মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা

আলপনা ঘোষ

মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়িতে যে বয়সে মেয়েরা রান্নাঘরে ঢুকে হাতাখুন্তি নিয়ে মায়ের সঙ্গে একটু-আধটু রান্নাবান্না করা শুরু করে সে বয়সে আমার এসব ব্যাপারে কোনও আগ্রহই ছিল না। বিয়ের পরে খানিকটা প্রয়োজনে মায়ের কাছে আমার রান্নায় হাতেখড়ি। কবে যে সেই প্রয়োজন আমার জীবনে শখে পরিণত হল, সে কথা জীবনের সাঁঝবেলায় পৌঁছে আজ আর মনে পড়ে না।

আমার ঠাকুমা শৈলজা দেবী ও আমার মা রেখা গুপ্ত দু’জনেই ছিলেন রন্ধনপটীয়সী। অতি কম তেল মশলা দিয়ে সাধারণ রোজকার রান্নাও ওঁদের হাতে হয়ে উঠত অসাধারণ। কালোজিরে কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে পাবদা বা পারশে মাছের সেই হলুদবাটার ঝোলের স্বাদ আজ এত বছর বাদেও যেন জিভে লেগে রয়েছে।

নারকেল সরষে দিয়ে ইলিশ বা চিংড়ি মাছ ভাপে, কাঁচা কুমড়ো বা ঝিঙে-মিষ্টি কুমড়ো, বা বেগুন দিয়ে লঙ্কা-হলুদ বাটার ইলিশ মাছের তেল ঝোল পাঁচ তারার হোটেলের পোলাউ-কালিয়ার থেকে স্বাদে-গন্ধে কোনও অংশে কম ছিল না।

আমার বাপের বাড়ির দেশ ছিল পূর্ববঙ্গের খোদ বরিশাল জেলাতে। দেশ বিভাগের পরে পুরো পরিবারের মানুষজন ছিন্নমূল হয়ে এপার বাংলায় এসে ঠাঁই নিলেন। শুরু হল নতুন করে বেঁচে থাকার, টিকে থাকার লড়াই। সেই কঠিন সময়েও ঠাকুমা কিন্তু তাঁর ফেলে আসা দেশের আচার অনুষ্ঠান বজায় রেখেছেন। তাই আমাদের ছোটবেলায়, ওপার বাংলার নবান্নের উৎসব এই কলকাতা শহরে নিয়ম নিষ্ঠা মেনে পালন করতে দেখেছি তাঁকে। আমাদের কাছে এই অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল আমার ঠাকুমার হাতের চাল মাখা। ভেজানো নতুন চালবাটা, নতুন গুড়, নারকেলকোরা দিয়ে মাখা হত। নারকেলের মধ্যে একটা শাঁস জাতীয় জিনিস থাকে যাকে ফোপরা বলতাম সেটিও এর মধ্যে দেওয়া হত। এতে আবার একটু আমআদার রসের আভাস পড়লে তো আর কথা নেই।

আজকাল যখন বাজার থেকে কেনা কাসুন্দি দিয়ে শাকভাজা খাই, তখনও ঠাকুমার হাতের কাসুন্দির কথা মনে পড়ে যায়। কাসুন্দি বানানোর সময় অনেক আচার নিয়ম মানতে হত। ছোটদের প্রতি কড়া নিষেধ ছিল আমরা যেন বাসি কাপড়ে ওঁকে ছুঁয়ে না দিই। তা হলে নাকি কাসুন্দি নষ্ট হয়ে যাবে। ঠাকুমা দুই রকমের কাসুন্দি বানাতেন। তার মধ্যে আমার ও আমার দিদির বিশেষ লোভ থাকত তেঁতুল কাসুন্দির প্রতি।

মাঝে মাঝেই নতুন ধরনের নানা রান্না নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাতেন ঠাকুমা। এরকমই একটি পদ ছিল মেটের পুর দিয়ে বেগুন। বড় মাপের বেগুন দু’ভাগ করে কেটে শাঁস চিরে তার মধ্যে রান্না করা মেটে পুরে ময়দার গোলায় চুবিয়ে ভেজে গরম গরম খেতে হবে। অনেক বছর বাদে রান্না নিয়ে যখন আমি নিয়মিত চর্চা করছি তখন ঠিক এরকমই একটি রান্নার খোঁজ পেয়েছিলাম এক নামকরা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান রন্ধনলেখিকার রান্নার বইতে। আজও ভেবে অবাক লাগে কী করে ‘ব্রিঞ্জাল কাটলেট’ নামের ওই অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পদটি আমার ঠাকুমার হেঁশেলে ঢুকে পড়েছিল।

এক অসাধারণ পোলাও বানাতেন ঠাকুমা। একান্তই নিজস্ব সেই রান্নার রেসিপি। খুব সাদামাটা নাম দিয়েছিলেন তার— দইভাত। এই পদে এমন মাপে দই দেওয়া হত, যে না বলে দিলে বোঝা মুশকিল ছিল এতে দই পড়েছে। অথচ দইয়ের হালকা স্বাদ ও গন্ধরাজ লেবুর পাতার গন্ধ— দুই মিলে, মা-ঠাকুমার হাতে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে যেত এই পদটি। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমি অবশ্য এই পদের নাম রেখেছি গন্ধরাজ পোলাও।

আমার মায়ের হাতের চিতল মাছের মুইঠ্যা, কাঁচকলার বড়া, নিরামিষ বা চিংড়ি দিয়ে মোচার ঘণ্ট ছিল অতি উপাদেয়।

জন্মাষ্টমী উপলক্ষে পাড়ায় পাড়ায় তালের ধুম পড়ে যেত। রান্নাঘরের দাওয়াতে তাল এনে ফেলা হত। বাইরেটা কুচকুচে কালো আর মসৃণ। মনে হত হাত ছোঁয়ালে পিছলে যাবে। ভেতরের রসালো শাঁসটি আবার সোনালি। ঠাকুমা আর মা যখন সেই তাল নিয়ে রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন, তখন তার তীব্র মিষ্টি গন্ধে সারা পাড়া আমোদিত হয়ে উঠত।

প্রতিবেশী ঘটি-বাড়িতে তৈরি হত তালপাটালি, তালের বরফি, তালফুলুরি। তালের ব্যাপারে এদেশীয়দের হাতযশ বোধহয় বাঙালদের তুলনায় একটু বেশি ছিল।

পৌষ সংক্রান্তিতে আমাদের বাড়িতে প্রায় উৎসবের সাড়া পড়ে যেত। পিঠে পায়েসের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত ক’দিন আগে থেকে। সংক্রান্তির দিন সারা বাড়ি পিঠে আর নতুন গুড়ের গন্ধে ম ম করত। তখন তো মিক্সি, প্রেশার কুকারের যুগ নয়। চাল গুঁড়ো করা বা ভেজানো চাল বাটা সবই মা-ঠাকুমা দু’জনে মিলে করতেন। সকাল থেকে রান্নাঘরে শুরু হয়ে যেত পিঠে পর্ব। চালের গুঁড়ো দিয়ে মা বানাতেন বাঙাল বাড়ির চিতুই পিঠে। এ দেশিরা যাকে আস্কে পিঠে বলে জানেন। মাটির ছাঁচে বেগুনের বোঁটা দিয়ে সরষের তেল মাখিয়ে চালের গোলা ঢেলে উনুনের আঁচে এই পিঠে তৈরি হত। ছাঁচের থেকে গরম গরম চিতুই পিঠে তুলে মা আমাদের পাতে দিতেন। গরম সেই পিঠে আমরা নারকেল কোরা আর ঝোলা নলেন গুড় দিয়ে তারিয়ে তারিয়ে খেতাম।

ঠাকুমা নারকেলের পুর ভরে পুলিপিঠে বানাতেন। কখনও সেটি ভেজে ঘন চিনির রসে ফেলে তুলে নিয়ে ভাজা পুলি হিসেবে খাওয়া হত। আবার কখনও না ভাজা পুলি দুধে ফেলে ঘন করে জ্বাল দিয়ে তিনি পুলি পিঠের পায়েস করতেন।

পায়েসে গুড় মেশানো হত খুব সাবধানে। একটু এদিক ওদিক হলেই দুধ কেটে যাবার ভয় ছিল যে।

মা ঠাকুমাদের রান্না নিয়ে অনেক গল্প, অনেক স্মৃতিচারণের শেষে থাকছে ওঁদের হাতের ‘দইভাতের’ রন্ধন প্রণালী।

দইভাত বা গন্ধরাজ পোলাও

উপকরণ: গোবিন্দভোগ চাল, মিষ্টিদই, গন্ধরাজ লেবুপাতা, কাজুবাদাম, কিশমিশ, মিহি করে কুচোনো আদা, কাঁচালঙ্কা, নুন, ঘি বা সাদা তেল।

প্রণালী: চাল ভাল করে বেছে ধুয়ে জল ঝরিয়ে রাখুন। মিষ্টিদই ফেটিয়ে নিন। ঝরঝরে করে ভাত রেঁধে মাড় গেলে একটি পাত্রে ছড়িয়ে রাখুন।

এবারে একটি ডেকচিতে অল্প ঘি বা তেল গরম করে তাতে আদা, কাজু ও কিশমিশ দিয়ে নাড়ুন এবং এতে রান্না করা ভাত ও চেরা কাঁচালঙ্কা দিন। নুন মেশান। উনুন থেকে নামিয়ে ভাতের মধ্যে ফেটানো দই ঢালুন ও আলগা করে নাড়াচাড়া করে লেবুর পাতাগুলি ভাতের সঙ্গে মেশান। কম আঁচে বসান ও খানিকক্ষণ রেখে নামিয়ে নিন। ঢাকা দিয়ে মজতে দিন। দইভাত তৈরি। একটু বেশি মিষ্টি স্বাদ যাঁদের পছন্দ, তাঁরা এ ভাতে অল্প চিনি দিতে পারেন।

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%