আলপনা ঘোষ
ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙালির ইতিহাস’ গ্রন্থের এক জায়গায় বলেছেন যে, ‘উচ্চকোটির’ বাঙালির বিবাহভোজে শাকপাতা চলত না। এত রকমের আমিষ আর নিরামিষ তরকারি-ব্যঞ্জন পরিবেশন করা হত তা নাকি লোকে গণনা করেও শেষ করতে পারত না।
এই প্রসঙ্গে খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকের মহাকবি শ্রীহর্ষের লেখা ‘নৈষধকাব্যে’ নলদময়ন্তীর বিয়ের ভোজের কথাই ধরুন না কেন। গিরিশচন্দ্র বেদান্ততীর্থ তাঁর একটি গ্রন্থে বলেছেন যে, এই ভোজে নাকি নানাবিধ খাদ্য রন্ধনশিল্পীরা এমন পদ্ধতিতে প্রস্তুত করেছিলেন যে বরযাত্রীরা সেগুলিকে অকালের ফলমূল ভেবে খেয়ে একেবারে বিস্মিত হয়ে যান। এ যেন অনেকটা বাঙালির ঘরে শ্যালিকাদের হাতে নতুন জামাইকে ঠকাবার ব্যবস্থা। বিয়ের ভোজ সম্বন্ধে শ্রীহর্ষ একটি শ্লোকে লিখেছিলেন যে ‘নানা প্রকার মত্স্য, হরিণ, ছাগ ও পক্ষীর মাংসের দ্বারা সূক্ষ্ম, সুস্বাদু এবং সুগন্ধী এত অধিক রকমের ব্যঞ্জন প্রস্তুত করা হইয়াছিল যে, লোকে তাহা খাইয়া শেষ করা তো দূরের কথা, কেহ তাহার সংখ্যা গণনা করিতেও সমর্থ হয় নাই।’ এসব তো গেল প্রাচীন যুগের কথা। পরবর্তী কালেও বাঙালির বিয়েবাড়ির ভোজ নিয়ে বাড়াবাড়ি কিন্তু একটুও হ্রাস পায়নি।
লেখিকা, গবেষিকা চিত্রা দেবের কাছ থেকে জানা যায় যে কৃষ্ণনগরের মহারাজ সৌরীশচন্দ্র রায়ের বিয়ের ঠিক আগে আশীর্বাদের অনুষ্ঠানের ভোজে অতিথিদের জন্য পাঁচ রকমের পোলাও, আট রকমের মাছের পদ রান্না হয়েছিল। সেখানে দই মাছ থেকে শুরু করে কই পাতুরি বা তেল কই, রুই দমপোক্ত, চিংড়ির মালাইকারি, ভেটকি মাছের ক্রোকেট্, রুই পেটি, মাছের অম্বল, কোনওটাই বাদ যায়নি, মাছের পরে ছিল পাঁঠা বা খাসির মাংসের পাঁচ রকমের পদ। সে যুগে সাধারণভাবে হিন্দুদের মধ্যে মুরগির মাংস খাবার তেমন চল ছিল না। নিরামিষ তরকারির পদ ছিল বারোটি। বাঙালির রান্নাঘরে ততদিনে মোগলাই ও সাহেবি খানার চল হয়েছে তার প্রমাণ মেলে পদগুলির নামকরণে। মেনুতে যেমন ছিল ফুলকপির মোগলাইকারি, কুমড়োর হুশেন শা, তেমনি ছিল মোচার চপ, ফুলকপির রোস্ট, পাঁপড় কারি ইত্যাদি। বাংলা পদে ছিল ফুলকপির জামাইভোগ। আর ছিল আলুর জয়হিন্দ।
আমার ছেলেবেলায় আবার ‘জয়হিন্দ সন্দেশের’ খুব চল ছিল। এই সন্দেশের তিনটি স্তরে তিনটি রং থাকত। গেরুয়া, সাদা, সবুজ। দেশ সবে স্বাধীন হয়েছে। দেশপ্রেম তখন তুঙ্গে।
সে দিনের অনুষ্ঠানে মিষ্টির যে দীর্ঘ তালিকা চিত্রা দেব দিয়েছেন, তার মধ্যে এই বাংলার বিখ্যাত সব আঞ্চলিক মিষ্টির একটিও বাদ যায়নি। যেমন বেলডাঙার মনোহরা, কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত সরভাজা ও সরপুরিয়া, শান্তিপুরের নিখুতি, বর্ধমানের সীতাভোগ, কালীগঞ্জের রসকদম্ব, দিগনগরের দেদো মণ্ডা, বহরমপুরের ছানাবড়া ইত্যাদি ইত্যাদি।
পঞ্চাশ দশকের গোড়ায় বিয়েবাড়ির চিত্রটা আমার নিজের চোখে দেখা। সেসময় বাড়ির ছাদে ম্যারাপ বেঁধে একদিকে ছাদনাতলায় বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান হত, অন্য দিকে অতিথিদের মাটিতে পিঁড়ি পেতে বসিয়ে কলাপাতায় খেতে দেওয়া হত। বাড়ির ছোটদের ওপরে ভার পড়ত মাটির গেলাসে জল আর কলাপাতার এক কোণে নুন লেবু দেবার। বাড়িতেই ভিয়েন বসত। তখন ভবানীপুরে ওড়িশার পাচকদের একাধিক ঠেক ছিল। বনেদি সব পরিবারের তো বাঁধা পাচক থাকতেন, যাঁরা বংশপরম্পরায় তাঁদের নির্দিষ্ট সহকারীদের নিয়ে রান্না করে যেতেন। এঁদের রান্নার যশ ছিল প্রায় আকাশ ছোঁয়া। বাঙাল, ঘটি সব বাড়িতেই ছিল ওঁদের সহজ বিচরণ। বাড়ির কর্তার ফরমাশ অনুযায়ী ওঁরা রান্না করতেন। অনেক পরিবারে বাজারের মিষ্টি ঢুকত না। এই পাচকেরাই এমন সব মিষ্টি বানাতেন যা স্বাদ ও গুণগত মানে যে-কোনও নামী মিষ্টির দোকানকে হার মানিয়ে দিতে পারত। বাঙালির যে-কোনও সামাজিক অনুষ্ঠান এঁদের ছাড়া চলত না।
পূর্ববঙ্গের বিয়েবাড়িতে লুচি, পোলাওয়ের চল ছিল না। সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালবাড়ির মেনুতে থাকত সাদা ভাত, ডাল, বেগুনভাজা, একটা সবজির ঘ্যাঁট। মাছের একাধিক পদ থাকত। পুকুরের বড় রুইমাছ দিয়ে হত দই মাছ। সরষেবাটা হত বড় দেশি পারশে বা ইলিশ দিয়ে। তেলঝোল হত চিতল মাছের পেটি দিয়ে। শীতের দিনে ফুলকপি দিয়ে হত গলদা চিংড়ি। বাঙালদের অতি প্রিয় চিতল মাছের গাদার অংশ দিয়ে ‘মুইঠ্যা’ও বাদ যেত না। সামর্থ্য মতো এসব পদের থেকে বেছে মেনুতে যোগ হত। ও-বাংলার বিয়ের ভোজে মাংসের খুব চল ছিল না। চাটনি আর পাঁপড়ভাজা দুই বাংলার মানুষেরই পছন্দের ছিল। শেষ পাতে পায়েস খাওয়ানোর চল ছিল। গ্রীষ্মকালে ঘটি, বাঙাল সবাই আম খাওয়াতেন।
ঘটি বাড়ির মেনুটা হত ভিন্ন। গরম গরম ফুলকো লুচি ছাড়া চলত না। তার সঙ্গে কখনও থাকত কাজু, কিশমিশ দেওয়া পোলাও। লুচির সঙ্গে বোঁটাসুদ্ধ বেগুনভাজা, হালকা মিঠা স্বাদের ছোলার ডাল, কুমড়োর ছক্কা, রুইমাছের কালিয়া, গলদা চিংড়ির মালাইকারি, পাঁঠার মাংস থাকত। শেষ পাতে দ্বারিকের বা মোল্লার চকের লাল দই থাকত। মিষ্টির মধ্যে থাকত দরবেশ ও সন্দেশ। পরিবেশনের সময় দইয়ের মাথা খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রিতদের মধ্যে শোর পড়ে যেত। কোনও কোনও বাড়িতে আবার খাজা দিয়ে ক্ষীর পরিবেশনের রীতি ছিল। একে বলা হত ক্ষীরখাজা।
পর্ব শেষে থাকছে ছানাগোলা পায়েসের প্রণালী।
জল ঝরানো ছানা বেটে চিনির রসে ছেড়ে দিন। মিনিট পাঁচেক ফুটিয়ে আগে থেকে ঘন করা দুধ ঢেলে দিন। কিশমিশ মেশান। অল্প আঁচে ভাল করে নাড়ুন। ঘন হয়ে এলে একটি পাত্রে ঢেলে ওপর থেকে বাদামের কুচি আর এলাচের গুঁড়ো ছড়িয়ে বাটি ভরতি করে পরিবেশন করুন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন