আলপনা ঘোষ
এদেশিদের কথা বলার ধরনটি ভারী মিষ্টি! তাই বুঝি তাঁরা গুচ্ছের মিষ্টি ঢালেন রান্নায়, তা সে যে পদই হোক না কেন!
মিঠে রসনা ও মিঠে কথা এই দুটি দিয়ে ঘটিদের যায় চেনা। আমি নিজে কাঠ বাঙাল, অন্তত ছেলেবেলা থেকে এদেশি প্রতিবেশী ও বন্ধুদের কাছ থেকে এই সম্বোধনে অভ্যস্ত হয়েছি। কিন্তু আমরাও কিছু কম যাই না এসব ব্যাপারে, তাই পালটা জবাব দিতেই বোধহয় ওদের আমরা ঘটি বলে ডেকে এসেছি। শোধবোধ আর কী!
আমার দূর সম্পর্কের এক কাকা প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন এক আপাদমস্তক পাঁড় ঘটি কন্যাকে। কন্যা রূপেগুণে অতুলনীয়া, তাই সেই ষাটের যুগেও যখন ঘটি-বাঙালের বিয়ে প্রায় অভাবনীয় ছিল, সেই সময়ে অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বেশ ঘটা করে শেষ পর্যন্ত ওঁদের বিয়ে হয়েছিল।
মনে আছে সে বিয়েতে পাত পেড়ে খেয়েছিলাম আমরা। ঘটিবাড়ির বিয়েতে অন্য অনেক পদের মধ্যে ‘নুচি’, বেগুনভাজা, প্রচুর মিষ্টি দেওয়া ছোলার ডাল ছিল। নতুন স্বাদের এই ছোলার ডাল আমাদের জিভে ভাল লাগলেও, সে কথা গুরুজনদের সামনে বলার উপায় ছিল না, এমনই বৈরীভাব তখন ঘটি-বাঙালের মধ্যে। বিপত্তি হল, যখন বিশাল আকারের গলদা চিংড়ির পদটি আমাদের পাতে পরিবেশিত হল। পরিমিত মশলা, ঘি, গরমমশলা সহযোগে সে রান্না শুধুমাত্র মিষ্টির আধিক্যজনিত কারণে, অতি লোভনীয় সে চিংড়ির পদটি আমরা ছোটরাও, হায়, উপভোগ করতে পারলাম না।
শেষ পাতে কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত সরভাজা ও সরপুরিয়া এবং মোল্লার চকের লাল দই ছিল। কিন্তু তাতেও বরপক্ষ চিংড়ির শোক ভুলতে পারলেন না। অনুষ্ঠান শেষে বরযাত্রীদের নিয়ে বাসে করে ফেরার সময়ে, গুরুজনেরা খাস বাঙাল ভাষায় বিয়ের ভোজ সম্বন্ধে যেসব চোখা চোখা বিশেষণ প্রয়োগ করেছিলেন তা অবশ্য জনসমক্ষে প্রকাশযোগ্য নয়। রূঢ় সত্য ভাষণে বাঙালদের জুড়ি মেলা ভার সে কথা তো কারও অজানা নয়।
নববধূ শ্বশ্রূগৃহে পদার্পণ করলেন। বাঙালরা মনে বেশিক্ষণ অসন্তোষ পুষে রাখেন না, তাও আবার কারণটা যখন সামান্য ভোজন-বিষয়ক। তা ছাড়া এ ব্যাপারে নববধূর যে কোনও দোষ নেই, সে কথাও ওঁরা বিলক্ষণ বুঝেছিলেন। তাই সাদর সম্মানে তাঁকে ঘরে তোলা হল।
বিয়ে-থা চুকে যাবার কিছুকাল পরে এক শীতের দিনে কাকাদের বাড়ি থেকে মধ্যাহ্ন ভোজনের নিমন্ত্রণ এল। নির্দিষ্ট দিনে আমরা দল বেঁধে গন্তব্য স্থানে পৌঁছে গেলাম। এদেশি সুন্দরী নতুন কাকিমার সঙ্গে আলাপ করার আকর্ষণও তো আমাদের কিছু কম ছিল না।
এমনিতে বাঙালবাড়িতে নেমন্তন্ন করে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের ডাকলেও খাওয়া-দাওয়ার ধরনটা খুব সাদামাটা ছিল। কিন্তু সেদিন যে নতুন বউয়ের হাতে রান্না করা একটি বিশেষ পদ থাকবে এ বিষয়ে অতিথিরা প্রায় নিশ্চিত ছিলেন।
নিমন্ত্রণকর্তা, সম্পর্কে আমার বাবার জ্যাঠামশাই আমাদের দেখেই, ‘আও, বও’ বলে আপ্যায়ন করলেন। দাদু, বাবা বৈঠকখানায় বসলেও আমরা ছোটরা মা ঠাকুমার সঙ্গে অন্দরমহলে ঢুকে গেলাম। মেয়েলি আড্ডার ফাঁকে শুনে ফেললাম যে সেদিনের বিশেষ পদ কচি পাঁঠার ঝোলটি রাঁধছেন আর কেউ নয়, আমাদের নতুন কাকিমা।
বাঙালবাড়িতে নানা রকম মাছের নানা পদ প্রায়শ রান্না হলেও, ক্বচিৎ কদাচিৎ মাংস রান্না হত। আমাদের বাড়িও তার থেকে ব্যতিক্রম ছিল না। কাজেই কচি পাঁঠার ঝোলের নামে আমাদের ভাই-বোনেদের নোলায় জল।
খাবার ঘরে গোল হয়ে পিঁড়ি পেতে ঝকঝকে কাঁসার থালা সামনে রেখে বসে আছি। সাদা ধোঁয়া ওঠা ভাত, মুশুরির ডাল, কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা দিয়ে পাতলা ইলিশ মাছের ঝোল। কিন্তু আমরা ছোটরা খিদে চেপে বসে আছি শুধুমাত্র নতুন কাকিমার হাতে রান্না করা মহার্ঘ সেই কচি পাঁঠার ঝোলের প্রতীক্ষায়।
ছোট হাতায় এইটুকু ডাল বা মাছের ঝাল তুলে ঘটিদের মতো দশবার— ‘আর একটু দেব কি? আর একটু নাগবে কি? পেট ভরে খাও নয়তো মাথা খাও’ এসব আদিখ্যেতা দেখাবার রেওয়াজ বাঙালদের মধ্যে কোনও কালে ছিল না। তাই আমার পাতের কাছে ইলিশের কাঁসি নিয়ে আসতে আর আমি একবার মাথা নাড়তেই ইলিশ মাছের বড় পেটিটা পাশের জনের পাতে গিয়ে পড়ল। তখন আর পেট চেপে বসে থাকা ছাড়া উপায় কী?
অবশেষে মাথায় ঘোমটা টেনে নতুন কাকিমার প্রবেশ। হাতে ধরা মাংসের বাটি থেকে হাতায় করে মাংস পাতে দিতেই, সবটা ভাত মাংসের ঝোলের সঙ্গে মেখে কপাত করে মুখে পড়তেই মনে হল পায়েস খাচ্ছি। এখানেও যে-কোনও পদে, এমনকী মাছ, মাংসতেও থাবা থাবা মিষ্টি দিয়ে ঘটিদের রান্না করার সেই একই গল্প। আজ এত দশক পরেও সেদিনের হতাশার কথা ভুলিনি। পরবর্তীকালে সেই কাকিমাই কিন্তু শুধু বাঙাল রান্না নয়, দেশি-বিদেশি পদ রান্না করে নাম কিনেছিলেন।
এদেশিরা নানাবিধ মশলা দিয়ে যা-ই পরিপাটি করে রাঁধুন না কেন, তাতে একগাদা মিষ্টি না মেশালে তাদের দিন বরবাদ, তা সে শুক্তো থেকে শুরু করে ডাল, কুরকুরে করে আলুভাজা, সরষেবাটা দিয়ে পুঁইডাঁটার চচ্চড়ি, ‘কাতলা’ মাছের কালিয়া বা মাংসের ঝোল যাই হোক না কেন! একটা সময় ছিল যখন নাকি ঘটিরা ভেলিগুড় ছাড়া কোনও রান্নার কথা ভাবতে পারতেন না।
রান্নায় মিষ্টি দেওয়া নিয়ে ঘটিদের যতই গালমন্দ করি না কেন, এক ব্যাপারে ওঁরা কিন্তু আমাদের পিছনে ফেলে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন আর তা হল শান্তিপুরের নিখুঁতি, বেলডাঙার মনোহরার মতো অগুন্তি সব অপূর্ব, স্বাদু মিঠাই। কাজেই রান্নায় মিষ্টি দেওয়া নিয়ে ঘটিদের সঙ্গে কাজিয়াতে মিষ্টিমুখ দিয়ে ইতি টানাই বোধহয় বিধেয়।
আমার এক এদেশি বন্ধুর মায়ের হাতে বানানো একটি অতি সাধারণ অথচ অত্যন্ত স্বাদু মিষ্টি পাকাকলার বড়া খেয়েছিলাম কয়েক যুগ আগে যার স্বাদ আজও ভুলিনি।
উপকরণ: ছানা, পাকাকলা, খোয়া ক্ষীর, ময়দা, দুধ, এলাচ, চিনি, জল, ঘি।
প্রণালী: জল ঝরানো ছানা ভাল করে মেখে নিন যাতে কোনও খিঁচ না থাকে। পাকাকলা টুকরো করে কেটে মিক্সিতে বা হাতে চটকে মেখে এতে খোয়া ক্ষীর, ময়দা, দুধ, এলাচের গুঁড়ো এবং ছানা মেশান। পুরো মিশ্রণ একসঙ্গে ভাল করে মেখে ঘণ্টা কয়েক রেখে দিন। চিনি দিয়ে সিরা তৈরি করুন। কড়াই উনুনে বসিয়ে তাতে ঘি দিন। কলা ও ছানার মিশ্রণ দিয়ে বড়া তৈরি করে গরম ঘি-তে কলার বড়া ভাজুন। বড়াতে বাদামি রং ধরলে তুলে নিয়ে চিনির সিরাতে ফেলুন। বড়াতে রস ঢুকলে রস থেকে তুলে গরম গরম খেতে দিন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন