আলপনা ঘোষ
শস্য-শ্যামলা বঙ্গভূমিতে সাধারণ মানুষের ক্ষুধা নিবৃত্তির অন্যতম প্রধান উপায় ছিল শাক ভক্ষণ। তাই বোধহয় দরিদ্রের উপযোগী খাদ্য বোঝাতে ‘শাকভাত’ কথাটির চল হয়েছিল। নিরামিষভোজীদের অপর এক নাম শাকাহারী। এ পোড়া বঙ্গদেশে যেখানে অভাব, অনটন, রোগ-মারী মানুষের রোজকার বালাই সেখানে প্রকৃতি অকৃপণ হাতে উজাড় করে দিয়েছেন শাক ও সবজির ভাণ্ডার। ধনী, দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের খাদ্য তালিকায় তাই শাক এক বিশেষ স্থান জুড়ে রয়েছে। মধ্যযুগের বাংলার মঙ্গলকাব্যগুলিতে রান্নাবান্নার যেসব বিবরণ পাই, সেখানেও শাকের সগৌরব উপস্থিতি লক্ষণীয়। ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী দাসীর শাক সংগ্রহের কথা বলতে গিয়ে নানাবিধ শাকের কথা বলেছেন।
নটে রাঙ্গা তোলে শাক পালঙ নালিতা,
তিক্ত ফলতার শাক কলতা পলতা।
আবার লিখেছেন,
নটুয়া বেথুয়া তোলে ফিরে ক্ষেতে ক্ষেতে,
মহুরী শুলকা ধন্যা ক্ষীর পাই বেতে।
কবিকঙ্কণ আবার এখানে নিরামিষ রান্নার বিভিন্ন পদ্ধতির কথা প্রসঙ্গে শাকে ঘি দেবার কথা বলেছেন। যথা
ঘৃতে ভাজা পলা কড়ি, উনটা শাকে ফুলবড়ি—
ঘৃতে নালিতার শাক, চিঙ্গড়ী কাঁটাল বীচি দিয়া। ইত্যাদি।
‘চৈতন্যভাগবত’ রচয়িতা বৃন্দাবন দাস তাঁর গ্রন্থে কুড়ি রকম শাক রান্নার কথা বলেছেন। ‘চৈতন্যচরিতামৃত’-এর লেখক কৃষ্ণদাস কবিরাজের লেখাতেও সার্বভৌম ভট্টাচার্যের বাড়িতে চৈতন্যদেব অন্নের সঙ্গে যে যে নিরামিষ খাদ্য গ্রহণ করেছিলেন তার মধ্যে শাকের উল্লেখ মেলে। যেমন,
দশবিধ শাক নিম্ব তিক্ত শুক্তার ঝোল,
মরিচের ঝালে ছেড়াবড়ি বড়া ঘোল ইত্যাদি ইত্যাদি।
ষোড়শ শতকে রচিত দ্বিজ বংশীদাসের ‘মনসামঙ্গল’-এ শাকের নানাবিধ রন্ধন-প্রণালী মেলে। যেমন-
‘প্রথমে নালিতা শাকে রান্ধিলেন তৈল পাকে, কচুশাকে নারিকেল কাটি,’-।
আজও এই একবিংশ শতকে নিরামিষ কচুশাকের ঘণ্টতে বাঙালির রান্নাঘরে নারকেল কোরা দিয়ে রান্নার চল রয়েছে।
বাংলা ভাষায় প্রথম রান্নার বই ‘পাকরাজ্যেশ্বর’ গ্রন্থেও বাঙালির সব ধরনের খাদ্যের মধ্যে শাকের উল্লেখ মিললেও তার তালিকা মোটেই দীর্ঘ নয়। বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘পাকপ্রণালী’ (প্রথম প্রকাশ: ১৩০৪ ব.) গ্রন্থে পালং, হিঞ্চে, কচু, নটে, মেথি প্রভৃতি নানাবিধ শাকের উল্লেখ করেছেন যা কখনও ভাতে, ভাজা, ছেঁচকি বা ঘণ্টতে যেমন ব্যবহৃত হয়েছে তেমনি ব্যবহৃত হয়েছে নানা আমিষ পদে। এরকমই একটি নিরামিষ পদ হল নটেশাকের ঘণ্ট।
টাটকা এবং কচি নটে শাক ভাল করে ধুয়ে, বেছে কুচি কুচি করে কেটে নিতে হবে। আলু ও কাঁচকলার খোসা ছাড়িয়ে কুচিয়ে রাখুন। কড়াইতে তেল গরম করে তাতে বড়ি ভেজে তুলে নিন। পরে ওই তেলে তরকারিগুলি কষে তাতে শাক ঢেলে, নুন দিয়ে ঢিমে আঁচে ঢাকা দিয়ে রাখুন। শাকের জল মরে এলে, আরও একটু জল দিন। তরকারি সুসেদ্ধ হলে দুধ, চিনি, ধনেবাটা, জিরেমরিচবাটা, লঙ্কাবাটা, ছেঁচা আদা ও নারকেল কোরা দিয়ে নাড়াচাড়া করে সামান্য ময়দাগোলা ঢেলে দিন। ঘি-এ জিরে ফোড়ন দিয়ে ঘণ্ট সাঁতলে নিন। দু’-একবার ফুটে উঠলে নামিয়ে নিন।
‘ক্যালকাটা কুক বুক’ গ্রন্থের তিন সেরা রাঁধুনির অন্যতম ছিলেন মীনাক্ষী দাসগুপ্ত। এই গ্রন্থে তিনি দিয়েছেন ‘পালং শাক, ধনেপাতা ও মেথি শাক ভাজার’ এক স্বাদু রন্ধন-প্রণালী।
পালং, মেথি ও ধনেপাতা ধুয়ে বেছে, পাতাগুলি কুচিয়ে নিতে হবে। সরষের তেল কড়াইতে ঢেলে ভাল গরম হলে তাতে কুচোনো টম্যাটো, পেঁয়াজ দিয়ে নেড়েচেড়ে আঁচ কম করে লঙ্কা, হলুদ দিন। ভাল করে কষে, পেঁয়াজ নরম থাকতেই পালং, মেথি, ধনেপাতা ও স্বাদমতো নুন দিন। ঢাকা না দিয়ে রাঁধুন। শাক নরম হয়ে এলে ভাজা বাদাম দিয়ে ভাল করে নেড়ে ভাজা, ভাজা হলে নামিয়ে নিন।
কিরণলেখা রায়ের ‘বরেন্দ্র রন্ধন’ গ্রন্থে সরল পুঁটি দিয়ে মটরশাক ঘণ্টের এক অভিনব পদের উল্লেখ মেলে। এই ঘণ্ট রাঁধতে নাকি পুঁটিমাছের আঁশ ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আঁশ সমেত মাছ কুটে ঘণ্টে দেওয়া যেতে পারে।
এই প্রসঙ্গে শীতের মরসুমে আমার মায়ের হাতে রাঁধা পালংশাকের একটি আমিষ ঘণ্টের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, অনেক চেষ্টা করেও স্বাদে গুণে আমি আজও মায়ের সেই রান্নার ধারেকাছে পৌঁছুতে পারিনি। কুচোনো কাঁচালঙ্কা ও পেঁয়াজ ফোড়ন দিয়ে মিহি করে কাটা পালংশাকে মা দিতেন ভাজা চিংড়ি, টাটকা মটরশুঁটি, নুন, সামান্য মিষ্টি। সব শেষে মাখো মাখো এই পালংশাক ঘণ্টে কুচোনো ভাজা নারকেল ছড়িয়ে নামিয়ে নিলেই তৈরি এই স্বাদু পদ।
বাংলা ভাষাতে একটি প্রবাদবাক্য চালু আছে, ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’ দেওয়া। অধুনা বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছার জমিদার বংশের কৃতীপুরুষ ধীরেন্দ্রকান্ত লাহিড়ী চৌধুরীর সহধর্মিণী রেণুকা দেবী চৌধুরাণী তাঁর ‘রকমারি আমিষ রান্না’ বইতে আক্ষরিক অর্থে শাক দিয়ে মাছ না ঢেকে শাক ও মাছের নানাবিধ স্বাদু সব রন্ধন-প্রণালী আমাদের জন্য রেখে গেছেন। তাতে রয়েছে চিংড়ি দিয়ে ঢুলো শাকের শুক্তো, ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কলমি বা পালং শাকের ঘণ্ট, মটরশাক দিয়ে কইমাছ, কলমি ডাঁটা ও ডগা দিয়ে ইলিশ মাছের পদ ইত্যাদি। শুধু মাছে নয়, মাংসতেও তিনি শাক দিয়ে স্বাদু সব পদ সৃষ্টি করেছেন। মাটন এবং মুরগি এই দুটোতেই তিনি মেথি শাক ও নারকেল দুধের মেল বন্ধন করে এমন এক পদ সৃষ্টি করলেন যা এক কথায় তুলনাহীন।
‘মেথিশাক ও নারকেলের দুধ দিয়ে মুরগির মাংস’ পদে আদাবাটা, রসুনবাটা ও নুন দিয়ে মাংস কিছুক্ষণ মেখে রেখে দিতে হয়। একটি ডেকচিতে ঘি বা তেল চড়িয়ে পেঁয়াজকুচি ও দারচিনির টুকরো দিন। সুগন্ধ বেরুলে মশলামাখা মাংস ছেড়ে বেশ করে কষতে হবে। পরিমাণ মতো গরম জল দিয়ে ঢাকা দিয়ে মাঝারি আঁচে রাখুন। অন্য একটি ডেকচিতে ঘি বা তেল গরম করে কাঁচালঙ্কা চিরে দিন। একটু ভেজে মোটা মোটা করে কাটা মেথিশাক দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। ভাজা হয়ে গেলে এই শাক মাংসে ঢেলে নেড়েচেড়ে মিশিয়ে দিন। দশ-পনেরো মিনিট ফোটার পরে নারকেলকোরা থেকে দুধ বের করে মাংসে দিন। এই ঝোল বেশি ফুটবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন