আলপনা ঘোষ
বাঙালির বিয়ের ভোজে বিদেশি পদের অনুপ্রবেশের ঘটনা খুব সাম্প্রতিক নয়। বাঙালি পদের সঙ্গে দোলমা, মাছ বা মাংসের চপ, ফিশফ্রাই, চিংড়ির কাটলেট, মাংসের কিমা দিয়ে আলুচপ কিংবা চিংড়ির চিনে কাবাব প্রভৃতি পদের পরিবেশন শুরু হয়েছিল সেই প্রাক স্বাধীনতা যুগে।
আমার ঠাকুরদার প্রাণের বন্ধু ঐতিহাসিক ড. সুরেন্দ্রনাথ সেনের ছেলের বিয়ে হয়েছিল খুব ঘটা করে। সেটা সম্ভবত গত শতাব্দীর পঞ্চাশ দশকের শেষের দিক। বউভাতের খাওয়াতে ছিল হরেক রকমের পদ। তখনও বাঙালি শেষ পাতে পায়েস, দই, সন্দেশ, রসগোল্লা বা দরবেশ জাতীয় মিষ্টিতে আটকে ছিল। ওই বিয়েবাড়িতে আমি প্রথম আইসক্রিম খেয়েছিলাম ঝকঝকে রুপোলি পাত্রে। নতুনত্বের দিক দিয়ে দইয়ের জায়গায় আইসক্রিম বেশ একটা চমক সৃষ্টি করতে পেরেছিল। তাই আজ এত দশক বাদে সে দিনের অন্য কোনও খাবারের পদের নাম মনে না থাকলেও, আইসক্রিমের কথা কিন্তু ভুলতে পারিনি।
ততদিনে মাটিতে বসে খাওয়ার পরিবর্তে হলুদ রঙের ভাঁজ করা চেয়ার টেবিলে বসে খাওয়া শুরু হয়েছে। ডেকরেটারের লোকজনই লম্বা লম্বা, কাঠের টেবিল, কাঠের চেয়ার নিয়ে আসত। টেবিলের ওপরে জলের ছিটে দিয়ে কাগজের সাদা চাদর বিছিয়ে ঠিক মাপে ছিঁড়ে নেওয়া হত। তার ওপরে কলাপাতা পাতার জায়গায় দেওয়া হত পোড়া মাটির বাসন বা কাচের প্লেট। এক ব্যাচের খাওয়া হয়ে গেলে, ঝটপট কাগজ পালটে, নতুন কাগজ পেতে দেওয়া হত। পরিবারের তরুণ সদস্য ও তাঁদের বন্ধুবান্ধবরাই কোমরে গামছা বেঁধে, পেতলের বালতি নিয়ে পরিবেশন করতেন। প্রতি পদই একাধিক বার নিমন্ত্রিতদের পাতের সামনে শুধু লোকদেখানো ঘুরিয়ে দেবার চল ছিল না। গৃহকর্তা ও তাঁর আত্মীয়স্বজন দাঁড়িয়ে থেকে খাওয়ার তদারকি করতেন।
আশির দশকেই বাঙালির বিয়ে, অন্নপ্রাশন প্রভৃতি যে-কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে ধীরে ধীরে কেটারিং প্রথা চালু হয়ে যায়। কোম্পানির নাম মনোগ্রাম করা সাদা পোশাক বা ইউনিফর্ম পরে অল্পবয়সি ছেলেরা পরিবেশন করতেন। হাতে দস্তানা পরে চিমটে দিয়ে ফিশফ্রাই নিমন্ত্রিতের পাতে তুলে দিতেন। দেবার আগে ফিসফিসিয়ে জেনে নিতেন অতিথি সেটি খেতে ইচ্ছুক কি না। গলদা চিংড়ির মালাইকারি নিয়ে ঝড়ের গতিতে ওঁরা আবির্ভূত হয়ে নিমেষে অদৃশ্য হয়ে যেতেন। অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছে থাকলেও অতিথিরা দ্বিতীয়বার মহার্ঘ এই পদটি চাইবার সুযোগই পেতেন না।
এই সময়ে বিয়েবাড়ির ভোজের খাওয়াতে প্রায় নিঃশব্দে এক বিপ্লব ঘটে যায়। পোলাওয়ের জায়গায় ঢুকে পড়ে আমিষ বা নিরামিষ, নানা ধরনের ফ্রায়েড রাইস ও বিরিয়ানি। লুচির বদলে কড়াইশুঁটির কচুরি বা রাধাবল্লভী, রুমালি রুটি, নান, লাচ্চা পরোটা প্রভৃতির ভক্ত হয়ে পড়ে বাঙালি। ফিশ ফ্রাইয়ের বদলে মেনুতে ঢুকে পড়ে ফিশ ওরলি। টিক্কা, কাবাবও ওই দৌড়ে পিছিয়ে থাকেনি। তেজপাতা, গোটা জিরে ও থেঁতো করা গরমমশলা ফোড়ন দিয়ে আদা, জিরেবাটা দেওয়া বাঙালির চিরন্তন ছানার ডালনা হয়ে পড়ে ব্রাত্য। তার বদলে পাতে পড়ে পেঁয়াজ, রসুন, আদাবাটা ও নানাবিধ মশলা সহযোগে তৈরি পনির বাটার মশালা কিংবা পালক পনির। পাঞ্জাবি, গুজরাটি, কাশ্মীরি প্রভৃতি প্রাদেশিক রান্নার পদ ঢুকে পড়ে বাঙালির বিয়ের ভোজে। শুধু কি তাই? কখনও কখনও কন্টিনেন্টাল, চাইনিজ পদের দেখাও মেলে এইসব পাঁচমেশালি দেশি পদের ভিড়ে।
ইতিমধ্যে অতিথি আপ্যায়নের ধারাতেও আসে পরিবর্তন। অতিথিকে ‘এসো বোসো, ভাল করে খাও, আর অন্তত দু’পিস মাছ নাও’ এসব বলার জন্য কেউ থাকে না।
অতিথিদের ভিড় বাড়তে শুরু করলে দেখা যায় কেটারার কোম্পানির উর্দি পরা ছেলেরা চা, কফি, ঠান্ডা পানীয় ভরতি কাগজের গ্লাস ট্রে-তে নিয়ে অতিথিদের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। মুখে তাঁদের কথা নেই। কে কোন পানীয় নেবেন কি আদৌ নেবেন কি না তার দায় কিন্তু অতিথির। ‘স্টার্টার’ নামক বস্তুটির সবে তখন আমদানি হয়েছে চা, কফি বা শরবতের সঙ্গে ‘টা’ হিসেবে। আগেকার দিনে বরযাত্রীদের জন্য শরবত বা চায়ের ব্যবস্থা থাকত, তার সঙ্গে দু’-চারটে বিস্কুট। আজকাল সে জায়গায় সব নিমন্ত্রিতদের জন্য থাকে চিকেন ললিপপ, পকৌড়া, কাবাব, প্রন গোল্ডকয়েন বা ফিশফিঙ্গার। নিরামিষাশীদের জন্য পনির বা মাশরুম টিক্কা, বেবি কর্ন ভাজা বা ভেজিটেবল চপ।
পরিবেশনের ব্যাপারেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। আমদানি হয়েছে ‘ব্যুফে’র যেখানে লম্বা সাজানো টেবিলের ওপরে সুদৃশ্য পাত্রে খাদ্যবস্তু সাজানো থাকবে। প্লেট, কাঁটা চামচ নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে অতিথিরা তাঁদের পছন্দের খাবার প্লেটে তুলে খেতে শুরু করবেন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে দু’-চারজনের বসার মতো চেয়ার টেবিলের ব্যবস্থা থাকবে নচেৎ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাওয়া সারুন। খাওয়া নিয়ে জোর জবরদস্তি নেই। ইচ্ছে মতো কমবেশি যেমন প্রাণ চায় খেয়ে নিন।
একালের বিয়ের ভোজের একটি পরিচিত মিষ্টি পদ বেক্ড সন্দেশের প্রণালী থাকছে পর্ব শেষে।
উপকরণ: গুঁড়ো দুধ, জল, কন্ডেন্সড মিল্ক, গুঁড়ো চিনি, দই, ঘি, লেবুর রস, এলাচগুঁড়ো, কুচোনো পেস্তা।
প্রণালী: ২ কাপ গুঁড়ো দুধ জল দিয়ে গুলে ফুটিয়ে নিন। লেবুর রস মিশিয়ে ছানা কাটুন। ভাল করে জল ঝরিয়ে নিন। এবারে এতে ১/৪ কাপ গুঁড়ো চিনি, ১ টেবিল চামচ দই, ১/২ কাপ কন্ডেন্সড মিল্ক, ২ টেবিল চামচ ঘি ও ১ চামচ এলাচ গুঁড়ো মেশান। পুরো মিশ্রণ ভাল করে মাখুন। এবারে একটি বেকিং পাত্রে মাখন মাখিয়ে তার ওপরে ছানার মিশ্রণ ঢেলে হাত দিয়ে সমান করুন। আগে থেকে গরম করা ওভেনে পাত্রটি ঢুকিয়ে ১৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ১৫-২০ মিনিট বেক করুন। চৌকো করে কেটে কুচোনো পেস্তা ওপর দিয়ে ছড়িয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন