সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা

আলপনা ঘোষ

চার দশকেরও বেশি সময় আগের কথা। দক্ষিণ কলকাতার এক নামী ইস্কুলের দিদিমণি আমি তখন। সবে নতুন সংসার পেতেছি লেক রোড অঞ্চলে। একতলায় আমাদের ফ্ল্যাটের উলটো দিকে থাকতেন এক স্বামীনাথন পরিবার। সকাল হলেই তাঁদের বাড়ি থেকে ভেসে আসা কফির গন্ধে মাতোয়ারা সারা পাড়া।

বিকেলে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলেই প্রায় আমার মায়ের বয়সি স্বামীনাথন-গিন্নি আমাকে ডেকে নিতেন গল্প করার জন্য। আমার সাংবাদিক স্বামীটি যে সে সময় বাড়ি থাকেন না তা উনি টের পেয়ে গিয়েছিলেন। চমৎকার বাংলা বলতেন। এক-একদিন একেক রকম মাদ্রাজি খাবার বানাতেন আর তা চেখে দেখার দায় ছিল আমার। দোসা, বড়া, ইডলি, সম্বর কোনওটাই বাদ যেত না। আর তার সঙ্গে থাকত গরম ফিলটার্ড কফি।

ওই সময়ে আমাদের বাঙালিদের কাছে দক্ষিণ ভারতীয় মাত্রেই তাঁর পরিচয় ছিল ‘মাদ্রাজি’ নামে তা তিনি তামিলনাড়ু, কেরালা, অন্ধ্র বা কর্ণাটক যে রাজ্যেরই লোক হোন না কেন।

সন্ধের সময় কোনওদিন লেক মার্কেটে বাজার করতে গেলে মনে হত যেন একটা মিনি মাদ্রাজ শহরে এসেছি। বাজারের ঠিক উলটো দিকে কমলা ভিলা ছিল দক্ষিণীদের অস্থায়ী আবাসস্থল। জীবিকার সন্ধানে তামিলনাড়ু, কেরালা প্রভৃতি দক্ষিণী রাজ্য থেকে আগত মানুষজনেরা প্রথমে এসে এখানেই ডেরা বাঁধতেন। কমলা ভিলার পাশ দিয়ে গেলেই সম্বরের গন্ধ ভেসে আসত।

ভিলার বাইরে ফুটপাতের উপরে সার বেঁধে বেশ কিছু দোকান ছিল। তাদের কোনওটাতে বিক্রি হত দক্ষিণী পত্রপত্রিকা, কোনওটাতে দক্ষিণী মশলাপাতি, পাঁপড়, কফি ইত্যাদি। ফুলের দোকানে জুঁই বেলের মালার সঙ্গে থাকত কমলালেবু রঙের দক্ষিণী ফুলের মালা। বেশির ভাগ দক্ষিণী মহিলার খোঁপা বা বেণিতে শোভা পেত সেই মালা।

দক্ষিণী মালভূমি বা ডেকান প্লেটোর সঙ্গে বাঙালির যে এক প্রাচীন যোগসূত্র আছে সে কথা আমাদের অনেকেরই জানা নেই। ভঙ্গ নামে পরিচিত আমাদের বঙ্গভূমি সে যুগে মৌর্য সাম্রাজ্যের অংশ বিশেষ ছিল।

রান্নাবান্নার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু মিল, যেমন বাঙালিদের মতো দক্ষিণীদের ডালে নানাবিধ ফোড়ন দেওয়ার অভ্যেস। দক্ষিণ ভারতীয় রান্নায় সম্বর আর বাংলা রান্নায় ফোড়নের ব্যবহার যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ভিন্ন ভিন্ন মশলার মিশ্রণ সহযোগে প্রস্তুত এইসব রান্নাতে রন্ধনশিল্পীর কেরামতি প্রকাশ পায়। বিভিন্ন মশলার গন্ধের মিশ্রণ প্রতিটি রান্নাকে দেয় এক বিশিষ্ট মাত্রা তা সে দক্ষিণ ভারতীয় রান্নাই হোক বা বাংলা রান্নাই হোক না কেন।

সম্বর ও ফোড়ন ছাড়া একটি সবজি পুব আর দক্ষিণকে গাঁটছড়া বেঁধে দিয়েছে আর সে সবজিটি হল কাঁচাকলা এবং মোচা। শোনা যায় মাদ্রাজ থেকে সি রাজাগোপালচারি যখন রাজ্যপাল হিসেবে কলকাতার রাজভবনে বসবাস শুরু করেছিলেন তখন তাঁর প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকাতে থাকত কাঁচাকলার কোপ্তা।

সমুদ্রতটবর্তী দাক্ষিণাত্যে নারকেল গাছের অভাব নেই আর তাই বোধহয় ওঁদের রন্ধনতালিকার একটি মুখ্য উপকরণ হল নারকেল যা তাঁরা নৈপুণ্য এবং শৈল্পিক কারুকলা দিয়ে রান্নায় প্রয়োগ করেন। অন্ধ্রপ্রদেশ ও কেরালার নারকেল ও তেঁতুল দিয়ে চিংড়ির একটি পদের খ্যাতি তো সারা দেশ জুড়ে।

আমাদের এই বাংলা রান্নাতেও নারকেলের বিবিধ প্রয়োগের কথা কেই বা না-জানে! ছোলার ডালে কুচোনো নারকেল, মোচাতে কোরানো নারকেল, চিংড়ির মালাইকারিতে নারকেলের দুধের ব্যবহার তো সামান্য কয়েকটি উদাহরণ মাত্র।

দক্ষিণ ভারতীয় শব্দ ‘কড়ি’ সম্বন্ধে কলকাতাবাসী অভিনেতা, অধ্যাপক এন ভিশ্বনাথন একবার বলেছিলেন যে তামিল ব্রাহ্মণদের কাছে গ্রেভিহীন শুকনো সবজির পদ হল ‘কড়ি’ আর অব্রাহ্মণদের কাছে আবার তা হল একটি মাংসের পদ যাতে ফোড়ন হিসেবে ব্যবহৃত হয় কারিপাতা।

দক্ষিণ ভারতের চারটি রাজ্য থেকে কলকাতায় প্রথম যাঁরা এসেছিলেন তাঁরা হলেন চেত্তিয়ার সম্প্রদায়ভুক্ত তামিল। এঁরা প্রধানত আমিষাশী। তখন এজ়রা স্ট্রিট অঞ্চলে ছিল ওঁদের বাস। সবচেয়ে পুরনো তামিল আস্তানা ‘নাগারাথার ভিদুথি’ বা এজ়রা স্ট্রিটের ‘চেত্তিয়ার হাউস’-এ মিলত ওঁদের অতি স্বাদু ‘চেত্তিয়নাদ চিকেন’ ও নানা ধরনের আমিষ সব পদ।

বাঙালিদের মতো দক্ষিণ ভারতীয়দেরও প্রধান খাদ্য হল ভাত। ওঁদের খাদ্য তালিকাতে রয়েছে ভাত, সম্বর, রসম, টকদই এবং নানাবিধ সবজি যেমন কুট্টু এবং পোরিয়াল। নিরামিষ পদগুলির রন্ধন প্রণালী অতি সহজ এবং স্বাস্থ্যকর।

প্রাতরাশে দক্ষিণীদের পছন্দ ইডলি, দোসা, বড়া যা কলকাতার বাঙালিদের খাদ্যতালিকাতে সহজেই ঢুকে গেছে। তাই রোববারের সকালে তাঁরা ভিড় জমান কালিঘাট মেট্রো স্টেশনের কাছে প্রেম ভিলাতে ফিলটার কফি সহযোগে ইডলি দোসার সমন্বয়ে প্রাতরাশ সারতে।

যদিও কলকাতার দক্ষিণী প্রতিবেশীদের খাদ্যরুচির সঙ্গে বাঙালিদের পরিচিতি আজকের নয়, তাও বেশির ভাগ বাঙালিই দক্ষিণী খাদ্য বলতে বোঝেন দোসা ও ইডলি। সেই ধারণা পালটাতে, পাঠকের জন্য এই পর্বে থাকছে একটি আমিষ স্বাদু পদ যার প্রবেশাধিকার এজ়রা স্ট্রিটের দক্ষিণী ভোজনালয়ে ঘটেছিল গত শতকের প্রথম দিকে।

মাটন চেত্তিনাদ

উপকরণ: টুকরো করে কাটা মাটন, কুচোনো পেঁয়াজ, কুচোনো টম্যাটো, গোটা গরমমশলা, আদা, রসুনবাটা, শুকনোলঙ্কাগুঁড়ো, ধনেগুঁড়ো, হলুদগুঁড়ো, তেল, নুন, থেঁতো করা গোটা গোলমরিচ ও কারিপাতা।

প্রণালী: মাংস সেদ্ধ করে সরিয়ে রাখুন। তেল গরম করে তাতে গোটা গরমমশলা দিন। পেঁয়াজ দিয়ে হালকা বাদামি করে সাঁতলান। আদা রসুনবাটা, লঙ্কাগুঁড়ো, ধনেগুঁড়ো, হলুদগুঁড়ো দিয়ে কষুন। এতে টম্যাটো দিন এবং রান্না করুন যতক্ষণ না গ্রেভি ঘন হয়ে আসে। এবারে এতে সেদ্ধ করা মাংস, স্বাদ অনুযায়ী নুন দিন। কম আঁচে মিনিট দশেক রাখুন ও মাঝে মাঝে নেড়ে দিন। সমস্ত মশলা মিশে গেলে গোলমরিচ ও কারিপাতা দিয়ে নামিয়ে নিন।

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%