আলপনা ঘোষ
শীত এলেই ভোজনরসিক বাঙালির মন পিঠের জন্য আকুলি-বিকুলি করে ওঠে। সেকালে কিন্তু অঘ্রান মাস থেকেই পিঠে তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। অঘ্রানে নতুন ধান উঠলে নবান্ন উৎসব উদ্যাপিত হত আর পিঠে ছাড়া সে উৎসব প্রায় অকল্পনীয় ছিল। প্রথমে নতুন ধান কুটে চাল, তার পরে সেই চালের গুঁড়ো দিয়ে পিঠে। আমার ঠাকুমা শুনেছি নিজে হাতে গ্রামের বাড়িতে ঢেঁকিতে ধান কুটতেন। নতুন ধানের চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি হত নানাবিধ স্বাদু পিঠে। সংক্রান্তির পুজোতে পিঠে এবং পুলি নৈবেদ্য হিসেবে নিবেদিত হত।
প্রাচীনকালে যখন সন্দেশ, রসগোল্লার আবির্ভাব হয়নি, তখন তো মিষ্টি বলতে বাঙালি এই পিঠে পুলিকেই জানত। ইতিহাসের সূত্র অনুযায়ী আর্যরাই নাকি আমাদের দেশে ক্ষীরের ব্যবহার শুরু করে। পরবর্তীকালে ক্ষীরের সঙ্গে চালের গুঁড়ো, নারকেল, গুড় ইত্যাদি মিশিয়ে পিঠে তৈরি শুরু হয় বাঙালির হেঁশেলে।
কৃত্তিবাসের রামায়ণ থেকে শুরু করে মঙ্গলকাব্য, চৈতন্যচরিতামৃত সর্বত্রই কিন্তু পিঠের জয়গান।
গৌরচন্দ্রের আহারের জন্য শ্রীক্ষেত্রে সার্বভৌম ভট্টাচার্যের গৃহিণী যে নিরামিষ পঞ্চাশ ব্যঞ্জন পাক করেছিলেন, তার মধ্যে পিঠেও ছিল। চৈতন্য ভাগবতে সেই সব খাদ্যবস্তুর দীর্ঘ বর্ণনার সঙ্গে মিষ্টি বড়া ও পিঠের কথা উল্লেখ করতেও কবি ভুলে যাননি।
মুদ্গ বড়া মাস বড়া কলা বড়া মিষ্ট,
ক্ষীর পুলি নারিকেল পুলি আর পিষ্ট।
পৌষ সংক্রান্তির দিনটি যথেষ্ট ধুমধামের সঙ্গে পালিত হত সেকালে। রবীন্দ্রনাথের মেজ বউঠান জ্ঞানদানন্দিনী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন যে পৌষপার্বণে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে রাশিকৃত পিঠে গড়তে হত বলে লোক কম পড়লে তবেই বাড়ির মেয়ে-বউদের ডাক পড়ত। সেকালে নানা ধরনের পিঠেপুলি তৈরিতে পারদর্শী হওয়াকে অন্তঃপুরবাসিনীদের বিশেষ গুণ বলে ধরা হত।
কবি এবং ভোজনরসিক ঈশ্বর গুপ্ত তাঁর কবিতাতে বাঙালি গৃহস্থ ঘরে পিঠে পুলি উৎসবের এক সরস চিত্র এঁকেছেন:
আলু তিল গুড় ক্ষীর নারিকেল আর
গড়িতেছে পিঠেপুলি অনেক প্রকার।
পৌষপার্বণে বাড়ির মেয়ে বউয়েরা বানাতেন নানা রকমের সব পিঠে। পিঠের মধ্যে সেরা ছিল আস্কে পিঠে, পুলিপিঠে, মুগের ভাজা পিঠে, সরু চাকলি, পাটিসাপটা, মালপোয়া আর রসবড়া প্রভৃতি।
পিঠে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি কিছু কম নয়। পৌষসংক্রান্তি এলেই মা, ঠাকুমা, দিদিমাদের কথা মনে পড়ে যায়। সারা বাড়ি ম ম করত গুড়, নারকেল আর ক্ষীরের গন্ধে। প্রায় অন্ধকার রান্নাঘরে কাঠের বা কয়লার উনুনের সামনে বসে তাঁরা যা সৃষ্টি করতেন তার তুলনা মেলা ভার আজকের দুনিয়াতে।
কত রকমের পিঠে আর কী বিচিত্র তার নাম আর কী অসাধারণ তার স্বাদ। আমার সবচাইতে পছন্দের ছিল পাটিসাপটা পিঠে। ঠাকুমাকে দেখেছি উনুনে বসানো কালো লোহার তাওয়াতে প্রথমে বেগুনের বোঁটা দিয়ে তেল বুলিয়ে নিয়ে তবে তাতে গোলা ঢালতে যাতে গোলা তাওয়াতে লেগে না যায়।
আমার বাপের বাড়িতে আবার পিঠে তৈরির ব্যাপারে কোনও ভেজাল চলত না। পশ্চিমবঙ্গের মানুষজন পাটিসাপটা পুরে ক্ষীরের ভাগ কম দিয়ে নারকেলের ভাগ বেশি দেন। এ নিয়ে রেষারেষি করলেও গুড়, ক্ষীর ও নারকেল কোরার সম্মিলিত সেই পুরের মিশ্রণ কিন্তু কম স্বাদু ছিল না আমার কাছে। তবু ঘটি বাঙালের কাজিয়া বলে কথা! এদেশিদের সঙ্গে টক্কর মারতে আমার বাঙাল বাপের বাড়িতে পাটিসাপটার পুরে থাকত গুড় দিয়ে জ্বাল দেওয়া নির্ভেজাল শুধু ক্ষীর। সংক্রান্তির দিন ভোর রাত্তিরে উঠে আমার মা পেতলের হাতা দিয়ে নাড়িয়ে নাড়িয়ে দুধ জ্বাল দিতেন। ঘন হয়ে এলে তাতে অতি সাবধানে গুড় মেশাতেন যাতে দুধ কেটে না যায়। ঘন দুধ শুকিয়ে ক্ষীর হয়ে এলে তবে মায়ের ছুটি আর ঠাকুমার হাতের জাদুর কাজ শুরু।
সুজি ও চালের গুঁড়ো দিয়ে প্রস্তুত গোলা মাপ মতো তাওয়াতে ঢেলে তা জমে এলে তার পেটের মধ্যে ক্ষীরের পুর ভরে লম্বা করে মুড়ে অক্লেশে একটার পর একটা পাটিসাপটা গড়ে খুন্তির ধার দিয়ে তুলে নেওয়ার এই কঠিন কাজটি করতেন ঠাকুমা। সব ক’টা পিঠে হত এক মাপের। একটু ঠান্ডা করে মুখে দিলেই নরম ক্ষীরের মিষ্টির রসালো স্বাদে একেবারে মোহিত আমরা।
আমার মায়ের এক বালবিধবা দাপুটে পিসিমা ছিলেন, যিনি দেশভাগের পরেও কালিয়াতে বসে তাঁর ভাইয়ের সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। আমরা যখন তাঁকে দেখেছি, ততদিনে বয়সের ভারে তিনি নুয়ে গেছেন। গায়ের রং ফরসা, টিকোলো নাক, বোঝা যেত এককালে তিনি ডাকসাইটে সুন্দরী ছিলেন। শীতের শুরুতে কালিয়া থেকে কলকাতায় আসতেন। থলে বোঝাই করে আনতেন নারকেল, যাতে পিঠে পার্বণের সময় কোনও সমস্যায় পড়তে না হয়। তাঁর বাক্স খুললেই বেরুত বৈয়াম ভরতি ঝোলা গুড়, নানা মাপের পাটালি গুড়, নারকেলের নাড়ু আর চিঁড়াকুচা। নারকেলের শাঁস চিঁড়ের মতো মিহি করে কেটে ঘি-তে ভেজে চিনির রসে মেখে শুকিয়ে নিলেই তৈরি ঝুরঝুরে চিঁড়াকুচা। বছরভর হা-পিত্যেশ করে এই চিঁড়াকুচার জন্য ওঁর নাতনাতনিরা সব বসে থাকতাম। নিপুণ হাতে ঝুরঝুরে চসি গড়তেন আর পুলির পেটে নারকেলের পুর ভরে তা ফেলতেন খেজুরের রস সমৃদ্ধ ঘন ক্ষীরের পায়েসে। চসি পুলিতে মাখামাখি সে ক্ষীর ছিল স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়।
এ বঙ্গের আস্কে পিঠে ও বঙ্গে পরিচিত চিতই পিঠে নামে। চিতই পিঠের জন্য গোল করে খোপ কাটা মাটির সরা আসত বাজার থেকে। ধুয়ে, পুঁছে, তেলের প্রলেপ দিয়ে তাতে গোলা ঢেলে সেঁকা হত চিতই পিঠে যা ঝোলা গুড় ও নারকেল কোরা দিয়ে খেতে ছিল দারুণ।
সরুচাকলি নামে আর এক ধরনের পিঠে আছে যা নোনতা, মিষ্টি দু’ভাবেই খাওয়া যায়। সুজি আর চালের গুঁড়ো দিয়ে গোলা তৈরি করে তাওয়ার ওপরে সেঁকে এই পিঠে তৈরি করা হয় যা দেখতে অনেকটা রুটির মতো। অনেকে আবার কলাইয়ের ডালের গুঁড়ো আর চালের গুঁড়োর লেইয়ের সঙ্গে নুন, মিষ্টি, আদাবাটা মিশিয়ে এই পিঠে বানিয়ে থাকেন।
বাঙালির মতো পিঠে নিয়ে উৎসবের প্রচলন আছে অসম, উড়িষ্যা, বিহার প্রভৃতি রাজ্যে। অসমে ভোগালি বিহু পরব হয় সংক্রান্তির দিনে। ওই দিন পিঠে খাওয়ার চল আছে ওদের, তবে ভাতের মণ্ড দিয়ে প্রস্তুত ওই পিঠে তত স্বাদু নয়।
উড়িষ্যার মানুষের সবচেয়ে প্রিয় পিঠে হল এদুরি, চাকুলি আর পোড়া পিঠে। এই পিঠেতে ওঁরা ব্যবহার করেন বিউলির ডাল। বিহারে কিন্তু এই বাংলার মতোই প্রধানত চালের গুঁড়ো দিয়ে পিঠে হয়।
পিঠে পর্ব শেষ করছি আমাদের অতি প্রিয় দুধপুলি ও এদেশিদের স্বাদু পাটিসাপটা পিঠের রন্ধন প্রণালী দিয়ে।
উপকরণ: চালের গুঁড়ো, দুধ, খেজুড়ের গুড়, নারকেল কোরা।
প্রণালী: দুধ ও খেজুরের গুড় জ্বাল দিয়ে ঘন করতে হবে। বাকি গুড় নারকেল কোরাতে দিয়ে পুর তৈরি করতে হবে। চালের গুঁড়ো সেদ্ধ করে, ভাল করে মেখে নিতে হবে। ছোট ছোট লেচি কেটে গোল করে মাঝখানে পুর ভরে ছোট আকারের পুলি পিঠে গড়ে নিতে হবে। উনুনে ক্ষীর থাকা অবস্থায় পুলিগুলি ছেড়ে দিতে হবে। কম আঁচে খানিকক্ষণ রেখে বেশ কয়েকটা ফুট দিন। পিঠে নরম হলে নামিয়ে নিন এবং বাটি ভরতি করে অতিথিকে দুধপুলি দিন।
উপকরণ: চালের গুঁড়ো, সামান্য সুজি এবং ময়দা, দুধ, তেল
পুরের উপকরণ: নারকেল কোরা, পাটালি গুড়, এলাচের গুঁড়ো।
পুর প্রস্তুত প্রণালী: নারকেল কুরিয়ে গুড় দিয়ে কম আঁচে ভাল করে পাক দিতে হবে। মিশ্রণটি থেকে সুগন্ধ বেরোলে এবং আঠা মতো হয়ে এলে এলাচের গুঁড়ো মিশিয়ে নামিয়ে রাখুন ও ঠান্ডা হতে দিন। এইভাবে তৈরি হল পাটিসাপটা পিঠের পুর।
গোলা তৈরির প্রণালী: চালের গুঁড়োর সঙ্গে অল্প পরিমাণ সুজি ও ময়দা মিশিয়ে তাতে সামান্য ময়ান দিন। চিনি দুধে মিশিয়ে ফোটান। চিনি গলে গেলে নামিয়ে নিন। একটু ঠান্ডা হলে এতে চালের গুঁড়ো, সুজি, ময়দা মিশিয়ে পাতলা গোলা প্রস্তুত করুন। গোলা যেন মসৃণ হয়।
পিঠে তৈরির প্রণালী: উনুনে তাওয়া বসিয়ে গরম করুন। এবারে বেগুনের বোঁটা দিয়ে তাওয়াতে তেল মাখিয়ে নিন। এরপরে তাওয়ার মাঝখানে এক হাতে গোলা দিন। তাওয়া কাত করে লুচির মতো গোল করে গোলাটা গড়িয়ে নিন। তলাটা ভাজা ভাজা হলে খুন্তি দিয়ে তাওয়া থেকে ছাড়িয়ে নিন। একপাশ থেকে লম্বা করে নারকেলের পুর দিয়ে মাদুরের মতো গুটিয়ে নিন। সামান্য বাদামি রং ধরলে নামিয়ে নিন। ঠিক একই পদ্ধতিতে বাকি পাটিসাপটাগুলি তৈরি করুন। আজকাল লোহার তাওয়ার বদলে নন-স্টিক তাওয়া ব্যবহৃত হয়। এতে তাওয়া থেকে পিঠে তোলা অনেক সহজ হয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন