আলপনা ঘোষ
‘শাশুড়ি নেই, ননদ নেই,/কার বা করি ডর,/আগে খাই পান্তাভাত/শেষে লেপি ঘর।’ সংসারের নানাবিধ সম্পর্কের টানাপোড়েন, গঞ্জনা, অশান্তি এসবের মধ্যেও কোনও এক গাঁয়ের বধূর পান্তাভাত প্রীতি পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে তাঁর এই এক টুকরো ছড়ার ছন্দে।
বাঙালির পান্তাভাত খাওয়ার অভ্যেস কিন্তু আজকের নয়। ১৭৫৬ সাল। বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলা, কাশিমবাজার কুঠি দখল করে বন্দি করেছেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তালেবর সব উচ্চপদাধিকারীদের যাঁর মধ্যে ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। কীভাবে তিনি পালিয়ে গিয়ে তাঁর এক পূর্ব পরিচিত রেশম ব্যবসায়ী কৃষ্ণকান্ত নন্দীর গৃহে আশ্রয় নিয়েছিলেন সে আর এক গল্প। জনশ্রুতি এই যে সেই সময়ে কান্তবাবুর ব্যাবসা লাটে ওঠায়, অর্থাভাবের কারণে সাহেব অতিথিকে তিনি নাকি পান্তাভাত দিয়ে আপ্যায়ন করেছিলেন। এই ঘটনা নিয়ে রসিক কান্তবাবু লিখলেন—
নবাবের ভয়ে কান্ত নিজের ভবনে
সাহেবকে রেখে দেয় পরম গোপনে।
ঘরে ছিল পান্তাভাত, আর চিংড়িমাছ,
কাঁচালঙ্কা, বড়ি পোড়া, কাছে কলাগাছ।
কাটিয়া আনিল শীঘ্র কান্ত কলাপাত,
বিরাজ করিল তাহে পচা পান্তাভাত।
পেটের জ্বালায় হায় হেস্টিংস তখন
পান্তাভাত দিয়া করেন ভোজন।
প্রাচীন বাংলা মঙ্গলকাব্যতেও আমরা পান্তাভাতের উল্লেখ পাই। চণ্ডীমঙ্গলকাব্যে ব্যাধপত্নী নিদয়ার গর্ভবতী অবস্থা— কোনও কিছুই তাঁর মুখে রুচছে না। একমাত্র যা খেতে ওঁর সাধ যায় তা হল, পান্তা ও আমানি। তাই কবি লিখলেন:
পাঁচ মাসে নিদয়ার না রুচে ওদন।
ছয় মাসে কাঞ্জী করঞ্জায় মন।
‘কাঞ্জী’ হল পান্তাভাত বা আমানি। পান্তাভাতের জলীয় অংশকে ‘আমানি’ বলা হয়। ভাত বাদ দিয়ে শুধু আমানি খাওয়ারও চল আছে কারণ তা নাকি স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী।
এক সময় ছিল যখন বাঙালি পান্তার সঙ্গে কাঁচা অথবা পোড়া মরিচ ও একটি পেঁয়াজ দিয়ে উদরপূর্তি করে সারাদিনের মতো কাজেকর্মে বেরিয়ে পড়তেন। পান্তাভাত ছিল তখনকার বাঙালির খাদ্যাভ্যাস এবং ঐতিহ্য।
পান্তা প্রসঙ্গে মনে পড়ে যাচ্ছে আমার ছেলেবেলার কথা। পূর্ববঙ্গ থেকে ছিন্নমূল হয়ে আমরা তখন কলকাতার ভাড়াবাড়িতে। জ্যৈষ্ঠ মাসের গা-পোড়া গরমে মা যখন কাঁসিতে করে নুন-মাখা পান্তাভাতে গন্ধরাজ লেবু টিপে গরাসে করে তা আমার মুখে তুলে দিতেন তা ছিল প্রায় অমৃত সমান। কাঁচালঙ্কার ঝাল কচি জিভে সহ্য হত না। তাই মাঝে মাঝে মিষ্টি পাকাকলা চটকে ভাতের সঙ্গে মেখে দিতেন, যা কিছু কম স্বাদু হত না। আগের রাতে ভিজিয়ে রাখা মুশুরির ডাল বেটে, ভাল করে ফেটিয়ে তার মধ্যে নুন, কাঁচালঙ্কা ও পেঁয়াজকুচি মিশিয়ে মায়ের হাতে ভাজা সেই ডালের বড়া, পান্তাভাতের সঙ্গে সংগতে ছিল এক কথায় অনবদ্য। মা, পিসিমাদের দেখেছি কচুর লতির চচ্চড়ি বা নারকেলকোরা দিয়ে নিরামিষ কচুশাকের ঘণ্ট আর পান্তাভাত রসিয়ে খেতে।
পান্তাভাতের সঙ্গে বেগুনপোড়াও কোনও অংশে পিছিয়ে নেই আর তার প্রমাণ মেলে কৌতুকদীপ্ত সব ছড়ার ছন্দে। ‘পান্তাভাতে বেগুনপোড়া শুধুই ডাঁটার চচ্চড়ি’ বা বহুল প্রচারিত সেই প্রবাদবাক্য যাতে প্রবাদকার বউয়ের গুণ বোঝাতে লিখছেন,
আহা বউয়ের কী যে গুণ
পান্তাভাতে পুড়িয়ে দিত
কালো কালো বেগুন।
সেই বেগুনপোড়াতে আবার যদি মেশে ঝাঁঝালো কাঁচা সরষের তেল, নুন আর কুচোনো কাঁচালঙ্কার আভাস, তা হলে তো কোনও কথা হবে না।
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার মানুষদের পান্তাভাদের সঙ্গে শুঁটকিমাছের গরগরে ঝাল দেওয়া ভর্তা খাওয়ার অভ্যেস কিন্তু আজকের নয়। আজকাল আবার ঢাকা শহরে নববর্ষ উপলক্ষে ইলিশপান্তা খাওয়ার চল হয়েছে।
এপার বঙ্গে অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের গ্রামেগঞ্জেও এখনও পান্তা খাওয়ার চল আছে। পান্তার সঙ্গে পোস্তর বড়া এ বঙ্গের লোকজনদের বিশেষ প্রিয়। এ ছাড়া চাকা করে কাটা মিষ্টি কুমড়ো, কালোজিরে ও লঙ্কার গুঁড়ো মেশানো বেসনের গোলায় ডুবিয়ে ভাজাও বেশ ভাল জুটি পান্তার সঙ্গে। মোটা করে কাটা দু’টুকরো চালকুমড়োর মধ্যে কাঁচালঙ্কা, নারকেল ও সরষেবাটা পুর দিয়ে বেসনের গোলায় ডুবিয়ে পুরভাজাও স্বাদ এবং অভিনবত্বের দিক দিয়ে পান্তাভাতের সঙ্গে ভাল যায়। বাসি তরকারি দিয়ে পান্তাভাত খাওয়ার অভ্যেসটিও বেশ প্রাচীন।
সারা জ্যৈষ্ঠমাস জুড়ে বৈষ্ণবেরা রাধাকৃষ্ণকে পান্তাভাত ভোগ দিয়ে থাকেন। পান্তাভাত, দই, চিনি, কলমিশাকভাজা ও আরও দু’-তিন রকমের তরকারি দিয়ে এই ভোগ দেওয়া হয়।
উড়িষ্যার মানুষজন নাকি পান্তাভাতে দই, কাঁচালঙ্কা, ধনেপাতা, পেঁয়াজকুচি মিলিয়ে তার সঙ্গে যে-কোনও ধরনের পকৌড়া বা ভাজি খান জম্পেস করে। ওই রাজ্যে এই ভাতের পরিচিতি ‘পোকাল ভাতি’ নামে। এই বিশেষ ভাতটি নাকি এতই জনপ্রিয় যে ওই অঞ্চলের স্থানীয় পাঁচতারা হোটেলগুলিতে এটি পরিবেশিত হয়ে থাকে। হয়তো বা নামী হোটেলের এই দামি পান্তা খেয়েই কোনও কবি লিখেছিলেন, ‘হাজার টাকার পান্তা-বিলাস,/মিডেলকেলাস ফুটানি।/দুদিন বাদেই যায় না চেনা/ওড়িয়া না ভুটানি।’
অসমে পান্তাভাত পরিচিত ‘পইতা ভাত’ নামে। পান্তার সঙ্গে ওঁরা ভালবাসেন সব রকমের সেদ্ধ মাখা খেতে। যেমন— সরষের তেল, লেবুর রস ও মরিচ দিয়ে ভাপানো মৌরলা মাছ বা যে-কোনও ছোট মাছমাখা, আলুসেদ্ধ, ওলসেদ্ধ, মানকচুসেদ্ধ মাখা খেতে।
অনেক মেদিনীপুরবাসীর গ্রীষ্মের এই প্রচণ্ড গরমে প্রতি রাতের খাওয়ার মেনুতে থাকে পান্তাভাত ও তার সঙ্গে নুন, কাঁচাতেল, মরিচভাজা দিয়ে আলুসেদ্ধ মাখা, কুচোনো নারকেল, গন্ধরাজ লেবু আর মরিচমাখা কুচোনো শসা। এর সঙ্গে কুচো চিংড়ি ভাজা, কাঁচালঙ্কা, পেঁয়াজকুচি একসঙ্গে থেঁতো করে তাতে সরষের তেল দিয়ে মাখা একটি অতি স্বাদু পদ।
অনেক সময় তাঁরা পান্তাভাতের সঙ্গে খান কাঠকয়লার উনুনের আঁচে পোড়ানো আলু, বেগুনের ভর্তা যার স্বাদ এক কথায় অনন্য।
খ্যাতনামা সাংবাদিক লেখক শ্রীসুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় যিনি এখন হায়দ্রাবাদবাসী, জানিয়েছেন পান্তা নিয়ে তাঁর স্মৃতির কথা। এক সময়ে তিনি নকশালবাড়ি আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৫ সালের সেই আগুনঝরা দিনগুলিতে তাঁকে বহুদিন গ্রামেগঞ্জে আত্মগোপন করে থাকতে হয়েছে। গ্রামের চাষিবন্ধুদের সস্নেহ আশ্রয়ে থেকেছেন তখন, ভাগ করে খেয়েছেন ওঁদের সঙ্গে পান্তাভাত। এরকমই একবার আশ্রয় নিয়েছিলেন ওঁরা কয়েকজন ইছামতী নদীর ধারে এক কৃষক কমরেডের বাড়িতে।
সন্ধের সময় ওঁরা যেতেন নদীর ধারে ছোট ছোট গুগলি ও কচুঘেঁচু কুড়িয়ে আনবার জন্য। ঘরে ফিরে কমরেডের মা ওইসব অল্প তেল মশলা দিয়ে এমন উপাদেয় রান্না করে দিতেন পরের দিন পান্তাভাতের সঙ্গে খাবার জন্য, যার স্বাদ আজও তাঁর মুখে লেগে আছে। সুমন্ত জানিয়েছেন, সেই পান্তাভাত, গুগলি আর কচুঘেঁচুর তরকারি ভরপেট খেয়ে তাঁরা বেরিয়ে পড়তেন পরের দিন নতুন এক আশ্রয়ের সন্ধানে, নিরুদ্দেশের পথে।
আশ্চর্যের বিষয় এই যে এত বছর বাদে প্রবাস জীবনে অভ্যস্ত সুমন্ত কিন্তু ভুলে যাননি সেসব দিনের কথা, ত্যাগ করেননি তাঁর পান্তাভাত খাওয়ার অভ্যেস। তাই রাতের খাওয়ার পরে উদ্বৃত্ত ভাতটুকু পান্তার রীতি মেনে তিনি তা এক বাটি জলে সারারাতের জন্য ভিজিয়ে রাখেন। সকালে ভাতের জলটুকু ফেলে তাতে এক চিমটে নুন, সামান্য সরষের তেল ও একটি কাঁচালঙ্কা ভেঙে দিলেই ওঁর স্বাদু, চটজলদি প্রাতরাশ প্রস্তুত।
আমি যখন সুমন্তকে দেখেছি তখন তিনি স্টেটসম্যান পত্রিকার তরুণ রিপোর্টার। চলনে বলনে একেবারে পাক্কা সাহেব। আজ তিনি পান্তা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারছেন! ওঁর নকশালবাড়ি আন্দোলনে যোগ দেওয়ার খবরে সেদিন যেমন আশ্চর্য হয়েছিলাম, ওঁর পান্তা খাওয়ার অভ্যেসের কথা শুনেও কিন্তু আজও সেদিনের মতোই চমকে গেলাম।
উপকরণ: ছোট চিংড়ি, পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচালঙ্কা, শুকনোলঙ্কা, নুন, সরষের তেল, ধনেপাতা।
প্রণালী: চিংড়ি ধুয়ে বেছে জল ঝরিয়ে নুন হলুদ মেখে রেখে দিন। একটি তাওয়াতে সামান্য তেল মাখিয়ে খোসা ছাড়ানো গোটা পেঁয়াজ, রসুনের কোয়া পুড়িয়ে নিন। শুকনোলঙ্কা চিমটে দিয়ে ধরে আগুনে পুড়িয়ে রাখুন। এবারে একটি কড়াইতে সামান্য তেল গরম করে তাতে কাঁচালঙ্কা কুচি দিয়ে চিংড়ি হালকা করে ভেজে তুলে নিন। এর মধ্যে পোড়ানো পেঁয়াজ, রসুন, শুকনোলঙ্কা, নুন মিশিয়ে ব্লেন্ডার বা শিলে বেটে নিন। এই মিশ্রণে ধনেপাতাকুচি ও কাঁচা সরষের তেল মেশালেই প্রস্তুত চিংড়ির ভর্তা।
কেউ কেউ আবার সব শেষে পুরো মিশ্রণটি উনুনে রাখা গরম লোহার তাওয়াতে নাড়িয়ে তবে পরিবেশন করে থাকেন।
উপকরণ: টম্যাটো, পেঁয়াজকুচি, শুকনোলঙ্কা, নুন, সরষের তেল, ধনেপাতাকুচি।
প্রণালী: একটি তাওয়ার উপরে টম্যাটোগুলি পুড়িয়ে নিন। কালো হয়ে এলে নামিয়ে নিন। ঠান্ডা হলে খোসা ছাড়িয়ে রাখবেন। শুকনোলঙ্কাও পুড়িয়ে নিন। এবারে অন্য একটি পাত্রে পেঁয়াজকুচি, পোড়ানো শুকনোলঙ্কা, নুন, সরষের তেল ও কুচোনো ধনেপাতা একসঙ্গে মেখে তার সঙ্গে পোড়ানো টম্যাটো জুড়ে দিলেই তৈরি মজাদার টম্যাটো ভর্তা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন