খুশির ইদ ও খানাপিনা

আলপনা ঘোষ

ইদ, রমজান প্রভৃতি শব্দ মনে করিয়ে দেয় কাজী নজরুলের লেখা অসাধারণ সেই গানের কলি-

রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ

আপনাকে তুই বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।

মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান উৎসব ইদ বছরে দু’বার অতি সমারোহে পালিত হয়। এদেশীয়দের আর পাঁচটা উৎসবের মতো ইদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই সম্প্রদায়ের মানুষের খাদ্যসংস্কৃতি। রমজানের সময় মাসব্যাপী ওঁদের উপবাস প্রতিদিন ভঙ্গ হয় সূর্যাস্তে এক চুমুক জল পান করে ও মরুভূমির ফল খেজুর দিয়ে। সঙ্গে থাকে পেঁয়াজি, পকৌড়া বা সামোসা যাকে আমরা, কলকাতার লোকজন, শিঙাড়া বলে জানি। বিখ্যাত ভূপর্যটক ইবন বতুতা, যিনি মহম্মদ বিন তুঘলকের আমন্ত্রণে দিল্লি এসেছিলেন, তাঁর ভ্রমণনামচায় ‘সামুসাক’-এর উল্লেখ করেছেন যাকে আমাদের এই শিঙাড়ারই নামান্তর বলা যেতে পারে। মরক্কোর এই পর্যটকের বর্ণনা অনুযায়ী মহম্মদ বিন তুঘলকের ভোজসভায় যেসব পদ পরিবেশিত হত তার মধ্যে অন্যতম ছিল আখরোট, পেস্তা, পেঁয়াজ ও নানাবিধ মশলা দ্বারা প্রস্তুত মাংসের কিমার ‘সামুসাক’ যা আবার ভাজা হত বিশুদ্ধ ঘি দিয়ে। প্রতি অতিথির পাতে পড়ত চারটি থেকে পাঁচটি ‘সামুসাক’।

দেশের বড় বড় শহরগুলিতে আজকাল মহা ধুমধাম করে ইদের ইফতার পার্টি হয়। ইফতারে অন্যতম প্রধান যে পদটি খাদ্যতালিকায় থাকে তা হল মাংস, ডাল, চাল দিয়ে প্রস্তুত ‘হালিম’। এটি একটি স্যুপজাতীয় পদ যা যেমন স্বাদু তেমনি স্বাস্থ্যকর। এর সঙ্গে থাকে বিরিয়ানি, অতিরিক্ত মশলাযুক্ত কোর্মা, ধোঁয়া ওঠা কাবাব, চাঁপ, সেমুইয়ের পায়েস ও সুজির হালুয়া ইত্যাদি। শুধু যে আগত অতিথিদের জন্য এলাহি ব্যবস্থা থাকে তা কিন্তু নয়। রমজানের মাসে আশেপাশের পরিচিত মানুষজনের বাড়ি, কাজের লোকজন, সকলের মধ্যে খাবার বিলি করার এক চমৎকার প্রথা আছে ওঁদের মধ্যে।

ইদের আগে থেকে যেমন জামাকাপড় কেনাকাটার বহর শুরু হয়, ঠিক তেমনি ওঁদের হেঁশেলেও পড়ে যায় সাজ সাজ রব। শুধু ইদের বাজার বলে নয়, রোজার জন্য থাকে বিশেষ কেনাকাটা যেমন রোজা ভাঙার জন্য চাই মরিয়ম খেজুর। বড় বড় দানার লম্বাটে এই খেজুরের জন্য যেতে হয় শহরের নামী, দামি বাজারে। যতই চড়া দাম হোক না কেন অন্য খরচ কাটছাঁট করেও আরবের খেজুর বলে যেগুলি বিক্রি হয় তা চাই-ই চাই।

রান্নাঘরে ইদের আগাম প্রস্তুতি শুরু হয় পিঠে পর্ব দিয়ে। মিষ্টি, নোনতা হরেক রকমের পিঠে বানান বাড়ির মেয়েরা। কোরানো নারকেল চিনি দিয়ে জ্বাল দিয়ে শিঙাড়ার পুর বানিয়ে ফেলতে হয়। এবারে ময়দার লেচি কেটে পাতলা করে বেলে পুর ভরে মুড়ে নিতে হয়। এগুলি কোনওটা হয় পুলির আকারের আবার কোনওটা তেকোনা। ভাজা হয়ে গেলে জ্বাল দেওয়া চিনির ঘন রসে ডুবিয়ে তুলে রাখা হয় বড় বড় বেতের ঝুড়িতে। মিষ্টি যাদের অপছন্দ তাদের জন্য থাকে নোনতা শিঙাড়া। ইদের দিনে অতিথিরা এলে শরবতের সঙ্গে দেওয়া হয় সেমুই আর মিঠা বা নোনতা সামোসা।

টাটকা টাটকা তৈরি হয় সুজির হালুয়া, ভাজা হয় গরম গরম ফুলকো লুচি অতিথিদের নাস্তার জন্য। সন্ধেয় ইদের চাঁদ দেখা হলে প্রার্থনা শেষ হয় ‘আমিন’ বলে।

কোরবানি ইদে আবার খাওয়া হয় চর্বির পিঠে। কোরবানির সময়ে বাড়িতে যে প্রচুর মাংসের জোগান থাকে বিভিন্ন পদ রান্নার জন্য, তার মধ্যে চর্বিও কিছু কম থাকে না। সেই চর্বি বড় কড়াইতে করে ফোটালে, তা গলে তেলে পরিণত হয়। তখন ফুটন্ত সেই তেল সাবধানে তুলে টিফিন কৌটো ভরতি করে রেখে দিতে হয়। চর্বি ঠান্ডা হয়ে জমাট বাঁধে ঠিক ডালডার মতো।

রাতভোর ভেজানো চাল শিলে বেটে তার মধ্যে ফেটানো ডিম, পেঁয়াজ ও আদাবাটা, নুন, হলুদ, লঙ্কাগুঁড়ো মিশিয়ে গোলা তৈরি করা হয়। এবারে জমাট বাঁধা চর্বি আবার কড়াইতে দিয়ে ফুটতে শুরু করলে হাতায় করে চালের গোলা সেই চর্বির তেলের মধ্যে ঢেলে দিতে হয়। একটু বাদে ঝালঝাল নোনতা পিঠে ফুলে উঠলে, ঝাঁঝরিতে করে তা উলটে দিতে হয়। একটি একটি করে ভাজা এই পিঠে গরম গরম খেতে দিতে হয়। এই হল গিয়ে ইদের দিনে চর্বির পিঠে দিয়ে নাস্তার গল্প।

ইদের সামোসা

ইদের সামোসা— কোরবানির ইদের পরে আবার বাসি মাংসের পুর দিয়ে বানানো হয় সামোসা। এই পুর বানানোর পদ্ধতিও কিন্তু বেশ দীর্ঘ। ইদের ভোজের পরে উদ্বৃত্ত বাসি মাংস যাতে নষ্ট না হয় তার জন্য তা রোজ দু’বেলা জ্বাল দিতে হয়। এতে মাংসের ঝোল যায় শুকিয়ে। তখন সেই মাংস থেকে হাড় বাদ দিয়ে সেগুলিকে হাত দিয়ে ঝুরঝুরে করে নিতে হয়। কড়াইতে তেল গরম করে বেশি পরিমাণ কুচোনো পেঁয়াজ দিয়ে ভাল করে ভেজে তার মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয় বাসি মাংসের ঝুরো। এবারে নেড়েচেড়ে ভাজা ভাজা করে নিলে তৈরি সামোসার পুর।

এর পরে রুটির কাই তৈরি করতে লাগে শুকনো আতপচালের গুঁড়ো। ফুটন্ত জলে সেই চালের গুঁড়ো মিশিয়ে তার মধ্যে দিতে হয় নুন, হলুদ আর আদাবাটা। এবারে কাঠের হাতা দিয়ে সমানে নাড়তে হবে চালের মিশ্রণ যাতে না দলা পাকিয়ে যায়। উনুন থেকে কড়াই নামিয়ে ঠান্ডা করে ভাল করে ঠেসে মেখে নিতে হয় রুটির কাই যাতে বেলার সময় ফাটল না ধরে। এবারে ছোট ছোট লেচি কেটে লুচির মতো বেলে শিঙাড়ার আকারে গড়ে পুর ভরে মুখ এমনভাবে বন্ধ করতে হয় যাতে গরম তেলে পড়লে পুর বেরিয়ে না যায়। চার-পাঁচটি সামোসা একসঙ্গে ভাজা যায়। সামোসাগুলিতে বাদামি রং ধরলে তেল ঝরিয়ে তুলে নিয়ে গরম গরম খেতে দেওয়া হয় উপস্থিত অতিথিদের। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে আপনিও খুশির ইদ বানান সবাইকে নিয়ে।

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%