রাজস্থানি খাজানা

আলপনা ঘোষ

কলকাতার ইতিহাস বলে এ শহর সকলের শহর। তাই আমাদের প্রতিবেশীদের মধ্যে এক বিরাট অংশ জুড়ে আছেন রাজস্থানি, পাঞ্জাবি, গুজরাটি, পারসি, ওড়িয়া, বিহারি, দক্ষিণ ভারতীয় প্রভৃতি নানা প্রদেশের মানুষ।

‘ব্রিটিশ-রাজ’-এর আমলে কলকাতা ছিল সেসময়ে ভারতবর্ষের রাজধানী। মরুভূমির দেশ থেকে রাজস্থানিরাই প্রথম এসেছিলেন বঙ্গভূমিতে ব্যাবসার উদ্দেশ্যে। অষ্টাদশ শতকে তত্কালীন বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের নবাবের মহাজন ছিলেন মানেকচাঁদ শেঠ নামে এক রাজস্থানি। পরবর্তীকালে বংশানুক্রমে এঁরা ‘জগৎ শেঠ’ উপাধি লাভ করেন।

একদিন শুধুমাত্র ‘লোটা-কম্বল’ সম্বল করে সুতানুটির খোলা আকাশের নীচে যাঁরা আশ্রয় নিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে সেই রাজস্থানি সম্প্রদায়ের দৌলতেই ওই অঞ্চল যা আজ ‘বড়বাজার’ নামে পরিচিত, পাঁপড় থেকে শুরু করে মুক্তো ও নানাবিধ জিনিসের কেনাবেচা ও টাকার লেনদেনের কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে।

কলকাতার এই রাজস্থানিরা প্রধানত জৈন এবং বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী। জীবহত্যা যেহেতু ওঁদের ধর্মে নিষিদ্ধ তাই তাঁরা কট্টর নিরামিষাশী। তরকারির মধ্যেও তাঁদের নানা বাছবিচার আছে, যেমন কন্দ, আলু, ওল জাতীয় সবজি ওঁদের খাদ্যতালিকা বহির্ভূত।

এঁদের মধ্যে আবার নাহার এবং কোলেরা বাঙালিদের সঙ্গে দীর্ঘ সহবাসের ফলে ভাষা, খাদ্যরুচি, পোশাকের দিক থেকে প্রায় বাঙালি বনে গেছেন। মাছ, মাংস না খেলেও তাঁদের রান্না করা নিরামিষ পদের সঙ্গে বাঙালির বিশুদ্ধ নিরামিষ পদের কিন্তু বিশেষ অমিল নেই।

রাজস্থানের মাড়োয়ার ও মেওয়ার অঞ্চল থেকে আগত আগরওয়ালরা বাংলাতে আসেন পরের দিকে। সেই থেকে এই প্রদেশে বসবাসকারী সব রাজস্থানিরা এ অঞ্চলে পরিচিত হন ‘মাড়োয়ারি’ নামে তা তিনি রাজস্থানের বিকানির বা যোধপুর যে-কোনও প্রদেশেরই হন না কেন।

মাড়োয়ারিদের অন্যতম প্রধান খাদ্য হল ‘ডাল বাটি চুর্মা’। মাড়োয়ারি শব্দ ‘বাটি’ হল এক ধরনের আটার মণ্ড যা ঘি দিয়ে মেখে সেঁকা হয়। গল্প আছে রাজস্থানের মরুভূমিতে যুদ্ধরত সৈন্যরা আটা মেখে তার মণ্ড বালির নীচে রেখে দিত যাতে সূর্যের তাপে ‘বাটি’ সেঁকা হয়ে যায়। সারাদিনের পরে ক্ষুধার্ত সৈন্যরা ঘি মাখিয়ে শুধুমাত্র সেই রোদে সেঁকা ‘বাটি’ খেয়ে তৃপ্ত হতেন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে যেদিন বাটির সঙ্গে ঘোল জুটে যেত সেদিন তাঁদের আনন্দ দেখে কে?

সেকালে ‘বাটি’র সঙ্গে ডাল খেতেন শুধুমাত্র উচ্চবংশীয় ধনী মাড়োয়ারিরা। এই পদ তৈরি হত যে চার বা পাঁচ রকমের ডাল দিয়ে তা হল অড়হর, ছোলা, মুগ, বিউলি ও মুশুর ডাল। এখন তো এই ডাল প্রায় রাজস্থানের জাতীয় পদে পরিণত হয়েছে। কলকাতার যে-কোনও মাড়োয়ারি রেস্তোরাঁতেও ‘ডাল বাটি চুর্মা’র যথেষ্ট কদর।

‘ডাল বাটি’র সঙ্গে চুর্মা হল এমন একটি স্বাদু পদ যেটি ছাড়া ‘ডাল বাটি’ খাওয়া প্রায় অসম্পূর্ণ। ‘চুর্মা’ পদ তৈরির সঙ্গে আবার জড়িয়ে রয়েছে রাজস্থানের এক লোককথা। কোনও এক রাজপরিবারের এক পাচক নাকি অনবধানবশত ‘বাটি’র মধ্যে আখের রস মিশিয়ে ফেলেছিলেন। এই অপরাধে কী দণ্ড হতে পারে এই চিন্তায় যখন পাচকের আত্মারাম প্রায় খাঁচাছাড়া, তখন সেই রাজপরিবারের কোনও এক মহিলা স্বাদ গ্রহণ করে বুঝলেন যে, পাচকের ভুলে শাপে বর হয়েছে। ‘বাটি’র মধ্যে মিষ্টি যোগ হয়ে তা আরও স্বাদু এবং রসালো হয়েছে। তখন থেকে তাঁরা আখের রসে ‘বাটি’ ভিজিয়ে রাখা শুরু করলেন। এমন স্বাদু, নরম ‘বাটি’ খেয়ে তাঁদের পতিদেবতারাও খুশি। এইভাবে এলাচের গন্ধ দেওয়া মিষ্টি স্বাদের ভাঙা ‘বাটি’র টুকরো থেকে ‘চুর্মা’ পদের উৎপত্তি হয়েছিল।

ডাল এক অতি স্বাস্থ্যকর খাদ্য কারণ এতে যথেষ্ট প্রোটিন জাতীয় পদার্থ আছে। তাই বোধহয় নিরামিষাশী মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের খাদ্যের মধ্যে পাঁপড় ও বড়ি এত জনপ্রিয়। শীতকালে সারা রাত ডাল ভিজিয়ে রেখে তা মিহি করে বেটে তা দিয়ে নানা আকারের বড়ি ও পাঁপড় গড়ে রোদে শুকিয়ে নিলেই কাজ শেষ। তার পরে পাঁপড় সেঁকে বা ভেজে নিলেই হল। ওঁদের প্রতিদিনকার খাদ্যতালিকায় সেঁকা পাঁপড় আর আলাদা করে বড়ির একটি পদ থাকবেই।

মাড়োয়ারিদের একটি জনপ্রিয় স্বাদু মিষ্টি পদ হল বাদাম কি হালোয়া। কাজু, কিশমিশ, কাঠবাদাম, সুজি, চিনি ও ঘি দিয়ে প্রস্তুত এই মিষ্টি পদটি কলকাতাবাসীরও অত্যন্ত প্রিয়।

মাড়োয়ারিদের আবার মিষ্টি শেষপাতে খাওয়ার চল নেই। বিয়ে বা যে-কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে অতিথিকে প্রথম আপ্যায়ন করা হয় নানাবিধ মিষ্টান্ন দিয়ে। অতিথির যখন প্রায় ভরপেট অবস্থা তখন থরে থরে আসে ডালের পুর ভরা খাস্তা কচুরি, গাট্টা কারি, নানা স্বাদের নিরামিষ পকোড়া, দহিবড়া, পাঁপড় ইত্যাদি নানা পদ।

হোলির সময় মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের আর এক প্রিয় মিষ্টি হল গুঁজিয়া। এই গুঁজিয়ার সঙ্গে আমাদের বাঙালি গুজিয়ার কিন্তু কোনও মিল নেই। খোয়া ক্ষীর এবং কাজু, কিশমিশ প্রভৃতি নানাবিধ শুকনো ফল (ড্রাই ফ্রুট্‌স) মিশ্রণে প্রস্তুত ও ঘন চিনির রসে ফেলা এই মিষ্টি যে একবার মুখে দিয়েছে, তার পক্ষে এর স্বাদ ভোলা অসম্ভব।

কলকাতাবাসী মাড়োয়ারিদের ‘ডাল বাটি চুর্মা’ প্রীতির কথা স্মরণে রেখে এই পর্বের শেষে থাকছে চার রকমের ডাল দিয়ে ‘ডাল বাটি চুর্মা’র ডালের রন্ধন-প্রণালী।

ডাল বাটি চুর্মা

উপকরণ: অড়হর ডাল, ছোলার ডাল, মুগ ডাল, বিউলি ডাল, হলুদ ও লঙ্কা গুঁড়ো, গরমমশলাগুঁড়ো, গোটা কয়েক লবঙ্গ এবং ছোট এলাচ, তেজপাতা, আদা কুচোনো, গোটা কালো সরষে, মেথি, গোটা জিরা, সামান্য হিং, কুচোনো ধনেপাতা, নুন, চিনি এবং ঘি।

প্রণালী: অড়হর, ছোলা, মুগ এই তিনটি ডাল এক মাপের নিতে হবে। পরিমাণে বিউলি ডাল অপেক্ষাকৃত কম পরিমাণে নিতে হবে। এবারে সব ডালগুলি ধুয়ে ফুটন্ত জলে দিন। ঢাকা দিয়ে কম আঁচে ফোটান। নুন, হলুদ, লঙ্কাগুঁড়ো এবং ঘি দিন। ডাল সেদ্ধ হয়ে এলে চিনি ও গরমমশলাগুঁড়ো মেশান। অন্য একটি পাত্রে ঘি দিন। ধোঁয়া বেরুলে তেজপাতা, গোটা গরমমশলা, মিহি করে কুচোনো আদা, কালো সরষে, মেথি, জিরা ও হিং ফোড়ন দিন। মশলার সুগন্ধ বেরুলে সেদ্ধ করা ডাল ঢেলে সামান্য ফুটিয়ে নামিয়ে নিন। ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%