আলপনা ঘোষ
আমাদের কাঁকুলিয়ার বাড়ির দোতলাতে নতুন ভাড়াটে হয়ে এলেন এক তেওয়ারি পরিবার। পাঞ্জাবি হিন্দু। ও বাড়ির বড় ছেলের বউ সারদার সঙ্গে প্রথম থেকেই এক আত্মিক বন্ধনে বাঁধা পড়েছিলাম আমরা। সারদা আমার বাবামাকে ডাকতেন বাবামা বলে আর আমরা তিন ভাইবোন ওকে ডাকতাম দিদি বলে। আমরা বাংলায় কথা বলতাম আর দিদি হিন্দি আর আমাদের শেখানোর জন্য মাঝে মাঝে ইংরেজিতে কথা বলতেন। পুরো পরিবার খাতায় কলমে নিরামিষাশী হলেও সারদাদিদির স্বামী এবং দেবরের আমিষ পদের দিকে নজর ছিল। দিদির শাশুড়ি ও দিদির কড়া খবরদারিতে ওঁদের বাড়িতে আমিষ পদ ঢোকা নিষেধ ছিল। কিন্তু আমাদের রান্নাঘর থেকে মাছের চপ ভাজার গন্ধ বেরুলেই দুই ভাই রান্নাঘরে হাজির। দিদির আপত্তি অগ্রাহ্য করে চায়ের আসরে যোগ দিতেন আর জমিয়ে মায়ের হাতে বানানো চপ খেতেন।
আমাদের এই ইংরেজি শিক্ষিত দিদিটিও রান্নাবান্নায় চৌকস ছিলেন। নিরামিষ পাঞ্জাবি রান্নায় তাঁর দারুণ হাতযশ ছিল। প্রায়ই নেমন্তন্ন করে খাওয়াতেন আমাদের। সারদাদিদির হাতে বানানো তড়কা ডাল আর সর্ষো শাগ আজও মুখে লেগে আছে। ও নিজে ভালবাসতেন আমার মায়ের হাতের ফুলকো লুচি, বেগুনভাজা আর ছোলার ডাল খেতে।
পাঞ্জাবের সঙ্গে বাংলার যোগাযোগ শুরু স্থলপথে, সেই যখন শেরশাহ গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের পত্তন করেছিলেন। তারপরে যুগ কেটে গেছে, পাঞ্জাব থেকে আগত মানুষেরা এই কলকাতাতে জীবিকার সন্ধানে এসে এই শহরকে আপন করে নিয়েছেন।
প্রাক-স্বাধীনতা কালে জুটমিল, রেলওয়ে, কয়লাখনি এবং জাহাজি সংস্থাগুলিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সুবিধা অন্যান্য রাজ্যবাসীর মতো পাঞ্জাবের মানুষজনকেও কলকাতায় টেনে এনেছিল। কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁরা বসবাস শুরু করলেও, তাঁদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি ছিল ভবানীপুর অঞ্চলে।
একটা সময় ছিল যখন ট্যাক্সিচালক বলতে বাঙালি জানত মাথায় পাগড়ি বাঁধা শিখ চালক। কলকাতার ভবানীপুর অঞ্চলে মোটর পার্টসের বেশির ভাগ দোকানের মালিক ছিলেন পাঞ্জাবিরা। দেশ ভাগের পরে পশ্চিম পাঞ্জাবের বেশ কিছু মানুষ এই বঙ্গদেশে এসে স্থায়ী ভাবে থেকে গিয়েছিলেন। বাংলার মতো পাঞ্জাবও তো দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল।
কলকাতা শহরে পাঞ্জাবি খানার কদর কতটা তা বোঝা যায় এখানকার ধাবা এবং পাঞ্জাবি ভোজনালয়গুলির সংখ্যা দেখে। শহরের অনেকগুলি নামী ধাবার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য আজাদ হিন্দ, জয় হিন্দ এবং বালিগঞ্জ ফাঁড়ি সংলগ্ন ধাবা।
গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে যেতে গেলে চোখে পড়বে একটু দূরে দূরে একটি করে ধাবা। এক সময়ে এগুলিতে ভিড় জমাতেন দূর-পাল্লার ট্রাক চালকেরা। এখন কিন্তু পথের ক্লান্তি দূর করতে, ধোঁয়া-ওঠা মশলা দেওয়া দুধচাতে চুমুক দিতে, তন্দুরি রুটি আর পালক পনিরের স্বাদ নিতে সর্ব স্তরের মানুষ ভিড় জমান।
এই খোদ কলকাতা শহরেই হোটেল ব্যাবসাতে পাঞ্জাবিদের সাফল্য কম নয়। অম্বর, সাগর, পিটার ক্যাট প্রভৃতি রেস্তোরাঁর খ্যাতি শুধুমাত্র এঁদের খাঁটি পাঞ্জাবি খানার জন্য। এই তো সেদিনের কথা। হঠাৎই কোনও জানান না দিয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বালিগঞ্জ ফাঁড়ির প্রায় অর্ধশত বছরের পুরনো ধাবাটি। কথাটা জানাজানি হতেই কলকাতার সব সংবাদপত্রগুলিতে প্রায় ‘হেডলাইন নিউজ’। তারপরে ক’দিন ধরে চলল পাতার পর পাতা ভরতি করে শুধু ধাবা নিয়ে চর্চা, স্মৃতিচারণ, হা-হুতাশ! সুখের কথা ধাবা আবার চালু হয়েছে। এসব থেকে বোঝা যায়, পাঞ্জাবি খানার প্রতি বাঙালির টান কতটাই নির্ভেজাল।
পাঞ্জাবি শেফের হাতে বানানো নান, তন্দুরি চিকেন, টেংরি কাবাব, কুলফি তো আজকাল আপামর বাঙালির ‘হট ফেভারিট’। শুধু কি তাই? সেও আজকের কথা নয়, যখন বাঙালির মত্স্যপ্রীতির কথা মাথায় রেখে, বঙ্গসন্তানদের পাঞ্জাবি খানার নেশা ধরাতে অম্বর হোটেলের রন্ধনবিদেরা মাছ দিয়ে নানা প্রকার তন্দুরি পদ বানাতে শুরু করেছিলেন। আজকাল তো বাঙালি বিয়েবাড়ির মেনুতে ‘তন্দুরি ফিশ’ বা ‘তন্দুরি প্রনের’ দারুণ চাহিদা।
ভবানীপুরবাসী আমার এক পাঞ্জাবি বন্ধুর কাছে ওদের খাদ্যাভাসের খবর জেনে আমি তো চমত্কৃত। পুরো পরিবার আমিষ, নিরামিষ দু’রকমের খাবারে অভ্যস্ত।
রোববারের দুপুরে কোনও কোনও দিন নাকি ওঁদের পছন্দ সাদা ভাত দিয়ে বাঙালির নির্ভেজাল শুক্তো আর দইমাছ। তার সঙ্গে অবশ্যই থাকে পাঞ্জাবের ফুলকো আটার রুটি আর তড়কা ডাল। খাদ্য পরিমণ্ডলে বাংলা ও পাঞ্জাবের কী অসাধারণ মেলবন্ধন।
কলকাতা শহরে পাঞ্জাব সন্তানদের বাজারহাট করতে সবচেয়ে পছন্দের জায়গা হল, ভবানীপুরের জগুবাবুর বাজার। শীতকালে টিন্ডা, কুন্দ্রি, সরষে শাক থেকে শুরু করে ওঁদের পছন্দের নানাবিধ পাঞ্জাবি আচার, ভুট্টার আটা সব মিলবে এই বাজারে।
পাঞ্জাবি খানার কথা লিখতে গিয়ে বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে আমার স্নেহময়ী সারদাদিদির কথা, তাই আজকের এই পর্ব শেষে থাকছে ওঁর হাতে বানানো বিশুদ্ধ পাঞ্জাবি তড়কা ডালের রেসিপি।
উপকরণ: সবুজ উড়দ ডাল, হলুদগুঁড়ো, লঙ্কার গুঁড়ো, আদা, রসুনবাটা, কুচোনো টম্যাটো, কুচোনো পেঁয়াজ, ঘি, নুন, ও ডাল সেদ্ধ করার জন্য মাপ মতো জল।
প্রণালী: ডালে জল, নুন, হলুদ, লাল লঙ্কাগুঁড়ো দিয়ে প্রেশার কুকারে সেদ্ধ করুন। হলুদের থেকে লঙ্কাগুঁড়োর পরিমাণ একটু বেশি হবে। প্রায় ঘণ্টাখানেক লাগবে ডাল সুসেদ্ধ হতে। ডাল কিন্তু ঘন হবে। এবারে কড়াইতে ঘি গরম করে পেঁয়াজ দিন এবং কম আঁচে সোনালি করে ভাজুন। রসুন, আদা দিয়ে কষুন। এবারে এতে সেদ্ধ করা ডাল দিন এবং ঢাকা দিয়ে রান্না করুন। পুরোটা ভাল করে মিশে গেলে নামিয়ে নিন।
কলকাতার বাঙালিদের পছন্দ অনুসারে এই ডালে পেঁয়াজের সঙ্গে ঘি-তে দেওয়া হবে কুচোনো টম্যাটো, কয়েকটি কাঁচালঙ্কা ও ধনেপাতা। পরিবেশনের আগে ডালে একটু মাখন মেশাতে হবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন