আলপনা ঘোষ
ভোজনরসিক লেখক প্রতাপকুমার রায় তাঁর ‘মহাভোজ রাজভোজ’ গ্রন্থে ‘তেলেভাজা’ নামক খাদ্যবস্তুটিকে শুধু ভারতবর্ষের জাতীয় খাদ্য নয়, তাকে সর্বজনীন বলে অভিহিত করেছেন। এর সম্বন্ধে যুক্তি খাড়া করতে গিয়ে লেখক জানিয়েছেন যে উত্তর ভারতের পকৌড়া, গুজরাটের ফরসান, কিংবা মহারাষ্ট্রের ভজে বাংলার তেলেভাজারই নামান্তর। এ বাদ দিয়ে দক্ষিণ ভারতের ভডা, তিল বা নারকেল তেলে ভাজা হলেও তাকেও কিন্তু তেলেভাজার পর্যায়ে ফেলা চলে।
বর্ষার দিনে, শীতের সন্ধ্যায়, পথেঘাটে কিংবা সান্ধ্য আড্ডাতে চায়ের সঙ্গে টা হিসেবে বাঙালির তেলেভাজা না হলে ঠিক জমে না। কলকাতার নামী, দামি ক্লাবগুলিতেও তাই আজকাল বিকেলে সুগন্ধী দার্জিলিং চায়ের সঙ্গে টা হিসেবে দেওয়া হয় আলুর চপ, পেঁয়াজি, ডালের বড়া, ফুলুরি বা বেগুনির মতো বাঙালির নির্ভেজাল তেলেভাজা। বাঙালি সাহেব, মেমসাহেবরা কলকাতার রাস্তায় তেলেভাজার ঠেক থেকে শালপাতায় মোড়া তেলেভাজা খেতে যতই নাক সিটকোন না কেন, ক্লাবে বসে বোনচায়নার রেকাবিতে ঝাঁঝালো সরষের নির্যাস সহযোগে তেলেভাজা খেতে ওঁদের মান তো যায়ই না, বরং চা বা কফির সঙ্গে মুচমুচে এই ভাজা তারিয়ে তারিয়ে খান। তবে বিশুদ্ধ তেলেভাজা-প্রেমীদের মতে নামী দামি রেস্তোরাঁয় মানী শেফের হাতে তৈরি বা বাড়ির গৃহিণীর হাতে মনের মাধুরী মিশিয়ে বানানো তেলেভাজা নাকি স্বাদগুণে কোনও মতেই রাস্তার তেলেভাজার সমকক্ষ বস্তু হয়ে উঠতে পারে না।
এই শহরে তেলেভাজার পীঠস্থান হল বাগবাজার অঞ্চল। সন্ধের সময় লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ক্রেতাকে অপেক্ষা করতে হয় তেলেভাজা কেনার জন্য। তেলেভাজার মধ্যে আবার সেরার সেরা হল বেগুনি। পাতলা করে কাটা বেগুনের টুকরো বেসনের গোলায় ডুবিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় গরম তেলে। বাদামি রং ধরলেই কড়াই থেকে তুলে শালপাতায় মুড়ে দিতে হয় অপেক্ষমাণ ক্রেতাদের হাতে। হাতেগরম এই পদার্থটি আবার চটজলদি মুখে না পুরলে বেগুনি খাবার মজা কিন্তু মাঠে মারা যায়। তবে বেগুনির স্বাদগুণের চাবিকাঠিটি কিন্তু লুকিয়ে থাকে বেসন মিশ্রণের কারিগরিতে। মিশ্রণকে স্বাদু করতে এতে নুনের সঙ্গে মেশানো হয় কালোজিরে, লঙ্কার গুঁড়ো আর মুচমুচে করে ভাজতে আন্দাজ মতো খাবার সোডা। এবারে বেসনের মধ্যে জল দিয়ে পুরো মিশ্রণটি এমন দ্রুতভাবে ফেটাতে হবে যাতে তা বেগুনের গায়ে মাখার পক্ষে উপযুক্ত হয়ে উঠবে আর গরম তেলে পড়তে তা পরিণত হবে সুন্দরী বেগুনিতে। তেলেভাজার দলে প্রথম সারিতে আর যারা আছে তারা হল আলুর চপ, পেঁয়াজি আর ফুলুরি। বাঙালির মাছের প্রতি প্রেমের কথা কে না জানে। তেলেভাজার বেশির ভাগ ঠেকেই কিন্তু মাছ বা মাংসের চপ, কাটলেট, বা ফ্রাইয়ের প্রবেশ নিষেধ। তা সত্ত্বেও দোকানের বাইরে জনসমাগম শেষ নেই। এমনই অমোঘ আকর্ষণ তেলেভাজার বাঙালির কাছে।
শুধু কি চায়ের সঙ্গে টা হিসেবে তেলেভাজার কদর বেশি তা কিন্তু নয়। বাদলা দিনে খিচুড়ির সঙ্গেও তেলেভাজা কিন্তু জমে ভাল। এই পেঁয়াজির কথাই ধরুন না কেন। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ে রাস্তাঘাট জলে ডুবে গেছে। বাজারহাট বন্ধ। এমনই কপাল বাড়িতেও শাকসবজি তেমন নেই সেদিন। অগত্যা বাড়ির গিন্নি চালডাল মিশিয়ে খিচুড়ি বসিয়ে দিলেন উনুনে। ঘরে পেঁয়াজ থাকেই, কাজেই খিচুড়ির সঙ্গে গরম গরম পেঁয়াজি ভেজে দিলে আর কিছুর প্রয়োজন পড়ে না। চালের গুঁড়ো আর বেসনের গোলাতে নুন, সামান্য তেল আর খাবার সোডা মিশিয়ে ভাল করে ফেটিয়ে নিলেই তৈরি মিশ্রণ। এবারে কুচোনো পেঁয়াজ এবং কাঁচালঙ্কা ওই মিশ্রণে ডুবিয়ে ডুবো তেলে ভেজে নিলেই তৈরি পেঁয়াজি।
বাগবাজারের প্রসিদ্ধ তেলেভাজার দোকান ‘বেঙ্গল ফেমাস অয়েল ফ্রায়েড শপ’। অর্ধ শত বর্ষের পুরানো এই দোকানের বিখ্যাত তেলেভাজা হল মোচার চপ যার নাকি আগে নাম ছিল লড়াইয়ের চপ। কেন এই অদ্ভুত নাম দেওয়া হয়েছিল সে তথ্য অবশ্য আমার জানা নেই। এই দোকানে অন্য যা মেলে তার মধ্যে আছে আলুর চপ, ফুলুরি আর বেগুনি।
উত্তর কলকাতার আর একটি বিখ্যাত তেলেভাজার দোকান হল স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুলের কাছে লক্ষ্মীনারায়ণ সাউ অ্যান্ড সন্সের তেলেভাজার দোকান। এখানে মেলে ভেজিটেবল কাটলেট আর ভেজিটেবল চপ, স্বাদে, গুণে যা যে-কোনও বড় হোটেলের মাংসের কাটলেটকে হার মানাতে পারে। সন্ধেবেলায় লম্বা লাইন পড়ে। আধা ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি শেষ। অনেককেই হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়। আলুর চপ, ফুলুরিও মেলে এখানে।
ফুলকপির ফুলুরির মতো বেগুনের ফুলুরিও লোকজনের বড় পছন্দের। তাই আজকের পর্বে পাঠকের জন্য থাকছে বেগুনের ফুলুরি।
উপকরণ: বেগুনের ফুলুরির জন্য লাগবে একটি মাঝারি মাপের বেগুন, মুগডাল, কুচোনো লঙ্কা, কুচোনো আদা, ধনেপাতা, নুন, চিনি, ভাজার জন্য তেল।
প্রণালী: মুগের ডাল আগের দিন রাতে ভিজিয়ে রাখবেন। বেগুনের গায়ে নুন তেল মাখিয়ে উনুনে পুড়িয়ে নিন। ঠান্ডা হলে বেগুনের শাঁস কুরে নিন। আদা, কাঁচালঙ্কা, ধনেপাতা মিহি করে কুচিয়ে রাখুন। ভেজানো ডাল মিহি করে বেটে তাতে স্বাদ মতো নুন, চিনি, সামান্য জল দিয়ে ভাল করে ফেটিয়ে রাখুন। এবারে এতে লঙ্কা, আদা ও কুচোনো ধনেপাতা দিন। বেগুনের শাঁস এই মিশ্রণে ডুবিয়ে গরম তেলে ছাড়ুন। একবার ভেজে তুলে নিন। তেল আর একবার গরম করে ফুলুরি মুচমুচে করে ভেজে তেল ঝরিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন