আলপনা ঘোষ
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফের সঙ্গে বাঙালির পটলের দোর্মা ও পোলাওয়ের গাঁটছড়া বন্ধনের ইতিহাস যথেষ্ট প্রাচীন। এর সূত্রপাত ঘটেছিল সেই দিনটিতে, যেদিন জোব চার্নক ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা আর্মেনিয়ান বণিকদের কলকাতা ও শ্রীরামপুরে এসে স্থায়ী বসবাসের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। খাদ্য-গবেষকদের মতে ইহুদিদের মাহাশাস ও আর্মেনিয়ানদের দোলমাই নিঃসন্দেহে চিংড়ির কিমা দিয়ে বাঙালির আদি অকৃত্রিম পটলের দোর্মার পথপ্রদর্শক।
যে সমস্ত বিদেশি সম্প্রদায় প্রথম আমাদের প্রাণের শহর কলকাতাকে একদিন নিজেদের বাসভূমি মনে করে থেকে গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পার্শিয়া (ইরান) থেকে আগত এই আর্মেনিয়ানরাই। অনেক যুগ আগে স্থলপথে আর্মেনিয়ানরা ভারতবর্ষে এসেছিলেন বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে। এঁদের মধ্যে কারও কারও আবার অমাত্য হিসেবে স্থান হয়েছিল মোঘল সম্রাট আকবরের সভায়।
চার্নক সাহেবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আর্মেনিয়ানরা কলকাতায় পৌঁছেই ওল্ড চায়না বাজার স্ট্রিটে স্থাপন করলেন কাঠের তৈরি একটি চ্যাপেল। ১৭২২ সালে সেটি অবশ্য নাজ়ারেথ-এর হোলি চার্চ অধিগ্রহণ করে ও আর্মেনিয়া স্ট্রিটে সেটি পুনঃস্থাপন করা হয়। শুরুর দিকে কলকাতায় আগত বেশির ভাগ আর্মেনিয়ানরা মূলত ব্যাবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। খুব সম্ভবত বাণিজ্যিক কারণেই এই দেশে ইংরেজদের সঙ্গে ওঁদের একটি সমঝোতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেই সময়ে কলকাতার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের কাছাকাছি এক অঞ্চলে আর্মেনিয়ানরা এমন পাকাপাকি ভাবে থাকতে শুরু করেছিলেন যে আজও ওই অঞ্চলটি আর্মেনিয়ান পাড়া নামে পরিচিত।
এ দেশে আসার পরেও আর্মেনিয়ানরা কিন্তু দেশীয় পরিচয় বা বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছেন। সারা পৃথিবী যখন ২৫ ডিসেম্বর তারিখে ক্রিসমাস পালন করে তখন আজও ওঁরা এই শহরে ওঁদের নিয়ম মতো ক্রিসমাস উৎসব পালন করেন জানুয়ারি মাসের ৬ তারিখে। ওই দিন আর্মেনিয়ান কলেজে আর্মেনিয়ান ছাত্র ও কর্মীদের জন্য একটি বিশেষ ভোজের ব্যবস্থা থাকে। সেই ভোজের মেনুতে থাকে একটি বিশেষ মাছের পদ। ক্রিসমাসের দিন কলকাতার অন্যতম পুরনো গির্জা আর্মেনিয়ান চার্চে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের শেষে ওঁরা বড়া ক্লাবে মধ্যাহ্ন ভোজে মিলিত হন। সে দিনের মেনুতে যেমন থাকে ওঁদের দেশি পদ বাঁধাকপির দোলমা, সমিত পিলাফ বা দিল পিলাফ, তেমনি থাকে কলকাতার ফিশ কালিয়া ও ফুলকপির ভাজি। পিলাফ পদটির সঙ্গে বাঙালির অতি পরিচিত হালকা পোলাউয়ের বেশ মিল আছে। ডিনারে থাকে ল্যাম্ব রোস্ট, পিলাফ, এক ধরনের বিশেষ আর্মেনিয়ান ব্রেড লাভাস ও শেষ পাতে আর্মেনিয়ান ডেজ়ার্ট আনুশাব।
বাঙালিদের যে-কোনও মঙ্গলানুষ্ঠানে যেমন মাছের ছোঁয়া থাকবেই, ঠিক তেমনি আর্মেনিয়ানদের সামাজিক ও ধর্মীয় বা যে-কোনও মঙ্গলানুষ্ঠানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ওদের লাভাস রুটি। লাভাস ছাড়া ওদের বিয়ের অনুষ্ঠান নাকি অসম্পূর্ণ। আর্মেনিয়ান শব্দ ‘লাভ’-এর অর্থ সু আর ‘আস’ এর অর্থ হল খাদ্য। তাই লাভাসের আর্মেনিয়ান মানে হল সুখাদ্য। ভারতীয় তন্দুরের মতো এক বিশেষ ধরনের উনুনে সেঁকা হয় এই রুটি।
পুরনো কলকাতার স্থাপত্য শিল্পের ক্ষেত্রে আর্মেনিয়ানদের অবদান কিছু কম নয়। কয়েক বছর আগে এক সাংঘাতিক অগ্নিকাণ্ডে পার্ক স্ট্রিটের যে স্টিফেন কোর্ট প্রায় ভস্মীভূত হতে বসেছিল সেই বিশাল বাড়িটির সঙ্গে আজও যাঁর নাম জড়িয়ে আছে সেই আরাথুন স্টিফেনও ছিলেন একজন আর্মেনিয়ান। উনিশ শতকের শেষের দিকে প্রায় কপর্দকশূন্য অবস্থায় ভাগ্যান্বেষণে এই শহরে এসে তিনি যে জয়ী হয়েছিলেন সে সম্বন্ধে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। কলকাতার অন্যতম ল্যান্ডমার্ক গ্র্যান্ড হোটেলও স্টিফেন সাহেবের আর একটি কীর্তি। স্টিফেন কোর্ট যখন পুড়ে গেল তখন একটি সংবাদপত্রে পড়েছিলাম ওই বাড়ির বাসিন্দা, স্টিফেন সাহেবের নাতনি, আইরিন হ্যারিসের কথা। বাড়ি পুড়ে যাবার পরে অসহায় এই বৃদ্ধাকে নাকি ফুটপাতের ওপরে বসে থাকতে দেখা গিয়েছিল।
এই শহরে এখন মুষ্টিমেয় যে ক’জন আর্মেনিয়ান আছেন তাঁদের সংখ্যা একশোরও নীচে। কিন্তু আজও ময়দানের আর্মেনিয়ান স্পোর্ট ক্লাব বা ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের আর্মেনিয়ান কলেজে গেলে, অল্পবয়সি আর্মেনিয়ান ছেলেদের রাগবি খেলতে দেখতে পাবেন। অনেকেরই বোধহয় জানা নেই যে আর্মেনিয়ান কলেজের এই বাড়িতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিখ্যাত ইংরেজ সাহিত্যিক উইলিয়াম থ্যাকারে। ওঁর বাবা ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলকাতাস্থ এক পদস্থ কর্মচারী। উইলিয়াম থ্যাকারের লেখা কালজয়ী উপন্যাস ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’ আজও ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রদের অবশ্য পাঠ্য।
যে কয়েকটি আর্মেনিয়ান পরিবার এ শহরে টিকে রয়েছেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই ভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়েছেন। এর ফলে এই নতুন প্রজন্মের বেশির ভাগ ছেলেমেয়েই আর্মেনিয়ান ভাষাতে কথা বলতেও অপারগ। এই মিশ্র সংস্কৃতির প্রভাব স্বাভাবিক ভাবে ওঁদের হেঁশেলকেও ছুঁয়ে গেছে। এই সব কারণে কলকাতার আর্মেনিয়ানদের দোলমা, পিলাফ প্রভৃতি দেশীয় পদের সঙ্গে আজকাল যোগ হয়েছে এই শহরে বসবাসকারী অন্য সম্প্রদায়ের স্বাদু সব পদ।
স্বভূমিতে অর্থাৎ খোদ আর্মেনিয়াতে ওঁদের খাদ্য-তালিকাতে সবজি ও ফলের প্রাধান্য যথেষ্ট বেশি। কারণ ও দেশের উর্বর জমিতে ফল ও শাক-সবজির অপর্যাপ্ত ফলন হয়। ফলের মধ্যে যেমন ওঁদের প্রিয় আঙুর, আপেল, কমলা, চেরি, পিচ ইত্যাদি ফল, সবজির মধ্যে প্রধান হল স্কোয়াশ, বাঁধাকপি, টম্যাটো, নানা জাতের লঙ্কা, পেঁয়াজ, আলু, গাজর, কড়াইশুঁটি ইত্যাদি। এ ব্যাপারে মাছ মাংসও কিন্তু পিছিয়ে নেই।
আর্মেনিয়ানদের ব্রেকফাস্ট শুরু হয় ওঁদের দেশীয় কফি দিয়ে। মধ্যাহ্ন ভোজন অপেক্ষাকৃত হালকা হলেও সবজি, মাছ, মাংসর সঙ্গে থাকবে ঘরে পাতা দই ও ফল। রাতের খাবার মেনুতে শেষ পাতে বাঙালিদের মতো মিষ্টি থাকতেই হবে। আর্মেনিয়ানদের প্রধান খাদ্যশস্য হল গম। আধ-ভাঙা গম যাকে আমরা দালিয়া বলি, তা দিয়ে আর্মেনিয়ানরা প্রস্তুত করেন নানা স্বাদু পদ। এ ছাড়া আটা ও ময়দা দিয়ে ওঁরা তৈরি করেন নানা রকমের হাতে বানানো রুটি ও ব্রেড।
আমিষ পদে ওঁদের বিশেষ পছন্দের হল গ্রিল্ড ফিশ/মিট, সেদ্ধ মাংসের পদ, কোপ্তা ইত্যাদি। আর্মেনিয়ানদের দোলমার উল্লেখ অবশ্য আগেই করেছি। পরম্পরায় বিশ্বাসী আর্মেনিয়ানরা আবার দোলমা করেন একটু অন্য ভাবে। রান্না না করা মাংসের কিমাতে ভেজানো চাল, কুচোনো রসুন, পেঁয়াজ, পার্সলি, পুদিনা পাতা, পেঁয়াজশাক, টম্যাটোর রস, গোলমরিচ ও লঙ্কার গুঁড়ো, নুন, অলিভ অয়েল ইত্যাদি মিশিয়ে খুব ভাল করে হাত দিয়ে ঠেসে খানিকক্ষণ রেখে দেন। অনেকে আবার চালের বদলে কিমাতে দেন ভাঙা দালিয়া। আঙুরপাতা গরম জলে সামান্য ভাপিয়ে জল ঝরিয়ে তার মধ্যে কিমার এই মিশ্রণ দিয়ে চার ভাঁজ করে পাতা মুড়ে দোলমা তৈরি করেন। অন্য একটি পাত্রে অলিভ অয়েল, লেবুর রস, পর্যাপ্ত পরিমাণ টম্যাটোর রস, নুন, লঙ্কাগুঁড়ো ইত্যাদি দিয়ে প্রস্তুত হয় একটি স্বাদু মিশ্রণ। বড় ডেকচিতে বেশ কয়েকটি আঙুরপাতা বিছিয়ে তার ওপরে দোলমাগুলি সাজিয়ে ওপর থেকে ঢেলে দেওয়া হয় বেশ বেশি পরিমাণে ওই মশলার মিশ্রণ। দোলমাগুলি মাপ মতো রেকাবি দিয়ে আঁট করে ঢেকে তার ওপরে ডেকচির ঢাকা লাগিয়ে জোরালো আঁচে বসিয়ে দিতে হবে। ফুটতে শুরু করলে ঢিমে আঁচে প্রায় ঘণ্টাখানেক রেখে দিতে হয়। রান্নার শেষে কাঁটা ফুটিয়ে বুঝে নিতে হবে পুরের উপকরণগুলি সেদ্ধ হয়েছে কি না। কলকাতার আর্মেনিয়ানরা অবশ্য আঙুরপাতার অভাবে এ পদটি করেন বাঁধাকপির পাতা দিয়ে।
বাঙালির অতি প্রিয় কাঁচকলার কোপ্তার সঙ্গেও খানিকটা মিল আছে আর্মেনিয়ানদের ‘কুফতে’র। যদিও দোলমা কিংবা কুফতে যাই ওঁরা বানান না কেন সবটাই রান্না হয় ভাপিয়ে। বাঙালিদের মতো ভাজাভুজি খাওয়া ওঁদের বোধহয় না-পছন্দ।
পর্বের শেষে থাকছে কলকাতার আর্মেনিয়ানদের একটি বিশেষ আমিষ পদ।
উপকরণ: টুকরো করে কাটা চিকেন, নুন ও সদ্য পেষা গোলমরিচ, মাখন, অলিভ অয়েল, বড় মাপের পেঁয়াজ, টম্যাটো, দারচিনিগুঁড়ো, এলাচ-লবঙ্গগুঁড়ো, ফুটন্ত চিকেন ব্রথ, সরু লম্বা দানাযুক্ত চাল।
প্রণালী: চিকেনের টুকরোগুলি ভাল করে ধুয়ে পেপার ন্যাপকিন দিয়ে শুকনো করে মুছে নুন ও গোলমরিচগুঁড়ো মেখে রাখুন। খানিকটা টম্যাটো কুচিয়ে নিন। বাকি টম্যাটো পিষে রাখুন। একটি বড় কড়াইতে মাঝারি আঁচে তেল ও মাখন গরম করে তাতে চিকেন টুকরোগুলি দিন ও বাদামি করে ভেজে তুলে রাখুন।
এবারে কড়াইতে কুচোনো পেঁয়াজ ছাড়ুন ও হালকা করে ভাজুন। কুচোনো টম্যাটো ও পেষা টম্যাটো দিয়ে কষুন। এতে নুন গোলমরিচগুঁড়ো ও জল মিশিয়ে ফোটান। ভাজা চিকেনের টুকরোগুলি দিন ও নাড়াচাড়া করুন। কম আঁচে ফুটতে দিন ও মাঝে মাঝে নাড়ুন যতক্ষণ না চিকেন সুসিদ্ধ হয়। এবারে চিকেন ব্রথ ও চাল একসঙ্গে মেখে অন্য একটি প্যানে রাখুন ও তার ওপরে চিকেন টুকরোগুলি সাজিয়ে দিন। ঢাকা দিয়ে কম আঁচে রাঁধুন। চাল সেদ্ধ হয়ে এলে ও জল শুকিয়ে গেলে দারচিনি, এলাচ, লবঙ্গগুঁড়ো ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। স্যালাডের সঙ্গে গরম পিলাফ পরিবেশন করুন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন