ভাপে আর দমে

আলপনা ঘোষ

বেশি ঝাল-মশলা দেওয়া গরগরে রান্না যখন তেমন আমাকে টানে না, তখন আমার পছন্দের পদ হল ভাপে তৈরি আমিষ-নিরামিষ পদ। ভাপে রান্নায় খাদ্যের পুষ্টিগুণ যেমন অধিক পরিমাণে রক্ষিত হয়, ঠিক তেমনি স্বাদ গুণেও তার মান কোনও অংশে পিছিয়ে থাকে না। এই ধরনের রন্ধন প্রণালীতে অতিরিক্ত তেলমশলার প্রয়োগ যেহেতু অপেক্ষাকৃত কম থাকে এবং ভাজা বা কষানোর কোনও প্রক্রিয়া থাকে না, তাই এই রান্নার উপকরণগুলির নিজস্ব স্বাদ ও গুণের কোনও ঘাটতি হয় না।

আমাদের দেশে ভাপে রান্নার রীতি শুরু হয়েছিল সে কোন প্রাচীন কাল থেকে। শিকার করা প্রাণীর মাংস উষ্ণ প্রস্রবণের মধ্যে রেখে পরিশুদ্ধ করতে গিয়ে আমাদের পূর্বপুরুষদের মাথাতে এই ধরনের রন্ধন প্রক্রিয়ার চিন্তা এসেছিল।

প্রেশার কুকার, বৈদ্যুতিক চুল্লি বা স্টিমার প্রভৃতি আধুনিক প্রযুক্তি চল হবার আগে, আমাদের মা, দিদিমাদের দেখেছি আধ কড়াই ফুটন্ত জলের মধ্যে মুখ বন্ধ টিফিন কৌটোতে মশলা-মাখা মাছ রেখে ভাপে রান্না করতে। আবার কখনও দেখেছি মানকচু, ঝিঙে, ঢ্যাঁড়শ, আলু-উচ্ছে এমনকী ইলিশমাছ ভাতে রান্না করতে। দেখেছি মুশুরির ডাল নেকড়ার পুঁটুলিতে ঢিলে করে বেঁধে ফুটন্ত চালের মধ্যে দিতে। সরষের তেল আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে সে ডালমাখার স্বাদ ভোলার নয়।

বাংলা রান্নার আদি গুরু বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় ভাপা ও ভাতে রান্না নিয়ে অনেক চমৎকার তথ্য আমাদের দিয়ে গেছেন। সাধারণত মাছ ভাতে দিতে হলে অনেকেই কচি লাউ কিংবা কলার পাতায় ইলিশ, কই বা বড় বড় গলদা চিংড়ি প্রভৃতি মাছ মুড়ে অন্নপাকের সময়ে ভাতের মধ্যে দিয়ে দিতেন। অন্নপাকের শেষে হাঁড়ির মধ্যে থেকে ওই রাঁধা মাছ তুলে কলাপাতায় বাঁধা হলে, পাতা ফেলে এবং লাউপাতা হলে পাতা সমেত তেল ও নুন মেখে নিয়ে খাওয়া হত। তাঁর মতে মাছভাতের পক্ষে ইলিশ মাছের পেটি হল সেরার সেরা। তিনটি কারণে পেটি মাছের অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় সুখাদ্য কারণ পেটিতে তেলের ভাগ বেশি আর কাঁটার সংখ্যা অল্প ও কোমল। এই জন্য প্রায় সব মাছের পেটিই ভাপে রান্নার পক্ষে বেশি উপযোগী।

বিপ্রদাস তাঁর গ্রন্থে ‘ইলিশ মাছ ভাতে’র এক অসাধারণ প্রণালী দিয়েছেন। পেটির মাছ বড় বড় চাকা করে কেটে সামান্য লবণ মেখে ধুয়ে জল ঝরিয়ে রাখতে হবে। খাঁটি সরষের তেল, নুন, সামান্য হলুদ ও সরষেবাটা মাছে মেখে দিলে আর কোনও মশলা দেবার প্রয়োজন পড়ে না। প্রথমে ভাত রান্না করে তা কোনও একটি পাত্রে ঢেলে, ভাতের ওপরে একটু চেপে গর্ত মতো করে তাতে একখানি কচি কলাপাতা পেতে, তার ওপরে সরষেবাটা, হলুদ, তেল এবং নুন মাখা মাছ রেখে আর একখানি অনুরূপ মাপের কলাপাতা দিয়ে ঢেকে বাকি গরম ভাত ওপরে ঢেলে আধাঘণ্টা রেখে দিলেই প্রস্তুত অসামান্য এই ভাপে ইলিশ পদ।

বাঙালির আদি অকৃত্রিম চচ্চড়িতেও ভাপে রান্নার এক প্রণালীর খোঁজ মিলেছে এক আধুনিক শেফের সংগ্রহে। তেলে শুকনোলঙ্কা, তেজপাতা ও পাঁচফোড়ন দিয়ে তাতে ছোট করে কাটা মিঠে আলু, ঝিঙে, কুমড়ো, বেগুন ইত্যাদি সবজি দিন। ভাল করে নাড়ুন। এবারে এতে পড়বে নারকেলকোরা বাটা, সরষেবাটা, হলুদ, কাঁচালঙ্কা আর নুন। এবারে মশলামাখা পুরো সবজি স্টিমারে দিয়ে পঁয়তাল্লিশ মিনিট উনুনে রেখে দিলেই তৈরি আমাদের অতি প্রিয় স্বাদু চচ্চড়ি। ঠিক এই একই পদ্ধতিতে রাঁধা যাবে ছানা দিয়ে ভাপা পটলের দোর্মা, মোচাচিংড়ি ইত্যাদি পদ।

রান্নার প্রতিটি ঘরানার সঙ্গে মিলে মিশে থাকে ইতিহাসের গন্ধ। অযোধ্যা বা অওধ রান্নার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এরকম নানা জমজমাট গল্প। দমপোক্ত রান্নার কথা বলতে গেলে অযোধ্যার কথা আসবেই কারণ অযোধ্যার হেঁশেলকেই এ দেশের দমে রান্নার আঁতুড়ঘর বলা যেতে পারে।

সে বহু যুগ আগের কথা। একবার অওধ অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে নবাব পড়লেন দারুণ চিন্তায়। প্রজাবৎসল নবাব বিশাল বিশাল উনুনে বড় বড় হাঁড়ি চাপিয়ে এলাহি খানাপিনার আয়োজন করলেন। ঠিক হল সারা দিন ধরে অবিরাম রান্না চলবে। হাঁড়ির মধ্যে একসঙ্গে রাঁধা হবে মাংস, আলু, সবজি ও নানা পুষ্টিকর উপাদান। রান্না হত ঢাকাবন্ধ হাঁড়িতে ঢিমে আঁচে দীর্ঘ সময় ধরে। এর ফলে শক্ত খাবার শুষে নিত সব রকম খাদ্যরস এবং পুষ্টিতে ঘাটতি পড়ত না। এই হল অবধ ঘরানার দম্‌পুখ্‌ত রন্ধন প্রণালীর জন্মের ইতিহাস। একসঙ্গে এক হাঁড়িতে এভাবে বেশি পরিমাণ খাবার রান্না করলেও তাপ সব জায়গায় সমান ভাবে পৌঁছুতে পারত। নাড়াচাড়া না করেও শুধু দমে এভাবে প্রস্তুত রান্নার স্বাদ পৌঁছে যেত এক অন্য মাত্রায়। আজও এই দম্‌পুখ্‌ত রান্নার জনপ্রিয়তা এতটুকু কমেনি।

দম্‌পুখ্‌ত মাংস

উপকরণ: মাংস, আদাবাটা, পেঁয়াজবাটা, টকদই, গোটা গরমমশলা, তেজপাতা, শুকনোলঙ্কা, ঘি, নুন।

প্রণালী: টকদই, পেঁয়াজবাটা, আদাবাটা দিয়ে মাংস ভাল করে মেখে রাখুন। এবারে ডেকচিতে ঘি গরম করে তাতে তেজপাতা, গরমমশলা, শুকনোলঙ্কা ফোড়ন দিয়ে তাতে মাখা মাংস দিন। সামান্য নাড়াচাড়া করে উষ্ণ জল ও নুন দিন। ফুটতে শুরু করলে ডেকচির মুখ ভাল করে বন্ধ করে দমে বসান। ঢিমে আঁচে রাঁধুন। মাংস সুসেদ্ধ হয়ে ঘি ভেসে উঠলে নামিয়ে নিন।

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%