অযোধ্যার নবাবি খানা

আলপনা ঘোষ

রন্ধন প্রসঙ্গ নিয়ে অতীতচারণা করতে গিয়ে স্বাভাবিক ভাবে এসে পড়ে ইতিহাসের কথা। সেই মধ্যযুগ থেকে বারবার পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে বিদেশিরা আমাদের দেশে হানা দিয়েছে নানা উদ্দেশ্যে। কেউ এসেছে সাম্রাজ্য ও উপনিবেশ গড়তে, কেউ বা ধর্ম প্রচার করতে। আবার ব্যাবসা, বাণিজ্য, লুঠতরাজের ধান্দাতেও এসেছে কেউ কেউ দূর দেশ থেকে।

সেই কোন প্রাচীনকালে মধ্য এশিয়া থেকে হানাদারেরা স্থলপথে এসে পৌঁছেছে ভারতের বুকে। তারা যেমন সঙ্গে এনেছে ব্রোকেডের পোশাক, কোমল, চিক্কণ মখমল, তেমনি এনেছে নানাবিধ মশলাপাতি, সুগন্ধী। এদের দৌলতেই বাঙালির রান্নাঘরে পরবর্তীকালে ঢুকে পড়েছে কোর্মা, কালিয়া, কাবাব যা এখন বাংলার খাদ্য পদেরই অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে।

ভারতবর্ষে সুলতানি আমলের শুরু দ্বাদশ শতকের গোড়াতে। খিলজি, তুঘলকদের আমলে কবি, সংগীতবিদ্ আমির খশরু মুসলমানদের খাদ্যপ্রীতির কথা প্রসঙ্গে লিখেছেন, তন্দুরি রুটি, মেষ ছাগ কোয়েল এবং অন্যান্য পাখির মাংস, পেঁয়াজের শিঙাড়া, শরবত ছিল ওঁদের অত্যন্ত প্রিয়।

১৫২৬ সালে বাবর এ দেশে মোঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেন। কিন্তু এ দেশের জল, বাতাস, খাদ্য, পানীয় কোনওটাই ওঁর বিশেষ পছন্দ হল না। ‘বাবরনামা’ গ্রন্থে এ নিয়ে তিনি আক্ষেপও করেছেন। এখানকার যেসব ফল তিনি আস্বাদ করেছেন, এই গ্রন্থে তার কিছু উল্লেখ মেলে। তার মধ্যে কমলালেবু, কাঁঠাল ও আট রকমের টক ফলের কথা তিনি বলেছেন। একটু বেশি মিষ্টি হলেও কাঁঠালের স্বাদ নাকি তাঁর ভাল লেগেছিল। তারিফ করেছিলেন ভারতীয় মাছের কারণ তাতে কোনও দুর্গন্ধ নেই আর তা খেয়ে তিনি তৃপ্ত হয়েছিলেন।

পরবর্তীকালে বাংলার নবাবদের দৌলতে নবাবি হেঁশেলে বরফকুচি দিয়ে শরবত খাওয়ার শুরু। গ্রীষ্মকালে নবাব ও তাঁর পরিবারের জন্য রাঁধুনিরা ঘন মিষ্টি দুধে পেস্তা বাদাম ও জাফরান গোলা মিশিয়ে কুলফির লোহার ছাঁচে ঢেলে ৫-৬ ঘণ্টা বরফের বিছানায় রেখে জমিয়ে তৈরি করতেন কুলফি। বাংলার সঙ্গে কুলফির পরিচয় ঘটেছিল ওই একই সময়ে।

ইতিমধ্যে ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলিকে পিছনে ফেলে শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের রানির ভাগ্যেই শিকে ছিঁড়ল। ভারতের দণ্ডমুণ্ডের কর্ত্রী হলেন স্বয়ং ইংল্যান্ডেশ্বরী রানি ভিক্টোরিয়া। অবাধ্য নবাবেরা একের পর এক তাঁদের স্বভূমি থেকে নির্বাসিত হলেন।

মুর্শিদাবাদের পতন হল। নবাব জাফর আলি নির্বাসিত হয়ে কলকাতাতে আস্তানা গাড়লেন। এই শহরের সঙ্গে নবাবি খানার সেই প্রথম পরিচয়। শাহি হেঁশেলের খাস বাবুর্চিরা রাঁধলেন বাংলার দুই সবজির পদ, এঁচোড়ের কোর্মা ও কাঁচকলার কোপ্তা। তার সঙ্গে পোলাওতে এবার যোগ হল বাঙালির প্রিয় মাছ। সেই ‘মাহী পোলাও’ আবার যখন গঙ্গার ইলিশের ছোঁয়া পেল তখন স্বাদে গন্ধে সে হয়ে উঠল অতুলনীয়।

এর বেশ কিছু বছর বাদে ইংল্যান্ডেশ্বরীর হুকুমে অযোধ্যার শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ নির্বাসিত হলেন কলকাতার মেটিয়াবুরুজে। শিল্প ও চারুকলার একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক এই নবাব নিজেও ছিলেন একজন কবি, নাট্যকার এবং সংগীত ও নৃত্যকলার এক পারদর্শী শিল্পী ও অনুরাগী। তাঁর রচিত ভৈরবী ঠুংরি ‘বাবুল মোরা নৈহার’, চলচ্চিত্র অভিনেতা গায়ক কে এল সায়গলের কণ্ঠে গীত, আজও অমর হয়ে আছে।

সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’ ছবিতে ওয়াজিদ আলি শাহকে দেখিয়েছেন। অভিনয়ে আমজাদ খান।

ওয়াজিদ আলি শাহের কলকাতাবাসের সময় এই শহরের মোগলাই খানা অন্য এক মাত্রায় পৌঁছোয়। স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কারণে নবাবের বাবুর্চিখানার প্রস্তুত প্রতিটি পদ তাঁর খাস হাকিমকে চেখে দেখতে হত।

নবাবের রাতের মেনুতে অযোধ্যার বিশেষ সব পদ যেমন থাকত, তেমনি থাকত পোলাও, সবজি ভাজি, শামি কাবাব, শাহি মছলি কা কোর্মা ইত্যাদি পদ।

নবাবের হেঁশেলে নির্ভেজাল সরষের তেল দিয়ে রাঁধা মাছের কোর্মার স্বাদের সঙ্গে নিশ্চয় বাঙালির রান্না করা মাছের স্বাদের কোথাও না কোথাও একটা মিল ছিল।

শেষ পাতে নবাবকে মিষ্টিমুখ করাতে তাঁর বাবুর্চি ঢিমে আঁচে অনেকটা সময় নিয়ে বানাতেন শাহি সেমাই।

ওয়াজিদ আলি শাহের স্বাস্থ্যরক্ষার প্রতি কড়া নজর রাখতেন তাঁর খাস হাকিম। তাঁর নির্দেশে প্রস্তুত হত দই, রসুন, লঙ্কা দিয়ে ‘বুরহানি’। হজমের সমস্যা এড়াতে নবাব নিয়ম করে প্রতিদিন পান করতেন এক গ্লাস ‘বুরহানি’।

এ ছাড়া ওঁর জন্য বিশেষ পদ্ধতিতে রান্না হত মুশুরির ডাল। মাটির হাঁড়িতে এই ডাল সেদ্ধ করার সময় ডালের মধ্যে ফেলে দেওয়া হত একটি সোনার মোহর। সেকালের হাকিমেরা বিশ্বাস করতেন যে সোনা ধাতুর মধ্যে নাকি রোগ নিরাময়কারী কোনও বিশেষ গুণ আছে।

ঠান্ডা লাগার হাত থেকে রেহাই পেতে হাকিমি নির্দেশ মেনে নবাবের খাদ্য তালিকায় অবশ্যই থাকত বেসনের রুটি ও কাঁচালঙ্কার চাটনি।

সবজি, মাছ, মাংস দই ও মশলা দিয়ে মেখে ঢাকা দেওয়া পাত্রে দমে রান্না করতেন বাবুর্চিরা। একই বাবুর্চি কিন্তু সব পদ রাঁধতেন না। বিশেষ পদের জন্য ওই রান্নার দক্ষ কারিগরকে নিয়োগ করা হত।

নবাবি হেঁশেলে তৈরি স্বাস্থ্যকর পানীয় ‘বুরহানি’র প্রণালী দিয়ে ইতি টানছি এই পর্বে।

বুরহানি

উপকরণ: ঘন দুধ, পাতলা দুধ বা জল, কুচোনো রসুন, কুচোনো কাঁচালঙ্কা, কুচোনো পুদিনা পাতা, শুকনো খোলায় ভাজা জিরের গুঁড়ো, গোলমরিচ গুঁড়ো, স্বাদ মতো নুন ও চিনি।

প্রণালী: একটি কাচের পাত্রে ঘন দুধের সঙ্গে পাতলা দুধ বা জল মেশান। পুদিনা পাতা ও কাঁচালঙ্কা বাদে আর সব উপকরণ এর মধ্যে দিয়ে ভাল করে গুলে নিন। প্রয়োজনে ব্লেন্ডার ব্যবহার করতে পারেন। পুদিনা পাতা ও কাঁচালঙ্কা কুচি বুরহানির উপর থেকে ছড়িয়ে ঠান্ডা পরিবেশন করুন।

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
মুখবন্ধ
৩.
অযোধ্যার নবাবি খানা
৪.
কলকাতা ইহুদির নাহুম্‌স ও আঞ্জুলি
৫.
আর্মেনিয়ানদের দোলমা-পিলাফ
৬.
পর্তুগিজ এল দেশে
৭.
ইতালির পিৎজ়া
৮.
ক্রেপ কাহন
৯.
কলকাতার চাওমিয়েন
১০.
পারসি পাতিয়া
১১.
রাজস্থানি খাজানা
১২.
ওড়িশার চুড়চুড়া
১৩.
সম্বর ও ফোড়নের ইতিকথা
১৪.
কলকাতার ধোকলা
১৫.
পাঞ্জাবিদের তড়কা ডাল
১৬.
রিনা ব্রাউনদের খানাপিনা
১৭.
পদে পদে মিল
১৮.
পান্তাভাতে বেগুনপোড়া
১৯.
শাকাহার
২০.
অরুচির রুচি— পোড়া, সেদ্ধ
২১.
স্বাদু ঘণ্ট
২২.
কণ্টক-কথা
২৩.
ছেঁচকি চচ্চড়ির কাহন
২৪.
ঝালে ঝোলে অম্বলে
২৫.
ভাপে আর দমে
২৬.
বাঙালি ক্রিশ্চানদের রান্না
২৭.
কোর্মা ও কালিয়া
২৮.
কোপ্তা কাবাব
২৯.
কাঁচা আমের রকমারি
৩০.
প্রাচীন বাঙালির ভোজনচর্চা
৩১.
সাবেকি পাকশালা
৩২.
মা-ঠাকুমার রন্ধন-কথা
৩৩.
তালে তাল
৩৪.
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোরভোগ ও ভোজ
৩৫.
মফস্সলের পুজোর ভোগ ও ভোজ
৩৬.
বাঙালি বিয়ে: পাকাদেখার গল্প
৩৭.
সাবেকি বিয়েবাড়ির ভোজনধারা
৩৮.
একালের বিয়েবাড়ির ব্যুফে সংস্কৃতি
৩৯.
খুশির ইদ ও খানাপিনা
৪০.
শবে বরাত ও পিঠে কাহন
৪১.
বো ব্যারাকসের বড়দিন
৪২.
কেক দিয়ে শীতযাপন
৪৩.
বাঙালবাড়ির প্রাতরাশ
৪৪.
জিভে মিঠে তার, মুখে মিঠে কথা
৪৫.
মন কেমনের শুঁটকি
৪৬.
ওপার বাংলার মিষ্টি খবর
৪৭.
তিল থেকে তাল
৪৮.
বাকরখানির গল্প
৪৯.
তেলেভাজা খেতে মজা
৫০.
চপ কাটলেটের চমক
৫১.
খিচুড়ি: উদর ও উদার
৫২.
কলকাতার বিরিয়ানির স্বাদু কিসসা
৫৩.
স্বাদের সন্ধানে
৫৪.
পাঁচমেশালি চটজলদি রান্না
৫৫.
সন্দেশ: খবর থেকে খাবার
৫৬.
রসগোল্লা, তুমি কার?
৫৭.
পিষ্টক বৈচিত্র্য
৫৮.
এ বঙ্গের মিষ্টি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%