আলপনা ঘোষ
ইতিহাসের পাতা ওলটালে আমরা জানতে পারি যে ‘কোর্মা’ শব্দটি এসেছে উর্দু্ ভাষা থেকে। ঢাকা-বন্ধ পাত্রে ঢিমে আঁচে ধীরে ধীরে মাংস রান্নার প্রক্রিয়াকেই নাকি উর্দুতে কোর্মা বলা হত। মুখ্যত অযোধ্যার মোগলাই হেঁশেল থেকে বাঙালির হেঁশেলে কোর্মার আমদানি হয়েছিল সেই সময়ে যখন নবাব ওয়াজেদ আলি লখনউ-এর সনদ থেকে নির্বাসিত হয়ে এলেন কলকাতার মেটিয়াবুরুজে। নবাবের খাস রাঁধুনিরাও এলেন, তাঁর আর সব পারিষদদের সঙ্গে। কলকাতায় এসে বাদশাহি রান্নার ধারায় পরিবর্তনের হাওয়া লাগল। লখনউতে এতদিন যে কোর্মার প্রধান উপকরণ ছিল গোস্ত এখন তাতে যোগ হল নদীর টাটকা মাছ আর শ্যামলা বাংলার নানা সবজি। এইভাবে মোগলাই হেঁশেলে আমিষ ও নিরামিষ দুই প্রকারের কোর্মাই অচিরে নবাবের পছন্দের সেরা খাবারের তালিকাভুক্ত হল।
বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় কোর্মাকে প্রধানত মোগলাই, হিন্দুস্থানি এবং ইহুদি এই তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন। বেলা দে তাঁর ‘গৃহিণীর অভিধান’ গ্রন্থে বেশি ঘিয়ে জলের সংস্পর্শে না এনে কেবল দই দিয়ে মৃদু আঁচে রান্না করা মাংসের টুকরোকে কোর্মা বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আবার বলেছেন নরম পাখি, পাঁঠা বা ভেড়ার মাংসে যেমন কোর্মা ভাল হয়, তেমনি ভাল হয় বড় চিংড়ি ও রুই মাছের মতো মোটা মাছে। মাছ মাংসের পাশাপাশি শ্রীমতী দে আলুর কোর্মার এক চমৎকার রন্ধন-প্রণালী দিয়েছেন।
আলুর খোসা ছাড়িয়ে বড় বড় করে কেটে তেলে ভেজে তুলে নিন। অন্য পাত্রে টকদই, পেঁয়াজ, লঙ্কা, আদাবাটা, চিনি, নুন ও বোঁটা ছাড়ানো কিশমিশের সঙ্গে, ভাজা আলু মেখে কিছুক্ষণ রেখে দিন।
এবারে আঁচে ডেকচি চাপিয়ে ঘি দিন। ঘি গরম হলে তেজপাতা ও গোটা গরমমশলা ফোড়ন দিয়ে মশলামাখা আলু ঢেলে দিন। নেড়েচেড়ে ঢাকা দিয়ে কম আঁচে রেখে দিন। আলু সেদ্ধ হয়ে এলে মাখা মাখা ঝোল থাকতে নামিয়ে নিন।
কালিয়া প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল রবি ঠাকুরের কথা। তিনি যে ভোজনরসিক ছিলেন তা প্রায় সকলের জানা। তাঁর এই রসের প্রমাণ মেলে তাঁর বিভিন্ন লেখাতে। কবি তাঁর ‘খাপছাড়া’ গ্রন্থে এক গোরা বোষ্টম ও তাঁর কালিয়া প্রীতির কথা লিখেছেন যিনি নাকি-
শুদ্ধ নিয়ম-মতে
মুরগিকে পালিয়া,
গঙ্গাজলের যোগে
রাঁধে তার কালিয়া।
গোরা বোষ্টম কী করে শুদ্ধ নিয়ম মেনে কালিয়া তাও আবার মুরগির কালিয়া রাঁধতে শিখেছিলেন সে প্রশ্নের অবশ্য কোনও সদুত্তর দেননি কবি।
এই কালিয়া রান্না নিয়েও নানা মুনির নানা মত। ‘বরেন্দ্র রন্ধন’-এর লেখিকা কিরণলেখা রায়ের মতে ‘ঝাল’ রান্নার প্রণালীতে অতিরিক্ত গোটা গরমমশলা এবং রুচি অনুসারে হিং বা পেঁয়াজ ফোড়ন, কিছু অম্ল ও মিষ্ট রস যোগ ও পরে গরমমশলাবাটা, আদাবাটা, রসুনবাটা প্রভৃতি মেশালে নাকি কালিয়া প্রস্তুত। তেলের পরিবর্তে ঘি দিয়ে কালিয়া রাঁধাই তিনি প্রশস্ত বলে মনে করেন।
কোর্মার মতো কালিয়াও নিরামিষ, আমিষ দু’প্রকারের রান্না হয় যেমন আলু ও ফুলকপির কালিয়া, আলু পটলের কালিয়া আবার আমিষ পদ হিসেবে ফুলকপি ও চিংড়ির কালিয়া, রুই মাছের কালিয়া ইত্যাদি। আমিষ কালিয়া যেমন ধরুন রুই মাছের কালিয়াতে কেউ কেউ আবার দেশজ আনাজ যেমন আলু বেগুন, ফুলকপি, পটল প্রভৃতি দিয়ে থাকেন। ফুলকপি দিয়ে চিংড়ির কালিয়া পদটির কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল ফাদার দ্যতিয়েনের কথা।
একানব্বুই বছর বয়সেও এই লেখক সন্ন্যাসী কয়েক বছর ধরে প্রায় প্রতি শীতে ব্রাসেল্স থেকে কলকাতাতে আসতেন। ওই সময়ে নিয়ম করে একদিন অন্তত তিনি আমার বাড়িতে আসতেন আমার হাতের রান্না খেতে। সেদিন আমাকে রাঁধতে হত তাঁর পছন্দের ফরমাশি যেসব পদ তার মধ্যে একটি হল ফুলকপি দিয়ে চিংড়ির কালিয়া। ফাদারের পছন্দের এই বিশেষ পদটির রন্ধনপ্রণালী দিয়ে ইতি টানছি এই পর্বে।
উপকরণ: বাগদা চিংড়ি, ফুলকপি, আলু, পেঁয়াজ, টম্যাটো, হলুদ-লঙ্কা বাটা, আদাবাটা, জিরেগুঁড়ো, গরমমশলা, তেজপাতা, সামান্য দই, তেল ও ঘি।
প্রণালী: চিংড়ি ধুয়ে বেছে তাতে নুন, হলুদ মেখে তেলে সামান্য সাঁতলে রাখুন। এবারে ওই তেলে ডুমো করে কাটা আলু ফুলকপি দিয়ে নাড়ুন। সামান্য নুন দিন। বাদামি রং ধরলে তুলে নিন। এবারে নতুন করে তেল ও ঘি দিয়ে তাতে তেজপাতা, থেঁতো করা গোটা গরমমশলা ও মিহি করে কুচোনো পেঁয়াজ ফোড়ন দিয়ে বাটা ও গুঁড়ো মশলা সামান্য জলে গুলে ঢেলে দিন। কুচোনো টম্যাটো, নুন এবং মিষ্টি দিয়ে ভাল করে কষুন। টম্যাটো এবং পেঁয়াজ দুটোই সামান্য দেবেন। মশলার ভাজা গন্ধ বেরুলে টকদই ফেটিয়ে দিন। মাপমতো উষ্ণ জল দিন। ফুটে উঠলে কপি আলু দিন। সেদ্ধ হয়ে এলে চিংড়ি দিয়ে দু’-তিন ফুট হলে ও মশলার ওপরে তেল ভেসে উঠলে নামিয়ে নিন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন