আলপনা ঘোষ
কলকাতার বাঙালির কাছে শীতকাল হল গিয়ে উৎসবের কাল। নরম পশমবস্ত্র গায়ে দিয়ে বাঙালি ছোটে আনন্দের সন্ধানে। বইমেলা, বস্ত্রমেলা, পুষ্পমেলা, সার্কাস, বনভোজন সব চলবে সারা শীতকাল জুড়ে। আর কী থাকবে এর সঙ্গে? ভোজনরসিক বাঙালির খাওয়াদাওয়া। শীতকাল মানেই পিঠেপুলি, শীতকাল মানে কেক।
‘কেক’ শব্দটির উৎপত্তি ত্রয়োদশ শতকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার ‘কাকা’ শব্দ থেকে। ইতিহাসের সূত্র অনুযায়ী জানা যায় যে প্রাচীন মিশরবাশীরাই সর্বপ্রথম কেক বানানোর পদ্ধতি আয়ত্ত করেছিলেন।
সপ্তদশ শতকে ইয়োরোপে প্রথম আইসিং দেওয়া গোল আকারের কেক বানানো শুরু হয়েছিল। এর পরে কীভাবে কেকের খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে তা এক দীর্ঘ কাহিনি।
এই কলকাতা শহরের নামজাদা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বসতি হল ‘বো-ব্যারাকস’। এখনও সর্বসাকুল্যে আশিটি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবারের বাস এখানে। সারা শীত জুড়ে ওই এলাকা দিয়ে যাতায়াতের পথে আপনার নাকে ভেসে আসবে কেকের মিষ্টি সুবাস, কোপ্তা কারির গন্ধ আর কানে আসবে জিম রিভ্সের গানের সুর।
এই বো-ব্যারাকসে থাকত আমার এক কলেজের বন্ধু স্টেলা ব্রাউন। ছুটির দিvনে ওর মা গাড়ি পাঠিয়ে নিয়ে যেতেন আমাকে। অনেকগুলি শীতের দুপুর কাটিয়েছি আমি ওর সঙ্গে। এই সময়টা দেখতাম ওদের সারা বাড়ি কেমন যেন একটা উৎসবের সুরে বাঁধা। ওভেন ফ্রেশ কেক আর বিস্কুটের গন্ধে ম ম করত সারা বাড়ি।
কোনওদিন আবার গিয়ে দেখতাম, স্টেলার দিদিমা, খাবার টেবিলে বসে কেকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমি আর স্টেলা দু’জনেই জুটে যেতাম ওঁর কেক তৈরির প্রক্রিয়াতে হাত লাগাতে। আমাদের বাড়িতে কেক বানানোর চল ছিল না একেবারেই। সত্যি কথা বলতে কেক কী করে তৈরি হয় তা জেনেছিলাম স্টেলাদের বাড়িতে। কেকের সরঞ্জাম সব সাজিয়ে নিয়ে বসতেন স্টেলার দিদিমা। সারা টেবিল জুড়ে পাতা থাকত একটা প্লাস্টিকের টেবিল ক্লথ যাতে ময়দা, কোকো ইত্যাদি চালুনিতে চালবার সময় বা কেকের মিশ্রণ ফেটানোর সময়ে টেবিল নোংরা না হয়ে যায়। দিদিমার হাতের পাশে থাকত একটা নোটবুক যাতে লেখা থাকত ওঁর যত রেসিপি। আশ্চর্যের বিষয় উনি কিন্তু সে বই খুলেও দেখতেন না। একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম ওঁকে। নিজের মাথাতে দুটো টোকা মেরে বলেছিলেন সব রেসিপিগুলি নাকি ওঁর সাদা মাথাতে ধরা আছে।
কেকের উপকরণ মাপবার জন্য ছিল একটি বড় মাপের চায়ের কাপ। ময়দা, কোকো, চিনি সব মাপা হত ওই কাপ দিয়ে। ওই কাপে হাত দেওয়ার অনুমতি ছিল না কারুর। স্টেলা বলেছিল দিদিমা নাকি কাজের শেষে নিজের হাতে ধুয়ে মুছে তুলে রাখতেন কাপটাকে।
মাঝারি মাপের হামানদিস্তাতে চিনি গুঁড়ো করতেন। আমরা কাছে থাকলে আমাকে বা স্টেলাকে বলতেন কাজটা করতে। মাপামাপির কাজটা নিজের হাতে করতেন। ওঁকে দেখেছি ময়দা, কোকো, বেকিং পাউডার একসঙ্গে মিশিয়ে চালুনিতে তিনবার চেলে নিতে। মিশ্রণ ফেটাবার বাসনে প্রথমে সাদা মাখন, গুঁড়ো করা চিনি কাঠের হাতা দিয়ে ফেটাতেন। বলতেন এ-কাজের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কেক ঠিকঠাক হওয়ার চাবিকাঠি। স্টেলাকে একটি করে ডিম ফেটাতে দিতেন অন্য একটি পাত্রে। সেই ফেটানো ডিম দিদিমা একটি একটি করে মাখন চিনির মিশ্রণে দিয়ে আবার ফেটিয়ে নিতেন। এরপরে হল ময়দার মিশ্রণ দেওয়ার পালা। অল্প অল্প করে দিতেন আর হালকা করে ফেটাতেন একই দিক দিয়ে যাতে মিশ্রণের মধ্যে হাওয়া ঢুকতে পারে। অ্যালমুনিয়ামের পাত্রে মাখন মাখিয়ে তাতে ময়দা ছড়িয়ে পুরো মিশ্রণ ঢেলে ইলেকট্রিক ওভেনে ঢুকিয়ে দিতেন তবে তার আগে ওভেন চালু করে গরম করে নেওয়া ছিল মাস্ট। আমরা অধীর আগ্রহে কেক ফুলে ওঠা দেখার অপেক্ষায় বসে থাকতাম। বেকিং হয়ে গেলে উলের কাঁটা কেকের মধ্যে ঢুকিয়ে দেখে নিতেন কাঁটাতে কিছু লেগে আছে কি না। কিছু লেগে না থাকা মানে কেক প্রস্তুত। এরকম কেক বানানোর অনেক খুঁটিনাটি কৌশল আমি শিখেছিলাম স্টেলার দিদিমার কাছ থেকে।
ওঁদের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবারের নানা মজার গল্প শুনেছি ওঁর কাছে। কেক বানাতে বানাতে ওঁর মুখ চলত। আর সেসব গল্প শুনে আমরা দুই বন্ধু হেসে গড়িয়ে পড়তাম।
ক্রিসমাসের দিনগুলিতে বাবার হাত ধরে যেতাম নিউ মার্কেট। ক্রিসমাস ট্রি, বেলুন, স্ট্রিমার্স, রিবনে সাজানো কামান চত্বর, রকমারি দেশি-বিদেশি চকোলেট, কেক, মাফিন্স, চিকেন প্যাটিস— এইসব নিয়ে আমাদের ছেলেবেলায় নিউমার্কেটের ছিল জোরদার আকর্ষণ। ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়লে বাবা আমাদের নিয়ে ঢুকতেন নাহুম অ্যান্ড সনস্-এ। খানিকটা দূর থেকে নাকে ভেসে আসত কেকের মিষ্টি গন্ধ। ব্যস, আমাদের ক্লান্তি দূর, চোখ চকচক, নোলা সকসক। চকোলেট পেস্ট্রি ছিল আমাদের তিন ভাইবোনের ভারী পছন্দের। বাবা দোকানে ঢুকে আমাদের বেঞ্চিতে বসিয়ে দিয়ে পেস্ট্রির অর্ডার দিতেন। নাহুমের মালিক ডেভিড সাহেব নিজের হাতে কাগজের প্লেটে করে চকোলেট পেস্ট্রি ধরিয়ে দিতেন আমাদের। দোকানে বসে কেক খাওয়ার সে যে কী আনন্দ কী বলব!
নাহুম্স থেকে আমাদের বাড়িতে একেবারে বাঁধাধরা আসত রিচ ফ্রুট কেক কাগজের বাক্স করে। আমার মায়ের আবার পছন্দের ছিল নাহুম্সের হানি লাইট প্লামকেক। বাবা সেটি নিতেও ভুলতেন না। প্লাস্টিকের ব্যাগ ভরতি করে কেক, পেস্ট্রি, প্যাটিস নিয়ে বাবার মরিস মাইনর চেপে বাড়ি ফিরতাম আমরা। বড়দিনের উৎসবের শুরু হত এইভাবে আর জিব জুড়ে থাকত নাহুম্সের কেকের স্বাদ। আজ এই বাহাত্তর বছর বয়সেও ছেলেবেলার সেই স্মৃতি অম্লান।
উপকরণ: ডিম ২টি, ময়দা ১১/২ কাপ, চিনি ১ কাপ (বা যে যেমন মিষ্টি পছন্দ করে), বেকিং পাউডার ১ চা চামচ, গুঁড়ো দুধ ২ টেবিল চামচ, দুধ ১ কাপ, মাখন ১/২ কাপ, কমলা লেবুর রস ৩ টেবিল চামচ।
প্রণালী: চিনি গুঁড়ো করে রাখুন। ডিমের সাদা অংশ ইলেকট্রিক বিটার অথবা কাঠের হাতা দিয়ে খুব ভাল করে ফেটিয়ে ফেনা মতো করুন। ডিমের কুসুম এর মধ্যে দিয়ে আবার ফেটান। তারপর এতে দুধ মেশান। চালুনিতে ময়দা, গুঁড়ো দুধ এবং বেকিং পাউডার চেলে নিয়ে অল্প অল্প করে চিনির সঙ্গে দুধ, ডিমের মিশ্রণে দিয়ে কাঠের হাতা দিয়ে আলতোভাবে একদিকে নাড়ান। অল্প অল্প করে কমলালেবুর রস মেশান। সুন্দর ক্রিমের মতো হলে কেকের মোল্ডে মাখন মেখে, তার ওপরে শুকনো ময়দা ছড়িয়ে, পুরো মিশ্রণটি ঢেলে দিন। এবারে প্রি-হিটেড ওভেনে ১৮০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় কেকটি প্রায় এক ঘণ্টা বেক করুন। কেকের মধ্যে একটি কাঁটা ঢুকিয়ে দেখে নিতে হবে কেক হয়ে গেছে কিনা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন