আলপনা ঘোষ
খিচুড়ি ও তার অনুষঙ্গ নিয়ে কত সুখস্মৃতি। তখন কাঁকুলিয়া রোডের ভাড়াবাড়িতে আমাদের বাস। সন্ধে থেকে ভারী বর্ষণ শুরু হয়েছে। আমরা ছোটরা ঘরবন্দি। ঢাকা বারান্দায় ঠাকুরদার গা ঘেঁসে বসে ভূতের গপ্পো শুনছি। কাকা, পিসিরা আপিস থেকে এক এক করে কাক-ভেজা হয়ে বাড়ি ফিরছেন। উঠোন পেরিয়ে আমাদের মস্ত রান্নাঘর। সেখানে মা, ঠাকুমা রাতের রান্নার জোগাড় করতে ব্যস্ত। ভাজা মুগডালের সুবাস ভেসে আসছে। চেনা খিচুড়ির গন্ধে সময়ের আগেই আমাদের খিদে চাগিয়ে উঠছে।
এরই মধ্যে বাইরের ঘরের দরজায় দুবার ঘণ্টি বেজে উঠল। দাদা এক ছুটে গেল দরজা খুলতে, পেছন পেছন আমি আর দিদি। দরজা খুলতে দেখি বর্ষাতি গায়ে আমাদের বাবা এককাল হাসি মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর এক হাতে ডাক্তারি বাক্স আর এক হাতে জোড়া ইলিশ। সারাদিন রোগী দেখে, চেম্বার সেরে চিরদিনের খাদ্যরসিক বাবা গেছেন বাজারে ইলিশমাছ কিনতে। যৌথ পরিবারের মজাই আলাদা। নিমেষে হাতে হাতে মাছ ধোয়া, কাটা, বাছা সব হয়ে গেল। রান্নাঘরের দাওয়াতে সবাইমিলে পাত পেড়ে বসে খিচুড়ির সঙ্গে জমিয়ে ইলিশমাছ ভাজা দিয়ে ভোজ খাওয়া হল। তার সঙ্গে চলল, বাবার কত সস্তাতে বাজিমাত করে ইলিশমাছ কেনার রসালো গল্প। আজ আমার এই বাহাত্তর বছর বয়সেও সেদিনের সেই সুখস্মৃতি অম্লান।
আজকাল সে রামও নেই, নেই সেই অযোধ্যাও! এপার বাংলায় খিচুড়ির সঙ্গে ইলিশ মাছ ভাজা খাওয়ার কথা বাঙালি তো ভুলতে বসেছে। গঙ্গার ইলিশ তো আজকাল সুদূরের স্বপ্ন! সাতশো টাকা কেজি দরে খোকা ইলিশ কিনে তার কোনটা ভাজবেন আর কোনটাই বা ভাপে খাবেন?
তাই খিচুড়ির চিরকালীন অনুপান হিসেবে বাঙালির কাছে পাঁপড় ভাজা, ডিমভাজা, বেগুনি বা পেঁয়াজি দিয়ে একরকম আবার লাবড়া-ছ্যাঁচড়া দিয়ে আর একরকম খাওয়া, কোনটাই অবিশ্যি কম স্বাদু নয়।
এই তো সেদিন খিচুড়ি ‘ব্র্যান্ড ফুড’ ঘোষিত হওয়া উপলক্ষে বৈদ্যুতিক সামাজিক মাধ্যমে যে ধূমধাড়াক্কা পড়ে গেল তাতে অনুপান নিয়ে দেখলাম বাঙালির নানাবিধ মত। আমার অত্যন্ত স্নেহের পাত্র, কৃতি সাংবাদিক, লেখক, ভোজনরসিক শ্রীমান ঋজু বসু খিচুড়ি ও তার অনুষঙ্গ নিয়ে এই মাধ্যমে যা লিখেছেন তা এককথায় অতীব রসনাগ্রহী। তাঁর মতে খিচুড়ি এমন একটি উদারমনাপদ পদ যার সঙ্গে সহজেই ভাব জমাতে পারে চিংড়ি, বেকন, গোরু, মেটে সব। খিচুড়ির সঙ্গে যা জিভ চায়, সব চলবে, দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে। এখানেই নাকি তার খাঁটি ভারতীয়ত্ব।
একজন জানিয়েছেন ময়মনসিংহের মানুষ আবার পছন্দ করেন খিচুড়ির সঙ্গে চাঁপ শুটকি ভুনা খেতে। বাংলাদেশি মুসলমানেরা আবার খিচুড়ির সঙ্গে খেতে ভালবাসেন গরগরে করে রাঁধা খাসির মাংস। পাকিস্তানের মানুষজনের পছন্দ খিচুড়ির সঙ্গে লাল করে ভাজা পেঁয়াজ আর শুকনো করে রাঁধা কষা মাংস।
খিচুড়ি কিন্তু শুধু বাঙালির নয়, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী সর্বত্রই খিচুড়ি ও তার অনুষঙ্গের অবাধ বিচরণ।
আমার এক বিহারী বন্ধুর কাছে শুনেছি, নিরামিষ খিচুড়ির সঙ্গে তাদের চাই তিলোরি, আমের আচার আর আলুর ভর্তা। ত্রিপুরাবাসীদের পছন্দ খিচুড়ির অনুপান হিসেবে সিদক (শুটকি) চাটনি।
আমাদের আর এক প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশাতে ওঁরা খিচুড়ির অনুপান হিসাবে খান বেগুন ভর্তা ও রায়তা।
নবাবি রান্নার ভক্ত হায়দরাবাদের মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ খুশি হবেন খিচুড়ির সঙ্গে যদি পরিবেশিত হয় বিফ কিমা এবং তিল ও তেঁতুলের চাটনি।
শাকাহারী গুজরাতবাসী সাদাসিধে খাদ্যে অভ্যস্ত। তাই তাঁদের খিচুড়ির সঙ্গে কড়ি-নামক দইযুক্ত একটি সাইড ডিশ থাকলেই তাঁরা সন্তুষ্ট।
ডায়েটিশিয়ান ঋজুতা দিবেকরের মতে দই, কড়ি এবং আচার সহযোগে খিচুড়ি গ্রহণ স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী।
খিচুড়ি প্রসঙ্গে একটি সত্য কাহিনির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। বেশ কয়েক যুগ আগের কথা। এক ঘোর বর্ষার দিন। বন্ধু আবু দাউদের বাড়ি এসেছেন সারেঙ্গে আর শাস্ত্রীয় সংগীতের ওস্তাদ সাগরুদ্দিন খাঁ। মান্য অতিথির জন্য আবু দাউদের বেগম রান্না করলেন কামিনীভোগ চালের ভুনা খিচুড়ি আর তার সঙ্গে পাঁপড় ভাজা ও কষা মাংস। খাওয়ার পরে ঢেকুর তুলে সেদিন খাঁসাহেব বলেছিলেন, ‘আহা কী খেলাম। আমিনার বিরিয়ানিও এ স্বাদের কাছে তুচ্ছ’।
সম্প্রতি দিল্লির ইন্ডিয়া গেটের সামনে ৯১৮ কেজি ওজনের খিচুড়ি রান্না করে গিনেজ বুক অব রেকর্ডসে জায়গা করে নিল ভারত। বিখ্যাত সেফ সঞ্জীব কাপুরের নেতৃত্বে এই রান্না হয় আর তাঁর এই বৃহৎ কর্মযজ্ঞে সহায়ক হিসাবে হাতাখুন্তি নিয়ে নেমে পড়েছিলেন ভারতের যোগগুরু রামদেব।
আজ সমগ্র ভারত মেনে নিল, ভাল, বাঙালি কিন্তু এই পদটির টানে আগেই মজেছিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন