আলপনা ঘোষ
বাংলা রান্নায় ঘণ্টের চল কিন্তু আজকের নয়। ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ কাব্যের লেখক কৃষ্ণদাস কবিরাজ শ্রীক্ষেত্রে চৈতন্যদেব সার্বভৌম ভট্টাচার্যের বাড়িতে যে নিরামিষ সব পদ অন্নের সঙ্গে আহার করেছিলেন তার এক বিশদ বিবরণ দিয়েছেন এবং তাতেও মোচাঘণ্টের উল্লেখ মেলে।
সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু যিনি নিঃসন্দেহে নিজে একজন ভোজনশিল্পী ছিলেন তিনি আবার বাংলা রান্নার দুই রত্ন চচ্চড়ি ও ঘণ্টের মধ্যে এক সূক্ষ্ম সীমারেখা টেনে দিয়েছেন। যে চচ্চড়ি আর ঘণ্ট আমরা প্রায় রোজই খেয়ে থাকি সে দুটি পদের মধ্যে তফাত কী তার সঠিক উত্তর কিন্তু আমাদের অনেকেরই জানা নেই। দুটোতেই নানা তরকারির সংযোজন থাকতে পারে। দুটো পদেই স্বাদে উত্তরণ ঘটতে পারে নিরামিষ পদ হিসেবে বা বাঙালির প্রিয় মাছের ছোঁয়ায়।
অনেক ভাবনা-চিন্তা করে বুদ্ধদেব যে তফাতটি আবিষ্কার করেছেন তা হল, ‘চচ্চড়িতে যে মশলাটি স্বাদাধিক, সেই সরষে মেশালে ঘণ্টের আর জাত থাকে না।’ তাঁর মতে এ দুটি পদের মধ্যে বিভাজন নির্ভর করে সরষের মতো একটি মশলার ওপরে।
সামাজিক অনুশাসন মেনে এককালে হিন্দু বাঙালি বিধবাদের খাওয়াদাওয়াতে ছিল নানা বাধানিষেধের বেড়াজাল। আমাদের সেইসব বিধবারা স্বাদু সব সুখাদ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে সমাজের ওপরে এক মধুর প্রতিশোধ নিয়েছিলেন এক অসাধারণ নিরামিষ রন্ধনশৈলী সৃষ্টি করে যা বাংলা রান্নাকে পৌঁছে দিয়েছে এক শুদ্ধ, সুন্দর শিল্পে।
এমনই এক পদ আমাদের চাপোড় ঘণ্ট। শুধু মাছ, পেঁয়াজ, রসুনই বিধবাদের নিষিদ্ধ খাদ্যবস্তুর তালিকাভুক্ত ছিল তাই নয়, মুশুর ডালও তাঁদের চলত না। তাতে কী? আগের রাতে ভিজিয়ে রাখা মটরডালবাটা দিয়ে মুচমুচে করে চাপোড় তৈরি করে তেল বা ঘি-তে ভেজে তার সঙ্গে আলু, পটল, কাঁঠালের বিচি, কুমড়ো, থোড় ইত্যাদি নানা সবজি বা যে-কোনও একটি বা দুটি যোগ করে তাঁরা যে ঘণ্ট তৈরি করতেন তা এতই স্বাদু হত যে তার কদর আজও কমেনি। চাপোড় ঘণ্টে আবার তরকারির পরিমাণ চাপোড়ের থেকে কম হতে হবে, না হলে স্বাদ ঠিক হবে না। সাদা জিরে, শুকনোলঙ্কা ও তেজপাতা ঘি বা তেলে ফোড়ন দিয়ে তাতে আদাবাটা কষে মিহি করে কুচোনো তরকারি দিয়ে নাড়াচাড়া করে কম আঁচে ঢাকা দিয়ে রাঁধতে হয় এই ঘণ্ট। নুন, মিষ্টি পরিমাণ মতো দিয়ে চাপোড়গুলি ভেঙে মিশিয়ে দিতে হবে। পুরোটা সুসেদ্ধ হলেই চাপোড় ঘণ্ট প্রস্তুত।
বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘পাক-প্রণালী’ গ্রন্থে প্রায় আঠারোটি নিরামিষ ঘণ্টের পদপ্রণালী দিয়েছেন। এর মধ্যে কিছু কিছু ঘন্ট আমিষ, নিরামিষ দুই প্রকারেরই হতে পারে। যেমন কচুর শাকের ঘণ্ট। সাধারণত ভাদ্রমাসে গৃহস্থের ঘরে কচু শাকের ঘণ্ট রাঁধা হয়ে থাকে। নিরামিষ ঘণ্টে তেজপাতা, কালোজিরা, কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দেওয়া হয়ে থাকে। ভাপানো শাক ছেড়ে ভাল করে কষে নামাবার আগে নুন, মিষ্টি, নারকেলকোরা দিতে হয়। আমিষ কচুর শাকে ইলিশ মাছের মুড়ো দিলে তার স্বাদ হয় অতুলনীয়।
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের এক পার্বণ বলা যেতে পারে জামাই-ষষ্ঠী অনুষ্ঠানকে। সেদিন শাশুড়ি মাতা তাঁর আদরের জামাইকে নিজের হাতে রেঁধে খাওয়াতেন নানা আমিষ নিরামিষ পদ। এইসব পদের মধ্যে অন্যতম ছিল মুড়িঘণ্ট। সেসব দিনে জামাই বাবাজীবনরা নাকি সারা বছর অপেক্ষা করে থাকতেন এই পদটি পাতে পড়ার জন্য, এমনই স্বাদু এই মুড়িঘণ্ট।
আজকাল অবশ্য দিন বদলেছে। পাঁচতারা সব হোটেলের নামী শেফেরা জামাইষষ্ঠীকে উপলক্ষ করে বাঙালির চিরন্তন যেসব পদ রেঁধে ফেলেন, তার মধ্যে ‘মুড়িঘণ্ট’ থাকেই। আধুনিক শাশুড়িমাতারা জামাই বাবাজীবনদের নিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাই আজকাল হোটেলমুখী। মিহি সুগন্ধী চাল আর রুইমাছের মুড়োই হল এই ঘন্টটির প্রাণভোমরা।
পর্বের শেষে থাকছে বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের ‘পাক প্রণালী’তে উল্লিখিত ‘পটল-কিশমিশ ঘণ্ট’-এর পদ প্রণালী।
ঘণ্টের আলু ও পটলের খোসা ছাড়িয়ে কুচি কুচি করে কাটুন। কড়াইতে ঘি গরম করে তাতে ছোটএলাচের দানা, দারচিনি এবং লবঙ্গ ফোড়ন দিন। ফোড়নের সুগন্ধ বেরুলে তাতে আলু পটল দিয়ে নাড়ুন। অল্পক্ষণ পরে ধোয়া বাছা কিশমিশ তাতে ঢেলে দিন। এবারে এতে নুন কাঁচালঙ্কা ও আদাকুচি দিয়ে নাড়তে থাকুন। তরকারির জল মরে গিয়ে গা-মাখা মতো হলে নামিয়ে নিন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন