দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
•তৃতীয় উপাখ্যান•
বেতাল কহিল, মহারাজ, বর্ধমান নগরে রূপসেন নামে অতি বিজ্ঞ গুণগ্রাহী দয়াশীল পরম ধার্মিক রাজা ছিলেন। একদিন দক্ষিণদেশবাসী বীরবর নামে রাজপুত কর্মপ্রাপ্তির বাসনায় রাজদ্বারে উপস্থিত হইল। দ্বারবান তাহার প্রমুখাৎ সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়া রাজসমীপে বিজ্ঞাপন করিল, ''মহারাজ বীরবর নামে এক অস্ত্রধারী পুরুষ কর্মের প্রার্থনায় আসিয়া দ্বারদেশে দণ্ডায়মান আছে, সাক্ষাৎকারে আসিয়া স্বীয় অভিপ্রায় আপনার গোচর করিতে চায়; কি আজ্ঞা হয়?''
রাজা আজ্ঞা করিলেন, ''অবিলম্বে উহাকে লইয়া আইস।''
অনন্তর দ্বারী বীরবরকে নরপতিগোচরে উপস্থিত করিলে, রাজা তদীয় আকার-প্রকার দর্শনে তাহাকে বিলক্ষণ কার্যদক্ষ স্থির করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ''বীরবর, কত বেতন পাইলে তোমার স্বচ্ছন্দে দিনপাত হইতে পারে?''
বীরবর নিবেদন করিল, ''মহারাজ, প্রত্যহ সহস্র সুবর্ণমুদ্রার আদেশ হইলে আমার চলিতে পারে।''
রাজা জিজ্ঞাসিলেন, ''তোমার পরিবার কত?''
সে কহিল, ''মহারাজ, এক স্ত্রী, এক পুত্র, এক কন্যা, আমি স্বয়ং, এই চারি; এতদ্ব্যতিরিক্ত আর আমার পরিবার নাই।''
রাজা শুনিয়া মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিলেন, ''ইহার পরিবার এত অল্প, তথাপি কি নিমিত্ত এত অধিক প্রার্থনা করে? যাহা হউক, এক ভৃত্যের নিমিত্ত নিত্য নিত্য এবংবিধ ব্যয় যুক্তিসঙ্গত নহে অথবা এ অর্থব্যয় ব্যর্থ হইবে না; অবশ্যই ইহার অসাধারণ গুণ ও ক্ষমতা থাকিবে। অতএব কিছুদিনের নিমিত্ত রাখিয়া ইহার গুণের ও ক্ষমতার পরীক্ষা করা উচিত।''
অনন্তর কোষাধ্যক্ষকে ডাকাইয়া রাজা আজ্ঞা দিলেন, ''তুমি প্রতিদিন প্রাত:কালে বীরবরকে সহস্র সুবর্ণ দিবে; কোন মতে অন্যথা না হয়।''
বীরবর রাজকীয় আজ্ঞা-শ্রবণে পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইয়া ধন্যবাদ প্রদান করিতে লাগিল এবং কোষাধ্যক্ষের নিকট হইতে সে দিবসের প্রাপ্য নির্ধারিত সুবর্ণ গ্রহণ পূর্বক নৃপনির্দিষ্ট বাসস্থানে গমন করিল। তথায় উপস্থিত হইয়া সে প্রথমত: সেই সুবর্ণকে ভাগদ্বয়ে বিভক্ত করিয়া এক ভাগ বিপ্রসাৎ করিল; অবশিষ্ট ভাগ পুনর্বার বিভাগ করিয়া এক ভাগ বৈষ্ণব, বৈরাগী, সন্ন্যাসী প্রভৃতিকে দিল; অপর ভাগ দ্বারা নানাবিধ খাদ্যসামগ্রীর আয়োজন করিয়া শত শত দীন, দু:খী, অনাথ প্রভৃতিকে পর্যাপ্ত ভোজন করাইল; অবশিষ্ট যৎকিঞ্চিৎ স্বয়ং পুত্র, কলত্র ও দুহিতার সহিত আহার করিল।
প্রতিদিন এইরূপে দিনপাত করিয়া সায়ংকালে বর্ম, খড়গ ও চর্ম ধারণ পূর্বক বীরবর সমস্ত রজনী রাজদ্বারে উপস্থিত থাকে। রাজা তাহার শক্তির ও প্রভুভক্তির পরীক্ষার্থ কি দ্বিতীয় প্রহর, কি তৃতীয় প্রহর, যখন যে আদেশ করেন, অতি দু:সাধ্য হইলেও সে তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পন্ন করিয়া আইসে।
একদিন নিশীথসময়ে অকস্মাৎ স্ত্রীলোকের ক্রন্দনধ্বনি শ্রবণগোচর করিয়া রাজা বীরবরকে আহ্বান করিলে সে তৎক্ষণাৎ সম্মুখবর্তী হইয়া কহিল, ''মহারাজ, কি আজ্ঞা হয়?''
রাজা কহিলেন, ''দক্ষিণদিকে স্ত্রীলোকের ক্রন্দনশব্দ শুনা যাইতেছে; ত্বরায় ইহার তথ্যানুসন্ধান করিয়া আমাকে সংবাদ দেও।''
বীরবর ''যে আজ্ঞা মহারাজ'' বলিয়া তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করিল। রাজা বীরবরকে এক মুহূর্তের নিমিত্তও আজ্ঞা-প্রতিপালনে পরাঙ্মুখ না দেখিয়া সাতিশয় সন্তুষ্ট ছিলেন; এক্ষণে তাহার সাহস ও ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করিবার নিমিত্ত স্বয়ং গুপ্তভাবে পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন।
বীরবর সেই ক্রন্দনশব্দ লক্ষ্য করিয়া অতি প্রসিদ্ধ এক ভয়ঙ্কর শ্মশানে উপস্থিত হইল; দেখিল, এক সর্বালঙ্কারভূষিতা সর্বাঙ্গসুন্দরী রমণী শিরে করাঘাত ও হাহাকার করিয়া উচ্চৈ:স্বরে রোদন করিতেছে। বীরবর দেখিয়া অতিশয় বিস্ময়াবিষ্ট হইল এবং তাহার সম্মুখবর্তী হইয়া জিজ্ঞাসিল, ''তুমি কে, কি দু:খে এই ঘোর রজনীতে একাকিনী শ্মশানবাসিনী হইয়া বিলাপ ও পরিতাপ করিতেছ?''
সে কোন উত্তর দিল না; বরং পূর্ব অপেক্ষা অধিকতর রোদন করিতে লাগিল। অনন্তর বীরবর সবিশেষ ব্যগ্রতাপ্রদর্শন পূর্বক বারংবার জিজ্ঞাসা করাতে সে কহিল, ''আমি রাজলক্ষ্মী। রাজা রূপসেনের গৃহে নানা অন্যায়াচরণ হইতেছে; তৎপ্রযুক্ত তদীয় আবাসে অচিরাৎ অলক্ষ্মীর প্রবেশ হইবে; সুতরাং আমি রাজার অধিকার পরিত্যাগ করিয়া যাইব। আমি প্রস্থান করিলে অল্পদিনের মধ্যেই রাজার প্রাণাত্যয় ঘটিবে; সেই দু:খে দু:খিত হইয়া রোদন করিতেছি।''
প্রভুর এবম্ভূত অসম্ভাবিত ভাবী অমঙ্গল শ্রবণে বিষাদসাগরে মগ্ন হইয়া বীরবর কহিল, ''দেবি! আপনি যে আজ্ঞা করিলেন, তাহাতে কোন মতে সন্দেহ করিতে পারি না। কিন্তু যদি এই হৃদয়বিদারণ অমঙ্গল ঘটনার নিবারণের কোন উপায় থাকে, বলুন; আমি রাজার মঙ্গলের নিমিত্ত প্রাণান্ত পর্যন্ত স্বীকার করিতে প্রস্তুত আছি।''
রাজলক্ষ্মী কহিলেন, ''পূর্বদিকে অর্ধযোজনান্তে এক দেবী আছেন। যদি কেহ ঐ দেবীর নিকট আপন পুত্রকে স্বহস্তে বলিদান দেয়, তবে তিনি প্রসন্ন হইয়া রাজার সমস্ত অমঙ্গলের সম্পূর্ণ নিবারণ করিতে পারেন।
রাজলক্ষ্মীর এই বাক্য শুনিয়া বীরবর অতি সত্বর ভবনাভিমুখে ধাবমান হইল; রাজাও কৌতুকাবিষ্ট হইয়া পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন। বীরবর গৃহে উপস্থিত হইয়া আপন পত্নীকে জাগরিত করিয়া সবিশেষ সমস্ত বিজ্ঞাপিত করিলে সে তৎক্ষণাৎ পুত্রের নিদ্রাভঙ্গ করিয়া কহিল, ''বৎস, তোমার মস্তক দিলে রাজার দীর্ঘ আয়ু ও অচল রাজ্য হয়।''
তখন পুত্র কহিল, ''মাত:! প্রথমত: আপনার আজ্ঞা, দ্বিতীয়ত: স্বামিকার্য, তৃতীয়ত: ক্ষণবিনশ্বর পাঞ্চভৌতিক দেহ দেবসেবায় নিয়োজিত হইবে, ইহা অপেক্ষা আমার প্রাণত্যাগের উত্তম সময় আর ঘটিবে না; অতএব শুভকর্মে বিলম্ব করা কর্তব্য নহে। আপনারা সত্বর হইয়া কার্যসম্পাদন করুন।''
...ইত্যাকার নানাপ্রকার কথোপকথনের পর বীরবর সপরিবারে দেবীর মন্দিরাভিমুখে প্রস্থান করিল। রাজা এইরূপ বীরবরের সপরিবারে প্রভুভক্তির প্রবলতা ও অচলতা দেখিয়া যৎপরোনাস্তি চমৎকৃত ও আহ্লাদিত হইলেন এবং মনে মনে অগণ্য ধন্যবাদ প্রদান পূর্বক গুপ্তভাবে তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে বীরবর দেবীর মন্দিরে উপস্থিত হইল এবং ...নানা উপচারে যথাবিধি পূজা করিয়া সাষ্টাঙ্গপ্রণিপাত পূর্বক দেবীর সম্মুখে কৃতাঞ্জলি হইয়া কহিল, ''জগদীশ্বরি! তোমাকে প্রসন্ন করিবার নিমিত্ত আমি প্রাণাধিক প্রিয় পুত্রকে স্বহস্তে বলিদান দিতেছি। কৃপা কর, যেন প্রভুর দীর্ঘ আয়ু ও অচল রাজ্য হয়।''
এই বলিয়া খড়গ লইয়া বীরবর অকাতরে পুত্রের মস্তকচ্ছেদন করিল। বীরবরের কন্যা এইরূপে জীবিতাধিক সহোদরের প্রাণবিনাশ দেখিয়া খড়গ-প্রহার দ্বারা প্রাণত্যাগ করিল। বীরবরের পত্নীও শোকে একান্ত বিকলচিত্তা হইয়া তৎক্ষণাৎ তনয়-তনয়ার অনুগামিনী হইল। তখন বীরবর বিবেচনা করিল, ''প্রভুকার্য সম্পন্ন করিলাম; এক্ষণে আর কি নিমিত্ত দাসত্বশৃঙ্খলে বদ্ধ থাকি? আর কি সুখেই বা জীবনধারণ করি?'' এই বলিয়া সেই বিষম খড়গ দ্বারা স্বীয় শিরশ্ছেদন করিল।
এইরূপে অল্পক্ষণের মধ্যে চারিজনের অদ্ভুত মরণ প্রত্যক্ষ করিয়া রাজার অন্ত:করণে নিরতিশয় নির্বেদ উপস্থিত হইল। তখন তিনি কহিতে লাগিলেন, ''যে রাজ্যের নিমিত্ত এতাদৃশ প্রভুভক্ত সেবকের সর্বনাশ হইল, আর আমি সেই বিষম রাজ্যের ভোগে প্রবৃত্ত হইব না। আমি অতিশয় স্বার্থপর ও নিরতিশয় নির্বিবেক; নতুবা কি নিমিত্ত বীরবরকে পুত্রহত্যা হইতে নিবৃত্ত করিলাম না? কি নিমিত্তই বা তাহাকে আত্মঘাতী হইতে দিলাম? উপক্রমেই এই ঘোরতর অধ্যবসায় হইতে বীরবরকে বিরত করা সর্বতোভাবে আমার উচিত ছিল। সর্বথা আমি অতি অসৎকর্ম করিয়াছি। এক্ষণে আত্মহত্যারূপ প্রায়শ্চিত্ত ব্যতীত চিত্তসন্তোষ জন্মিবে না।''
এই বলিয়া খড়গ লইয়া রাজা আত্মশিরশ্চেছদনে উদ্যত হইবামাত্র ভগবতী কাত্যায়নী তৎক্ষণাৎ আবির্ভূতা হইয়া হস্তধারণ পূর্বক রাজাকে নিবৃত্ত করিলেন; কহিলেন, ''বৎস! তোমার সাহস ও সদ্বিবেচনা দর্শনে যারপর নাই প্রীত হইয়াছি; অভিপ্রেত বর প্রার্থনা কর।''
রাজা কহিলেন, ''মাত:! যদি প্রসন্ন হইয়া থাক, এই চারি জনের জীবনদান কর।...''
দেবী ''তথাস্তু'' বলিয়া অবিলম্বে পাতাল হইতে অমৃত আনয়ন পূর্বক তাহাদের গাত্রে সেচন করিবামাত্র চারি জনেই তৎক্ষণাৎ সুপ্তোত্থিতের ন্যায় গাত্রোত্থান করিল।....
পরদিন প্রভাত হইবামাত্র রাজা রূপসেন সভাভবনে সিংহাসনে আসীন হইয়া রাত্রিবৃত্তান্ত কীর্তন পূর্বক সর্বসভাজন- সমক্ষে ধর্ম সাক্ষী করিয়া অদ্ভুত প্রভুপরায়ণ বীরবরকে অর্ধরাজ্যেশ্বর করিলেন।''
...কথা সমাপ্ত করিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল, ''মহারাজ, পূর্বাপর সমস্ত শ্রবণ করিলে; এক্ষণে জিজ্ঞাসা করি, কাহার ঔদার্য অধিক হইল?''
বিক্রমাদিত্য উত্তর দিলেন, ''আমার বোধে রাজার ঔদার্য অধিক।''
বেতাল কহিল, ''কেন?''
রাজা বলিলেন, ''স্বামীর নিমিত্ত সর্বনাশ স্বীকার ও প্রাণদান করা সেবকের কর্তব্য কর্ম। বীরবর রাজকার্যার্থে ঈদৃশ ঔদার্য প্রকাশ করিয়া আত্মধর্ম প্রতিপালন করিয়াছে। কিন্তু রাজা যে সেবকের নিমিত্ত রাজ্যাধিকার তৃণতুল্য বোধ করিয়া অনায়াসে প্রাণত্যাগে উদ্যত হইলেন, এতাদৃশ ঔদার্যের কার্য কস্মিনকালেও কাহারও কর্ণগোচর হয় নাই।''
—
তিনটে শেয়াল
কালিদাস ভট্টাচার্য
একটি বনে তিনটি শেয়াল সন্ধ্যে হ'লে মনের সুখে
গাইতো বসে রাত্রে খেয়াল; মাখতো কালি নাকে মুখে;
আবার সকাল দশটা-দশে এবং খেলায় উঠতো মাতি
কাটতো দাড়ি ডালে বসে। করতো আবার হাতাহাতি।
ঠিক বারোটায় নামতো জলে তিনটে শেয়াল হঠাৎ নাকি
সাজতো সাহেব বিকেল হলে। হয়ে গেছে তিনটে পাখি!
এবং তারা গেছে উড়ে
কেউ জানে না কোন সুদূরে।।
—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন