দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

আশা দেবী
বাড়ীটা জলের দরেই পেলেন বিটু বোস। ছখানা বড়য় ছোটয় ঘর, রান্না ঘর, জল কল। মাত্র কুড়ি হাজার টাকা। পাড়ার সবাই বললে : একটু ভাল করে দেখেশুনে নিলে পারতেন। অমন করে একদিনের নোটিশে বাড়ী কেনা ঠিক হলো কি? একটু দেখেশুনে—
সঙ্গে সঙ্গে বিটু বোসের স্ত্রী নিস্তারিণী বললে : দেখছো তো! ওদেরও ওই বাড়ীতে চোখ পড়েছিল। তখুনি বলেছিলাম কাউকে জানিও না। কথা শুনলে না—জানালে রাজ্য শুদ্ধু সবাইকে! এখন ভালোয় ভালোয় বাড়ীতে গিয়ে উঠতে পারলে বাঁচি। সবাই বলে বাড়ী ঘর কপালে হয়! তাই এরা হিংসেয় ফেটে মরছে। চল, চল। ওই তো লরি এসেছে, উঠে পড়।
দশজন কুলি লাগিয়ে সব মালপত্র গাড়ীতে তুলে ফেললেন বিটুবাবু। তারপর ভোঁ করে একেবারে খ্যাঁংড়াপটি স্ট্রীটের সেই বাড়ীর কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।
গাড়ী থেকে নেমে বিটুবাবু বললেন : আগে তো দখল নিই। তারপর অন্য কথা হবে।
বাড়ীর কাছে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে এক ভদ্রলোক দ্রুতপায়ে বেরিয়ে এলেন। তারপর বিটুবাবুকে দেখে বললেন: এতদিন কোথায় ছিলে দাদা—বলেই বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বিটুবাবু দেখলেন পরণে নানা রঙের টুকরো জোড়া দেওয়া একটা আলখাল্লা আর মাথায় জটা জটা চুলের রাশ। যেন সারকাসের জোকার।
লরিওলা কারুর সঙ্গে কোন কথা না বলে সামনের খোলা বৈঠকখানা ঘরে দুম দাম করে সমস্ত মালপত্র নামিয়ে চলে গেল। কারণ ভাড়া তার আগামই নেওয়া ছিল।
নিস্তারিনী ধীরে ধীরে ঘরে গিয়ে একটা ট্রাঙ্কের ওপর বসলেন।
হঠাৎ ওপরে একটা শব্দ হতেই সেই অদ্ভুত পোশাকপরা ভদ্রলোক এক ছুটে ওপরে উঠে গেলেন; তারপর চিৎকার করে বলতে লাগলেন : শব্দ—শব্দ আর কিছু নয়, বায়ুতে একটা তরঙ্গ। আহা তরঙ্গ বলতে কি বোঝা যায়। নদীর তরঙ্গ, জলের তরঙ্গ, জলতরঙ্গ, গানের তরঙ্গ—তরঙ্গে তরঙ্গে একেবারে ছয়লাপ।
বিটুবাবু বললেন : নিস্তারিণী, প্রাণ যাবে এবার। বোধ হয় পানু ঘোষ শত্রুতা করে একটা পাগল সমেত বাড়ী সস্তায় বিক্রি করে দিয়ে পালিয়েছে। এখন উপায়!
: বল, রান্না ঘর কোথায়? আগে তো দুটি খিচুড়ি করে খেয়ে নি, তারপর বোঝা যাবে।
দুজনে নিচের তলায় বেশ খানিকটা জায়গা খুঁজে একটা জনতা স্টোভে খিচুড়ি বসিয়ে দিয়ে স্নান করতে গেলেন। ওপরে তখনও তরঙ্গের বিশ্লেষণ চলছে পুরোদমে। তরঙ্গ থেকে জল, তার থেকে বিষ্টি, কত কি বলতে বলতে হঠাৎ ভদ্রলোক নিচে নেমে এসে বিটুবাবুর জন্যে থালা গ্লাস পাতা আসনের ওপর বসে গিয়ে গোগ্রাসে সেই খিচুড়ি খেতে সুরু করে দিলেন। আর খেতে বসতে এসে বিটুবাবু তো অবাক। দেখেন, নিস্তারিণী ভয়ে কাঠ হয়ে এক কোণায় পালিয়ে আছে।
ভদ্রলোক নিজেই হাঁড়ি থেকে ঢেলে নিয়ে সবটুকু খিচুড়ি চেটে পুটে খেয়ে বললো : বিদায় তবে আজ আসি?—বলেই দ্রুতপদে ওপরে চলে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন।
বিটুবাবু বললেন : নিস্তারিণী ভয় পেলে চলবে না। বাড়ী যখন কিনেই ফেলেছি তখন একটা বুদ্ধি করতেই হবে। চলো, কাল পানুবাবুর বাড়ী গিয়ে সব কথা বলি।
: কিন্তু কি লাভ। তিনি হয়তো বলবেন, তখন তোমরা ভালো করে দেখে শুনে কেননি কেন? সে দোষ তো তোমাদেরই। তখন কি বলবে? আর মিছিমিছি ওসব নিয়ে কথা বলাবলি করলে পাড়ার সবাই হাসবে। বলবে, আচ্ছা বোকা এরা! দেখে শুনে কেনেনি, এখন ঝগড়া করতে এসেছে।
তবে এখন উপায়?—নিস্তারিণী বললেন।
বিটুবাবু ভেবে চিন্তে বললেন : দেখি চেষ্টা করে কী করতে পারি।
বলে ওপরে চলে গেলেন। দেখলেন ভদ্রলোক যত রাজ্যের আরশোলা নিয়ে শিশিতে ভরে সযত্নে তাদের তাকে সাজিয়ে রাখছেন। শিশির গায়ে কোনটাতে লেখা ১৯৫০; কোনটাতে আবার ১৯০৫। আবার কোনটাতে লেখা লঘুকরণ—তার ওপরে আরশোলা আর নিচে লাল লাল পিঁপড়ে।
বিটুবাবুকে দেখেই ভদ্রলোক একটা হাতুড়ি নিয়ে এসে দড়াম দড়াম করে ছাদের সিঁড়ি ভাঙতে লাগলেন। বিটুবাবু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন : একি? আমার বাড়ী ভাঙছেন কেন?
: দেখুন আমি সিঁড়ি ভাঙবার অঙ্ক করছি। প্রথম প্রথম এ সিঁড়িগুলো ভাঙতে ভারি কষ্ট হতো। এখন একটা বড় হাতুড়ি আনবার পর সবটা একেবারে জল হয়ে গেছে। বলেই ভাঙা সিঁড়ির উপর এক ঘটি জল ঢেলে দিলেন। বিটুবাবু তো বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইলেন। ছাদের সিঁড়ির সর্বনাশ করে দেবে আর কিছু বললেই, তাই চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলেন। ভদ্রলোক বললেন : ছোটবেলায় অঙ্কস্যার বলেছিলেন, নেউলে, তোর প্রতিভা আছে। অঙ্কই তোর আসে ভালো, তাই দেখুন সারা ঘরে শুধু অঙ্ক আর অঙ্ক।
বিটুবাবু দেখলেন গোটা একটা যাদব পাটিগণিত ছিঁড়ে আঠা দিয়ে সারা ঘরে দেয়ালে সে মেরে রেখেছে।
: দেখুন চৌব্বাচ্চার অবস্থা। একটা চৌব্বাচ্চা, দুটো মুখ। একদিক দিয়ে জল ঢোকে আর একদিক দিয়ে জল বেরোয়। আমি চৌবাচ্চাটাকেই ভেঙ্গে ফেলেছি। তাহলে সব জলই বেরিয়ে যাবে, কোন হাঙ্গামা থাকবে না।
বিটুবাবুর চোখে জল এলো। এমন সুন্দর চৌবাচ্চাটা ভেঙ্গে চুরে শেষ করে রেখেছে। বাড়ীর আর কোথাও কিছু নেই। চারিদিকেই তার ল্যাবরেটরী আর পরীক্ষা।
বিটুবাবু খানিকক্ষণ খুব গম্ভীর হয়ে বসে রইলেন। তারপর ভাবলেন, বিপদে তাল হারালে চলবে না। সুতরাং ভদ্রলোককে বললেন : আপনার আর কে আছে?
: কেন? আপনি!—বলেই একটা থালা থেকে খানিকটা ঝুল-কালি বিটুবাবুর মুখে মাখিয়ে দিয়ে থুতনিটা ধরে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগলেন আর বলে চললেন : হ্যাঁ—হ্যাঁ ঠিক—ঠিক বুঁচি পিসি। কোন ভুল নেই।
ঘরে ফিরে এসে বিটুবাবু বললেন, নিস্তারিণী, কোনো উপায় নেই। বাড়ী ওই পাগলকে দিয়েই চলে যেতে হবে। আর ওই পাগলকে বাড়ী থেকে সরাতে পারেনি বলেই ধাপ্পা দিয়ে পানুবাবু আমাকে বেচে দিয়েছে। একটু ভালো করে দেখতে পর্যন্ত দিলে না। এখন কি করি বলো তো। যাবই বা কোথায়?
: আচ্ছা, তুমি ব্যস্ত হয়ো না। পানুবাবুর বাড়ী আমার কাকীমার বাড়ীর পাশেই। আমি একটা ব্যবস্থা করছি। তুমি এ ক'দিন ওর দিকে চোখ রাখো আর কিছুতেই কিছু বলো না। রেগে যেন বাড়ী ছেড়ে চলে যেয়ো না। তা হলেই সব মাটি হয়ে যাবে।
নিস্তারিণী সকাল বেলা উঠেই ভগবানের নাম সেরে বেশ করে সেজেগুজে একটা ট্যাক্সি করে কাকীমার বাড়ীর দিকে চললেন।
পথেই দেখা পানুবাবুর স্ত্রীর সঙ্গে। তিনি কালীঘাটে পূজো দিয়ে ফিরছিলেন। মুখে আর তাঁর হাসি ধরে না। বললেন: আছেন কেমন?
: খুব ভালো। বলবো কি আপনাকে, এমন সুন্দর একটা বাড়ী আমাদের দিয়ে আপনারা যে কী উপকারই না করেছেন তা কী বলবো।
পানুবাবুর স্ত্রী একটু ভুরু কোঁচকালেন। এ বাড়ী তাঁরা কত লোককে বিক্রি করতে চেয়েছেন, কিন্তু কেউ কেনেনি। আজ দশ বছরের চেষ্টায় বিটুবাবুকে বাড়ী না দেখিয়ে শুধু ধাপ্পা দিয়েই বিক্রি করেছেন। ওঁরা ভালো আছেন কিরকম? কিছুই তিনি বুঝতে পারছেন না। খানিকক্ষণ পরে : তা বেশ—তা বেশ, বলতে বলতে তিনি বাড়ীর ভেতর ঢুকে গেলেন।

তারপর তারা...দড়াম দড়াম করে হাতুড়ির বাড়ি দিয়ে...
কাকীমার বাড়ীতে গিয়ে নিস্তারিণী শুনলেন—বাড়ী বিক্রির আনন্দে ছেলেমেয়ে নিয়ে পানুবাবু আর তাঁর স্ত্রী কাল ভোরেই তালা দিয়ে দু দিনের জন্যে দেওঘরে বেড়াতে যাচ্ছেন।
মাথায় একটা প্ল্যান এলো নিস্তারিণীর। আবার একটা ট্যাক্সি করে বাড়ী চলে এলেন তিনি।
ওপর থেকে ভদ্রলোক সমানে বলছেন : লন্ডন—নিউ ইয়র্ক—রাশিয়া—উলুবেড়ে। আহা—কি বিচিত্র সব জায়গা। পোল্যান্ড, বাঁশবেড়ে—গোবরডাঙ্গা যেন স্বর্গ। বিটুবাবু আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছেন।
তারপর ধীরে ধীরে ওপরে উঠে এসে একটা টুলের ওপর চেপে বসলেন। মনে হলো ওধারের একটা বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে কারা যেন বেরুবার জন্য ছটফট করছে। কালকে নতুন এসে তো বিটুবাবু একেবারে কিছুই বুঝতে পারেননি।
কারা যেন ঘরের মধ্যে থেকে ধুপ ধাপ করছে। মনে হলো এটা তো পাগলা গারদ নয়? কিন্তু তাই বা কি করে হবে! কিন্তু ঘরের মধ্যে যারা ধুপ ধাপ করছে তারা দরজার ওপর জোরে জোরে আঘাত করতে লাগল।
: ভাঙ-ভাঙ কারা—আঘাতের পর আঘাত কর—বলে চিৎকার করতে লাগলেন ভদ্রলোক।
তারপর বিটুবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন : ওই যে, দেখছো পাশের বাড়ী—ওই যে জানলা খুলে দেখছে সবাই। কাল লক্ষ্য করোনি। ওরাই সব গণ্ডগোলের গোড়া। ওরা আমাদের খেতে দেয় না। ডাক্তার এসে মারে আমাদের। লোক আমাদের সারা দিনরাত তালা বন্ধ করে রাখে। আমাদের আমেরিকায়, গোবরডাঙ্গায় বা ঘুঘুডাঙ্গায় কোথায়ও যেতে দেয় না।
এখনকার কথায় কিন্তু ওকে খুব পাগল বলে মনে হলো না। কিন্তু এটা বোঝা গেল, ওরা এবাড়ী থেকে মুক্তি পেতে চায়।
: একটা গাড়ী আনলে তোমরা লন্ডনে যাবে?—বিটুবাবু বললেন।
: ও—হো—হো—হুরা। সবাই বেরো গুহা ছেড়ে। আমরা লন্ডন অভিমুখে যাত্রা করবো। ওঠ ভাই সব জাগ। এখন তোমাদের জাগার সময়—বলতে বলতে লোকটা সেই হাতুড়ি দিয়ে দড়াম দড়াম করে মেরে দরজা ভেঙ্গে ফেললো আর পিল পিল করে ওর মধ্যে থেকে প্রায় জনা দশেক পাগল বেরিয়ে এলো।
: চল লন্ডন—বলেই তারা থলে ভরে বেড়ালের বাচ্চা, সোনা ব্যাঙ, আরশোলা, ঝুড়ি ভর্তি মরা কুকুর, খাঁচা ভর্তি মরা পাখি নিয়ে দরজায় দাঁড়ানো লরিতে উঠে বসলো এবং বিদুৎ গতিতে লরিটি তাদের নিয়ে একেবারে পানুবাবুর বাড়ীর দরজার সামনে পৌঁছে দিলো।
তারপর তারা এগার জনে 'চল সই, চল জল আনিগে, জল আনিগে চল' গান করতে করতে দড়াম করে হাতুড়ির বাড়ি দিয়ে তালা ভেঙ্গে বাড়ীর মধ্যে হুড়-হুড় করে ঢুকে পড়লো।
: এবার আর সিঁড়ি ভাঙা নয় দরজা ভাঙ্গার অঙ্ক কসতে হবে ভাই সব। এস, এস বলে সবাইকে বাড়ীর ভেতর ঢুকিয়ে নিয়ে, সেই প্রথম লোকটি দড়াম করে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলো।
বিটুবাবুর আনন্দে প্রায় কেঁদে ফেলার অবস্থা। একটা রিকসা ডেকে বললেন : পাঁচ টাকা বকসিস। চল—
চলতে চলতে শুনতে পেলেন, যেন বাড়ীর ভেতর প্রলয় হচ্ছে।
—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন