দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

শক্তিপদ রাজগুরু
ক্যাবলা আবার বাড়ি থেকে পালিয়েছে।
মাঝে মাঝে ও পালায়, এই নিয়ে বার তিনেক হ'ল বোধ হয়। অবশ্য তার জন্য সব সময় ওকেই দোষ দেওয়া যায় না।
ক্যাবলার নিজের মা নেই, তার মত একটি ক্ষুদে দানবকে পৃথিবীতে এনে বোধ হয় ওর মা লজ্জাতেই এখান থেকে বিদায় নিয়েছে।
অবশ্য ক্যাবলার বাবা ওর মায়ের মৃত্যুর জন্য আজও ক্যাবলাকেই দোষী করেন রেগে গেলে। ক্যাবলার উপর রাগ যে কোন মানুষই যখন তখন করতে পারে। তার কারণেরও অভাব হবে না। তাই ক্যাবলাকে কথাও শুনতে হয় যখন তখন, কিন্তু ওসব ক্যাবলার সহ্য হয়ে গেছে। কোনদিন কারো বকুনি ও গালমন্দ না শুনতে পেলে ক্যাবলাই বলে, 'দিনটা পানসে লাগছে, বুঝলি। আজ 'গুডবয়' হয়ে গেছি।'
ওর বাবার দেশেই গঞ্জে ফলাও কারবার। ধান-চাল-পাট এসবের বড় গুদামও আছে। দিনরাত যতিলাল দত্ত ওই কাজ কারবার নিয়ে ডুবে থাকে, ছেলের দিকে চাইবার সময় নেই। বেশ কয়েকটি ছেলেমেয়ে, তাই বোধ হয় ক্যাবলার মা মারা যাবার পর আবার নোতুন করে বিয়ে-থা করেছেন।
ক্যাবলাও যথারীতি তার কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। পেটা মুগুরের শক্ত গোলগাল দেহ, চোখ দুটোতে রাজ্যের দুষ্টুমি। ওর সঙ্গে মেশা মানেই কোন ঝামেলায় জড়িয়ে পড়া, অথচ না মিশে উপায়ও নেই।
ফুটবল টিমের ক্যাপটেন, ব্যাকে খেলে, ও যেন পাথরের পাঁচিল। গোলকিপারকে ও বলে, 'তুই শুধু দাঁড়িয়ে থাক। বল গললেও প্লেয়ার গলবে না।' হয়ও তাই। অনেকেই ভয়ে ক্যাবলার ধারে কাছে ঘেঁসে না। ওর পা দুটো নাকি লোহার তৈরি। পা দিয়েই ও ঘায়েল করেছে অনেককে।
ভরাবান বয়ে চলেছে ময়ূরাক্ষীর বুক ছাপিয়ে। গেরুয়া জলধারা ছোট বড় ঘূর্ণির মাতন তুলে কলকল শব্দে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে কোন সওয়ারী নৌকাকে, এমন প্রায়ই হয়। কূলে দাঁড়িয়ে থাকে ভীত মানুষের দল, ওই তীব্র স্রোতে নৌকাখানা গিয়ে কোন ডুবো বালুচরে ধাক্কা লাগলেই উলটে যাবে, ভেসে যাবে যাত্রীদল। আর্তনাদ করছে তারা।
সেবার নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ছিল ক্যাবলা, ওই নদী পাড়ি দেওয়া তার কাছে কিছুই নয়, লাফ দিয়ে পড়ল সেই স্রোতের আবর্তে—ভেসে চলেছে সে—নৌকা থেকে লম্বা কাছিখানা ওরা ছুঁড়ে দিয়েছে, ক্যাবলা সেটাকে ধরে ফেলে তীরের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে।
লোকজন জুটে গেছে।.... সেই কাছিটা নিয়ে তীরে এসে উঠল ক্যাবলা, তারপরই টানাটানি শুরু হয়। মেতে-ওঠা দুধার লালসাময়ী ময়ূরাক্ষী চায় ওদের গ্রাস করতে ওই নৌকা সমেত, অন্যদিকে মানুষ ওদের ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করছে। নৌকোখানা ওরা টেনে এনে ধারে লাগিয়েছে।
ক্যাবলা অবশ্য সেদিন বাবার হাতে বেশ কয়েকটা চড়চাপড় খায়। যতিলাল বকে, 'মরবি একদিন হতভাগা! যাবি আর কোনদিন?' যতিলাল চড়চাপড় দিতে থাকে, অবশ্য ক্যাবলার মুখ থেকে সেদিন কোন রকম প্রতিশ্রুতিই বের করতে পারেনি সে। গজগজ করে যতিলাল, 'পড়াশোনাও নেই, বাঁদর হচ্ছো দিন দিন! কি করবি তুই?'
কথাটা অবশ্য মাঝে মাঝে ক্যাবলাও ভেবেছে। খেলার পর নদীর ধারের মাঠ থেকে ফেরার আগে একটু বসে জিরিয়ে নিই আমরা। সন্ধ্যা নামছে। আলোটুকু মুছে যায় নি তখনও, পশ্চিম আকাশে পাখীগুলো নদীর বালিয়াড়ির উপর দিয়ে উড়ে চলেছে বাসার সন্ধানে। দু একটা করে তারা ফুটে উঠছে আকাশের বুকে। ক্যাবলা শোনায়, 'বাড়িতে মন টেকে না বুঝলি। দিনরাত কেবল বকুনি আর শাসানি! ধ্যুত্তোর! বল ওই পড়া ছাড়া কি আর কাজ নেই? আর কিছু করে না মানুষ?'
জবাব দিতে পারি না। আমরাও তখন সেই কথা ভাবি। ক্যাবলাই শোনায়, 'আমি গোয়েন্দা হবো বলেছিলাম। তা বাবা যা গাঁট্টা মারলে, আর মা তো বলে আমি নাকি অন্নধ্বংস করছি। পড়াশোনা কিসসু হবে না।' দম নিয়ে শোনায় ক্যাবলা, 'বুঝলি, গোয়েন্দাই হতে হবে আমাকে।'
ক্যাবলা ইদানীং লাইব্রেরী থেকে ওই সব বইই পড়ছে। কিরীটিকুমার শেষ করেছে, রবার্ট ব্লেকও পড়েছে সব, হেমেন্দ্র কুমার রায়ের সব ডিটেকটিভ নভেলও শেষ করেছে। বলি, 'সামনেই টেস্ট! তার তিনমাস পরই স্কুল ফাইনাল।' ওটার জন্য ক্যাবলার যেন কোন ভাবনাই নেই।
টেস্ট পরীক্ষাতেই ব্যাপারটা বাধিয়ে ছিল। সেকেন্ড মাষ্টার মশায় নাকি স্কুলের মধ্যে সবচেয়ে গোয়েন্দা মাষ্টার। কোন ছেলে পরীক্ষায় টুকছে, কে বলাবলি করছে,—এসব তার চোখে ঠিক ধরা পড়ে। এ নিয়ে স্কুলেও তার নামডাক। বেশ জাহির করেই কথাটা প্রকাশ করেন তিনি, 'টুকুক দেখি কেউ আমার সামনে!' ইতিমধ্যে বহু ছেলেকেই শায়েস্তা করেছেন তিনি। এবার টেস্ট পরীক্ষার সময় হাতেনাতে ধরে ফেলেন ক্যাবলাকে বামাল সমেত।
একটা তালগোল পাকানো কাগজের ঢ্যালা খপ করে ওর হাত থেকে ছোঁ মেরে তুলে নেন সেকেন্ড মাষ্টার মশায়। ওর উপর মাষ্টার মশায়ের অনেক দিনের নজর। ছেলেটা পড়াশোনাও করে না, কেবল দস্যিপনা করে—অথচ পাশ করে যায় ঠিকই। ভেতরে নিশ্চয়ই কোন রহস্য আছে। আজ সেই রহস্যই ধরে ফেলেছেন তিনি।
আমরাও চমকে উঠি, অন্য মাষ্টার মশায়রাও এসে পড়েছেন, হেডমাষ্টার মশায় ক্যাবলার কান ধরে নাড়া দিতে থাকেন। 'এটা কি?'
ক্যাবলা নির্বিকার চিত্তে জবাব দেবার চেষ্টা করে, 'কিছুই নয় স্যার।'
—'কিছুই নয়?'
সেকেন্ড মাষ্টার মশায় ও আরো অনেকে তখন উৎসাহ ভরে সেই কাগজের ঢ্যালাটার রহস্য মোচন করবার চেষ্টা করছেন। এক একটা কাগজের টুকরো খুলে চলেছেন, বাজে কাগজ, কোন অঙ্ক বা জ্যামিতির প্রবলেম কিছুই নেই তাতে। দোকানের হিসাব লেখার বাতিল কাগজ মাত্র বের হচ্ছে একটার পর একটা।
সকলেই উদগ্রীব। ক্যাবলাকে নিশ্চয়ই বের করে দেবেন ভরা হল থেকে। মালমশলাই খুঁজছেন সেকেন্ড মাষ্টার মশায় আর স্বয়ং হেডমাষ্টার নিজে। শেষ পর্যায়ে কাগজের ঢ্যালা থেকে বের হল শুকনো একটা আমড়ার আঁঠি।
সেকেণ্ড মাষ্টার মশায়ের মুখ-চোখ লাল হয়ে গেছে।
ক্যাবলা পরম বিজ্ঞের মত বলে 'ওটা একটা টোকন স্যার। কালিতলার সন্ন্যাসী ঠাকুর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কাছে রাখলে কাজ হবে।'
হেডমাষ্টার মশায় সরে গেছেন। সেকেন্ড মাষ্টার মশায় ধমকান, 'সাট আপ! ডেঁপো ছোকরা কোথাকার! গো অন রাইটিং।'
...ক্যাবলা আবার লিখতে বসে। আমরা সবাই হাসছি হলে বসে। খুক! খুক!—চাপা হাসির শব্দ ওঠে। অঙ্কের টিচার গজাননবাবু হুঙ্কার ছাড়েন—'ইউ বয়েজ, নো নয়েজ, নো নয়েজ!'
সেকেন্ড মাষ্টার মশায় সেদিন আর হলে আসেননি। ক্যাবলা গলা নামিয়ে বলে, 'ম্যানেজ কর তোরা, আজ উনি আসবেন না, আমড়ার আঁঠি চুষছেন। বড্ড ওর 'লো' নজর, তাই দিলাম একটু ঠুকে।'
কটা মাস দেখতে দেখতে কেটে গেল। ক্যাবলা এই ক'মাসে যেন বদলে গেছে। পড়াশোনা করে দেখতে পাই। বিকালে বের হয় মাঝে মাঝে। শুনি বাড়িতেও নাকি ওদের ঝামেলা চলেছে কাকা জেঠাদের সঙ্গে। ওর বাবার মন মেজাজও ভালো নেই। ফলে বাড়িতেও অশান্তি লেগে আছে। রাগের মাথায় বাবাও যা তা বলেন।
ক্যাবলাই দু:খ করে, 'এভাবে আর থাকা যায় না বুঝলি, পরীক্ষাটা হতে দেরী।'
'তারপর?' আমরা ব্যগ্রকণ্ঠে প্রশ্ন করি।

নৌকা থেকে লম্বা কাছিখানা ওরা ছুঁড়ে দিয়েছে, ক্যাবলা সেটাকে ধরে ফেলে...
ক্যাবলা আনমনে জবাব দেয়, 'কোথাও চলে যাবো। ভেবেছিলাম অনেক কিছুই হবো, তা আর হল না।'
...তবু পরীক্ষাটা দিয়েছে সে। ফাইনাল পরীক্ষা দিতে গেলাম মহকুমা শহরে। সেখানকার বোর্ডিং-এ থেকে কদিন পরীক্ষা দিলাম। ক'দিন ধরেই দেখেছিলাম শহরের বোর্ডিং-এর ছেলেদের সর্দারি। আমরা যেন পাড়াগেঁয়ে ভূত, সবে শহরে এসেছি।
বিজলী বাতি জ্বালাতে যাবো, ওরা ঠাট্টা করে —'দেশলাই ঠোকো হে!'
জলের কল খুলতে গেলে হাসে, 'দেখো, যেন তোড়ে ভেসে না যাও!'
ক্যাবলা গজ গজ করে। ওরা ক্যাবলার সঙ্গেও নাকি কি বদরসিকতা করেছে। ক্যাবলা বলে, 'পরীক্ষা শেষ হতে দে। তারপর দেখবো বাছাধনদের।'
তাই যেন বেধেছিল সেদিন। শেষ পরীক্ষা হয়ে গেছে। ভূগোল ছিল। বেলা একটাতেই শেষ হয়েছে। এবার বাড়ি ফিরবো আমরা।
রিজার্ভ বাস-এ বাক্স-বিছানা তুলছি। ক'দিন পর বাড়ির কথা মনে পড়ে। এমন সময় একটা কলরব শুনে ফিরে চাইলাম। দু তিনজন ছেলে ওই ক্যাবলার পিছনেই লেগেছে। ওর গোলগাল চেহারা দেখে ওকে ডাকতো ওরা সার্কেল অফিসার বলে। তারাই নাকি ওই বোর্ডিং-এর আদি বাসিন্দা আর সবচেয়ে পাজিমার্কা ছেলে! একজন বলে, 'তুমিও গোল, বুঝলে ভায়া, পরীক্ষায় ওই গোল্লাই পাবে নাকি সার্কেল অফিসার?'
চটে ওঠে ক্যাবলা, 'সরে দাঁড়ান না।'
ছেলে দুটো ওর পথ আটকেছে। অন্য জন ওর মাথায় একটা টোকাই দিয়েছে। হঠাৎ ক্যাবলা সামনের দুটো ছেলেকে টুঁটি ধরে মাথায় মাথায় কয়েকটা ঠকাঠক ঠুকে ছেড়ে দিল। সিটকে ছোঁড়া দুটোর মাথায় যেন চর্কিপাক লেগেছে, দুদিকে ছিটকে পড়ে ছটফট শুরু করেছে। তৃতীয় জন তখন নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে চীৎকার করছে।
ক্যাবলার এই মূর্তি আমরা জানি, তাই বলি ওকে, 'ছেড়ে দে ক্যাবলা!'
ক্যাবলা ধরাশায়ী দুই মূর্তিকে শাসাচ্ছে, 'আর রসগোল্লা খাবে স্যাঙ্গাত? তাহলে বলো—এর চেয়ে কড়া ওই রাজভোগের ব্যবস্থা করি।'
ওকে টেনে নিয়ে এলাম আমরা। রাজভোগের আর ব্যবস্থা করা তার হল না। ওরা ওতেই ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।
ক্যাবলার মন থেকে তবু সেই বাসনাটা যায়নি। আরও নোতুন বইপত্র যোগাড় করেছে। নিজের খেয়ালে সে তৈরি করেছে কতকগুলো তীর, লোহার ফলার ডগে কোন গাছের পাতার রসও লাগিয়েছে। মাঝে মাঝে কোন লোককে হাটে কয়েকবার ঘুরতে দেখলে তার দিকেই নজর দেয়।
'বুঝলি, লোকটা ক্রিমিন্যাল। দেখছিস না ওর হাতের ধ্যাবড়া আঙ্গুলগুলো। নাকের পাটা কেমন বাঁকানো। হ্যাভারসনের বই-এ আছে—'
আমরা তখন আলু-কাবলির শালপাতা চাটছি টক তেঁতুল লাগিয়ে, ওর রহস্য কথা শোনার সময় নেই। ও শুধু আসামীই খুঁজছে।
...হঠাৎ এমনি দিনে সাহাদের বাড়িতে ডাকাতি হয়ে গেল। রাতের অন্ধকারে কালো কালি আর সিঁদুর মেখে মশাল জ্বেলে একদল লোক এসে পড়ল। বিকট তাদের চীৎকার, আর তেমনি শন শন লাঠি ঘুরছে। গ্রামের লোক জেগে গেছে, মাঠের ধারে সাহাদের বিরাট বাড়ির দিকে এগোয় কার সাধ্যি। বনেদী বড়লোক সাহাবাবুরা। তাদের বাড়িতে বাসনের অভাব নেই। টাকা-মোহর-সোনাদানা তো আছেই। ডাকাতের দল বগি থালা ছুড়ছে, তীর বেগে ঘুরতে ঘুরতে অন্ধকারে ভেসে আসে সেই থালা—যেন শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন চক্র। লাগলে কেটে নামিয়ে দেবে হাতপা—মায় গলা অবধি।
আর্তনাদ ওঠে, ওরা বেদম মারধোর করে লুঠ করছে সিন্দুক ভেঙ্গে। ঘুম ভেঙ্গে গেছে ক্যাবলারও। ক্যাবলা চকিতের মধ্যে ব্যাপার বুঝে তার তীরধনুক নিয়ে বের হতে যাবে, বাধা দেয় ওর বাবাই।
'কোথায় যাচ্ছিস?'
মা শোনায়, 'যাক না, যমের বাড়ি যাচ্ছেন উনি।'
ক্যাবলাকে তবু ওরা আটকাতে পারেনি। পাঁচিল টপকে বের হয় ক্যাবলা।
ডাকাতের দল তখন ধনসম্পদ বস্তাবন্দী করে বের হয়ে পালাচ্ছে, ক্যাবলা দেখতে পায় ওদের। একটা তেঁতুল গাছের গুঁড়ির আড়াল থেকে লোহার ফলা লাগানো তীর আকর্ণ টেনে ছুঁড়ে দেয়, অস্ফুট আর্তনাদ ওঠে। একটা ষণ্ডা মার্কা লোকের হাতেই বিঁধে গেছে তীরটা।...চারিদিকে আলোড়ন পড়ে যায়।
'মাছি লেগেছে।'
ক'জন ডাকাত খোলা তলোয়ার হাতে এদিক ওদিকে খুঁজছে। ক্যাবলাও আরও দু'একটা তীর ছুঁড়ে জখম করার চেষ্টা করে ওদের। কিন্তু ওরা ধরে ফেলেছে তার লুকোবার ঠাঁই, এগিয়ে আসছে এই দিকে।
ক্যাবলা অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। কিন্তু বেশ দেখেছে সে তীর দিয়ে একটা লোককে জখম করেছে। তীর লেগেছে ওর ডান হাতে।
পুলিশও আসে। মাটিতে দেখা যায় রক্তের দাগ। কিন্তু ডাকাতির কোন কিনারাই হল না। সাহাকর্তাকে তারা দারুণ মেরে গেছে। বুড়ো হাসপাতালেই মারা যান। দুচারজন তখনও ভুগছে।
ক্যাবলা এমনি দিনে বাড়ি থেকে পালালো। ওর সৎমায়ের কথার চোটেই নাকি ক্যাবলা চলে গেছে। আমরাও কিছুদিন তার কথা আলোচনা করি। খেলার মাঠে মনে পড়ে তাকে।
দিনগুলো কোন দিকে হারিয়ে যায়। পরীক্ষার ফল বের হয়েছে, ভালোভাবে পাশ করেছে ক্যাবলা। ওর বাবাও দু:খ করেন, ছেলেটা কোথায় যে গেল। থাকলে কলেজে পড়াতেন। আজ তার ক্যাবলার জন্য দু:খ হয়। কিন্তু ক্যাবলা কোথায় হারিয়ে গেছে কেউ জানি না আমরা।
স্কুলের পরীক্ষার পর এবার ছত্রভঙ্গ হবার পালা। এতদিন গ্রামে এক সঙ্গে থেকেছি-পড়েছি-খেলেছি। এবার বৃহত্তর জগতে আমরা সবাই হারিয়ে গেলাম। গ্রাম ছেড়ে বাইরে আসতে হ'ল।
তবু পূজোর ছুটিতে বাড়ি ফিরেছি। বেশ কয়েকটা মাস কেটে গেছে। এতদিন মনে ছিল না, এই গ্রাম সবুজের ধারে ময়ূরাক্ষীর ঘোলা জলভরা তীরে এসে মনে পড়ে ক্যাবলাকে। কাশফুল ফুটেছে দিগন্তজুড়ে কে যেন সাদা উত্তরীয় পেতে রেখেছে—হাওয়ার দোলখাওয়া উত্তরীয়।
বাতাসে ভেসে আসে—সবুজ ধানে ভরা ক্ষেত পার হয়ে গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে ঢাকের গুরু গুরু শব্দ, পূজোর ঢাক বাজছে, এসব জগৎ জুড়ে আর একজন ছিল, ওই ক্যাবলা। আজ সবই আছে, সবাই রয়েছে; নেই শুধু সেই ছেলেটিই।
সাহাবাবুদের ডাকাতি খুন জখম নিয়ে অনেক তদন্ত হয়েছে, কাগজেও লেখা হয়েছে। তোলপাড় চলেছিল বেশ কিছু দিন। কিন্তু কোন কিনারাই হয়নি সেই ডাকাতির। লোকেও ভুলে গেছে সবকিছু।
গ্রামের জীবনে এবার পূজোর আলোচনাই হচ্ছে জোরদার। দত্তবাবুদের ঠাকুর এবার একহাত বেশী হয়েছে, ছোট হয়েছে সাহাবাবুদের ঠাকুর। বারোয়ারীতলায় এবার যাত্রা না হয়ে থিয়েটার হয়েছে। শহর থেকে ডাইনামো এনে বিজলীবাতি জ্বেলে থিয়েটার হয়েছে; আলোর ফোকাস দিয়ে নদী যা দেখিয়েছে তা নাকি একেবারে রিয়েল।
এমনি দিনে খবর আসে,—জটাধারীতলায় নোতুন এক জাগ্রত সাধু মহারাজ এসে ধুনি জ্বেলেছেন, বিরাট সাধু।
সঙ্গে চেলা চামুণ্ডাও রয়েছে অনেক। ঘোড়া-গরু তাঁবুও রয়েছে। তিনি নাকি প্রয়াগের কোন বিরাট সাধু, পুরীতে দেবদর্শন করতে চলেছেন। পথে আশ্রয় নিয়েছেন এস্থানের লোকদের জীবন ধন্য করার জন্য।
গ্রামের লোকও হুমড়ি খেয়ে গিয়ে পড়ে মহারাজের ওখানে। চেলারাই ঘিরে রেখেছে তাঁকে। মহারাজ সারাদিন মৌনী থাকেন। —দুচারটে বাণী দেন সূর্যাস্তের পর দুঘণ্টা। রাত্রি এক প্রহর পার হয়ে গেলে আবার মৌনী হয়ে যান।
এত লোকের মনে যে এত বেদনা, এত ভক্তি, এত লোভ ছিল তা জানতাম না। দেখি, মহারাজের ওখানে গিয়ে সাহাজী মশায় হত্যা দিয়েছেন। তার বাড়িতে ডাকাতি হয়ে গেছে, অপরাধী ধরা পড়ল না!
মহারাজ হাত তুলে সান্ত্বনা দেন, 'ভাবো ধনদৌলত মাটির মতই মূল্যহীন, ও সব গেছে পাপ গেছে। তবেই সান্ত্বনা পাবে বাবা।'
যতিলাল দত্তমশায় মাথা ঠুকছেন—'আমার সন্তান হারিয়ে গেছে বাবা!'
মহারাজ সান্ত্বনা দেন,—'পরমাত্মা নে দিয়া, উনেহি সে লিয়া! বাস, দু:খ ক্যা বেটা!'
তবু দত্তমশায় ছাড়েন না! বলেন, 'একদিন ঘরে পায়ের ধুলো দিতে হবে বাবা।'
মহারাজ হাসেন, 'সংসারে আর পা দিই না বেটা। এখান থেকেই আশীর্বাদ করছি। শান্তি মিলে গা। উসব চিজ লে যাও বেটা। কাঙালী লোগকো দে দেও।'
তিনি কারো বাড়িতেও যান না, কারো কোন দানও গ্রহণ করেন না। সুতরাং সাধুর মাহাত্ম্য প্রচার হতে দেরী হয় না। বিরাট মহাপুরুষ। এরই মধ্যে শুনলাম কে নাকি রাতের অন্ধকারে আকাশে আলোর রেখা দেখেছে—পরে নজর হয় ওটা সেই মহারাজ স্বয়ং। কোন একটা মরা ছেলেকে নাকি স্রেফ পায়ের আঙ্গুল ঠেকিয়ে বাঁচিয়েছেন তিনি।
ভিড় বেড়ে যায়। আমরাও যাই প্রসাদের লোভে। মহারাজ দাড়ি গোঁফে আবৃত—, মাথায় ইয়া জটা। গায়ে একটা সিল্কের উত্তরী। চারিপাশে তাগড়া তাগড়া জোয়ান চ্যালারা, ত্রিশূল-বল্লম হাতে তাঁবু পাহারা দেয়। ওরা নাকি দেবতার বিগ্রহ ধনসম্পদ নিয়ে চলেছে নীলাচলের দিকে।
মাঝে মাঝে দু'একজন তরুণ সন্ন্যাসীকেও দেখি। দাড়ি গোঁফ সবে বের হয়েছে। মাথায় জটা। সর্বাঙ্গে বিভূতি মাখানো, দু'একজন আমাদের দিকে চেয়ে থাকে। পরক্ষণেই তারা সরে যায় কোন অন্য সাধুকে আসতে দেখে।
সেদিন রাতের অন্ধকারে সারা গ্রাম জেগে ওঠে আর্তনাদে। শিউরে ওঠে গ্রামের মানুষ, এমনি ঘটনা তারা আগেও একরাতে দেখেছিল এবার ওরা হানা দিয়েছে দত্তদের বাড়িতেই। যতি দত্ত বেশ পয়সা কামিয়েছে এবার। প্রচুর টাকা পয়সা করেছে। লাখ লাখ টাকা, সেদিনই গুদামের প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকার পাট চালান দিয়েছে। ওরা বোধহয় খবর রেখেছিল—তাই আজ রাতেই হানা দিয়েছে।
অন্ধকারে ওরা বন্দুকের আওয়াজ করছে। চীৎকার ওঠে। ডাকাতরা বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়েছে। পুরোনো আমলের বাড়ি। চোরাকুঠুরিও আছে কয়েকটা!....ওরা সিন্দুক ভাঙ্গছে, যতি দত্তকে একটা খুঁটিতে বেঁধে মশালের ছ্যাঁকা দিয়ে চলেছে। ওরা শাসাচ্ছে, 'বের কর কোথায় আছে টাকার বান্ডিল, বন্ধকী সোনার জিনিস, নইলে পুড়িয়ে মারবো।'
আর্তনাদ করে দত্তমশায়। বাড়ির মেয়ের গা থেকে জোর করে গহনা খোলে ওরা। কানের মাকড়ি খোলা না গেলে ডাকাতরা হেঁচকা টানে কান ছিঁড়ে সেটা বের করে নিয়ে শাসায় 'চেঁচালে কেটে ফেলবো!'
দত্তগিন্নীকে কে এক ধাক্কায় ছিটকে ফেলে দিয়ে ওর গলার দশভরি গোট হারটা ছিঁড়ে নেয়। কান্নায় আর্তনাদে বাড়ি ভরে উঠেছে। ওরা সিন্দুক ভাঙ্গছে। এমনি সময় একজন তরুণ ডাকাতই খবর দেয় সর্দারকে, 'মালখানার চাবি পাওয়া গেছে সর্দার।'
চোরা ঘুপসি ঘরখানায় ছোট্ট লোহার দরজা খুলে ফেলেছে ওরা। সর্দার ক'জনকে নিয়ে ঢুকে পড়ে, বাইরে রয়েছে মাত্র একজন। হঠাৎ সে দরজাটা বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দেয় বাইরে থেকে।
গ্রামের লোকও এসে পড়েছে। থানা পুলিশ সেই আগেকার ডাকাতির পর থেকেই সাবধান হয়েছিল, তারাও হানা দিয়েছে। বন্দুকের শব্দ ওঠে। ভয় পেয়ে গেছে এরা। বেশীক্ষণ থাকা নিরাপদ নয়।
পালাতে হবে। কিন্তু সর্দার আর ক'জনকে দেখা যায় না। ওরা তাড়া দেয়, 'বের হয়ে পড়ো! ওরা বোধ হয় আগেই বের হয়ে গেছে!'
কিন্তু বেরুবার মুখেই কাকে দেখে ওরা চমকে ওঠে। তাদেরই দলের একজন! গর্জে ওঠে ডাকাতের দল—কে বল্লম নিয়ে তেড়ে আসে।
'বেইমান! শেষ করে দোব তোকে!'
কিন্তু তার আগেই পুলিশের রিভলবারের গুলি লাগে তার কবজিতে, সড়কি ছোঁড়া আর হল না। ওরা জালে পড়ে গেছে। একেবারে বেমালুম ধরা পড়ে গেছে দলশুদ্ধ।
যতিলাল দত্ত এতদিন পর তার হারানো ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে, 'তুই—ক্যাবলা!'
পুলিশ তখন সেই চোরাকুঠুরির দরজা খুলে এক-এক-করে ডাকাতদের বের করছে আর হাতকড়ি লাগাচ্ছে, শেষকালে ধরা পড়ল সেই সর্দার।
সাধুমহারাজের এইটাই আসল পরিচয়, ওই জটাজুট-দাড়িগোঁফ সবই নকল। ওটা তার সাজবেশ মাত্র। ওই সব দলেরই ওটা ভেক। চেলারূপী ক্যাবলাকে দেখে সাধুমহারাজ গর্জায়, ''হারামজাদ কাহাঁকা! তুই-ই বেইমানি করলি?''
হাসছে ক্যাবলা, 'তোমার ডান হাতের চিহ্নটা দেখাও মহারাজ পুলিশকে, আমার তীর লেগেছিল ওখানে, সেবার সাহাবাবুদের বাড়িতে যখন পদধূলি দিয়েছিলে তখন। ওই দাগটি থেকেই তোমায় চিনেছিলাম, তোমার চ্যালাগিরি করতে শুরু করেছিলাম। আজ এটা গুরুদক্ষিণা মাত্র।'
'চোপরও শয়তান! জিব টেনে ছিঁড়ে দোব তোর!'—মহারাজ গর্জন করছে। কিন্তু নিষ্ফল সেই গর্জন।
মহারাজের আস্তানা—তার বাক্স প্যাটরা সার্চ করছে পুলিশ। অনেক ডাকাতির মালই বের হয়েছে, মায় সাহাবাবুদের বাড়ির বৌদের চন্দ্রহার, বিছে, ভারি ভারি গহনা পর্যন্ত। আর বের হয়েছে ক্যাবলার হাতের তৈরী সেই তীরটাও, যাতে মহারাজ বছর খানেক আগে জখম হয়েছিলেন।
অনেকদিন লোকের চোখে ধুলো দিয়ে এই কাণ্ড করে এসেছে মহারাজের দল। পুলিশও এবার হাতে পেয়েছে তাদের।
ক্যাবলার নামডাক বেড়ে গেছে।
ক্যাবলার ছবি বের হয় কাগজে, পুলিশ সাহেব নিজে ওকে খাতির করে পুরস্কার দিয়েছেন।
এখনও ওকে দেখতে পাবে, একসঙ্গেই কলেজে পড়ি আমরা। বলিষ্ঠ সতেজ একটি তরুণ। ব্যাকে দাঁড়িয়ে একাই যেন প্রতিপক্ষের সব আক্রমণ ঠেকাচ্ছে। কলেজ টিমের যোগ্য ক্যাপ্টেন।
পড়াশোনাও মন দিয়ে করছে।
ও নাকি পাশ করে আরও বড় হবে।
আজ ওকে আমরা বিশ্বাস করি—ওর শক্তি সাহস আর নিষ্ঠা আছে। ও বড় হবে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন