দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

সঙ্কর্ষণ রায়
ছোট নাগপুরের একটি পাহাড়ী অঞ্চলে টাংস্টেন (Tungsten) নামে একটি ধাতুর সন্ধান করছিলাম। টাংস্টেন খুব শক্ত জাতের ধাতু। তাকে লোহার সঙ্গে মেশালে বিশেষ ধরনের ইস্পাত তৈরী হয়। এই ইস্পাত এতই শক্তিশালী যে তাকে বুলেট দিয়েও বিদীর্ণ করা যায় না।
পাহাড়ের নীচে ঘন শাল বন। শালবনের মধ্যে অনেকগুলো কোয়ার্টজ (quartz) পাথরের শিরা মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আছে। তাদের মধ্যে খোঁড়াখুঁড়ি করে আমরা টাংস্টেন খুঁজি। খুঁড়ি বিস্তর, কিন্তু খুঁজে পাই অল্পই। আমার মনে হল টাংস্টেনের আসল ভাণ্ডার বুঝি মাটির নীচে কোয়ার্টজ পাথরের শিরার একেবারে ভেতরের মহলে লুকোনো আছে।
একটা গহ্বর খনন করে ভেতরের খবর নেবার আয়োজন করলাম। কোয়ার্টজ পাথরের শিরাটি এক জায়গায় ভেঙ্গে আলগা হয়ে পড়েছে। বিচ্ছিন্ন সাদা পাথরের টুকরোগুলো অনেকটা যেন স্তূপের আকারে সাজানো ছিল। কোদাল দিয়ে পাথরের স্তূপটিকে সরিয়ে ফেলতেই বড় আকারের কালো রঙের একটি পাথর চোখে পড়ল। পাথরটি মাটির ভেতরে গাঁথা। চারটে গাঁইতি দিয়ে চারপাশ থেকে চাড় দিতে পাথরটি আলগা হয়ে বেরিয়ে পড়ল।
পাথরটি সরে আসতেই একটি সুড়ঙ্গ চোখে পড়ে। সুড়ঙ্গের ভেতরে গভীর অন্ধকার। টর্চের আলো জ্বালিয়ে দেখলাম যে সুড়ঙ্গ পথটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে—কতদূর পর্যন্ত গিয়েছে তা বোঝা গেল না।
সুড়ঙ্গটা দেখে আমার সহকর্মী নীরেন সোল্লাসে বলে উঠল, বা: একেবারে রেডি মেড (ready made) ভেতরে ঢোকার পথ। খোঁড়াখুঁড়ি না করেই ভেতরে ঢুকে পড়তে পারব। নিশ্চয়ই এটা একটা পুরোনো খনি। কিন্তু এই খনির খবর আগে তো কখনো পাইনি আমরা। এখানকার যে সব রিপোর্ট আমাদের হাতে এসেছে, তাদের মধ্যে এই খনির কোন উল্লেখই নেই।
ভুবন মাহাতো ছিল আমাদের গাইড। স্থানীয় লোক। এখানকার পথ-ঘাট, পাহাড়-জঙ্গল সবই তার নখদর্পণে। সে বললে, এটা তো খুব প্রাচীন কালের খনি। নাগ বংশের রাজাদের আমলে এই খনিতে কাজ আরম্ভ হয়েছিল।
আমি বললাম, প্রাচীন কালের লোকেরা টাংস্টেন চিনল কী করে! টাংস্টেনের সঙ্গে মানুষের পরিচয় তো বেশী দিনের পুরোনো নয়।
ভুবন বললে, টাংস্টেন নয় স্যার, অন্য কোনও জিনিস এই খনি থেকে বের করা হত। কী জিনিস তা অবশ্য আমি বলতে পারব না।
নীরেন বললে, ভেতরে ঢুকলেই তা বোঝা যেতে পারে। চলুন না সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে পরীক্ষা করে দেখি আমরা।
আঁৎকে উঠে আমি বললাম, ভেতরে ঢুকব কী মশাই! প্রাচীন কালের খনি—কত বিষাক্ত গ্যাস যে ভেতরে জমে আছে তার ঠিক নেই! ভেতরে ঢোকার আগে বাইরে থেকে তাজা বাতাস সুড়ঙ্গের মধ্যে পাম্প করে ঢুকিয়ে দিতে হবে।
—সে তো অনেক হাঙ্গামার ব্যাপার। তার জন্য বড় ফ্যান, নানারকম যন্ত্রপাতি এনে বসাতে হবে এখানে।
গম্ভীর মুখে আমি বললাম, তা হবে বই কি। অম্নি অম্নি সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে পড়ে নিজেদের জীবন তো আমরা বিপন্ন করতে পারিনে। এসব করতে সময় লাগবে অনেক। ইতিমধ্যে চেষ্টা করে দেখা যাক না এই সুড়ঙ্গটির মধ্যে কিসের খনি ছিল সে খবর পাওয়া যায় কিনা।
ভুবন বললে, খবর যদি পেতে চান করালী মাইতির কাছে চলুন। বছর ত্রিশেক আগে এই সুড়ঙ্গের মধ্যে তিনি ঢুকেছিলেন। ঢুকে কী পেয়েছিলেন তা অবশ্য আমি জানিনে। তবে একটা বড় আকারের তামার পাত তিনি বের করে এনেছিলেন বলে শুনেছি। তাতে কি সব না কি খোদাই করা আছে।
কোথায় আছে সেই তামার পাতটি?—আমি সাগ্রহে প্রশ্ন করলাম।
—করালী মাইতির কাছেই আছে।
তৎক্ষণাৎ আমরা ভুবন মাহাতোকে নিয়ে করালী মাইতির বাড়িতে গেলাম। করালী তখন তাঁর ঘরের দাওয়াতে বসে তামাক খাচ্ছিলেন। বয়স বোধ হয় আশি পেরিয়েছে। মাথার চুলগুলো সব কাশ ফুলের মত সাদা, মুখের চামড়া কুঁচকে আমসির মত হয়ে গেছে। চোখ দুটি ছোট ছোট—কিন্তু আশ্চর্য রকম উজ্জ্বল। আমরা সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ভুরু কুঁচকে আমাদের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকালেন তিনি।
কী চাই আপনাদের বাবুমশাই?—প্রায় ধমকের সুরে প্রশ্ন করলেন করালী।—আমি বুড়ো মানুষ, কারুর সাতে পাঁচে নেই, আমার কাছে কিসের প্রয়োজন আপনাদের?
আমি বললাম, প্রয়োজন সামান্যই। চুকরিপাড়ার জঙ্গলের পুরোনো খনিটা থেকে যে তামার পাতটা আপনি কুড়িয়ে পেয়েছেন, সেইটে দেখতে চাই আমরা।
তামার পাতটার কথা কে বলেছে আপনাদের?—করালীর গলার স্বর পাথরের মতো জমাট বাঁধে— চোখ দুটি ঝলসে ওঠে আগুনের মত।—বুঝেছি, এ ভুবন মাহাতোর কাজ। কিন্তু বাবুমশাইরা, তামার পাতটা আছে আমার ঠাকুরঘরে শালগ্রাম শিলার পাশে—ওটা আমি ছাড়া কেউ ছুঁতে পারে না।
আমি বললাম, বেশ তো আমরা কেউ ওটাকে ছোঁব না। আপনিই হাতে নিয়ে বসুন—আমাদের দেখে নিতে কোন অসুবিধে হবে না।
আপনারা দেখে নেবেন মানে!—চোখ পাকিয়ে বলে উঠলেন করালী।—জানেন আমার নিজের বাড়িরও কাউকে ওটা দেখতে দিই নি! শুনুন বাবুমশাইরা, এই তামার পাতটা একান্তভাবে আমার নিজস্ব জিনিস—কাউকে কখনো দেখতে বা ছুঁতে দিই নি, দেবও না।
অগত্যা আমরা ফিরে এলাম আমাদের তাঁবুতে। তাঁবুর সামনে ডেক-চেয়ারে বসে পড়ে নীরেনকে বললাম, তা হলে সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢোকার ব্যবস্থা করা যাক। হেড অফিসে সুড়ঙ্গের মধ্যে হাওয়া চালাবার জন্য যন্ত্রপাতির ফরমাশ পাঠিয়ে দিন আজই।
নীরেন বললে, এই সব যন্ত্রপাতি এসে পৌঁছতে তো অনেক সময় লাগবে। এতদিন চুপচাপ বসে না থেকে সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢোকার চেষ্টা করলেই তো হয়।
আমি বিরক্ত হয়ে উঠে বললাম, কী যে সব ছেলেমানুষের মত কথা বলছেন তার ঠিক নেই! আপনার ফুসফুসের কী বিষাক্ত গ্যাস সইবার ক্ষমতা আছে যে এই দু:সাহসিক চেষ্টা করতে চান! একটু ধৈর্য ধরুন না, যন্ত্রপাতিগুলো এসে গেলে পর নিশ্চিন্ত মনে সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকতে পারবেন।
নীরেন মুখ গোমরা করে বসে থাকে। আর কোন কথা বললে না সে।
আমি ভুবনকে প্রশ্ন করলাম, হ্যাঁহে ভুবন, করালী মাইতি সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে কী বিষাক্ত গ্যাসের পাল্লায় পড়েন নি?
ভুবন একটু চিন্তা করে জবাব দিল, সে আমি ঠিক বলতে পারব না স্যার। তবে ঢুকেই তিনি বেরিয়ে এসেছিলেন ঐ তামার পাতটা নিয়ে। আর কখনো ঢোকার চেষ্টা করেন নি।
—ঢুকেই যখন বেরিয়ে এসেছিলেন, তখন নিশ্চয়ই তিনি বিষাক্ত গ্যাসের পাল্লায় পড়েছিলেন। শুনছেন তো নীরেনবাবু, বিষাক্ত গ্যাসের জন্যই আর করালী ঐ সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকতে সাহস পান নি।
ভুবন বললে, ঐ তামার পাতের লেখাগুলি পড়তে পারলে বোধ হয় আবার তিনি ঢোকার চেষ্টা করতেন। আমার বাবাকে তিনি বলেছিলেন যে তামার পাতের লেখা থেকে যদি তিনি সুড়ঙ্গের মধ্যে দামী কিছু আছে বলে হদিস পান তাহলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা অবশ্য আবার করবেন।
আমি বললাম, সুড়ঙ্গের মধ্যে বিষাক্ত গ্যাস যদি না থাকত করালী নিশ্চয়ই তামার পাতের লেখাগুলির পাঠোদ্ধারের অপেক্ষা না রেখেই সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকতেন।
—তা ঢুকতেন বই কি। কারণ অনেক চেষ্টা করেও লেখাগুলি পড়তে তিনি পারেন নি। লেখাগুলি পড়িয়ে নেওয়ার জন্য কলকাতায় বড় বড় পণ্ডিতদের কাছে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁরাও পারেন নি পাঠোদ্ধার করতে। তামার পাতের লেখা যখন দুর্বোধ্যই রইল, তখন সুড়ঙ্গের রহস্য ভেদের জন্য সোজাসুজি ভেতরে ঢুকে যাওয়াই উচিত ছিল তাঁর। করালী তা করেন নি বলেই অনুমান করছি যে সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢোকাটা নিরাপদ ছিল না।
দিন কয়েক বাদে শুনলাম যে করালী মাইতি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন।
ভুবন বললে, করালীর ছেলে বিশ্বম্ভর খুব ভালো মানুষ। তাকে বললে সে হয়তো তামার পাতটা আপনাদের দেখিয়ে দিতে পারে।
করালীর শ্রাদ্ধশান্তি চুকে গেলে পর আমরা একদিন বিশ্বম্ভরকে ডেকে পাঠিয়ে অনুরোধ জানালাম তামার পাতটি একবার আমাদের দেখিয়ে যাবার জন্য।
আমাদের কথা শুনে মুখ কাচু মাচু করে বিশ্বম্ভর বললে, সে তো আর সম্ভব নয় স্যার। বাবার ইচ্ছেমত ঐ তামার পাতটা তাঁর চিতার ওপরে তুলে দিয়েছিলাম।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীরেনকে আমি বললাম, তামার পাতের কথা তা হলে ভুলেই যান। সুড়ঙ্গের রহস্য ভেদ আমরা সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকেই করব।
কলকাতা থেকে যন্ত্রপাতি এসে পৌঁছতে তখনো অনেক দেরি। নীরেন বললে, যন্ত্রপাতি না এলে সুড়ঙ্গের মধ্যে না হয় ঢুকতে পারব না, কিন্তু সুড়ঙ্গের বাইরে কাজকর্ম করতে তো কোন বাধা নেই। আমি ভাবছি সুড়ঙ্গের চারপাশের পাথরগুলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করব। হয়তো তাদের মধ্যেই সূত্র পেয়ে যাব সুড়ঙ্গের রহস্য সমাধানের।
সোৎসাহে আমি বললাম, সে তো খুবই ভাল কথা। দেখুন না পরীক্ষা করে—হয়তো সুড়ঙ্গের মধ্যে না ঢুকেই আপনি সুড়ঙ্গের রহস্য ভেদ করতে পারবেন।
দিন কয়েক বাদে একদিন উত্তেজিতভাবে ক্যাম্পে ফিরে এল নীরেন। একটা কাগজে মোড়া শিশি আমার হাতে দিয়ে সে বললে, দেখুন না, ভারি মজার জিনিস পেয়ে গিয়েছি আজ।
কাগজের মোড়ক খুলে শিশির মধ্যে কয়েক দানা পারদ দেখতে পেলাম।
পারদ কোথায় পেলেন?—বিস্মিত দৃষ্টিতে নীরেনের মুখের পানে তাকিয়ে আমি প্রশ্ন করলাম।
কোয়ার্টজের ফাটলের মধ্যে লুকিয়ে ছিল; পাথর ভেঙ্গে বের করে এনেছি,—নীরেন জবাব দিল।
—কোয়ার্টজের মধ্যে পারদ! এ যে অসম্ভব ব্যাপার!
—কোয়ার্টজের মধ্যে নয়, কোয়ার্টজের ফাটলের মধ্যে ছিল। জানেন নিশ্চয়ই যে সোনার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দানাকে টেনে বের করে আনার ক্ষমতা পারদের আছে। এই পারদ দিয়ে নিশ্চয়ই ঐ সুড়ঙ্গ থেকে খুঁড়ে আনা পাথর থেকে সোনা নিষ্কাশন করা হত। তার খানিকটা কোয়ার্টজের ফাটলের মধ্যে ঢুকে গিয়ে সংরক্ষিত হয়েছে।
ঐ সুড়ঙ্গের মধ্যে তা হলে সোনার খনি ছিল!—আমার চোখ দুটি বিস্ফারিত হয়ে ওঠে।
নীরেন বললে, ছিল নিশ্চয়ই। এই পারদই তার প্রমাণ।
নীরেনের অনুমান যে সত্য তা যাচাই করার সুযোগ কিছুদিনের মধ্যেই পেলাম। আমাদের ফরমাশ করা যন্ত্রপাতি এসে যেতেই সুড়ঙ্গের ভেতরকার অবরুদ্ধ বিষাক্ত বাতাসের মধ্যে বিশুদ্ধ বায়ু সঞ্চালন করা গেল। তারপর সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে একেবারে নীচের দিকে চলে গেলাম আমরা। সুড়ঙ্গ যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে সোনার সন্ধান মিলল। সেখানে কোয়ার্টজের সঙ্গে মিশেছিল সোনার ছোট ছোট দানা—আমাদের টর্চের আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠল।
—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন