এক ঝাঁক গল্প

দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

জ্যোতিভূষণ চাকী

বিনিপয়সার ধনুক

এক বুড়ো পথ দিয়ে যাচ্ছিল। একেবারে থুত্থুড়ে বুড়ো। কুঁজো হয়ে চলছিল সে। পিঠটা ধনুকের মতো বাঁকা। একটা ছেলে তাকে দেখে বলল, ''ও বুড়ো, তোমার ধনুকটা কত দিয়ে কিনলে?''

বুড়ো বলল, ''ওর দাম জেনে লাভ নেই ভাই, আমার বয়েসটা যখন তোমার হবে, ও ধনুক তখন তুমি বিনিপয়সাতেই পাবে।''

টেকোর টিপ্পনী

এক টেকো মাথায় একটা কালো টুপি প'রে থাকত। দূর থেকে দেখে মনে হত তার চুল আছে। কিন্তু একদিন সে যখন বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে বসে গল্প করছিল, বাতাসের এক ঝাপটায় তার টুপি গেল উড়ে। বন্ধুরা হো হো ক'রে হেসে উঠল। লোকটাও তাদের হাসিতে যোগ দিয়ে বলল, ''এতো হবেই ভায়ারা, এতো হবেই। প্রকৃতির দেওয়া আসল টুপি আমি সামলাতে পারলাম না, এ নকল টুপি সামলাব কি ক'রে?''

দিল ও দেউড়ি

এক ভিখিরী এক ধনীর দুয়োরে ধর্না দিল। খুব বড় বাড়ি, খুব বড় দেউড়ি। কিন্তু ভিখিরী পেল না কিছুই, পেল শুধু গঞ্জনা। ভিখিরীর কাকুতি-মিনতি বড় দেউড়ি বাড়িটার কারো মনেই সাড়া জাগাল না। পরের দিন ঐ ভিখিরীকে দেখা গেল ওই দেউড়িতে, তার হাতে একটি কুড়ুল। দ্বাররক্ষী শুধলো, 'কুড়ুল হাতে কেন?' ভিখিরী বলল, ''দেউড়িটার মাপ বদলাতে হবে। বাড়ির মালিকের মনের মাপ এই দেউড়ির মাপের নয়। তার মনের মাপের সেদিন যে পরিচয় পেলাম তাতে দেউড়ি কেটে ছোট না করলে চলবে কি করে?''

আগে নিজেকে সামলাও

এক বাদশা তার একটি গোলামকে গোপন কথা বলে সাবধান করে দিয়েছিলেন, ''খবরদার, কাউকে বলিস নে যেন।''

বছর খানেক বাদে কথাটা সবাই জেনে ফেলল। বাদশা গোলামের প্রাণদণ্ডের আদশ দিলেন। জল্লাদ তরোয়াল উঁচু করেছে এমন সময় একজন বাদশাকে বললেন, ''একটা কথা জিজ্ঞেস করি হুজুর। আপনি নিজের কথা নিজে গোপন রাখতে পারেন নি, আর এই সামান্য গোলাম তা গোপন রাখবে এ আপনি ভাবলেন কি ক'রে? নির্ঝরের মুখ বন্ধ করতে না পারলে নদীর মুখ বন্ধ করা কি সম্ভব?''

গোলামের প্রাণদণ্ড মকুব করলেন বাদশা।

বড়র বিপরীত

দুই বন্ধুর মধ্যে একজন খুব বড়লোক হয়ে গেল। আর একজন গরিবই রয়ে গেল। গরিব বন্ধু গেল বড়লোক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। বড়লোক বন্ধু বলল, ''কে তুমি? চিনতে পারছি না তো! কি দরকার বল।''

গরিব বন্ধু বলল, ''শুনলাম আপনি অন্ধ হয়েছেন তাই দেখতে এলাম। কথাটা আমি বিশ্বাস করিনি। এখন দেখছি ঠিকই। আহা, কবে থেকে আপনার এ অবস্থা হল?''

নম্রতা

একবার চোখ জিভকে বলল, ''দাঁত তো তোমার শত্রু। সব সময় এই শত্রুদের মধ্যে তোমাকে থাকতে হয়। এরা তো সুযোগ পেলেই তোমাকে আঘাত করবার জন্যে প্রস্তুত। এদের হাত থেকে বাঁচো কি ক'রে শুনি?''

জিভ বলল, ''নম্রতায়।''

অন্ধের বাতি

এক অন্ধ রাত্তিরে একটা বাতি হাতে নিয়ে আর একটা কলসি কাঁখে নিয়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। একটা লোক তার কাছে এসে বলল, 'আরে বেকুব, তোর কাছে যে দিন রাত্তির, আলো অন্ধকার দুই-ই সমান। তবে আর বাতি হাতে নিয়েছিস কেন?''

অন্ধ হেসে বলল, ''ভাই, এ বাতিটা আমার জন্যে নয়, তোমাদের জন্যে। তোমরা যাতে ধাক্কা দিয়ে আমার কলসিটা না ভাঙ্গো তাই এই বাতি।''

মনের জোরে

একটা পিঁপড়ে মস্ত বড় একটা পোকা বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। খোকা মাকে বলল, ''মা, ঐটুকু পিঁপড়ে অতবড় পোকা কেমন ক'রে নিয়ে যাচ্ছে? পিঁপড়ের গায়ে কি খুব জোর?''

মা বললেন, ''জোর গায়ে নয় খোকা, জোর ওর মনে। মনের জোরে পিঁপড়ে তার নিজের ওজনের দশগুণ ভারি জিনিস বয়ে নিয়ে যাচ্ছে।''

বেচারা গর্দভ

একজন গ্রামবাসীর একটা গাধা মারা গেল। সেই গাধার মাথাটা তার ক্ষেতে টাঙিয়ে রাখল সে যাতে কুলোকের দৃষ্টি ক্ষেতের উপর না পড়ে। একজন তা দেখে হেসে বলল, ''বেচারা গাধাটা সারা জীবন লাঠি খেয়েই মরেছে। যে বেঁচে থাকতে এক মুহূর্তের জন্যেও নিজেকে প্রভুর কোপদৃষ্টি থেকে বাঁচাতে পারে নি। এখন মরে গিয়ে সে কেমন করে কুলোকের দৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচাবে?''

আলসের নালিশ

একটা লোককে ছারপোকা সারা রাত ঘুমোতে দিল না। লোকটা প্রার্থনা করল, ''হে ঈশ্বর, আমাকে ছারপোকার কামড় থেকে বাঁচাও।''

কিন্তু ছারপোকা তাকে আরও বেশি করে কামড়াতে লাগল। লোকটা অতিষ্ঠ হয়ে বলল, ''হে ঈশ্বর, তুমি আমাকে ছারপোকার কামড়ের মত ছোট্ট একটা বিপদ থেকে বাঁচাতে পারলে না, বড় বড় বিপদে যে কত সাহায্য তোমার কাছ থেকে পাবো তাতো বুঝতেই পাচ্ছি।''

জবাব এল, ''যা থেকে একটু চেষ্টা করলেই তুমি রেহাই পেতে পারো এমন কাজে যদি তুমি নিশ্চেষ্ট থাকো, বড় কাজে ঈশ্বর কখনও তোমার সহায় হবেন না।''

দর্জী ঐ কলসীতে

এক শহরে এক দর্জী ছিল। গোরস্তানের কাছে তার একটা দোকান ছিল। সে খুঁটিতে একটা কলসি টাঙিয়ে রেখেছিল। কোন মৃতদেহ ঐ দোকানের কাছ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলে দর্জী ঐ কলসির মধ্যে একটা পাথর ফেলে দিত। এই ভাবে পাথর জমা হত ঐ কলসিতে। ঐ পাথর গুণে দর্জী হিসেব করত সবসুদ্ধ কত জন মরল। একবার গোনা হয়ে গেলে সে কলসি খালি করত, আবার ঐ ভাবে পাথর ফেলত। একদিন দর্জী মারা গেল। একজন লোক দর্জীর খোঁজে এল, তার মরবার সংবাদ সে পায় নি। পড়শীকে দর্জীর সংবাদ জিগ্যেস করায় সে বলল, ''দর্জী ঐ কলসিতে।''

বৃদ্ধ ও যমদূত

বৃদ্ধ শ্রমিক মাথায় বোঝা নিয়ে হাটে যাচ্ছিল। প্রচণ্ড গ্রীষ্ম, পথ নির্জন। বৃদ্ধ আর চলতে না পেরে বোঝাটা নামিয়ে পথে বিশ্রাম করতে থাকে। দারিদ্র্যের সংসারের ছবিটা তার চোখে ভেসে ওঠে। মনে মনে যমদূতকে স্মরণ করে সে। যমদূত এসে যদি তার প্রাণটা নিয়ে যেত জীবনের জ্বালা জুড়তো। এমন সময়—একি? যমদূত যে স্বয়ং হাজির! যমদূত বললেন, ''তুমি আমাকে ডেকেছিলে? কিন্তু কেন বল তো?''

শ্রমিক বলল, ''আমার এই ভারী বোঝাটা তুমি মাথায় তুলে দাও তো, হাটে যেতে হবে, অনেক বেলা হয়ে গেল।''

মশা ও মৌমাছি

এক মশা শীতের দিনে ক্ষিদের জ্বালায় অস্থির হয়ে এল এক মৌমাছির কাছে, এসে মিনতি ক'রে বলল, ''ভাই, আমার খাবার আর থাকার ব্যবস্থা করে দাও, আমি তোমার ছেলেমেয়েদের গান শেখাব। তুমি তো জানো সঙ্গীত বিদ্যেটা আমার কতখানি আয়ত্ত।''

মৌমাছি বলল, ''থাক তার দরকার নেই। আমার ছেলেমেয়েদের আমি মৌচাক গড়ার বিদ্যেটাই শেখাব। গান শিখে তারা রোজগারই বা করবে কি, বিশেষ করে তোমার মতো সঙ্গীতজ্ঞ থাকতে?''

কানে দড়ি

বাজারের মোড়ে এক জায়গায় একজন লোক চীৎকার করে আজেবাজে কি সব গালগল্প করছিল। বেশ কিছু লোক তাকে ঘিরে তার কথা শুনছিল। তারা এত মশগুল যে বাজারের থলে থেকে গরুতে ছাগলে যে কলাটা মূলাটা খেয়ে গেল সে হুঁশও তাদের নেই। এমন সময় একটা বেদে ভালুক নাচাতে নাচাতে সেখানে গেল। ভালুক দেখে সবাই সেদিকে চাইল। ভালুক বলল, ''কি দেখছ তোমরা, বেদে আমায় নাকে দড়ি দিয়ে নাচাচ্ছে তাই? আর এই গল্পে লোকটা যে তোমাদের কানে দড়ি নিয়ে নাচাচ্ছে তা দেখে আমারও খুব হাসি পাচ্ছে।''

গুরু শিষ্যে

এক পীরসাহেব তাঁর শিষ্যকে বললেন, 'আর ব'লো না বাছা, লোকের জ্বালায় অস্থির হয়ে গেলাম। রাত নেই দিন নেই, সব সময়ে দেখা করতে আসছে তো আসছেই। নিজের ব'লে আমার এতটুকু সময় নেই।''

শিষ্য বলল, ''আজ্ঞে, এক কাজ করুন গুরুজী। যে-সব লোক আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসে, তাদের মধ্যে যারা গরিব তাদের কিছু ধার দিন, আর যারা বড় লোক তাদের কাছে কিছু ধার চান। ব্যস, আর দেখতে হবে না, কেউ এসে কোন সময়ে আপনাকে বিরক্ত করবে না।''

সকল অধ্যায়
১.
মাটি
২.
ভুতের গল্প
৩.
হর্ষবর্ধনের অশ্বরোগ
৪.
সেই মেয়েটি
৫.
বিদ্যাসাগরের ছেলেবেলা
৬.
গোয়েন্দা
৭.
ইতিহাস ছাড়িয়ে
৮.
যমালয়ে জীবন্ত মানুষ
৯.
ডাকিনীর ডাক
১০.
শত্রুতা
১১.
রেলে
১২.
অতু
১৩.
এক যে ছিল বাঘিনী
১৪.
দাওয়াই
১৫.
বিশ্বের বিস্ময় হেলেন কেলার
১৬.
ফুলের বিবাহ
১৭.
মংলুফলায় সোনা
১৮.
একটি গল্প করার মত গ্রাম
১৯.
লালমণি পাখি
২০.
প্লাবন
২১.
ছাত্র-সঙ্গীত
২২.
জয়-পরাজয়
২৩.
এখন শিউলি-বেলা
২৪.
আশ্বিনে
২৫.
ছড়া
২৬.
পোড়ো কুঁড়ে
২৭.
মা (উপন্যাস)
২৮.
গোর্কির ছেলেবেলা
২৯.
সেয়ানে সেয়ানে
৩০.
সুড়ঙ্গের রহস্য
৩১.
এক ঝাঁক গল্প
৩২.
কঙ্কাল
৩৩.
নতুন করে জাগো মা
৩৪.
বেতাল-পঞ্চবিংশতি
৩৫.
ভবঘুরের চিঠি
৩৬.
নিলাম দামী চশমা
৩৭.
শরৎ এল
৩৮.
কৈশোর
৩৯.
আলোর ডাকে
৪০.
অগ্রদূত
৪১.
টাকার কথা
৪২.
সাহস চাই!
৪৩.
ভোজবাড়ীর ব্যাপার
৪৪.
আবাহনী
৪৫.
এবার পূজায়
৪৬.
বামুনের স্বর্গবাস
৪৭.
মজার ধাঁধা
৪৮.
আংটির পাথর
৪৯.
মনমঞ্জুষা
৫০.
নিখিল বঙ্গ গরু সম্মেলন
৫১.
মিকি ডাক আর দিসনে
৫২.
মেঘনাদবধ
৫৩.
চৌধুরী-বাগ
৫৪.
জাদু বিদ্যা
৫৫.
বাবার চিঠি
৫৬.
গানের কথা
৫৭.
আমার প্রথম শিকার আভিযান
৫৮.
বিশ্বক্রীয়া ওলিম্পিক
৫৯.
বাংলার বন্যা
৬০.
শরতে
৬১.
আনন্দ আশ্বিনে
৬২.
টোটকা কিছু
৬৩.
জলদি করুন দাদা
৬৪.
কিশোর বিজ্ঞানীর আসর
৬৫.
সঙ্গীতের মৃত্যু
৬৬.
ছত্রপতি
৬৭.
মেঘ ও বৃষ্টি
৬৮.
মধুপালের আবির্ভাব

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%