দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

নন্দগোপাল সেনগুপ্ত
কুচবিহার শহর থেকে অল্পদূরে বাণেশ্বর বলে একটি সুন্দর গ্রাম আছে। ছোট রেল আধ ঘণ্টাটাক লাগে সেখানে পৌঁছতে। গাঁয়ের ভেতর দিয়েই চলে গেছে স্টেশনটি।
ছোট্ট স্টেশন, কিন্তু ভারী সুন্দর। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ালে দেখা যায়, খোলা মাঠ, যা ছড়িয়ে আছে বহুদূর পর্যন্ত। ডানদিকে তাকালে যেদিন উজ্জ্বল সূর্যালোক থাকে, সেদিন দেখা যায় দিগন্তের গায়ে ধোঁয়া-ধোঁয়া পাহাড়। শুনেছি ওগুলো হিমালয়ের চূড়া।
স্টেশন থেকে বাঁ হাতে লাইন ধরে কিছুটা গেলে পাওয়া যায় ছোট্ট একটা নদী, তার নাম বুনতি। সামান্য জল, কিন্তু তাতেই সর্বদা ঝম ঝম ঝর ঝর শব্দ হচ্ছে। কেন জান? ভীষণ তোড় জলের এবং তা রাশিরাশি নুড়ি ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে স্রোতের বেগে। লোহার পুলে দাঁড়িয়ে দেখতে বেশ লাগে।
এই যে বাণেশ্বর গ্রাম, সবাই বলেন, এ নাকি পুরাণে যাঁর কথা আছে সেই বাণ রাজার রাজধানী ছিল এক সময়। ঊষাহরণ এবং তা নিয়ে যুদ্ধবিগ্রহ যা হয়েছিল, তা নাকি হয়েছিল এখানেই, কিংবা এরই কাছাকাছি কোন জায়গায়।
মোটের ওপর পুরাণের কাহিনী যাই হক, গ্রামটি পুরান। আর এর অভিনবত্ব কোথায় এবং কি জান? সব বাড়ীই কাঠের তৈরি এবং সব বাড়ীই মাটি থেকে খানিকটা উঁচু করে বানান মাচার ওপর দাঁড় করান। গ্রামের কেন্দ্রস্থলে আছে বৃহৎ এক শিবের মন্দির এবং শিবের নাম বাণেশ্বর। বুঝতেই পারছ গ্রামটির নামকরণ হয়েছে এই দেবতার নামে।
স্থানীয় লোকরা বলেন দেবতা খুব জাগ্রত। তাঁর নামে পাঁঠা মানত করলে যে ইচ্ছা মনে নিয়ে তা করবে, তা পূরণ হবেই। তোমরা হয়ত বলবে শিবের কাছে কোথাও পাঁঠাবলি হয় না ত। অন্য জায়গায় হয় না ঠিকই, কিন্তু বাণেশ্বর পাঁঠা ভালবাসেন।
তবে মজা জানত, পাঁঠা তাঁর সামনে হাঁড়িকাঠে বন্দী করে খাঁড়া দিয়ে কাটা হয় না। মন্দিরের দেওয়ালে একটা হুকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় পাঁঠাটি, তারপর তার মাথা লক্ষ্য করে ভারী পাথর ছুঁড়ে মারা হয় তাকে।
আদিবাসীদের মধ্যে দেবতার সামনে বনমোরগ পাথর দিয়ে ছেঁচে মারার বা জ্যান্ত আগুনে ফেলে পোড়ানোর রীতি দেখেছি। বাংলাদেশে আমাদের সমাজেও যে এই রীতি চলিত আছে, তা প্রথম জানতে পারি বাণেশ্বরে গিয়ে। কত যে জানার জিনিস আছে পৃথিবীতে!
আমরা বাঙালীরা বৈদিক আর্যজাতির সন্তান নই তো। আমরা পুরান দ্রাবিড় মুঙ্গল গোষ্ঠীর মানুষ এবং শিব ও শক্তি গোড়ায় ছিলেন আমাদেরই দেবতা। তারপর আর্যদের সঙ্গে যখন আমাদের যোগাযোগ হয়েছে, তখন আমাদের দেবদেবীর যেমন তাঁরা নিয়েছেন, তাঁদের আচার ব্যবহার তেমনি নিয়েছি আমরা।
এখন আর আলাদা করে কিছু ধরার উপায় নেই। সবাই মিলেমিশে এক হয়ে গেছি আমরা। তবু এখানে ওখানে কিছু কিছু আগের চিহ্ন এখনো গা ঢাকা দিয়ে আছে, যা চোখে পড়লে হঠাৎ চমক লাগে। বাণেশ্বরে পাঁঠাবলির এই নিজস্ব ধরনটা তেমনি একটা ব্যাপার। হয়ত আসাম এবং মণিপুরেও এই রকম জিনিস আরো কিছু কিছু দেখা যাবে।
মোটের ওপর বাণেশ্বরে শিবের কাছে পাঁঠাবলি হয় এইটুকু জেনে রাখ। কিন্তু এই সব নয়, আরো একটা ব্যাপার আছে যা সমান কৌতূহলজনক। কি জান সেটা? শিবঠাকুরের নিজস্ব একটা পুকুর আছে, তার ধারেই তাঁর মন্দির এবং মন্দিরের তলা দিয়ে বানান সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে বর্ষার সময় জল এসে শিবের মাথা ধুইয়ে দিয়ে যায়। কেউ কেউ বলেন শুধু বর্ষা নয়, সব ঋতুতেই নাকি জল আসে এবং রোজই প্রাত:স্নান করেন শিব এই জলে।
কিন্তু এটাই সবচেয়ে বড় খবর নয়। সব চেয়ে বড় খবর হল শিবঠাকুরের প্রতিপালনে একদল মোহন আছে এবং তাদের সম্বন্ধে স্থানীয় নরনারীর শ্রদ্ধা ভক্তির শেষ নেই। কিন্তু মোহন কি তাই বলা হয় নি। মোহন হল একদল কচ্ছপ, যা ওই শিবপুকুরে মনের আনন্দে বাস করে চলেছে বছরের পর বছর।
এরা ডাঙায় উঠে রোদ পোহায়, জলের ধারে ধারে ঘোরে লোকের হাত থেকে মুড়ি, খৈ ও ময়দার ডেলা খাবে বলে। কেউ ওদের ধরেন না, মারেন না। দুটোই নিষেধ। একবার কোন বাইরের মানুষ না জেনে একটা ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন খাবার জন্যে। তাঁর এজন্যে রীতিমত প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছিল।
ঐ মরা মোহনের খোলা মাথায় নিয়ে গোটা গ্রাম ঘুরতে হয়েছিল তাঁকে এবং শিবের ঘরে একশোটা বাতি জ্বালাতে ও পুরো একদিন কিছু না খেয়ে একটানা শিবনাম জপ করতে হয়েছিল। এ ছাড়া জরিমানাও দিতে হয়েছিল টাকা পাঁচেক। হবে না? শিবের আশ্রিত মোহন মেরে মাংস খাওয়া ত যা তা ব্যাপার নয়!
মোহনগুলো সম্বন্ধে রকমারি গল্প চলিত আছে। কেউ বলেন এক ভৈরব একবার এসে কদিন মন্দিরের ধারে গাছতলায় বাস করেছিলেন। তাঁর ঝোলায় ছিল সিঁদূর-মাখান একটা মা-কচ্ছপ। সেটা জলে ছেড়ে দিয়ে যান তিনি যাবার সময়। আজকের মোহনরা সব তার কাচ্চা বাচ্চা। কেউ বলেন, বহু দূর নদী থেকে হাঁটতে হাঁটতে ওরা এসে পুকুরে বাসা বেঁধেছে। কেন এসেছে কেউ জানে না।
কারো মতে ওদের বয়স পাঁচশো বছর, কারো মতে দুশো বছর। আমি ঠিক জানি না কত। তবে মন্দিরটা খুব পুরান, আগেকার ঢঙে তৈরি, আর পুকুরের ঘাট ও পৈঠেগুলো দেখলেই মনে হয়, তাও খুব পুরান। তার বাসিন্দা মোহনরা তাই পুরান হতে পারে। যাই হোক, এই মোহনরা কিন্তু নদীর কচ্ছপ, পুকুরে ও বাঁশ বনে যে মেটে কচ্ছপদের দেখা যায়, তারা নয়।
এই জাতের কচ্ছপরা কতদিন বাঁচে ঠিক জানি না। সমুদ্রের কচ্ছপরা অবশ্য দু-তিনশো বছর বাঁচে। আলিপুর চিড়িয়াখানায় সব চেয়ে বড় যে গজকচ্ছপটি আছে, তা সেন্ট হেলেনা দ্বীপে ছিল। নেপোলিয়ান ঐ দ্বীপে যখন বন্দী, তখন নাকি এর পিঠে বসতেন। তিমি কুমীরও এই রকম দীর্ঘজীবী হয়। শুনেছি কায়রো চিড়িয়াখানায় আছে টিমসা নামে তিনশো বছরের বুড়ো এক কুমীর।
কিন্তু থাক ও কথা, বাণেশ্বরের কথায় আসি আবার। বাণেশ্বর চমৎকার জায়গা। ভীষণ বৃষ্টি হয় এখানে, তাই মাঠ-ঘাট বন-জঙ্গল সারা বছর সবুজ সতেজ ঝলমলে দেখায়। কত যে পাখী আসে নানা দিক নানা দেশ থেকে, তা গুণে শেষ করা যায় না। জঙ্গলে খরগোস ও সজারু আছে, অজগর আছে, আছে ভীষণ ভীষণ বিষধর সাপ। কখনো কখনো হাতী এবং মহিষও চলে আসে জলপাইগুড়ির জঙ্গল থেকে।
তখন লোকেরা কি করেন জান? মশাল জ্বালিয়ে, কানেস্তারা বাজিয়ে তাঁরা তাড়া করেন তাদের। মহিষরা সহজে ভয় পায় না, শিং বাগিয়ে তেড়ে আসে। হাতীরা কিন্তু বেশ ভীতু। তবে হ্যাঁ, কায়দা মত পেয়ে গেলে শুঁড়ে উঠিয়ে আছাড়ও দেয় তারা একআধজনকে। অবশ্য তেমন ব্যাপার বেশী ঘটে না।
হাতী আর মহিষ খাবার খুঁজতে খুজতেই এসে হাজির হয় শীতকালে। আর শীতকালেই আসে বাঘ এবং হুঁড়ারও। সরষে ক্ষেতে গা মিশিয়ে বসে থাকে বাঘ, হঠাৎ বুঝতে পারা যায় না। কাছে গোরু বাছুর এসে পড়লেই লাফ দিয়ে তার উপর পড়ে এবং ধরে নিয়ে গভীর বনে চলে যায়। কদাচিৎ বাঘে ও বুনো মহিষে যুদ্ধ বাধলে সে হয় একটা দেখবার মত দৃশ্য। অনেকে দেখেছেন।
এমনি দেখার জিনিস হল অজগরের শিকার ধরা। বোধ হয় জান যে হরিণ ছাগল বা ভেড়া ধরে সরাসরি গিলে ফেলে অজগর। তারপর কি করে জান? একটা গাছে নিজের শরীরটা কুণ্ডলি করে জড়ায় ওই জন্তুটার হাড়গোড় ভাঙার জন্যে। সেটা হলেই পড়ে পড়ে ঘুমোয় তিন চার পাঁচ দিন। এই সময় বুনোরা টের পেলে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। তারা মাংস খায় কিনা অজগরের।
এক এক সময় কি হয় জান? বড় শিংওয়ালা কোন জন্তু গিলেছে অজগর, গিলতে গিলতে সবটা পেটের মধ্যে নিয়েছে, শুধু কষার দুধারে আটকে গেছে দুটো শিং ...ঐ অবস্থাতেই অসাড় হয়ে পড়ে থাকে অজগর আর আস্তে আস্তে হজম হতে থাকে গিলিত জন্তুটা। তখন শিং দুটো কাছাকাছি হয় এবং তা টুক করে গিলে ফেলে অজগর। কোন কোন সময় এই শিঙের জন্য শেষ পর্যন্ত মরতেও হয় তাকে।
কোচবিহার কলকাতা থেকে প্লেনে যেতে লাগে মাত্র দু-ঘণ্টা, আর কোচবিহার থেকে ট্রেনে বাণেশ্বর যেতে লাগে আধ ঘন্টা। সুবিধা করতে পারলে ধাঁ করে একদিন ঘুরে আসতে পার তোমরা। শুধু ওইখানে কেন? ওখান থেকে আলিপুরদুয়ার হয়ে রাজাভাতখাওয়া এবং জণ্ডিয়া ও বক্সা পাহাড়ে যাওয়া যায়। যাওয়া যায় কালজানি ও হাসিমারায়, আর যাওয়া যায় তোরসা নদী পেরিয়ে ভুটানের প্রথম শহর ফুন্টসুলিঙ।
পাহাড় জল জঙ্গলে অপরূপ এই জায়গা গুলো। বন থেকে আসছে অবিরাম ঝিঁঝির রীরী শব্দ, নদী থেকে আসছে ঝম ঝম ঝর ঝর শব্দ, আকাশ থেকে আসছে পাখীর আওয়াজ...কক কক পিপ পিপ উই উই! মন সত্যিই উদাস হয়ে যায়। লোকালয়েও সন্ধ্যা হলে শোনা যায় ভাওয়াইয়া গান, যা সমান উদাস করা।
বাংলা দেশেরই উত্তরাংশের একটা জায়গা, অথচ তার খবর রাখি না আমরা অনেকেই। তাই আমার ভাল-লাগা এই সুর ও স্বপ্নে ভরা সুন্দর গ্রাম বাণেশ্বরের কথা বললাম তোমাদের আজ।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন