দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

ধীরেন্দ্রলাল ধর
খুন, তদন্ত ও গ্রেপ্তার থেকেই শুরু।
বিখ্যাত ধনী কয়েক দিনের জন্য শিমুলতলায় গিয়েছিলেন হাওয়া বদলাতে। বড়দিনে সেখানে দিব্যি আড্ডা জমে উঠেছিল প্রতিবেশীদের নিয়ে। ধনী গৃহে আড্ডা জমানোর সুবিধা আছে। চা-বিস্কুট তো আছেই, তার সঙ্গে উপরিও আছে ফুলকপির ফুলুরি, ক্রিসমাস কেক, পাঁপর ভাজা, আর নিয়মিত খবরের কাগজও পড়তে পাওয়া যায়।
মুকুন্দবাবুর আড্ডায় আরেকটি আকর্ষণ ছিল ব্যাডমিন্টন খেলা, এবং খেলার শেষে সন্ধ্যার পর মুকুন্দবাবুর কন্যার কীর্তন গান।
যে একবার মুকুন্দবাবুর আড্ডায় এসে পড়তো, সে আসতো রোজই। বাইরে এতোগুলো আকর্ষণ এক সঙ্গে এড়িয়ে যাওয়া সহজ নয়।
পয়লা জানুয়ারী এই মজলিশ জমে উঠেছিল ভালই। মুকুন্দবাবু সবাইকে নববর্ষের নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন—তিনটে থেকে ব্যাডমিন্টন খেলা, ছটার সময় গানের আসর আর আটটার সময় ভোজন।
গানের আসরের শেষে মুকুন্দবাবু একবার ঘর থেকে উঠে গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ আর তাঁর দেখা নেই। শেষে রঞ্জন, তারপর সুনন্দা গেল তাঁকে ডাকতে। দোতলায় মুকুন্দবাবুর ঘর ভিতর থেকে বন্ধ। সুনন্দা ডেকে ডেকে সাড়া পেল না। চাকরকে ডেকে বললো,—হরি, দেখ তো কি ব্যাপার?
দরজায় ঠেলা দিয়ে কোন সাড়া না পেয়ে, হরি দরজায় ধাক্কা দিয়ে খিল ভাঙলো; দেখা গেল মুকুন্দবাবু রক্তাক্ত দেহে মেঝের উপর পড়ে আছেন। তাঁর গলার অর্ধেকটা কাটা। ছোরাখানা পড়ে আছে পাশেই।
সবাই ত্রস্ত হয়ে উঠলো। সুনন্দা জ্ঞান হারাল।
হরি পুলিস ডেকে আনলো। পুলিস সব দেখে শুনে, তদন্ত করে রঞ্জন রায়কে গ্রেপ্তার করলো।
রঞ্জন এম-এ পাস করে সবে একটি কলেজে অধ্যাপক হবার জন্যে তদ্বির শুরু করেছে, বড়দিনে বন্ধুর বাড়ীতে এসেছিল বেড়াতে। পুলিস তাকে ধরে চালান করলো।
পুলিস মামলা সাজিয়ে ফেললো, বিচার শুরু হয়ে গেল।
রঞ্জনের বন্ধু জীবন সবে ওকালতি শুরু করেছিল। উকিল সভায় সখের গোয়েন্দা বলে সুধীরবাবু প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। জীবন তাঁকে এসে ধরলো,—আপনি আমার বন্ধুর হয়ে লড়ুন। আমি জানি সে নির্দোষ।
সুধীরবাবু এই ধরনের মামলাই চান, রাজী হয়ে গেলেন।
এইখান থেকেই শুরু হলো গল্প।
সরকারী পক্ষের উকিল জগদীশবাবু মামলার ভূমিকা আদালতে উপস্থাপিত করলেন। তিনি বললেন—কলকাতার ব্যবসায়ী মুকুন্দ চৌধুরী কয়েক দিনের জন্য শিমুলতলায় হাওয়া বদলাতে যান, সেখানে ইংরেজী নববর্ষের পয়লা জানুয়ারী তারিখে সন্ধ্যার পর তিনি খুন হন। সেদিন তাঁর বাড়ীতে নববর্ষের এক প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। কয়েকজন স্থানীয় প্রতিবেশী তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বিকালে ব্যাডমিন্টন খেলার ব্যবস্থা হয়েছিল, তারপর কীর্তনের আসর জমে। গানের শেষে তিনি একবার উঠে যান। তারপর তাঁর ফিরে আসতে বিলম্ব দেখে, তাঁকে ডাকতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর শয়ন কক্ষে তিনি রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছেন, একখানি ছুরিকা দিয়ে তাঁর কণ্ঠনালী ছিন্ন করা হয়েছে। পুলিস ঘটনাস্থলে গিয়ে যথাবিহিত তদন্ত করে। উপস্থিত সকলের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে পুলিস যথেষ্ট প্রমাণ পেয়েছে যে, এই হত্যাকাণ্ড রঞ্জন রায়ের কাজ—রঞ্জন রায় কোন রকম ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্যই এই খুন করেছে।
ম্যাজিস্ট্রেট জিজ্ঞাসা করলেন—ব্যক্তিগত স্বার্থ কি, সে সম্পর্কে আপনারা কিছু জানেন?
জগদীশবাবু বললেন—মুকুন্দবাবুর পাকিস্তানে যেসব সম্পত্তি আছে, তার মধ্যে একটা হোসিয়ারী মিল অন্যতম। পাকিস্তান সরকার ঐ সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছেন। তবে সেই সব সম্পত্তির একটা মূল্য দেবার কথা চলছে। এবং হোসিয়ারী মিলটার জন্য শীঘ্রই তাঁর দুলাখ টাকা পাবার কথা ছিল। সেই সব মালিকানার কাগজপত্র তিনি সঙ্গেই রেখেছিলেন। সকালে তিনি সেইগুলো দেখাশুনা করেন। তাঁর ঘর থেকে সেইগুলো খোয়া গেছে। পুলিস সন্দেহ করছে, ওই টাকাটা আত্মসাৎ করাই এই হত্যার মূল কারণ। তবে সে সম্পর্কে যথেষ্ট প্রমাণ না থাকায় পুলিস সে দিকটা ছেড়ে দিয়ে এখন শুধু হত্যার ব্যাপারটাই আদালতে উপস্থিত করতে চায়। পুলিস মনে করে, আসামীর উপযুক্ত শাস্তি বিধান হলে সেই দলিলপত্র যে উদ্দেশ্যে অপহৃত হয়েছে তা ব্যর্থ হবে।
সরকারী উকিল তার বক্তব্য শেষ করলে, ম্যাজিস্ট্রেট আসামী পক্ষের উকিলকে আহ্বান করলেন—আপনার কিছু বলার আছে?
সুধীরবাবু বললেন—আমি এখন শুধু একটি কথাই বলবো যে, একজন নিরপরাধ উচ্চশিক্ষিত যুবককে পুলিস শুধু সন্দেহের বশে অযথা হয়রানি করছে, আমার মক্কেল রঞ্জন রায় নির্দোষ। সাক্ষ্য প্রমাণাদির সাহায্যে আমি সেকথা প্রমাণ করার চেষ্টা করবো।
এবার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হলো।
প্রথম সাক্ষী মুকুন্দবাবুর কন্যা সুনন্দা চৌধুরী।
সুনন্দা বললো—বাবার শরীর খারাপ ছিল, তাই দিন পনেরোর জন্য শিমুলতলার বাড়ীতে আমরা থাকার জন্য গিয়েছিলাম। বাবা মেলামেশা করাটা খুব বেশী পছন্দ করতেন। সেইজন্য পাড়াপড়শীদের সঙ্গে আলাপ হলেই বাড়ীতে আসার নিমন্ত্রণ করতেন। সেদিনও বাড়ীতে যাঁরা এসেছিলেন সকলেই প্রতিবেশী। নববর্ষ বলে একটা খেলাধূলা ও গানের আসর বসানোর আয়োজন হয়েছিল। গানের শেষে বাবা একবার উঠে যান, তাঁর আসতে দেরি হচ্ছে দেখে রঞ্জনবাবু তাঁকে ডাকতে যান, ফিরে এসে বলেন, বাবার ঘর ভিতর থেকে বন্ধ, ডেকে কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। আমি তখন তাড়াতাড়ি রঞ্জনবাবুর সঙ্গে উপরে উঠে যাই। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকা হয়। আলো জ্বেলে দেখি...
সুনন্দার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো; সে কেঁদে ফেলল।
জগদীশবাবু প্রশ্ন করলেন—তখনই কি আপনারা পুলিসে খবর দেন।
রঞ্জনবাবু তখনই আমাদের মালী হরিকে থানায় পাঠান।
—পুলিস কতক্ষণ পরে আসে? ততক্ষণ সেই ঘরে কে ছিল?
—সেসব কথা স্পষ্ট করে আমি ঠিক বলতে পারবে না। হরি ও রঞ্জনবাবু আমাকে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দেন। এঘরে কি হচ্ছে, তা আমি তখন দেখিনি।
—আপনার কাকে সন্দেহ হয়?
—আমি তো কাউকেই ভাল চিনি না। শিমুলতলাতেই ওঁদের সবাইকার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। দশ দিনের বেশী কেউই আমাদের পরিচিত নন। সকলেই তো ভদ্রলোক বলে জানি।
—এঁদের মধ্যে আপনার বাবার সঙ্গে সবচেয়ে বেশী অন্তরঙ্গতা কারও ছিল?
—বাবা রঞ্জনবাবুকেই বেশী পছন্দ করতেন।
—এর কোন বিশেষ কারণ ছিল কি?
—কারণ ছিল। রঞ্জনবাবু থাকেন ঠিক পাশেই একখানা বাড়ী পরে। তাই বাবা দুপুরে ওকে ডেকে পাঠাতেন, ক্রসওয়ার্ড পাজল-এ শব্দ বসানোর ব্যাপার নিয়ে। পাজল সমাধান করাতে ছিল বাবার বড় ঝোঁক। আর রঞ্জনবাবু ইংরাজির এম.এ., বাবা ওঁর ইংরাজি শব্দ চয়নের প্রশংসা করতেন।
—হত্যাকাণ্ডের দিনও দুপুরে রঞ্জনবাবু এসেছিলেন?
—হ্যাঁ। সেদিন বিকালে রঞ্জনবাবু আর বাড়ী গিয়ে জামাকাপড় বদলাবার অবকাশ পাননি। বাবা কিসের যেন একটা খসড়া তাঁকে দেখতে দিয়েছিলেন। সেইটা রঞ্জনবাবু সারা বিকাল ধরে পড়েন। শেষে পড়ে যখন তিনি ফেরত দেন, তখন বাবা সেইটে রাখতেই ঘরে গিয়েছিলেন, এবং তখনই খুন হন।
—ঘর থেকে যখন তাঁর ফিরতে দেরি হলো, তখন রঞ্জনবাবুই তাঁকে ডেকে আনতে গিয়েছিলেন এবং তিনিই এসে বলেন যে, ঘর ভিতর থেকে বন্ধ?
—হ্যাঁ।
—আপনাদের সেই ঘরের দরজায় কি এমন ব্যবস্থা আছে যে, কোন লোক বাইরে বেরিয়ে এসে দরজা টেনে বন্ধ করে দিলে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে?
—না, সে ব্যবস্থা নেই, তবে একবার সে রকম হয়েছিল, কেমন করে যেন ছিটকিনি পড়ে গিয়েছিল।
—আপনারা সেই দোষ সারিয়েছিলেন?
—না, কিছুই করা হয়নি।
—সে দোষ তো আর একবার ঘটতে পারে?
—পারে।
—তাহলে যদি কেউ সেইভাবে বেরিয়ে এসে দরজা টেনে দেয় তো দরজা ভিতর থেকে বন্ধ হতে পারে?
—পারে।
—এবং আপনার বাবার ঘরে শেষ বার রঞ্জনবাবুই গিয়েছিলেন?
—হ্যাঁ।
—আর আপনার কাছে কিছু জিজ্ঞাস্য নেই।
সুনন্দা সাক্ষীর কাঠগড়া থেকে নেমে গেল।
এবার দ্বিতীয় সাক্ষী প্রভাসকুমার মিত্র।
প্রভাস এম. এ.-র ছাত্র। এখানে কাকার বাড়ী খালি পড়ে আছে, এক সহপাঠীকে নিয়ে বড়দিনের ছুটি কাটাতে এসেছে। মুকুন্দবাবুর সঙ্গে প্রথম দিনেই আলাপ হয়। ব্যাডমিন্টন খেলার আসর দেখে সে প্রতিদিন বিকালে মুকুন্দবাবুর বাড়ীতে আসে। ব্যাডমিন্টন খেলার দিকে তার ঝোঁক আছে। ঘটনার দিনেও সে মুকুন্দবাবুর বাড়ীতে বসে ছিল।
জগদীশবাবু প্রশ্ন করলেন—মুকুন্দবাবুর নামতে দেরি হচ্ছে দেখে তাঁকে কে ডাকতে গিয়েছিলেন?
—রঞ্জনবাবু।
—একা?
—একা।
—কতক্ষণ পরে তিনি ফিরে এসেছিলেন?
—তা বলতে পারি না, পাঁচসাত মিনিট হবে।
—খাবার ঘর থেকে মুকুন্দবাবুর শোবার ঘর অবধি যেতে কতক্ষণ লাগতে পারে?
—আমি কখনও উপরে যাইনি, তবে ঠিক খাবার ঘরের উপরেই সেই ঘর বলে জানি।
—ফিরে এসে রঞ্জনবাবু আপনাদের ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন?
—আমাদের ডাকেন নি। তিনি সুনন্দা দেবীকে এসে বলেন, 'দরজা বন্ধ, সাড়া পাচ্ছি না।' সুনন্দা দেবী তখন উপরে যান, উপরে দরজায় ধাক্কা মারার শব্দ শোনার পর আমরাও উপরে যাই।
—কে দরজা খুলে প্রথম ঘরে ঢোকে?
—রঞ্জনবাবু, ঘরে ঢুকে আলো জ্বালেন।
—রঞ্জনবাবুকে আপনি আগে চিনতেন?
—বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রমহলে ওঁর নাম শুনেছি। ব্যাডমিন্টন খেলায় দুবার তিনি বিশ্ববিদ্যালয় 'ট্রফি' পেয়েছেন। টুর্নামেন্টে ওকে দেখেছি, কিন্তু মৌখিক পরিচয় হয়নি।
—মুকুন্দবাবুর বাড়ী ছাড়া আর কোথাও ওঁকে আপনি দেখেছেন?
—হ্যাঁ, দুতিন দিন আগে একদিন রাত্রে ওকে দেখেছিলাম মুকুন্দবাবুর পাশের বাড়ী থেকে বেরুতে। তবে কোন কথাবার্তা হয়নি।
—সে বাড়ীতে কে থাকে?
—বাড়ীটা খালি রয়েছে, শুনেছি ভাড়া দেওয়া হবে।
—সে বাড়ীটা কি মুকুন্দবাবুর বাড়ীর সঙ্গে লাগাও?
—পাশাপাশি।
—সেই খালি বাড়ীতে রঞ্জনবাবু কেন গিয়েছিলেন পরে কিছু বলেছিলেন?
—না, আমি সে কথা জিজ্ঞাসা করিনি। খেলা নিয়েই আমাদের কথা হতো।
—রঞ্জনবাবুকে আপনার কেমন মানুষ, মনে হয়?
—ভাল লোক, স্পোর্টসম্যান, কোন নেশা নেই, এম. এ. পাস, আদর্শ ছেলে।
দ্বিতীয় সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষ হল।
এবার তৃতীয় সাক্ষী সুধীন্দ্রনাথ। প্রভাসের সহপাঠী। সুধীন নতুন কোন কথাই বলতে পারলো না। দু বন্ধু সব সময় একত্রে ঘোরাফেরা করে; কাজেই প্রথম বন্ধুর যা অভিজ্ঞতা, দ্বিতীয়েরও তাই।
তারপর চতুর্থ সাক্ষী অধ্যাপক খগেন ঘোষ।
অধ্যাপক বললেন, যে, পূর্ববঙ্গে তিনি এক কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। বাংলা ভাগ হবার সময় হিন্দুস্থানে চলে আসেন। দমদমায় তাঁর বাড়ী আছে, সেইখানেই তিনি থাকেন। মুকুন্দবাবুর সঙ্গে তাঁর ছাত্রজীবনের পরিচয়। ইস্কুল ও কলেজে একসঙ্গে পড়েছেন। কিছুদিন যাবৎ পেটের গোলযোগে তিনি ভুগছেন। সেই সূত্রে তিনি শিমুলতলায় যান হাওয়া বদলাতে। এখানে মুকুন্দর সঙ্গে দেখা। দীর্ঘকাল পরে সহপাঠীকে পেয়ে দিনগুলি মধুর হয়ে উঠেছিল, কিন্তু কপালে তা সইল না।
জগদীশবাবু প্রশ্ন করলেন—মুকুন্দবাবুর সঙ্গে আপনার অন্তরঙ্গতা বাল্যকাল থেকে, তাহলে মুকুন্দবাবুর অনেক ব্যক্তিগত কথা আপনি জানেন?
খগেনবাবু বললেন—ব্যক্তিগত গোপন কথা তো কিছু ছিল না, সাধারণ মানুষের সহজ জীবন। মুকুন্দের সঙ্গে আমার অনেক ক্ষেত্রে মিল ছিল। সেও বিপত্নীক, একটি মাত্র কন্যা, সুনন্দা। আমার স্ত্রীও একমাত্র কন্যা রেখে মারা গেছেন। তবে মুকুন্দের আর্থিক অবস্থা আমার চেয়ে অনেক ভাল ছিল। রংপুরে তার মস্ত গেঞ্জি মোজার কারখানা ছিল, যা থেকে বছরে অন্তত: ত্রিশ হাজার টাকা পেতো। পাকিস্তান হবার পর সেই টাকা হাতছাড়া হয়ে যেতেই সে একটু কাহিল হয়ে যায়। তবে কয়লা খনির কিছু শেয়ার কেনা ছিল বলে, সে বিশেষ ধাক্কা খায়নি। আর মানুষ তো মাত্র দুটি—বাপ আর বেটি।
—মুকুন্দবাবুর কোন শত্রু ছিল বলে আপনি জানেন?
—না। সরল সোজা মানুষ, শত্রু থাকবে কেন?
—মুকুন্দবাবু এইভাবে খুন হবার কি কারণ থাকতে পারে?
—আমি সেইটাই কদিন ধরে ভেবেছি। কদিন আগে সে বলেছিল পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের চুক্তি হবার পরে হোসিয়ারী মিলের দামটা সে পাবে, দু লাখ টাকা ধার্য হয়েছে। সেই সব দলিল নিয়ে সে শিমুলতলায় বসে ফাইল ঠিক করছিল। সে ফাইলটার আপনারা কোন খোঁজ পেয়েছেন? তার মধ্যে এই হত্যা রহস্যের কোন ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে মনে হয়।
—মুকুন্দবাবুর বাড়ীতে যাঁরা যাওয়া আসা করতেন তাঁদের কাউকে আপনার সন্দেহ হয়?
—না, সবাই তো সজ্জন, সুশিক্ষিত। এঁদের কেউ যে খুন করতে পারেন তা তো ভাবা যায় না।
—রঞ্জনবাবু সম্পর্কে আপনার কি ধারণা?
—ভাল ছেলে, বিলাতে গিয়ে ডকটরেট হতে চায়।
—হত্যাকাণ্ডের দুদিন আগে রাত নটা নাগাদ মুকুন্দবাবুর পাশের বাড়ীর বাগান থেকে বেরিয়ে আসতে যাকে আপনি দেখেছিলেন, সে কে?
—অন্ধকারে তার মুখ দেখতে পাইনি, তবে চালচলন দেখে মনে হয়েছিল সে রঞ্জনবাবু।
—একা তিনি বাগান থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন?
—তাই তো দেখেছিলাম।
—সে বাড়ী তো ভাড়া দেবার জন্য খালি পড়ে আছে।
—হ্যাঁ।
—পরে আপনি রঞ্জনবাবুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কিছু?
—করেছিলাম। সে বলেছিল, 'একটা ফুল তুলতে বাগানে ঢুকেছিলাম।'
—সে কথা আপনি বিশ্বাস করেছিলেন?
—ফুলের বাগানে ফুল তুলতে যাওয়ায় অবিশ্বাস করার কি আছে?
—মুকুন্দবাবুর বাগানে ফুলগাছ নেই?
—আছে।
—নিজের জনের ঘরে ফুল থাকতে অন্য বাগানে লোক ফুল তুলতে যাবে কেন?
—ওটা নিছক খেয়ালের ব্যাপার বলে আমার মনে হয়। এখানেই খগেনবাবুর সাক্ষ্য শেষ হলো।
এবার পঞ্চম সাক্ষী খগেনবাবুর কন্যা শিপ্রা ঘোষ।
শিপ্রা কলেজে পড়ে, পিতার সঙ্গে শিমুলতলায় গিয়েছিল।
রাত্রে রঞ্জনকে বাগান থেকে বেরিয়ে আসতে সে দেখেছে, তবে মুখ দেখেনি। খগেনবাবুর মতই তার অভিজ্ঞতা।
ষষ্ঠ সাক্ষী অতুল দত্ত। কয়লা খনির ম্যানেজার। মুকুন্দবাবু তাঁকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন শিমুলতলায়। মুকুন্দবাবুর সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা চলছিল, পাকিস্তান থেকে টাকাটা পেলেই তিনি লাখ খানেক টাকা তাঁর খনিতে শেয়ার কিনবেন।
জগদীশবাবু প্রশ্ন করলেন—এই শেয়ার কেনা নিয়ে রঞ্জনবাবুর সঙ্গে কি আপনার কোন বিতর্ক হয়?
—হ্যাঁ। রঞ্জনবাবু বলেছিলেন, লাখ টাকা যদি খাটাতেই হয় তো নিজস্ব কোন ব্যবসা পত্তন করাই ভাল। দরকার হলে গবর্মেন্ট থেকে টাকা ধার পাওয়াও যেতে পারে।
—এ সম্পর্কে মুকুন্দবাবু কিছু বলতেন?
—না, তিনি শুনে একবার বলেছিলেন, 'এ বয়সে আমি আর খাটতে পারবো না।' রঞ্জনবাবু বলেন, 'আমি খাটবো।' মুকুন্দবাবু শুধু হাসেন। তার ফলে রঞ্জনবাবু আমার উপর বিরূপ হয়ে উঠেছিলেন, সেটা তাঁর ব্যবহারে আমি বুঝতে পারতাম।
সাক্ষ্য এইখানেই শেষ হলো।
জগদীশবাবু এবার জজকে বললেন—রঞ্জন রায়কে আমি এই হত্যাকাণ্ডের আসামী বলে অভিযুক্ত করেছি দুটি প্রমাণের উপর। এবার আসামীকে আমি জেরা করতে চাই।
জর্জের নির্দেশে আসামী রঞ্জনকে পুলিস কাঠগড়ায় নিয়ে এলো।
জগদীশবাবু একখানি রুমাল দেখিয়ে প্রশ্ন করলেন—এই রুমালখানি কি আপনার?
রঞ্জনবাবু রুমাল হাতে নিয়ে দেখলেন, রুমালের কোণে একটি লাল গোলাপ ফুল আঁকা আছে। তিনি বললেন,—হ্যাঁ, এই রুমাল আমার।
—মুকুন্দবাবুর পাশের বাড়ীর বাগানে এই রুমাল পাওয়া গেছে। সেখানে রুমালখানি কি করে গেল, সে কথা আপনি বলতে পারেন?
—একদিন সন্ধ্যার পর মুকুন্দবাবুর দোতলার ঘরে বসে আমি একখানি দলিলের লেখা দেখছিলাম, এমন সময় বাইরের বারান্দায় একটা শব্দ হয়। আমি বারান্দায় বেরিয়ে এসে দেখি, একটি লোক বারান্দা থেকে লাফিয়ে পিছনের বাগানে পড়লো। আমিও সঙ্গে সঙ্গে তাকে তাড়া করি। কিন্তু সে পালিয়ে যায়। তখনই বোধ হয় রুমালখানি পড়ে গিয়ে থাকবে।
—পরে আপনি রুমালের খোঁজ করেন নি?
—খুঁজেছিলাম কিন্তু পাইনি।
—এই রুমালের এক কোণে কয়েক ফোঁটা রক্তের দাগ আছে, এ রক্ত রুমালে কোত্থেকে এলো জানেন?
—না। রুমালে রক্ত লাগার কোন কারণ নেই।
এবার জগদীশবাবু রুমালখানি কোর্টে জমা দিলেন। তারপর বের করলেন একখানি ছোরা, রঞ্জনকে দেখিয়ে বললেন,—এই ছোরাখানি কি আপনার?
রঞ্জনবাবু ছোরাখানি দেখে বললেন—আমি সঠিক বলতে পারছি না। তবে এই রকম একখানা ছোরা আমার ছিল। শিমুলতলায় মুর্গী জবাই করার জন্য আমি এই রকম একখানি ছোরা কিনেছিলাম।
—এই ছোরাখানা মুকুন্দবাবুর মৃতদেহের পাশে পাওয়া গেছে।
—এ সম্পর্কে আমি কিছুই বলতে পারবো না।
জগদীশবাবু ছোরাখানা আদালতে জমা দিলেন। তারপর বললেন—হুজুর, এই ছোরা দিয়ে মুকুন্দবাবুর গলা কাটা হয়েছিল। ছোরাখানি কদিন আগে আসামী শিমুলতলায় কিনেছিল। আর রুমালখানিও আসামীর। রক্তের ছিটে লাগায় হত্যাকাণ্ডের পর আসামী বাইরের বারান্দা দিয়ে পাশের বাড়ীর বাগানে ফেলে দিয়েছিল। মুকুন্দবাবু যখন উপরতলায় ছিলেন, তখন তাঁকে ডাকতে এসে আসামী এই কাজ করে। তারপর ভাল মানুষ সেজে নিচে নেমে যায়। যাবার সময় দরজাটা এমনভাবে বন্ধ করে যায়, যেন ভিতর থেকে ছিটকিনি পড়ে যায়। এটা খুব ঠান্ডা মাথায় সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
এদিকে পাঁচটা বাজলো। জজ বললেন—আজ এই পর্যন্ত থাক, আবার কাল হবে।
জজ উঠলেন, আদালত ভাঙলো।
জীবন বসেছিল সুধীরবাবুর পিছনের সারিতে, বললো—কি বুঝছেন?
সুধীরবাবু বললেন—এখনও কিছু বুঝিনি, কাল বুঝবো।
—রঞ্জনকে শেষ অবধি রক্ষা করতে পারবেন তো?
—এখনি উতলা হবার মত কিছু হয়নি। এর পরেও তো আপীল আছে।
জীবন হতাশ ভাবে সুধীরবাবুর মুখের পানে তাকালো। সুধীরবাবু ব্যস্তভাবে বললেন—আমি যাই। আমার আর এখন কথা বলার অবকাশ নেই।
অধ্যাপক খগেন ঘোষ অতুল দত্তের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন। সুধীরবাবু তাঁদের পিছনে ছুটলেন।
পরদিন সুধীরবাবু প্রথমেই বললেন—হুজুর, আসামী নির্দোষ। আসামীদের নির্দোষিতা প্রমাণ করার জন্য আমি আজ সাক্ষীদের জেরা করতে চাই।
জজ অনুমতি দিলেন। সুধীরবাবু প্রথমেই যে পুলিস অফিসার তদন্ত করেছিলেন, তাঁকে ডাকলেন, বললেন—আপনিই মুকুন্দবাবুর বাড়ীতে গিয়ে দেখেন, মুকুন্দবাবু গলাকাটা অবস্থায় পড়ে আছেন আর তাঁর পাশেই ছোরাখানা পড়ে আছে? ঘরে আপনি পায়ের বা আঙুলের ছাপ কিছু লক্ষ্য করেছিলেন?
দারোগা বললেন—পরিষ্কার ধুলোহীন ঘর, সেখানে পায়ের ছাপ পাওয়া যেতে পারে না। টেবিল-চেয়ারও ঝাড়ামোছা, সেখানে আঙুলের ছাপই বা পাব কি করে? তবে যদি কেউ পিছনের বারান্দা থেকে পাশের বাড়ীর বাগানে লাফিয়ে পড়ে থাকে, এই ভেবে আমি সেই বাগানে সন্ধান করেছি। সেখানে ঝুরো মাটি ও বালিছড়ানো পথে কিছুই ঠাহর করা যায়নি। সেখান থেকেই একখানি রক্তমাখা রুমাল পাই। ছোরা এবং রুমাল দুটোই রঞ্জনবাবুর।
—সেই কারণেই রঞ্জনবাবুকে আপনারা আসামী বলে ধরেছেন? রঞ্জনবাবুর ছোরা ও রুমাল নিয়ে অন্যলোকও তো খুন করতে পারে? ছোরার উপর আঙুলের ছাপ দেখেছেন?
—কোন ছাপ নেই। সম্ভবত: ওই রুমাল জড়িয়ে ছোরাখানা ধরা হয়, আঙুলের ছাপ না রাখার জন্য।
—রঞ্জনবাবুকে সঙ্গে নিয়ে যখন আপনারা তাঁর ঘরে তল্লাশ করতে যান, তখন তাঁর ঘরে কোন বিশেষত্ব লক্ষ্য করেছিলেন কি?
—ঘরখানা ঠিকমত গোছানো ছিল না। তবে ছেলে-ছোকরাদের ঘর ওরকম হয়। গোছানোটা মেয়েদের কাজ।
—ঘরের সেই অবস্থা দেখে রঞ্জন কিছু বলেছিল?
—বলেছিল, ঘরে কেউ ঢুকে এমনি করে গেছে।
—ঘরে সত্যি কেউ ঢুকেছিল কি না সে সম্পর্কে আপনারা কোন তদন্ত করেছিলেন? পায়ের বা আঙুলের ছাপ দেখা, মালীকে জিজ্ঞাসা করা প্রভৃতি কোন খবরদারি করেছিলেন?
—না, প্রয়োজন বলে মনে করিনি। খুনী আসামী ধোঁকায় ফেলার জন্য অমন অনেক কথা বলে।
—রঞ্জনবাবুর ঘরে সন্দেহজনক কিছু পেয়েছিলেন?
—না। দারোগার সাক্ষ্য এইখানেই শেষ হলো।
এবার সুধীরবাবু ডাকলেন অতুল দত্তকে।
—আপনার কয়লাখনি আছে?
—শুধু আমার নয়, আমাদের। আমি তার ম্যানেজিং ডিরেকটর।
—কদ্দিন আপনি এই পদে আছেন?
—গত এক বছর। বাবাই দেখাশুনা করতেন, বাবা ব্লাডপ্রেসারে কিছুটা অসমর্থ হয়ে পড়ায় আমি ম্যানেজিং ডিরেকটর হই।
—আপনার বাবা কোথায় আছেন এখন? কি নাম?
—অমিয় দত্ত, এখন আছেন ধানবাদে। সেখানে আমাদের বাড়ী আছে।
—আপনি কতদূর পড়াশুনা করেছেন?
—ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির বি. এসসি।
—আপনি শিমুলতলায় গিয়েছিলেন মুকুন্দবাবুকে লাখখানেক টাকার শেয়ার বেচবার জন্য?
—মুকুন্দবাবু বাবাকে লিখেছিলেন যে, পাকিস্তানের কাছ থেকে এবার তিনি লাখ দুয়েক টাকা পাবেন। বাবা বললেন, তা থেকে যদি লাখখানেক টাকা তিনি খনির ব্যাপারে লাগান, তাহলে আমাদের পাশের খনিটাও আমরা কিনতে পারি। সেইজন্যই আমি ওঁকে সব বোঝাতে শিমুলতলায় যাই।
—কিন্তু আমি যদি বলি, আপনি মিথ্যাবাদী? অমিয় দত্তের ছেলে অতুল দত্ত শিবপুর থেকে মাইনিং পাস করে এখন বিলাতে আছে। আপনি মিথ্যা পরিচয় দিচ্ছেন। আপনার আসল নাম ভৈরব হালদার, আপনি ভিখিরীদলের অধিকারী, বাগমারীতে আপনার আস্তানা আছে, সেখানে পঞ্চাশ-ষাটজন ভিখারী থাকে, তাদের দিয়ে আপনি রোজগার করেন,—তাই না?
—আপনি কি বলছেন?
—আরও শুনুন, এখানে কোন লোক আপনাকে ভাড়া করে এনেছিল মুকুন্দবাবুর দু লাখ টাকার দলিলটা হস্তগত করার উদ্দেশ্যে। আপনি তাই অতুল দত্ত সেজে কাজে নামেন। মুকুন্দবাবু আসল অতুল দত্তকে ছেলেবেলায় দেখেছিলেন, তাই তিনি আপনার পরিচয়ে বিশ্বাস করেছিলেন। আমি মিথ্যা পরিচয়ের অভিযোগে সন্দেহভাজন ব্যক্তি হিসাবে আপনাকে গ্রেপ্তার করার জন্য আদালতে আবেদন জানাচ্ছি।
—এ অন্যায়! এ ব্যাপার আমি সহ্য করবো না, আমি প্রমাণ দেব।
—প্রমাণ পেলেই আপনাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
জজ বললেন—আপনার অভিযোগের কোন প্রমাণ আছে?
সুধীরবাবু একখানি টেলিগ্রাম ও একখানি ফোটো আদালতে পেশ করলেন। টেলিগ্রাম ধানবাদ থেকে এসেছে, অমিয় দত্ত জানিয়েছেন—আমার পুত্র মাইনিং ইঞ্জিনীয়ার অতুল দত্ত বর্তমানে ইংলন্ডে মাইনিং পড়ছে, এখানে নেই।

শিয়ালদহ স্টেশনে শিপ্রা ধরা পড়ল...
ফোটোখানি পাসপোর্টের ছবি, কোণে সই করা অতুল দত্ত। সে ছবির সঙ্গে সাক্ষী অতুল দত্তের কোথাও কোন মিল নেই।
জজ আদেশ দিলেন—এই সাক্ষীকে এখন হাজতে রাখা হোক। এর সম্পর্কে পুলিস তদন্ত করবে।
এবার সুধীরবাবু জেরা শুরু করলেন অধ্যাপক খগেন ঘোষকে।
—আপনি রংপুর কলেজে অধ্যাপনা করতেন, বাংলা দেশ ভাগ হবার পর আপনি চলে এসেছেন, বর্তমানে আপনি দমদমায় থাকেন?
—হ্যাঁ।
—আপনার চলে কি করে? আপনার জীবিকা কি?
—ইস্কুল-কলেজের বই লিখে আমি রোজগার করি, আমার লেখা অনেক বই অন্য লোকের নামে বাজারে চলছে।
—পাকিস্তানের সঙ্গে আপনার কোন যোগাযোগ আছে?
—রংপুরে আমার পৈতৃক বাড়ী আছে। সে বাড়ী পাকিস্তান সরকার দখল করেছে। আমি তার দাম আদায়ের চেষ্টা করছি, চিঠিপত্র চলছে।
—রংপুরে আপনার কেউ আছে?
—আমার তো ওই একটা মেয়ে। ওকে আমি কাছে কাছেই রাখি। আমি চলে এসেছি, রংপুরে আর কে থাকবে?
—কলকাতায় সখের দলে অভিনয় করে এক শিপ্রা ঘোষ বেশ নাম করেছে, সে কি আপনারই মেয়ে?
—হ্যাঁ, ছেলেবেলা থেকেই ওই দিকে ওর ঝোঁক আছে বলে আমি আর কোন বাধা দিইনি।
—আমি যদি বলি শিপ্রা ঘোষ আপনার মেয়ে নয়?
—সে আপনার যা খুশি বলতে পারেন।
—আপনি তো বিপত্নীক, কিন্তু শিপ্রার মা তো বেঁচে আছেন।
—সে আপনার যা খুশি বলতে পারেন।
সুধীরবাবু জজের অনুমতি চাইলেন—হুজুর, আমি শিপ্রার মাকে হাজির করতে চাই।
জজ অনুমতি দিলেন, জীবন এক মহিলাকে নিয়ে আদালতে এলো।
সুধীরবাবু প্রশ্ন করলেন—আপনার মেয়ের নাম কি?
—শিপ্রা—শিপ্রা ঘোষ।
—এঁকে আপনি চেনেন? সুধীরবাবু খগেনবাবুকে দেখিয়ে দিলেন।
—হ্যাঁ। উনি তো গবর্মেন্টের লোক। আমার মেয়েকে চাকরি করে দিয়েছেন।
—কি চাকরি?
—সরকারী লোকেরা গাঁয়ে গাঁয়ে গিয়ে নাচ-গান যাত্রা দেখায়, শিপ্রাকে উনি সেই দলে ভর্তি করে দিয়েছেন।
—কতদিন উনি শিপ্রাকে এই চাকরি করে দিয়েছেন?
—মাস ছয়েক হয়েছে।
—এর মধ্যে শিপ্রা একবারও কি বাইরে গেছে?
—হ্যাঁ। এই তো কিছুকাল আগে পনেরো দিন চিত্তরঞ্জন থেকে ঘুরে এলো। ওখানে বড়দিনের সময় খুব বড় আসর হয়েছিল।
—বড়দিনের সময় আপনার মেয়ে চিত্তরঞ্জনে ছিল?
—হ্যাঁ, উনিই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন।
সুধীরবাবু জজকে বললেন—হুজুর, খগেন ঘোষকে মিথ্যা সাক্ষী দেবার জন্য আমি অভিযুক্ত করছি।
জজের নির্দেশে পুলিস খগেন ঘোষকে পাকড়াও করলো।
সুধীরবাবু বললেন—হুজুর, আমি খগেন ঘোষ ও অতুল দত্তের বাড়ী তল্লাশ করাতে চাই। সেই রিপোর্ট না পাওয়া অবধি মামলা মুলতুবি রাখার আবেদন জানাচ্ছি।
জজ বললেন—আজই খানাতল্লাস করে পুলিস কাল রিপোর্ট দেবে, মামলা মুলতুবি রাখা নিষ্প্রয়োজন।
সন্ধ্যার একটু পরেই সুধীরবাবুর টেলিফোন বেজে উঠলো। তিনি টেলিফোন ধরলেন।
—আমি জীবন সরকার, শিয়ালদহ স্টেশন থেকে টেলিফোন করছি। শিপ্রাকে অনুসরণ করে আমি পাইকপাড়ায় যাই। আধঘণ্টা পরে শিপ্রা বাড়ী থেকে বেরিয়ে সোজা বেলেঘাটায় আসে। সেখানে একটি মাঠকোঠায় প্রায় আধঘণ্টা অপেক্ষা করে। তারপর একজন লোককে সঙ্গে নিয়ে শিয়ালদায় এসেছে। শিপ্রা টিকিট কেটেছে, কোথাকার টিকিট জানি না। ট্রেনের জন্য তারা অপেক্ষা করছে।
—শিপ্রার হাতে কোন ব্যাগ আছে?
—একটা বড় ভ্যানিটি ব্যাগ ছাড়া আর কিছু নেই।
—সঙ্গের লোকটির হাতে?
—না।
রেলওয়ে পুলিসকে বলে তাদের আটকাও। আমি এখুনি যাচ্ছি। পুলিসকে বলবে, মূল্যবান ডকুমেন্ট পাকিস্তানে চলে যাচ্ছে। গ্রেপ্তারের দায়িত্ব আমার।
সুধীরবাবু তখনই একখানি ট্যাক্সি নিয়ে ছুটলেন শিয়ালদহ স্টেশনের দিকে।
শিয়ালদহ স্টেশনে শিপ্রা ধরা পড়লো, তার ভ্যানিটি ব্যাগের মধ্যে পাওয়া গেল মুকুন্দবাবুর হোসিয়ারী মিলের দলিল ও সেই সম্পর্কিত কাগজপত্র।
পরদিন আদালতে সওয়াল করলেন সুধীরবাবু—ভৈরব ও গোকুল সম্পর্কে মামাতো-পিসতুতো ভাই। দুজনেই রংপুরের বাসিন্দা। মুকুন্দবাবুর ফ্যাক্টরির সব কথা তারা জানতো। ওই টাকাটা হস্তগত কারা জন্য তারা ষড়যন্ত্র করে। গোকুল খগেন ঘোষ সাজে। আর ভৈরব সাজে অমিয় দত্তের ছেলে অতুল। এমেচার ক্লাব থেকে শিপ্রাকে তারা জোগাড় করে। সঙ্গে মেয়ে থাকলে মানুষের সন্দেহ হবে না, তাছাড়া সুনন্দার সঙ্গে মেলামেশার সুবিধা হবে। ভৈরব মুকুন্দবাবুর ঘর থেকে দলিল চুরি করা যায় কিনা, সেই চেষ্টায় এক রাত্রে মুকুন্দবাবুর বাড়ীতে ঢুকেছিল। কিন্তু রঞ্জনবাবু দেখতে পেয়ে তাড়া করেন। ভৈরব পাশের বাড়ীর বাগানে লাফিয়ে পড়ে পালিয়ে যায়। ঘটনায় দিন রাত্রে শিপ্রা এক সময় ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বরাবর সে মুকুন্দবাবুর ঘরে গিয়ে ঢোকে, টেবিলের ড্রয়ার থেকে সে দলিলপত্র চুরি করে। ঠিক সেই সময় মুকুন্দবাবুও খসড়াটা রাখার জন্য ঘরে গিয়ে পড়েন। গোকুল অলক্ষ্যে তাঁর পিছনে ছিল। ঘরে শিপ্রাকে দেখে মুকুন্দবাবু চীৎকার করতে যান। গোকুল তখন তাকে হত্যা করে। এই রকম একটা ঘটনার জন্য গোকুল আগে থেকেই তৈরী ছিল। রঞ্জনবাবুকে যাতে পুলিস সন্দেহ করে, সেজন্য সে আগে থেকেই কার্য কারণ তৈরী করে রেখেছিল। রঞ্জনের ঘর থেকে রুমাল ও মুর্গীকাটা ছোরা সে সংগ্রহ করেছিল। সেই দুটো বস্তু তাকে সংগ্রহ করে দেয় শিপ্রা। তার প্রমাণ এই ছোট্ট লাল পাথরখানা। শিপ্রার আঙুলে একটা সাপ আংটি আছে। সাপের দুটি চোখে দুখানি লাল পাথর বসানো ছিল। একটা চোখের লাল পাথর খোয়া গেছে। এই পাথরখানি সেইটি। এটাকে পাওয়া গেছে রঞ্জনের সুটকেশের মধ্যে। রুমাল বের করে আনার সময় কোন রকমে এই পাথরখানা আংটি থেকে খুলে সুটকেশের মধ্যে পড়ে যায়। আমি এটা তাঁর সুটকেশের মধ্যে আবিষ্কার করি।
মামলা ঘুরে গেল। ভৈরব ও গোকুলের ছ'বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড হলো, শিপ্রার হলো দু'বছর। রঞ্জনবাবু মুক্তি পেলেন।
জজ রায় দেবার সময় সুধীরবাবুর প্রশংসা করে বললেন—সুধীরবাবুর মতো আইনজীবী আদালতের গৌরব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন