দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য
হাসতে চায় সবাই। সবাই খোঁজে আনন্দ। কিন্তু দু:খ যখন মানুষকে ঘিরে ধরে, তখন হাসির বদলে কান্না আর আনন্দের বদলে বিষাদ মানুষ না চাইতেই পায়। ম্যাকসিম গোর্কিও তাই পেয়েছিলেন। ছোটবেলায় এত দু:খ পেয়েছিলেন তিনি, যা' জানলে অতি বড় দু:খীরও মনে হবে, সুখে আছি। কিন্তু অতি বড় দু:খীও কল্পনা করতে পারবে না সেই অসহায় শিশুকে, অন্ধকারের মধ্যে সে একা, সে কাঁদছে অবিরাম, কিন্তু কেউ তার কান্না শুনতে পাচ্ছে না।
আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগেকার কথা। ১৮৬৮ খ্রীস্টাব্দের ২৮শে মার্চ রাশিয়ার নিঝনি নভগরোদে জন্মগ্রহণ করেছিল সেই অসহায় শিশু। সেদিন কেউ কল্পনা করতে পারে নি, একদিন এই শিশু সেরা লেখক হবে। বিশ্বজোড়া নাম-ডাক হবে তার। এই নিঝনিতেই একদিন গড়ে উঠবে এক বিরাট শহর। শিশুটির নামেই তার নাম হবে গোর্কি।
বরণীয় লেখক গোর্কি তাঁর শৈশবের অনেক কথাই নিজে লিখে রেখে গেছেন। 'আমার ছেলেবেলা' তিনি লিখেছেন চোখের জল দিয়ে। এই বইয়ের শুরু ও শেষে মৃত্যু। শুরুতেই দেখি, গোর্কির বাবার মৃত্যু হয়েছে। আগাগোড়া সাদা পোশাক পরিয়ে শুইয়ে রাখা হয়েছে তাকে। আর বইটির শেষ দিকে পাই, ঠিক এমনি আরেক দৃশ্য; মা ভারভারার অসাড় দেহটা পড়ে আছে, অনাথ গোর্কি অসহায়ভাবে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এছাড়া সারা বইটিতে যা' পাই, তা' আরও করুণ। ওখানে দেখি, বাবার মৃত্যুর পর মায়ের হাত ধরে গোর্কি এসেছে তার মামার বাড়ীতে। বাড়ী তো নয়, যেন নরককুণ্ড, পিশাচপুরী। জঘন্য সব নীচতা-হীনতার একটি আড্ডাখানা। বাড়ীর মালিক গোর্কির দাদামশাই খুব বদরাগী আর নীচ প্রকৃতির মানুষ। তিনি যেন তখনকার বর্বর রুশ-জীবনের প্রতিনিধি। তখনকার বলতে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিককার। আর গোর্কির দুই মামা মিখাইল ও ইয়াকভ যেখানে নেমেছিল, অতি বড় পাষণ্ডও সেখানে নামতে ভয় পায়। জংলী পশুর মতই হিংস্র ও ভয়ঙ্কর ছিল ওরা।
দাদামশায়ের বাড়ীতে কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। সকলেই থাকে স্বার্থসিদ্ধির ফিকিরে। কারণে-অকারণে রেষারেষি ও মারামারি ওখানে লেগেই আছে। এই বিষাক্ত পরিবেশের মধ্যেই বেড়ে ওঠে গোর্কি। দাদামশায়ের লাঠি-ঝাটা ও মামাদের কিল-চড় খেতে খেতে বেড়ে ওঠে। আশা নেই, আনন্দ নেই, তার জীবনে। আছে শুধু রক্তচক্ষু দাদামশায়ের শাসন, আর কিছু হিংস্র মানুষের অত্যাচার। মা কাছে থাকেন না বড় একটা; প্রায়ই দূরে দূরে ঘুরে বেড়ান। এই জঘন্য আবহাওয়ার মধ্যে গোর্কির একমাত্র সান্ত্বনা তার দিদিমা। নাতিকে খুবই ভালবাসেন তিনি; গল্প বলেন নিত্য-নতুন। কিন্তু ক্ষমতা তাঁর কতটুকু! শয়তানদের হাত থেকে গোর্কিকে তিনি বাঁচাতে পারবেন কেন!
শেষ পর্যন্ত পথে পথে ঘুরে বেড়াতে হয় গোর্কিকে। আঁস্তাকুড় ঘেঁটে জীবিকার সন্ধান করতে হয়। অবশেষে মায়ের মৃত্যু হয় যখন, গোর্কি তখন পথের ভিখারী। পথে পথেই দিন কাটে তার। রাশিয়ার পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়ায় আট বছরের সেই ছোট্ট শিশু।
তবু ভাগ্যহীন এই অনাথ কেমন করে বেঁচে রইল, আজকের মানুষের কাছে তা এক বড় বিস্ময়। তবে বেঁচে থাকলে এই শিশুটি যে একদিন লেখক হবে তার প্রমাণ ছেলেবেলাকার অনেক ছোটখাট ঘটনার মধ্যে পাওয়া যায়। রাত্রিবেলা দিদিমার পাশে শুয়ে বানিয়ে বানিয়ে অনেক কবিতা বলত গোর্কি। একবার এক স্কুল ইনস্পেক্টার তো অবাক; গোর্কির কাছ থেকে ছড়ায় এক সাধুর জীবনী শুনে একেবারে মুগ্ধ। আর বারবার মুগ্ধ হত স্কুলের ছেলেরা। রূপকথার গল্প বলে গোর্কি ওদের মাতিয়ে তুলত।
কিন্তু স্কুলে যাবার সুযোগ গোর্কির বেশীদিন ঘটে নি। আর দশজনের থেকে আলাদা বলে সহপাঠীদের সঙ্গে বনিবনাও বড় একটা হ'ত না। তার মন স্বপ্ন দেখত হয় পাখি-ডাকা কোনো কুঞ্জবনের, না হয় গল্পে শোন কোনো দূরের গ্রামের। তারপর একদিন কেমন করে সে মন জাগল, কেমন করে মানুষের সুখ-দু:খ ও ন্যায্য অধিকারের কথা ভাবল সেই মন, সে কাহিনী লেখা আছে গোর্কির 'মা' উপন্যাসে।
—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন