দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

সুনন্দা দাশগুপ্ত
সেদিন বিকেলে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে, আমি এক বন্ধুর বাড়ী বসে আছি। ঝমঝমে বৃষ্টির সঙ্গে মুচমুচে চিড়েভাজা আর গরম চায়ের মতো ভালো জিনিস আর কি হতে পারে বলো? তাই একটু পরেই যখন চিনেবাদাম আর আদাকুচি মেশানো ফুরফুরে চিড়েভাজার সঙ্গে গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের পেয়ালা এলো, তখন আর বেশী অনুরোধের অপেক্ষা না করে, তাড়াতাড়ি তার সদ্ব্যবহার শুরু করলাম। তারপরই একটা ব্যাপার ঘটল।
পেয়ালার সঙ্গে চামচের টুংটাং শব্দ হতেই, হঠাৎ যেন আমার মনের উপরকার একটা পর্দা সরে গেল, আর কতকাল আগের এক পুরোনো স্মৃতিকে একেবারে আমার চোখের সামনে নিয়ে এল। মনে পড়ল হারিয়ে যাওয়া সেই ছোটবেলার কথা...
বিকেলে বন্ধুর বাড়ী গিয়ে দেখি, তার জ্বর হয়েছে। বন্ধুর মা তার জন্য দুধসাবু নিয়ে এলেন। চামচে দিয়ে একবার টুংটাং করে নেড়ে বললেন—'লক্ষ্মী সোনা, একটু খেয়ে নাও তো মানিক। দেখ তো কেমন চমৎকার করে তোমার জন্য সাবুর পায়েস করে এনেছি।' আমার সেই ছেলেমেলার বন্ধু কিন্তু মোটেই সে কথায় ভুললো না। নাকী সুরে কান্না জুড়ে দিলে।...
কতক্ষণ যে এসব ভেবেছি জানিনে। বন্ধুর কথায় আবার সেই পুরোনো স্মৃতির খেই হারিয়ে গেল,—'কি ব্যাপার? চুপচাপ বসে আছো যে? চা-টা ঠান্ডা করে লাভ কি?'
তোমরা কি বলতে পারো—এই যে চামচের টুংটাং আওয়াজে এমন করে হঠাৎ আমার পুরোনো স্মৃতির দুয়ার খুলে গেল, কেন এমনটি হল? এতদিন যে কথা মনে পড়েনি, আজ আবার কেন মনে পড়ল? এসব ভাবনা এতদিন তাহলে ছিল কোথায়?
এর সহজ উত্তর হল—পুরোনো স্মৃতিগুলো নিশ্চয়ই একেবারে নি:শেষে হারিয়ে যায়নি। তা মনের মধ্যেই লুকোনো ছিল। এরপর যদি বলি, মনের মধ্যে কোনখানে লুকোনো ছিল, তার উত্তর কি হবে?
আমাদের মন এক বিচিত্র সঞ্চয় ভাণ্ডার। প্রতিদিন কতরকম বিচিত্র ঘটনা ঘটে যায়। কত সুখদু:খের আলোড়ন তুলে দিনের পর দিন এগিয়ে চলে। আজকে যা 'বর্তমান', আগামীকাল তা 'অতীতে' পরিণত হবে। এই সব বিচিত্র ঘটনারাশি থেকে আমাদের মন প্রতিমুহূর্তে কত কি সংগ্রহ করে চলেছে! এই বিচিত্র সংগ্রহশালাকে একটি 'মঞ্জুষা'র সঙ্গে তুলনা করা চলে। 'মঞ্জুষা' কাকে বলে জান নিশ্চয়? মঞ্জুষা বলে প্যাঁটরাকে। আমরা যেমন বাক্স কি প্যাঁটরাতে আমাদের সংগৃহীত জিনিসগুলি সাজিয়ে রেখে দিই; মনের মঞ্জুষাতে তেমনিই দিনের পর দিন ভরে রাখি প্রতিদিনের সংগৃহীত নানারকমের স্মৃতি।
আমাদের মনকে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়। প্রথমটি হল 'সচেতন স্তর' (conscious)। আমরা যে প্রতিদিন কাজকর্ম করি, সমাজে চলাফেরা করি, সবার সঙ্গে কথাবার্তা বলি, ভাবের আদানপ্রদান করি, তা আমরা করি এই সচেতন স্তরের নির্দেশেই, তার নির্দেশেই তখন আমরা চলি। এই সচেতন মনের নির্দেশেই আমরা একটা কাজ করতে গিয়ে আর একটা কাজ করে ফেলি না। একটা কথা বলতে গিয়ে অন্য কিছু অথবা অবান্তর কথা বলি না। আমরা ঠিক ঠিকভাবে যার যার কাজ করে যাই। সারাদিন আমরা এই সচেতন মনের নির্দেশেই সমাজের সভ্য মানুষরূপে নিজেদের পরিচয় দিতে পারি।
এর পরের স্তরকে বলা যায় 'অবচেতন স্তর' (subconscious) আর তারও পরে আছে 'অচেতন' স্তর (unconscious)। আমাদের অনেক স্মৃতি এই অবচেতন এবং অচেতন স্তরে লুকিয়ে থাকে। তোমরা নিশ্চয়ই মহাকবি কালিদাসের 'অভিজ্ঞান শকুন্তলম'-এর গল্পটি জান। যখন শকুন্তলা বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে দুষ্যন্তের কথা ভাবছিলেন, তখন অতিথি সৎকারের অন্যথা হয়েছে বলে দুর্বাসা মুনি শকুন্তলাকে শাপ দিলেন। আর সেই শাপের প্রভাবে পড়ে রাজা দুষ্যন্ত শকুন্তলার কথা ভুলে গেলেন।
এই ভুলে যাওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু এ নয় যে, শকুন্তলার কথা দুষ্যন্তের মন থেকে একেবারেই মুছে গেল! শকুন্তলার স্মৃতি ছিল দুষ্যন্তের সচেতন মনে। সেই সচেতন মন থেকে শকুন্তলার স্মৃতি চলে গেল দুষ্যন্তের অবেচতন মনে। রাজার অন্ত:পুর থেকে ভেসে আসা এক গানের কথাগুলো শুনে দুষ্যন্তের বারবার মনে হচ্ছিল,—কি যেন তাঁর মনে নেই; কার কথা যেন তিনি ভুলে যাচ্ছেন। তোমরা বড় হয়ে যখন 'অভিজ্ঞানশকুন্তলম' নাটক পড়বে, তখন দেখবে, শকুন্তলাকে প্রত্যাখ্যানের আগে হংসপদিকার গান শুনে মহারাজ দুষ্যন্ত তাঁর বিদূষককে বলছেন, ''আমার মনে হচ্ছে যেন কোন একান্ত প্রিয়জন আমার কাছে নেই—
রম্যাণি বীক্ষ্য মধুরাংশ্চ নিশম্য শব্দান
পর্যুসুকী ভবতি যৎ সুখিতোহপি জন্তু:
তচ্চেতসা স্মরতি নূনম অবোধপূর্ব্বম
ভাবস্থিরাণি জননান্তর সৌহৃদানি।''
এর অর্থ—''রম্য দৃশ্য দেখে অথবা মধুর শব্দ শুনে সুখী মানুষও যে পরম ব্যাকুল হয়ে ওঠে, তার কারণ নিশ্চয়ই এই যে, জন্মান্তরের বন্ধুত্ব, যা এখন ভাবরূপে, স্মৃতিরূপে স্থির হয়ে আছে, তাকে সে নিজের অজ্ঞাতসারে স্মরণ করে।'' দুষ্যন্তের সচেতন মন শকুন্তলার কথা সম্পূর্ণরূপে ভুলে গেলেও শকুন্তলার স্মৃতি দুষ্যন্তের মন থেকে একেবারে মুছে যায়নি। দুষ্যন্তের মনের অবচেতন স্তরে শকুন্তলার স্মৃতি লুকিয়েছিল। এইজন্যই দুষ্যন্ত নিজের সচেতন মনের আড়ালে আসলে শকুন্তলার জন্যই ব্যাকুল হয়েছিলেন।
আমরাও নিজেদের সচেতন মনের অজ্ঞাতসারে বহু সুখদু:খের স্মৃতি এই অবচেতন স্তরে লুকিয়ে রাখি। অবচেতন মনের লুকোনো চিন্তাগুলি আমাদের সারাদিনের কাজকর্মের মধ্যে ধরাছোঁয়া দেয় না। আমরা যখন সচেতন অবস্থায় থাকি, তখন এগুলি প্রকাশিত হয় না। যখন আমরা কোনো বাক্সের ডালা খুলি, তখন সর্বপ্রথমে কি দেখি বল তো? সবচেয়ে উপরে যে জিনিস আছে, তার প্রতিই আমাদের চোখ পড়ে। আমাদের মনমঞ্জুষার ঢাকনা খুললেও দেখা যাবে, সবচেয়ে প্রথমে আমরা পাই সচেতন মনের নির্দেশ আর সচেতন মনের সঞ্চয়।
অবচেতন স্তরে লুকোনো স্মৃতি অধিকাংশ সময় আত্মপ্রকাশ করে আমাদের স্বপ্নের মধ্য দিয়ে। আমাদের যে সব আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভয়, আশঙ্কা বা সন্দেহ আমরা অপরের সামনে প্রকাশ করতে কুণ্ঠিত হই, অথবা জানি, যে সব ঘটনা বাস্তব জীবনে কখনোই ঘটবে না, সেইসব চিন্তা আমাদের অজ্ঞাতসারেই আমরা এই অবচেতন স্তরে সঞ্চিত করে রাখি। অনেক হারানো স্মৃতি, যেগুলো হয়তো একান্ত তুচ্ছ, তাও সঞ্চিত হয় আমাদের অবচেতন স্তরে। অযত্নে সঞ্চিত স্মৃতি বলে সেগুলো নি:শেষে হারিয়ে যায় না। সব সঞ্চিত থাকে মনের মধ্যেকার লুকোনো মনের ভিতরে।
অনেক সময় এই অবচেতনে সঞ্চিত স্মৃতির দুয়ার কোনো ঘটনার সাদৃশ্যে হঠাৎ খুলে যায়। ছোটবেলার কবেকার সেই তুচ্ছ ঘটনা, যা এতদিন মনেই পড়েনি, আজ হঠাৎ চামচের টুংটাং আওয়াজে বর্ষার এই বিষণ্ণ বিকেলে সেকথা আমার মনে পড়ে গেল। হারানো স্মৃতিরা ভীড় করে থাকে মনের গহনে। তারা সত্যি-সত্যি ঝরাপাতার মতো অজানা নিরুদ্দেশের মধ্যে হারিয়ে যায় না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন