দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

আশরাফ হোসেন
ভদ্রলোক গ্রামের মানুষ, চাকরি করেন শহরে। বছরে চার-পাঁচ বার ছুটি-ছাটায় বাড়ী আসেন। অন্য সময়ে কোন বার না আসতে পারলেও পূজার বন্ধে প্রায় মাসখানেকের ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়ীতে কাটিয়ে যাওয়া তাঁর একেবারে বাঁধা।
প্রতি বারের মতো সেবারও তিনি বাড়ী ফিরছেন পূজার সময়ে। যথারীতি ট্রেন থেকে নেমে নৌকা করে এসে পৌঁছলেন নদীর ঘাটে। ঘাট থেকে বাড়ী প্রায় আধ-মাইলের পথ। ট্রেনটা নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পরে আসায় ঘাটে এসে পৌঁছতে বেশ রাত হয়ে গেছে। এদিকে, পূজায় ছেলেমেয়ে ও বাড়ীর অন্য সকলের জন্যে জামাকাপড় এটা-সেটা কিনে আনতে সঙ্গে লটবহরও কম হয় নি। একবার সেগুলির দিকে তাকিয়ে নিয়ে ভদ্রলোক মাঝিকে বললেন, 'এখন কী করা যায় বল তো সত্তার? মালপত্র তো অনেক, অন্তত তিন ক্ষেপ লাগবে নিয়ে যেতে।'
বিরাট লটবহরের দিকে তাকিয়ে ভাবতে ভাবতে মাঝি বলল, 'আমিও তো তাই ভাবছি কত্তা। সঙ্গে এমনও আর কেউ নেই যে, দু এক ক্ষেপেই সব নিয়ে যাওয়া যাবে। তাছাড়া, এই রাত-বিরেতে নাওখানও তো খালি রেখে যাওয়া ঠিক না?'
'উঁহু, তা হয় না। তার চেয়ে এক কাজ করলে হয় না? তুই এক ক্ষেপ নিয়ে বাড়ী রেখে আয়। ফিরবার সময় কাউকে সঙ্গে নিয়ে আসিস। তার সঙ্গে বসে দুটো কথা বলতে বলতে আর দু-এক ক্ষেপ তুই দিয়ে এলি। তারপর, বাকি যা রইল, সেটা আমরা দুজনেই নিয়ে গেলাম। কী বলিস? তাই করা যাক।'
মাঝি ভদ্রলোকের বিশেষ পরিচিত। তাই দ্বিতীয় বার আর বাক্য ব্যয় না করে নীরবে সে এক মাথা মোট নিয়ে রওনা হয়ে গেল। সত্তার ঘাটের পথে অন্ধকারে অদৃশ্য হবার আগেই তিনি ডেকে বললেন, 'আর শোন, সত্তার, ফিরবার সময় যাকে সঙ্গে আনবি, তাকে কিন্তু একটা হ্যারিকেনও আনতে বলিস। বালি-বালি জোছনা আছে যদিও, তবু সঙ্গে একটা আলো থাকা ভাল।'
ধীরে ধীরে মাঝি অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। চারিদিকে নেমে এল নির্জন নিস্তব্ধতা। জনপ্রাণীর সাড়াশব্দ কোথাও নেই। দূর থেকে ভেসে আসছে শুধু ঝিঁঝির ডাক, আর মাঝে মাঝে শিয়ালের আর্তনাদ। রাতের লোকালয় ঝোপঝাড় গাছপালারা সব ঘুমিয়ে আছে ম্লান জোছনার চাদর জড়িয়ে।
নৌকার গলুইয়ের উপর বসে নি:শব্দ রাত্রির এই শোভা দেখতে বড় ভাল লাগে ভদ্রলোকের। আশ্বিন মাস—বাতাসে একটু একটু যেন শীতের আমেজ। শরতের আকাশে ভেসে চলেছে তুলোর মতো ছেঁড়া ছেঁড়া পাতলা মেঘ। নদীর ওপারের কিছুটা জায়গা ভরে আছে সাদা কাশফুলে। কত বারই তো তিনি এসব দৃশ্য দেখেছেন, তবু আজও যেন তা পুরনো হতে চায় না। নদীতীরের বাঁশবনের মাথাগুলো মাঝে মাঝে দুলে উঠছে হাওয়ায়; তারই ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে ম্লান এক ফালি চাঁদ। আবছা জোছনায় চারিদিক কেমন যেন রহস্যে ঘেরা।
তন্ময় হয়ে চারিদিকের দৃশ্য দেখতে দেখতে ভদ্রলোক বোধ হয় একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ একটা কালপেঁচার কর্কশ চীৎকার ভেঙে খান খান করে দিল আঁধার-নিস্তব্ধতা। অন্ধকার বাঁশবনের মধ্যে দিয়ে পাখিটা দূরে কোথায় যেন উড়ে চলে গেল।
মুহূর্তে সচকিত হয়ে তিনি তাকালেন চারিদিকে। হঠাৎ তাঁর নজর পড়ল পাড়ের উপরে; দেখেন—কে একজন সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
যে ঘাটে নৌকাখানা লেগেছিল, সেটা বেশ খাড়াই। লোকটি দাঁড়িয়ে ছিল সেই খাড়াই পাড়ের উপরে। এতটা দূর থেকে আবছা অন্ধকারের মধ্যে প্রথমটায় তিনি ঠিক চিনতে পারেন নি। কিন্তু বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে ঝরে-পড়া ম্লান চাঁদের আলোয় এক হাতে একগাছি জাল আর অন্য হাতে একটা খালুই মত দেখে লোকটি যে কে, বুঝতে আর বাকি রইল না ভদ্রলোকের।
নিশ্চয়ই এ রতন মালো! সে ছাড়া কে-ই বা আর যাবে এত রাত্রে মাছ ধরতে?
সব কিছুই যেন অদ্ভুত এই রতন মালোর। অনেক রাতে না হলে মাছ ধরে যেন তার সুখই হয় না। তিন কুলে কেউ নেই। একা মানুষ। রাতভোর মাছ ধরে ভোর রাত্রে ঘরে ফেরে। তারপর একটু ঝিমটি দিয়েই মাছের সওদা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে বাজারের পথে। বছরের তিন শো পঁয়ষট্টি দিনই রতনের জীবন এই নিয়মে বাঁধা। দু:সহ মাঘের শীত কিংবা শ্রাবণের অবিশ্রান্ত বর্ষণ—কোন কিছুই তাকে এ থেকে বিচ্যুত করতে পারে না।
পাড়ের ছায়ামূর্তিটিকে আন্দাজে চিনতে পারলেও নিশ্চিত হবার জন্যে ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, 'কে রে ওখানে? রতন নাকি?'
ভদ্রলোক শুনতে পেলেন, 'আজ্ঞে হ, রাঙা কত্তা।'
'কোথায় যাচ্ছিস এত রাত্তিরে? মাছ ধরতে বুঝি?'
'আজ্ঞে।'
ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, 'তা, কেমন আছিস?'
উত্তর শুনতে পেলেন স্পষ্ট, 'আজ্ঞে কত্তা, ভাল।'
রতন মালো তারপর একটু ক্ষণ সেখানে নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে অন্ধকার বাঁশবনের পথে মিলিয়ে গেল। ভদ্রলোক আগের মত আবার দুই চোখ ভরে নি:শব্দ রাত্রির সৌন্দর্য দেখতে লাগলেন।
এমন সময় মাঝি ফিরে এল ঘাটে। ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, 'কই রে, কাউকে আনিস নি সঙ্গে?'
উত্তরে মাঝি জানালে, 'আজ্ঞে, সাগর আসছে।'
সাগর এসে পৌঁছতেই ভদ্রলোক বললেন, 'তুই তাহলে আর এক ক্ষেপ নিয়ে রেখে আয়, সত্তার। বাকিটা আমি আর সাগর পরের ক্ষেপেই নিয়ে যেতে পারব।'
মাঝি মাল নিয়ে চলে গেল। ভদ্রলোক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে গ্রামের খবরাখবর নিতে লাগলেন সাগরের কাছ থেকে। এবার ফসল কেমন হয়েছে, চারিদিকে ক'খানা পূজা হচ্ছে, নিজেদের গ্রামের বারোয়ারী পূজায় কত চাঁদা উঠেছে ইত্যাদি নানা বিষয়ে কথাবার্তা বলতে বলতে হঠাৎ এক সময় সাগর বললে, 'শুনেছেন রাঙা কত্তা, মালো-পাড়ার রতন মালো মারা গেছে?'
'সে কী?' ভদ্রলোক যেন চমকে ওঠেন বাজ পড়ার শব্দে, 'এই যে তাকে—।'
কী মনে করে মাঝপথে তিনি থেমে যান হঠাৎ। মুহূর্ত মাত্র নীরব থেকে, যেন কিছুই হয় নি এমনি সহজ কণ্ঠে, জিজ্ঞাসা করেন, 'তা কবে মারা গেছে রে?'
'আজ্ঞে, ভাদ্দর মাসের হপ্তাখানেক থাকতে।'
সংবাদটা শুনে ভদ্রলোকের সারা শরীর কেমন যেন ভারী হয়ে এল। কিন্তু অত্যন্ত সাহসী মানুষ, তাই মুহূর্তের মধ্যে সেটা কাটিয়ে উঠে তিনি কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, 'তাই নাকি? তা, কী হয়েছিল, বল তো?'
'আজ্ঞে ধনুষ্টঙ্কার।'
'ধনুষ্টঙ্কার? সেটা আবার কী করে হল?' ভদ্রলোকের বিস্মিত কণ্ঠ।
'আজ্ঞে ধনুষ্টঙ্কারই। জগন্নাথ ডাক্তারও তাই বললে।' তারপর ক্ষণকাল থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সাগর বলে যায়, 'রতনের অভ্যেসটা তো জানতেন, রাঙা কত্তা। এখন, সেদিন হয়েছে কী—সারাটা সকাল যায়, দুপুরও গড়িয়ে গেল, অথচ মালোর পো-র ঘরের দরজা যেমন বন্ধ তেমনি বন্ধই পড়ে রইল। ভিতর থেকে কোন সাড়াও আসে না শব্দও আসে না। সব দেখেশুনে পাশের বাড়ীর পরানের বৌ-র কেমন যেন সন্দ' হল; কথাটা সে পরানকে বললে। পরান তো প্রথমে ব্যাপারটা গায়েই মাখল না। দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এল। তবু কারুর সাড়াশব্দ নেই—ঘরের জানলা-কপাট বন্ধই পড়ে আছে। দেখে তখন পরানের কানে জল গেল—না:, ব্যাপারটা তো তাহলে সুবিধের নয়। সে গিয়ে অনেক ডাকাডাকি, দরজা-জানলা ধাক্কাধাক্কি করলে, কিন্তু না:, ভিতর থেকে কারুরই কোন সাড়াশব্দ তবু আসে না। শেষটায় তখন কী আর করা! মালো-পাড়ার মাতব্বররা এসে কপাট ভেঙে ভিতরে ঢুকে দেখে—রতন বিছানায় পড়ে আছে, ধড়ে তার প্রাণ নেই।'
সাগর চুপ করল। চারিদিক আবার ভরে এল নিস্তব্ধতায়। ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, 'তারপর?'
'তারপর?' সম্মোহিতের মতো সাগর বলে যায়, 'তারপর জগন্নাথ ডাক্তার এলেন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন, অনেক পরীক্ষে করলেন। কিন্তু কিছুতেই আর ধরতে পারেন না, লোকটা মরল কী করে। হঠাৎ পায়ের গোড়ালির নীচে এক জায়গায় একটা কাটা দেখে ডাক্তারবাবুর চক্ষু স্থির! তখন আরও সব কী কী পরীক্ষে করে তিনি বললে, মানুষটা ঐ কাটা থেকেই ধনুষ্টঙ্কারে মারা গেছে।'
ক্ষণকালের জন্যে থেমে সাগর আবার আগের মতো গাঁয়ের টুকিটাকি নানান খবর শুনিয়ে যায়। ভদ্রলোক অন্যমনস্ক চোখে নীরবে তার মুখের দিকে চেয়ে থাকেন।
ইতিমধ্যে মাঝি ফিরে আসে। ভদ্রলোক ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে নিজের সুটকেসটি নিয়ে উঠে এলেন। হাতে লন্ঠন, আর বাকি মোট মাথায় নিয়ে সাগর আগে আগে চলে পথ দেখিয়ে।
যেতে যেতে সে এটা-ওটা নিয়ে কথাবার্তা চালিয়ে যায়। ভদ্রলোক 'হুঁ' 'হ্যাঁ' সাড়া দিতে দিতে নীরবে তার পিছনে হেঁটে চলেন।
পথের দুধারে অনেকখানি জুড়ে শুধু ঘন বাঁশঝাড়। তার মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে সরু এক ফালি পথ। কিছু দূর এমনি সোজা গিয়ে মুহূর্তের জন্যে সমকোণে একবার বাঁক নিয়েই পথটা আবার ছুটে চলে গেছে বাঁশবনের মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা সর্পিল গতিতে। এমনি আর একটা সরু পায়ে-চলা পথ মালো পাড়া থেকে ডানদিকের বাঁশঝাড়ের মধ্যে দিয়ে এসে মিশেছে ঐ বাঁকে।
এই মোড়ের কাছে এসে ভদ্রলোকের সারা শরীর কেমন যেন ছম ছম করে উঠল। নিতান্ত অনিচ্ছাসত্বেও মুহূর্তের জন্যে তিনি একবার ওই মালো-পাড়ার পথটার উপর চোখ না বুলিয়ে পারলেন না। কিন্তু সেই মুহূর্তের মধ্যে যা দেখতে পেলেন, তাতে পা যেন আর চলে না, এমনি অবস্থা হল তাঁর! সরু ঐ পায়ে-চলা পথ ধরে একটি অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসছে তাঁদের দিকে। এবার আর তার হাতে জাল কিংবা খালুই কিছুই নেই।
সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলোক কর্তব্য স্থির করে ফেললেন—একটু ক্ষণের জন্যেও সেখানে না দাঁড়িয়ে, যেন কিছুই হয় নি এমনিভাবে, যেমন চলছিলেন, তেমনি চলতে লাগলেন। যেতে যেতে আড়চোখে পিছনের দিকে একবার তাকালেন—রতন মালো ঠিক তাঁর পিছন পিছন হেঁটে আসছে।
ইতিমধ্যে সাগর কিছুটা এগিয়ে গেছে। তাকে ধরবার জন্যে দ্রুত পা ফেলে এগিয়ে যাওয়াও নিরাপদ নয় মনে করে ভদ্রলোক আগের মত গতিতে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞাসা করলেন, 'এত রাতে এখন কোথায় চললি, রতন?'
উত্তর শোনা যায় রতনের, 'এই যাই একটু এদিকে।'
পথটা বাঁশবনের মধ্যে থেকে বেরিয়ে দু ধারের আম-কাঁঠাল-পেয়ারার বাগান আর আগাছার ঝোপঝাড় দু পাশে সরিয়ে সোজা গিয়ে নেমেছে দিগন্তছোঁয়া দক্ষিণের ধূ ধূ মাঠে। তাই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'এদিকে কোথায়? মাঠে?'
উত্তর যেন তিনি শুনতে পেলেন, 'হ।'
'মাছ ধরতে যাচ্ছিস বুঝি?'
উত্তরে ছায়ামূর্তিটি আমতা আমতা করে কী যে বলল, ঠিক বোঝা গেল না। ভদ্রলোক আবার জিজ্ঞাসা করলেন, 'তা, জাল-খালুই নিয়ে এলি না যে?'
'আজ্ঞে, তার আর দরকার হবে না।'
এমনি নানা অপ্রয়োজনীয় কথায় সময় কাটিয়ে ভদ্রলোক এগিয়ে চলেন। হঠাৎ কেমন যেন তাঁর সন্দেহ হয়। মাথা চুলকানোর ভান করে তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে মুহূর্তের জন্যে আড়চোখে পিছনের দিকে চেয়ে দেখেন—রতন মালো ঠিক তাঁর গা ঘেঁষে পিছন পিছন হেঁটে আসছে। তার ঠান্ডা নিশ্বাস যেন তাঁর দুই কাঁধ আর ঘাড়ের উপর এসে আছড়ে পড়ছে।
আর বুঝি পা চলে না। সারা শরীর হিম হয়ে আসতে থাকে। তবু বুকে যথাসম্ভব সাহস সঞ্চয় করে এক সময়ে ভদ্রলোক পথের শেষে এসে পৌঁছলেন। এখান থেকে যে পথটি বাঁদিকে বেরিয়ে গেছে, সেটা ধরে কিছুটা গেলেই তাঁর বাড়ী।
সাগর ততক্ষণে অনেকটা এগিয়ে গেছে। ভদ্রলোক বাঁকের মুখে এসে একটু দাঁড়ালেন, বললেন, 'তাহলে তুই যা রতন, আমি চলি।'
'কোথায় যাবেন কত্তা?' বলতে বলতে হঠাৎ ছায়ামূর্তিটি বুঝি তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল।
তারপর ঠিক কী যে ঘটেছিল, ভালো মনে করতে পারেন না তিনি। তবে এটুকু মনে আছে, নিশিডাকা মানুষের মত নীরবে তিনি হেঁটে চলেছেন তারপর ছায়ামূর্তিটির পিছু পিছু অনেকটা পথ।
কত দূর গিয়েছিলেন, মনে নেই। বেশ কিছু পথ এমনি করে হাঁটবার পর হঠাৎ এক সময় একটি পা বুঝি তাঁর খানায় পড়ে যায়। গর্তে পা পড়তেই মুহূর্তের চমকে তিনি সম্বিৎ ফিরে পান।—এ কি? কোথায় চলেছেন তিনি? সামনে যে ধূ ধূ করছে শুধু মাঠ? এ পথে তো আসবার কথা নয়?
কিন্তু কী করা যায় এখন? সামনের দিকে তাকিয়ে দেখেন, ছায়ামূর্তিটি বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছে। পলকমাত্র আর সেখানে না দাঁড়িয়ে সঙ্গে সঙ্গে পিছন ফিরে তিনি গ্রামের দিকে দিলেন ছুট!
বেশ কিছু দূর এসে পথের বাঁক ঘুরতে গিয়ে মুহূর্তের জন্য একবার শুধু তাকালেন মাঠের দিকে। দেখেন—মাঠের মাঝে ছায়ামূর্তিটি ঘুরে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে চেয়ে আছে, দু:সহ রাগে যেন আগুনের ভাঁটার মতো জ্বলছে তার চোখ দুটি।
গল্পটা শুনেছিলাম সুদার মুখেই। তাঁর নিজের জীবনেই নাকি ঘটেছিল ঘটনাটা।
আবু জিজ্ঞেস করছিল, 'আচ্ছা সুদা, সত্যি কি তুমি নিজে কোনদিন এসব কিছু দেখেছ?'
যাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাঁকে কিন্তু এ কথার উত্তর দিতে হয় নি। 'তা হলে এত বেলা শুনলি-টা কী? এমন বোকার মত সব প্রশ্ন করিস যে শুনলে পিত্তি জ্বলে যায়।' উত্তরটা জহুরই শুনিয়ে দিয়েছিল।
জহুরের ঠোঁটকাটা কথায় আবু কেমন যেন থতমত খেয়ে যায়; আমতা আমতা করে কী বলবারও বুঝি সে চেষ্টা করে। কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে তপন জিজ্ঞাসা করেছিল, 'তুই থাম। আচ্ছা সুদা, সত্যি কি এসব অশরীরী বা প্রেতাত্মা কিছু আছে?'
'কী জানি! কত জ্ঞানী-গুণী মানুষ যার উত্তর আজও পায় নি, আমি করব তার মীমাংসা?' কথাগুলো কেমন যেন দার্শনিকের মতো শোনায়।
'তবু তোমার কী মনে হয়?' তপনের প্রশ্নে ব্যাকুলতা ফুটে ওঠে।
আশ্চর্য মানুষ এই সুদা অর্থাৎ সুরাজদা। শিহরণ-জাগানো অপ্রত্যাশিত কত বিচিত্র রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা যে জীবনে তাঁকে সঞ্চয় করতে হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। আমাদের ক্লাব-ঘরের সান্ধ্য-আসরের আড্ডাটি তাই তাঁর স্বাগত উপস্থিতিতে প্রায় প্রতিদিনই বেশ জমজমাট হয়ে জেঁকে বসে।
বয়সে আমাদের চেয়ে অনেক বড়, তবু সমবয়সীদের সঙ্গে মেলামেশায় সুরাজদার বিশেষ রুচি নেই। ডাঙায় মাছের মত সেসব গুরুগম্ভীর পরিবেশে তিনি যেন হাঁপিয়ে ওঠেন।
পাড়া-সুবাদে তাঁকে আমরা দাদা বলেই সম্বোধন করি, যদিও মেলামেশাটা তাঁর আমাদের সঙ্গে সমবয়সী বন্ধুর মত। আদরার্থে মাঝে মাঝে তাই তাঁর সুরাজ নামটি সংক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের মুখে দাঁড়ায় সুদা।
তপনের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, 'আমার কী মনে হয়? আমার মনে হয়, এসব এমনই জিনিস, যা বিশ্বাস করলে আছে, না করলে নেই। শোন, ছোট একটা ঘটনা বলি।'
আমরা সব জড়সড় হয়ে বসি।
আশেপাশের পাঁচ-দশটা গাঁয়ের মানুষ এক ডাকে তাকে চেনে। যেমন দুর্ধর্ষ সাহসী তেমনি দশাসই বলিষ্ঠ চেহারা। নাম জিতু কাহার। ভূত-প্রেত দস্যু ডাকাত—ডরায় না সে কাউকে। ডাক-দুপুরে যে সব জায়গা বা পথ লোকে মাড়ায় না ভয়ে, জিতু কিন্তু সেসব জায়গা রাত-বিরেতে এমনকি নির্জন ঘোর অমাবস্যা রাত্রেও অবলীলাক্রমে পার হয়ে আসে।
এমনি এক জায়গা চৌধুরীদের বাগ। বাগানটি জমিদারদের। আগে চৌধুরীদের যখন প্রতাপ ছিল, তখন লোকের মাঠ-পথে অনেকটা ঘুরে এ গাঁ থেকে সে গাঁ-য় যেতে হত। দিনে দিনে চৌধুরীদের সে দাপট কমে এল, বিরাট বাগানটার অবস্থাও দাঁড়াল একেবারে ছন্নছাড়া। কেবল তাই নয়, ধীরে ধীরে পাঁচ গাঁয়ের মানুষ ভুলে গেল মাঠভাঙা সেই ঘুরপথ, তাদের চলায় চলায় চৌধুরীদের বাগিচার বুকের উপর দিয়ে আঁকা হল আড়াআড়ি এক পায়ে-চলা রাস্তা। বাগানটি আম জাম কাঠাল লিচু পেয়ারা প্রভৃতি নানা রকমের গাছাগাছালি আর আগাছায় ভরা।
চৌধুরী-বাগের পাশেই নদীর ধারে বিরাট এক শ্মশান। আশপাশের দশ-বারোটা গাঁয়ের মৃতদেহের সৎকার হয় সেখানে। ধীরে ধীরে চৌধুরীদের প্রতাপ যত কমে আসে, শ্মশানটাও তত গ্রাস করতে থাকে বাগানের এলাকা। তার উপর, শিয়াল-কুকুর শকুন-দাঁড়কাকের উৎপাত তো আছেই। আধ-পোড়া না-পোড়া যত মরা মানুষের মাথার খুলি, দেহের হাড়গোড় বাগিচাময় তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখে। বাগানের পথে চলতে গিয়ে তাই হামেশাই মানুষকে এমনি দু-দশটা খুলি বা হাড়গোড় ডিঙিয়ে পার হতে হয়।

বাঁদিকে শ্মশান। সেদিক থেকে...
ফুটফুটে পূর্ণিমার রাত তো দূরের কথা, নির্জন ভর-দুপুরবেলায়ও তাই এ পথ মাড়াতে কোন লোকেরই গা ছমছম না করে পারে না। কত জন যে এ পথে ভয় পেয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। তাই, কি পূর্ণিমা কি অমাবস্যা, কোন রাতেই কেউ একা একা চৌধুরী-বাগের এই ভয়াবহ পথ ভাঙে না। ভিন গাঁয়ের কাজ সেরে দিনে দিনেই তারা ছাড়িয়ে যায় বাগানের এলাকা।
এমনি সাংঘাতিক রাস্তাও কিন্তু জিতু কাহারের কাছে দিনে-রাতে সব সময়েই সমান। এ পথ পার হতে হবে বলে যে দিনে দিনে কাজকর্ম সেরে বাড়ীর পথ ধরবে, এমনটি জিতুর দ্বারা হবার নয়।
একদিন রাতের কথা। জিতু ফিরছে ঐ পথে। ঘুরঘুট্টি অমাবস্যার রাত্রি নয়, তবে আকাশে মরা চাঁদটা যে কোথায়, তা-ও ঠিক দেখা যায় না। গাছগাছালির আড়ালে কোথাও না কোথাও যে সেটা লুকিয়ে আছে, তা শুধু বোঝা যায় মাঠে ঘাটে গাছপালায় মাখানো ফিকে জোছনার আভাস দেখে।
হঠাৎ কিছু দূর থেকে তার নজরে পড়ে, সামনের শিমূল গাছটার নীচে ঘোমটা মাথায় একটি বৌ দাঁড়িয়ে। কী ব্যাপার? এই নির্জন রাতে এমনি জায়গায় কী করছে বৌটা ওখানে দাঁড়িয়ে? থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে জিতু কাহার, 'কে ওখানে?'
কোন উত্তর নেই। পায়-পায় আরও এগিয়ে যায় জিতু। আবার জিজ্ঞেস করে, 'কী হল, উত্তর দিচ্ছ না যে? কে তুমি? ভালয় ভালয় বলছি, উত্তর দাও শীগগির, নয়তো তোমার একদিন কি আমার একদিন।'
কিন্তু তাতেও কোন উত্তর করলে না বৌটি। শুধু একবার বুঝি মুহূর্তের জন্যে ঘাড় ফিরিয়ে দেখে নিলে জিতুকে। এমনি করে কয়েক বার জিজ্ঞাসাতেও বৌটি যখন কোন উত্তরই করল না, তখন সত্যিই তার একটু ভয় ধরে গেল। অদ্ভুত সাহস তো বটে মেয়েছেলেটির! যতবারই জিতু ডেকে জিজ্ঞেস করে, ততবারই সে ঘাড় ঘুরিয়ে নিতান্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে একবার দেখে নেয় তাকে মুহূর্তের জন্যে।
আর না পেরে শেষটায় জিতু পাশের এক গাছ থেকে মোটা একখানা কচা ভেঙে নিয়ে পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেল বৌটার কাছে। গিয়ে যা দেখলে, তাতে একা-একাই সে হো-হো করে না হেসে উঠে পারলে না—দু:, কে না কে ছোট্ট একটা মরাগাছের ডালে ছেঁড়া একখানা কাপড় ঝুলিয়ে রেখে গেছে।
শুনে আমি বলেছিলাম, 'আচ্ছা জিতু, এমনি রাত-বিরেতে তুই বনে-বাদাড়ে চলাফেরা করিস, সঙ্গে একটা লন্ঠন-টণ্ঠনও তো রাখতে পারিস?'
ম্লান হেসেছিল জিতু, 'আর বাবু লন্ঠন! নিজে পাই নে দু বেলা দু মুঠো পেট ভরে খেতে, তার আবার লন্ঠন! বিনা তেলে কি আর লন্ঠন জ্বলে বাবু?'
বিশ্বাস করতে পারা যায়? এমনি সাহসী মানুষ জিতু কাহারের কিনা একদিন মৃত্যু হল এই চৌধুরী-বাগে?
শীতকাল। সেদিন জিতু গিয়েছিল কী এক কাজে হরিদাসপুর ছাড়িয়ে পাশের এক গ্রামে দুপুরের দিকে। একে সেদিন শীত পড়েছে বেশী, তার উপর আকাশ থমথম করছে মেঘে। চারিদিকে কেমন দুর্যোগের ভাব। রাতে বৃষ্টি হতে পারে ভয়ে দিনের আলো থাকতে থাকতে তাড়াতাড়ি কাজ সেরে বাড়ি ফিরে আসবে, ঠিক করেছিল জিতু। কিন্তু তা আর হল না। কাজ সারতেই ঘুরে গেল সন্ধ্যা। তার উপর সন্ধ্যা লাগতে না লাগতেই নামল টিপ টিপ করে বৃষ্টি।
সারা মাথা-কান ভাল করে কাপড় দিয়ে জড়িয়ে জিতু হেঁটে চলেছে হন হন করে বাড়ীর পথে। অমাবস্যা রাত। মাঘ মাস। জিতু এসে পৌঁছল চৌধুরীদের বাগে। আকাশে মেঘ না থাকলে তারাদের আলো যা-ও পাওয়া যেত, তা-ও নেই। দু হাত দূরের কিছু তো দূরের কথা, নিজের হাতখানাকে পর্যন্ত দেখা যায় না, চারিদিকে এমনি ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। সেই যে শুরু হয়েছে টিপ টিপ করে বৃষ্টি, তা আর থামে নি। মাঝে মাঝে হা হা করে ছুটে চলেছে ঠান্ডা হাড়কাঁপানো উত্তরের বাতাস। আর তারই ঝাপটায় তীরের মতো বৃষ্টির ফোঁটা এসে বিঁধছে জিতুর চোখে মুখে।
চারিদিকে জনপ্রাণীর সাড়াশব্দ নেই। মাঝে মাঝে শুধু দমকা-বাতাসে গাছের পাতা থেকে ঝরে-পড়া ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির জলের শব্দ আর আশেপাশে দীর্ঘশ্বাসের মত নিশ্বাসের মৃদু আওয়াজ কানে আসে। তাছাড়া, চারিদিক নীরব নি:সাড়। কোথাও একটা শিয়ালের ডাক কিংবা গাছের ডালে কোন শকুনের ডানা ঝাপটানোর শব্দও পর্যন্ত শোনা যায় না।
ডাইনে-বাঁয়ে কোনদিকে পলকের জন্যেও তাকায় না জিতু। তীরের ফলার মত বৃষ্টির ছাট এসে বিঁধছে চোখে মুখে। নীচের দিকে তাই মুখ নামিয়ে বাগের মধ্যে দিয়ে সে পায়ে-চলা পথ ধরে হেঁটে চলে ঝড়ের বেগে।
বাঁদিকে শ্মশান। সেদিক থেকে...সেদিক থেকে কি কোন শব্দ শোনা যায়? কই, কাউকে তো দেখা যায় না সেদিকে? কিন্তু, পিছনে? পিছনে যেন কার পায়ের অস্পষ্ট শব্দ?
জিতু কান পাতে। হুঁ, ঠিক—পিছনের অস্পষ্ট পায়ের শব্দটা জিতু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে।
হঠাৎ—! এ কী? কে যেন খপ করে তার কাপড় টেনে ধরল পিছন থেকে? আচমকা টানে জিতুর সারা শরীরের মধ্যে দিয়ে যেন এক তীব্র বিদ্যুৎ-প্রবাহ খেলে যায়। সে চীৎকার করে ওঠে, 'কে রে? ছাড়, ছাড় বলছি শীগগির।' বলেই হ্যাঁচকা টানও সে মেরেছিল কাপড় মুঠো করে ধরে। কিন্তু না:, সে টানে কাপড় ছাড়ল না, কে যেন ধরে রইল তা শক্ত মুঠিতে।
ঠিক সেই মুহূর্তে কি জিতু একবার তাকিয়েছিল পিছনের দিকে?
সেদিন সারা রাত নানা দুশ্চিন্তায় কাটিয়ে পরদিন ভোরে তার বাড়ির লোক হরিদাসপুরের দিকে খোঁজ করতে গিয়ে চৌধুরী-বাগের মধ্যে দিয়ে যেতে দেখে—জিতু কাহারের প্রাণহীন হিমশীতল দেহখানি পড়ে আছে পথের ধারে বৃষ্টিভেজা ঘাসের উপর। আর, তার কাপড়ের একটি কোণ বেধে জড়িয়ে আছে একটি গরুর খুঁটোর মাথায়।
—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন