দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়
আবার সেই ঝুঁকোবাবু।
কোত্থেকে যেন লাফাতে গিয়ে ঝুঁকোবাবুর কোমরে চোট লেগেছিল। সেই থেকে তাকে সামনের দিকে ঝুঁকে ঝুঁকে পথ চলতে হয়। তাই সবাই তাকে ঝুঁকোবাবু বলে ডাকে। তার আসল নামটা লোকে আজকাল ভুলেই গেছে।
তা যাক।
আমরা তাকে ঝুঁকোবাবু বলে জানি, ঝুঁকোবাবুই বলবো।
ঝুঁকোবাবু ভারি মজার মজার গল্প বলে। আর সেই সব গল্প শোনবার জন্যে তারাশঙ্করের নাতিরা তাকে দেখতে পেলেই টেনে নিয়ে যায়। বাইরের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসায়, চা খাওয়ায়, কফি খাওয়ায় আর গল্প শোনে।
ঝুঁকোবাবুর বয়স কত?
কেউ বলে ষাট, কেউ বলে সত্তোর।
ঠিক করে কেউ বলতে পারে না।
বলবে কেমন করে? ঝুঁকোবাবুর চুলও পাকেনি, দাঁতও ভাঙ্গেনি।
কেউ বলে চুলে কলপ লাগিয়েছে, কেউ বলে দাঁতগুলো বাঁধানো।
সেদিন ছিল রবিবার। ইস্কুলের ছুটি। বিকেলবেলা 'মণিমেলা'য় যাবার জন্যে তারাশঙ্করের ছোট তিনটে নাতি—ঝণা, বাচ্চু আর মুকুল জামাজুতো পরে বেরুবে; এমনসময় দেখলে, মোটা লাঠিটি হাতে নিয়ে ঝুঁকোবাবু কোথায় যেন যাচ্ছে।
ছুটে গিয়ে মুকুল তাকে চেপে ধরলে।
—ওরে ছাড় ছাড়, ঝিলপার্কে দুটো চক্কর মেরে আসি।
ঝণা আর বাচ্চু ততক্ষণে এসে গেছে।
আর নিস্তার নেই।
—খোঁড়া পায়ে আর চক্কর মারতে হয় না। এসো। আমরা খুব বিপদে পড়ে গেছি।
ঝুঁকোবাবু বললে, তোদের আবার বিপদ কিসের?
ঝণা বললে, আমাদের বিপদ বুঝি থাকতে নেই?
—না।
ঝুঁকোবাবু তাদের বাইরের ঘরে গিয়ে বসালো। বললে, তোদের এ-বয়েসে কোনও বিপদই বিপদ নয়। বিপদের কথা ভাবিসনে। বুড়ো হয়ে যাবি।
বাচ্চু বললে, বিপদের কথা ভাবলে বুঝি বুড়ো হয়?
ঝুঁকোবাবু বললে, হয়।
—তুমি বুঝি বিপদের কথা ভাবো না?
—কখখনো না। বিপদ আর দু:খু—এই দুটো জিনিসকে আমল দিয়েছিস কি মরেছিস। —নে বল তোদের কি বিপদ হয়েছে শুনি।
ঝণা বললে, দাঁড়াও তোমার জন্যে এক পেয়ালা কফি আনতে বলি।
ঝুঁকোবাবু বললে, কফি? উত্তম। এ-বাড়ীতে কফি এলো কোত্থেকে?
চাকরটা দোরের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। ঝণা তাকে এক পেয়ালা কফি আনতে বললে। রাম জিজ্ঞাসা করলে, তোমরা খাবে না?
বাচ্চু বললে, পেলেই খাই।
ঝুঁকোবাবু বললে, চার পেয়ালা আনবি। সবাই মিলে না খেলে আসর জমবে না। কই, আমার কথার জবাব দিলি না তো?
বাচ্চু জিজ্ঞাসা করলে, কি কথা?
ঝুঁকোবাবু বললে, তোদের বাড়ীতে কফি আমি কখনও খাইনি। তাই জিজ্ঞাসা করলাম—কফি এলো কোত্থেকে?
বাচ্চু বললে, দাদু আজকাল কফি খাচ্ছে।
ঝুঁকোবাবু বললে, কফি খেলে ঘুম কমে যায়। ঘুম কমলে প্রেসার বাড়ে। তোর দাদুকে কফি খেতে বারণ করে দিস।
মুকুল বললে, ওরে বাবা, দাদুর সঙ্গে কথা বলতে ভয় করে।
ঝণা বললে, দাদু আমাদের সঙ্গে কথাই বলে না।
ঝুঁকোবাবু বললে, আমার সঙ্গেও তো কথা বলে না। দেখা হলে মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। বলে, আমি নাকি আজগুবি সব গল্প বানিয়ে বানিয়ে বলি। আমি নাকি মিথ্যেবাদী।
মুকুল বললে, মিথ্যেবাদীই তো।
ঝুঁকোবাবু বললে, তাহলে তোর দাদুও তো মিথ্যেবাদী। এই যে এই এত-এত কাঁড়ি কাঁড়ি গল্প লিখেছে সবই তো মিথ্যা কথায় ভরা।
ছেলেরা কি বলবে বুঝতে পারলে না। দাদুর লেখা গল্প-উপন্যাস আর এই ঝুঁকোবাবুর সব উদ্ভট আজগুবি গল্প—দুটোই কি এক?
ঝুঁকোবাবুই শেষে বুঝিয়ে দিলে। বললে, না রে না, তা নয়। তোর দাদু আমার সঙ্গে কথা বলে না, আমাকে মিথ্যাবাদী বলে, তাই কথাটা রাগ করে বললাম।
এই বলে ঝুঁকোবাবু তার হাতদুটি জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বললে, তোর দাদু হলো গিয়ে একজন স্রষ্টা শিল্পী, আর আমি হলাম একটা সাধারণ মানুষ। ওর গল্প-উপন্যাসগুলো হলো গিয়ে মিথ্যালোকের সত্য কাহিনী, আর আমার হলো গিয়ে—
চার পেয়ালা কফি এসে গেল। কথাটা আর শেষ হলো না। ঝুঁকোবাবু বললে, নে কফি খা।
কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে ঝুঁকোবাবু বললে, না:, সেরকম কফি আমরা তৈরি করতে পারি না।
ঝণা বলে উঠলো, কি রকম?
ঝুঁকোবাবু বললে, দক্ষিণ ভারতে যেরকমটি খেয়েছি।
—দক্ষিণ ভারতে কিজন্যে গিয়েছিলে তুমি?
ঝুঁকোবাবু বলে বসলো, হাতী কিনতে।
হাতীর নামে সবাই উদগ্রীব হয়ে উঠলো। মুকুল সব চেয়ে ছোট। তারই আগ্রহ সব চেয়ে বেশি। কফির কাপটি হাতে নিয়ে এগিয়ে এসে বললে, হাতী কিনলে তুমি? কত বড় হাতী? দুটো বড় বড় দাঁত ছিল?
ঝুঁকোবাবু বললে, না রে না—দাঁতওলা বড় হাতী নয়। বাচ্চা হাতী। সুইডেনের 'জু'তে যে হাতীটা দিয়েছিলাম, সেটা তখন মরে গেছে। তাই আর একটি বাচ্চা হাতীর জন্যে টেলিগ্রাম করলে। গেলাম মহীশূরে। মহারাজার অতিথি হয়ে আমাকে থাকতে হয়েছিল তা প্রায় একমাস। মহারাজা কিছুতেই ছাড়তে চায় না। বলে, আরও কিছুদিন থাকুন আপনি।
—হাতী কিনলে?
ঝুঁকোবাবু বললে, কিনতে হলো না। চারটে বাচ্চা হাতী দেখিয়ে মহারাজা বললে, এই চারটেই আপনাকে উপহার দিলাম। আপনি নিয়ে যান।
—চারটেই নিলে?
—চারটে নিয়ে কি করবো?
—বা-রে! আমরা একটা নিতাম তাহলে।
ঝুঁকোবাবু বললে, থাক আর হাতী নিতে হয় না। তোমাদের দাদুকে অনেকগুলো হাতী পুষতে হয়।
মুকুল ছেলেমানুষ। হাতী পোষার মানেটা বুঝতে পারলে না। বললে, কোথায় হাতী? আমাদের কুকুর আছে একটা। আর একটা হরিণের বাচ্চা এনেছিল দাদু। মরে গেছে। হাতী তো নেই।
—আছে, আছে, তোরা বুঝবি না।
এই বলে কফির কাপটি হাত থেকে নামিয়ে দিয়ে ঝুঁকোবাবু বললে, এবার তোদের সেই বিপদের কথাটা বল। যে-কথাটা বলবার জন্যে আমাকে এখানে ডেকে আনলি।
ঝণা এদের সবার চেয়ে বড়। বললে, আমি বলছি শোনো। তোমার বয়েস কত হলো আগে বল।
—কেন? আমার বয়েস জেনে কি করবি?
বাচ্চু বললে, তোমার সঙ্গে আমাদের খুব ভাব তো। তাই সবাই আমাদের জিজ্ঞাসা করে—ঝুঁকোবাবুর বয়েস কত বল। কেউ বলে ষাট, কেউ বলে সত্তোর। অথচ তোমার চুলও পাকেনি, দাঁতও ভাঙ্গেনি—
ঝুঁকোবাবু হো হো করে হেসে উঠলো। বললে, এই তোদের বিপদের কথা?
ঝণা বললে, বিপদ নয়? আমরা বলতে পারি না যে!
—শোন তবে। যে-কথা কাউকে বলি না, তোদের আজ সেই কথা শোনাই। আর-এক পেয়ালা কফি আনতে বল। কফিটা বেশ ভাল হয়েছিল।
এই বলে লঠিটা হাতের কাছে টেনে নিয়ে ঝুঁকোবাবু ভাল করে চেপে বসলো। রামকে ইশারা করে ঝণা বলে দিলে, আর-এক পেয়ালা কফি।
—কফি আসুক, ততক্ষণ তুমি বল।
ঝুঁকোবাবু আরম্ভ করলে,—আমার তখন পঁচিশ বছর বয়েস। বউ মরে যেতেই মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে গেল। ভাবলাম, সারা ভারতবর্ষটা একবার ঘুরে দেখি। তখন সব জায়গায় ট্রেণও চলে না। পায়ে হেঁটে আর নৌকোয় চড়ে যেতে হয়। সে আজ অনেকদিনের কথা। তোর দাদু তখনও জন্মায়নি।
বাচ্চু বললে, ধেৎ, তাই হয় কখনও? দাদুর বয়স তো সত্তোর বছর।
ঝণা বললে, তাহলে তোমার বয়েস কি একশো বছর নাকি?
গম্ভীর মুখে ঝুঁকোবাবু বললে, না। একশো তিন বছর সাত মাস।
মুকুল বললে, তোমার সব মিছে কথা। মানুষ কখনও একশো বছর বাঁচে না।
ঝুঁকোবাবু বললে, শুনেই যা না। টিপ্পনি পরে কাটবি। দেখতে বেরোলাম ভারতবর্ষ। কিন্তু ঘুরতে ঘুরতে চলে গেলাম ব্রহ্মদেশ। সেখান থেকে জাভা, সুমাত্রা, বোর্নিয়ো। তারপর জাপান। জাপান থেকে চীন। দেখতে দেখতে পনেরো কুড়িটা বছর কোনদিক দিয়ে কেটে গেল বুঝতে পারলাম না। শুধুই মনে হতে লাগলো—জীবনটা তো শেষ হয়ে গেল। আর কতদিনই বা বাঁচবো। মানুষের জীবন এত ছোট কেন? চীনের দুজন বৌদ্ধ লামার সঙ্গে পাহাড় পর্বত বন জঙ্গল পেরিয়ে সোজা গেলাম তিব্বতে। সেখান থেকে হিমালয়। হিমালয় আমার এত ভাল লাগলো—লামাদের ছেড়ে দিলাম। বললাম, তোমরা যেখানে যাচ্ছ যাও, আমি হিমালয়েই ঘুরে বেড়াবো। মরতে হয় এইখানেই মরবো। তখনকার হিমালয় আর এখনকার হিমালয়ে অনেক তফাত। সে হিমালয় ছিল যেমন ভয়াবহ তেমনি সুন্দর! পর্বতের গুহার ভেতর কতরকমের কত সাধু-সন্ন্যাসী! সেই ভয়াবহ নির্জন জায়গায় এই সব সাধু-সন্ন্যাসী কি খেয়ে বাঁচে, কেমন করে এতদিন থাকে,—এই কথাটি জানবার জন্যে সাধু দেখলেই আমি থেমে যাই, সেইখানেই আশ্রয় ভিক্ষা করি। কিন্তু দু'একদিনের বেশি কেউ থাকতে দেয় না। তাড়িয়ে দেয়। একজন সাধু বললেন, পুরী, সেতুবন্ধ, দ্বারকানাথ আর বদ্রিনারায়ণ দর্শন করে এখানে এসো। তখন আমি তোমাকে থাকতে দেবো। শুনে আমার তো চক্ষুস্থির! ততদিন বোধ হয় বাঁচবো না। লোকালয়ে যাবার জন্যে মন তখন ছটফট করছে। নেমে আসছি নীচের দিকে। ক্ষিদেও পেয়েছে, পিপাসাও পেয়েছে, আর হাঁটতে পারছি না। প্রতিমুহূর্তেই মনে হচ্ছে, এইবার বোধ হয় মরে পড়ে থাকবো। একটি পর্বতের গা বেয়ে নেমে আসছি, একটি পাথরের গায়ে পা পিছলে গড়াতে গড়াতে পড়বি তো পড়—একেবারে একটি গুহার মুখে। দু'জন সাধু বেরিয়ে এলো গুহা থেকে। ধরাধরি করে আমাকে গুহার ভেতরে নিয়ে গেল। সেবা শুশ্রূষা করে বাঁচালে আমাকে। সারাদিনে মাত্র দুটি ছোট ছোট ফল খেতে দিত আমাকে। সে যে কী অমৃত ফল কে জানে! সেই ফল খেয়ে মনে হতো যেন নবজীবন লাভ করলাম।
দুদিন পরে উঠে বসেছি। কী ভাল যে লাগছে সে আর কি বলবো! সেই হাড়কাঁপানো দুরন্ত শীতেও একজন সাধুর গায়ে কোনও কাপড় নেই। সাদা ধপধপ করছে গায়ের রং। মাথার চুল, দাড়িগোঁফ, সব সাদা। সাদা দাঁত পালিশ-করা পাথরের মত ঝকঝক করছে। ঝরনার জলে স্নান করে আসছেন। চোখদুটি উজ্জ্বল। শিশুর মত সরল মুখে হাসি যেন লেগেই আছে। আনন্দময় পুরুষ। গুহার ভেতর সারা দিনরাত ধুনি জ্বলছে। আর সেই ধুনির সামনে একটি হরিণের চামড়ার ওপর বসে বসে কত রকমের কত গল্প বলছেন।
আর-একজন বোধ করি তাঁর চেলা। রামচরণ বলে ডাকছেন তাকে। তার গায়ে একটি পুরু কম্বল। কাঠ কাটা, ধুনি জ্বালানো, ফল সংগ্রহ করে আনা—যাবতীয় কাজকর্ম সেই রামচরণই করছে।
সেদিন তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে।
চারিদিক কুয়াশার মত মেঘে ঢাকা। ঝাপসা চাঁদের আলো এসে পড়েছে গুহার ভেতর। ধুনি জ্বলছে। সাধু-মহারাজ হাসতে হাসতে গল্প বলছেন। রামচরণ বাইরে বেরিয়ে গেছে। আমি একমাত্র শ্রোতা।
গল্প বলছিলেন লোভ সম্বন্ধে।
মহারাজ বললেন, সংসারী মানুষের লোভ হচ্ছে গিয়ে সব চেয়ে বড় শত্রু। একদিন এক সাধু-মহারাজ আর তার শিষ্য নদী পেরিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছিলেন। নদীটা পার হয়েই দেখেন, পথের ধারে মস্ত বড় একতাল সোনা পড়ে আছে। সোনা দেখে শিষ্যের লোভ হলো। সোনার তালটা সে কুড়িয়ে নিতে যাচ্ছিল। সাধু-মহারাজ বললেন, খবরদার! ওটা তুমি ছুঁয়েছো কি মরেছো।
সোনার তালটা শিষ্যকে তিনি নিতে দিলেন না।
ফেরার পথে দেখলেন,—দুজন লোক মরে পড়ে আছে সেইখানে। একজন সেই সোনার তালটার কাছে। আর-একজন নদীর তীরে।
গুরু-মহারাজ বললেন, বল তো এরা কেন মরেছে?
শিষ্য বললে, কেমন করে বলবো গুরুদেব। আমি তো জানি না।
গুরু-মহারাজ তখন বললেন, ওই যে দুজন মরে পড়ে আছে—ওরা দুই বন্ধু। ঠিক আমাদের মত নদী পেরিয়ে যেতে যেতে সোনার তালটা দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু একা তো একজনে সেটা নিতে পারে না! নিতে হলে দুজনকেই নিতে হবে। এক বন্ধু বললে, সোনাটা এইখানে মাটি চাপা দিয়ে লুকিয়ে রেখে চল আমরা শহরে যাই। সেখান থেকে একটা ছেনি, একটা হাতুড়ি আর একটা ওজনের জন্যে দাঁড়িপাল্লা নিয়ে আসি। নিয়ে এসে সোনাটাকে ছেনি হাতুড়ি দিয়ে টুকরো টুকরো করে ভেঙ্গে দাঁড়িপাল্লা দিয়ে দুটো সমান ভাগে ভাগ করে বাড়ি নিয়ে যাব। এই না ভেবে তারা শহরে গেল ওই সব আনবার জন্যে। কিন্তু সংসারী মানুষের লোভ এমনি প্রচণ্ড যে ধর্মাধর্ম জ্ঞানটুকু পর্যন্ত তারা বিসর্জন দিয়ে বসলো। কেউ কাউকে ভাগ দিতে চায় না। দুজনেই ভাবলো—আমি একাই সবটা নেবো, ওকে কিচ্ছু দেবো না। দুজনেই মনে-মনে দুটো ফন্দি এঁটে বসলো। ঠিক হলো, প্রথমে তারা এসে নদীতে স্নান করবে, তারপর কিছু খেয়ে নিয়ে সোনার তালটা কাটতে বসবে। যে-বন্ধু খাবার কিনলে, তার একটা মারাত্মক বিষের কথা জানা ছিল। সেই বিষ কিনে নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে রাখলে। আর-এক বন্ধু তখন আর-একটা মতলব ঠিক করে রেখেছে।
শহর থেকে ফিরে এসে দুই বন্ধু গেল নদীতে স্নান করতে। এক বন্ধু যেই নদীর জলে ডুব দিয়ে স্নান করতে যাবে, আর-এক বন্ধু তার হাতের ছেনিটি তার মাথায় বসিয়ে দিলে হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে। লাল রক্তে নদীর জল রাঙা হয়ে গেল। ছুটে পালাতে গিয়েও পালাতে পারলে না। এলিয়ে পড়লো নদীর কিনারে এসে।

ছোট্ট একটি বড়ি আমার হাতে
দিয়ে বললেন, খেয়ে ফ্যাল ।
বন্ধুকে হত্যা করে আর-এক বন্ধু নদীর জলে হাতের রক্ত ধুয়ে মুছে এসে মনের আনন্দে খেতে বসলো। খেয়ে দেয়ে সোনার তালটা নিয়ে বাড়ী যাবে—এই ছিল তার ইচ্ছা। কিন্তু তারও ইচ্ছা পূর্ণ হলো না। খেতে খেতেই সে এলিয়ে পড়লো সেইখানে।
সোনার তালটি যেমন ছিল তেমনি পড়ে রইলো সেইখানে।
গল্প শেষ করে সাধু-মহারাজ হাসতে লাগলেন।
ঝুঁকোবাবু বললে, আমি দেখলাম এই সময় কেউ নেই, রামচরণ ফিরে এলে মনের কথা সাধু-মহারাজকে বলা চলবে না। তাই আমি এগিয়ে গিয়ে মহারাজের পাদুটো জড়িয়ে ধরে বললাম, আপনি বাবা সামান্য মানুষ নন আমি বুঝতে পেরেছি।
সাধুবাবা হো হো করে হেসে উঠলেন,—কেমন করে বুঝলি?
বললাম, হিমালয়ের এই ঠাণ্ডায় আমরা যেখানে গরম জামা-কাপড় পরে কম্বল মুড়ি দিয়ে জমে বরফ হয়ে যাচ্ছি, আপনি সেখানে বরফ গলা ঝরনার জলে স্নান করছেন, খালি গায়ে বসে আছেন নিশ্চিন্ত হয়ে। তার ওপর আপনার পাকা চুল দাড়ি দেখে মনে হচ্ছে আপনার বয়েসের গাছ-পাথর নেই, অথচ সারা শরীরে তার চিহ্ন পর্যন্ত কোথাও দেখা যাচ্ছে না—
মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে সাধুবাবা আমার হাতদুটো তাঁর পা থেকে সরিয়ে দিলেন প্রথমে, তার পরেই বললেন, বল ব্যাটা তুই কি চাস?
কি চাই? ভারি বিপদে পড়ে গেলাম। কি চাই তা যে আমি নিজেই জানি না!
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে সাধুবাবা বললেন, সমঝ গয়া ব্যাটা—তু কেয়া মাংতা।
তুমি বাবা অন্তর্যামী, তুমি না সমঝালে কে সমঝাবে বল?
—তুই বহুৎ পরমায়ু চাস?
বললাম, হ্যাঁ বাবা ঠিক ধরেছেন আপনি। আমার মনে হচ্ছে, এবার আমি মরে যাব। অথচ আমি সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতে চাই, অনেক কিছু জানতে চাই, অনেক কিছু শিখতে চাই।
সাধুবাবার একটি থলি ছিল। হাত বাড়িয়ে সেই থলেটির ভেতর হাত ঢুকিয়ে ছোট্ট একটি বড়ি বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, খেয়ে ফ্যাল।
খেয়ে ফেললাম সেই বড়িটি।
—আর কিছু করতে হবে না?
সাধুবাবা বললেন, না। তোকে মৃতসঞ্জীবনী খাইয়ে দিলাম। তবে এই কথাটি জেনে রাখিস—কলিকালে অমর কেউ হবে না। মরতে একদিন হবেই। তোর ইন্দ্রিয়গুলো যখন দেখবি অক্ষম হয়ে এসেছে, আর কাজ করতে চাইছে না, তখন জানবি আমার এই ওষুধের কাজ শেষ হয়ে গেছে।
এই পর্যন্ত বলে ঝুঁকোবাবু থামলো। গল্প বলার মাঝখানে কখন আর-এক পেয়ালা কফি এসেছে, কখন সে পেয়ালাটি শেষ হয়ে গেছে ঝুঁকোবাবু তা বুঝতেই পারেনি। বললে, এখন বুঝতে পারলি তো—আমার বয়েস কত।
মুকুল বললে, তোমার বয়েস একশ তিন বছর সাত মাস বললে লোকে বিশ্বাস করবে?
ঝুঁকোবাবু বললে, বিশ্বাস না করলে তো বয়েই গেল! এবার উঠি।
উঠতে যাচ্ছিল ঝুঁকোবাবু, ঝণা আর বাচ্চু—দুজনে ধরে বসলো। —না আর-একটু বোসো। আর একটা গল্প বল।
ঝুঁকোবাবু বললে, এবার যদি এক পেয়ালা চা খাওয়াতে পারিস, তা'হলে না হয় বসি একটুখানি।
বাচ্চু বললে, এবার আর রাম পারবে না। চায়ের কথা মাকে বলতে হবে।
বাচ্চু চায়ের কথা বলতে গেল।
ঝণা বললে, তারপর তুমি সেই সাধুর আশ্রম থেকে কোথায় গেলে? কি করলে বল।
বাচ্চু চেঁচিয়ে বলে গেল, আমি না আসা পর্যন্ত বলবে না। মাকে এক কাপ চায়ের কথা বলেই আমি আসছি।
বাচ্চুর ফিরে আসতে দেরি হলো না। ঝুঁকোবাবু তখন আরম্ভ করেছে আর-এক গল্প।
—কেদার-বদরি যাবার ইচ্ছা ছিল কিন্তু তা আর গেলাম না। পাহাড়ে ওঠা-নামার কষ্ট আর সহ্য হচ্ছে না। আমি যখন অনেকদিন বাঁচবো, তখন পরে আবার এলেই হবে। পাহাড়-জঙ্গল পেরিয়ে নেমে আসছি সমতলের দিকে। হরিদ্বারের কাছে এসে এক সাহেবের সঙ্গে দেখা। জাতিতে ইংরেজ। ভারতবর্ষ দেখতে এসেছে। দু:খের দিনে মানুষের সঙ্গে ভাব হয় চট করে। একসঙ্গে পথ চলতে চলতে রবার্টের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। রবার্ট বললে, তোমাদের দেশ তো দেখলাম। এবার চল তোমাকে আমি আমাদের দেশে নিয়ে যাই। পাশপোর্ট তৈরি করিয়ে সেই রবার্টই আমাকে নিয়ে গেল ইংলন্ডে।
লন্ডনের একটি হোটেলে বসে দুজনে লাঞ্চ খাচ্ছি, হঠাৎ একটি মেয়ের সঙ্গে রবার্টের দেখা হতেই সেই যে সে মেয়েটির সঙ্গে বেরিয়ে গেল হোটেল থেকে, আর ফিরে এলো না।
আমার তখন এমন অবস্থা, সেই অপরিচিত বিদেশে কি খাব কোথায় থাকবো কিছুই ঠিক নেই। সেই সময় আমার এক বন্ধু জুটলো সেই হোটেলে, সে তখন সেই হোটেলে বাবুর্চির সহকারী। নাম বলতো নুয়েন। আমি তাকে 'হো' বলে ডাকতাম। সে-ই আমার চাকরি করে দিলে। টেবিল পরিষ্কার করা আর এঁটো ডিস ধুয়ে মুছে তুলে রাখার কাজ। আমি অন্তত: কিছুদিনের জন্যে বেঁচে গেলাম। সে বলতো তার বাড়ী ইন্দোচীন। আমার বাড়ী ইন্ডিয়া, আর তার বাড়ী ইন্দোচীন।
লন্ডনের হোটেলের এই বাবুর্চিটি কে বলতে পারিস?
ঝণা বললে, তা আমরা কেমন করে বলবো?
ঝুঁকোবাবু বললে, বলতে পারলি না তো? আমার এই বন্ধুটি হলো ভিয়েৎনাম যুদ্ধের হোতা বিশ্ববিখ্যাত হো চি মিন।
বাচ্চু বললে, লন্ডনে তিনি বাবুর্চির কাজ করতেন?
—হ্যাঁ, লন্ডনে, প্যারিসে, হ্যানয়ে, হংকং-এ, ক্যান্টনে, চীনে, রাশিয়ায় —কত ছদ্মনামে কতরকমের কত কাজ যে সে করেছে তার অন্ত নেই। কিন্তু সেই তখন থেকেই দেখেছি তার একমাত্র স্বপ্ন ভিয়েৎনামের স্বাধীনতা।
ঝণা বললে, এই যে সারা পৃথিবী জুড়ে 'ভিয়েৎনাম' 'ভিয়েৎনাম' শুনছি, এই যে এতদিন ধরে ওখানে যুদ্ধ চলছে—এর কারণটা কি বলতে পারো? আমাদের বুঝিয়ে দাও তো!
ঝুঁকোবাবু বললে, সে সব অনেক কথা। চট করে বুঝতে পারবি না। আর একদিন এসে বেশ ভাল করে বুঝিয়ে দেবো। আজ শুধু এইটুকু জেনে রাখ—ভিয়েৎনামে টিন আর টাংষ্টেন এই দুটো জিনিস প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এই দুটি জিনিসের লোভে ভিয়েৎনামের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে অনেক বড় বড় রাষ্ট্র। ভিয়েৎনাম তাদের তুলনায় কিছুই নয়, নিতান্ত নগণ্য নিতান্ত ছোট দেশ। তার ওপর ফরাসীরা তাকে দু'ভাগ করে দিয়ে আরও ছোট করে দিয়েছে। ভিয়েৎনামের লড়াইটাকে এখন রাজনীতির রঙে রাঙিয়ে দিয়ে নিতান্ত জটিল করে তোলা হয়েছে। তা সে যত জটিলই হোক, আমার বন্ধু এই হো চি মিনকে দূর থেকে একটি প্রণাম জানাই।
এই বলে হাতদুটি জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে ঝুঁকোবাবু বললে, তার দেশবাসীকে এই অসাধারণ মানুষটি যে মহামন্ত্রে দীক্ষা দিয়েছে সে মন্ত্রটি মানুষের চরিত্রে একটি মহা মূল্যবান সম্পদ। তার নাম—অপরাজেয় মনুষ্যত্ব।
এক পেয়ালা চা দিয়ে গেল রাম।
ঝুঁকোবাবু বললে, এই চা খেয়েই এবার আমি উঠবো।
আজ কিন্তু ঝুঁকোবাবুর কাছ থেকে বড় বড় কথা শুনে ছেলেদের তাক লেগে গিয়েছিল। ঝণা বললে, এবার কিন্তু এইরকম সব কথা শুনবো তোমার কাছ থেকে।
চা খেতে-খেতে ঝুঁকোবাবু জিজ্ঞাসা করলে, কি রকম কথা?
—এই যেমন হো চি মিনের কথা বললে। তেমনি সব দেশ-বিদেশের কথা।
ঝুঁকোবাবু বললে, আচ্ছা, এবার তোদের রাশিয়ার কথা বলবো।
রাশিয়ার কথা শুনে বাচ্চু খুব উৎসাহিত হয়ে উঠলো। বললে, হ্যাঁ হ্যাঁ রাশিয়ার কথা শুনবো। ভূগোলে আমি খুব কম নম্বর পাই।
ঝুঁকোবাবু ঘাড় নেড়ে বললে, না। আমার কথা শুনে তোর ভূগোলের নম্বর বাড়বে না, শুধু চিন্তা করবার শক্তিটা বাড়বে।
এই বলে চায়ের কাপটি হাত থেকে নামিয়ে দিয়ে লাঠিটি নিয়ে ঝুঁকোবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
—আবার ডেকেছিলি ওকে?
ছেলেরা তাকিয়ে দেখলে তাদের দাদু তারাশঙ্কর এসে দাঁড়িয়েছে দোরের কাছে।
মুকুল বললে, জানো দাদু, ঝুঁকোবাবুর বয়েস একশো তিন বছর সাত মাস।
তারাশঙ্কর হেসে বললে, তাহ'লে তো ও মানুষ নয়, ও ভূত।
'ভূত' কথাটা তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল—কারণ এই মাত্র মস্ত বড় একটা আজগুবি ভূতের গল্প তার অনিচ্ছাসত্বেও লিখে তাকে শেষ করতে হয়েছে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন