এক যে ছিল বাঘিনী

দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


বেদুইন

এক যে ছিল রাজা।—উঁহু। রাজার গল্প নয়। আমাদের দেশে রাজা নেই, রাজার জন্য মাথা ব্যথাও নেই। তাহলে?—মন্টি ঘন্টি, শন্টির গল্প! তাও অচল। নতুন গল্প ফেঁদে বসবার আগেই ধপাস করে শব্দ। কোন ভারী জিনিস পতনের আওয়াজ। চমকে উঠলাম। ভর সন্ধ্যে বেলায় আওয়াজটা মোটেই ভাল লাগল না।

দরজা খুলে বের হলাম।

মিটি মিটি আলোতে দেখতে পেলাম সুরেশ মণ্ডলকে। আমাদের দুয়ার থানার ছোটবাবু সুরেশ মণ্ডল সাইকেলসহ আমার দরজার সামনে গর্তে পড়ে হাঁপাচ্ছে।

ছুটে গিয়ে টেনে তুললাম।

সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না সুরেশ। তার হাত-পা যেন ভেঙ্গে পড়ছে।

জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে সুরেশবাবু?

সুরেশবাবুর গলায় জিব আটকে গেছে। কোন রকমে বলল, ভাল্লুক।

ভাল্লুকের নাম শুনে আমিও এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে বললাম, কোথায়?

উত্তর দেবার আগে আমার প্লাংকের বারান্দায় বসে সুরেশ মণ্ডল আঙ্গুল দিয়ে দেখাল, ঐ দিকে।

সুরেশ মণ্ডলের আঙ্গুল আর ইঙ্গিত দেখে মুখ ফেরালাম। কোথাও ভাল্লুক দেখতে পেলাম না। সুরেশ মণ্ডল বোধহয় ভুল করেছে।

গৃহিণীকে তাড়াতাড়ি এক গেলাস জল দিতে বললাম।

সুরেশ ঢক ঢক করে জল খেয়ে দম নিল। এতক্ষণ তার জিব গলায় যেন আটকে ছিল। জল খাবার পর কিছুটা শক্তি পেয়ে বলল, পেছন পেছন আসছিল।

কোথায় গিয়েছিলেন?

তুরতুরি বাগানে একটা চুরি কেস এনকোয়ারি করতে। রওনা হতে দেরি হল। খুব জোরে আসছিলাম, সন্ধ্যের আগে থানায় পৌঁছাতে হবে। এসেও প্রায় গিয়েছিলাম। মরারায়ডাক নদীর ওপরে আসামীলতার বনে ঢুকেছি এমন সময় বিকট চিৎকার।

তারপর?

পাশের ঝোপ থেকে ভাল্লুক মশায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে, সাইকেলের পেছনে প্রায় দশ হাত দূরে। আমিও পড়ি-কি-মরি করে প্যাডেলে চাপ দিতে লাগলাম। দেহের যত শক্তি আছে তা খরচ করেও পেছনে চেয়ে দেখি ভাল্লুক পেছন ছাড়েনি। সামনের দুপা উঁচু করে ছুটছে আমার পেছন পেছন।

তারপর?

মরারায়ডাক নদী অবধি তাকে দেখেছি। তারপর পেছনে তাকিয়ে দেখার সাহস পাইনি।

বললাম, ভাগ্যি বর্ষাকাল নয়।

সুরেশ মণ্ডল বিস্মিতভাবে জিজ্ঞেস করল, কেন?

তাহলে নদীতে জল থাকত, নদী পার হতে পারতেন না। পরের ঘটনা নিজেই কল্পনা করুন।

তা বটে। বলে সুরেশ মণ্ডল বোধহয় তার ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিচ্ছিল মনে মনে। ইতিমধ্যে গৃহিণী গরম চায়ের বাটিটা সামনে রেখে বলল, ভাল্লুক আর আসছে না, এবার চা খেয়ে দেহটা সঙ্গে সঙ্গে মনটাকে সুস্থ করুন।

শুকনো হাসি দেখা দিল সুরেশের মুখে।

কনেস্টবল থেকে এ-এস-আই পদে প্রমোশন পেয়ে সুরেশ প্রথম পোস্টিং পেয়েছে দুয়ারে। জলপাইগুড়ির বনাঞ্চলের জন্তু জানোয়ারদের নাম শুনেছে, কখনও সাক্ষাত পরিচয় হয়নি। এই প্রথম পরিচয় সেজন্য ঘাবড়ে গেছে বেচারা। সুরেশ কেন, অনেক বীর পালোয়ানই ঘাবড়ে যাবে। দুয়ারের বনাঞ্চলে বাঘ, ভাল্লুক, বুনো মোষ, পাইথন, হাতী, নেকড়ে ও হায়নার সঙ্গে যাদের পরিচয় নেই তারা দূরে বসে ঠিক করতে পারবে না দুয়ারের বন কি ভয়ঙ্কর স্থান।

উত্তরে ভূটানের পাবর্ত্য বন। পূর্বে সঙ্কোশ নদী। নিম্নে সমতল কোচবিহার জেলা। বিরাট অঞ্চল নিয়ে দুয়ার। ইংরেজ এর নাম দিয়েছে ডুয়ার্স, আর প্রচলিত গল্প হল, ভূটান যাবার বিভিন্ন পথ থাকায় প্রবেশ পথকে দ্বার বা দুয়ার বলা হয়। এরই এক জনহীন জঙ্গলী জায়গায় দুয়ার থানা। অফিসার দুজন। একজন দারোগা একজন সহকারী দারোগা। আর সেপাই সংখ্যা মাত্র ছয়। এই থানার সহকারী দারোগা হল সুরেশ মণ্ডল।

কাজে যোগ দেবার পর সুরেশ প্রথম পরিচয় করেছিল আমার সঙ্গে। বি-এ পাশ করে কোন কাজ না পেয়ে সেপাইয়ের চাকরি নিয়েছিল। তারপর প্রমোশন এবং প্রমোশনের পর প্রথম পোস্টিং দুয়ারে।

চা পানের পর সুরেশকে বললাম, নতুন অভিজ্ঞতা!

নতুন তো বটেই, ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতাও। আপনি কি করতেন জানি না। তবে জীবিত অবস্থায় ফিরে আসার কোন সম্ভাবনা ছিল বলে মনে হচ্ছে না। উ:।

শিউরে উঠল সুরেশ মণ্ডল।

বললাম, আমার কথা যখন বললেন তখন গল্প শুনুন। ঘটনা, অবশ্যই সত্য ঘটনা।

সুরেশ মণ্ডল ভাল হয়ে হাত পা ছড়িয়ে মাদুরে বসল।

আমাদের রেনজ অফিসার বর্ধনের নাম শুনেছেন তো।

সুরেশ বলল, শুনেছি প্রায় পাঁচ ছয় বছর আগে উনি এখানে ছিলেন কিন্তু তার এত নাম কেন বলুন তো। উনি তো চলে গেছেন অনেক দিন আগেই।

হেসে বললাম, ঠিক যেতে পারেন নি, যাবার আগে একখানা চরণ রেখে গেছেন। তাই ওকে স্মরণ করতে হয় মাঝে মাঝে।

ঠিক বুঝলাম না আপনার কথা।

বর্ধনবাবুর এখন একটি মাত্র পা রয়েছে, অপরটি এই ডুয়ার্সের বনে রেখে যেতে হয়েছে। সেই জন্য এবং যে ঘটনায় তার পা রেখে যেতে হয়েছে তার জন্য সবাই তাকে মনে রেখেছে।

সুরেশ আগ্রহ সহকারে বলল, এবার বলুন কি হয়েছিল।

সেই বর্ধনবাবু ঠিক এমনি সময়ে এসেছিলেন আমার এই আস্তানায়। বর্ধনবাবুর বিশ্বাস ছিল তিনি খুব ভাল শিকারী। তাকে কোন দিন শিকারে যেতে দেখিনি। একবার মাত্র একটা পাইথন মেরে এনেছিলেন। পাইথনটা বোধহয় পনর বিশ মিনিট আগে হরিণ গলাধ:করণ শেষ করে বিশ্রাম করছিল একটা হরিতকী গাছতলায়। তখনও হরিণের পেছনের দুটো পা বেরিয়ে ছিল মুখের বাইরে। বর্ধনবাবুর নজরে পড়তেই বন্দুক হাতে করে ছুটে গেলেন। তারপর গুলি। কটা গুলি তা জানি না। তবে শেষ করতে পেরেছিলেন এবং সেই পাইথনকে সদরে এনে তার পেট থেকে হরিণ বের করে হরিণের মাংস ভক্ষণ এবং হরিণের চামড়া ও পাইথনের চামড়া সংগ্রহ—এই দুটো কাজ বেশ ভাল ভাবেই করেছিলেন। বর্ধনবাবুর শিকারী জীবনে এর চেয়ে আর কি গৌরব থাকতে পারে। পাইথন মারার পর থেকেই বর্ধনবাবুর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পেল। তার আত্মবিশ্বাস যে কত প্রবল তা প্রমাণ করতে মাঝে মাঝেই সাইকেলে চেপে বের হতেন। পিঠে বাঁধা থাকত দোনলা বন্দুক। সেদিন ব্রিচেস পরতেন, মাথায় হেলমেট টুপি চাপাতেন। অবশ্য রোজই ফিরে আসতেন শূন্য হাতে। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতেন, জঙ্গলে যেতে হলে হাতিয়ার নিয়ে যাওয়াই উচিত।

এহেন বর্ধনবাবু ঠিক এমনি সময় আমার এই আস্তানায় এসে বসলেন। মুখ দেখে মনে হল কোন গুরুতর বিষয় নিয়ে চিন্তা করছেন। আমি কিছু বলবার আগেই বর্ধনবাবু বললেন, খুবই উৎপাত করছে শুনছি।

কে?

কে আবার। একটা বাঘিনী।

তা করবে। শীতকালে বাঘিনীর বাচ্চা হলেই সমতলে নেমে আসে। বাঘের জাত, নিজের স্বামীকেও বিশ্বাস করে না। বাঘে যদি বাচ্চা দিয়ে হঠাৎ ব্রেকফাস্ট করে তা হলে বাঘিনী বেচারী কেঁদে মরবে। তার চেয়ে পতির সঙ্গে দ্বন্দ্ব না করে সন্তানসন্ততি নিয়ে গ্রামে এসে নিরীহ গোবৎস অথবা ছাগ শিশুর ফলাহার সম্পন্ন করার চেষ্টায় থাকে। উভয় কূল রক্ষা হয় তাতে।

ঠাট্টা নয় বিশুবাবু। এর মধ্যে ছয় ছয়টা গরু মেরেছে। এগারটা কুকুর আর ঊনিশটা ছাগল। তুলসীপাড়া গ্রামে হাহাকার পড়ে গেছে। গ্রামের লোক সাহস করে দিনের বেলাতেই বাইরে বের হয় না। কি করা যায় বলুন তো।

ব্যাঘ্র নিধন ভিন্ন অন্য পথ দেখছি না। তবে মশাল জ্বেলে টিন পিটিয়ে বাঘ তাড়ানোর সেই পুরানো মেথডটা প্রয়োগ করলে মন্দ হয় না।

তাতে লাভ হবে না মশাই। বাঘিনী হয়ত তুলসীপাড়া ছেড়ে রামপুরে হাজির হবে। সেখানেও উৎপাত সৃষ্টি হবে। আরও ভয়ঙ্কর কথা বাঘিনী দিনের বেলায় এসে গরু ছাগল ধরে নিয়ে যাচ্ছে। রাতের অন্ধকারে চুপি চুপি আসে না। প্রকাশ্য দিবালোকে আসছে। এর ফলে উত্তর দিকের মাঠে আর কেউ গরু ছাগল চরাতে যায় না। আতঙ্কে থমথম করছে গোটা এলাকা।

আপনি গিয়েছিলেন সে এলাকায়।

যাইনি, যাব মনে করেছি। জঙ্গলে জঙ্গলে দশটা বছর কেটে গেল মশাই এমন সাহসী আর ধূর্ত বাঘের কথা কখনও শুনিনি। এ দেখছি অদ্ভুত বাঘ।

বরং ডেপুটি কমিশনারকে একটা রিপোর্ট পাঠিয়ে দিন। সদর থেকে শিকারী পাঠাক সরকার। বাঘের সঙ্গে লড়াই করুক।

তা বটে, কিন্তু সরকারী দপ্তরের ব্যাপার তো জানেন! এ বছরে রিপোর্ট করলে আগামী বছর তার উত্তর আসবে। ততদিন কি পশুপক্ষী থাকবে। সব শেষ হয়ে যাবে। তবে একটা রিপোর্ট কালই পাঠাব মনে করেছি। ইতিমধ্যে এখান থেকেই বাঘ মারার ব্যবস্থা করতে হবে।

কাজটা খুব সহজ নয়। দিনের বেলায় বাঘ আসে। মাচান বেঁধে বসে থাকলে দিনের বেলায় সে পথে বাঘ হয়ত আসবেই না।

বিট পাঠালে কেমন হয়। আশেপাশের কোন জঙ্গলে নিশ্চয় ওর ডেরা আছে।

তাহলে মাটিতে মুখোমুখী দাঁড়িয়ে চার্জ করতে হবে। এতে রিকস কত তা জানেন।

বর্ধনবাবু স্বীকার করলেন এভাবে বাঘ মারতে গেলে জীবন বিপন্ন হবার সম্ভাবনা। অথচ বাঘটাকে মারতেই হবে যে কোন উপায়ে, যে কোন রিকস নিয়ে।

অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বর্ধনবাবু বললেন, আপনি যদি সঙ্গে থাকেন তাহলে এই রিকস নিতে পারি।

হেসে বললাম, আমি হলাম আপনাদের য়্যামেচার শিকারী। দু-চারটে বেলে হাঁস আর তিতির মারলে সে শিকারী হয় না। আমার একনলা বন্দুকও বাঘ শিকারের ঠিক উপযোগী নয়। তবে আপনার পেছন পেছন যেতে পারি।

দোনলা বন্দুক একটা আমিই দেব আপনাকে। আসল কথা কি জানেন, আমার ডেপুটি হল ভীষণ ভীতু। তাকে বলেছিলাম সঙ্গে যেতে, রাজি হল না। তবে তার দোনলা বন্দুকটা দেবে বলেছে। জঙ্গল দেশে এমন মানুষ নেই যে সাহস করে আমার সঙ্গে যায়।

গুণিনদের ডাকিয়ে পাঠালে কেমন হয়। ওরা মন্ত্র দিয়ে বাঘ বন্ধ করে। ওদের সাহায্য নিতেও তো পারেন।

ওসবে আপনি বিশ্বাস করেন?

ওরা যখন চুরি করে হরিণ মারে তখন ওদের জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন। ওরা বলে আমরা বাঘ বন্ধ করে বনে যাই। তাই বাঘ কিছু করতে পারে না।

ওরা দিনের বেলায় চুপি চুপি হরিণ চলাচলের পথে জাল পেতে রাখে। রাতের বেলায় গাছের মাথায় বসে থাকে। হরিণ জালে পড়লে লাঠি দিয়ে আট দশ জনে পিটিয়ে মারে হরিণকে। মন্ত্র দিয়ে বাঘ বন্ধ করার দরকার হয় না। একবার শান্তরামের শ্বশুর হরিণ মারতে কি বিপদে পড়েছিল তাতো শুনেছেন। শান্তরামের শ্বশুরকে সবাই জানে মস্ত বড় গুণিন। জালপেতে, মন্ত্র দিয়ে বাঘ বন্ধ করে গাছের মাথায় বসেছিল। জালে শব্দ হতেই গাছ থেকে নেমে লাঠিপেটা আরম্ভ করতেই মন্ত্র 'ফুঁ' হয়ে গেল। হরিণ নয়, সাক্ষাত বাঘ পড়েছে জালে। অন্ধকারে হরিণ ধরতে একেবারে বাঘের মুখে। তারপর বুনো গাছগাছড়ার ওষুধ। তাতে কোন ফল হল না। পচে উঠল গোটা দেহটা। নিয়ে গেল হাসপাতালে। ওসব দিয়ে কি হবে। তার চেয়ে চলুন আমরা দুজন গিয়ে ফয়সালা করে আসি।

সুরেশ মণ্ডল চুপ করে শুনছিল এতক্ষণ। আমি থামতেই বলল, গিয়েছিলেন আপনি?

বললাম, সেই কথাই তো বলছি। না গিয়ে উপায় ছিল না। বর্ধনবাবুর সঙ্গে রোজ সকালে খেয়ে দেয়ে তুলসীপাড়া যেতাম, সন্ধ্যেবেলায় ফিরে আসতাম। পাঁচ ছয় দিন সাইকেলে যাতায়াত করলাম, বাঘের সাথে দেখা আর হল না।

তুলসীপাড়া গ্রামের উত্তর দিকে খোলা মাঠ। মাঠটা প্রায় দু ফার্লং লম্বা। মাঝে মাঝে কয়েকটা পনর ষোল ফুট উঁচু বুনো গাছ। মাঠে কচি কচি ঘাস। গ্রামের রাখালরা এখানে গরু ছাগল চরাতে আসে। গেরস্ত বউরা দড়ি দিয়ে খুঁটোতে গরু বেঁধে দিয়ে যায়। সন্ধ্যার আগে গরু ছাগল সবাই ফিরিয়ে নিয়ে যায় ঘরে। এতকাল কোন উৎপাত ছিল না। কোন সময় কেউ ভাবতও না এই মাঠে কোন বিপদ আছে। এ বছরেই হঠাৎ এই বিপদ।

প্রথম দিন দুপুর বেলায় ঘেনু বড়ুয়ার এগার মাস বয়সের এঁড়ে টেনে নিয়ে গেল বাঘে। রাখালরা হৈ-হৈ করে পালিয়ে এসে খবর দিল ঘেনুকে। মাঠে বাঘ আসতে পারে বিশ্বাস করতে চায়নি কেউ। সব রাখালই যখন একবাক্যে বাঘের কথা বলল তখন সবাই বিশ্বাস করল। তবে বাঘের সাইজটা নিয়ে যত গোলমাল। কেউ বলল পাঁচ হাত, কেউ বলল সাত হাত। মোটামুটি সবাই বুঝল, বাঘটা বেশ বড়।

সংবাদ সংগ্রহ করলাম। বাঘের অবস্থিতি সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হলাম। কিন্তু পাঁচ ছয় দিনে বাঘের সাক্ষাৎ পেলাম না।

অবশেষে আশা ছেড়ে দিয়ে বললাম, আর বাঘ আসবে না।

বর্ধনবাবু আমার সঙ্গে একমত।

গ্রামের লোকদের ডেকে বললেন, আর বাঘ আসবে না। তোমরা নিশ্চিন্তে থাকতে পার। বাঘ অতি চতুর, সেও বুঝতে পেরেছে বিপদ তার সামনে।

বাঘ সোজা পেছনের পায়ে দাঁড়িয়ে...

তুলসীপাড়া থেকে সেদিন বেশ তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছিলাম। তখনও বাড়ি ফিরিনি। রেনজারের বাংলোতে বসে চা খাচ্ছি। এমন সময় সাইকেল চেপে ছুটতে ছুটতে এল কেলো রাজবংশী। এসেই ধপাস করে পড়ে গেল সিঁড়িতে।

কেলো তুলসীপাড়ার বাসিন্দা, কোন বিপদ হয়েছে বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি তাকে টেনে তুলে জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে।

কেলো রাজবংশী কাঁপতে কাঁপতে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় যা বলল তার অর্থ হল : সাহেব ফিরে আসার পরই চিৎকার শুনে কেলোর বউ বাইরে এসে দেখে বাঘ তার দু বছরের মেয়েটার গলা কামড়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল কেলো রাজবংশী।

আমরা চিন্তিত হলাম।

ডুয়ার্সের বাঘ তো সাধারণত 'ম্যান ইটার' নয়, ক্বচিৎ কখনও শোনা গেছে এই বনে বাঘ মানুষ মেরে খেয়েছে। অথচ দিনের বেলায় ঘরের পেছন থেকে একটা শিশুকে টেনে নিয়ে গেল, আশ্চর্য।

বর্ধনবাবু নতুন লোক। ম্যান ইটারের চরিত্র অনুধাবন করতে পারছেন কিনা জানি না। আমি নিজের মনেই বললাম, বাঘিনী এবং বয়স বেশি।

কেন?—প্রশ্ন করল বর্ধনবাবু।

প্রথম কারণ, যতগুলো জন্তু মারা গেছে তা সবই ছোট ছোট জন্তু, আবার মানুষ যেটা মারা গেছে সেটা শিশু। বয়স বেশি না হলে বড় বড় জন্তু মারার চেষ্টা করত। আর বাঘিনী বলছি, কেননা, এত সাহস ও হিংস্রতা বাঘের সাধারণত থাকে না। বাঘ একটু গভীর জঙ্গলে থাকতে ভালবাসে।

বর্ধনবাবু বললেন, ওসব হল থিওরি। প্র্যাকটিশ হয় কি করে বাঘ মারা যায়!

চেষ্টা করতে হবে। কদিন আমরা মাঠে ঝোপে চলাচল করেছি, বাঘ সতর্ক থেকেছে। আজ সুযোগ পেয়েই শিশু মেরেছে। এবার আমাদের সতর্ক হতে হবে, আত্মগোপন করে অপেক্ষা করতে হবে। আবার মাঠে গরু ছাগল ছেড়ে দেবার ব্যবস্থা করতে হবে। তুমি থানায় যাও কেলো, আমরা এর ব্যবস্থা করছি। আমাদের সাধ্য থাকলে তোমার মেয়েকে বাঁচাতাম নিশ্চয়ই। ঘটনাটা যা ঘটেছে তাকে রোধ করার কারও ক্ষমতা ছিল না। থানা থেকে বাড়ি যাও। গ্রামের লোকজন নিয়ে জঙ্গলে খুঁজে দেখ। হয়ত পেয়েও যেতে পার মেয়েকে।

কেলো রাজবংশীকে স্তোকবাক্য শুনিয়ে ফেরত দিলাম কিন্তু নিজেদের কোন সান্ত্বনা নেই।

বর্ধনবাবু সত্যিই খুবই ব্যথিত হলেন কেলো রাজবংশীর কথায়। অনেক ভেবে সিগারেটে আগুন দিলেন। সিগারেটে আগুন দিয়ে অনেকক্ষণ নি:শব্দে ধোঁয়া টানতে থাকেন। আমিও চুপ করে বসে রইলাম।

নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে বর্ধনবাবু বললেন, এর শেষ চাই মশাই। কালকেই।

আবার সকাল হল।

বর্ধনবাবু প্রস্তুত হয়ে বের হলেন।

আমিও চললাম তার সঙ্গে।

তুলসীপাড়া পৌঁছে গেলাম এক ঘণ্টার মধ্যেই।

রোজকার মত আজ আর মাঠে গেলাম না। বনের পথ ধরে উত্তর দিকে এগোলাম দুজনেই। মাঠ একচক্র ঘুরে উত্তর দিক থেকে গ্রামের দিকে এগোতে এগোতে হাড়িকাঠের মত গাছের ডাল দেখে বর্ধনবাবু উঠে বসলেন। আমাকে পাশের গাছে উঠে বসতে বললেন।

গাছে উঠতে উঠতে বললাম, আরও একটু উঁচুতে বসুন বর্ধনবাবু। পাঁচ ছয় ফুট উপরে বসা মোটেই নিরাপদ নয়।

বর্ধনবাবু হেসে বললেন, মরতে তো একবারই হবে।

এর পর মন্তব্য ও প্রশ্ন অনাবশ্যক।

আমি গিয়ে বসলাম একেবারে গাছের মাথায়। অন্তত দশ ফুট উঁচুতে।

সামনের মাঠে আমাদের নির্দেশমত কয়েকটা গরুছাগল ছেড়ে দিল গ্রামের লোকেরা। ঘরের ছাদে বসে তারাও লক্ষ্য করছে বাঘ কোথা দিয়ে আসে কি না। সবার নজর জঙ্গলের দিকে। প্রার্থিত বাঘ কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। সবাই বেশ আগ্রহী অথচ অধৈর্য।

বেলা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শীতের বেলা। দুটো বাজতে না বাজতে গভীর বনের মাথায় হেলে পড়ল দিনের আলো। মাঝে মাঝে বন মোরগের ডাক শোনা যাচ্ছে। দিনের বেলায় এমন নিস্তব্ধতা কোথাও থাকতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

আমাদের আশ্রয় থেকে বন আরম্ভ হয়েছে প্রায় বিশ পঁচিশ হাত দূরে। সেদিকেই আমার নজর। আর বর্ধনবাবু নজর রেখেছেন গরু-ছাগলের দিকে। কারও মুখে কোন শব্দ নেই। এমন কি হাত-পা নাড়তে হলেও সাবধানে তা করতে হচ্ছে।

শিকারীদের কাছে শুনেছি, বাঘ দেখামাত্র এক রকম ভীতিতে আচ্ছন্ন হয় তারা। কারও সেই ভীতি দুচার মিনিট থাকে, কারও তা স্থায়ী হয়। এর ফলে অনেকেই আশ্রয় স্থল থেকে বাঘের মুখে পড়ে যায়। অনেকেই বাঘ শিকার করার বদলে নিজেই বাঘের শিকার হয়। অনেক সময়ই 'মিস ফায়ার' হয়। আসবার সময় এসব কথা বর্ধনবাবুকে রোজই বলেছি। বর্ধনবাবুও আমাকে বলেছেন, আমার ওসব নেই, আপনি বরং সাবধানে থাকবেন। আপনি তো য়্যামেচার।

রহস্য করে যা বলা হয় তা যে বাস্তবে পরিণত হতে পারে তা বর্ধনবাবু স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি।

পাশের জঙ্গলে খস খস করে শব্দ হতেই সতর্ক হলাম। প্রথমে মনে হল, বোধহয় শেয়াল। উঁহু। হামাগুড়ি দিয়ে চারিদিকে নজর রেখে জঙ্গল থেকে বের হল বিরাট এক চিতাবাঘ।

বর্ধনবাবুর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ফিস ফিস করে বললাম, পেছনে বাঘ। প্রস্তুত হন।

আমার কথা শেষ হতেই বর্ধনবাবু ফিরে তাকালেন।

ততক্ষণে বাঘ একেবারে বর্ধনবাবুর গাছের তলায়। ওপরে খস খস শব্দ শুনে বাঘ মুখ তুলে তাকাল। মনে হল বর্ধনবাবুও ফায়ার করতে প্রস্তুত হলেন। নিমেষে দুঘর্টনা ঘটে গেল।

হাড়িকাঠের দুদিকে পা ঝুলিয়ে বসেছিলেন বর্ধনবাবু। বাঘ সোজা পেছনের পায়ে দাঁড়িয়ে বর্ধনবাবুর বুটসমেত পায়ের গোড়ালি কামড়ে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে টেনে নামাল তাকে গাছ থেকে। বর্ধনবাবুর হাত থেকে ছিটকে পড়ল বন্দুক। বর্ধনবাবু হুমড়ি খেয়ে পড়লেন বাঘের পিঠে। এবার যে বাঘ বর্ধনবাবুকে টানতে টানতে বনে নিয়ে যাবে সে বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নেই। আমিও প্রায় দিশেহারা।

কি করব ঠিক করতে হল কয়েক সেকেন্ডে।

বাঘের পলায়ন পথ আমার গাছের তলা দিয়ে। বনে ঢুকতে যদি বাধা না দেই তা হলে বর্ধনবাবুকে আর জীবিত পাবার কোন আশা নেই। গাছ থেকে সর সর করে নেমে লাফিয়ে পড়লাম দুজনের সামনে। তখন দুজনের মল্লযুদ্ধ চলছে। বর্ধনবাবু বাঘের গলা জড়িয়ে ধরেছে, বাঘও তাকে টেনে নেবার চেষ্টা করছে।

আমি বন্দুক নিয়ে প্রস্তুত কিন্তু গুলী করার সুযোগ ও সুবিধা পাচ্ছি না।

হঠাৎ ধপাস করে শব্দ হতেই বাঘও একটু চমকে উঠেছিল। সেই অবসরে রক্তাক্ত পা খানা বাঘের মুখ থেকে টেনে নিলেন বর্ধনবাবু। আমিও সুযোগ বুঝে দমাদম দুটো ফায়ার করে আবার বন্দুক লোড করে নিলাম। বলাবাহুল্য বাঘের গায়ে একটিও গুলী লাগেনি। হতচকিত বাঘ তার মুখের শিকার ফেলে একলাফে গিয়ে ঢুকল বনে।

ছুটে গেলাম বর্ধনবাবুর কাছে। এতক্ষণ সজ্ঞানে বর্ধনবাবু লড়াই করছিলেন বাঘের সাথে। বাঘের মুখ থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আর তার জ্ঞান ছিল না।

বন্দুকের শব্দে গ্রামের লোকেরা হৈ-হৈ করে ছুটে এল।

বাঘ শিকার সম্ভব হল না, বর্ধনবাবুও পাকা শিকারী নন। কিন্তু বর্ধনবাবু বাঘের সঙ্গে লড়াই করে যে সাহস দেখিয়েছিলেন সেটাই স্মরণীয় ঘটনা। আমি একাই তা দেখিনি, গ্রামের বহুলোক তা দেখেছিল।

বর্ধনবাবুকে হাসপাতালে পাঠিয়ে বেশ দু:খিত মনেই ফিরে এসেছিলাম।

হাসপাতালে যেদিন বর্ধনবাবুর জ্ঞান হল, সেদিন প্রথম কথা বলেছিলেন, আমার পা!

একটা পা কেটে ফেলতে হয়েছিল তার। কিন্তু তুলসীপাড়ায় সেই থেকে আর বাঘের উৎপাত হয়নি।

ঘটনা বলা শেষ করে বললাম, এইজন্যই বর্ধনবাবুর কথা আজও লোকের মনে আছে সুরেশবাবু। বনে বাস করতে হলে বাঘ ভাল্লুককে দেখে ভয় পেলে চলবে না। মরণ তো একদিন আসবেই। মরণের ভয়ে রোজ মরলে নিজেরই অখ্যাতি। বুঝলেন।

সকল অধ্যায়
১.
মাটি
২.
ভুতের গল্প
৩.
হর্ষবর্ধনের অশ্বরোগ
৪.
সেই মেয়েটি
৫.
বিদ্যাসাগরের ছেলেবেলা
৬.
গোয়েন্দা
৭.
ইতিহাস ছাড়িয়ে
৮.
যমালয়ে জীবন্ত মানুষ
৯.
ডাকিনীর ডাক
১০.
শত্রুতা
১১.
রেলে
১২.
অতু
১৩.
এক যে ছিল বাঘিনী
১৪.
দাওয়াই
১৫.
বিশ্বের বিস্ময় হেলেন কেলার
১৬.
ফুলের বিবাহ
১৭.
মংলুফলায় সোনা
১৮.
একটি গল্প করার মত গ্রাম
১৯.
লালমণি পাখি
২০.
প্লাবন
২১.
ছাত্র-সঙ্গীত
২২.
জয়-পরাজয়
২৩.
এখন শিউলি-বেলা
২৪.
আশ্বিনে
২৫.
ছড়া
২৬.
পোড়ো কুঁড়ে
২৭.
মা (উপন্যাস)
২৮.
গোর্কির ছেলেবেলা
২৯.
সেয়ানে সেয়ানে
৩০.
সুড়ঙ্গের রহস্য
৩১.
এক ঝাঁক গল্প
৩২.
কঙ্কাল
৩৩.
নতুন করে জাগো মা
৩৪.
বেতাল-পঞ্চবিংশতি
৩৫.
ভবঘুরের চিঠি
৩৬.
নিলাম দামী চশমা
৩৭.
শরৎ এল
৩৮.
কৈশোর
৩৯.
আলোর ডাকে
৪০.
অগ্রদূত
৪১.
টাকার কথা
৪২.
সাহস চাই!
৪৩.
ভোজবাড়ীর ব্যাপার
৪৪.
আবাহনী
৪৫.
এবার পূজায়
৪৬.
বামুনের স্বর্গবাস
৪৭.
মজার ধাঁধা
৪৮.
আংটির পাথর
৪৯.
মনমঞ্জুষা
৫০.
নিখিল বঙ্গ গরু সম্মেলন
৫১.
মিকি ডাক আর দিসনে
৫২.
মেঘনাদবধ
৫৩.
চৌধুরী-বাগ
৫৪.
জাদু বিদ্যা
৫৫.
বাবার চিঠি
৫৬.
গানের কথা
৫৭.
আমার প্রথম শিকার আভিযান
৫৮.
বিশ্বক্রীয়া ওলিম্পিক
৫৯.
বাংলার বন্যা
৬০.
শরতে
৬১.
আনন্দ আশ্বিনে
৬২.
টোটকা কিছু
৬৩.
জলদি করুন দাদা
৬৪.
কিশোর বিজ্ঞানীর আসর
৬৫.
সঙ্গীতের মৃত্যু
৬৬.
ছত্রপতি
৬৭.
মেঘ ও বৃষ্টি
৬৮.
মধুপালের আবির্ভাব

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%