বামুনের স্বর্গবাস

দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বীরেশ চট্টোপাধ্যায়

দিনকাল বড় খারাপ যাচ্ছে বামুনের!

পরকাল, পরকাল, পরকাল! ভেবে ভেবে সে আর পারে না। কী যে হয়েছে আজকাল, দিনরাত শুধু ঐ এক চিন্তা মাথার মধ্যে ভন ভন করে। খেতে-শুতে উঠতে-বসতে—নিষ্কৃতি নেই দু দণ্ডের জন্যেও। কোথায় দুটো অন্য কথা চিন্তা করবে একটু নিশ্চিন্ত মনে, কিন্তু তার কি ছাই জো আছে? অমনি পরকালের ভাবনা এসে যেন ভিমরুলের মত ছেঁকে ধরে।

বয়সটাও তো আর বামুনের কম হয় নি? যে-বয়সে মানুষ এক পা ইহকালে, অন্য পা পরকালে অর্থাৎ ঠিক যে কোথায় রাখবে বুঝতে না পেরে মহাপ্রস্থানের জন্যে আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চোখের দৃষ্টি ঝাপসা করে ফেলে, বামুনের বয়সটাও এখন তাই। একে তো পাকাটির মতো চেহারা, তার উপর এই বয়স! এ বয়সে কি এত ভাবনা-চিন্তার ধকল সয় শরীরে?

কিন্তু সে-কথা বোঝে-টা কে? অষ্ট প্রহর ধরে অহরহ এই পরকালের চিন্তাই যে তার হাড়-মাস সব একেবারে কালি-কালি করে ছাড়লে, সেটা কি আর ওই পরলোকের নবাবপুত্তুরগুলো বোঝে? তারা তো বেশ বহাল তবিয়তে আছে! সমন পাঠিয়ে দিলেই হল—তোমার ইহকালের মেয়াদ শেষ! ব্যস! এবার পরকালে এসো, তোমার পাপপুণ্যের বিচার হবে। নিক্তিতে পাপপুণ্য ওজন করে স্থির হবে তোমার নরকবাস আর স্বর্গবাসের মেয়াদ।

রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বামুনের। কিন্তু উপায় কী? হাতের কাছে তো আর নবাবপুত্তুরগুলোকে পাবার উপায় নেই। পেলে না হয় তাদের ভাবসাবগুলো বুঝে একবার বোঝাপড়া করে নেওয়া যেত।

আর, ঐ পাপপুণ্যি! মানুষের পাপপুণ্যি বিচারের ভার কে কবে দিয়েছে ওদের হাতে? কী বোঝে তারা মানুষের ব্যাপার-স্যাপার? এ কথা কি বামুন কোনদিন অস্বীকার করেছে যে, কিপটেমি সে করে নি? আলবৎ করেছে! সারাটা জীবনভোরই তো সে তা-ই করে বেড়িয়েছে, নিজের আত্মাকে পর্যন্ত উপোস করিয়ে কষ্ট দিয়ে রেখে তিলে তিলে সব কিছু জমিয়ে গেছে, কোনদিকে ভ্রূক্ষেপ করে নি পর্যন্ত।

কিন্তু কিপটেমিটা যে পাপকাজ, এমন কথা কোন শাস্ত্রে লেখা আছে? আর, সব কিছু দানপত্র করে সন্ন্যেসী হয়ে বেরিয়ে পড়লেই বুঝি পুণ্যি করা হয়?

এতসব বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিজের মনকে যতই সান্ত্বনা দিক বামুন, মন কিন্তু তা মানে না। দিনরাত ঐ এক পরকালের চিন্তাই তাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খায়, দু-দুটো কান ঝালাপালা করে ছাড়ে। কোন কাজে মন বসে না, কোন কিছু ভাবতে পারে না। পাকাটির মত দেহখানা শুকিয়ে আধখানা হবার যোগাড় হয়েছে।

সত্যিই তো, পরলোকের ওঁরা যখন খতিয়ান খুলে দেখবে, তখন কি আর কিছু গোপন থাকবে? পুণ্যের ঘরটা যে একদম ফাঁকা, সেটা তো আর চোখে না পড়ে পারবে না? আর, পুণ্যি কী করেছি জিজ্ঞাসা করলে আমিই বা তার কী উত্তর দেব? পুণ্যি করেছি, এমন তো কোন নজিরই দেখাতে পারব না!

না:, আর পারে না বামুন ভেবে ভেবে। কপাল ঠুকে সব ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

মাঝে মাঝে ভাবে, ছাইপাঁশ চিন্তাটা মন থেকে একেবারে ঝেঁটিয়ে দূর করে দেবে। কিন্তু তা-ও কি ছাই হবার জো আছে?

এই তো সেদিন। কলকেয় তামাক সাজতে গিয়ে ভাবনাটা মনের মধ্যে যেই একটু উঁকি দিতে গেছে, অমনি সে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গান শুরু করে দিলে, বল মা—উঁহু, সুরটা ঠিক আসছে না যে, কেমন যেন বেসুরো বেখাপপা লাগছে কানে?

তা, কে-ই বা আর শুনতে আসছে! এ তো সে আসরে শোনাতে বসে নি, নিতান্ত কিনা প্রাণের তাড়নায় এখন গাইতে হচ্ছে! তবু চারিদিকে একবার না তাকিয়েও পারে না বামুন।

কিন্তু—বল মা তো হল, তারপর? তারপর যে আর মনে পড়ে না ছাই!

বল মা...বল মা...। হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে এবার। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বামুন গান জুড়ে দেয়,—

বল মা 'আমি' দাঁড়াই কোথা?

বল মা 'আমি' দাঁড়াই কোথা?

না:, বিস্মরণশক্তিরও বলিহারি যাই বাপু! এর মধ্যে গানের পরের কলিটা বেমালুম গায়েব করে দিলি? কিছুতেই আর সেটা মনে আসে না বামুনের। কিন্তু গানও সে থামায় না, কলিটা স্মরণ করতে করতে গান চালিয়ে যায়,

বল মা 'আমি' দাঁড়াই কোথা?

হ্যাঁ হ্যাঁ, এবার মনে পড়েছে—

বল মা 'আমি' দাঁড়াই কোথা?

আমার কেউ না-আ-ই শঙ্ক—

ওই দেখ! একটু যদি ভুলে থাকবার জো আছে! গান করতে গিয়েও রক্ষে নেই, অমনি এসে হাজির পরলোকের এক নবাবগিন্নি!

না:, সুর কেটে গেছে, আর হয় না। কী দশাই না ওঁরা করে ছেড়েছে মানুষগুলোর। একে তো আধ-প্রাণে, তার ওপর নামধাম এটাসেটা, যতসব ছাইভস্ম দিয়ে কী আষ্টেপৃষ্ঠেই না বেঁধেছে এই ইহলোকের দোপেয়ে জীবগুলোকে।

কী আর করে বামুন। বাধ্য হয়ে এবার থেকে তাকে অন্য ধাঁধায় ঘুরতে হয়। পরকালের ডাক তো এল বলে, তার আগে ছিটেফোঁটা হলেও...

কথাটা যেই না মনে হওয়া, আর যায় কোথা! সঙ্গে সঙ্গে বামুনের মাথায় হাইকোর্ট খেলতে শুরু করে দিলে—তাই তো, মরার আগে কী করে একটু আধটু পুণ্যি করে যাওয়া যায়? কিপটেমিটা যদি নির্ভেজাল পাপ হয়, তবে তো নির্ঘাৎ তার ভাগ্যে অনন্তকালের জন্যে নরকবাস বরাদ্দ। স্বর্গবাসের সুখ! তার কোন ভরসা নেই। সুতরাং পটল তুলবার আগেই—।

সেদিন দাওয়ায় বসে বামুন এইসব কথাই ভাবছে আর তামাক টানছে ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ। এমন সময় তার বাড়ীর সামনের পথ দিয়ে যাচ্ছিল একজন লোক। গলায় তার কাছির মতো মোটা ঝকঝকে উপবীত আর মাথায় গিঁট দিয়ে বাঁধা টিকিগাছ দেখে মানুষটি যে ব্রাহ্মণ, সেটা বুঝতে আর দেরি হল না বামুনের। লোকটিকে দেখবার সঙ্গে সঙ্গে বামুনের মাথায় পুণ্য লোভের এক মতলব খেলে গেল। মরি-বাঁচি করে কোন রকমে তাড়াতাড়ি হুঁকোটা বাঁশের খুঁটিতে ঠেস দিয়ে রেখে ছুটে গিয়ে সে হাজির হল বামুনের কাছে এবং গলবস্ত্র হয়ে করজোড়ে বললে, ''আপনি তো, দাদা, জাতিশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ। বেদে আছে, ব্রাহ্মণের পদধূলিতে পাপপুরীও স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়। তাই হে নরশ্রেষ্ঠ বিপ্রদেব, কৃপা করে এই হীন অধমের জীর্ণ কুটিরে একবার আপনার পদধূলি দিতে হবে।''

হঠাৎ ছুটতে ছুটতে আসা বামুনের কথাগুলি শুনে দাদার চক্ষু তো ছানাবড়া! কিছুই বুঝতে না পেরে তিনি কিপটেটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে শুধু চেয়ে রইলেন। অবস্থাটা আঁচ করেই বামুন আবার বললে, ''আসুন প্রভু, বেলা যায়। পুণ্যসঞ্চয়ের ব্যাপারে অনর্থক অন্য চিন্তায় কালক্ষেপ বা বিলম্ব সমীচীন নয়।''

দাদাটি তখন কী আর করেন, নীরবে বামুনের পিছন পিছন চলতে লাগলেন।

বাড়ী পৌঁছেই কিপটেটা বললে, ''প্রভু, আজ তিন দিনব্যাপী আমি ব্রত উপলক্ষে উপবাস করে আছি। আর কিছুক্ষণের মধ্যে ব্রতের নির্দিষ্ট তিন দিন পূর্ণ হবে। কিন্তু সে ব্রতের অতি প্রয়োজনীয় একটি আচার হচ্ছে—নির্দিষ্ট সময় উত্তীর্ণ হবার আগেই ব্রাহ্মণকে গোদান। তাই আমার এই দুগ্ধবতী গাভীটিকে আপনার হস্তে সমর্পণ করতে চাই।'' বলতে বলতে বামুন উঠানের একপাশে বাঁধা হাড়জিরজিরে মৃত্যুপথযাত্রী গরুটিকে টানতে টানতে এনে হাজির করলে সেই ব্রাহ্মণের সামনে এবং বললে, ''কৃপা করে অধমের এই তুচ্ছাতিতুচ্ছ দানটুকু প্রসন্ন চিত্তে গ্রহণ করুন দাদা।''

দাদাও তখন নিরুপায়—বাধ্য হয়ে সেই রুগ্ন মরণাপন্ন গরুটিকে তিনি গ্রহণ করলেন; এবং তারপর সেটার গলার দড়ি ধরে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে চললেন বাড়ীর দিকে।

কিন্তু বাড়ী পৌঁছুবার আগেই রুগ্ন দুর্বল দেহে আর চলতে না পেরে গরুটি শয্যা নিলে পথের মাঝে এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই যাত্রা করলে পরলোকের দিকে।

এদিকে কিপটে বামুন তখন মনের খুশিতে দাওয়ায় বসে অবিরাম হুঁকো টানছে ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ। ব্রাহ্মণকে গোদান করে পুণ্য সঞ্চয় হয়েছে—এই চিন্তায় সে তখন এমনই মশগুল যে, কলকের আগুন যে কখন নিভে গেছে, সেদিকে খেয়ালই নেই। ব্রাহ্মণটিকে বিদায় করে অবধি মনের আনন্দে সে ঐ নেভা কলকের তামাকই টেনে চলেছে একনাগাড়ে। আর কী! স্বর্গবাস এবার আর তার ঠেকায় কে!

এর পর থেকে বামুনের দিন যায় মহাসুখে। এমন সময় হল কী—হঠাৎ একদিন সে কাউকে না কাঁদিয়ে মারা গেল পট করে এবং যথাবিধি যাত্রা করলে পরলোকের দিকে।

পরলোকে গিয়ে প্রথমেই পড়ে ধর্মরাজ যমের রাজ্য। বামুন তো বুক উঁচিয়ে খড়ম পায়ে গট গট করে সেখানে এসে হাজির। ধর্মরাজের কাছে যাবার জন্যে যেই সে গেট দিয়ে ঢুকতে যাবে, অমনি পাগড়ি মাথায় দ্বারী পথ আটকায়, জিজ্ঞাসা করে, ''কৌন হ্যায় তুম?''

পথের মাঝে এমনি বাধা পেয়ে অত্যন্ত বিরক্ত হয় বামুন, ভ্রূ কুঁচকে বলে, ''কৌন হ্যায় টৌন হ্যায় বুঝি না বাপু, সোজা বাংলা কথায় বল তো কী বলতে চাস?''

একটু থেমেই সে চোখ পাকিয়ে বলে, ''শোন কত্তা, বেশী ফট ফট করো না। তোমাদের এ পোড়া রাজ্যে আসবার আমার মোটেই ইচ্ছা ছিল না, তা দরকার তো দূরের কথা। নিতান্ত যমরাজমশাই তলব পাঠিয়েছেন, তাই আসা। নইলে এ ছাই পোড়া দেশে কি কেউ আর শখ করে আসতে চায়?'' বামুন একটু থামে, তারপর তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, ''এখন সর দেখি বাপু, পথ দে। মেলাই পাঁয়তাড়া কষিস নে।''

কেমন যেন ভ্যাবাচাকা খেয়ে যায় দ্বারী। বামুন যেভাবে তার সঙ্গে আলাপ করলে, তেমনটি আগে কখনও কেউ করে নি। অধিকাংশ কথাই সে বুঝতে পারলে না, কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলে বামুনের দিকে। আর, বামুনও ঠিক সেই ফাঁকে বুক ফুলিয়ে খড়ম পায়ে ঢুকে পড়লে গেট দিয়ে।

কয়েক কদম এগিয়ে বাঁক ফিরতেই সে গিয়ে উপস্থিত স্বয়ং ধর্মরাজের রাজসভায়। রাজসভা শূন্য—যমরাজ বসে আছেন সিংহাসনে, পাশেই খাতাপত্র দোয়াত কলম নিয়ে মেঝের উপর উপবিষ্ট চিত্রগুপ্ত। দেখেই বামুন তাঁদের চিনতে পারে, কেমন যেন নিরানন্দ বিরস বিষণ্ণ মনে হয় তাঁদের দুজনকেই। আর, ওদিকে বামুনকে দেখে তো যমরাজ ও চিত্রগুপ্তের চোখমুখ আনন্দে উজ্জ্বল উদ্ভাসিত!

ধর্মরাজের দিকে তাকিয়ে বামুন জিজ্ঞাসা করে, ''এমন মনমরা কেন প্রভু? খদ্দের মক্কেলের বাজার বড় মন্দা বুঝি?''

কথাগুলি এমনই অপমানজনক যে যমরাজ উত্তর করবেন কি, কিছুক্ষণের জন্যে হঠাৎ অন্য দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে রইলেন। একটু পরে বললেন, ''এত দেরি যে তোমার?''

''আর প্রভু দেরি! দেরির যে দোষ কোথায়, আর আমারই বা যে গাফিলিটা কোথায়—আপনিই বিচার করুন। ভালোয় ভালোয় যে শেষটায় এসে পৌঁছেছি, এ আমার-আপনার দুজনারই চৌদ্দ পুরুষের ভাগ্যি—এ আমি নিঘঘাৎ হলপ করে বলতে পারি।''

বামুন একটু থামতেই যম বিরক্তির সঙ্গে বললেন, ''ওসব বাজে কথা রাখ। তোমার দেরির কারণটা কী, তাড়াতাড়ি বলে ফেল।''

''আজ্ঞে, তাই বলছি। দেখুন না কী ব্যাপার, মরার আগে নিজের আত্মাকে পর্যন্ত খেতে না দিয়ে তিল তিল করে যা কিছু জমিয়েছিলাম, আপনার তলব পেয়ে সেগুলো বাঁধাছাঁদা করে নিয়ে আসতে গিয়েই তো যা দেরি হয়ে গেল। এবার তাহলে আপনিই বিচার করুন, নবাবপুত্তুর, থুড়ি, মানে ইয়ে আর কি, কত্তা, দোষটা আমার কিনা। আমি কী করব বলুন, ওগুলো যে আমায় ছেড়ে দু দণ্ডও থাকতে পারে না।''

যম আর কথা না বাড়িয়ে চিত্রগুপ্তকে বললেন, ''দেখো তো বামুনের রেকর্ডটা।''

অনেকক্ষণ ধরে ফাইল খাতাপত্র ঘেঁটে চিত্রগুপ্ত গম্ভীরভাবে বললে, ''উঁহু, কোন কিছুই তো রেকর্ডে নেই দেখছি।''

শুনে বামুনও তিড়বিড় করে উঠলে, ''উঁহু নয় কত্তা, উঁহু নয়। দেখ দেখ, ভালো করে দেখ—লেখা আছে ঠিকই। তবে আমারটা তো আর যেখানে সেখানে লেখা থাকবে নি, কোণটুকচিতে কোথাও লেখা আছে। দেখ, দেখ, ভালো করে দেখ। ঝুটমুট ঝামেলা পাকিও না।''

বামুনের কথায় ধর্মরাজ কেমন যেন ঘাবড়ে যান। দাঁতে দাঁত ঘষতে ঘষতে চিত্রগুপ্তের উদ্দেশে তিনি বলেন, ''আজকাল তোর কী হচ্ছে বল তো, চিতে? তোর ভাবসাব তো বিশেষ সুবিধের মনে হচ্ছে না? ঝামেলা একটা না পাকিয়ে তুলে তুই কিছুতেই ছাড়বি নে দেখছি। কত করে বলি, খাতাপত্র ফাইল রেকর্ড সব টিপটপ রাখবি, যখনকারটা তখন, যেখানকারটা সেখানে সঙ্গে সঙ্গে বিতং দিয়ে টুকে রাখবি। কোন কাজটা পরে করব'খন বলে ফেলে রাখবি নে—তা সেসব কথা কি তোর কানে ঢুকবে না? এরপর দেখছি, তোর জন্যে আমারও বিপদের সীমা থাকবে না। নিজে তো তুই মরবিই, আমাকেও জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিয়ে যাবি। নে নে, শীগগির সব ভালো করে দ্যাখ। না:, তোর জন্যে শেষটায় না আমার এতদিনের চাকরিসুদ্ধ টান পড়ে তাই ভাবছি।''

মহারাজের তিরস্কারে চিত্রগুপ্ত একেবারে ঘাবড়ে গিয়ে গলিতঘর্ম হয়ে পড়ে। দ্রত সে আবার কাগজপত্র উলটাতে থাকে। হঠাৎ খাতার শেষ দিকে এসে তার নজরে পড়ে, সত্যিই তো, পৃষ্ঠার মাথায় এক কোণে বামুনের গরুদানের কথাটা যে লেখা আছে! লেখাটি পড়ে সে যমরাজকে শোনায়।

গম্ভীরভাবে কিছুক্ষণ কী ভাবলেন ধর্মরাজ, তারপর বললেন, ''শোন বামুন, তুমি যে গাভীটি এক ব্রাহ্মণকে দান করেছিলে, যদিও সেটা ছিল রুগ্ন শীর্ণ আর মৃত্যুপথযাত্রী, তবু শত হলেও তা গোদান।—''

''আজ্ঞে, ঠিক কথা। গোদান তো বটেই, আর—''

ভ্রূ কুঁচকে যমরাজ বললেন, ''দাঁড়াও, কথাগুলো আগে শুনে নাও। তা, যা বলছিলাম, ব্রাহ্মণকে এই গোদানের জন্যে অতি সামান্য হলেও তাই কিছুটা পুণ্যসঞ্চয় তোমার হয়েছে।—''

''আজ্ঞে, নিশ্চয়ই, তাই—।''

''আবার?'' চোখ পাকিয়ে তাকান ধর্মরাজ।

''আজ্ঞে। মানে ইয়ে—।''

''একটি কথাও যদি আর বলেছ, তবে ঘাড় ধরে তোমায় এখান থেকে বের করে দেব দারোয়ান দিয়ে।''

''আজ্ঞে।''

মুহূর্তের জন্যে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন ধর্মরাজ। তারপর বললেন, ''যাক, এই পুণ্যের বলে তুমি সাড়ে সাত দণ্ডের জন্যে স্বর্গবাস করতে পাবে, তাছাড়া অনন্তকাল তোমার নরকবাস।''

''আজ্ঞে, তবে—।'' বামুন কী বলতে যাচ্ছিল, তাকে থামিয়ে দিয়ে যমরাজ বললেন, ''তবে-টবে নয়; এখন বল, কোনটা তুমি আগে ভোগ করতে চাও—নরকবাস, না স্বর্গবাস?''

''আজ্ঞে, মানে ইয়ে, হচ্ছে গিয়ে—।'' আমতা আমতা করে কথাগুলি বলতে বলতে বামুন ঘাড় চুলকায় আর ভাবে—তাই তো, এখন কী করা? এ আবার কী ফ্যাসাদে পড়া গেল? নরকবাস আগে, না স্বর্গবাস আগে! তা, নরকবাস তো অনন্তকালের জন্যে, তার জ্বালাটা পোহাতে হবে চিরকাল। আর স্বর্গবাস মাত্র সাড়ে সাত দণ্ড অর্থাৎ প্রায় তিন ঘণ্টার জন্যে। যদি আগে নরক-বাসে যাই, তবে তার মেয়াদ যে কবে ফুরোবে, আর সে-মেয়াদ ফুরোলে তখন কর্তাদের যে আবার কী মতি-গতি হবে, কে জানে! শেষ পর্যন্ত হয়তো সাড়ে সাত দণ্ডের স্বর্গবাসটাও আর ভাগ্যে জুটবে না। সুতরাং স্বর্গবাসের সুখটাই আগে ভোগ করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

এইসব ভেবে বামুন যমকে বললে, ''আজ্ঞে কত্তা, ইয়ে মানে—ভেবেচিন্তে দেখলাম, স্বর্গবাস যখন মাত্র কয়েক দণ্ডের জন্যে, তখন স্বর্গবাসটাই আমি আগে করে নেব। তারপর যা থাকে কুল-কপালে।''

ধর্মরাজ তখন এক ভৃত্যকে ডেকে কী যেন বললেন ইশারায়। ভৃত্যটি সেখান থেকে চলে গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এল একটি নাদুসনুদুস গরু নিয়ে। যম বললেন, ''বামুন, তুমি যখন স্বর্গবাসটাই আগে ভোগ করতে চাও, তখন কী আর বলি, তা-ই হোক। তোমার এই সাড়ে সাত দণ্ডের স্বর্গবাসের সময়টুকুর জন্যে এ গরুটি তোমার রইল। এ সময়টুকুর জন্যে তুমি একে যা বলবে, তাই এ শুনবে।''

'তাই নাকি? তা বেশ, সে তো খুব ভালো কথা।'' কিন্তু ব্যাপারটা বামুনের মোটেই সুবিধের মনে হয় না—এত যত্ন এত খাতির, মায় সাড়ে সাত দণ্ডের জন্যে নাদুস-নুদুস একটা দুধেলা গাভী পর্যন্ত দান! এ আবার কী কথা? ভূতের মুখে রাম-নাম? লক্ষণটা তো বড় ভাল মনে হচ্ছে না? কেমন যেন গোলমেলে ঠেকছে ব্যাপারটা?

যমরাজের মনের কথাটি তাই যাচাই করে নেবার জন্যে বামুন বললে, ''তা, একটা কথা প্রভু মনে হচ্ছিল। যদি অধমের গুনাহ মার্জনা করেন তো নির্ভয়ে বলি।''

ধর্মরাজ নীরবে জিজ্ঞাসু চোখে তার দিকে তাকাতে সে জিজ্ঞাসা করলে, ''অধমের উপর প্রভু বড় বেশী করুণা করছেন মনে হচ্ছে?''

''কেন?''

''মানে ইয়ে। সাড়ে সাত দণ্ডের জন্যে স্বর্গবাস। তার উপর আবার সেইসঙ্গে গোদান। ব্যাপারটা কেমন যেন—।''

ভ্রূ কুঁচকে ধর্মরাজ বললেন, ''কে বললে গোদান? দান-টান নয়। সাড়ে সাত দণ্ডের জন্যে ওটা তোমায় ধার দেওয়া হচ্ছে। মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেই ওটাকে আবার খোঁয়াড়ে এনে পুরে রাখা হবে।''

''ও, তাই নাকি? তা, এই বুঝি এখানকার আইনকানুন?''

যমরাজ অতিষ্ঠ হয়ে চীৎকার করে উঠলেন, ''হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ, আর পারি নে বাপু বকে বকে, মুখ দিয়ে ফেনা ছুটে গেল। এত কথায় তোমার কী দরকার বলতে পারো? এই সাড়ে সাত দণ্ডের মধ্যে তোমার ক্ষিদে-টিদে তো লাগতে পারে, না কি?''

''আজ্ঞে, তা তো পারেই।'' দ্রুত কথাগুলি বেরিয়ে এল বামুনের মুখ দিয়ে।

''তাহলে তখন খাবে-টা কী? কাচকলা?''

''আজ্ঞে ইয়ে—।''

''আজ্ঞে ইয়ে নয়। ক্ষিদে-টিদে লাগলে তখন এই গরুর দুধ খেয়েই তোমায় থাকতে হবে। চেহারাটা তো বানিয়েছ পাকাটির মত। তারপর যদি রোগা দেহে চলতে ফিরতে গিয়ে পথেঘাটে দাঁতমুখ সিটকে অক্কা দিয়ে পড়ে থাকো তো কৈফিয়ৎটা তার দেবে কে? মেয়াদ শেষে বাহাল তবিয়তে আবার নরকবাসে ফিরতে হবে না? সেইজন্যেই ওটা তোমায় দেওয়া হল, বুঝেছ?''

''আজ্ঞে।'' বলে আস্তে আস্তে বামুন এগিয়ে যায় গরুটির কাছে। তারপর সেটাকে সামনে থেকে পিছন থেকে এপাশ থেকে ওপাশ থেকে ভাল করে দেখে নিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করে, ''কিন্তু কত্তা, কেমন যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছে একে?''

''না: আর পারি নে।'' বলতে বলতে পিছনের তাকিয়ায় গা এলিয়ে দিলেন ধর্মরাজ। চিত্রগুপ্তকে বললেন, ''যা বলবার এবার তুই-ই বল চিতে। আমি আর পারি নে। আজ আমার দফাটি রফা না করে আর এ বিদেয় হবে না দেখছি।''

চিত্রগুপ্ত বামুনের দিকে তাকিয়ে যথাসাধ্য গম্ভীর গলায় বললে, ''শোন বামুন, পূর্বজন্মে এটি তোমারই ছিল। একেই তুমি ব্রাহ্মণের হাতে সমর্পণ করেছিলে। তারপর পথে যেতে যেতেই এর মৃত্যু হয়।''

গাভীটির কাছে গিয়ে তার পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে বামুন বললে, ''বা: মণি, এই ক'দিন মাত্র এখানে থেকে এর মধ্যে তো দেখছি বেশ নাদুসনুদুস হয়ে পড়েছ? তাহলে না জানি স্বর্গবাস কী সুখের! তা, চিনতে পারছ লক্ষ্মীটি তোমার এই পূর্বজন্মের মনিবকে? বেশ বেশ চিনতে তো পারবেই। এমন মনিব তো আর আকছার পথে-ঘাটে মেলে না।'' তারপর সে যমকে জিজ্ঞাসা করলে, ''তাহলে প্রভু এই সাড়ে সাত দণ্ড গরু শুধু আমারই কথা শুনবে, এই তো?''

''হ্যাঁ।''

বামুন তাতেও নিশ্চিন্ত না হতে পেরে গরুকে শুধায়, ''শুনলে তো মণি, তুমি তাহলে আমার?''

''আজ্ঞে।''

''আমি যা বলব, শুধু তাই শুনবে তো?''

''আজ্ঞে হ্যাঁ।''

''আর কারও কথা শুনবে না?''

''আজ্ঞে না।''

বামুন নীরবে দাঁড়িয়ে কী ভাবলে কিছুক্ষণ, তারপর গরুটিকে বললে, ''তাহলে মণি, আগে একটা কাজ করো দেখি? ওই যে রোগা পটকা বুড়ো চিত্রগুপ্ত হাভাতেটাকে দেখছ, কাগজ-পত্র দোয়াত-কলম নিয়ে বসে আছে, শীগগির গিয়ে ওটাকে শিংয়ে তোল তো।''

সেরেছে! যেই-না এই বলা, আর অমনি বেধে গেল তুলকালাম কাণ্ড! শিং বাগিয়ে গরুটি তো তেড়ে গেল চিত্রগুপ্তের দিকে। আর, তাই-না দেখে বেচারা চিত্রগুপ্ত করলে কী—কাগজপত্র দোয়াত-কলম ফেলে ছড়িয়ে একাকার করে যেদিকে দু চোখ যায়, দিলে ছুট।

আর, এদিকে হল কী, তার পায়ের ঠেলায় কালি ভরা দোয়াতটি ছিটকে গিয়ে পড়ল যমরাজের কপালে, এবং সে কালিতে তাঁর সারা মুখ হয়ে গেল একেবারে কালি-কালিময়। তাঁর ভ্রূ, দু চোখের পাতা, নাক ও ঠোঁট বেয়ে কালি পড়তে লাগল টপটপ করে গড়িয়ে।

কী দিয়ে কী হল, কিছুই না বুঝতে পেরে ধর্মরাজ তখন সবে দু হাতের তালু দিয়ে মুখের কালি মুছছেন, এমন সময় বামুনের কণ্ঠস্বর তাঁর কানে গেল, ''চিত্রগুপ্তটা যাক গে, ওটা চুনোপুঁটি। এবার এই নাদুসপেটা মোটকা যমটার ভুঁড়িটা শিংয়ে ফেড়ে মাথায় তোল দেখি?''

ব্রহ্মা যে ব্রহ্মা ছোটবেলায় রেস-কম্পিটিশনে..., তিনি

পর্যন্ত পিছিয়ে পড়লেন

সাড়ে সাত দণ্ডের প্রভুর আদেশ! শুনে সঙ্গে সঙ্গে গরু তো লম্বা বাঁকানো সূচ্যগ্র শিং দুটো নেড়ে এগিয়ে গেল যমরাজের দিকে। ধর্মরাজ ততক্ষণে সবে কপাল থেকে নাক পর্যন্ত কালি মুছেছেন কি মোছেননি, এর মধ্যে বামুনের এই আদেশ!

মরেছে! কোথায় রইল মুখের কালি মোছা? সঙ্গে সঙ্গে পড়ি কি মরি করে সেই কালি-লেপা মুখেই তিনি সিংহাসন ফেলে দিলেন পাঁই পাঁই করে ছুট। একে তো মোটা মানুষ—নাদুসনুদুস দেহ নিয়ে ভালো করে ছোটাও যায় না। তার উপর আবার দৌড়তে দৌড়তে রাস্তার মাঝে কাছাটা গেল খুলে। ''দু: ছাই, কাছার নিচুচি করি।'' বলে ছুটতে ছুটতে আর দাঁত কিড়মিড় করতে করতে তিনি এক ফাঁকে কাছাটি টেনে নিয়ে নাভির উপর গুঁজে দিলেন।

এদিকে গরুটা তখন শিং বাঁকিয়ে ছুটছে তাঁর পিছু পিছু এবং তার পিছন পিছন বামুন। কোনদিকে খেয়াল নেই বামুনের। তার তখন রোখ চেপে গেছে—দেখি, স্বর্গে থাকে কে? পাপ করো পুণ্যি করো—জন্মজন্মান্তরের স্বর্গবাসটা তোমাদের বাঁধা, যেন নবাবপুত্তুরের বাপচৌদ্দপুরুষের সম্পত্তি। আর, নরকবাস কিনা যত আধ-পেরানে মানুষগুলোর জন্যে?

এইসব ভাবতে ভাবতে বামুনের তখন বাহ্যজ্ঞান এমনই লোপ পেয়ে গেছে যে, দু পায়ের এক পা থেকে খড়মটা যে কখন ছিটকে পড়ে গেছে, তা সে খেয়ালই করে নি। সে তখন এক পা খালি আর এক পায়ে খড়ম নিয়ে ছুটে চলেছে গরুটির পিছন পিছন যমকে তাড়া করে—ঠকাস থপ ঠকাস থপ।

ওদিকে চিত্রগুপ্তের তখন আর এক দশা। একে তো মানুষটা সে রোগা আধ-প্রাণে, তার উপর বুড়োও হয়েছে বেশ। তবু যমের রাজসভা থেকে বেরিয়ে কোনদিকে না তাকিয়ে তো সে প্রাণের দায়ে এক নাগাড়ে পাঁই পাঁই করে ছুটেছে কিছুক্ষণ। বেশ কিছু দূর এসে হঠাৎ তার খেয়াল হয়—তাই তো, একবার পিছনে তাকিয়ে দেখলে হয় না, শিং দুটো আসছে কিনা? ছুটতে ছুটতেই এক ফাঁকে চিত্রগুপ্ত আড়চোখে পিছন ফিরে তাকায়—না:, কেউ আসছে না।

ততক্ষণে সে হাঁপিয়ে উঠেছে—ছুটবার মতো দম আর নেই। পরিশ্রান্ত রুগ্ন দেহে সে তখন নিশ্চিন্ত মনে দাঁড়িয়ে পড়লে এবং বিশ্রাম নেবার জন্যে এক গাছের ছায়ায় গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসলো গা এলিয়ে।

ক্লান্ত দেহ! কখন এক সময় বুঝি দু চোখে তন্দ্রামতো এসেছিল। হঠাৎ দূর থেকে এক শব্দ শুনে তার কাঁচা ঘুম গেল ভেঙে। রক্তবর্ণ দুটি বড় বড় ভয়ার্ত চোখে চিত্রগুপ্ত দেখে, কালিমুখো একটা মোটা লোক, আর তার কিছু দূরে পিছন পিছন তাড়া করে ছুটে আসছে শিং দুটো এবং সেই লক্ষ্মীছাড়া বামুনটা।

বুঝতে কিছুই আর বাকি রইল না চিত্রগুপ্তের।

কিন্তু এখন সে কী করবে? ঐ শিং দুটো যে এবার আর তাকে রেহাই দেবে না? কিছুই ঠিক করতে না পেরে ভয়ে চিত্রগুপ্তের দাঁতকপাটি লেগে যায় এবং মুখ দিয়ে শুধু বেরুতে থাকে একটানা গোঁ গোঁ শব্দ।

গাছতলায় চিত হয়ে পড়ে থাকা চিত্রগুপ্তকে কিছু দূর থেকে দেখতে পেয়েই যমরাজ চিনতে পারেন। মুহূর্তের জন্যেও না থেমে ছুটতে ছুটতেই তিনি চেঁচিয়ে বলেন, ''ওরে ও পোড়ারমুখো চিতে, ব্যাপারখানা কী, এ্যাঁ? বাঁচতে চাস তো ওঠ শীগগির। এই বুঝি তোর হাওয়া খাওয়ার সময় হল? কি রে উঠলি? ওঠ বলছি শীগগির। ওই দেখ কারা আসছে।''

কিন্তু তাতেও চিত্রগুপ্তের নড়বার কোন লক্ষণ দেখা গেল না। তাই না দেখে ধর্মরাজের হল ভীষণ রাগ। ততক্ষণে তিনি তার কাছেই এসে পড়েছেন। কিন্তু মুহূর্তের জন্যেও পা দুটোকে সোজা করবার অবসর নেই। দৌড়তে দৌড়তে চিত্রগুপ্তের কাছে এসে ধপ করে তার চুলের মুঠি ধরে বললেন, ''কী রে, আর সময় পেলি নে, এখন ভিটকেলি করার সময় নাকি, এ্যাঁ? ওঠ পোড়ারমুখো, ওঠ শীগগির।''

কিন্তু চিত্রগুপ্তের মুখ দিয়ে তখন শুধু থুতুর ফেনা আর গোঁ গোঁ শব্দ বেরুচ্ছে, তাছাড়া প্রাণের আর কোন লক্ষণই নেই তার দেহে। ধর্মরাজ কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে বাঁ হাতে তার চুলের মুঠি ধরে যেমনি তীরবেগে এসেছিলেন, তেমনি তীরবেগে চললেন ছুটে। আর তার ফলে চিত্রগুপ্তের তখন যা প্রাণান্তকর অবস্থা, তা দেখলে সত্যিই মায়া হয়।

একে তো চুলের গোছা ধরে হিড় হিড় করে টানবার ফলে সমস্ত মাথাটার উপরের চামড়াটা যেন ছিঁড়ে যায় যায় আর কি! তার উপর আবার ঐভাবে টানবার ফলে পথের কাঁকর খোয়া আর কাঁটা গাছের সঙ্গে ঘষায় তার সারাটা পিঠ, উরুর পিছন আর গোড়ালি দুটোর চামড়া ছড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে রক্তারক্তি ব্যাপার। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ব্যথায় আর যন্ত্রণায় চিত্রগুপ্তের মূর্ছা গেল ছুটে, কাতর স্বরে সে ওই অবস্থায়ই যমকে বললে, ''মারা গেলাম, মহারাজ, মারা গেলাম। দয়া করে ছেড়ে দিন প্রভু, এখন আমি নিজেই ছুটতে পারব।''

ছুটতে ছুটতেই যম কথাটা ঝালিয়ে নিলেন, ''বুঝে দেখ, পারবি তো ঠিক?''

''আজ্ঞে ঠিক পারব প্রভু, ঠিক পারব, এর মধ্যে আর বেঠিক কিছু নেই।''

''নে তবে, ছেড়ে দিলাম। ছোট শীগগির।''

ছুটতে ছুটতে এক ফাঁকে যম যেই তার চুলের মুঠি ছেড়ে দিলেন, অমনি চিত্রগুপ্ত রাস্তার মাঝে এক পাক গড়াগড়ি খেয়ে নিয়েই উঠে পড়ল এবং ছুটল যমের পিছু পিছু।

যম জিজ্ঞাসা করলেন ছুটতে ছুটতেই, ''কি রে, আসছিস তো?''

''আজ্ঞে, হ্যাঁ মহারাজ।''

পথ আর ফুরোয় না। তবু যা হোক, এমনি করে ক্রোশের পর ক্রোশ ছুটতে ছুটতে শেষে এক সময় তাঁরা এসে পড়লেন ব্রহ্মার রাজ্যে।

আজ কিছু দিন ধরে বেজায় গরম পড়েছে। তার উপর রাজ্যের মধ্যে সব সময় এটা-সেটা একটা-না-একটা ঝক্কি-ঝামেলা লেগেই আছে। ফলে কিছুদিন যাবৎ ব্রহ্মার মন-মেজাজ ভালো যাচ্ছিল না মোটেই।

যম, চিত্রগুপ্ত, গরু ও বামুন—সবাই যখন ব্রহ্মার রাজ্যে এসে পড়লেন, তার অল্পক্ষণ আগে রাজ্যের কাজকর্ম সেরে সবে ব্রহ্মা গাছতলার ছায়ায় এসে একটু নিশ্চিন্ত হয়ে ঠান্ডায় বসেছেন।

এমন সময় দূরাগত চিৎকারে তাঁর কান দুটো খাড়া হয়ে উঠল খরগোশের মতো। চিৎকারটা যেদিক থেকে আসছে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেদিকে তাকালেন। দেখেন, একজন মোটা ভুঁড়িওয়ালা লোক এবং তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রোগাপানা একটি বুড়ো ছুটতে ছুটতে আসছে তাঁর দিকে। আর তাদের পিছন পিছন কিছু দূরে ছুটে আসছে শিং বাঁকিয়ে একটি গরু এবং তার পিছনে আর একজন লোক।

''না:, আবার কী ঝামেলা বাধল, কে জানে!'' বলতে বলতে ব্রহ্মা ভ্রূ কুঁচকে ভাল করে তাকালেন সেদিকে এবং চিৎকারের কথাগুলি শুনবার জন্যে কান দুটি আরও খাঁড়া করলেন। দ্বিতীয় লোকটিকে তিনি দূর থেকে দেখেই চিনতে পারলেন, এবং ভুঁড়ি ও দেহের আদল দেখে কালিমুখো প্রথম জন যে কে, তা-ও আন্দাজ করে নিতে তাঁর ভুল হল না। কিন্তু এ অবস্থা কেন এদের? বিস্ময়ে ও উদ্বেগে ব্রহ্মা উবু হয়ে বসলেন। শোনেন—প্রথম জন অর্থাৎ যম ছুটতে ছুটতে চিৎকার করছেন, ''হে স্বয়ম্ভু, হে প্রজাপতি, রক্ষা করুন পিতামহ! গেছি আজকে, আজ আর বাঁচোয়া নেই!''

ব্রহ্মা সেইভাবে বসেই চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করলেন, ''কেন, কী হয়েছে কৃতান্ত।''

''আর কি হয়েছে! কপালে যে এ-ও লেখা ছিল, কী করে জানব চতুরানন? এ জানলে কি আর ছাই যমের চাকরি নিতাম?'' যম ও অন্যান্যরা ততক্ষণে অনেকটা কাছে এসে পড়েছেন। ছুটতে ছুটতেই যম আবার বললেন, ''সাড়ে সাত, মাত্র সাড়ে সাত—উ:।''

উৎকণ্ঠিত ব্রহ্মার আর তর সয় না—যমের কথা শেষ না হতেই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ''সাড়ে সাত? সে আবার কী? কী হয়েছে তার?''

ইতিমধ্যে শোনা যায় বামুনের চিৎকার, ''গরু, যম আর চিত্রগুপ্তটা থাক। তার আগে চারমুখো ঐ বিরিঞ্চটাকে শিংয়ে তোল দেখি।''

সেরেছে! এ আবার কী কথা? কাপড়-চোপড় তখন ভালো করে পরাও ছিল না ব্রহ্মার। কিন্তু তাহলে কী হবে? সেদিকে কি ছাই দৃকপাত করবার অবসর আছে? আর, এ কথা শোনবার পর মানসিক অবস্থাও কি তখন কাপড়-চোপড়ের অবস্থা লক্ষ্য করবার মতো থাকে নাকি?

গরুর প্রতি বামুনের আদেশ শুনবার সঙ্গে সঙ্গে তাই বাঁ হাতে কোঁচাটি কোন রকমে মুঠে করে-না ধরে মুক্তকচ্ছ হয়ে ব্রহ্মা লাগালেন দৌড়। উ:, সেই কবে ছোটবেলায় দৌড় প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়ে তিনি ফার্স্ট হয়ে জলপানি পেয়েছিলেন, তাই বলে কি এই বুড়ো বয়সে আর এই বুড়ো হাড়ে সে ধকল সয়? তবু তাঁর পা দুটি এমন ক্ষিপ্রগতিতে চলতে থাকে যে, দূর থেকে মনে হয় যেন মাটির এক-দেড় হাত উপর দিয়ে ছুটে চলেছে শুধু একটি দেহ। আর, তাঁর টিকি? সেগুলি কিন্তু মাথার উপর খাঁড়া হয়ে নির্বিঘ্নে নিশ্চিন্ত মনে দাঁড়িয়ে আছে আকাশের দিকে মুখ করে।

পিছু পিছু ছুটতে ছুটতে এক সময় করুণ কণ্ঠে যম বললেন, ''হে স্বয়ম্ভু, একটু আস্তে।''

আর আস্তে! স্বয়ম্ভুর কি তখন আস্তে করবার অবসর আছে? খোদ একেবারে প্রাণ নিয়ে বলে টানাটানি! কোন দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে ব্রহ্মা চললেন উল্কার বেগে ছুটে।

যেন রেস-কম্পিটিশন! সবার আগে ব্রহ্মা তাঁর পিছনে ধর্মরাজ, ধর্মরাজের ঠিক পিছনে চিত্রগুপ্ত, এবং চিত্রগুপ্তের থেকে কিছুটা পিছনে গরুটি এবং তার পিছনে বামুন—পাঁই পাঁই করে ছুটছে সবাই তীরের বেগে। গরুটিরও তখন রোখ চেপে গেছে—কান খাড়া করে, আকাশের দিকে লেজ উচিয়ে, শিং দুটো সামনের দিক তাগ করে ছুটছে সে-ও মরি-বাঁচি করে। কিন্তু পারবে কেন ব্রহ্মার সঙ্গে, যিনি কিনা ছোটবেলায় রেস-কম্পিটিশনে নাম লিখিয়ে জলপানি পেয়েছিলেন?

এমনি করে ছুটতে ছুটতে ব্রহ্মারা সবাই এসে পড়লেন গাছ-গাছালিতে ঘেরা এক জায়গায়। হঠাৎ ব্রহ্মার কানে গেল, গাছের ছায়ায় কোথায় যেন বসে নাম-না-জানা এক পাখী মিষ্টি গলায় গান করছে মনের আনন্দে। শুনে ব্রহ্মা গেলেন বেজায় চটে, দাঁত কিড়মিড় করে চেঁচিয়ে বললেন, ''পাখী, বড় তো কপচাইতেছ, এমনি পাল্লায় তো আর পড় নি। পড়লে কোথায় কুয়ু কুয়ু বেইরে যেত।''

পরলোকের গোমড়ামুখোগুলোর মধ্যে চিত্রগুপ্তটাই যা একটু রসিক। ব্রহ্মার কথাগুলো কানে যেতে এত দু:খের মধ্যেও সে ফিক করে হেসে ফেললে। হাসির শব্দে ব্রহ্মা শুধু আড়চোখে একবার তাকালেন পিছনের দিকে। কিছুই তখন করবার অবসর নেই। দাঁতে দাঁত ঘষে অগত্যা তিনি মনের ঝাল মিটিয়ে নিলেন।

এমনি করে ছুটতে ছুটতে একসময়ে তাঁরা সবাই এসে পৌঁছলেন শিবের রাজ্যে। চারিদিকে ভূতের আড্ডা—কেউ গাঁজা টানছে, কেউ ভাঙ বাঁটছে শিলনোড়ায়, কেউ বা আবার গাঁজা ভাঙ চরস খেয়ে চিত হয়ে শুয়ে হাতাহাতি বাঁধিয়েছে আকাশের সঙ্গে।

লাইন বেঁধে ব্রহ্মাদের হঠাৎ ছুটে আসতে দেখে কিছু না বুঝতে পেরে তারা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল তাঁদের দিকে।

''কি রে শ্যাওড়াগাছ, রেস-কম্পিটিশন নাকি?''

''মনে হচ্ছে, সে রকমই কিছু এটটা হবে।''

''তা, আগে জানলে তো মোরাও নাম লেখাতে পারতাম।''

একটা ভূত চিৎকার করে ব্রহ্মাকে শুধায়, ''কী বেরমোরাজ, খবরটা কী? বুঝলাম তো, রেস-কম্পিটিশন, কিন্তু খবরটা তো আগে-ভাগে মোদেরকেও জানাবার লাগে?''

একজন রসিক ভূত আর একজনকে আস্তে আস্তে বললে, ''ওরে ও বেরমোদত্যি, দেখ দেখ, বেরমোর টিকিগুলো দেখ —কেমন খাড়া হয়ে আছে।''

একটা ভূত নেশা করেছিল খুব। সে করলে কী—ছুটতে ছুটতে এসে এক ফাঁকে ব্রহ্মাদের লাইনের মধ্যে ঢুকে শুরু করলে ছুট।

ছুটতে ছুটতে ব্রহ্মারা যখন শিবের কুঁড়ের প্রায় সিকি ক্রোশের মধ্যে এসে পড়েছেন, তখনও শিব-পার্বতীর ঝগড়া থামে নি। বাউন্ডুলে শিবটা কোন কাজ করবে না কর্ম করবে না, সারা দিনভোর শুধু পড়ে পড়ে সারা গায়ে ছাই ভস্ম মেখে বেড়াবে আর গাঁজাভাঙ খেয়ে নেশায় বুঁদ হয়ে রাস্তাঘাটে আদাড়ে ঘুরে বেড়াবে 'বোম বোম' করে। এদিকে সংসারও অচল; এমনকি আজ রাত্রে কী রান্না হবে, খাবে কী ছেলে-মেয়েরা—তা পর্যন্ত জানেন না পার্বতী। তাই শিবের সঙ্গে এই ঝগড়া। শেষে শিব আর না পেরে হাল বলদ নিয়ে সবে মাঠের দিকে যাবেন চাষ করতে, এমন সময় দূর থেকে হঠাৎ ব্রহ্মার চিৎকার শুনে শিব দাঁড়ালেন, ''ভো মহেশ্বর পশুপতি, রক্ষে কর, বিশ্বেশ্বর, রক্ষে কর। আজ আর বাঁচোয়া নেই। গেল গেল সব আজ রসাতলে গেল।''

দূর থেকে ব্রহ্মাকে দেখে উমা মাথায় ঘোমটা টেনে চলে গেলেন ঘরের মধ্যে। আর, কিছুই বুঝতে না পেরে শিব অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন ব্রহ্মাদের দিকে। ইতিমধ্যে বামুনের চিৎকার শোনা যায়, ''এবার আগে গিয়ে ঐ চুড়ো করে চুল বাঁধা তিনচোখো বিরুপাক্ষটাকে শিংয়ে তোল তো দেখি, মণি। কাজ নেই কম্ম নেই, পরমানন্দে শুধু সারা গায়ে ছাইভস্ম মাখছেন, গাঁজাভাঙ খাচ্ছেন, আর ভুঁড়ি ভাসাচ্ছেন। দাঁড়াও, মজা দেখাচ্ছি।''

যেই না একথা কানে যাওয়া, আর সঙ্গে সঙ্গে চক্ষের নিমেষে শিব উধাও। ব্রহ্মা যে ব্রহ্মা ছোটবেলায় রেস-কম্পিটিশনে ফার্স্ট হয়ে জলপানি পেয়েছিলেন, তিনি পর্যন্ত পিছিয়ে পড়লেন। যে ভূতটা নেশার ঘোরে ব্রহ্মাদের লাইনে ঢুকে দৌড় শুরু করেছিল, বামুনের কথা কানে যেতেই চক্ষের নিমেষে তার নেশার ঘোর গেল কেটে। এক ফাঁকে সে এক ঝোপের মধ্যে গিয়ে ঝুপ করে লুকিয়ে পড়লে।

শিব ও অন্যান্যরা লাইন বেঁধে ছুটে সেখান থেকে বেরিয়ে যেতেই সে ঝোপের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসে তারস্বরে চিৎকার শুরু করে দিলে, ''ওরে ও শাকচুন্নী, ও বুধো, কে কোথায় তোরা আছিস রে, শীগগির আয়, শীগগির আয়—বুড়োটা আজকে মরেছে। নিঘঘাৎ আজ আর ওর রক্ষে নেই। খোদ একেবারে মানসির পাল্লায় পড়েছে রে, মানসির পাল্লায় পড়েছে।''

রাজ্যটা শিবের খুব বড় নয়। তাই পাঁই পাঁই করে ছুটতে ছুটতে অল্পক্ষণের মধ্যে তাঁরা এসে পড়েন বিষ্ণুর রাজ্যে। চারিদিকে তাকাতে তাকাতে বামুনও ছুটছে গরুর পিছু পিছু। আ: চোখ আর ফেরে না—কী সুন্দর চারিদিকের শোভা, যেন সাজানো বাগান। দূর থেকে চোখে পড়ে নারায়ণের প্রাসাদপুরী গোলোকধাম, মনে হয় যেন ছবি দেখছে সে।

নারায়ণ তখন লক্ষ্মীকে নিয়ে পায়চারি করছিলেন বাগানে। হঠাৎ পরিচিত গলার অর্থাৎ বদমেজাজী শিবের চিৎকার শুনে থমকে দাঁড়ালেন, ''ও হরি, পুণ্ডরীকাক্ষ, খুব তো নিশ্চিন্তে হাওয়া খাওয়া হচ্ছে। ভেবেছ কোনটা, এ্যাঁ? এসব কী অনাসৃষ্টি শুনি? বাপ-পিতাম'র জীবনটা যে আজ বেঘোরে পয়মাল হবার জোগাড়, সে খেয়াল আছে? ও হৃষীকেশ, শুনতে পাচ্ছ, নাকি কানে তুলো গুঁজে বসে আছ?''

বিষ্ণু তাকিয়ে যা দেখলেন, তাতে এরূপ ব্যাপারের কোন অর্থই খুঁজে পেলেন না। শুধু নিষ্পন্দ হয়ে ছুটে আসা শিব-ব্রহ্মাদের দিকে রইলেন তাকিয়ে।

ইতিমধ্যে ছুটতে ছুটতে তাঁরা বিষ্ণুর কাছে এসে পড়েছেন। নারায়ণকে দেখে বামুন গরুকে বলল, ''গরু, আসলটাকে এবার পেয়েছি। যাও তো এবার, ঐ যে চারভুজো গোবিন্দ, ওটাকে গিয়ে আগে শিংয়ে তোল দেখি।'' সঙ্গে সঙ্গে সে লক্ষ্মীর দিকে তাকিয়ে বললে, ''দেখি ঠাকরুণ, সরে দাঁড়াও তো দেখি?''

ব্যাপার খুব সুবিধার নয় বুঝে বিষ্ণু বামুনকে বললেন, ''আহা-হা করো কী করো কী বৎস, হয়েছেটা কী, আমায় বলোই না দেখি। আমি সব সমস্যার সমাধান করে দিচ্ছি।''

বামুন গরুকে বললে, ''দাঁড়াও মণি, একটু সবুর করো। ততক্ষণে একটু জিরিয়ে নাও।'' তারপর সে বিষ্ণুকে জিজ্ঞাসা করলে, ''ঠিক তো, সব সমস্যার সমাধান করে দেবে তো তুমি? দেখ, যদি না পারো—।''

''না, না, সে কী কথা? আগে আমাকে বলোই-না ব্যাপারটা। কথা দিচ্ছি, তুমি যা চাইবে, তাই পাবে।''

''ঠিক তো?''

''হ্যাঁ হ্যাঁ, কত বার আর বলব?''

''বেশ, শোন তাহলে মন দিয়ে। পরলোকে আসবার আগে যা কিছু আমি করেছি, ঐ কৃতান্ত যমটা বলে কিনা, তার সবই নাকি পাপকর্ম। শুধু একটাই নাকি পুণ্যি করেছিলাম, তা হচ্ছে—এক বামুনকে একটি গরুদান। এজন্যে কৃতান্তটা বলে কিনা—মাত্র সাড়ে সাত দণ্ডের জন্যে আমার স্বর্গবাস পাওনা, বাকি অনন্তকালের জন্যে নরকবাস। এবার তুমিই বিচার করো বাপু, এ রায় ঠিক কিনা। তার আগে সাফ কথা শুনে রাখো—আমি চাই চিরকালের জন্যে স্বর্গবাস।''

''এ্যাঁ?''

''এ্যাঁ-ফ্যাঁ নয়—হ্যাঁ। এর অন্যথা হলে তুমিও কিন্তু বাপু নিষ্কৃতি পাবে না বলে দিচ্ছি।''

নারায়ণ কেশে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন, ''তা, বেশ তো। শুধু এই কথা? এর জন্যে আবার এত তুলকালাম কাণ্ড! ছি:! ঐ তো ঐ দেখ, তোমারই থাকবার জন্যে আমার এই গোলোকের পাশেই কেমন সুন্দর প্রাসাদ তৈরি শুরু করে দিয়েছি। এখন থেকে যতদিন তোমার প্রাণ চায়, তুমি ঐখানেই থাকবে।''

বিষ্ণুর কথামতো বামুন সেইদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়।—সত্যিই তো, নারায়ণের খোদ গোলোকধামের পাশেই এক বিরাট রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ী তৈরি হচ্ছে যে?

বামুনের কেমন যেন সন্দেহ হয়, সে জিজ্ঞাসা করে, ''সত্যি কি কত্তা, ওটা আমারই থাকবার জন্যে?''

''হ্যাঁ হ্যাঁ, সত্যি-সত্যি তোমারই জন্যে। তুমি ছাড়া আমার কে-ই বা আর আছে যে, তার জন্যে অমন বিশাল প্রাসাদ এত খরচ-খরচা করে তৈরি করতে যাব?''

বিষ্ণুর কথাবার্তা শুনে তখন ব্রহ্মা, যম পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছেন, বার বার তাঁরা তাকাচ্ছেন শিবের দিকে। মহাদেবের তখন অবস্থা ঘোরালো, চোখমুখ দিয়ে যেন তাঁর তখন আগুন ছিটকে বেরুচ্ছে। বামুনের সঙ্গে বিষ্ণুর এমনি মিষ্টি আলাপ আর অপমানজনক চুক্তি শুনে তিনি তো চটেমটে অস্থির। এমনিতে শিব খুবই ভাল মানুষ, গাঁজাভাঙ খেয়ে সারাদিন নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে থাকেন, বিশেষ কারো সাতেও থাকেন না পাঁচেও থাকেন না। কিন্তু একবার চটলে আর রক্ষে নেই। স্বান-কাল-পাত্র ভেদাভেদজ্ঞান সব কিছু তাঁর লোপ পেয়ে যায়, মুখ দিয়ে সব অকথ্য অশ্রাব্য ভাষা আর তুই-তোকারি বেরিয়ে আসে।

এখনও হল তাই। তবু যথাসাধ্য নিজেকে সংযত করে তিনি বললেন, ''হ্যাঁ রে পুণ্ডরী, এসব তোর কী রকমের আক্কেল বল দেখি? সেই সময় থেকে তোর কাণ্ডকারখানা আর ব্যাপার-স্যাপার দেখতে দেখতে পিত্তি যে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গেল? যে কিনা এতটা বেলা ধরে সারাটা স্বর্গরাজ্য তোলপাড় আর নাস্তানাবুদ করে নাচিয়ে চোখের জলে নাকের জলে এক করে ছাড়লে, তার সঙ্গেই কিনা তোর এমনি শলাপরামর্শ আর এই চুক্তি?''

''কিন্তু এ ছাড়া তো কোন উপায়ও নেই মহেশ্বরের। মহর্ষি ব্রহ্মাও তো স্বয়ং এখানে উপস্থিত; তিনিই বলুন, এ ছাড়া এখন কী করণীয়?'' বলতে-বলতে বিষ্ণু তাকালেন ব্রহ্মার দিকে। কিন্তু মুখ দেখে তাঁকে বিশেষ সন্তুষ্ট মনে হল না।

শিবের রাগ তখনও পড়ে নি, তিনি পূর্ববৎ বিষ্ণুর দিকে তাকিয়েই বললেন, ''এমনি সস্তায় কিস্তিমাৎ আর চালবাজি দিয়ে রাজ্যপাট চালালে দু দিনে সব পয়মাল হয়ে যাবে, এই বলে রাখলাম। দুধ কলা দিয়ে যা এক কাল সাপ তুই আজ পুষলি পুণ্ডরী, দু দিন সবুর কর, বুঝবি ঠ্যালা; দেখিস, সারাটা স্বর্গরাজ্য যদি ও জ্বালিয়ে পুড়িয়ে না খায় তো কী বলেছি।''

শিবের ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলেছিল। কিন্তু সে অন্য এক কাহিনী।

সকল অধ্যায়
১.
মাটি
২.
ভুতের গল্প
৩.
হর্ষবর্ধনের অশ্বরোগ
৪.
সেই মেয়েটি
৫.
বিদ্যাসাগরের ছেলেবেলা
৬.
গোয়েন্দা
৭.
ইতিহাস ছাড়িয়ে
৮.
যমালয়ে জীবন্ত মানুষ
৯.
ডাকিনীর ডাক
১০.
শত্রুতা
১১.
রেলে
১২.
অতু
১৩.
এক যে ছিল বাঘিনী
১৪.
দাওয়াই
১৫.
বিশ্বের বিস্ময় হেলেন কেলার
১৬.
ফুলের বিবাহ
১৭.
মংলুফলায় সোনা
১৮.
একটি গল্প করার মত গ্রাম
১৯.
লালমণি পাখি
২০.
প্লাবন
২১.
ছাত্র-সঙ্গীত
২২.
জয়-পরাজয়
২৩.
এখন শিউলি-বেলা
২৪.
আশ্বিনে
২৫.
ছড়া
২৬.
পোড়ো কুঁড়ে
২৭.
মা (উপন্যাস)
২৮.
গোর্কির ছেলেবেলা
২৯.
সেয়ানে সেয়ানে
৩০.
সুড়ঙ্গের রহস্য
৩১.
এক ঝাঁক গল্প
৩২.
কঙ্কাল
৩৩.
নতুন করে জাগো মা
৩৪.
বেতাল-পঞ্চবিংশতি
৩৫.
ভবঘুরের চিঠি
৩৬.
নিলাম দামী চশমা
৩৭.
শরৎ এল
৩৮.
কৈশোর
৩৯.
আলোর ডাকে
৪০.
অগ্রদূত
৪১.
টাকার কথা
৪২.
সাহস চাই!
৪৩.
ভোজবাড়ীর ব্যাপার
৪৪.
আবাহনী
৪৫.
এবার পূজায়
৪৬.
বামুনের স্বর্গবাস
৪৭.
মজার ধাঁধা
৪৮.
আংটির পাথর
৪৯.
মনমঞ্জুষা
৫০.
নিখিল বঙ্গ গরু সম্মেলন
৫১.
মিকি ডাক আর দিসনে
৫২.
মেঘনাদবধ
৫৩.
চৌধুরী-বাগ
৫৪.
জাদু বিদ্যা
৫৫.
বাবার চিঠি
৫৬.
গানের কথা
৫৭.
আমার প্রথম শিকার আভিযান
৫৮.
বিশ্বক্রীয়া ওলিম্পিক
৫৯.
বাংলার বন্যা
৬০.
শরতে
৬১.
আনন্দ আশ্বিনে
৬২.
টোটকা কিছু
৬৩.
জলদি করুন দাদা
৬৪.
কিশোর বিজ্ঞানীর আসর
৬৫.
সঙ্গীতের মৃত্যু
৬৬.
ছত্রপতি
৬৭.
মেঘ ও বৃষ্টি
৬৮.
মধুপালের আবির্ভাব

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%