সঙ্গীতের মৃত্যু

দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

কুমারেশ ঘোষ

তখন দিল্লীর সিংহাসনে নতুন বাদশা হয়েছেন ঔরংজেব।

তিনি গান-বাজনা পছন্দ করতেন না। তাঁর মতে ওসব ছিল ধর্মবিরুদ্ধ কাজ। আর তখন দিল্লীতে গান-বাজনার রেওয়াজও খুব ছিল। অনেকেই গান-বাজনা করতেন আর অনেকেই ছিলেন সঙ্গীত-রসিক।

বাদশা ঔরংজেব হুকুম দিলেন, রাজ্যে গানবাজনা করা চলবে না। আর যাতে না চলে তা দেখবার জন্যে রাজকর্মচারীও নিযুক্ত করলেন। তারা কোথাও গান-বাজনা হচ্ছে দেখলেই সেখানে ছুটে যেতো এবং সভা ভঙ্গ তো করে দিতোই, বাদ্যযন্ত্রগুলোও ভেঙে চুরমার করে দিতো। পদ্মবনে যেন মত্ত হাতি ঢুকতো।

গাইয়ে বাজিয়েরা দেখলেন, এ তো বড় মুস্কিল! রস সৃষ্টি করা তো বন্ধ হলোই, সেই সঙ্গে তাঁদের রুজি-রোজগারও যে বন্ধ হতে চললো। গান গেয়ে বা বাজনা শুনিয়ে বেশ দু'পয়সা রোজগার হচ্ছিল, এখন বাদশার হুকুমে না খেয়ে মরতে হবে যে!

দিল্লী শহরের গাইয়ে-বাজিয়েরা সব একদিন গোপনে এক জায়গায় মিলিত হলেন এবং নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করতে লাগলেন, কী ভাবে এর প্রতিকার করা যায়। একটা কিছু তো করা দরকার! নইলে প্রাণে মরতে হবে যে!

শেষে তাঁরা একটি উপায় ঠিক করলেন।

সবাই জানতেন, বাদশা ঔরংজেব প্রতি শুক্রবার অর্থাৎ জুম্বাবারে মসজিদে নামাজ পড়তে যান। প্রাসাদ-দুর্গ থেকে যে পথে তিনি হাতিতে চেপে মসজিদে নামাজ পড়তে যান—সেই পথের দুধারে প্রায় হাজার খানেক গাইয়ে-বাজিয়ে এক শুক্রবারে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বুক চাপড়ে 'হায়-হায়' করে বিলাপ করতে শুরু করলেন।

আর কয়েকজন গাইয়ে-বাজিয়ে একটা খাটে ভাঙা বাদ্যযন্ত্র সাজিয়ে নিয়ে কাঁধে করে সেই রাস্তা ধরে চলতে লাগলেন। যেমন কোন লোক মরে গেলে খাটে করে নিয়ে যাবার নিয়ম!

বাদশা ঔরংজেব যথারীতি নামাজ পড়বার জন্যে হাতির পিঠে চেপে সেই রাস্তায় উপস্থিত হলেন, দেখলেন রাস্তায় খুব ভিড়। আর বাদশাকে দেখে রাস্তার দু'ধারের গাইয়ে-বাজিয়েদের 'হায়-হায়' কান্না যেন আরও বেড়ে গেল।

বাদশা তাঁর হাতি থামিয়ে পার্শ্বচরদের একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী ব্যাপার?'

পার্শ্বচরটি খবর নিয়ে এসে বললে, শাহানশা, গোস্তাকি মাফ হয়, ওরা সব গাইয়ে-বাজিয়ে। আর ওই খাটে রয়েছে সব ভাঙা বাদ্যযন্ত্র। ওটাকে ওরা ঘটা করে কবর দিতে যাচ্ছে।

শুনে ঔরংজেব বুঝলেন, ব্যাপারটা কি। তাঁর হুকুমের প্রতিবাদে ওই সব গাইয়ে-বাজিয়েরা তাঁকে দেখাবার জন্যে ওই ব্যবস্থা করেছে।

তিনি মুচকে হাসলেন একবার। তারপর গম্ভীর হয়ে বললেন, সত্যিই তো কাঁদবারই কথা। তবে যে মারা গেছে তাকে তো আর বাঁচানো যাবে না। তবে যাতে মহাসমারোহে সসম্মানে তার কবর দেওয়া হয়, সেদিকে যেন লক্ষ্য রাখা হয়। ওঁদের বলে দাও সে কথা!

বলেই ঔরংজেব হুকুম দিলেন মাহুতকে, চালাও, মসজিদ।*

_____

* মানুচি-র Storia Do Mogor অবলম্বনে।

সকল অধ্যায়
১.
মাটি
২.
ভুতের গল্প
৩.
হর্ষবর্ধনের অশ্বরোগ
৪.
সেই মেয়েটি
৫.
বিদ্যাসাগরের ছেলেবেলা
৬.
গোয়েন্দা
৭.
ইতিহাস ছাড়িয়ে
৮.
যমালয়ে জীবন্ত মানুষ
৯.
ডাকিনীর ডাক
১০.
শত্রুতা
১১.
রেলে
১২.
অতু
১৩.
এক যে ছিল বাঘিনী
১৪.
দাওয়াই
১৫.
বিশ্বের বিস্ময় হেলেন কেলার
১৬.
ফুলের বিবাহ
১৭.
মংলুফলায় সোনা
১৮.
একটি গল্প করার মত গ্রাম
১৯.
লালমণি পাখি
২০.
প্লাবন
২১.
ছাত্র-সঙ্গীত
২২.
জয়-পরাজয়
২৩.
এখন শিউলি-বেলা
২৪.
আশ্বিনে
২৫.
ছড়া
২৬.
পোড়ো কুঁড়ে
২৭.
মা (উপন্যাস)
২৮.
গোর্কির ছেলেবেলা
২৯.
সেয়ানে সেয়ানে
৩০.
সুড়ঙ্গের রহস্য
৩১.
এক ঝাঁক গল্প
৩২.
কঙ্কাল
৩৩.
নতুন করে জাগো মা
৩৪.
বেতাল-পঞ্চবিংশতি
৩৫.
ভবঘুরের চিঠি
৩৬.
নিলাম দামী চশমা
৩৭.
শরৎ এল
৩৮.
কৈশোর
৩৯.
আলোর ডাকে
৪০.
অগ্রদূত
৪১.
টাকার কথা
৪২.
সাহস চাই!
৪৩.
ভোজবাড়ীর ব্যাপার
৪৪.
আবাহনী
৪৫.
এবার পূজায়
৪৬.
বামুনের স্বর্গবাস
৪৭.
মজার ধাঁধা
৪৮.
আংটির পাথর
৪৯.
মনমঞ্জুষা
৫০.
নিখিল বঙ্গ গরু সম্মেলন
৫১.
মিকি ডাক আর দিসনে
৫২.
মেঘনাদবধ
৫৩.
চৌধুরী-বাগ
৫৪.
জাদু বিদ্যা
৫৫.
বাবার চিঠি
৫৬.
গানের কথা
৫৭.
আমার প্রথম শিকার আভিযান
৫৮.
বিশ্বক্রীয়া ওলিম্পিক
৫৯.
বাংলার বন্যা
৬০.
শরতে
৬১.
আনন্দ আশ্বিনে
৬২.
টোটকা কিছু
৬৩.
জলদি করুন দাদা
৬৪.
কিশোর বিজ্ঞানীর আসর
৬৫.
সঙ্গীতের মৃত্যু
৬৬.
ছত্রপতি
৬৭.
মেঘ ও বৃষ্টি
৬৮.
মধুপালের আবির্ভাব

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%