মাটি

দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

প্রেমেন্দ্র মিত্র

আয়েষা হঠাৎ যন্ত্রণায় থর থর করে কেঁপে উঠল।

কে যেন প্রচণ্ড এক বোমা ছুড়ে মেরেছে তার গায়ে।

বোমা অবশ্য কেউ মারেনি। নিজে থেকেই কোথাও কিছু ফেটেছে। তারই চাপা আওয়াজটা আমার ককপিটে বসেই পেলাম।

হ্যাঁ আয়েষা কোনো মেয়ে টেয়ে নয়, একটা মাঝারি মাপের জোড়া এঞ্জিনের ব্রিস্টল পার্সিউস।

জায়গাটা হল উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার আকাশ আর প্লেন চালাচ্ছি আমি!

ব্যস ওই পর্যন্তই। তারপর খক খক খুক খুক কি যে কাশির হিড়িক পড়ল, বাহাত্তর নম্বর বনমালী নস্কর লেনে যেন কাশ রোগের এপিডেমিক লেগেছে। শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভুর গলার খুকখুকুনিটাই কাশি বলে চালানো একটু শক্ত।

কি হচ্ছে কি সব? —শিবু কড়াগলায় ধমক দিয়ে তার নতুন ঘাঁটা হোমিওপ্যাথিক বিদ্যে জাহির করলে,—অত যদি কাশি হয়েছে তা এক ফোঁটা ইপিকাক থার্টি খেতে পারো না? তা না হয়, সকাল বিকেল দুবার গার্গল...

গার্গল কথাটাই গলা দিয়ে বার হবার সময় অমন সুড়সুড়ি লাগাবে শিবুও বোধহয় ভাবতে পারে নি। নিজেই সে কেশে খুন তারপর।

রীতিমত রাগ দেখাতে হ'ল এবার। বললাম,—কি সব তোদের আক্কেল। কাশবার আর সময় পেলি না! ওদিকে আফ্রিকার ওপর ঘনাদা জখম প্লেনে আটকা পড়েছেন সে খেয়াল আছে?

সেই খেয়ালটা হতেই যেন ধন্বন্তরীর ওষুধ পড়ে সব কাশি থেমে গেল।

ঘনাদার অবস্থাটা কিন্তু এখন কি?

চেয়ে দেখতে ভরসা হয় না। মনে হয় বিস্ফোরণটা বুঝি তাঁর দু চোখেই দেখতে পাব।

ভয়ে ভয়ে বললাম,—ককপিটে তারপর কি করলেন ঘনাদা?

জবাব নেই ঘনাদার মুখ থেকে।

আয়েষা কি ফেটে গেল আকাশেই?

ঘনাদা একেবারে মৌনী।

তাহলে এত কষ্টের আয়োজন এত ফন্দি-ফিকির সবই একটু কাশির আহাম্মকিতেই গেল ভেস্তে?

তাঁর মুখের দিকে এখনো ভরসা করে চোখ তুলিনি। কিন্তু আরাম কেদারায় মেঝের ওপর ছড়ানো তাঁর চরণযুগল ত স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।

চরণযুগল ত এখনো যথাস্থানেই আছে। শুধু আছে নয় রীতিমত ছন্দে ছন্দে নড়ছে বলা যায়। অর্থাৎ ঘনাদা আরামে তাঁর মৌরসী আসনে গা এলিয়ে দিয়ে পা নাচাচ্ছেন!

এটা খাপ্পা হওয়ার লক্ষণ ত নয়! তাহলে এতক্ষণে ওই পদযুগলকে ত আসর ঘরের দরজা পার হয়ে তেতলার টঙের ঘরের দিকেই উঠতে দেখা যেত। ওই কাশির এপিডেমিকের পর ঘনাদা আর এক মুহূর্তও থাকতেন এই বর্বরদের মাঝখানে?

তাহলে এ অভাবনীয় ব্যাপার সম্ভব হ'ল কি করে?

সাহস করে এবার মুখ তুলে ঘনাদার দিকে তাকালাম। তাকিয়ে তাঁর একাগ্র ও উদগ্রীব দৃষ্টি অনুসরণ করে আসর ঘরের দরজার দিকে চোখ গেল।

সেখানে বনোয়ারী একটা বিরাট ট্রে নিয়ে ঢুকছে। ট্রে-টা এমন বিরাট যে বনোয়ারীকে দুহাত ছড়িয়ে সেটা বাগিয়ে ধরতে হয়েছে।

ট্রে-র ওপর একটা খঞ্চিপোসের ঢাকনা।

সে ঢাকনার তলায় কি আছে আমরা অবশ্য জানি। কিন্তু বনোয়ারী দরজায় দেখা দেবার আগেই যে রকম আগ্রহভরে ঘনাদা সেদিকে তাকিয়ে প্রায় বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে গিয়েছিলেন তাতে তিনিও সে খঞ্চিপোসের নিচে ট্রে-র ওপর সাজানো সব প্লেটে কি আছে যেন তখনই মনে মনে টের পেয়েছিলেন বলে সন্দেহ হয়।

টের পেলেন কিসে? শুধু গন্ধে?

আমাদের মত সাধারণ নগণ্য মানুষের তুলনায় ঘ্রাণশক্তি তাঁর তাহলে সত্যিই অলৌকিক বলতে হয়। বনোয়ারী দরজা পেরিয়ে আসরের একেবারে মাঝখানে এসে দাঁড়াবার আগে শুধু নাসিকা মারফত আমরা কিছুই জানতে পারিনি। ঘরের মাঝখানে এসে ট্রে-টা ঘনাদার সামনের নিচু টেবিলটায় রেখে বনোয়ারী ওপরের ঢাকনাটা সরাতে গন্ধটা অবশ্য উতলা করে তুলল।

উতলা করে তোলবার মতই জিনিস। কলকাতার সেরা রেস্তোরাঁর সবচেয়ে ওস্তাদ বাবুর্চির সোনা দিয়ে বাঁধানো হাতের কাজ। মুখে দিলে যেন আর এ দুনিয়ায় নয় বেহেস্তেই আছি মনে হবে।

এসব বিজ্ঞাপনের ভাষা অবশ্য গৌরের। ঘনাদাকে বেঁধে ফেলবার জন্যে কদিন ধরে সে এসব পাঁয়তাড়া কষছে। আমাদের কাছে সকালে বিকেলে সুবিধে পেলেই শনিবারের আসরে যে আজব খানা সে আমদানি করছে তার আগাম হ্যান্ডবিল ছেড়েছে বলা যায়।

গদগদ হয়ে বলেছে,—এতো আর শুধু ফুটন্ত জলে চোবানো কি হাতাখন্তি নাড়া নয়, সারেঙ্গীর ছড় চালানোর মত এক একটি সিক ঘোরাবার সূক্ষ্ম কেরামতি।

আজব খানাটা যে কি, রসিকজনের কাছে তা বোধ হয় আর ব্যাখ্যা করে বলতে হবে না।

হ্যাঁ উপাদেয় জিনিসটি হ'ল কলকাতার একেবারে সেরা রসুইখানার সিককাবাব।

ঘনাদাকে কিন্তু সে কথা জানানো হয় নি। তা সত্বেও চোখে দেখবার আগে শুধু গন্ধেই মোহিত হয়ে তিনি যদি আমাদের অমন একটা বেয়াদবি আশাতীত ভাবে মাপ করে ফেলেন তাহলে সেটা আমাদের নেহাৎ ভাগ্য বলেই ধরা উচিত।

খটকা অবশ্য মনের ভেতর একটু থেকে যায়। সিককাবাব বা আর যে কোন আহামরি খাবারই হোক এ সব ঘুষ ত তাঁর বাঁধা বরাদ্দ। তার জন্যে এমন দয়ার অবতার হতে তাঁকে বড় দেখেছি বলে মনে পড়ে না।

কিন্তু এ খটকাটাকে আমল দেবার দরকারটা কি? ঘনাদা যে বেমালুম সব কিছু ভুলে গিয়ে তাঁর ডবল সাইজের প্লেটে ফালি-করা কোল বালিশের মত দুটি বড় বড় কাবাবে মনোনিবেশ করেছেন এতেই কৃতার্থ হয়ে খুশি থাকলেই ত হয়।

ঘনাদা যতক্ষণ সিককাবাবে তন্ময় হয়ে আছেন ততক্ষণে এ বৈঠকের ভূমিকাটা সেরে ফেলা যেতে পারে। ঘনাদাকে এ শনিবারে মুখ খোলাবার জন্যে যে সব আয়োজন হয়েছে তার একটা হ'ল এই সিককাবাব।

এর ওপর শিশিরের সিগারেটের টিন ত আছেই, তাছাড়া আর একটা মোক্ষম ঘুষ বা প্রণামী যা দেওয়া হয়েছে তা একটু অভাবিত নিশ্চয়। তাই দিয়েই শেষ মাত-এর চালের রাস্তা গৌর আগে থাকতে করে রেখেছে।

ঘনাদা নিজেই একটু যেন চমকে গেছেন প্রথমে।

আর যাই হোক তাঁকে এক ভাঁড় ঘি কেউ উপহার দিতে পারে এটা তিনি কল্পনাই করতে পারেন নি বোধহয়।

এটা কি হে? —ঘনাদা একবার ভাঁড়টা আর একবার যে সেটা তাঁর পায়ের কাছে নামিয়ে দিয়েছে তার দিকে সমান সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়েছেন।

দাতা অবশ্য তাঁর অচেনা।

তার পরিচয়টা গৌরই উচ্ছ্বসিত হয়ে এবার দিয়েছে,—এ হল শম্ভু মানে শিবুর মাসতুতো ভাই, ঘনাদা। আপনাকে ওর ডেয়ারীর ঘি একটু চাখতে দিতে এসেছে।

চাখবার পক্ষে যথেষ্ট কিনা ঘনাদা সেইভাবে একবার কাগজ দিয়ে মুড়ে বাঁধা ভাঁড়টার দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন,—শিবুর মাসতুতো ভাই-এর ডেয়ারী আছে বুঝি?

না, ডেয়ারী ঠিক নেই। —গৌরকে যেন সত্য কথাটা স্বীকার করতে হয়েছে,—তবে যেখানে ও ডেয়ারী করবে ভাবছে সেখানকার ঘির একটু নমুনা এনেছে আমাদের জন্যে।

জায়গাটা কোথায়? ঘনাদা মৃদু একটু কৌতূহল দেখিয়েছেন।

বেশীদূর নয়, নেফার কাছে!—গৌর খুশি করবার মত খবরটা দিয়েছে, —ডেয়ারী করার দারুণ সুবিধে। গরুর পাল সেখানে ছাড়াই থাকে। বনে নিজেরা চরে খায়, গোয়ালেরও দরকার হয় না। শুধু ধরে দুয়ে নিলেই হ'ল।

বা:! শুধু ধরে দুয়ে নিলেই হ'ল?—ঘনাদা রীতিমত উৎসাহিত হয়ে উঠেছেন মনে হয়েছে,—তাহলে ডেয়ারীর আর ভাবনাটা কি?

না, ভাবনা কিছু নেই।—শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভুই এবার মওড়া নিয়েছে,—আর শুধু ডেয়ারী কেন, চাষবাসেরও দারুণ সুবিধে। জমি পড়ে আছে অঢেল, শুধু চষলেই হ'ল।

জমি খুব সস্তা তাহলে! —ঘনাদার গলায় বেশ ঔৎসুক্যই ফুটে উঠেছে যেন।

সস্তা, মানে জলের দর।—শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভু সানন্দে জানিয়েছে,—জমি যে চষে তার।

আর ফসলও তাহলে তাই! —ঘনাদা একটু বেয়াড়া বুঝেছেন কিনা ঠিক ধরা যায়নি,—যে কেটে নেয় তারই।

ভুল যদি ঘনাদা কিছু বুঝে থাকেন তা সংশোধন করবার আর চেষ্টা করেনি কেউ।

গৌর তার বদলে নিজের উৎসাহটাই প্রকাশ করেছে, —এরকম জায়গার কথা শুনলে এখুনি যেন চলে যেতে ইচ্ছে করে! মনে হয় কেন মিছে পড়ে আছি এই নোংরা ঘিঞ্জি খবরের কাগজের ভাষার সমস্যাসঙ্কুল শহরে!

হ্যাঁ—ঘনাদা গৌরকে সমর্থন জানিয়েছেন, —এ প্রবলেম-সিটি থেকে যেতে হলে নেফাই একমাত্র জায়গা। বুনো আধবুনো গাউর আর গয়ালের পাল আছে, পারো ত দুয়ে নাও, আর জমি আছে অঢেল, চষো। তুমি না পারো ফসল না হয় আর কেউ কাটবে! আর যদি ওই গাউর গয়ালের পালই খেয়ে যায় তাহলেও ত লোকসান নেই! ওরা ত তোমাদেরই ডেয়ারীর সব।

ঘনাদার কথাগুলো কি একটু বাঁকা?

অত খুঁত ধরলে চলে না। বাঁকা কথাকে সিধে ভাবলেই ত হয়। যার মাসতুতো ভাই তার হবু ডেয়ারীর নমুনা হিসেবে ওই ঘি এনেছে সেই শিবুই এবার হাল ধরেছে আলোচনার।

যেন আশীর্বাদ চাইবার ভঙ্গীতে বলেছে, —আপনি তাহলে ভরসা দিচ্ছেন ঘনাদা? আপনার কাছে একটু সাহস পেলে এ মেস টেস তুলে দিয়ে চোখ কান বুজে সবাই নেমে পড়ি! নেফার জমি ত খুব ভালো শুনেছি। মাটিতে সোনা ফলে, তাই না, ঘনাদা?

সোনা ফলে কি না ফলে তা উনি কি বলবেন?— হঠাৎ বেসুরো গেয়েছে শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভু। বেশ একটু নাক বেঁকিয়ে বলেছে,—উনি কি মাটি চেনেন! ওঁর দৌড় ত এই বনমালী নস্করের গলি আর রাজত্ব ওই চিলেকোঠার ছাদটুকু। মাটির উনি কি জানেন?

আসর-ঘরে বসেই এ আলাপ হচ্ছিল তা বলা বাহুল্য। শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভুর এই আচমকা 'সিডিশন'-এ সমস্ত ঘর একেবারে নি:সাড় হয়ে গেছে। আমরা অপেক্ষা করেছি রুদ্ধনি:শ্বাসে।

একটু আধটু নড়ে চড়ে গেলেও লাইন যা পেতেছিলাম সমস্ত সাজানো ব্যাপারটা তার ওপর ঠিক মতই গড়িয়ে যথাস্থানে এসে পৌঁচেছে।

ঘি দিয়ে যা শুরু ঘা দিয়ে তা শেষ। এই হ'ল গৌরের নতুন শক-থেরাপি। এখন এস্পার ওস্পার একটা কিছু হবেই। ঘনাদার পিছলে পালানো আর চলবে না। কিন্তু শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভু মাত্রাটা একটু বাড়িয়ে ফেলেছে কি? সলতে যদি ধরেও থাকে বেশী হাওয়ার ঝাপটায় আবার নিভে না যায়!

শিবু নিজেই তাই একটু সামলাবার ব্যবস্থা করেছে। মাসতুতো ভাই-এর ওপর যেন একটু রেগে বলেছে,—তোর ত ল্যাকেসিস দরকার। মাদার টিংচার তিন ফোঁটা। কাক কাঁকুড় জ্ঞান নেই তোর! ঘনাদা মাটি চেনেন না ত চিনিস তুই!

না, ঠিকই বলেছে তোমাদের শম্ভুবাবু। —ঘনাদা উদার এবং কিছুটা উদাস ভাবে নিজের অক্ষমতা স্বীকার করেছেন,—মাটি আমি সত্যি চিনি না। নেহাৎ কুদুটার শিং দুটো মাপতে গিয়ে ক্ষুরের ঝুরো মাটি একটু চোখে পড়েছিল আর তার আগে প্লেনটা কাদুনা থেকে উঠতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তে কোন রকমে বেঁচে গিয়েছিল তাই, নইলে টার্কা-কে ভুল জমি কিনিয়ে প্রায় ত ডোবাতেই বসেছিলাম।

আপনি আবার জমি কেনাবেচার কাজও করতেন নাকি? জমির দালাল ছিলেন বুঝি! —শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভু একটু যেন বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে বাহাত্তর নম্বরের হালচাল না বুঝে। আমরা একটু শঙ্কিত হয়েছি।

তা একরকম বলতে পারো। —ঘনাদা কিন্তু অম্লানবদনে মেনে নিয়েছেন,—জমির দালাল না হোক জাতের কুলুজিকার খানিকটা ত বটেই। আমার কথায় কান দিলে হাউসা, ইয়ারুবা, ফুলানি আর ইবোতে মিলে এমন লঙ্কাকাণ্ড শুরু হয়, না বিয়াফ্রা-য় দিনে হাজারটা বাচ্চা না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরে!

বিয়াফ্রা শুনেই আমাদের কান খাড়া হয়ে উঠেছে।

আবার কিন্তু বেয়াদবি করেছে শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভু। এ মাসতুতো ভাইটিকে আমদানি করা কতটা সুবুদ্ধির কাজ হয়েছে সন্দেহ জাগতে শুরু করেছে এবার। গোড়ায় একটু সুবিধে হলেও শেষটা তারই উৎপাতে যজ্ঞ নষ্ট না হয়।

হাউসা ইয়ারুবা শুনেই শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভু টিপ্পনি কেটে বাহাদুরীর চেষ্টা করেছে,—ওই কি সব কিষ্কিন্ধের নাম বললেন, ওদের নিয়ে আপনিই লঙ্কা জ্বালিয়ে এসেছিলেন বুঝি? তাই ওই দুর্ভিক্ষ লেগেছে।

ভেরেট্রাম অ্যালবাম!

ঘনাদা সহিষ্ণুতার অবতার হয়ে তাঁর দৃষ্টিটা পাতকীর দিকে একটু ফেরাবার আগেই শিবু তার মাসতুতো ভাইকে প্রায় গর্জন করে থামিয়েছে,—হ্যাঁ নির্ঘাৎ ভেরেট্রাম অ্যালবাম—দু'শ। সমস্ত লক্ষণ একেবারে হুবহ মিলে যাচ্ছে,—'কখনও সত্য কথা বলে না। নিজে কি বলিতেছে তাহা নিজে জানে না। নিজেকে একজন কেওকেটা মনে করে।' যা, এখুনি গিয়ে মোড়ের হোমিওপ্যাথিক দোকান থেকে কিনে খা। ভেরেট্রাম অ্যালবাম বললে না যদি বোঝে ত হেলেবোরাস অ্যালবাম চাইবি।

শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভু হকচকিয়ে তখনকার মত একটু চুপ।

সেই ফাঁকে প্রায় কৃতাঞ্জলি হয়ে জিজ্ঞাসা করেছি,—আফ্রিকার নাইজিরিয়ার কথা বলছেন, না ঘনাদা? বিয়াফ্রার সঙ্গে ফেডারেল নাইজিরিয়ার ত মরণপণ লড়াই চলছে। ঈস আপনার কথায় তখন যদি কান দিত! কেন দিলে না বলুন ত?

পাঁচজনের কুমন্ত্রণা!—ঘনাদার গলায় গভীর আফশোষ ফুটে উঠেছে,—কালাদের অত ভালো হবার কথায় যাদের বুক জ্বলে, তারা নিজেদের ভেতর খাওয়াখাওয়ি করলেও কালাদের মধ্যে ভাঙন ধরাবার বেলা এক জোট। নাইজিরিয়ার বড় বড় জাত বলতে চারটে, —হাউসা, ইবো, ইয়ারুবা আর ফুলানি। এই চার জাতকে এক করে ফেডারেল মানে সংযুক্ত নাইজিরিয়া। কিন্তু যুক্ত হওয়া মানে ত গলায় দড়ি বেঁধে জুড়ে দেওয়া নয়। বুদ্ধিতে ক্ষমতায় উৎসাহে উদ্যমে সব চেয়ে যারা আগুয়ান, সেই ইবো-রা সংযুক্ত হওয়া মানে গলায় সেই ফাঁস লাগানোই দেখেছে। ইবোদের বিরুদ্ধে সারা নাইজিরিয়ায় নিধন যজ্ঞ শুরু হবার পর লেফটেন্যান্ট কর্নেল চুকুয়েমেকা ওদুমেগুয়ু ওজুকুয়ু তাই নিরুপায় হয়ে দুনিয়ার যেখানে যে আছে সমস্ত ইবোকে বিয়াফ্রায় ডেকে পাঠিয়ে মরণপণ লড়ছেন। বিয়াফ্রার এ নেতার নাম শুনে আজেবাজে হেঁজিপেজি ভাবে না যেন কেউ। ওজুকুযু উজবুক-টুজবুকের মাসতুতো ভাই নয়।

শিবু একটু ঢোক গিলেছে মাত্র। ঘনাদা কিন্তু কোনো দিকে চাননি। শুধু যেন দম নেবার জন্যেই একটু থেমে আবার তিনি শুরু করেছেন,—ওজুকুয়ুর কাছে বিলেতের সাহেবরাও ইংরেজী বক্তৃতার দু'একটা কায়দা-কানুন শিখতে পারে। প্রথমে ইংলন্ডে সারে-র এপসম স্কুলে তারপর অক্সফোর্ডের লিনকন কলেজে পড়েছেন। রাগবি খেলেছেন কলেজের হয়ে আর একশ পোনেরো ফুট সাড়ে আট ইঞ্চি লোহার চাকতি ছুঁড়ে স্কুলে যে রেকর্ড রেখেছেন আজও তা কেউ ভাঙতে পারেনি সেখানে।

এই ওজুকুয়ু যখন নাইজিরিয়ার বন্দর রাজধানী লাগোস-এর স্কুলে পড়ে, তখনই অবশ্য ওই সোনার দেশের এই পরিণামের ভয়ই করেছিলাম।

বলেওছিলাম সে কথা ফ্র্যাঙ্ক কেনীকে। বলেছিলাম,—কাজটা ভালো করছ না কেনী। এই যে জাতের অভিমান আর ধর্মের গোঁড়ামিকে খুঁচিয়ে হাউসা, ফুলানি আর ইবো, ইয়ারুবাদের মধ্যে ঈর্ষা হিংসা আকছা-আকছির বিষ ছড়াচ্ছ, তাতে তোমাদেরই শুধু পোয়াবারোর দান পড়বে তা ভেবো না। এদেশের জমিজায়গা সব গ্রাস করে টিনের খনি চালিয়ে যে বাদশাহীর মজা লুটছ, ওদের রক্তারক্তি বাধলে সে সবও লোপাট হয়ে যাবে।

ফ্র্যাঙ্ক কেনী হেসে আমার পিঠটা তার মুষলের মত হাত দিয়ে চাপড়ে বলেছে,—কি যে বলো দাস? আমি এদের মধ্যে হিংসের বিষ ছড়াবো! তুমি ত দেখেছ টার্কা আমার কি রকম প্রাণের দোস্ত।

হ্যাঁ, তা দেখেছি—স্বীকার করেও আমার সন্দেহটা জানিয়েছি, —তোমার মত খাস ধলা ইংরেজ বানিয়া সরল প্রাণে কোনো মতলব না নিয়ে কালা কারুর সঙ্গে দোস্তি করছে, এটা বিশ্বাস করতে মন চায় না।

তোমার বড় ছোট মন দাস! —ফ্র্যাঙ্ক আমার ঘাড়ে গদার মত তার ডান হাতখানা চালিয়ে একটা আদরের রদ্দা দিয়ে বলেছে,—তুমি বাঙালী ত! আমার এক মাসতুতো ভাই সুবনসিরিতে মিশনারী হয়ে গেছে। সে বলে,—

নাইজিরিয়ার টিনের খনির মালিক ফ্র্যাঙ্ক কেনীর মিশনারী মাসতুতো ভাই কি বলে তা শোনাতে গিয়ে হঠাৎ থেমে ঘনাদা শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভুর দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন, —সুবনসিরি কোথায় বুঝেছেন ত?

শিবুর মাসতুতো ভাই একটু কেমন আমতা আমতা করেছে,—হ্যাঁ, সুবনসিরি, মনে হচ্ছে যেন....

সুবনসিরির নামটাই ভুলে গেলেন? —ঘনাদা যেন বড় দু:খ পেয়েছেন,—তা সুবনসিরির কথা মনে না থাকুক, ডাফলা আপাতানিদের ত ভালো করেই চেনেন?

হ্যাঁ... তা... এক রকম।—শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভুকে বেশ একটু বিপন্ন মনে হয়েছে।

ওই এক রকম চিনলেই হ'ল।—ঘনাদা যেন পরম সন্তুষ্ট হয়েছেন শিবুর মাসতুতো ভাই-এর জবাবে,—ওদের এক রকমের বেশী দু'রকম চিনতে যাওয়া সুবিধের নয়। তারপর যা বলছিলাম, ফ্র্যাঙ্ক কেনী তার যে মাসতুতো ভাই মিশনারী হয়ে সুবনসিরিতে আছে তার মতামতটা আমায় শুনিয়ে দিয়েছিল। সেই মিশনারী ভাই নাকি বলে,—বাঙালী আসামী আর ওড়িয়া এদের সঙ্গে আলাপ করবে প্রতিটি কথা সাতপুরু ছাঁকনিতে ছেঁকে।

নইলে এরা আঁতের আসল কথা বড় চট করে ধরে ফেলে, না? —আমি রদ্দা-খাওয়া ঘাড়টায় হাত বুলোতে বুলোতে যথাসাধ্য হেসে বলেছি কেনীকে,—কিন্তু তোমাদের ওই সূর্যিঠাকুরের ভাদ্দর বৌ-এর দেশ থেকে খৃষ্ট ভজাতে, কলোনী বসাতে বা ব্যবসা করতে যারা বিদেশে যায়, তারা মুখে এক মনে আর রাখে না—এমন দুর্নাম ত অতি বড় শত্রুও দেবে না।

তোমার এই ঠোঁটকাটা রসিকতার জন্যে তোমায় এত ভালবাসি দাস! —ফ্র্যাঙ্ক কেনী বদন বিগড়ে দেবার মত একটি আদরের থাপ্পড় আমার গালে মেরে তার ভালবাসার পরিচয় দিয়ে বলেছে, —তুমি এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছ বলে কি খারাপই লাগছে কি বলব!

খারাপ আমারও লাগছে,—আন্তরিক সত্য কথাটা জানিয়েছি কেনীকে,—ভালবাসাটা এক তরফাই থেকে গেল, যাচ্ছি এই দু:খ নিয়ে। কিন্তু কাল আবার না গেলেই নয়।

কেন বলো ত? —কেনী যেন সত্যিকার আগ্রহ দেখিয়েছে, —কালই যেতে হবে এমন কি তাড়া?

তাড়া আমার নিজের জন্যে নয়,—আমি কেনীর জানা খবরটাই যেন নতুন করে জানিয়েছি, —তাড়া টার্কার জন্যে। বেনুয়ে নদীর ধারের সব সোনা ফলানো চাষের জমি থেকে শুরু করে এ গোটা অঞ্চলটাই পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে ওর পাওয়া তা ত জানো। এখন নতুন আইনে সেগুলোর মাপ চৌহদ্দি আবার লিখিয়ে রেজেস্টারী করিয়ে না নিলে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। টার্কা ত ব্যাপারটা গ্রাহ্যই করেনি। আমিই লাগোস থেকে সেদিন সব জেনে এসে ওকে তাড়া দিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।

লাগোস থেকে প্লেনটা সেই জন্যেই নিয়ে এসে রেখেছ বুঝি! —তার মাথায় সবে যেন ব্যাপারটা ঢুকেছে এমন ভাব দেখিয়ে কেনী টার্কার জন্যেই যেন চিন্তিত হয়ে পড়েছে,—জমিজমা ত পাবে। কিন্তু এসব ফুলানিদের এলাকা তা জানো ত? ইবো হয়ে টার্কা এখানে কত দিন আর টিঁঁকতে পারবে তাই ভাবছি।

তা ফুলানিদের কানে কু-মন্তর দিয়ে ফুসলে যে রকম ক্ষেপাবার ব্যবস্থা করছ,—আমি যেন কেনীর কেরামতিতে মুগ্ধ হয়ে বলেছি,—তাতে টার্কার মত ইবোদের সত্যিই হয়ত বেশী দিন এখানে থাকা চলবে না। কিন্তু কালা ইবোরা গেলে তোমার মত ধলা হিপ্পোদেরও পাততাড়ি গুটোতে হবে তা মনে রেখো।

হিপোপোটেমাস-এর দেশে সেই জানোয়ারের সঙ্গেই বপুর পরিধিতে পাল্লা দেওয়া তার চেহারাটার কথা ইঙ্গিত করলে কেনী ভেতরে ভেতরে একেবারে ক্ষেপে যায়। বাইরে কিন্তু একেবারে যেন গলে গেছে আমার বন্ধুত্বের পরিচয়ে।

যদি বা ভুলে যেতাম, ঠিক সময়ে মনে করিয়ে দেবার জন্যে ধন্যবাদ বন্ধু!—বলে বেড়াল হয়ে ইঁদুরছানার মত আমার গলাটা তার থাবায় ধরে ঘরের মেঝেতে দুবার প্রায় আছড়ে ফেলে কেনী তার কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে।

কৃতজ্ঞতা জানানোটা শরীরের ওপর দিয়েই সে শেষ করেছে ভেবেছিলাম। সেইটেই ভুল।

ভুলটা টের পেলাম পরের দিন টার্কাকে নিয়ে প্লেন ছাড়বার পরই।

প্লেনটা কেনীর টিনের খনির ল্যান্ডিং ফিল্ডে-ই ছিল। কেনীর নিজের একটা ছোট প্লেন আছে। হ্যাঙ্গারও আছে তার। আমার প্লেন সে হ্যাঙ্গারে ধরে না বলেই বাইরে রাখা ছিল।

প্লেন ছাড়বার সময় কোনো গোলমালই হয়নি। ওই ভোরেই কেনী তার একজন মেকানিক নিয়ে আমাদের বিদায় দিতে এসেছিল। তাকে যে চোখেই দেখি তার এই বিবেচনাটুকুতে খুশি না হয়ে পারিনি। ভেবেছিলাম, ছাড়বার আগে প্লেনের খুঁটিনাটি কিছু তদারকীর জন্যে নিজে থেকে মেকানিক নিয়ে এসেছে। প্লেনে ওঠবার আগে টার্কার ত বটেই আমারও হাতটা ধরে নেড়ে কেনী প্রায় ধরা গলায় বললে,—আর কবে দেখা হবে কে জানে দাস! দুনিয়ার কিছুরই ঠিক নেই। সত্যি তোমার অভাবটা খুব টের পাবো।

দুপুরবেলা যেদিন যেমন জোটে ..একটু বিশ্রাম করি ।

পাওয়াই ত উচিত! —আমিও গদগদ স্বরে বললাম, —হাউসা, ফুলানি, ইবো আর ইয়ারুবা, নাইজিরিয়ার এই প্রধান চার জাতের মশলা এক সঙ্গে মেশালে জমবার সিমেন্ট, না ফাটবার বারুদ হবে তাই বোঝাবার তথ্য যোগাড় করতে অন্য সব দিক সেরে এখানে টার্কার খোঁজেই এসেছিলাম। টার্কার বাবা ছিলেন অসামান্য কৃতী পুরুষ। বিলেত থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এসে এদেশের সেই প্রথম ঘুম-ভাঙার যুগে ইবো হয়ে ফুলানিদের মাঝখানে তাদেরই নিজের করে নিয়ে নানা রকম উন্নতির ব্যবস্থা করে গেছেন। টার্কার কাছে তার বাবার অভিজ্ঞতা ও মতামতটা জানবার জন্যেই এখানে এসেছিলাম। এসে তোমার সঙ্গে এমন বন্ধুত্ব হয়ে গেল যা ভোলবার নয়। তোমার অভাবটা আমাকেও বেশ কষ্ট দেবে।

আচ্ছা! আচ্ছা! আর দেরি করে লাভ নেই। উঠে পড়ো এবার প্লেনে।—কেনী তাড়া দিলে।

তার এই অধৈর্যটা আগেই একটু লক্ষ্য করেছি বলে আমার বিদায়-ভাষণটা ইচ্ছে করে একটু লম্বা করে ছিলাম। তখন কেনীর অধৈর্যে একটু অবাক হয়েছিলাম মাত্র। তার অর্থটা বুঝলাম খানিক বাদেই, আয়েষা যখন যন্ত্রণায় হঠাৎ থর থর করে কেঁপে উঠল।..

তারপর ঘনাদার এ বিবরণ আমাদের কাশির এপিডেমিক-এ কোথায় থেমে ডবল সিককাবাবের প্টে শেষ হবার অপেক্ষায় আছে তা আগেই জানানো হয়েছে।

ঘনাদার কাবাব সাঁটবার ধরন দেখে তাঁর মেজাজ সম্বন্ধে কিছুটা আশ্বস্ত হলেও খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত একেবারে নিশ্চিন্ত হ'তে পারিনি।

নিশ্চিন্ত হ'লাম জোড়া কাবাবের সদগতি করে তাঁর প্লেটের মত চাঁছাপোঁছা পরিষ্কার মুখ নিয়ে তিনি যখন শিশিরের দিকে মধ্যমা আর তর্জনী ফাঁক করে হাত বাড়ালেন।

শিশির তার যথাকর্তব্য পালন করবার পর দুটি রামটান দিয়ে ক্ষুদে গোছের পারমাণবিক বিস্ফোরণেরই যেন ধোঁয়া-কুণ্ডলী ছাড়তে ছাড়তে আমাদের দিকে কৃপা-কটাক্ষ করলেন ঘনাদা।

আমাদের মানে শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভুর দিকেই দৃষ্টিটা তাঁর বিশেষভাবে নিবদ্ধ। চোখে একটু ঝিলিক নিয়ে তাকেই জিজ্ঞাসা করেছেন,—প্লেনটা তখনও আকাশে, না?

মাসতুতো ভাই শম্ভুর জিভের ডগায় যদি বা কিছু জুৎসই জবাব এসে থাকে শিবুর কটমটে চোখের দিকে তাকিয়ে সেটা সে এক ঢোকে গিলে ফেলেছে। ভেরেট্রাম অ্যালবাম-এর ধাক্কাই সে তখনো ভালো করে সামলাতে পারেনি।

ঘনাদার স্মরণশক্তি উসকে দেবার ভলান্টিয়ারের অবশ্য অভাব হয়নি।

তিন দিক থেকে তিন জন আমরা এগিয়ে এসেছি :

আয়েষা তখন যন্ত্রণায় থরথর করে কাঁপছে, ঘনাদা!

কোথায় কি যেন ফেটেছে!

আপনি তখন ককপিটে বসে প্লেন চালাচ্ছেন।

চালাবার আর তখন কিছু নেই,—ঘনাদা যেন সেদিনের কথা স্মরণ করে একটু শিউরে উঠলেন—চোখটা তখন আপনা থেকে চলে গেছে অলটিমিটারে। মাত্র সাতশ ফুট উঠেছি, কিন্তু সাতশ ফুটে কি হবে? সামনের যে পাহাড়টা ঝড়ের মত ছুটে আসছে সেটা নেহাৎ ছোট হলেও অন্তত: হাজার তিনেক ফুট। সাতশ থেকে হাজার তিনেক পর্যন্ত উঠব কি করে এই জখম প্লেন নিয়ে?

কথাটা ভাবতে ভাবতেই সামনের যন্ত্রের প্যানেলে একটা লাল বাতি দপ দপ করতে লাগল। সেই সঙ্গে আগুন লাগার হুঁসিয়ারী ঘণ্টা। ডান দিকের ইঞ্জিনে আগুন ধরে গেছে। প্লেন আকাশে আর তোলা ত দূরের কথা সোজা রাখাই দায়। যে কোন মুহূর্তে পাক খেতে খেতে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে নিচের পাহাড় জঙ্গলের ওপর।

টার্কা সত্যিকার ইবো-ই বটে। এত বড় বিপদ থেকে বাঁচবার কোন আশা আর নেই জেনেও এতটুকু অস্থির হয়নি। চোয়াল দুটো শুধু একটু শক্ত হয়েছে তার। সেই কঠিন মুখ নিয়েই জিজ্ঞাসা করলে,—দু'নম্বর ইঞ্জিনে আগুন লাগল কি করে? কাল রাত্রেও ত আপনি আমি সব চেক করে গেছি।

আবার করা উচিত ছিল আজ সকালে। —নিজেকেই ধিক্কার দিয়ে কোনমতে প্লেনটা বাঁ দিকে ঘুরিয়ে টার্কাকে সাবধান করেছি,—কোথায় আছড়ে পড়ব জানি না। সামনে ঝুঁকে পড়ে মাথা নিচু করে দু'হাতে নিজের গোড়ালি দুটো শক্ত করে ধরে থাকো। কিছুতেই মাথা তুলো না।

পাহাড়টাকে এড়ানো গেছে, কিন্তু সামনে ত জঙ্গলের আর শেষ নেই। সেখানে 'ক্র্যাসল্যান্ড' যাকে বলে সেই ঘাড়মুড় গুঁজেই বা পড়বার চেষ্টা করব কোথায়? এদিকে প্লেনের একটা ইঞ্জিন জ্বলতে জ্বলতে ত পড়েই গেছে খসে। প্লেনটারও পড়তে আর দেরী নেই।

তাই পড়ল। শুধু অনেক কসরৎ করে আর ভাগ্যের জোরে ঘন একটা জঙ্গলের মাথায় প্লেনটাকে নামাতে পেরে পড়ার মারাত্মক ধাক্কাটা বাঁচাতে পারলাম।

জঙ্গলের মাথায় ডালপালায় লতায়পাতায় জড়িয়ে প্লেনটা ভেঙেচুরে বেঁকে দুমড়ে থামল। নেহাৎ কেনীর সঙ্গে আমার দেখা বরাত আছে বলে প্রায় অক্ষত শরীরেই তা থেকে মাটিতে নামতে পারলাম।

আমি একা হ'লে সাত দিনেও সে জঙ্গলের হদিস জেনে তা থেকে বার হতে পারতাম না। টার্কা কিন্তু মাটিতে নেমে দুটো গাছ আর ঝোপ একটু লক্ষ্য করে দেখেই যেন কলকাতার রাস্তা দেখে পাড়া চেনার মত বললে,—এ ত কেনীর টিনের খনির কাছেই এসে নেমেছি। দিন চারেক হাঁটলেই পৌঁছে যাব তার ডেরায়।

টার্কা দিন চারেক হাঁটার কথাটা এমন ভাবে বলল যেন সেটা নেহাৎ মর্নিং ওয়াক।

এত দু:খেও হেসে বললাম,—সামান্য দিন চারেক না হয় হাঁটব, কিন্তু তাতে লাগোস-এ পৌঁছতে ত পারব না! দুদিন বাদে নতুন আইনে তোমার জমিজমা যে সব বেহাত হয়ে যাবে।

টার্কা যা জবাব দিলে তাতে তার ওপর ভক্তি-ভালবাসা আরও বাড়ল। হেসে সে বললে,—হলে আর করছি কি! প্রাণটাই বেহাত হতে যাচ্ছিল যে!

এরপর আর বলবার কিছু থাকে না।

অন্তত: চারদিনের হাঁটা পথ, আর জঙ্গলও বড় সোজা নয়। হাতি গণ্ডার সিংহ চিতা জিরাফ, সারা আফ্রিকার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বুনো মোষ হরিণ শম্বর,—কি সে জঙ্গলে নেই! ডাঙায় ওই আর জলে হিপোপোটেমাস কুমীর। এছাড়া নানা জাতের বাঁদর সাপখোপ ত আছেই। কি ভাগ্যি প্লেনের ভেতর বন্দুকগুলো ছিল। টার্কা জঙ্গলের মাথায় আবার উঠে সেগুলো পেড়ে নিয়ে এল।

তাই নিয়েই রওনা হলাম।

টার্কা বলেছিল চারদিনের রাস্তা। হিসেবটা আমাদের পাড়াগাঁয়ের ক্রোশের মত বোধহয়। যতক্ষণ হায়রানিতে জিভ না বেরিয়ে পড়ে ততক্ষণ ক্রোশ আর শেষ হয় না।

টার্কার চার দিনের রাস্তা পার হতে আমার চার হপ্তা লেগে যেত যদি না অভাবিত একটা ব্যাপার যেত ঘটে।

সকালবেলা উঠেই পাখিটাখি বা খরগোশ টরগোশ পেলে মেরে তাই বনের কাঠ-কুঠরো জ্বেলে ঝলসে নিয়ে খাওয়া সেরে আমরা রওনা দিই। দুপুরবেলা যেদিন যেমন জোটে তেমনি একটু ছায়া খুঁজে নিয়ে একটু বিশ্রাম করি। তারপর আবার হাঁটা শুরু করি রোদের তেজ একটু কমলে। অন্ধকার নামবার আগেই থেমে পড়ে আবার সামান্য কিছু বনের ফল-পাকুড় আর ঝলসানো মাংস খেয়ে রাত্রের ডেরা বাঁধি মজবুত কোন গাছের মাথায়।

ভাগ্যক্রমে দিন দুয়েকের মধ্যে বড় কোনো বেয়াড়া জানোয়ারের সঙ্গে মোলাকাৎ হয়নি।

টার্কার কোন পরোয়াই নেই। কিন্তু হক্কের সম্পত্তি থেকে তার ফাঁকি পড়া নিয়ে আমার ভেতরের জ্বালাটা আর যেতে চায় না। প্লেনে কেন আগুন লেগেছিল বুঝতে আমার বাকি নেই। আমাদের প্রাণে মারতেই কেনী চেয়েছিল। কিন্তু প্রাণে মরি না মরি তার যা মতলব তা হাসিল হয়ে গেছে। টার্কা সময়মত গিয়ে না পৌঁছোবার দরুন তার বাজেয়াপ্ত দাবী নিজের প্লেনে লাগোস গিয়ে কেনী নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছে নিশ্চয়।

বনের পথ ভেঙে চলি বটে, কিন্তু কেনীর শয়তানিটা মনে হলেই মেজাজ একেবারে গরম হয়ে ওঠে। এমন সময় তিন দিনের দিন সকালে ভাগ্যই যেন আমার বন্দুকের গুলিতে এক কুদু-র ভবযন্ত্রণা শেষ করালে। কুদু হচ্ছে আফ্রিকার একটা অমূল্য শিকার। পাঁচটা সিংহ সাতটা হাতি কি গণ্ডার মেরে যা না হয় তার চেয়ে বেশি গর্ব হয় শিকারীর একটা নিখুঁত ছন্দে মেলানো জোড়া শিং-এর কুদু মেরে। কুদু ত হরিণ নয়, জঙ্গলের এক দৈবী মায়া। এই আছে এই নেই, কখন মূর্তি ধরে দেখা দেবে কেউ যেন জানে না।

সময় আর অবস্থা অন্য রকম হলে এই কুদু মারা নিয়ে একটা উৎসব পড়ে যেত। আপাতত: কোন রকমে শুধু হিসেবেই খুশী থাকবার জন্যে তার শিং জোড়া মাপতে গিয়ে হঠাৎ কুদুটার পায়ের ক্ষুরের দিকে নজর গেল। ক্ষুরের ফাঁকে যে ঝুরো মাটি লেগে আছে সেটা যেন কি রকম!

শিং মাপা ভুলে গিয়ে ক্ষুরের সেই মাটি কুরে কুরে নিয়ে পকেটের ভেতর রাখলাম।

কি করছেন কি? টার্কা অবাক, —পকেটে ও মাটি রাখছেন কেন?

কেন রাখছি! ধর্মের কল হয়ত বাতাসে নড়েছে এই মাটিই তার ইশারা, বলে।

হেঁয়ালিটা বুঝুক না বুঝুক টার্কা তা নিয়ে প্রশ্ন আর কিছু করল না।

বাতাসে ধর্মের কল নড়ার আরো একটা প্রমাণ অত তাড়াতাড়ি তারপর পাব ভাবতে পারিনি।

তখনও আমার হিসেবে অন্তত: দিন চারেকের হাঁটা পথ বাকি। যন্ত্রের মত পা চালাচ্ছি। হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনে চমকে উঠলাম।

টার্কার কান আমার চেয়েও সাফ। উত্তেজিত হয়ে বললে,—এ ত জীপের আওয়াজ শুনছি। জীপ নিয়ে এখানে কেনী ছাড়া আর কে আসতে পারে?

টার্কার অনুমান নির্ভুল প্রমাণ করে মিনিট খানেকের মধ্যেই জীপটা ডাইনের একটা বড় গাছপালার জঙ্গল ঘুরে আমাদের কাছে এসে থামল।

জীপের হুইল ধরে আছে কেনী নিজে। পেছনে তার শিকারের লটবহর নিয়ে একজন এদেশী অনুচর।

আমাদের দেখে কেনী যেমন আহ্লাদে আটখানা, তেমনি যেন একেবারে তাজ্জব। —আরে তোমাদের এখানে দেখব ভাবতেই পারিনি। এ জঙ্গলে কি করছ? লাগোস-এ যাবার নাম করে তাহলে শিকার করতেই নেমেছ এখানে? তা প্লেনটা কোথায়?

প্লেনটা হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে এসেছি। —বেশ দন্ত বিকশিত করেই তাকে বললাম, —তোমার কাছে কথাটা লুকিয়েছিলাম, কিন্তু ভাগ্যের এমন দয়া যে তোমার সঙ্গে শিকারের সাধটাও আশ্চর্যভাবে মিটিয়ে দিলে।

ঠিক! ঠিক! আমিও ত তাই ভাবছি! —কেনী একেবারে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল,—ভাগ্যই, নইলে হঠাৎ তোমাদের দেখাই পাইয়ে দেবে কেন? এসো, জীপে উঠে এসো। তোমার শিকারের সখটা মিটিয়ে দিই।

বন্দুক নিয়ে জীপে উঠে বসলাম। আমি সামনে কেনীর ডাইনে, আর টার্কা পেছনের সীটে।

আমরা ওঠবার পরই জীপ চালিয়ে দিয়ে কেনী বললে, বড় ভালো সময়ে তোমায় পেয়ে গেছি দাস। জানো নিশ্চয়ই যে পশ্চিম আফ্রিকার বুনো মোষের চেয়ে দুর্দান্ত জানোয়ার আর পৃথিবীতে নেই। এ বুনো মোষ যদি একবার ক্ষেপে, তাহলে সিংহ হাতি গণ্ডার তার তুলনায় যেন পোষা জানোয়ার। এ অঞ্চলের সেই বিখ্যাত বুনো মোষের এক পালেরই সন্ধান পেয়েছি আজ সকালে। সেখানেই তোমায় নিয়ে যাচ্ছি।

সত্যিই তোমার বন্ধুপ্রীতির তুলনা নেই।—আমি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললাম,—কিন্তু তুমি হঠাৎ এ সময়ে শিকারে বেরিয়েছ যে! লাগোস-এ তোমার একবার যাবার কথা ছিল না?

কেনী তার জালার মত মুখের ভাঁটার মত লালচে চোখের দৃষ্টি যেন বল্লমের মত একবার আমার দিকে ছুড়ে রসিয়ে রসিয়ে এবার বললে, —ঠিক ধরেছ দাস। তা লাগোসের কাজটা না সেরে কি এখানে এসেছি মনে করো? তোমরা যাবার পরই আমার প্লেনটা নিয়ে লাগোসে গেলাম। সেখানে কাজটা নির্ঝঞ্ঝাটে হয়ে গেল বলেই ফিরে এসে একটু স্ফূর্তি করতে শিকারে বেরিয়ে পড়লাম।

আমাদের প্লেনটার পাত্তা নেওয়ারও সেই সঙ্গে মতলব ছিল নিশ্চয়ই!—আমি তার কেজো বুদ্ধির যেন তারিফ করে বললাম,—প্লেনের খোঁজ আর শিকার, একসঙ্গে রথ দেখা আর কলা বেচা দুই-ই যাতে হয়ে যায়।

কি সাফ তোমার মাথা, দাস! —কেনী প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বললে,—আমার দেশের কাসল-এর হলঘরে হরিণ গণ্ডার বুনো মোষের মাথার সঙ্গে বাঁধিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে!

এমন সম্মানের জন্যে মাথাটা নিজেই তোমায় উইল করে যেতাম কেনী,—আমি একটু যেন আফশোষের সঙ্গে বললাম, —কিন্তু দেশে তোমার কাসলটা যেন ডার্টমুর-এ বলে শুনেছি।

ডার্টমুর? —খোঁচাটা চট করে ধরতে না পেরে কেনী একটু ভ্রূ কুঁচকে বললে,—ডার্টমুর কেন হবে? আমাদের কাসল হল, এই কি বলে কেন্টে।

বা:! জেনে খুশি হলাম।—আমি যেন মুগ্ধ হয়ে বললাম,—ওদিকে কেন্টে না ঘেন্টে তোমার কাসল, আবার এখানে এই। বেনুয়ে নদীর ধারের সমস্ত সেরা চাষের জমিই ত এখন তোমার। টার্কার সব জমিই ত নিজের নামে বন্দোবস্ত করে নিয়েছ?

তা না নিলে কি চুল ছাঁটতে লাগোস-এ গেছলাম! —এবার ফ্র্যাঙ্ক কেনীর শয়তানী হাসি আর থামতে চায় না খানিকক্ষণ।

ততক্ষণে তিন দিকে বিরাট জঙ্গলে ঘেরা একটা বন্ধুর পাথুরে ডাঙার ওপর আমরা এসে পড়েছি।

পাকা হাতে এবড়োখেবড়ো জমির ওপর দিয়ে জীপ চালিয়ে জঙ্গলের এক ধারে এসে সে ইঞ্জিন বন্ধ করে হাসতে হাসতেই বললে, —টার্কার কি জমি নিজের নামে বন্দোবস্ত করেছি শোন তাহলে। ভালো চাষের জমি যেখানে যত ওর ছিল সব।

আর ওই মেটে পাথরের ডাঙা জমিগুলো?— ভেতরের ধুকধুকুনি মুখে ফুটতে না দিয়ে নেহাৎ নির্বিকার গলায় জিজ্ঞাসা করলাম,—সেগুলোও লিখিয়ে নিয়েছ?

সেগুলো লিখিয়ে নেব আমি কি এমন আহাম্মক!—কেনী আবার পৈশাচিক হাসি হাসল,—আসল শাঁসটা নিয়ে খোসাটা ফেলে রেখেছি তোর মত উজবুক যার গুরু সেই ইবো ভূতটার জন্যে।

কি ধন্যবাদ যে তোমায় দেব ভেবে পাচ্ছি না কেনী! এতক্ষণে আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে পকেট থেকে সেই মাটির গুঁড়ো খানিকটা বার করে হাতের চেটোয় রেখে বললাম,—এটা কি বোধহয় চেনো?

কি ওটা?—কেনী সন্দিগ্ধভাবে চাইল, —খানিকটা গুঁড়ো মাটি ত!

হ্যাঁ গুঁড়ো মাটি!—আমি স্বীকার করলাম,—তবে একটু ভালো করে লক্ষ্য করে দেখো, সাধারণ মাটি নয়, 'শেল' যাকে বলে সেই মেটে পাথরের গুঁড়ো।

তুই আর আমায় শেল চেনাসনি, সুঁটকো মর্কট! —কেনী এবার জিভ থেকে ভদ্রতার শেষ রাশটুকুও খুলে নিয়ে হিংস্র উল্লাসের সঙ্গে বললে,—চাষের জমি যা বাগিয়ে নিয়েছি তার পাড় দিয়ে মাইলের পর মাইল ত এই 'শেল'-এর বাঁজা ডাঙা পড়ে আছে এখানে। দুনিয়ার কোনো কাজে লাগে না। না লাগে চাষবাসে, না করা যায় অন্য কিছু। তাই দিয়েছি সব ওই টার্কাকে ছেড়ে।

হ্যাঁ দিয়েছ! নিজেই মুগুর মেরেছ নিজের কপালে! —আমি এবার বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে বললাম,—একটু জলা জমির লোভে কুবেরের রাজত্ব হেলায় পায়ে ঠেলেছ।

কি আছে তোর ওই 'শেল'-এর বাঁজা ডাঙায়?— বিদ্রূপ করলেও একটু সন্দেহ ফুটে উঠল কেনীর গলায়,—সোনা রূপো হীরে মানিক!

যা আছে,—গম্ভীর হয়ে বললাম,—তা সোনাদানা হীরে মানিকের খনির চেয়ে অনেক দামী। আছে কেরোজেন।

কেরোজেন! —আমি যেন তাকে ঠারে গাল পাড়ছি এমনভাবে কেনী আমার দিকে চাইল।

বললাম,— হ্যাঁ কেরোজেন। আজ তোমার মত মুখখুরা ত নয়ই এ ব্যাপারের যারা ব্যাপারী তারাও নাম জানলেও এ জিনিসের কদর বোঝে না। কিন্তু এক দিন—খুব বেশী কাল পরেও নয়—সারা দুনিয়ায় কাড়াকাড়ি পড়ে যাবে এই মেটে পাথর 'শেল'-এর বাঁজা ডাঙার জন্যে। পৃথিবীর পেট্রোল ফুরিয়ে আসতে খুব দেরি নেই। দেরি যদি একটু থাকে তাহলেও দুনিয়ার মোট পেট্রোলের পুঁজি এক রকম জানা। পৃথিবীতে এখন তিন লক্ষ কোটি ব্যারেলের বেশী পেট্রোল নেই বলে ধরা যেতে পারে। সেই জায়গায় ভাসাভাসা জরিপে এই মেটে পাথর 'শেল'-এর যা সন্ধান পাওয়া গেছে, তা থেকে সমস্ত পৃথিবীর পেট্রোলের পুঁজির তিন গুণেরও বেশি তেল পাওয়া যেতে পারে। 'শেল' পাথরের রবারের ধরনের আঁট কেরোজেন শুধু সাড়ে আটশ থেকে ন'শ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপে গালিয়ে তার গন্ধক আর নাইট্রোজেন-এর গাদ শোধন করবার ব্যবস্থা করা দরকার। তার কায়দা বার করা কিছু শক্ত নয়। এসব জটিল ব্যাপার তোমার ও নিরেট মাথায় ঢুকবে না কেনী। শুধু এইটুকুই জেনে রাখো যে নাইজিরিয়ায় দুদিন বাদে যদি জাতে জাতে হানাহানির লঙ্কাকাণ্ড শুরু হয় তাহলে তোমার ওই ফাঁকি দিয়ে বাগানো দাবীর ছেঁড়া কাগজের বেশী দাম থাকবে না। কিন্তু অমন বিশ-ত্রিশ বছর বাদেও নাইজিরিয়া ঠাণ্ডা হলে টার্কার একেবারে নিজস্ব না হোক, এ দেশের মানুষের জন্যে এ সম্পদ মজুত থাকবে।

থাক, খুব হয়েছে! —কেনী এবার গর্জন করে উঠল, —এ মেটে পাথরের ডাঙা তোর যখন এত পছন্দ তখন এখানেই তোর হাড়গুলো যাতে শুকোয় তার ব্যবস্থা করছি। বুনো মোষ শিকারের কথা তোকে দিয়েছিলাম। সেই শিকারের সুযোগই এবার পাবি। আজ সকালে একটা বুনো মোষকে মারতে গিয়ে হাত ফস্কে গেছে। মোষটা আধা জখম হয়ে স্বয়ং যমের দূত হয়ে এখানেই আছে কোথাও লুকিয়ে। অনেকদিন সাধ ছিল ক্ষ্যাপা বুনো মোষের সঙ্গে একটা মর্কটের লড়াই দেখব। আজ সেই সুবিধেই হয়েছে। নে নাম।

কেনী আমায় প্রচণ্ড একটা ঠেলা দিলে।

জীপ থেকে পাথুরে জমির ওপরেই পড়লাম। পড়েছি ডান হাতে বন্দুকটা ঠিকমত সামলেই।

কেনী তখন মাটির ওপর থুবড়ে পড়া মুখটা সবে একটু হতভম্ব হয়ে তুলেছে।

তার কাছে যেন মাপ চেয়ে বলেছি,—কিছু মনে কোরো না কেনী, তোমার মত আমারও বহু দিনের একটা সাধ ছিল সাদা একটা হিপ্পোর সঙ্গে বুনো মোষের লড়াই দেখব। তুমি সেই সাধটা আজ মেটালে।

টার্কা জীপ থেকে তখন নামতে যাচ্ছে। তাকে বারণ করে বললাম,—না টার্কা, নেমো না। এটা আমাদের নিজের নিজের মান রাখবার বাজি। কেনীর বন্দুকটা বাইরে ফেলে দিয়ে তুমি জীপটা নিয়ে বনের ওই কিনারে গিয়ে অপেক্ষা করো। জঙ্গলের এধারে ওই ঝোপটার নড়া দেখে বুঝছি, আমাদের খেল শুরু হতে আর দেরি নেই। যাও তুমি।

থ্যাবড়ানো মুখ নিয়ে কেনী এবার প্রায় আঁতকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল।

না, না, জীপ নিয়ে যেও না! —তার প্রায় আর্ত চিৎকার শোনা গেল সঙ্গে সঙ্গে,—ও ক্ষ্যাপা মোষের কাছে তাহলে আজ রক্ষা নেই!

টার্কা তখন আমার নির্দেশ মত কেনীর বন্দুকটা ফেলে দিয়ে জীপ চালিয়ে দিয়েছে।

কেনী পাগলের মত তার পেছনে ছুটে যাবার চেষ্টা করছিল। তাকে এক হাতে টেনে ধরে ঘাড়ে একটা আদরের রদ্দা দিয়ে বললাম,—তোমার সাহস দেখে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি কেনী।

কেনী মাটির ওপর তখন বসে পড়েছে উবু হয়ে। ঘাড়টা পেছন থেকে ধরে তাকে টেনে তুলে গালে একটি থাপ্পড় দিয়ে প্রশংসা জানিয়ে বললাম,—আর কি তোমার দয়ার শরীর! নিজে জীপে উঠে পালিয়ে শুধু আমাকে জখম ক্ষ্যাপা মোষের মওড়া নেবার সুযোগ দিতে চাও। কিন্তু আর তোমায় সুযোগ দিতে হবে না। ফিরে দেখো, আমাদের নিয়তি নিজেই ছুটে আসছে।

কেনী আঁতকে ফিরে তাকালো। সাক্ষাৎ যমরাজের বাহনের মত ঝোপের আড়াল থেকে ফ্রন্টিয়ার মেল ট্রেনের ইঞ্জিনের মত ছুটে বেরিয়ে মোষটা তখন স্বয়ং শয়তানের হাতে আঁকা সেকেন্ড ব্র্যাকেটের মত শিং সাজানো মাথাটা একটু নুইয়ে হঠাৎ একটু থমকে থেমেছে মাত্র হাত কয়েক দূরে!

একবার সে দিকে চেয়েই তার নিজের ইষ্টনাম হেঁকে কেনী পেছন ফিরে দে ছুট!

ছুটো না! ছুটো না কেনী! ছুটলেই সর্বনাশ! —তার পেছনে চিৎকার করলাম। কিন্তু কে কার কথা শোনে!

ক্ষ্যাপা মোষটা মাথা নুইয়ে আই সি বি এম-এর মত তখন তাকে তাড়া করছে।

ঘনাদা থামলেন।

তারপর? তারপর? —শিবুর মাসতুতো ভাই-এর ব্যাকুল গলাই শুধু শোনা গেল,—কি হল ওই ফ্র্যাঙ্ক কেনীর?

কি হল, তা আবার বলতে হবে? —শিশির সিগারেটের টিনটা ঘনাদার সামনে খুলে ধরে প্রায় ঘনাদার মতই বাঁকা হাসি হাসবার চেষ্টা করলে।

না, না, মাথাটা তেমন সবল নয়। ওঁকে বুঝিয়ে বলাই দরকার। ঘনাদাই করুণা করলেন, —মোষের শিংজোড়া টার্কাকেই দিয়ে এসেছি।

তার মানে আপনি কেনীকে বাঁচাতে ওই ক্ষ্যাপা মোষকে মারলেন!—বিস্ফারিত চোখে জিজ্ঞাসা করলে শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভু।

মারব কেন?—ঘনাদা যেন অবাক হয়ে বললেন,—ক্ষ্যাপা মোষটা তার শিংজোড়া পায়ের কাছে খুলে রেখে প্রণামী দিয়ে গেল। আপনাদের নেফার ডেয়ারীর ওই গয়াল গাউর তা দেয় না?

যা: কি যে বলেন! —শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভু এবার লজ্জিত।

ভুল বললাম বুঝি!—ঘনাদাও লজ্জিত হলেন,—হ্যাঁ, ভুলের কথায় মনে পড়ল, আপনাদের নেফার ডেয়ারীর গাউর গয়ালরাও এখন বনস্পতি মেশানো দুধ দিচ্ছে দেখছি। এই যে রসিদটা দেখুন না!

ঘনাদা কখন ঘি-এর ভাঁড়ের কাগজের মোড়কটা খুলেছেন, কেউ দেখিনি। হাতে নিয়ে দেখি, সত্যিই মোড়কের সঙ্গে বনস্পতি কেনার রসিদটা থেকে গেছল।

কৈফিয়ৎ কিছু খুঁজে পাবার আগেই ঘনাদা আবার মাসতুতো ভাইকে বললেন,—আমি বলি কি, নেফায় ডেয়ারী করেও সুবনসিরি কি ডাফলা আপাতানির নাম যখন ভুলে যান তখন আপনি নিজেই কিছু ব্রাহ্মী শাক দিয়ে ফুটিয়ে এ ঘি-টা খান গিয়ে। স্মরণ শক্তি বাড়তে পারে।

না, না, ওসব ব্রাহ্মী ঘৃত টৃত নয়,—শিবু সোৎসাহে বলে উঠল,—এক ওষুধ আর্জেন্টাম নাইট্রিকাম।

হাসলাম, কিন্তু শিবুর সাজা মাসতুতো ভাই-এর জন্যে একটু দু:খও হ'ল। বেচারা আমাদের মদৎ দিতে এসে গৌরের 'শক-থেরাপি'-র মানে চমক-চিকিৎসার 'শক'-টা নিজেই খেয়ে গেল। কিন্তু 'পার্টে'র মর্ম না বুঝে খোদার ওপর খোদকারী করে 'স্ক্রিপ্টে'র বাইরে 'ডায়লগ' সে নিজের মুখে বসাতে যায়ই বা কেন?

অধ্যায় ১ / ৬৮
সকল অধ্যায়
১.
মাটি
২.
ভুতের গল্প
৩.
হর্ষবর্ধনের অশ্বরোগ
৪.
সেই মেয়েটি
৫.
বিদ্যাসাগরের ছেলেবেলা
৬.
গোয়েন্দা
৭.
ইতিহাস ছাড়িয়ে
৮.
যমালয়ে জীবন্ত মানুষ
৯.
ডাকিনীর ডাক
১০.
শত্রুতা
১১.
রেলে
১২.
অতু
১৩.
এক যে ছিল বাঘিনী
১৪.
দাওয়াই
১৫.
বিশ্বের বিস্ময় হেলেন কেলার
১৬.
ফুলের বিবাহ
১৭.
মংলুফলায় সোনা
১৮.
একটি গল্প করার মত গ্রাম
১৯.
লালমণি পাখি
২০.
প্লাবন
২১.
ছাত্র-সঙ্গীত
২২.
জয়-পরাজয়
২৩.
এখন শিউলি-বেলা
২৪.
আশ্বিনে
২৫.
ছড়া
২৬.
পোড়ো কুঁড়ে
২৭.
মা (উপন্যাস)
২৮.
গোর্কির ছেলেবেলা
২৯.
সেয়ানে সেয়ানে
৩০.
সুড়ঙ্গের রহস্য
৩১.
এক ঝাঁক গল্প
৩২.
কঙ্কাল
৩৩.
নতুন করে জাগো মা
৩৪.
বেতাল-পঞ্চবিংশতি
৩৫.
ভবঘুরের চিঠি
৩৬.
নিলাম দামী চশমা
৩৭.
শরৎ এল
৩৮.
কৈশোর
৩৯.
আলোর ডাকে
৪০.
অগ্রদূত
৪১.
টাকার কথা
৪২.
সাহস চাই!
৪৩.
ভোজবাড়ীর ব্যাপার
৪৪.
আবাহনী
৪৫.
এবার পূজায়
৪৬.
বামুনের স্বর্গবাস
৪৭.
মজার ধাঁধা
৪৮.
আংটির পাথর
৪৯.
মনমঞ্জুষা
৫০.
নিখিল বঙ্গ গরু সম্মেলন
৫১.
মিকি ডাক আর দিসনে
৫২.
মেঘনাদবধ
৫৩.
চৌধুরী-বাগ
৫৪.
জাদু বিদ্যা
৫৫.
বাবার চিঠি
৫৬.
গানের কথা
৫৭.
আমার প্রথম শিকার আভিযান
৫৮.
বিশ্বক্রীয়া ওলিম্পিক
৫৯.
বাংলার বন্যা
৬০.
শরতে
৬১.
আনন্দ আশ্বিনে
৬২.
টোটকা কিছু
৬৩.
জলদি করুন দাদা
৬৪.
কিশোর বিজ্ঞানীর আসর
৬৫.
সঙ্গীতের মৃত্যু
৬৬.
ছত্রপতি
৬৭.
মেঘ ও বৃষ্টি
৬৮.
মধুপালের আবির্ভাব

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%