দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
কেষ্টগোপালবাবুকে লোকে বলে কাষ্ঠগোপাল।
অকারণে বলে না। একটা মিষ্টি কথা বলবারও অভ্যেস নেই ভদ্রলোকের। কারণে অকারণে লোককে যা-তা বলে তাদের মন খারাপ করে দিতে তিনি ভয়ানক ভালোবাসেন।
এই ধরো, পটলা অঙ্কে ফেল করে ক্লাসে প্রমোশন পেল না। তিন দিন ধরে ছেলেটা খালি কেঁদেছে, তাকে দেখলে সকলেরই দু:খ হয়, কেবল কাষ্ঠগোপালের হয় না। পটলাকে আরো কষ্ট দিয়ে মনে মনে তিনি ভারী আরাম পান।
বাজারের ভেতর দিয়ে হয়তো পটলা যাচ্ছে, চারদিকে লোকজন, তার মধ্যে গলা চড়িয়ে কাষ্ঠগোপাল বললেন, কিরে পটলা, অঙ্কে নাকি তুই তিন পেয়েছিস?
পটলা যে দৌড়ে পালাবে তারও জো নেই। রাস্তা জুড়ে কাষ্ঠগোপাল দাঁড়িয়ে।
—তা তিন তো পাবিই। যেমন তোর নীরেট মগজ! একেবারে যে গোল্লা পাসনি, এই তোর বরাত বলতে হবে!
অত লোকের সামনে ডুকরে কেঁদে ওঠবার উপায়ও নেই পটলার। লাভের মধ্যে যারা খবরটা জানত না তারাও জেনে গেল। আর রসিয়ে রসিয়ে কাষ্ঠগোপাল বলতে থাকলেন : ওরে, লেখাপড়া না করে তুই বরং জলে ডুবতে যা। কালিদাসের বেলায় যেমনটা হয়েছিল—তেমনি যদি মা সরস্বতী তোকে দয়া করতে আসেন, তা হলে এ যাত্রা তরে গেলি। নইলে সামনের পরীক্ষায় যদি তুই অঙ্কের খাতায় পাঁচও পাস তো—
এবার ভ্যাঁক করে কেঁদেই ফেলল পটলা। আর তাই দেখে মিটমিট করে হাসতে লাগলেন কাষ্ঠগোপাল।
বিশ্বনিন্দুক লোক। কিচ্ছু পছন্দ হয় না কাষ্ঠগোপালের। পাড়ায় কোনো বাড়ীতে বিয়ে-টিয়ে হলে ভদ্রতার খাতিরেও তাঁকে নিমন্ত্রণ করতে হয়। আর খেতে বসে কী করেন কাষ্ঠগোপাল?—আরে ছ্যা, এর নাম লুচি? এ যে জুতোর চামড়া হে। পচা ভেজিটেবল, ঘি জোটালে কোত্থেকে? রাম—রাম, এ-রকম বাজে মাছের কালিয়া তো কখনো খাইনি। অ্যাঁ—এগুলো রসগোল্লা নাকি? তা হলে আর সুজির পিণ্ডি কাকে বলে?
কেউ যদি বলে, আমাদের তো ভালোই লাগছে—কাষ্ঠগোপাল তাকে ঠাট্টা করতে থাকেন। বলেন, পরের পয়সায় যে খাচ্ছ হে! জুতোর সুখতলাও অমৃতির মতো মনে হবে, মার্বেল খেতে দিলেও বলবে জনাইয়ের মনোহরা খাচ্ছি।
এই হলেন কাষ্ঠগোপাল। কিন্তু লোকে তাঁকে চটাতে সাহস পায় না। তাঁর অনেক টাকা, আর পাড়ার অর্ধেক বাড়ীর তিনি মালিক।
পাড়ায় নতুন বাড়ী করে এসেছেন মার্তণ্ড বাবু। রাশভারী চেহারার লোক। কী যেন সরকারী চাকরী করতেন, এখন রিটায়ার করেছেন। প্রায়ই বই-টই পড়েন আর সকালে-বিকালে একটা লাঠি হাতে নিয়ে দেশবন্ধু পার্কে বেড়াতে যান।
কাষ্ঠগোপাল গিয়ে হাজির হলেন তাঁর কাছে। নতুন লোক, আলাপ তো করা চাই। তা ছাড়া ফাঁক পেলে দুটো কড়া কথাও বলে আসবেন।
মার্তণ্ড বাবু একটা মস্ত চামড়া-বাঁধানো ডেকচেয়ারে বসে প্রকাণ্ড একটা ইংরিজি বই পড়ছিলেন। কাষ্ঠগোপালকে দেখে বইটা নামিয়ে বললেন, আসুন। বসুন।
—আলাপ করতে এলুম।
চশমার ভেতর দিয়ে তাঁকে ভালো করে দেখে নিলেন মার্তণ্ড। তারপর বললেন, বেশ। একবার এদিকে ওদিকে তাকিয়ে কাষ্ঠগোপাল বললেন, এ পাড়ায় বাড়ী করলেন কেন?
—এমনি। ভালো লাগল।
—না মশাই, অতি নচ্ছার পাড়া। লোকগুলো খুব বাজে।
—তাই নাকি? —হঠাৎ মার্তণ্ড জিজ্ঞেস করলেন : আপনিও বুঝি খুব বাজে?
কথাটা শুনে একটা বিষম খেলেন কাষ্ঠগোপাল : না—না—ইয়ে—আমি বাজে লোক নই। পাড়ায় একমাত্র ভালো লোক আমাকেই বলতে পারেন।
মার্তণ্ড বললেন, শুনে সুখী হলুম। তা কী খাবেন? চা? না ঘোলের সরবৎ?
কাষ্ঠগোপাল বললেন, বড্ড গরম পড়েছে আজ। ঘোলের সরবৎই ভালো।
মার্তণ্ড ঘোলের সরবৎ আনতে বলে দিলেন চাকরকে। কাষ্ঠগোপাল ভাবতে লাগলেন, এইবারে কী বলা যায়।
—অনেক খরচ করে বাড়ী করলেন, মশাই, কিন্তু ভালো হয়নি।
মার্তণ্ড বললেন, ভালো হয়নি বুঝি? সবাই তো প্রশংসা করেছে বাড়ীর।
—ও তো মুখের প্রশংসা মশাই। এ আবার বাড়ীর একটা ডিজাইন নাকি? তা ছাড়া সব বাজে মাল-মশলা দিয়ে তৈরি মশাই, দেখবেন—এক বছরেই বাড়ীতে ফাট ধরে যাবে।
—ফাট ধরে যাবে?
যাবেই তো। কন্ট্রাকটাররা কী করে? যেমন তেমন করে কেবল পয়সা আদায়ের ফন্দি, যা তা একটা তৈরি করে দিলেই হল।
—অ। —মার্তণ্ড আবার কাষ্ঠগোপালের দিকে তাকালেন : কিন্তু এ বাড়ী তো কন্ট্রাকটারে করেনি। আমার বড়ো ছেলে এনজিনীয়র, সেই-ই দাঁড়িয়ে থেকে করিয়েছে।
ও—ও। —কাষ্ঠগোপাল একটু ঘাবড়ালেন : তা হলে মাল-মশলা ভালোই আছে। কিন্তু আপনি যা-ই বলুন, ডিজাইনটা ভালো হয়নি।
কপাল কুঁচকে মার্তণ্ড কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন কাষ্ঠগোপালের দিকে। আর এর মধ্যে চাকর ঘোলের সরবৎ নিয়ে এল।
চমৎকার সরবৎ। মশলা-টশলা দিয়ে অনেক যত্ন করে তৈরি—নিন্দে করবার কিছু নেই। কিন্তু এক চুমুক খেয়েই নাক কুঁচকে উঠল কাষ্ঠগোপালের।
মার্তণ্ড বললেন, সরবৎ আপনার পছন্দ হয়নি বোধ হয়?
কাষ্ঠগোপাল বললেন, সত্যি কথা বলছি, কিছু মনে করবেন না। না—পছন্দ হয়নি।
মার্তণ্ড শান্ত গলায় বললেন, কি রকম আপনার পছন্দ?
—এ দই দোকান থেকে আনিয়েছেন তো?
—আর কোথায় পাব?
—তাই। আরে দোকানের দই কি আর দই মশাই, ও তো অর্ধেক চুনের গোলা।
বিনীত হয়ে মার্তণ্ড বললেন, তা হলে ভালো দই কোথায় পাব বলতে পারেন?
—বলছি, শুনুন। —খুশি হয়ে কাষ্ঠগোপাল টেবিলে একটা চড় মারলেন : সে দই —সে ঘোল খেয়েছিলুম আমার পিসিমার বাড়ীতে —হরিপালে। মানে তারকেশ্বর লাইনে যে হরিপাল আছে, সেখানে।
মার্তণ্ড বললেন, বলে যান।
—আগের দিন গোরু দোয়ানো হল। সেই টাটকা দুধ ক্ষীরের মতো জ্বাল দিয়ে সন্ধ্যেয় দই পাতা হল। সেই দই থেকে পরদিন দুপুরে যখন ঘোল তৈরি হল—
বাধা দিয়ে মার্তণ্ড বললেন, বুঝেছি, বুঝেছি। আমিই সে ঘোল খাওয়াতে পারি আপনাকে। একেবারে সেই জিনিস।
হকচকিয়ে কাষ্ঠগোপাল বললেন, সেই জিনিস?
—একেবারে। কোনো খুঁত পাবেন না।
বলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন মার্তণ্ড। কাষ্ঠগোপালকে বললেন, আসুন আমার সঙ্গে।
কাষ্ঠগোপাল কেমন চমকে গেলেন।
—কোথায় যেতে হবে?
—আসুন বলছি।
বাপরে, কী গলার আওয়াজ মার্তণ্ডের। পিলে চমকে গেল কাষ্ঠগোপালের। মার্তণ্ড আবার সেই বাঘা স্বরে বললেন, আসুন শিগগীর।
অগত্যা উঠে পড়লেন কাষ্ঠগোপাল। তাকে সোজা দোতলায় নিয়ে গিয়ে একটা ছোট ঘরের দরজা খুলে দিলেন মার্তণ্ড। বললেন, ঢুকুন ওর মধ্যে।
—অ্যাঁ। —ওখানে কী?
—ঘোলের সরবৎ। আপনি যেমন চেয়েছেন। ঢুকুন।

মার্তণ্ড আবার সেই বাঘা স্বরে বললেন, আসুন শিগগীর।
প্রায় ঠেলেই কাষ্ঠগোপালকে ভেতরে ঢোকালেন মার্তণ্ড। তারপর খট-খটাং। বাইরে থেকে দরজা বন্ধ।
চেঁচিয়ে কাষ্ঠগোপাল বললেন, একি ব্যাপার মশাই মার্তণ্ড বাবু—দোর বন্ধ করলেন কেন? খুলুন-খুলুন—
বাজের মতো আওয়াজ তুলে বাইরে থেকে মার্তণ্ড বললেন, আমার ঘোলের সরবৎ আমি স্পেশ্যাল মশলা দিয়ে তৈরি করি—যে খায় সে-ই শতমুখে প্রশংসা করে। আপনি তার নিন্দে করলেন! ঠিক আছে, আপনি যা চান, তাই খাওয়াব।
—কিন্তু এ ঘরে সরবৎ কোথায় মশাই। মিস্তিরিদের ক'টা চূণের টিন, ক'টা বাঁশ—
—আসবে, সরবৎ আসবে। আমি এখুনি হাটে লোক পাঠাচ্ছি, সন্ধ্যের মধ্যে সে লোক ফিরে আসবে। কাল দুধ দোয়ানো হলে —কাল সন্ধ্যেয় ক্ষীর তৈরি করে দই পাতা হবে। সেই দই থেকে পরশু দুপুরে ঘোল হবে। সেই ঘোল খেয়ে তবে আপনি এ ঘর থেকে বেরুবেন, তার আগে নয়।
বলে মার্তণ্ড চলে গেলেন।
—ও মশাই—ও মশাই—একি রসিকতা! খুলে দিন বলছি—কাতরস্বরে চ্যাঁচাতে লাগলেন কাষ্ঠগোপাল। কেউ সাড়া দিল না।
ভাগ্যিস, ঘরের ছোট জানলাটায় শিক-টিক কিছু ছিল না। প্রাণের দায়ে সেইটে দিয়েই ঝাঁপ মারলেন কাষ্ঠগোপাল—পড়লেন একটা পচা-ডোবার ভেতরে। ঘোলের বদলে এক পেট কাদাজল খেয়ে তিনি উঠে পড়লেন, তারপর সেই যে ছুটলেন—
অলিম্পিকের দৌড়ও তার কাছে লাগে না!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন