দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

লীলা মজুমদার
লোকটার উপর অনেকক্ষণ থেকেই তিনু সামন্তর চোখ ছিল। ঘুরেও ছিল তার পিছনে সারা দিন; উ:, ব্যাটার পায়ে চাকা বাঁধা! ভালো লোকে সোজা মুখের দিকে তাকায়, স্থির হয়ে বসে, বুক ফুলিয়ে হাঁটে। কারণ, তাদের ধরা পড়ার ভয় থাকে না, লুকিয়ে রাখার কিছু নেই, কাজেই অন্য লোককে সন্দেহ করারও কিছু নেই। কিন্তু এই লোকটা কেবলই নিজের নাকের পাশ দিয়ে ঠিক যেন মোড় ঘুরে তাকায়; একবার পা মেলে দেয় তো আবার তখুনি পা গুটিয়ে নেয়; নিজের জুতোর দিকে তাকায়, আবার চোখ ফিরিয়ে নেয়; যখনি ভাবে কেউ দেখছে না তখনি নিজের হাতের নখগুলোকে খুঁটিয়ে দেখে। এই কি ভালো মানুষের চিহ্ন নাকি? দুঁদে টিকটিকি তিনু সামন্তর চোখে ধূলো দেওয়া অত সহজ নয়।
তিনু সামন্তকে দেখেও ভালো মানুষ বলে চেনা যায় না। চেনা যাবার কথাও নয়। এমন কি, চেনা গেলে ফেল পড়বার ভয় আছে। প্রাইভেট টিকটিকিদের কিছু টিকটিকির মতো দেখতে হলে চলে না, তার চেয়ে বরং আইনভঙ্গকারীর মতো দেখতে হলেই ভালো। মোট কথা জনতার মধ্যে এমন ভাবে মিশে যেতে পারা চাই যে আলাদা করে তার উপর কারো চোখ পড়বে না। আজকাল আইনভঙ্গকারীদের সংখ্যা অগুন্তি। যারা আইনভঙ্গকারী নয়, তারা প্রায় সবাই আন্দোলনকারী। দু-জনার প্রায় এক-ই ধরনের চেহারা, রোগা কালো খিদেখিদে ভাব আর পিটপিটে চোখ। তাছাড়া চঞ্চল হাত পা।
তিনু সামন্ত আগে মোটাসোটা ছিল; তখন কালো-বাজারি মনে হত; অনেক সুবিধাও হয়ে যেত। একাজে যেখানে সেখানে খেতে হয়, তাতে কদিন আর শরীর টেকে। তার উপর পুলিসি কুকুরদের দক্ষতার ফলে প্রাইভেট টিকটিকিদের অবস্থা কাহিল। তাই আজকাল খেয়েদেয়েও কোনো সুখ নেই; শরীর হয়েছে আধখানা। চোখে কালি পড়েছে, কারো দিকে তাকাতে ইচ্ছা করে না। অর্থাৎ ঐ লোকটার সঙ্গে বেজায় সাদৃশ্য। তবু পায়ের জ্বলুনিটা আরাম হয়েছে বলে তিনু দুবেলা মা কালীকে ধন্যবাদ দেয়।
লোক চেনে তিনু, ঐ হল ওর পেশা। এ লোকটা যে দেখতে যতটা ভালো মানুষ আসলে ততটা নয়, সে আর বলে দিতে হবে না। ঐ দেখ, আবার পা গুটিয়ে বেঞ্চিতে তুলে বসল। তার আগে নাকের পাশ দিয়ে উঁকি মেরে তিনু ঘুমোচ্ছে কি না ভালো করে দেখে নিল।

তিনু তার উপর লাফিয়ে পড়ল, 'হাঁ হাঁ হাঁ, ও কাজও করবেন না।
তিনু ঘুমোয় নি; কিন্তু সে কথা কে বলবে। চোখের পাতা গালের কোলে পড়ে আছে, অথচ চোখের কোণে দিয়ে সব দেখা যাচ্ছে। লোকটা আস্তে আস্তে জুতো জোড়া খুলে ফেলল। ভিতরে চকরা-বকরা নক্সা কাটা লাল-কালো মোজা। তিনুর রক্তস্রোত দ্রুত হল। এই তা হ'লে চাবি লুকোবার আসল জায়গা। তাই পায়ের এত অশান্তি। মোজার ভিতর শেঠজির বাড়ির ভল্টের ঐ অত বড় চাবি লুকিয়ে হেঁটে বেড়ানো কি সোজা কথা।
লোকটা এদিক ওদিক তাকিয়ে পকেট থেকে হোমিওপ্যাথির শিশির মতো ছোট্ট একটা শিশি বের করল। এ আবার কি! তিনু বিস্মিত হল। তারপরেই মোজা দুটো দুই টানে খুলে ফেলে, শিশির ছিপি খুলে ফেলে, আঙ্গুলের ফাঁকে কি একটা ঢালতে গেল।
তিনু তার উপর লাফিয়ে পড়ল, 'হাঁ হাঁ হাঁ, ও কাজও করবেন না।' শিশি পড়ে মাটিতে গড়াগড়ি, ঘরময় উগ্র চেনা গন্ধ। লোকটার নড়বার চড়বার ক্ষমতা চলে গেছিল। ফ্যালফ্যাল করে তিনুর দিকে চেয়ে রইল।
তিনু একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে, নিজের ছোট ব্যাগটি থেকে টিউব আর একটা ছোট ওষুধের প্যাকেট বের করল। 'কেরোসিন দিয়েছেন কি মরেছেন। জন্মে কখনো সারবে না। এই, এই হল হাজার আসল ওষুধ—হাজা-কিলার! মলমটি লাগাবেন তার উপর গুঁড়োটি ছড়াবেন। এই, এই রকম করে। কেমন, আরাম হচ্ছে না?'
লোকটি কেঁদে ফেলে, তিনুর ক্যাম্বিসের জুতো পরা পায়ে বারবার মাথা ঠুকতে লাগল। 'নির্ঘাৎ দ্যাবতা! এত দিনের এত দু:খ এক কথায় আরাম করে দিলেন। কেউ কখনো এতটুকু কমাতে পারে নি স্যার, অথচ দেশের বাড়ির চারদিকে প্যাচ পেচে জল। ঘরে বসে থাকলেও শুকিয়ে গিয়ে আরো জ্বলুনি। এদিকে চারদিক গরম হয়ে উঠলে, ঘরে বসে থাকা ছাড়া উপায়ও নেই। মাচায় গোপন কুঠরি আছে। সেখানে সেঁধোয় কোনো টিকটিকির সাধ্য নেই।'
তিনু শুধু একটু হাসল। গাড়ির বেগ কমে এল, সামনেই স্টেশন। লোকটা উঠে পড়ে হঠাৎ যেন মরিয়া হয়ে, কোঁকড়া চুলের ভিতর থেকে লম্বা একটা পেতলের চাবি বের করে, তিনুর পায়ের কাছে ফেলে দিল। তিনু চিনল, এই শেঠজির চাবি। লোকটা বলল, 'আমি জানি এর-ই জন্যে সারাদিন আমার পিছনে ছিনে জোঁকের মতো লেগে ছিলেন। ভেবেছিলাম ফাঁকি দেব, কিন্তু দ্যাবতাকে বঞ্চিত করা আমার অসাধ্য।'
এই বলে হ্যাঁচকা টানে দরজা খুলে সে নেমেই যাচ্ছিল আরেকটু হলেই। তিনু হাত পেতে বলল, 'ওষুধের দাম এক টাকা তেত্রিশ পয়সা। থ্যাঙ্কিউ। এই নিন আমাদের কার্ড। ফুরিয়ে গেলে আবার আনাবেন।'
লোকটা নেমে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলে পর তিনুর সম্বিৎ ফিরে এল। শেঠজি চাবি উদ্ধারের জন্য হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। তার উপর এটা নিয়ে চার কিস্তি ওষুধ বিক্রির শতকরা তেত্রিশ কমিশন। মন্দ কি, বাবা। কোনকালে কি করেছিল বলে পুলিসে চাকরি হল না। তার চেয়ে এখন তিনুর ঢের ঢের বেশি রোজগার। বেঁচে থাক হাজা-কিলার ওষুধ কোম্পানি আর বেঁচে থাক আইনভঙ্গকারীরা। মা কালীর দয়ায় তিনু কখনো না খেয়ে মরবে না। যদিও কিছু হজম হয় না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন