দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

নীহাররঞ্জন গুপ্ত
মালীই কেমন যেন অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে সুপর্ণর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সুপর্ণ নিজেও যেন কেমন একটা অসোয়াস্তি বোধ করে। তাড়াতাড়ি চোখটা সরিয়ে নিয়ে তার নিজের শেষ কথাটারই যেন পুনরাবৃত্তি করে। বলে, হ্যাঁ—থাকবো বলেই এসেছি। কেন, তুমি তোমার বাবুর চিঠি পাওনি?
মালী এবারে মৃদু গলায় জবাব দিল, পেয়েছি—
—ঘর পরিষ্কার করে রেখেছো ত?
—পরিষ্কার তো রোজই করছি গত সাত বছর ধরে—নতুন করে কি আর পরিষ্কার করব—
কথাটা মিথ্যে বলে মনে হয় না সুপর্ণর—
সত্যিই বাড়িটার যেদিকে তাকানো যায়, যেন একটা সুন্দর পরিচ্ছন্নতা চোখে পড়ে। বাড়ির নামটা কিন্তু সত্যিই অদ্ভুত!
কঙ্কাল। বাড়ির নাম আবার কেউ কঙ্কাল রাখে নাকি?
কিন্তু অমিত্রসূদন বাড়িটার নাম কঙ্কাল রেখেছিলেন। কৌতূহলের বশেই সুপর্ণ অমিত্রসূদনকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ভারি অদ্ভুত নাম ত বাড়িটার আপনার! কে রাখল ঐ নাম?
আমি।—অমিত্রসূদন বলেছিলেন।
লোকটা লোহালক্কড়ের ব্যবসা করে আজকের দিনে বিরাট এক ধনী বলে পরিচিত হলেও ওর মধ্যে যেন একটা দ্বিতীয় সত্তা ছিল।
দ্বিতীয় একজন অমিত্রসূদন।
সাহিত্যিক অমিত্রসূদন।
ছোট বেলায় এক অদ্ভুত নেশায় পেয়েছিল অমিত্রসূদনকে—লেখার নেশা। পাতার পর পাতা লিখে গিয়েছে—এবং সে নেশা থেকে পরবর্তীকালেও মুক্তি পায়নি অমিত্রসূদন।
ব্যবসা, টাকাকড়ি, ঐশ্বর্যের প্রতিপত্তি, জৌলুস—সব কিছু থেকে যেন পৃথক হয়ে, অনেকটা শামুকের খোল থেকে বের হয়ে আসার মত বের হয়ে আসে এক অমিত্রসূদন, যে অমিত্রসূদনকে তার বাড়ির কেউ চেনে না।
তার ঘরের পাশের ছোট ঘরটিতে—
কোন ঐশ্বর্যের আড়ম্বর নেই—কতকগুলো আলমারি—ঠাসা বই, একটা লিখবার টেবিল, কাঠের একটা চেয়ার, কাগজ, কলম-দোয়াত সেই টেবিলের পরে, নিশুতি রাতে সেই ঘরে এসে ঢোকেন—
আপন মনে পাতার পর পাতা লিখে যান। যার একটি লেখাও আজ পর্যন্ত কখনো প্রকাশিত হয় নি—কৃপণের ধনের মতো সবার দৃষ্টির আড়াল থেকে যাকে সংগোপনে চিরদিন অদ্ভুত এক মমতায় লালন করে এসেছেন অমিত্রসূদন।
একজন—মাত্র একজন সে সংবাদ জানত।
সুপর্ণ। অমিত্রসূদনের বন্ধু পুত্র।
বছর চব্বিশ বয়স এর মধ্যেই শেয়ার বাজারে সুপর্ণ চৌধুরীর নাম হয়েছে। আর ঐ লেখার সূত্র ধরেই একদিন অমিত্রসূদন সুপর্ণকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। মধ্যে মধ্যে সুপর্ণকে ডেকে পাঠাতেন অমিত্রসূদন।
রোগা লম্বা চেহারা। গায়ের বর্ণ কেমন যেন রক্তহীন ফ্যাকাশে বিবর্ণ। মাথায় চুলগুলো পশমের মত পাতলা—সামান্য লালচে—অবিন্যস্ত সব সময়েই। ভাসা ভাসা বড় বড় দুটো চোখ। চোখে পুরু লেন্সের কালো সেলুলয়েডের ফ্রেমে চশমা। এম,এ, পাশ করবার পর কোথায় কোন এক বেসরকারী কলেজে লেকচারার—আর ঐ সাহিত্য।
সংসারে একাই-মা বাপ বহুকাল আগেই গত হয়েছেন।
ভারি ভাল লাগত সুপর্ণকে অমিত্রসূদনের—তাই মধ্যে মধ্যে ডেকে পাঠাতেন।
—কাকাবাবু—
—এসো। অনেক দিন তোমাকে দেখি না, তাই ডেকে পাঠিয়েছিলাম। চল—ছোট ঘরে চল।
ছোট ঘরে মানে সেই আলমারি ভর্তি বইতে ঠাসা ঘরটা।
নিজে একটা চেয়ারে বসে ওকে আর একটা চেয়ারে বসতে বলতেন।
—তারপর বল, কি নতুন লিখলে?
—কিছু লিখতে পারছি না কাকাবাবু!
—কেন?
—একটা আইডিয়া অনেকদিন থেকে মাথার মধ্যে ঘুরছে, কিন্তু কিছুতেই যেন গুছিয়ে আনতে পারছি না।
—কি রকম বলত।
—নিজের কাছেই ত স্পষ্ট নয়—তা কি বলবো আপনাকে! আপনি কি নতুন লিখলেন বলুন।
—একটা নাটক লিখতে শুরু করেছি।
—নাটক?
—হ্যাঁ। শুনবে?
—শোনান না।
বেশী লিখতে পারেননি—মাত্র একটা দৃশ্যই লেখা হয়েছে।
তারপর হয়ত পড়া হতো নাটক। কোন দিন বা কোন বিরাট উপন্যাসের বিরাট একটি চ্যাপ্টার, কোন দিন গল্পের একটা পাতা।
কোন কিছুই শেষ হতো না অমিত্রসূদনের। কিছু লেখবার পরই থেমে যেতো—অসম্পূর্ণ!
সুপর্ণ বলতো, এটা চমৎকার হয়েছে! শেষ করুন—
কিন্তু ঐ পর্যন্তই। শেষ হতো না। শুরু হতো কিছু নতুন।
একজনের বছর চব্বিশ বয়স, অন্যজন ষাটের কোঠায় পৌঁচেছেন। তবু দুজনার মধ্যে গড়ে উঠেছিল যেন প্রগাঢ় এক বন্ধুত্ব—প্রীতির—সখের বন্ধন।
কিছুদিন থেকে সুপর্ণর শরীরটা ভাল যাচ্ছিল না। একটা রক্তশূন্যতা। নানাভাবে ডাক্তাররা পরীক্ষা করলো। তারপর পরামর্শ দিল, চেঞ্জে কিছুদিন গিয়ে মানে কোন স্বাস্থ্যকর জায়গায় কিছুদিন গিয়ে থেকে আসুন।
কথাটি অমিত্রসূদন জানতে পেরে বললেন, এক-কাজ করো না সুপর্ণ—
—কি কাকাবাবু?
—তুমি আমার কঙ্কালে গিয়ে কিছু দিন থেকে এসো।
কঙ্কাল! কেমন যেন বিস্ময়ের সঙ্গেই তাকায় সুপর্ণ অমিত্রসূদনের মুখের দিকে।
—হ্যাঁ।—বাড়িটার নাম রেখেছি কঙ্কাল।
—আশ্চর্য নামটা ত!
—যশিডি আর দেওঘরের মাঝামাঝি জায়গায় বাড়িটা, মানে আসলে একটা ভাঙাচোরা বন-জঙ্গলে ভরা পুরানো ভূতুড়ে বাড়ি ছিল। বাড়ির পোজিশনটা দেখে ভাই-এর পছন্দ হয়ে গেল। কিনে ফেললাম বাড়িটা এক ভদ্রলোকের কাছ থেকে মাত্র দশ হাজার টাকায়—। তারপর—
অমিত্রসূদন বলতে থাকেন, কলকাতা থেকে এনজিনীয়ার পাঠালাম—মাল মশলা সব—নতুন করে বাড়িটা আবার গড়ে তুলব। খোঁড়াখুঁড়ি ভাঙ্গাভাঙ্গি—নানা ধরনের কেরামতির কাজ চলেছে এমন সময় ঘটলো ব্যাপারটা—
—কি?
—একতলা বাংলো প্যাটার্নের বাড়িটা—অনেকটা রেকট্যাঙ্গুলার আকারের। সামনে ও ডাইনে-বাঁয়ে ঘোরানো বারান্দা। পিছন ও সামনে চারিদিকে প্রাচীর ঘেরা অনেকখানি খোলা জায়গা।
অমিত্রসূদন থেমে থেমে বলতে লাগলেন, বাড়ির সামনেই একেবারে সিঁড়ির কোল ঘেঁষে ছিল বিরাট একটা কনক চাঁপার গাছ, তার হাত দুই ব্যবধানে একটা ঝাঁকড়া কাঁঠালী চাঁপার গাছ। পর পর দুদিন দুটো বিষধর সাপ সেই ঝোপ থেকে বের হওয়ায় এনজিনীয়ার কুলীদের হুকুম দিল ঐ ঝাঁকড়া কাঁঠালী চাঁপার গাছটা কেটে ফেলতে।
—তারপর ঐ গাছটা কাটতে গিয়েই ব্যাপারটা ঘটলো।
—কি?
—গাছের শিকড় মাটি খুঁড়ে তুলতে গিয়ে বের হয়ে এলো একটা কঙ্কাল।
—কঙ্কাল!
—হ্যাঁ, আট দশ বছরের একটা মানুষের কঙ্কাল এবং কঙ্কালের দু'হাতে দুগাছা সোনার রুলি।
—বাচ্চা মেয়ের কঙ্কাল তাহলে বলুন।
—বোধ হয় তাই।
—তারপর?
—কুলীকামিজ ও মিস্ত্রীদের মধ্যে ত হৈ-হৈ পড়ে গেল। ভয়ে সব হাত গুটিয়ে নিল। সব কাজ বন্ধ। এনজিনীয়ার পরে আমাকে সব জানালে। ছুটে গেলাম। স্থানীয় পুলিশে সে সংবাদ আগেই দেওয়া হয়েছিল, তারাই কঙ্কালটা নিয়ে গিয়েছিল। যা হোক আমি ত অনেক কষ্টে তাদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে টাকা-পয়সা দিয়ে শান্ত করলাম। আবার কাজ শুরু হলো। বাড়িও একদিন কমপ্টি হলো। এবারে বাড়ির নাম। কি নাম দেওয়া যায়—হঠাৎ মাথায় এলো—বাড়িটার নাম কঙ্কাল থাক।
—কঙ্কালটা পেয়েছিলেন বলেই বোধ হয় ঐ নাম রাখার আপনার ইচ্ছা হয়েছিল কাকাবাবু?
—হবেও বা। এদিকে কঙ্কাল নামটায় বাড়ির সবার আপত্তি।
—স্বাভাবিক।
—তা সত্বেও কারো কথা আমি শুনলাম না। বাড়ির ঐ কঙ্কাল নামই রাখলাম। আর সেই জন্যেই বোধহয় আমার বাড়ির কেউ সে বাড়িতে একটা দিনও গিয়ে থাকতে রাজী হলো না।
—কেউ যায়নি সে বাড়িতে আজ পর্যন্ত?
—না।
—আপনি?
—আমি মাত্র একবার গিয়েছি। সেই প্রথম ও সেই শেষ।
—আর যান নি?
—না।
—কেন?
—সেই কথাই এবারে বলবো তোমায় সুপর্ণ।
অমিত্রসূদন বলতে লাগলেন :
এত পয়সা খরচ করে বাড়িটা তৈরী করলাম। সামনে অনেকখানি জায়গা জুড়ে গোলাপের বাগান। নানা জায়গা থেকে সব রেয়ার গোলাপের চারা এনে পোঁতা হয়েছিল। একজন মালীই সব দেখাশোনা করত। প্রয়োজনীয় ফার্নিচার বেডিং ককারিস, থাকবার জন্য সব ব্যবস্থাই করা হয়েছিল যাতে করে ওখানে গিয়ে থাকলে কোন অসুবিধা না হয়।
কার্তিকের শেষ—! বেশ ঠান্ডা পড়ে শেষ রাতের দিক থেকে। সন্ধ্যা নাগাদ সোজা কলকাতা থেকে গাড়িতে করেই গিয়ে ওখানে পৌঁছলাম। অজস্র গোলাপ ফুটে রয়েছে বাগানে। মালীটাকে আগেই খবর দিয়ে রেখেছিলাম। গেটের সামনে গিয়ে হর্ণ দিতেই সে এসে গেট খুলে দিল। মালীটা ঐ জায়গারই লোক। বয়স হয়েছে, তাহলেও রীতিমত ষণ্ডাগণ্ডা গোছের লোক।
দিনের আলো তখনো একেবারে নি:শেষ হয়ে যায়নি। ঘুরে ঘুরে মালীকে নিয়ে বাগানটা দেখলাম। ক্রমশ সন্ধ্যার অন্ধকার চারিদিকে ঘনিয়ে এলো।
রাতটা ছিল পূর্ণিমার পরের রাত। সন্ধ্যার কিছু পরেই চাঁদের আলোয় চারিদিক স্পষ্ট হয়ে উঠলো। বাইরে বেশ ঠান্ডা। খাওয়াদাওয়া সেরে একটা চাদর গায়ে ঘরের মধ্যে একটা বই হাতে চেয়ারটার উপর বসে পড়ছি। ক্রমশ: কখন রাত এগারটা বেজে গিয়েছে, জানতে পারিনি। চারিদিকে রাত্রির স্তব্ধতা। থেকে থেকে জঙ্গলের মধ্যে ঝিঝিঁর ডাক শোনা যাচ্ছে, আর মধ্যে মধ্যে কোন গাছে রাতজাগা পাখীর ডানা ঝাপটানোর শব্দ। হঠাৎ সেই সময়—বলতে বলতে অমিত্রসূদন চুপ করলেন।
কি?—প্রশ্নটা করে সুপর্ণ অমিত্রসূদনের দিকে তাকাল।
—দরজাটা ঘরের ভেজান ছিল। হঠাৎ একটা মৃদু শব্দ পেয়ে দরজার দিকে তাকালাম; আর দেখলাম দরজার কপাট দুটো ধীরে ধীরে ফাঁক হয়ে গেল। প্রথমটা ভেবেছিলাম, বুঝি হাওয়ায় দরজাটা খুলে গিয়েছে। উঠতে যাবো দরজাটা বন্ধ করবার জন্যে, হঠাৎ সেই সময় যেন মনে হলো, এক ঝলক ঠান্ডা বরফের মত হাওয়া ঘরের মধ্যে এসে ঢুকল। সেই সঙ্গে একটি ছোট্ট মুখ দরজার ফাঁক থেকে ভিতরে উঁকি দিল।
—মুখ?
—হ্যাঁ, ফুলের মতো একটি মুখ। বড় বড় ডাগর-ডাগর দুটি চোখ, এক মাথা কোঁকড়া কোঁকড়া চুল, এবং শুধু মুখই নয়, তারপর ছোট একটি মেয়ে।
মেয়ে?—আবার প্রশ্ন করে সুপর্ণ।
—হ্যাঁ, বছর আট-নয়ের একটি মেয়ে। পরনে সাদা একটি ফ্রক, হাত দুটি খালি। মেয়েটি নির্নিমেষে আমার দিকে চেয়ে আছে। এতরাত্রে কাদের মেয়ে এলো? কি যেন এক সম্মোহন শক্তি ছিল তার চোখের দুটি দৃষ্টিতে। বললাম, এসো খুকী, বাইরে কেন? ভিতরে এসো—।
মেয়েটি কিন্তু কোন সাড়া দেয় না। নড়েও না।
—এসো, ভিতরে এসো।
মেয়েটি এবারে ভিতরে এলো। যেন ভারি সঙ্কুচিত।
—কাদের বাড়ির মেয়ে তুমি? কি নাম তোমার?
মেয়েটি কোন কথা বলে না। একবারও মনে হলো না অত রাত্রে অতটুকু একটা মেয়ে কি করে ঐখানে আসতে পারে।
কি নাম তোমার? কাদের মেয়ে তুমি?—আবার শুধালাম। এবারে মেয়েটি যেন মনে হলো তার হাত দুটি সামনের দিকে তুলে নি:শব্দে আমাকে কি দেখাল। শুধালাম, কি হয়েছে হাতে?
মেয়েটি আবার নি:শব্দে তার গোল গোল দুটি হাত তুলে দেখাল। তারপরই যেমন করে এসে ঢুকেছিল তেমনি হঠাৎ যেন ঘর থেকে বের হয়ে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে একটা ঝড়ো হাওয়ার শব্দ ও একটি ছোট মেয়ের কান্না যেন কানে ভেসে এলো। তাড়াতাড়ি ছুটে বাইরে গেলাম। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না।
খুকী! খুকী! কোথায় গেলে তুমি?—বলে চিৎকার করে ডাকলাম।
বাইরে ফুটফুটে জ্যোৎস্না। হঠাৎ নজর পড়লো বারান্দার এক পাশে সেই মেয়েটি দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেলাম মেয়েটির দিকে। আমাকে এগুতে দেখে মেয়েটি কাঁদতে-কাঁদতেই ছুটে যেন সামনের একটা ঝোপের মধ্যে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আমিও সেই দিকে এগিয়ে যাই। কামিনী গাছটার ঝোপটার সামনে এসে থমকে দাঁড়ালাম। মেয়েটির কান্না তখনো শুনতে পাচ্ছি, গুমরে গুমরে কাঁদছে, কিন্তু তাকে দেখতে পেলাম না। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি, কখন মালী পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি।
—সাব।
চমকে ফিরে তাকালাম। পিছনে দাঁড়িয়ে মালী। সে বললে, অন্দর মে চলিয়ে সাব—।
—মালী, একটা ছোট মেয়ে এই দিকে—
—আমি জানি, ভিতরে চলুন।
—মেয়েটি—
—চলুন—সাব, ভিতরে চলুন।
ফিরে এলাম ঘরে। মালী বললে, রাত অনেক হয়েছে, এবারে শুয়ে পড়ুন সাহেব।
—কিন্তু ও মেয়েটি কাদের?
—ও কারো নয়।
—কারো নয়?
—না। ও এবাড়িতেই থাকে।
—এই বাড়িতে থাকে? কাদের মেয়ে?
—মালী বলে, চাঁদনী রাত হলেই ও আসে।
—তুমি ওকে আরো দেখেছো?
—হ্যাঁ সাহেব, বললাম ত চাঁদনী রাত হলেই ও আসে।
—আসে?
—হ্যাঁ। আমন মনেই ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়ায়—কাউকে কিছু বলে না। কেবল কাঁদে।
—কাঁদে? কেন?
—তা বলতে পারবো না সাহেব।
তারপরই একটু থেমে মালী বললে, বোধহয় ও খোঁজে—।
—কি?
—তা জানি না। মনে হয়, হাত দুটো দেখিয়ে ও কিছু বলতে চায়।
—কিন্তু ও কাদের মেয়ে—?
—বললাম ত সাহেব—, ও কারো নয়। ও মানুষ নয়!
—মানুষ নয়?—
—না—।
বলাই বাহুল্য, অত:পর বাকী রাতটা জেগে রইলাম—। চোখে ঘুম এলোনা। বাকী রাত কেবল ওর কান্না শুনতে লাগলাম। অমিত্রসূদন থামলেন।
কান্না?—সুপর্ণ জিজ্ঞাসা করে।
—হ্যাঁ, একটা চাপা কান্না—। সারাটা বাড়ির মধ্যে যেন গুমরে গুমরে ফিরতে লাগল। অবশেষে এক সময় রাত শেষ হলো, আর আমিও কলকাতায় ফিরবার জন্য ড্রাইভারদের ডেকে গাড়িতে উঠে বসলাম। ফিরে এলাম কলকাতায়। আর কোন দিন যাইনি।
অমিত্রসূদনের কাছ থেকে বাড়িটার গল্প শোনার পরই সুপর্ণর কেমন যেন ইচ্ছা হয় বাড়িটাতে আসবার। এবারে অমিত্রসূদন নিজে থেকে ঐ বাড়িতে এসে ক'টা দিন থাকবার কথা বলায় সে রাজী হয়ে যায়।
সুপর্ণ বলে, যাবো। আপনি মালীকে জানিয়ে দিন।
দিন দুই পরেই সুপর্ণ চলে আসে ওখানে।
রাতটা চাঁদনী রাতই ছিল। আহারাদির পর ঘরের মধ্যে বসে সুপর্ণ অন্যমনস্কভাবে একটা বইয়ের পাতা উল্টাতে থাকে। কিন্তু মনে মনে সুপর্ণ যেন সেই মেয়েটির আসার প্রতীক্ষা করতে থাকে তার সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে।
অমিত্রসূদন তাকে বলেছিলেন, মালী নাকি সে-রাত্রে তাকে বলেছিল, চাঁদনী রাত হলেই সে আসে আর সাধারণত রাত এগারটার পর। হাত ঘড়িটার দিকে তাকাল সুপর্ণ। রাত এগারোটা বাজতে আর মিনিট দশেক বাকী। দরজাটা ভেজানই ছিল। বন্ধ করেনি সুপর্ণ।
ঠিক রাত যখন এগারটা, দরজার ভেজান কপাট দুটো ধীরে ধীরে খুলে যেতে লাগল একটু একটু করে। কে যেন বাইরের লোক দরজার কবাট দুটো ঠেলে খুলে দিচ্ছে। একটা অদ্ভুত প্রত্যাশায় যেন দু চোখ মেলে দরজার কবাটের দিকে চেয়ে থাকে সুপর্ণ। ক্রমে খুলে গেল দরজার কবাট দুটো একটু একটু করে—। তার পরই অমিত্রসূদনের বর্ণিত সেই মুখখানি। ক্রমে সমস্ত দেহটা। মাথা-ভর্তি ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল। পরনে সাদা একটি ফ্রক।
সুপর্ণ চেয়ে থাকে নি:শব্দে। সেও চেয়ে আছে ওর দিকে।
—এসো—।
মেয়েটি কোন সাড়া দেয় না।
—এসো, ভিতরে এসো! ভয় কি? এসো!
ও ঘরের মধ্যে এসে ঢুকল।
—কি নাম তোমার?
মেয়েটি কোন সাড়া দেয় না।
—কথা বলবে না আমার সঙ্গে? জান, আমি এতক্ষণ তোমার জন্যেই জেগে বসে আছি—তোমার কথা শুনবো, তোমার সঙ্গে আলাপ করবো বলে।
মনে হলো, এবারে ওর ফুলের পাপড়ির মতো পাতলা ঠোঁট দুটি যেন বারেকের জন্য কেঁপে উঠল। মনে হলো, ও যেন কি বলবার চেষ্টা করছে। কি যেন ও বলতে চায়।
—কি তোমার হারিয়েছে বল ত?
আবার পাতলা ফুলের পাপড়ির মতো ঠোঁট দুটি যেন কেঁপে উঠলো থির থির করে। মনে হলো, ও যেন বললো, আমার বালা—
—তোমার বালা বুঝি হারিয়ে গিয়েছে?
ও, মনে হলো এবার যেন বললে, বালা চুড়ি হার—সব নিয়ে গিয়েছে!
—কে নিয়েছে বল ত?
মেয়েটি আর কোন কথা বললো না হঠাৎ ঘর থেকে ছুটে বের হয়ে গেল—। তারপরই শোনা গেল চাপা কান্নার শব্দ। কে যেন ফুলে ফুলে কাঁদছে। কাঁদছে আর কাঁদছে। সুপর্ণ উঠে পড়ে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের হয়ে আসে। এবং অমিত্রসূদন যেমন তাকে বলেছিল তেমনি প্রথম বারান্দায় দেখা গেল মেয়েটাকে, এক সময় তারপর ঝোপটার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
সারাটা রাত ধরে তারপর সেই কান্না।
সুপর্ণ কিন্তু গেল না। থেকেই গেল ওখানে। তারপর পর পর চার রাত একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। সুপর্ণকে যেন কি এক নেশায় পেয়েছে।
বেশ কিছুটা দূর দূর ব্যবধানে কয়েকটা বাড়ি। বাড়িগুলো সবই প্রায় খালি। যাদের বাড়ি তারা মধ্যে মধ্যে আসে, আবার কিছুদিন থেকে চলে যায়।
ক্রমে এদিকে শুক্ল পক্ষ শেষ হয়ে গেল। অন্ধকার রাত। অন্ধকার রাত্রে কিন্তু কেউ এলো না।
সুপর্ণ ঠিক করে, আবার চাঁদনী রাত না আসা পর্যন্ত ও ওখানেই থাকবে।
সেদিন এক বৃদ্ধ চেঞ্জারের সঙ্গে হঠাৎ আলাপ হয়ে গেল সুপর্ণর। খান তিনেক বাড়ির পরে যে বাড়িটা তারই মালিক তিনি। দিন কয়েক হলো এসেছেন ক'টা দিন ওখানে কাটাতে। কথায় কথায় তিনি প্রশ্ন করলেন, আপনি কঙ্কালে থাকেন?
—হ্যাঁ। কেন বলুন ত?
—ও বাড়িটা সম্পর্কে নানাজনে নানাকথা বলে।
—হ্যাঁ, শুনেচি। শুধু শোনা কেন দেখেছিও।
—দেখেছেন?
—হ্যাঁ।
—একটি ছোট মেয়েকে দেখেছেন বোধ হয়?
—হ্যাঁ। আগে বাড়িটার মালিক কে ছিল, জানেন?
—জানি।
—কে বলুন ত?
—হরিসাধন বসু। সে অনেক বছর—তা প্রায় বছর পনের হবে—আগের কথা। সেই সময় এক চাঁদনী রাত্রে একটা দুর্ঘটনা ঘটে।
—দুর্ঘটনা?
—হ্যাঁ। তার ছেলে, ছেলের বৌ ও তাদের আট-নয় বছরের একটি মেয়েকে নিয়ে আসেন ক'টা দিন চেঞ্জ কাটাবার জন্যে।
—তারপর?
—একটা চাকর রেখেছিলেন। এখানকারই অর্থাৎ স্থানীয় লোক। সেই চাকরটার কাছেই একদিন মেয়েটিকে রেখে স্বামী, স্ত্রী দেওঘরে পূজা দিতে যান। ফিরতে তাদের রাত হয়। ফিরে এসে মেয়েটি বা সেই চাকর, কারোরই সন্ধান পাওয়া গেল না।
অনেক খোঁজাখুঁজি করা হলো, হৈ চৈ পড়ে গেল একটা, পুলিশ এলো, কিন্তু না মেয়েটির না চাকরটার সন্ধান পাওয়া গেল।
—তারপর?
—কাঁদতে কাঁদতে একদিন স্বামী-স্ত্রী ফিরে গেল। তারপর থেকে বাড়িটা খালিই পড়ে থাকে। কেউ কেউ ভাড়াটে এসেছিল, কিন্তু এক রাত্রির বেশী ঐ বাড়িতে থাকতে পারেনি—চলে গিয়েছে। শেষটায় বাড়িটা পোড়োবাড়ি হয়ে গেল। অনেক বছর পরে অমিত্রসূদনবাবু বাড়িটা কিনে নতুন করে তৈরী করলেন, কিন্তু তাঁরাও আজ পর্যন্ত কেউ একটা রাত এখানে এসে কাটাননি।
—আচ্ছা, মেয়েটির গায়ে গহনা ছিল না?
—হ্যাঁ। বড়লোকের নাতনী, হার-চুড়ি-বালা সব ছিল। আর পুলিশের ধারণা—সেই গহনার লোভেই সেই চাকরটা হয়ত মেয়েটাকে খুন করে গহনা নিয়ে পালিয়েছিল।
—খুন করে?
—তাই। কারণ অমিত্রসূদনবাবু যখন ঐ বাড়ি মেরামত করেন, সেই সময় একটা গাছের নীচে একটা কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছিল।
আবার চাঁদনী রাত এলো। ফুটফুটে জ্যোৎস্না চারিদিকে। সুপর্ণ অপেক্ষা করছিল।
সে এলো ঠিক রাত এগারটায়। তারপর মিলিয়েও গেল। শুরু হলো তারপর সেই কান্না।
সুপর্ণ আজ কান পেতে শোনে। কান্নাটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে এবং বাড়ির মধ্যেই বা আশে-পাশে কোথায়ও কাঁদছে কেউ। কোথায় কাঁদে কে?
ঘুরতে ঘুরতে এক সময় সুপর্ণ মালীর ঘরের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। মনে হলো যেন মালীর ঘরের ভিতর থেকেই কান্নার শব্দটা আসছে। ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল সুপর্ণ। এবং ঢুকেই থমকে দাঁড়াল। ঘরের মধ্যে একটা হ্যারিকেন বাতি জ্বলছে, আর মালীটাই মেঝেতে গড়াগড়ি করে কাঁদছে আর থেকে থেকে দুহাতে নিজের গলাটা টিপে ধরছে প্রাণপণ শক্তিতে।
—মালী! এই মালী!
হঠাৎ মালী কান্না সামলে,—কে?
—অমন করে কাঁদছিস কেন?
—প্রাশ্চিত্তির, বাবুজী, আমার পাপের প্রাশ্চিত্তির!
—পাপের প্রায়শ্চিত্ত?
—হ্যাঁ বাবুজী!
বলে মালী এবারে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো। চকিতে একটা সন্দেহ যেন মনের মধ্যে বিদ্যুতের মত ঝিলিক দিয়ে ওঠে সুপর্ণর, সে বলে, তবে কি তুইই?
—হ্যাঁ, বাবুজী! সেদিন দুটো গহনার লোভে আমিই দিদিমণিকে গলা টিপে—
মালী!—অর্ধস্ফুট একটা চিৎকার সুপর্ণর গলা থেকে বের হয়ে এলো।
—হ্যাঁ বাবুজী, দিদিমণি গহনাগুলো এমনিই দিয়ে দিয়েছিল মেরে ফেলবো ভয় দেখাতে। কেবল হাতের দুটো বালা দিতে চায়নি কিছুতেই। তখনি তার গলা টিপে ধরি আমি। কিন্তু বালা দুটো শেষ পর্যন্ত আমি নিই নি। বালা হাতেই ছিল তার, যখন গাছের নীচে তাকে পুঁতে রাখি।
সুপর্ণ কি বলবে বুঝতে পারে না। এক সময় মালীর ঘর থেকে বের হয়ে আসে। মালীটা তখনো কাঁদছে।
প্রতি চাঁদনী রাতে যেমন সারাটা রাত ধরে কান্না শোনা যেত, সে রাত্রেও তেমনি শোনা গেল। সুপর্ণ বসে থাকে ঘরের মধ্যে চেয়ারটার উপর। এক সময় রাত পোহাল। সুপর্ণ তখন স্থির করেছে পুলিশে সব সংবাদ সে দেবে। উঠে পড়ে সে। গায়ে জামাটা দেয়।
গেটের পাশেই মালীর ঘর। গেট দিয়ে বেরুতে গিয়ে কি ভেবে মালীর ঘরের খোলা দরজা-পথে ভিতরে উঁকি দিতেই সুপর্ণ থমকে দাঁড়াল।
ঘরের কড়ির সঙ্গে মালীর দেহটা ঝুলছে। গলায় দড়ি দিয়েছে সে কখন যেন।
পুলিশ এলো সংবাদ পেয়ে। সুপর্ণের কাছ থেকে সব শুনে রিপোর্ট লিখে নিয়ে মৃতদেহ চালান দিয়ে অফিসার সন্ধ্যা নাগাদ চলে গেলেন। সেদিন আর যাওয়া হলো না সুপর্ণর। যাবার ইচ্ছাও অবিশ্যি তার ছিল না। রাত নামলো। চাঁদের আলোর বন্যা আগের রাত্রির মতই। সুপর্ণ অপেক্ষা করে বসে থাকে।
ক্রমে এগারটা বাজল, সাড়ে এগারটা—বারটা—রাত এক সময় শেষ হয়ে গেল। কিন্তু সে মেয়েটি এলো না।
তারপরের রাত, তারপরের রাতেও না।
মেয়েটি আর এলো না।
দিন তিনেক পরে সুপর্ণ ফিরে এলো।
—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন