দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

শিবরাম চক্রবর্তী
‘এমন হন্যে হয়ে কোথায় ছুটেচ গোবরা ভায়া? কিসের জন্যে?'
শ্রীমান গোবর্ধন চন্দরকে হন্তদন্ত দেখে দাঁড় করিয়ে আমি তদন্ত করি।
'রাম ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি।' সে সংক্ষেপে জানায়। আর, খবরটা দিয়েই না পরের ক্ষেপে পা বাড়ায়।
'কেন, ডাক্তারের কাছে কেন হে? কার ব্যারাম হোলো আবার?'
'দাদার। ঘোড়ারোগে ধরেছে দাদাকে।'
'ঘোড়ারোগে? ও, বুঝেছি, আজ শনিবার যে!' বলে আমি সমঝদারের ন্যায় ঘাড় নাড়ি— 'কিন্তু এই মাঠের রোগ কি সারাতে পারবে ডাক্তার? ডাক্তার কি করবে তার?'
'মাঠের রোগ?'
'রোগও বলতে পারো, রোখও বলা যায়। তবে এ রোগ যার চাপে তাকে আর রোখা যায় না ভাই—সারানো দূরে থাক। এটা একটা যজ্ঞবিশেষ। তা, তোমার দাদা যখন একজন যোগ্য ব্যক্তি...'
'যোগ্য ব্যক্তি আমার দাদা? এই রোগ হবার যোগ্য বলছেন আমার দাদাকে?'
'নয় কেন? অনেক টাকা থাকলেই তো এই রোগে ধরে থাকে। যার ওড়াবার মত অঢেল টাকা আছে, সেই এই রোগ ভোগের যোগ্য। আর, যার তেমন টাকা নেই সেও এতে ভোগে বটে, সেটাও ঐ টাকার লোভেই —সে লোকটা হচ্ছে এই রোগের ভোগ্য। এই রোগে ভুগেই সে কাবার হয়—বুঝেচ?'
'আপনার হেঁয়ালী ঠিক ধরতে পারছি না, মশাই।'
'আরে, অশ্বমেধ যজ্ঞের কথা জানো না? সেটা ছিল সেই ত্রেতায়, দ্বাপরে। আর এটা হচ্ছে কলিযুগের অশ্বমেধ। শনিবার-শনিবার রেসের মাঠে হয়ে থাকে, যারা সেখানে গিয়ে ঘোড়ার পিছনে ছোটে, তারা বাজি হেরে শেষে সেই মাঠেই শুয়ে পড়ে। ঘোড়াই শুইয়ে দিয়ে যায় তাদের। অশ্বমেধ থেকে যজ্ঞটা তখন রাজসূয় হয়ে দাঁড়ায়। রাজার মতন শুয়ে থাকো তখন মাঠের ঘাসে। আর ঘাস খাও এনতার।'
'আরে দূর মশাই। সে ঘোড়ারোগ ধরেনি দাদাকে। দাদার এ রোগটা আজকের নয়। সেবার সেই দার্জিলিংয়ে বেড়াতে গেছলাম না আমরা? তখন থেকেই দাদার এই ঘোড়ারোগ।'
'দার্জিলিংয়ে গেছলে—তখনকার ব্যারাম? ঠিক বুঝতে পারছি না ভাই। তোমার কথাটাই আমার হেঁয়ালী বলে বোধ হচ্ছে।'
'দার্জিলিং গিয়ে ঘোড়া ঘোড়া করে ক্ষেপে গেলেন না আমার দাদা? সেখানে গেলে নাকি ঘোড়ায় চাপতে হয়। ঘোড়ায় চাপা, ঘোড়ায় চেপে বেড়ানো সেখানকার একটা রেওয়াজ নাকি....এক রকমের বিলাসিতাই!'
'জানি জানি। তা শুধু সেখানকার কেন, সব জায়গারই। ঘোড়া দেখলে খোঁড়া হয়—সব জায়গায় সবাই।' আমি জানাই।
'দাদাও হলেন, কিনে ফেললেন দু-দুটো ঘোড়া। একটা নিজের জন্য আর একটা আমার জন্য। দাদার এই ঘোড়া রোগের গোড়াটা হচ্ছে সেইখানেই। সেই দার্জিলিংয়েই শুরু।'
'বটে? বটে? দার্জিলিংয়ের আমদানি এই অশ্বরোগ?' কৌতূহলী হই : 'শুনি তো আগাগোড়া?'
গোবর্ধন গোড়ার থেকে ঘোড়ার দিকে আগায় :
'সেই হলো গে গোড়ার গলদ! তারপর থেকেই দাদা ঘোড়ার যতো গলদ বার করতে লাগলেন। নিত্য নতুন খুঁৎ। আর রোজ রোজ খুঁৎ খুঁৎ।'
একদিন বললেন,—''ঘোড়া দুটো এক সাইজের হয়ে গেলরে—ভারী মুস্কিল হল ত!''
আমি বললাম, ''মুস্কিল কিসের দাদা? একসাইজের জন্যেই তো ঘোড়া কেনা। ঘোড়ায় চড়া বেশ ভালো একসাইজ, জানো না, দাদা?''
দাদা বললেন, ''আমি আর তা জানিনে! জানি। সে একসাইজের কথা আমি বলছিনে, যার মানে কিনা ব্যায়াম। বলছিলাম যে এক সাইজের —মানে একরকম চেহারার হয়ে গেল। লম্বায় চওড়ায়, আড়ে বহরে, পায়ে মাথায় অবিকল একরকম। আগাপাশতলা সমান— সেই কথাই বলছিলাম আমি।''
আমি তখন বললাম, ''তাতে হয়েছে কী, দাদা? ঘোড়া যখন, তখন একরকমই তো হবে।''
দাদা বললেন, ''আরে, সব কিছুরই তর তম থাকা দরকার, নইলে তারতম্য বুঝব কিসে? টের পাবো কি করে? যেমন, মহৎ মহত্তর মহত্তম, উচ্চ উচ্চতর, উচ্চতম...''
''যথা?'' আমি জিজ্ঞেস করলাম দাদাকে।
''যেমন ধর, তুই হলি উচ্চ—লম্বায় পাঁচফুট সাড়ে চার ইঞ্চি। ঘাড়েগর্দানে। আমি আবার তোর চেয়ে ঢ্যাঙ্গা—আমি হলাম উচ্চতর। আর ওই হিমালয় আমার চেয়েও আবার সমুচ্চ —একেবারে উচ্চতম।.... এই ঘোড়াদুটোর কোন তরতম নেই মোটেই। তোর ঘোড়ার থেকে কি করে আমার- টাকে যে আলাদা করা যাবে, তাই ভাবছি। যে-ঘোড়া তোর পলকা শরীর বইবে, বয়ে বয়ে হালকা বইবার হ্যাবিট হয়ে যাবে তার, আমি যদি ভুল করে তার পিঠে চেপে বসি কখনো তো অনভ্যাসের দরুন সে হয়ত শুয়েই পড়বে তক্ষুনি—তারপর হয়ত আর নাও উঠতে পারে। আমার ভার বইতে গিয়ে ইহলীলা সাঙ্গ করে ভব পারাবার পার হয়ে যাবে বেচারা।''
''তাহলে তো ভারী ভাবনার কথা।'' শুনে আমি ভাবিত না হয়ে পারিনা।—যেমন ঘোড়ার জন্য, তেমনি নিজের জন্যেও বটে। দাদা চাপলে মারা যদি নাও যায় বেচারা, খোঁড়া হয়ে যাবে নির্ঘাৎ। আর, খোঁড়া পা খালি খানায় পড়ে কে না জানে? আর পড়লে যে সে খালি নিজেই পড়বে তা নয়, আমাকে নিয়েই পড়বে। আমার কী গতি হবে তখন? আমি একটা উপায় বার করলাম শেষটায়, বললাম, ''দাঁড়াও, দাদা, আমার ঘোড়ার লেজটা ছেঁটে দিই, তাহলে তো তুমি টের পাবে, চিনতে পারবে সহজেই।'' বলে আমি কাঁচি এনে আমার ঘোড়ার লেজটা কচ করে কেটে দিলাম। বললাম, ''তুমি তর-তম চাইছিলে, দাদা কেমন এইবার তার উত্তর পেলে তো?''
দাদা বললেন, ''তুই যেমন উত্তর দিয়েছিস, আমার ঘোড়াটাকে তেমনি উত্তম করি তাহলে।'' বলে নিজের ঘোড়ার লেজটা বেশ করে না পাকিয়ে কষে একটা গিঁট বেঁধে দিলেন তিনি। আর বললেন, ''তোর লেজটা তুই যেমন কাঁচিয়ে দিলি, আমারটা তেমনি পাকিয়ে দিলাম।''
তারপর হলো কি একদিন, দুজনে ঘোড়ায় চেপে হাওয়া খাচ্ছিলাম, একটা কাঁটা তারের বেড়ায় লেগে দাদার ঘোড়ার লেজের আধখান ছিঁড়ে হাওয়া হয়ে গেল। দেখে তো দাদা কেঁদে ফেললেন প্রায়—''দ্যাখ, কী হলো আমার লেজের দশা! আমাদের দুজনকার লেজ এখন একাকার হয়ে গেল। আলাদা করে চিনবার আর জো রইল না কোনো।''
আমি বললাম—''দাঁড়াও, আমার ঘোড়ার ঘাড়ের কেশরগুলো ছেঁটে দিচ্ছি তাহলে।''
ঘোড়ার ল্যাজা মুড়ো দুদিক মুড়িয়ে দিয়ে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করলাম দাদাকে।'
গোবরার দাদৃবাৎসল্যের আমি মনে মনে প্রশংসা না করে পারি না—'তারপর?'
'তারপর আর একদিন আরেক দুর্ঘটনা। পাশাপাশি দুভাই চলেছি ঘোড়ায় চেপে। দাদা আরাম করে ভূটানী চুরুট ফুঁকতে ফুঁকতে যাচ্ছেন—দাদার আনকোরা এক ব্যায়রাম—সেখানকারই আমদানি ব্যায়রামটা —আমি নাক সিঁটকে বললাম, ''ইস, তোমার এই চুরুটটা কী কড়া গো দাদা, ভারী বিচ্ছিরি গন্ধ বেরিয়েছে!''

ঘোড়াটা অমনি দাদার কথায় কান
না দিয়ে এমন ছুট লাগালো যে...
দাদা বললেন, ''হুঁ, গন্ধটা আমিও পাচ্ছি তখন থেকে। কড়ায় গণ্ডায় দাম নিয়েছে বলেই কি এত কড়া চুরুট দিতে হয়। এমন কোনো কড়ার তো ছিল না আমার।'' বলে নাক খাড়া করতে গিয়ে তাঁর নজর পড়ল নিজের ঘোড়ার ঘাড়ের ওপর—''ওমা! চুরুটের আগুনের ফুলকি লেগে ঘোড়াটার ঘাড়ের কেশরগুলো পুড়ে শেষ হয়ে গেল যে! গর্দান প্রায় ফাঁক!''
''যাক, দুজনেরই ঘাড় ফাঁকা হয়ে, একাকার হয়ে গেল দুটো ঘোড়াই।'' আমি বললাম একটু ভাবিত হয়েই বলতে কি! —''এখন তোমার চাপ থেকে আমার ঘোড়াটাকে বাঁচাই কি করে ভাবছি তাই।''
বেশ ভাবনায় পড়লেন দাদাও। নিজের চাপল্যের কথা ভেবেই বোধ হয়।
''কি করব তাহলে? আমার ঘোড়াটার কান কেটে দেব নাকি?'' বলে যেই না দাদা ঘোড়ার কানে কাঁচি বসাতে গেছেন, ঘোড়াটা অমনি দাদার কথায় কান না দিয়ে এমন ছুট লাগালো যে, তার দেখাদেখি আমার ঘোড়াটাও তার পিছু পিছু দৌড় মারলো তৎক্ষণাৎ।
তারপর আর ওদের কারোই পাত্তা পেলাম না আমরা। দুজনে মিলে গেলাম তখন সেই ঘোড়াওয়ালার কাছে যে আমাদের বেচেছিল ঘোড়াগুলো। গিয়ে দেখি কি, যে দুটো ঘোড়াই গিয়ে হাজির হয়েছে সেখানে আগের থেকে।
আমাদের কথা শুনে ঘোড়াওয়ালা বললে, ''এ আর এমন কি সমস্যা বাবু? ঘোড়া দুটোকে আলাদা করে চিনতে চান, এই তো?''
আমরা বললাম, ''হ্যাঁ, তাই।''
সে বললে—''এতো একনজরেই চেনা যায়। ঘোড়াদুটোর ফারাক দেখতে পাচ্ছেন না আপনারা? একটা ঘোড়া সাদা রঙের আর আর আরেকটা মেটে রঙের—দেখছেন না? এই সাদামাটা কথাটা মনে থাকলেই তো হোলো। তা আর মনে থাকছে না আপনাদের?''
তখন আমরা ধরতে পারলাম।' বলে হাঁপ ছাড়ল গোবর্ধন।
'তা তো ধরলে।' আমি বললাম— 'কিন্তু এর থেকে ঘোড়ার ব্যায়রামের কিছুই ত আমি ধরতে পারছি না।'
'ব্যায়রামটা ধরল তারপরই। ফেরবার সময় ঘোড়া দুটোকে আমরা সঙ্গে করে আনলাম ত। এই কলকাতায় আসার পর থেকেই শুরু হোলো দাদারটার যতো ব্যায়রাম। আজ সর্দি, কাল কাশি, পরশু পেটের অসুখ লেগেই আছে। দিনরাত হ্যাঁচোর হ্যাঁচোর ফ্যাচোর ফ্যাচোর। আর ঘোড়ার একেকটা হাঁচি! বববা:! আমাদের একশটা হাঁচির সমান। ঘরদোর কাঁপিয়ে দেয়। রাত্তিরে ঘুম ভেঙ্গে যায় আমাদের ওর হাঁচির আওয়াজে।'
'বলো কি হে?'
'হ্যাঁ দাদা। দার্জিলিঙে গিয়ে যেরকমটা আমাদেরও গোড়ায়... আমাদের ঠাণ্ডা লেগে হয়েছিল, আর ওদের হয়ত ঠাণ্ডার দেশ থেকে গরমে এসে পড়ায় তাই হয়েছে।'
'তোমার ঘোড়াটারও তাই হয়েছে নাকি?'
'না, আমার ঘোড়ার ততটা নয়। হবার শুরুতেই ওর কানের গোড়ায় গিয়ে বলে দিলাম, ''শোনো বাপু, দিনরাত এমন ফ্যাচর ফ্যাচর আমার ভালো লাগে না। এরকম করলে তোমাকে ত্যাজ্যপুত্র করে ভাগিয়ে দেব বাড়ি থেকে।'' শুনেই না সমঝে নিয়ে শুধরে গিয়েছে ঘোড়াটা। কিন্তু দাদার ঘোড়া একটু আদুরে তো, দাদার আদর পেয়ে পেয়ে বখে গিয়ে এখন উচ্ছন্নে যাবার পথে। দাদাকেও তার সঙ্গে নিয়ে চলেছে এখন।'
'এতো হোলো গে ঘোড়ার ব্যারাম। এর সঙ্গে তোমার দাদার কি? তোমার দাদার হল ঘোড়া-রোগ, মানে, ঘোড়াটাই রোগ আর এ হোলো গিয়ে ঘোড়ার রোগ। একটা মনের, একটা দেহের —আলাদা জিনিস। দুজনের রোগের মিলটা কোনখানে?
'লক্ষণে মিলছে।' ব্যক্ত করে গোবরা, 'ঘোড়াটা যেমন হাঁচছে, কাশছে, ফ্যাচর ফ্যাচর করছে, তেমনি দাদাও করছেন কাল থেকে। ঘোড়াটার মতই কেঁপে কেঁপে উঠছেন মাঝে মাঝে...'
'কামড়ে দেয়নি ত ঘোড়াটা? তাহলে ঘোড়ার ব্যায়রাম তোমার দাদায় সংক্রামিত হতে পারে বটে। কিন্তু তাহলেও এটা হাইড্রোফোবিয়া নয়, যদ্দুর মনে হয়।'
'হাইড্রোফোবিয়া?' শুনে হতবাক হয় গোবর্ধন। 'সে আবার কি?'
'সেটা ঠিক অশ্ব রোগ নয়, শ্বরোগ বলতে পারো বরং। কুকুরদের হয়। হলে পরে তারা জল খায় না, জল দেখলে ভয় খায়। আর সেই কুকুর মানুষকে কামড়ালে তারও ফের সেই রোগ হয়ে থাকে, উপরন্তু সেও কুকুরের মতই ঘেউ ঘেউ করে আবার। তবে বেশিদিন করে না, তারপরই মারা পড়ে যায় কিনা।'
'কি সর্বনাশ!' শুনেই গোবরা আঁতকে ওঠে।
'ঘোড়ায় কামড়ালে হাইড্রোফোবিয়া ঠিক না হলেও সেই ধরনের কিছু একটা হতে পারে বা, তোমার দাদা কি ঘোড়ার মত ডাক ছাড়ছেন? চিঁহি চিঁহি করছেন নাকি?'
'এখনো করেনি। তবে করবে হয়ত।'
'ঘাস রেখে দেখো তো তোমার দাদার সামনে। ঘাস খায় কি না দেখো তো। যদি ঘাস না খায়, খেতে না চায়, ঘাসে যদি তাঁর অরুচি দেখা যায়, তাহলে একটু ভয়ের কথাই বই কি।'
শুনে গোবরা আর দাঁড়ায় না। 'রাম ডাক্তারকে কল দিতে যাচ্ছি তাই।' ছুটতে ছুটতে বলে। আর বলতে বলতে ছোটে।
একটু বাদেই হর্ষবর্ধন এসে পড়েন, হাঁচতে হাঁচতে কাশতে কাশতে আর কম্পিত কলেবরে,—ঠিক যেমনটি জানিয়েছিল গোবরা।
'গোবরার ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে আমি নিজেই চলেছি রাম ডাক্তারের কাছে। কল দিতে যাচ্ছি তাকে।' বিকল হয়ে তিনি জানান।
'চলুন, আমিও যাই আপনার সঙ্গে।'
ডাক্তারের সামনে হাজির হয়েই হর্ষবর্ধন বেআক্তার হয়ে পড়লেন। হাঁচতে লাগলেন এক নাগাড়ে।
হ্যাঁচচো...হ্যাঁচচো...হ্যাঁচচো...
'দাঁড়ান দাঁড়ান, হচ্ছে কি এ! হাঁচছেন কেন এমন করে?' রাম ডাক্তার জানতে চান।
'আমি...আমি কি... হ্যাঁচচো...ইচ্ছে করে...হ্যাঁ....হ্যাঁ...হ্যাঁচচো হ্যাঁচছো... ইচ্ছে করে হাঁচছি নাকি?'
হাঁচতে হাঁচতে তিনি বললেন। বলতে বলতে হাঁচতে লাগলেন। আর কাঁপতে লাগলেন সেই সঙ্গে।
দাদাকে কম্পান্বিত দেখে গোবর্ধন, সেখানে সে খাড়া ছিল আগের থেকেই, ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল।
বসে বসে হাঁচতে থাকলেন দাদা!
'কী সর্বনাশ! আপনার হাঁচির চোটে আমার টেবিলের কাগজপত্র সব উড়ে গেল! কী বিদঘুটে হাঁচি মশাই আপনার। এতকাল ধরে ডাক্তারি করছি। কিন্তু এমন সর্বনেশে হাঁচি আমি কখনো দেখিনি। মানুষে এমন হাঁচতে পারে? অ্যাঁ?'
'ঘোড়ায় পারে ডাক্তারবাবু।' দাদার হয়ে জবাব দিল ভাইটি, 'ঘোড়ার হাঁচি হাঁচছে যে দাদা।'
'ঘোড়ার হাঁচি না হলেও ঘোরতর হাঁচি যে তার ভুল নেই।' বলেন রাম ডাক্তার : 'এই হাঁচিটা হয়েছে কবের থেকে?
হর্ষবর্ধন জবাব দিতে যান কিন্তু পেরে ওঠেন না, উলটে আরো বিস্তর হাঁচি পেড়ে বসেন।
'কাল থেকে হয়েছে, আর সেই ঘোড়ার থেকেই।' জানিয়ে দেয় গোবরাই।—'ঘোড়ারোগে ধরেছে আমার দাদাকে। মানে, সেই ঘোড়াটার ব্যায়রামে, বুঝলেন ডাক্তারবাবু?'
'ঘোড়ার ব্যায়রামে? কেন, ঘোড়াকে তো আমি কালকেই ওষুধ দিয়েছি, সেই ওষুধ কি তাকে খাওয়ানো হয়নি তাহলে?'
'খাইয়েছিলাম তো...হ্যাঁচছো...খাওয়াতে গেছলাম...কিন্তু হ্যাঁচছো... ঘোড়াকে ওষুধ খাওয়ানো কি সোজাকথা মশাই...হ্যাঁচছো...হ্যাঁচছো...তাকে খাওয়াবো কি...হ্যাঁচছো... তাকে খাওয়াতে গিয়ে না আমাকেই... হ্যাঁচছো... গিলে বসতে হয়েছে সেই ওষুধ! হ্যাঁচছো।'
'অ্যাঁ? কী সর্বনাশ। ঘোড়ার ওষুধ আপনি খেয়ে বসে আছেন। তাহলে তো ঠিকই হয়েছে। ঘোড়ার ওষুধ খেলে যে ঘোড়ার রোগে ধরবে সে বেশি কী! যে ওষুধে ঘোড়া সারে, মানুষকে তা একেবারে সেরে দেয়। কিন্তু কেন? ঘোড়াকে না খাইয়ে আপনি নিজে খেতে গেলেন কেন?' বিস্মিত হয়ে তিনি শুধোন।

'অ্যাঁ? কী সর্বনাশ! ঘোড়ার ওষুধ আপনি খেয়ে বসে আছেন!...
'আমি কি ইচ্ছে করে....হ্যাঁচছো...ইচ্ছে করে খেয়েছি নাকি?' ততক্ষণে অনেকটা সামলে উঠেছেন হর্ষবর্ধন : 'ঘোড়াকেই তো খাওয়াতে গেছলাম, কিন্তু ঘোড়া কি খেতে চায় নাকি? তাকে ওষুধ খাওয়ানো কি সোজা মশাই? হাঁ করতেই চায় না ঘোড়া।'
'আহা! হাঁ করাতে যাবেন কেন? আপনাকে একটা লম্বা কাঁচের নল দিলাম না? বললাম না যে, ওষুধের পাউডারটা সেই নলের ভেতর ভরে ঘোড়ার নাকের মধ্যে গলিয়ে দেবেন, তারপর সেই নলটার অপর দিকে মুখ লাগিয়ে ফুঁ দিলেই সেই ওষুধ ঘোড়ার নাকের গর্ত দিয়ে গিয়ে গলা দিয়ে গলে, পেটের তলায় চলে যাবে ওষুধ, বললাম না?'
'বলেছিলেন ত! ওর নাকেও বসিয়েছিলাম নলটা সেইরকম....কিন্তু...হ্যাঁ...কিন্তু হ্যাঁচছো...' হাঁচতে হাঁচতে কাঁপতে কাঁপতে ব্যক্ত করেন হর্ষবর্ধন—'কিন্তু আমার ফুৎকারের আগে...হ্যাঁচচো...পাজি ঘোড়াটা আগেই ফুঁ দিয়ে বসল যে!'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন