বাবার চিঠি

দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বিমল মিত্র

এমন আশ্চর্য ঘটনা আমার জীবনে আর কখনও ঘটেনি। ঠিক আমার জীবনের ঘটনা নয় বটে, কিন্তু আমি এই ঘটনার একজন নীরব সাক্ষী ছিলাম।

আমি কার্তিকের কথা বলছি।

আমি আর কার্তিক ছিলাম স্কুলের অভিন্ন-হৃদয় বন্ধু। আমরা এক সঙ্গে এক ক্লাশে পড়তাম। পাশাপাশি বাড়ী ছিল আমাদের। স্কুলের বাইরেও আমরা একসঙ্গে গল্প করতাম, খেলতাম আর নিজের নিজের মনের কথা বলতাম।

আমাদের ক্লাশে আরো অনেক ছেলে পড়তো। তাদের সঙ্গেও মিশতাম আমরা। কিন্তু কার্তিকের সঙ্গেই আমার ঘনিষ্ঠতাটা ছিল বেশি।

নির্মল বসতো আমাদের ঠিক পাশের বেঞ্চিতে।

নির্মল সদানন্দ সঞ্জীব, ওরাও ছিল আমাদের বন্ধু।

কার্তিক বলতো—ওদের সঙ্গে মিশতে আমার ভাল লাগে না ভাই, ওরা আমাদের দেখতে পারে না—

তা এই ভাল-লাগার কি কোনও বিশেষ কারণ থাকে? কখন যে কাকে কার ভাল লেগে যায় তা কেউ বুঝিয়ে বলতে পারে না। ভাল-লাগার কোনও নিয়ম-কানুন নেই, ভাল-লাগার কোনও জাত-ধর্মও নেই।

এই রকমই ছিল আমাদের ভাল-লাগা। কার্তিক ছিল গরীব। আমাদের ছিল পাকা-বাড়ী, আর ওদের মাটির বাড়ী। বাড়ীতে মা ছিল না। থাকতো এক বুড়ি পিসিমা। আর বুড়ো বাবা।

কিন্তু হঠাৎ তার বাবা একদিন মারা গেল।

কার্তিক খুব কাঁদলো। কার্তিকের পিসিমাও কাঁদলো খুব। কার্তিকের দু:খে আমিও খুব কাঁদলাম।

কিন্তু সব জিনিসেরই তো একটা শেষ আছে। সুখও যেমন চিরকালের নয়, দু:খও তো তেমনি চিরকালের নয়। সুখ-দু:খ সবই ক্ষণস্থায়ী। অশৌচের পর নমো-নমো করে শ্রাদ্ধ-শান্তি চুকে গেল। মাথা ন্যাড়া করে একমাস পরে স্কুলে এল কার্তিক।

আমি বললাম—কার্তিক দু:খু করিস নি, বাপ-মা কি কারো চিরকাল থাকে রে?

কার্তিক আমার কথা শুনে সেদিন খুব সান্ত্বনা পেয়েছিল মনে আছে।

বলেছিল—ভাই, মনে হচ্ছে আমি যেন একলা হয়ে গেলাম!

আমি বলেছিলাম—কিছু ভয় নেই তোর, আমি তো আছি—

ছোটবেলায় এ-সব ভালবাসার ঘটনা সকলের জীবনেই কম-বেশী ঘটেছে। ছোটবেলায় আমরা সবাই প্রায় একই রকম থাকি। বদলাই কেবল বড় হয়ে। যত গণ্ডগোল শুরু হয় বড় হবার পর।

তা সেই সময়ে একদিন একটা কাণ্ড ঘটলো।

একদিন বিকেল বেলা হঠাৎ দৌড়তে দৌড়তে কার্তিক আমাদের বাড়ীতে এসে হাজির। তখন সে একেবারে হাঁফাচ্ছে।

বললাম—কী রে, কী হলো তোর?

কার্তিক বললে—ভাই, বাবা আমাকে একটা চিঠি দিয়েছে—

কথাটা যেমন অস্বাভাবিক, তেমনি অবিশ্বাস্য।

বললাম—কী বলছিস তুই?

পকেট থেকে একটা খাম বার করে কার্তিক আমায় দেখালে। আমি চিঠিটা নিয়ে ওপর-নিচেয় ভাল করে উল্টে-পাল্টে দেখতে লাগলাম। ওপরে কার্তিকের নাম-ঠিকানা লেখা রয়েছে। চিঠিটা পোস্ট হয়েছে শ্যামবাজার থেকে।

চিঠিটা আগাগোড়া পড়লাম।

কার্তিকের বাবা লিখেছে—

পরম স্নেহাস্পদ,

বাবা কার্তিক

আমার এই পত্র পাঠ করিয়া তুমি হয়ত খুব অবাক হইয়া যাইবে। কিন্তু তোমাকে ছাড়িয়া এখানে আসা পর্যন্ত তোমার জন্য বড়ই মন কেমন করিতেছে। তুমি বোধ হয় আমার জন্য বড়ই কাতর হইয়াছ। আসিবার সময় তোমাকে কিছু বলিয়া আসিতে পারি নাই। আমি যাহা কিছু সামান্য রাখিয়া আসিয়াছি তাহাতে কষ্টে-সৃষ্টে তোমার লেখা-পড়া খাওয়া-দাওয়া চলিয়া যাইবে। সর্বদা সৎ পথে থাকিবে। যে সৎ পথে জীবনযাপন করে জীবনে তাহার কোনও কষ্ট হয় না। আমার জন্য কোনও দু:খ করিও না। আমি এখানে পরম সুখে আছি। এখানকার জল হাওয়া খুব ভাল। খাদ্যদ্রব্য সস্তা। ভাল চাল-আটা-ডাল-মাছ-মাংস তরিতরকারি পাওয়া যায়। এখানে কোন কিছুতেই ভেজাল নাই। বৃষ্টি হইলে এখানে রাস্তায় জল জমে না। বাসে-ট্রামে বসিয়া যাওয়ার জায়গা মেলে। চারিদিকে যেন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এখানে ঠগ-জুয়াচোর নাই। এখানে আসা অবধি আমার স্বাস্থ্য বেশ ভাল হইয়াছে। শুধু একটা বিষয়ে বড় অভাব বোধ করিতেছি। এখানে রসগোল্লা পাওয়া যায় না। আমার মাঝে-মাঝে রসগোল্লা খাইতে ইচ্ছা করে। যদি একটা কাজ করো তো ভাল হয়। যদি এক হাঁড়ি রসগোল্লা তুমি বুড়ো শিবের মন্দিরে রাখিয়া আসিতে পারো, তো আমি গিয়া খাইতে পারি। কেহ যেন জানিতে না পারে; দেখিবে।

আমার স্নেহ-আশীর্বাদ লইবে।

ইতি

আশীর্বাদক

তোমার বাবা

কার্তিক আমার দিকে কৌতূহলী দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে দেখছিল।

বললে—কী দেখলি?

বললাম—চিঠিটা তো শ্যামবাজারের পোষ্টাপিসের ছাপ রয়েছে। চিঠিটা তো শ্যামবাজারেই ফেলা হয়েছে।

কার্তিক বললে—বাবা বোধ হয় শ্যামবাজারের ডাকবাক্সেই চিঠিটা ফেলেছিল—

আমি বললাম—এখন তুই কী করবি? তোর বাবা এক হাঁড়ি রসগোল্লা চেয়েছে—

কার্তিক বললে—বাবা বরাবর রসগোল্লা খেতে খুব ভালবাসতো ভাই! এখন কী করি?

দুজনেই অনেকক্ষণ খুব মাথা ঘামালাম চিঠিটা নিয়ে। মারা যাবার পর সত্যিই কি কেউ চিঠি লিখতে পারে?

কার্তিক বললে—নির্মলদের একবার জিজ্ঞেস করব? নির্মলদের চিঠিটা একবার দেখাব?

বললাম—না, ওদের দেখাসনি। তোর বাবা কাউকে দেখাতেই তো বারণ করেছে।

—কিন্তু তোকে যে দেখালাম?

বললাম—আমাকে দেখালে ক্ষতি কী! তোর সঙ্গে তো আমার ভাব রে—

তা বটে। কার্তিক বুঝলো কথাটা।

বললে—সেই জন্যেই তো চিঠিটা পেয়েই তোর কাছে দৌড়ে এসেছি। পিসিমাকে পর্যন্ত এচিঠির কথা বলিনি।

—তোর বাবার হাতের লেখা ঠিক এই রকম?

কার্তিক বললে—প্রায় এই রকমই। তবে মারা যাবার পর স্বর্গে গিয়ে তো মানুষ একটু বদলে যায় তাই হাতের লেখাও একটু বদলে গিয়েছে। আমার ভাই কেমন মনে হচ্ছে এ বাবারই লেখা চিঠি!

বললাম—আমারও তাই মনে হচ্ছে। স্বর্গে গিয়েও তোর বাবা তোর কথা ভুলতে পারছে না।

কার্তিক বললে—ঠিক বলেছিস ভাই তুই। তুই যেন কাউকে এ-সব কথা বলিস নি।

জিজ্ঞেস করলাম—এখন কী করবি তুই?

কার্তিক বললে—আমি ভাবছি এক হাঁড়ি রসগোল্লা কিনে নিয়ে গিয়ে বুড়ো-শিবের মন্দিরের ভেতরে গিয়ে রেখে দিয়ে আসবো। তারপর যা হয় হোক—

আমাদের পাড়াটা যেখানে আদিগঙ্গার ধারে গিয়ে মিশেছে, বুড়ো-শিবের মন্দিরটা সেখানেই। মন্দির ভেঙে-চুরে ইঁটের স্তূপ হয়ে গেছে। তারই ভেতরে শিবের পাথরটা হয়ত আছে। অবশ্য শিব আছে কি নেই তা আমরা জানতাম না। কারণ কতকাল আগেকার মন্দির। সেখানে তখন কেউই যেত না। দিনের বেলা যদিও বা যাওয়া সম্ভব ছিল, রাত্রে ওদিকটা কেউই মাড়াতো না। বড় বড় অশথ আর বটগাছের শেকড়ে জায়গাটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল। ভেতরে ঢোকে কার সাধ্যি। শোনা যায় আমাদের জন্মের আগে ওখানে একজন সন্ন্যাসী থাকতো। সে-ই জায়গাটা পরিষ্কার করে রাখতো আর রোজ শিবের পূজো করতো। তারপর সেই সন্ন্যাসী মারা যাবার পর থেকে মন্দির দেখা-শোনা করবার আর কেউ ছিল না। আস্তে আস্তে জায়গাটা ভূতের আড্ডা হয়ে গিয়েছিল।

তা যা'হোক, শেষ পর্যন্ত রসগোল্লা দেওয়াই ঠিক হলো।

একদিন কার্তিক দোকান থেকে পাঁচ টাকার রসগোল্লা কিনে একটা হাঁড়িতে করে বুড়ো শিবের মন্দিরের দিকে গেল।

সঙ্গে আমিও আছি।

কার্তিক বললে—আমার কিন্তু খুব ভয় করছে ভাই—

আমি বললাম—ভয় কী তোর, আমি তো সঙ্গে রয়েছি—

তখনও সন্ধ্যে হয়নি। যখন দেখলাম আশে-পাশে কেউ কোথাও নেই, আমরা দু'জনে ঢুকলাম গিয়ে মন্দিরের ভেতরে। চারদিকে ভাঙা-চোরা ইঁট-কাঠ ছড়ানো রয়েছে। মোটা মোটা সব বটের ঝুরি ঝুলছে চারদিকে। আমরা অতিকষ্টে গিয়ে ভেতরে শিবমূর্তির কাছে গেলাম। তারপর বেদীটার ওপর কার্তিক রসগোল্লার হাঁড়িটা রাখলে। তারপর মাটির সরাটা মুখে ভাল করে চাপা দিয়ে বাইরে চলে এল।

বললে—চল, এবার ফিরে চল—

আমরা যেমন সকলের চোখের অগোচরে ভেতরে ঢুকেছিলাম, তেমনি সকলের চোখের অগোচরেই আবার বাইরে বেরিয়ে এলাম। কেউ আমাদের দেখতে পেলে না।

পরের দিন স্কুলে কার্তিক বললে—আজকে সন্ধ্যেবেলা বুড়োশিবের মন্দিরে একবার যাবি?

বললাম—কেন?

কার্তিক বললে—গিয়ে দেখে আসব বাবা রসগোল্লাগুলো খেয়েছে কি না—

আমি রাজি হলাম।

বিকেল বেলা আবার দু'জনে একসঙ্গে বেরোলাম। আবার সেই ভাঙা মন্দিরের মধ্যে ঢুকলাম দু'জনে। গিয়ে যা দেখলাম তাতে আমরা দু'জনেই হতবাক।

দেখি রসগোল্লার হাঁড়িটা ফাঁকা। কার্তিকের বাবা সবই নি:শেষ করে খেয়েছে। একটা রসগোল্লাও পড়ে নেই। শুধু খালি হাঁড়িটা পড়ে রয়েছে। আর চারদিকে রস খাবার জন্যে বড় বড় পিঁপড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আমরা নি:শব্দে আবার সেদিনকার মত বাইরে চলে এলাম।

...টর্চের আলোতে দেখলুম নির্মল সেখানে দাঁড়িয়ে...

কার্তিক বললে—বাবা যখন বেঁচে ছিল তখনও খুব রসগোল্লা খেতে ভালবাসতো ভাই। যাক, বাবা যে খুশী হয়েছে, তাইতেই ভাল লাগছে—

ক'দিন খুব আনন্দে কাটলো কার্তিকের। বাবা মারা যাওয়ার পর যেমন মন-মরা হয়ে গিয়েছিল, আর সে রকম নয় এখন।

কার্তিক বলতো—আমি যে বাবাকে রসগোল্লা খাওয়াতে পেরেছি এতেই আমি খুশী—

এর পরে কিছুদিন কেটে গেল। তারপর আবার একদিন বাবার চিঠি এল। ঠিক সেই আগেকার মতই। স্বর্গধামের খবর সব ভাল। বাবারও শরীর ভাল আছে। কোনও কষ্ট নেই। শেষে সেই এক অনুরোধ। রসগোল্লা। আর এক হাঁড়ি রসগোল্লা চাই।

কার্তিক বললে—ভাই, আমারই অন্যায়, আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল।

কার্তিক আবার এক হাঁড়ি রসগোল্লা কিনে নিয়ে গিয়ে রেখে এল। আবার আমি তার সঙ্গে গেলাম।

তার পরদিন আবার দু'জনে গিয়ে দেখে এলাম হাঁড়ি শূন্য। সব রসগোল্লা বাবা নি:শেষ করে খেয়ে গিয়েছে।

এমনি প্রত্যেকবার চিঠি আসে। আর প্রত্যেকবার কার্তিক রসগোল্লার হাঁড়ি নিয়ে গিয়ে রেখে আসে মন্দিরের ভেতরে।

এমনি করে বার দশেক রসগোল্লার হাঁড়ি দিয়ে আসা হলো।

শেষে একদিন চিঠি এল—এত কম-কম রসগোল্লা দাও কেন? আমার যে রসগোল্লা খাইতে কত ভাল লাগে তাহা কি তুমি জানো না? আমার জন্য এখন হইতে প্রতি সপ্তাহে এক হাঁড়ি করিয়া রসগোল্লা রাখিয়া দিবে।

কার্তিক চিঠিটা পড়ে আমাকে এনে দেখালো।

বললে—বাবা এত রসগোল্লা খেতে চাইছে কেন বলতো ভাই? বাবা তো জানে আমার অবস্থার কথা—

আমারও যেন কেমন সন্দেহ হলো একটু। প্রায় প্রতি মাসেই তো কার্তিক বাবাকে রসগোল্লা খাওয়াচ্ছে। কিন্তু তার বাবার তো জানা উচিত যে, রসগোল্লার দাম কত। এক হাঁড়ি রসগোল্লার দাম দশ টাকা। তাও পুরোপুরি হাঁড়ি ভর্তি হয় না। এখন যদি প্রতি সপ্তাহে একহাঁড়ি করে রসগোল্লা দিতে হয় তাহলে মাসে প্রায় চল্লিশ টাকা করে খরচ। এত খরচ কার্তিক কোত্থেকে করে? বাবার তো জানতে বাকি নেই ছেলের অবস্থা কেমন।

আমি বললাম—ভাই, আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে।

কার্তিক বললে—কী রকম?

বললাম—বাপ কখনও নিজের ছেলের ওপর এমন নিষ্ঠুর হতে পারে না। বাবা তো জানে তোর অবস্থার কথা। এ নিশ্চয়ই অন্য কেউ তোর সঙ্গে চালাকি করছে—

কার্তিকের তবু যেন কিছুতেই অবিশ্বাস হলো না।

বললে—তাই কখনও হয়?

বললাম—তুই দ্যাখ না একবার পরীক্ষা করে—

কার্তিক বললে—কী করে পরীক্ষা করবো?

বললাম—আমি একটা মতলব বার করেছি, তুই সেটা করে দ্যাখ—

—কী মতলব?

বললাম—এবার আর হাঁড়ির মধ্যে রসগোল্লা দিসনি। তার বদলে একটা জাঁতিকল পেতে রেখে দে—

—তারপর?

—তারপর যদি অন্য কেউ এর পেছনে থাকে তো সে হাঁড়ির সরাটা খুলে যেই ভেতরে হাত পুরে দেবে সঙ্গে সঙ্গে জাঁতিকলটা তার হাত কামড়ে ধরবে—

—তারপর?

—তারপর আমরা কাছাকাছি কোথাও লুকিয়ে থাকবো হাতে টর্চ নিয়ে। শব্দ শুনলেই দৌড়ে গিয়ে আসল লোককে ধরে ফেলবো।

কার্তিক বললে—কিন্তু ভাই যদি সত্যি-সত্যি বাবার হাতই আটকে যায়?

আমি বললাম—মরা মানুষের কি শরীর আছে আমাদের মত যে লাগবে?

তা অনেক বলা-কওয়ার পর শেষ পর্যন্ত কার্তিক রাজি হলো আমার প্রস্তাবে। সেইদিনই বাজারে গিয়ে একটা ভারি গোছের জাঁতিকল কিনে আনা হলো। তারপর একটা হাঁড়ির ভেতরে সেটাকে পেতে রাখা হলো। তারপর সরা দিয়ে মুখে ঢাকা দিয়ে রেখে আসা হলো মন্দিরের বেদীর ওপর। ঠিক যেমন অন্যদিন রেখে দেওয়া হতো।

তখন সন্ধ্যে হবো হবো।

হাঁড়িটা রেখে দিয়ে এসে অন্যদিনের মত আমরা আর বাড়ি চলে এলাম না। তার বদলে আমরা আদিগঙ্গার দিকে একটা ধানের আড়তের আড়ালে লুকিয়ে রইলাম। চারিদিকে কেবল জল-কাদা। ঘুরঘুট্টি অন্ধকার।

অনেকক্ষণ সেই ভাবেই রইলাম। কারো মুখেই কোনও কথা নেই।

কার্তিকের তখন মন ভেঙে গেছে।

একসময়ে বললে—কই রে, কিছু তো টের পাচ্ছি না ভাই—

বললাম—আর একটু দ্যাখ না—

কার্তিক বললে—আর কতক্ষণ দেখবো?

বললাম—চুপ কর, কেউ শুনতে পাবে।

এমনি করে কতক্ষণ যে কেটে গেল তার ঠিক নেই। আমরা নি:শ্বাস বন্ধ করে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। সময় যেন আর কাটতে চাইছে না।

হঠাৎ এক সময়ে চিৎকার উঠলো—ওরে বাবারে, মরে গেলুম রে বাবা—

চিৎকারটা শুনতেই আমরা টর্চ জ্বালিয়ে দৌড়ে গেলাম বুড়োশিবের মন্দিরের দিকে। তখনও চিৎকার চলেছে—মরে গেলুম রে বাবা, মরে গেলুম—

ইঁট-কাঠ লাফিয়ে আমরা যখন ভেতরে গেলুম, টর্চের আলোতে দেখলুম নির্মল সেখানে দাঁড়িয়ে ছটফট করছে। জাঁতিকলটা তার ডান হাতটা কামড়ে ধরেছে। আর তার আঙুল দিয়ে ঝরঝর করে রক্ত পড়ছে।

আমাদের দেখে নির্মল চিৎকার করে উঠল—ভাই জাঁতিকলটা খুলে দে, আর কখনও করব না, খুলে দে ভাই—

নির্মলকে দেখে আমরা সত্যিই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এমন করে যে সে কার্তিকের মত একজন গরীব ছেলেকে ঠকাবে এ আমরা কল্পনা করতেই পারিনি।

মনে আছে তখন থেকেই নির্মল আমাদের সঙ্গে একবারে কথা বলা ছেড়ে দিয়েছিল। ব্যাপারটা আমি ক্লাশের সব ছেলেদের কাছেই প্রকাশ করে দিয়েছিলাম। পরের বছর নির্মল আর আমাদের স্কুলে রইল না। ট্র্যানসফার-সার্টিফিকেট নিয়ে চলে গেল অন্য এক স্কুলে।

মজার ধাঁধার উত্তর

১। দুইভাবে মাপা যায় :

৮ কিলো পাত্রের দুধ ৫ কিলো পাত্রে ঢেলে দিল। আবার ৫ কিলো পাত্র থেকে ৩ কিলো পাত্রে ৩ কিলো দুধ ভর্তি করে রাখল। তাহলে ৮ কিলো পাত্রে ৩ কিলো, ৫ কিলো পাত্রে ২ কিলো আর ৩ কিলো পাত্রে ৩ কিলো দুধ থাকল। এবার ৩ কিলো পাত্রের দুধ ৮ কিলো পাত্রে ঢাললে ৮ কিলো পাত্রে ৬ কিলো দুধ পাওয়া গেল। ৫ কিলো পাত্র থেকে ২ কিলো দুধ ৩ কিলো পাত্রে সবটুকু ঢালল। তাহলে ৫ কিলো পাত্রে কিছুই রইল না। এবারে ৮ কিলো পাত্রের ৬ কিলো দুধ থেকে ৫ কিলো পাত্র ভর্তি করা হলে ৮ কিলো পাত্রে অবশিষ্ট ১ কিলো দুধ রইল। এখন ভর্তি ৫ কিলো পাত্র থেকে ১ কিলো দুধ ৩ কিলো পাত্রের ২ কিলো দুধের মধ্যে দিলে ঐ ৩ কিলো পাত্রে ৩ কিলো আর ৫ কিলো পাত্রে ৪ কিলো দুধ পাওয়া গেল।

আরেকভাবেও মাপা যায়। সেটা বলার ভার রইল আমাদের কিশোর-কিশোরী বন্ধুদের উপর। সবচেয়ে আগে যারা—আমাদের জানাতে পারবে, তাদের প্রথম চারজনের নাম আমরা 'কিশোর ভারতী'র পরবর্তী সংখ্যায় প্রকাশ করব। উপরন্তু, মাপার ওই দ্বিতীয় কৌশলটাও পরের সংখ্যায় জানিয়ে দেব।

২। ইঞ্জিনটা প্রথমে বাঁদিকে মেন লাইন বরাবর সোজা

গিয়ে বাঁকা লাইনে ব্যাক করে ঢুকে 'ক' বগির সঙ্গে লাগল। তারপর 'ক' বগিকে ওভারব্রীজের তলা দিয়ে ডানদিকে অর্থাৎ 'খ' বগির দিকে ঠেলে দিল। খালি ইঞ্জিনটা এবার যে পথে ঢুকেছিল সেই পথে ফিরে এসে মেন লাইন বরাবর ডানদিকে গিয়ে বাঁকা লাইনে ঢুকল, এবং প্রথমে 'খ' বগি ও তারপর 'ক' বগিকে একসঙ্গে লাগিয়ে নিয়ে, 'ক' বগিকে মেন লাইনে এনে রাখল। ইঞ্জিনটা তারপর শুধু 'খ' বগিকে নিয়ে আবার ডানদিকের বাঁকা লাইনে ঢুকে ওভারব্রীজের তলা দিয়ে 'খ' বগিকে ব্রীজের বাঁদিকে ঠেলে দিল। এবার সে মেন লাইনে রাখা 'ক' বগিকে নিয়ে 'ফ' জায়গায় রেখে এল। এবং সবশেষে মেন লাইন বরাবর বাঁদিকের বাঁকা লাইনে ঢুকে 'খ' বগিকে 'প' জায়গায় রেখে, নিজে এসে আবার মেন লাইনে দাঁড়াল।

৩। (ক) ব-য়-স, (খ) আয়নায় প্রতিচ্ছবি, (গ) আলপিনের

মাথা, (ঘ) লেখার কালি, (ঙ) Smiles—একটা ‘S’ থেকে অপর ‘S’-এর mile (মাইল) তফাত, (চ) তাস, (ছ) কন্যা।

সকল অধ্যায়
১.
মাটি
২.
ভুতের গল্প
৩.
হর্ষবর্ধনের অশ্বরোগ
৪.
সেই মেয়েটি
৫.
বিদ্যাসাগরের ছেলেবেলা
৬.
গোয়েন্দা
৭.
ইতিহাস ছাড়িয়ে
৮.
যমালয়ে জীবন্ত মানুষ
৯.
ডাকিনীর ডাক
১০.
শত্রুতা
১১.
রেলে
১২.
অতু
১৩.
এক যে ছিল বাঘিনী
১৪.
দাওয়াই
১৫.
বিশ্বের বিস্ময় হেলেন কেলার
১৬.
ফুলের বিবাহ
১৭.
মংলুফলায় সোনা
১৮.
একটি গল্প করার মত গ্রাম
১৯.
লালমণি পাখি
২০.
প্লাবন
২১.
ছাত্র-সঙ্গীত
২২.
জয়-পরাজয়
২৩.
এখন শিউলি-বেলা
২৪.
আশ্বিনে
২৫.
ছড়া
২৬.
পোড়ো কুঁড়ে
২৭.
মা (উপন্যাস)
২৮.
গোর্কির ছেলেবেলা
২৯.
সেয়ানে সেয়ানে
৩০.
সুড়ঙ্গের রহস্য
৩১.
এক ঝাঁক গল্প
৩২.
কঙ্কাল
৩৩.
নতুন করে জাগো মা
৩৪.
বেতাল-পঞ্চবিংশতি
৩৫.
ভবঘুরের চিঠি
৩৬.
নিলাম দামী চশমা
৩৭.
শরৎ এল
৩৮.
কৈশোর
৩৯.
আলোর ডাকে
৪০.
অগ্রদূত
৪১.
টাকার কথা
৪২.
সাহস চাই!
৪৩.
ভোজবাড়ীর ব্যাপার
৪৪.
আবাহনী
৪৫.
এবার পূজায়
৪৬.
বামুনের স্বর্গবাস
৪৭.
মজার ধাঁধা
৪৮.
আংটির পাথর
৪৯.
মনমঞ্জুষা
৫০.
নিখিল বঙ্গ গরু সম্মেলন
৫১.
মিকি ডাক আর দিসনে
৫২.
মেঘনাদবধ
৫৩.
চৌধুরী-বাগ
৫৪.
জাদু বিদ্যা
৫৫.
বাবার চিঠি
৫৬.
গানের কথা
৫৭.
আমার প্রথম শিকার আভিযান
৫৮.
বিশ্বক্রীয়া ওলিম্পিক
৫৯.
বাংলার বন্যা
৬০.
শরতে
৬১.
আনন্দ আশ্বিনে
৬২.
টোটকা কিছু
৬৩.
জলদি করুন দাদা
৬৪.
কিশোর বিজ্ঞানীর আসর
৬৫.
সঙ্গীতের মৃত্যু
৬৬.
ছত্রপতি
৬৭.
মেঘ ও বৃষ্টি
৬৮.
মধুপালের আবির্ভাব

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%