মিকি ডাক আর দিসনে

দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পলাশ মিত্র

ভোটাভুটিতে শেষ পর্যন্ত তিনটি নামই উঠেছিল। অর্থাৎ এ তিনটি নামই পৃথিবীর সবার সেরা।

ব্যাপারটা তাহলে খুলেই বলি :

বছর কয়েক আগে পৃথিবীর প্রায় সব দেশের সিনেমা বিশেষজ্ঞ আর সমালোচকেরা নিজেদের মধ্যেই ভোটাভুটির ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু ভোটটা কিসের? না, পৃথিবীর এমন কোন অভিনেতা বা অভিনেত্রী আছেন, যাঁর অভিনয় দেখতে পৃথিবীর সব দেশের ছেলেবুড়োরা ছুটে আসে নিজেদের জাতি ভাষা ধর্মের কথা ভুলে গিয়ে?

বোঝাই যাচ্ছে, এ ভোট বড় সোজা ব্যাপার নয়। কেননা ভোটাররা হচ্ছেন পৃথিবীর সেরা সিনেমা বিশেষজ্ঞ, যাঁরা কিনা পৃথিবীর সব চলচ্চিত্রের খবরই রাখেন। আর রাখেন, কে সবচেয়ে ভালো অভিনয় করছে। কার নাম-ডাক দেশের সীমা ছাড়িয়ে অন্য দেশের মানুষকেও আনন্দ দিচ্ছে।

কথায়-কথায় ভোটের ফলাফলটাই এতক্ষণ বলা হয় নি।

এই ভোটে, মানে এই জগৎজোড়া নির্বাচনে নাম উঠেছিল তিন-তিন জনের। তিন জনই অভিনেতা। অর্থাৎ এঁরাই হলেন পৃথিবীর সেরা অভিনেতা।

এঁদের মধ্যে একজন হলেন চার্লি চ্যাপলিন। কিন্তু অন্য দুজন কারা?

লরেল আর হার্ডি? না না, হলোই না। তাহলে?

শুনলে প্রথমে বিশ্বাসই হবে না যে, অন্য দুজন অভিনেতারা কেউই মানুষ নয়। মানুষ কি, এ-দুনিয়ার প্রাণী জগতেরই কেউ নয়।

ব্যাপারটা সত্যিই বিস্ময়ের। মানুষ নয়, আবার প্রাণী জগতেরও কেউ নয়—অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা! না, আর সময় নষ্ট করবো না। নাম দুটো বলেই ফেলি। শোনো তাহলে।

এঁদের একটির নাম হলো শ্রীমিকি মাউস। আর একটি শ্রীডোনাল্ড ডাক। হ্যাঁ, এঁরাই পৃথিবীর জনপ্রিয়তম অভিনেতা। এক আশ্চর্য যাদুকরের মনগড়া এবং হাতে তৈরী পটের কৌতুক অভিনেতা এঁরা। এঁরা মানুষ নয়, প্রাণীও নয়—এঁরা পটে আঁকা ছবি। কেবলই ছবি।

আগেই বলেছি, এক আশ্চর্য যাদুকরের তৈরী এঁরা। এই যাদুকরই মিকি, ডাক আর তাঁদের সাঙ্গোপাঙ্গোদের অবাক সব মজাদার কাণ্ডখারখানা সারা পৃথিবীর মানুষদের দেখিয়ে বিস্মিত ক'রে দিয়েছেন। যাদুকরের কল্পনা, তাঁর শিল্প-ভাবনা আর মানুষকে আনন্দ দেবার ইচ্ছাই এই অসাধারণ সৃষ্টির মূলে।

এই অসাধারণ শিল্প-প্রতিভাধর মানুষটির নাম ওয়াল্ট ডিসনে। ওয়াল্ট ডিসনেই তৈরী করলেন এই সব পটের অভিনেতা। আর এঁদের অভিনয়, এদের নাচ, এদের হাজারো অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা মানুষের অভিনয়কেও হার মানাল। তাই তো মিকি মাউস আর ডোনাল্ড ডাক হলো পৃথিবীর জনপ্রিয়তম অভিনেতা।

ঘটনাটা বড় কম নয়। আর কোনটাই বা কম? স্বয়ং ডিসনে সাহেবের জীবনটাই কি কম মজার? শুধু মজারই বা বলি কেমন করে, তাঁর জীবন যেমনি ঘটনায় ভরা, তেমনি আকর্ষণের। তিনি কী না করেছেন? একটা জীবন যেন এক দীর্ঘ নাটকের মতোই। এ-জীবনের গভীরে যত যাওয়া যায় ততই অবাক হতে হয়। আর পৃথিবীর সমস্ত মানুষের মতোই আমাদের মাথাও শ্রদ্ধায় নুয়ে আসে। আর মনের ভেতরে, হৃদয়ের ঘরে-ঘরে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয় তাঁরই নাম।

গল্পে পড়েছি, রাজকুমার পৃথিবী জয় করে ফিরেছে। হাজার হাজার লোক এসেছে তাকে অভিনন্দন জানাতে। হাতে তাদের মালা, কণ্ঠে জয়ধ্বনি। চোখে-মুখে আনন্দের ইশারা। ওয়াল্ট ডিসনেও সেরকমই রাজকুমার। সমস্ত বিশ্ব জয় করেছেন তিনি। সারা পৃথিবীর মধ্যে ক'জন তাঁর নাম শোনেনি, সেটা বিচার করতে গেলে দেখবে, নাম না-জানার দলে কেউই নেই। চলচ্চিত্র শিল্পের রাজকুমারকে সবাই চেনে।

কিন্তু এ রাজকুমারের জীবন আর পাঁচ জনের মতো নয়। কেন না, প্রথম মহাযুদ্ধের সময় অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার ছিলেন ডিসনে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, গাড়ি চালাতেন তিনি। তখন তাঁর বয়স ১৬।

ডিসেম্বরের পাঁচ তারিখে ১৯০১ সালে ডিসনে জন্মেছিলেন শিকাগো শহরে। তাঁর পোশাকী নাম হলো ওয়ালটার এলিয়াস ডিসনে। ভাইবোন মিলে এঁরা পাঁচ জন।

সংসারের অবস্থা এমন কিছু ভালো নয়। কিন্তু ছবি আঁকার প্রতিভা ছিল ডিসনের। কেন না, বয়স যখন তাঁর মাত্র সাত, তখনই এক ডাক্তারের বাড়ির ছবি এঁকে অনেককেই অবাক করে দিলেছিলেন তিনি। শুধু অবাক করেই স্থির থাকেন নি, কিছু টাকাও রোজগার হয়েছিল এই ছবিটা থেকে।

কিন্তু ওই যে আগেই বলেছি, ডিসনের জীবন নাটকের মতোই ঘটনার ঘনঘটায়-ভরা। এখানে একটানা সুখ নেই, নেই আনন্দ। আর পাঁচটা ছোট ছেলে যেমন ছোট বেলায় খায় দায়, ইস্কুলে যায়, গান গায় আর পাখির মতো আনন্দ করে—ডিসনের জীবনে তার নামগন্ধও নেই। পেটের জ্বালা মেটাবার জন্যে তাঁদের সংসার আজ এখানে কাল সেখানে। আজ মিসৌরিতে, তো কাল কানসাসে। যেভাবেই হোক খেয়েদেয়ে আগে বাঁচতে হবে তো। তাই অন্যসব ছোটদের মতো জীবনের সুরুতে যে আনন্দের ভোজ পাওয়া দরকার, ওয়াল্ট ডিসনের কপালে তা জোটে নি। কঠিন সংগ্রাম, তীব্র লড়াই। এ লড়াই পেটের জন্যে, এ লড়াই বাঁচবার জন্যে।

ভেবে অবাক হতে হয়, যে-ডিসনে বড় হয়ে কোটিপতি হয়েছিলেন, দু'হাত ভ'রে যিনি শুধু টাকা রোজগার করেছিলেন, কতো মানুষের অন্নের ব্যবস্থা করেছিলেন এবং সমস্ত পৃথিবী যাঁকে এক ডাকে চেনে—সেই ডিসনেকে, শিকাগোর সেই ওয়াল্ট ডিসনেকে দু'মুঠো ভাতের জন্যে ন'বছর—হ্যাঁ মাত্র ন'বছর বয়সে খবরের কাগজ বিক্রি করতে হয়েছিল!

এখানেই নাটক শেষ হলে বাঁচা যেত। কিন্তু তা হয়নি। বছর যত যেতে থাকে, ডিসনেও তত নানান কাজে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হন। তাই এবারে দেখা গেল, কানসাস আর শিকাগোর মধ্যে যে ট্রেনগুলো চলে, সেখানে ডিসনে মিছরি বিক্রী করছেন। ভবিষ্যতের বিশ্ববিখ্যাত স্রষ্টা ট্রেনের ঝিকঝিক গতির সঙ্গে সুর করে বলছেন, ভালো মিছরি আছে। নিয়ে যান।

ডিসনের কাছ থেকে ক'জন মিছরি নিয়েছিলেন, সে-হিসেব দিতে পারবো না। কিন্তু ট্রেনের গতির সেই সুর, সেই রেশ নিয়ে ঘরে ফিরেছিলেন ডিসনে। তাই হার মানেন নি তিনি। হাজার সমস্যা, হাজার পরাজয়, ব্যর্থতা আর গ্লানির মধ্যে ভেঙে পড়লেন না ওয়াল্ট ডিসনে। ভেতরে ভেতরে ছবি আঁকাও চলতে লাগলো। দিনে মিছরি বিক্রী রাতে ইস্কুলে পড়া এবং আকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে ছবি আঁকা শেখা চলতে লাগল সমান তালে।

এবারে বোধ হয় কালো মেঘের মধ্য দিয়ে সূর্যের মুখ দেখা গেল। ডিসনে একটা চাকরি পেলেন। না, কেরানির চাকরি নয়। ছবি আঁকার চাকরি। মানে একটা আপিসে সিনেমায় বিজ্ঞাপন হিসেবে দেখাবার জন্যে কার্টুন আঁকতে হবে তাঁকে। তবে কথাটা কি জানো, তখন কার্টুনের তেমন কদর ছিল না। আর যে সব কার্টুন বাজারে চলতো সেগুলো সবই প্রাণহীন। মনে হতো, শুধুই রঙে-আঁকা কতগুলো ছবি। অবশ্য এইসব কার্টুনগুলোর মধ্যে সামান্য প্রাণপ্রবাহের ছিটেফোঁটা যে না থাকতো তা নয়, কিন্তু সে সব এতোই খেলো এবং সাধারণ, যা দেখে কোনও আনন্দই উপভোগ করা যেত না।

ডিসনে ছিলেন প্রকৃতই শিল্পীমনের মানুষ। তিনি তাঁর অসামান্য প্রতিভা দিয়ে সহজেই বুঝতে পারলেন, এইসব কার্টুন যদি মানুষের মতোই হাঁটা-বসা খাওয়া-ঘুমোনো নাচা-কাঁদা করতে পারে অর্থাৎ কিনা এদের দিয়ে যদি সেরকম কিছু করানো যায়, তাহলে ব্যাপারটা দারুণ হয়।

ডিসনে ভাবতে থাকেন দিনরাত। নতুন কিছু না করলে তো আর চলছে না। একটা কার্টুনের ফিল্ম করলে কেমন হয়? কেন মন্দ কি?

তাই হলো। একটা গ্যারাজ ঘর ভাড়া করা হলো। এটাই হল তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারখানা। তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু এই গ্যারাজেই ঘটল এক অসাধারণ ঘটনা। এই ঘটনাই ডিসনেকে মিকি মাউস করবার প্রেরণা জোগাল। সামান্য ছোট্ট একটা ইঁদুরই এই ঘটনার মূলে।

ঘটনাটা মজারও বটে। সেই কথাই বলি।

ডিসনের সামনেই ইঁদুরটা গ্যারাজের ঘরে ঢুকে পাঁউরুটিটা খেতে লাগলো। একবার একটুখানি খায়, এদিক ওদিক পিটপিট করে তাকায়, আবার টুক করে পালিয়ে যায়। খানিকক্ষণ বাদে আবার আসে, আবার খায়, আবার পালায়। ডিসনে অবাক হয়ে দেখতে থাকেন এই মজার কাণ্ড। ভালোভাবে খাওয়া হয় নি কতদিন তাঁর। তবুও রাগ করে ইঁদুরটাকে মেরে তাড়িয়ে দিলেন না তিনি। আমরা হলে কি আমাদের পাঁউরুটিটা অমন আদর করে খাওয়াতুম ইঁদুরকে? তার ওপর যদি আমাদের পেটে খিদে থাকে? কিন্তু মহান শিল্পী এবং দরদী স্রষ্টা ডিসনে সাহেব হাসতে-হাসতেই দেখতে লাগলেন ইঁদুরের কাণ্ড। এই কাণ্ড দেখেই তাঁর মাথায় এলো প্ল্যাান। এলো মিকি মাউস।

এইসব ভাবনা মাথায় নিয়ে ডিসনে ১৯২৩ সালে এলেন হলিউডে। কপালে কী আছে সেটা এখানেই যাচাই করবেন তিনি।

এক বন্ধুর কাছ থেকে ধার করলেন এক ক্যামেরা। কতগুলো শিশুকে নিয়ে একটা ছোটো ফিল্মও তুললেন। তারপর ভাই রয়কে নিয়ে সুরু করলেন এক নতুন ফিল্ম কোম্পানি। তখন তাঁর বয়স বাইশ।

এখানে সাদা-কালোয় তুললেন কার্টুনের অনেকগুলো সিরিজ। এ ছবিগুলো কিন্তু সবই নির্বাক। এ সিরিজের নাম দিলেন 'অ্যালিস ইন কার্টুন ল্যান্ড।'

কিন্তু তবুও শান্তি পেলেন না তিনি। যা চাইছেন তা যেন পাচ্ছেন না। তবুও চুপচাপ বসে থাকার মানুষ নন তিনি। টাকা পয়সা জোগাড় করে নতুন উদ্যমে লেগে গেলেন কাজে। প্রথম দিককার গোটা দুই মিকি মাউস ফিল্ম তেমন একটা সাড়া না জাগাতে পারলেও ১৯২৮ সালে 'স্টিমবোট উইলে (While)’ ছবিটা যাকে বলে সোরগোল তুললো। সিনেমার বাঘা বাঘা কর্তারা একবারে যেন একটু নড়েচড়ে বসলেন। সকলের নজর এবারে ওয়াল্ট ডিসনের দিকে।

ওদিকে একটার পর একটা ফিল্ম তুলছেন ডিসনে সাহেব। প্রত্যেকটা ছবিই সফলতার চরমে। সিনেমার ভাষায় যাকে বলে হিট ছবি।

এবারে তুললেন রঙিন ছবি 'দি সিলি সিম্ভনি'। রঙে রঙে ভরিয়ে দিলেন। রঙের যে এতো বাহার থাকতে পারে তা কি আগে জানা ছিল? আর একটা দরকারী কথা কি জান, রঙের যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, রঙের দ্বারা আমাদের মনের নানা ভাবেরও যে প্রকাশ ঘটে, সে-কথাও আমরা যেন ডিসনের দৌলতেই নতুন করে জানলুম।

ব্যাপারটা উদাহরণ দিয়েই বলি। মনে করো, পল্টুর বড় মামা রেগে একেবারে ফায়ার। পল্টু তাঁর কলমটা ভেঙে দিয়েছে। ডিসনে করলেন কি, পল্টুর মামার রাগকে প্রকাশ করবার জন্যে মামার মুখটা লাল-রঙে দেখালেন। কেননা লাল হলো রাগের রঙ। এভাবে যে-ভাবের, মানে যে-মনোভাবের যেরকম রঙ, ডিসনে সেইরকম রঙ প্রয়োগ করে তাঁর ছবিকে আমাদের চোখের সামনে একেবারে জীবন্ত করে হাজির করলো। প্রকৃতির নানা রঙ নিয়ে তিনি যে ছবি করলেন, তার জুড়ি মেলা ভার। জীবজন্তুর গায়ের রঙ হুবহু তুলে ধরলেন। বাঘের সেই ডোরাকাটা দাগ কি ভোলবার!

'সিলি সিম্ভনি'র পর তুললেন 'স্নো হোয়াইট অ্যান্ড সেভেন ডোঅরফস'। এটিই হলো প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের অ্যানিমেটেড ফিল্ম। অ্যানিমেটেড ফিল্ম হলো, যে-ছবির কার্টুনগুলো মানুষের মতোই সজীব। অর্থাৎ তোমার মতো ছবির কার্টুনগুলো লাফাবে, ঘুড়ি ওড়াবে, বল খেলবে, ছোলা ভাজা খাবে, গান গাইবে। সোজা কথায়, পটের অভিনেতারা সকলেই মানুষের মতো আচরণ করবে। বুঝতেই পারছো, কার্টুনের এই সব কাণ্ডকারখানা দেখে সকলেই অবাক হলেন। মানে অবাক না হয়ে উপায় নেই। এসব ১৯৩৮ সালের কথা।

এ ছাড়া তিনি সৃষ্টি করলেন ডামবি (১৯৪১), ব্যামবি (১৯৪২), পিটার প্যান (১৯৫৭), সিন্ডারেলা, স্পিলিং বিউটি ও আরও অনেক অনেক ছবি।

শুধু কার্টুন ফিল্ম তুলেই থামলেন না তিনি। বন জঙ্গলের ওপর, অ্যাডভেনচারের ওপর, আর প্রকৃতির অন্যান্য বিষয় নিয়েও ছবি তুললেন তিনি। বনের বাঘ হাতি গণ্ডার হরিণ কাঠবেরালি—সবই যেন নতুন রূপে, নতুন সাজে হাজির হলো আমাদের সামনে। সবচেয়ে বড় কথা কি জান, বনের জন্তু জানোয়ারদেরও যে হাসি আছে, আনন্দ আছে, ব্যথা বেদনা সবই আছে—এ সব সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো ডিসনে সাহেবই সর্বপ্রথম আমাদের জানালেন। বনের নানা রঙের পাখিগুলো, নানা ধরনের জন্তুগুলো, সবাই যেন আমাদের কাছের হয়ে গেল। তাদের সুখ-দু:খ, আনন্দ-বেদনার সঙ্গে আমরাও যেন জড়িয়ে গেলাম।

তোমরা বোধ হয় ডিসনের 'লিভিং ডেসার্ট' ছবিটি দেখে থাকবে। অমন ছবি আর কি হবে? আর একটা আশ্চর্যের কথা, এইসব পশুপাখিদের ছবি তোলবার জন্যে, তাদের লাফানো, তাদের হাসি, তাদের কাণ্ডকারখানা তোলবার জন্যে দিনরাত ঝড়জলরোদ মাথায় রাতের পর রাত ডিসনে বসে থাকতেন ক্যামেরাম্যানকে নিয়ে।

এসব ছাড়াও মানুষদের নিয়েও তিনি ছবি করেছেন। ভেবো না যেন, শুধু কার্টুন আর জীবজন্তু নিয়েই ডিসনে সাহেবের কারবার। মানুষের সুখ-দু:খ হাসি-কান্না নিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি ছবি তুললেন। উদাহরণ হিসেবে নাম করতে পারি 'দি ট্রেজার আইল্যান্ড', 'দি অ্যাবসেন্ট মাইনডেড প্রফেসর' (১৯৬১) এবং আরও অনেকগুলো। এক কথায় বলা যায়, ছবির জগতে ডিসনে অপরাজেয় সম্রাট। নানা বিষয়, নানা কাহিনী এবং নানা চরিত্রই তাঁর ছবিতে হাজির হয়েছে।

আমাদের গল্প এবার শেষ হতে চলেছে। শেষ হবার আগে ডিসনে সাহেবের সর্বোত্তম কীর্তি 'ডিসনে ল্যান্ডে'র কথা না বললে সবই বৃথা।

'ডিসনে ল্যান্ড' হলো বিরাট এক ঘেরা জায়গায় তৈরী আজব এক পৃথিবী। ছোট-বড় সকলের আনন্দের খোরাক এখানে থরে-থরে সাজানো। এখানে কি নেই বলতে পারো? নানান ধরনের জীবজন্তু, পশুপাখি, গাছ-গাছড়া, নদী পুকুর ঝরনা পাহাড়, কুমীর হাঙর গণ্ডার তিমি হিপো—সবই এখানে দেখতে পাবে। ক্ষুদে ক্ষুদে রেলগাড়ি, জাহাজ স্টিমার—যা চাই সবই তোমাদের জন্যে তৈরী। এক কথায়, ছোটদের স্বর্গ এই ডিসনে ল্যান্ড। ছোটদের স্বপ্নের জগৎ এই ডিসনে ল্যান্ড।

বড়োরাও এখানে যে না আসেন তা নয়। পৃথিবীর সব দেশ থেকে হাজার হাজার লোক প্রত্যহ আসেন এখানে। আমেরিকায় যাবো অথচ ডিসনে ল্যান্ড দেখবো না, এ কোনোমতেই সম্ভব নয়। আমাদের জহরলাল নেহরুও কিন্তু ডিসনে ল্যান্ড দেখে এসেছেন। ডিসনে সাহেবের সঙ্গে ছবিও তুলেছেন।

ডিসনে ল্যান্ডের ব্যাপারটা ডিসনে সাহেবের মাথায় প্রথমে কী ভাবে এলো জান? তিনি যখন ফিল্ম তুলতেন, তখন প্রায়ই ভাবতেন তাঁর স্টুডিয়োর পাশেই যদি দু'একরের জমি নিয়ে একটা ফাঁকা সুন্দর জায়গা তৈরি করা যায়, তাহলে তাঁর স্টুডিয়োর কর্মীরা কাজ করতে করতেই ওই সুন্দর ফাঁকা জায়গায় নানান ভালো ভালো কিছু ছবি, কিছু গাছ, পশুপক্ষী ইত্যাদি দেখতে পারে। কিন্তু তারপর ডিসনে সাহেব যখন কাজে হাত দিলেন, শুনলে অবাক হবে যে, সেই দু'একর নিয়ে যে-পরিকল্পনার জন্ম হয়েছিল, কাজ শেষ হবার পর দেখা গেল সেই ডিসনে ল্যান্ডের আয়তন দাঁড়িয়েছে একশো ষাট একর। বোঝো ব্যাপারটা। কোথায় দু'একর, মানে ৪৮৪০ গজ ইনটু দুই। আর কোথায় একশো ষাট একর! মানে ৪৮৪০ গজ ইনটু একশো ষাট। আমি আর গুণ করতে পারবো না। তোমরাই গুণ করে ভেবে দেখো কী বিরাট জায়গা নিয়ে এই ডিসনে ল্যান্ড।

এই ডিসনে ল্যান্ডে আছে প্ল্যাসটিকের নানান জন্তু জানোয়ার। দেখলে মনে হবে সত্যি। আসলেও যে নেই তা নয়। আছে নানান ছবি, খেলনা, পুকুর, ঝরনা, পাহাড়। এক কথায় ছোটদের আনন্দের খনি, মর্ত্যের স্বর্গ এই ডিসনে ল্যান্ড। ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে ডিসনে ল্যান্ডে দর্শকরা প্রথম প্রবেশ করেন। তারপর থেকে কতো লোক, কতো পৃথিবীখ্যাত নেতা যে এখানে এসেছেন তার হিসেব নেই। লস এনজেলসের কাছেই এই আজব জগৎ।

ডিসনে ল্যান্ডে চার-চারটে এলাকা। মানে চারটে ভাগ এর। এক-একটা ভাগ এক-এক রকমের। কোনোটার নাম ফ্যানট্যাসিল্যান্ড, কোনোটার অ্যাডভেনচারল্যান্ড, কোনোটা আবার ফ্রনটিয়ারল্যান্ড, কোনোটা টুমরোল্যান্ড। এক-একটা ল্যান্ডে এক-এক রকম ব্যাপার। এক-এক রকম জগৎ। মনে হবে সত্যিকারের সমুদ্র দেখছো সামনে। মনে হবে হীরের খনির মধ্যে ঢুকেছ তুমি। মনে হবে তুমি চাঁদে যাচ্ছো। মনে হবে...

মনে হবে কী অসাধারণ প্রতিভা এই ডিসনে সাহেবের। ন'বছর বয়সের খবরে কাগজ বিক্রি-করা, ট্রেনে মিছরি বিক্রি-করা শিকাগোর সেই ছেলে কী অবাক কাণ্ড করলেন। শুধুমাত্র মানুষকে, শিশুসমাজকে আনন্দ দেবার জন্যে, মুখে হাসি ফোটাবার জন্যে কী দুরন্ত প্রচেষ্টা!

এসব কথা ভাবতে-ভাবতে তোমাদের মনে পড়বে ডিসনে সাহেবের সেই প্রাত:স্মরণীয় উক্তি, মানুস ইচ্ছে করলে সুখ এবং বিস্ময়ের সন্ধান পেতে পারে।

কিন্তু ডিসনে সাহেব শুধু সুখ, শুধু বিস্ময়ই পান নি, একত্রিশটি আকাডেমি পুরস্কার, ন'শো অন্যান্য পুরস্কার-অভিজ্ঞানপত্র এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসা নিয়ে বছর দুই আগে আমাদের কাঁদিয়ে চলে গেলেন। দুরারোগ্য ক্যানসার রোগ ডিসনে সাহেবের মুখের হাসি মুছে দিল। সারা পৃথিবীর পরমপ্রিয় ওয়াল্ট ডিসনে চলে গেলেন। সেদিন তারিখ ছিল ডিসেম্বরের পনেরো, সাল ১৯৬৬।

না না, আমিই ভুল বললাম।

ওয়াল্ট ডিসনে বেঁচে আছেন। তিনি চিরজীবী। তাঁর মৃত্যু নেই, ক্ষয় নেই, লয় নেই। তিনি আছেন পৃথিবীর কোটি কোটি শিশুর মধ্যে, তিনি আছেন কোটি কোটি পাখির মধ্যে, আকাশের তারার মধ্যে, বনের হরিণের চলার মধ্যে, কাঠবেরালির দুষ্টু চাউনির মধ্যে। তিনি আছেন পাহাড়ের চূড়ায়-চূড়ায়, অযুত-নিযুত ফুলে-ফলে-গাছে। তিনি আছেন প্রান্তরে সূর্যে চন্দ্রে। তিনি আছেন আনন্দে। আছেন ভালোবাসায়।

আর আছেন এবং থাকবেন সারা পৃথিবীর চিত্তলোকে। এ চিত্তলোক আজও তরঙ্গিত। কেননা সোনার খাতায় নতুন একটি নাম উঠেছে। নতুন একটি তারা ফুটেছে আকাশে।

সে-তারার নাম ওয়াল্ট ডিসনে।

সকল অধ্যায়
১.
মাটি
২.
ভুতের গল্প
৩.
হর্ষবর্ধনের অশ্বরোগ
৪.
সেই মেয়েটি
৫.
বিদ্যাসাগরের ছেলেবেলা
৬.
গোয়েন্দা
৭.
ইতিহাস ছাড়িয়ে
৮.
যমালয়ে জীবন্ত মানুষ
৯.
ডাকিনীর ডাক
১০.
শত্রুতা
১১.
রেলে
১২.
অতু
১৩.
এক যে ছিল বাঘিনী
১৪.
দাওয়াই
১৫.
বিশ্বের বিস্ময় হেলেন কেলার
১৬.
ফুলের বিবাহ
১৭.
মংলুফলায় সোনা
১৮.
একটি গল্প করার মত গ্রাম
১৯.
লালমণি পাখি
২০.
প্লাবন
২১.
ছাত্র-সঙ্গীত
২২.
জয়-পরাজয়
২৩.
এখন শিউলি-বেলা
২৪.
আশ্বিনে
২৫.
ছড়া
২৬.
পোড়ো কুঁড়ে
২৭.
মা (উপন্যাস)
২৮.
গোর্কির ছেলেবেলা
২৯.
সেয়ানে সেয়ানে
৩০.
সুড়ঙ্গের রহস্য
৩১.
এক ঝাঁক গল্প
৩২.
কঙ্কাল
৩৩.
নতুন করে জাগো মা
৩৪.
বেতাল-পঞ্চবিংশতি
৩৫.
ভবঘুরের চিঠি
৩৬.
নিলাম দামী চশমা
৩৭.
শরৎ এল
৩৮.
কৈশোর
৩৯.
আলোর ডাকে
৪০.
অগ্রদূত
৪১.
টাকার কথা
৪২.
সাহস চাই!
৪৩.
ভোজবাড়ীর ব্যাপার
৪৪.
আবাহনী
৪৫.
এবার পূজায়
৪৬.
বামুনের স্বর্গবাস
৪৭.
মজার ধাঁধা
৪৮.
আংটির পাথর
৪৯.
মনমঞ্জুষা
৫০.
নিখিল বঙ্গ গরু সম্মেলন
৫১.
মিকি ডাক আর দিসনে
৫২.
মেঘনাদবধ
৫৩.
চৌধুরী-বাগ
৫৪.
জাদু বিদ্যা
৫৫.
বাবার চিঠি
৫৬.
গানের কথা
৫৭.
আমার প্রথম শিকার আভিযান
৫৮.
বিশ্বক্রীয়া ওলিম্পিক
৫৯.
বাংলার বন্যা
৬০.
শরতে
৬১.
আনন্দ আশ্বিনে
৬২.
টোটকা কিছু
৬৩.
জলদি করুন দাদা
৬৪.
কিশোর বিজ্ঞানীর আসর
৬৫.
সঙ্গীতের মৃত্যু
৬৬.
ছত্রপতি
৬৭.
মেঘ ও বৃষ্টি
৬৮.
মধুপালের আবির্ভাব

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%