মা (উপন্যাস)

দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

সরোজকুমার রায়চৌধুরী

এক

বিকালে বসন্ত আর নন্দিনী লুডো খেলছিল। বড় ঘড়িটায় ঢং-ঢং করে পাঁচটা বাজল।

খেলার মাঝখানেই নন্দিনী উঠে পড়ল : এবার আমাকে উঠতে হবে। আজ এই থাক।

বিরক্ত ভাবে বসন্ত বললে, এই থাক কি? এ দানটা হয়ে যাক।

কুণ্ঠিত ভাবে নন্দিনী বললে, পাঁচটা বাজল শুনলে না?

—তাতে কী?

—বাবার অফিস থেকে আসবার সময় হল। খাবার তৈরী করতে হবে না?

—সে তো ঠাকুমা আছে।

—না, আজ আমি করব। আগেই ঠাকুমাকে বলেছি।

নন্দিনীর হাতে একটা ঝাঁপি দিয়ে বসন্ত বললে, আগেই বলেছি! চালাকি পেয়েছ? হেরে গেছ দেখে পালাবার মতলব?

বসন্তর মুঠো থেকে হাতটা ছাড়াতে ছাড়াতে নন্দিনী বললে, আচ্ছা বেশ আমি হারলাম। হয়েছে তো! এবার ছেড়ে দাও।

সে কি হয়! খেলার মাঝখানে যার জয় সুনিশ্চিত সে কিছুতেই প্রতিপক্ষকে ছাড়তে পারে না।

মুখ কাঁচুমাচু করে নন্দিনী বললে, ছেড়ে দাও লক্ষ্মীটি। জান না আজ ঠাকুমার একাদশী। বুড়ো মানুষ সমস্ত দিন নিরম্বু উপবাস। আমি বড় হচ্ছি। তাকে সাহায্য করতে হবে তো।

নন্দিনী ব্যস্তভাবে নীচে এসে দেখে ঠাকুমা খাবার তৈরী করতে বসে গেছেন।

লজ্জায় নন্দিনীর কান্না পেয়ে গেল। বললে, তুমি কেন নেমে এলে ঠাকুমা? আমি তো বলেছিলাম বাবার খাবার আজ আমি করবো।

ঠাকুমা হেসে বললেন, তাতে কি হয়েছে? তোরা ছেলেমানুষ খেলতে বসেছিলি। তাই আর ডাকলাম না।

নন্দিনী বললে, আমার ঠিক খেয়াল ছিল। সরো, লুচিগুলো আমি ভেজে নিচ্ছি।

—তা ভাজ। আমি বরং বেলে দিই।

—তোমাকে আমি কিচ্ছু করতে দেবো না। আজ না তোমার একাদশী। তুমি ওপরে গিয়ে শুয়ে পড়ো। বলে নন্দিনী ঘটর-ঘটর করে লুচি বেলতে লাগলো।

ঠাকুমা সরে বসলেন, কিন্তু উপরে গেলেন না। নিজের মনে বলে চললেন, তোরা ভাবিস উপবাসে আমাদের খুব কষ্ট হয়। বামুনের বিধবা, কিছু কষ্ট হয়না রে। বুঝতেই পারি না। প্রথম প্রথম হতো। সমস্ত দিন ক্ষিধে-তেষ্টায় ছটফট করতাম। সতেরো বছর বয়সে বিধবা হয়েছিলাম। তোর বাবা তখন এক বছরের ছেলে। আজ বিকেলে জল খাবার করতে দিচ্ছিস না, আর সেদিন অত বড় সংসারের সব কাজ করতে হতো। প্রথম প্রথম কষ্ট হতো। তারপর কাজের তাড়ায় ক্ষিধে- তেষ্টা কিছুই মনে থাকতো না।

নন্দিনী একমনে কাজ করে যায় আর মাঝে-মাঝে ঠাকুমার কথায় হুঁ হ্যাঁ দেয়।

বিভূতিবাবু জন্মেছিলেন খুব বড় সংসারে। তাঁর জ্যাঠা-বাবা-কাকারা ছিলেন পাঁচ ভাই। তাঁর বাবা অল্প বয়সে মারা গিয়েছিলেন। তিনিই একমাত্র সন্তান। কিন্তু তাঁর জ্যাঠা-কাকাদের অনেকগুলি করে সন্তান। সেই হট্টগোলের মধ্যে বিভূতিবাবু মানুষ হয়েছেন। সে এক অন্য আনন্দ। বড় দাদাদের শাসনের নীচে তাঁদের সমবয়সী ভাইবোনদের একটা আনন্দের রাজত্ব ছিল। খাওয়াদাওয়া নাম মাত্র। সব বৃহৎ পরিবারেই খাওয়াদাওয়া মোটামুটি হয়ে থাকে। সেকথা বিভূতিবাবুর মনেও নেই। মনে আছে শুধু অনেকগুলি সমবয়সী ভাইবোন মিলে অফুরন্ত আনন্দ হুল্লোড়ের কথা। প্রভাতে ঘুম থেকে উঠে রাত্রে শোবার অব্যবহিত আগে পর্যন্ত হৈ-হুল্লোড় চলতো। চোখ বন্ধ করলেই এখনো বিভূতিবাবু সেই দিনগুলি বেশ স্পষ্ট দেখতে পান।

তারপরে সংসারে কি যেন হয়ে গেল, বিভূতিবাবুর ভালো মনে পড়ে না। কিছুকাল পরস্পরের কলহ-কোলাহলের পর একদিন বিভূতিবাবুর মা বিভূতিবাবুকে নিয়ে সেই প্রকাণ্ড বাড়ীর নীচের একখানি ঘরে আশ্রয় নিলেন। সামনের একফালি বারান্দায় মাতা-পুত্রের রান্না চলতে লাগলো।

বিভূতিবাবু সেইবার ম্যাট্রিকুলেশন দেবেন। নীচের অন্ধকার ঘরের এক কোণে বসে তিনি দিনরাত পড়ায় মগ্ন। বোঝবার বয়স হলেও এসব ঝামেলা বোঝবার তাঁর সময় ছিল না। যত ঝামেলা তাঁর বিধবা মায়ের উপর দিয়েই গেল।

ঝামেলা মানে সহজ ঝামেলা নয়। পরিবার এক কথায় ভাঙে না। দীর্ঘকাল ধরে অনেক অশান্তি অনেক ঝগড়াঝাঁটি, অনেক অপ্রীতিকর ঘটনার পর তবে ভাঙে। বিভূতিবাবুদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কতদিন এমন হয়েছে যে, মাতা-পুত্রের উভয়ের খাওয়াই হয়নি।

কিন্তু কিছুতেই এ সমস্ত ব্যাপার বিভূতিবাবুর মনের ওপর দাগ কাটতে পারেনি। ঝগড়ার সূচনা দেখলেই তিনি পড়ার একখানি বই হাতে করে বাড়ী থেকে পালাতেন। বেশীর ভাগ সময়েই পার্কে পালিয়ে আসতেন। সেখানে শেডের নীচে একটা বেঞ্চে বসে অখণ্ড মনোযোগের সঙ্গে পরীক্ষার পড়া তৈরী করতেন। ক্ষুধা-তৃষ্ণার কথা মনেও থাকত না।

এ ছাড়া তার আর করবারও কিছু ছিল না। ঝগড়া চলতো তাঁর মায়ের সঙ্গে জ্যাঠা-খুড়োর। তখন তিনি ছেলেমানুষ, এক্ষেত্রে তাঁর করবার কিছু ছিল না।

তাঁর সব চেয়ে বেশী কষ্ট হ'ত যখন দেখতেন, তাঁর সমবয়সী খুড়তুতো-জাঠতুতো ভাইবোনেরা তাঁর সঙ্গে কথা বন্ধ করেছে। তাঁর ইচ্ছে করতো খোশামোদ করে তাদের রাগ ভাঙাবার। কিন্তু পরীক্ষা পাশের চিন্তায় তিনি এমনই ডুবে ছিলেন যে, ইচ্ছে সত্বেও দুদণ্ড বসে তাদের রাগ ভাঙান এমন অবসর ছিল না।

এই রকম অবস্থায় তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিলেন।

ক্লাসের মাষ্টারদের আশা ছিল বিভূতিবাবু জলপানি পাবেন। কিন্তু তাঁর সতীর্থরা যারা বিভূতিবাবুর বাড়ীর ব্যাপার জানতো, তাদের আশঙ্কা ছিল বিভূতিবাবুর পক্ষে পাশ করা কঠিন।

যখন পরীক্ষার খবর বেরুলো, দেখা গেল বিভূতিবাবু জলপানি পাননি, ফেলও করেননি। প্রথম বিভাগেই পাশ করেছেন।

এবার কলেজে পড়ার কথা।

কিন্তু এই সময় পৃথক হওয়ার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ হ'ল। জ্যাঠা-কাকারা জোর করে বিভূতিবাবুর মাকে নীচের একটা অন্ধকার ঘরে নামিয়ে দিলেন। আর মাতা-পুত্র দুজনের ব্যবহারের মত থালা বাসন দিলেন। বিভূতিবাবুর মা প্রতিবাদ জানিয়ে চিৎকার করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলেন না। বিভূতিবাবুর খুব ইচ্ছে ছিল আই. এস. সি. পড়া। তাঁর বিশ্বাস ছিল ম্যাট্রিকুলেশনের ফল যেটুকু খারাপ হয়েছে, ইন্টার- মিডিয়েটে সেটুকু তিনি নিশ্চয় শুধরে নিতে পারবেন। তারপরে জলপানির টাকায় ডাক্তারী পড়বেন। দরকার হলে দু-একটা ছেলে পড়ালেই চলবে।

কিন্তু তাঁর কিছুই সুবিধা হ'ল না। ধনী আত্মীয়ের অভাব ছিল না। কিন্তু কেউ এই দু:স্থ ছেলেটির পড়ার খরচ বইতে রাজী হল না। সকলেই নিজেদের সত্য-মিথ্যার পাঁচটা অভাব-অভিযোগের কথা শুনিয়ে তাঁকে বিদায় দিল।

বিভূতিবাবু মনে-মনে প্রচণ্ড আঘাত পেলেন। প্রকাশ্যে মাকে বললেন, আমার পড়া ঠিকও হ'ত না মা। পয়সার অভাবে মাঝপথেই হয়তো পড়া বন্ধ হয়ে যেত। তখন না এ-কূল, না ও-কূল। তার চেয়ে কোথাও যদি একটা চাকরি-বাকরি পাই তো ভালো হয়।

মা কিছুক্ষণ দম ধরে যেন একটা মস্ত বড় আঘাত সামলালেন। তাঁর চোখ দিয়ে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা জল পড়লো।

আঁচলে চোখ মুছে মা বললেন, একটা পাশ করে কি চাকরি পাবি? কে চাকরি করে দেবে?

মায়ের সামনে বিভূতিবাবু দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না। বললেন, একটা চেষ্টা তো করছি মা। দেখি কি হয়।

কিন্তু সেটা স্রেফ মিথ্যা কথা। কোন চেষ্টাই তিনি করছিলেন না। নিজের দু:খের কথা কাউকে জানাতে তাঁর সঙ্কোচ হচ্ছিল। আত্মসম্মানে আঘাত লাগছিলো।

সেই দিনগুলির কথা মনে হলে বিভূতিবাবু আজও শিউরে ওঠেন।

তাঁর সতীর্থদের মধ্যে যারা পাশ করেছে, তারা সবাই কেউ আর্টসে, কেউ সায়েন্সে ভর্তি হয়েছে। তাদের কাছে দাঁড়াতে বিভূতিবাবুর লজ্জা করতো। তাঁর বন্ধু বান্ধবদের বেশীর ভাগ এরাই। বিভূতিবাবু সকালে বেরিয়ে পড়তেন, এগারোটায় ফিরতেন। স্নানাহার করে আবার বেরিয়ে পড়তেন। রাত্রি আটটা-নটায় ফিরতেন। মা জিজ্ঞেস করতেন, দিন রাত্তির কোথায় কোথায় ঘুরিস? এই ক'মাসে চেহারা কি হয়েছে দেখেছিস?

কিন্তু এ কথায় বিভূতিবাবু ভ্রুক্ষেপও করতেন না। তাঁর দু:খ কাকেও বলবার নয়। এমনকি মাকেও নয়। এমনিতেই মায়ের দু:খের শেষ নেই, তার ওপর ছেলের দু:খের বোঝা তাঁর উপর চাপানো ঠিক নয়।

মাঝে মাঝে মা জিজ্ঞাসা করতেন, কোথাও কিছু সুবিধা হ'ল?

বিভূতিবাবু হেসে উত্তর দিতেন, চাকরি কি সোজা ব্যাপার মা যে, এক কথায় হয়ে যাবে? অনেককে বলেছি, তাঁরা চেষ্টা করছেন। দেখা যাক কি হয়।

সেদিনটা বোধ হয় শনিবার ছিল।

নিঝুম হয়ে যথারীতি বিভূতিবাবু পার্কের একটা অন্ধকার কোণে বসে ছিলেন। নটা বাজতে বাড়ী ফিরলেন।

মা বললেন, কোথায় ছিলিরে এত রাত পর্যন্ত? প্রসাদ তিনবার তোর খোঁজে এসে ফিরে গেল। কি না কি বিশেষ দরকার আছে।

বিভূতিবাবু মনে মনে হাসলেন! পৃথিবীতে কারুর সঙ্গে তাঁর কোন দরকার নেই। প্রসাদ যে অত অন্তরঙ্গ বন্ধু, তার সঙ্গেও নয়।

তাঁকে চুপ করে থাকতে দেখে মা বললেন, কাছেই তো প্রসাদের বাড়ী। যা না, একবার শুনে আয় না কি ব্যাপার।

চুপ করে মেঝেয় বসে বসে বিভূতিবাবু বললেন, আজ আর পারছি না মা। হেঁটে হেঁটে পায়ের আর কিছু নেই। কি আছে, দুটি খেতে দাও।

মা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। ভাত বাড়তে বাড়তে বললেন, আহা, তা আর হবে না! কিন্তু তুই অত ঘুরিস কেন? আমি বলছি, আমার কথা শোন, যতদিন সময় না হয়, ততদিন পায়ের সুতো ছিঁড়ে ফেললেও কিছু হবে না। যখন হবার তখন বাড়ীতে বসে থাকলেও হবে।

পরিহাস করে বিভূতিবাবু বললেন, হবে, যদি তোমার বাবার কিংবা শ্বশুরের অফিস হয়।

মাও হটবার পাত্র নয়। বললেন, কিংবা তোমার শ্বশুরের অফিস হলেও হবে।

—সন্দেহ আছে।

—সন্দেহ কেন? জামাইয়ের জন্য শ্বশুর করবে না?

—শ্বশুরের হয়ত করবার ইচ্ছা থাকতে পারে।

কিন্তু শ্বশুরের ছেলেরা আছে, যাদের চলতি ভাষায় শালা বলা হয়।

দু'জনায় উচ্চকণ্ঠে হেসে উঠলেন।

এ-বাড়ীতে অনেকদিন পরে হাসি। নিজেদের হাসির শব্দে নিজেরাই চমকে উঠেছিলেন।

এমন সময় প্রসাদের পুনরাবির্ভাব। এই চতুর্থবার। প্রসাদ জিজ্ঞাসা করলে, অত হাসি কিসের?

প্রসাদকে দেখে অপ্রস্তুত ভাবে বিভূতিবাবু বলে উঠেছিলেন, প্রসাদ তুমি এতরাত্রে কষ্ট করে আবার এলে কেন? কাল সকালে আমিই তোমার বাড়ী যেতাম।

প্রসাদ বললে, বাবা ঘরে তিষ্ঠুতে দিচ্ছেন না। তোমাকে তাঁর বিশেষ দরকার।

বিভূতিবাবু অবাক : আমাকে? তোমার বাবা? চল তাহলে এখনি যাই।

...বিভূতিবাবু চিৎকার করে উঠেছিলেন...

খানিকক্ষণ পরে বিভূতিবাবু ফিরে এলেন। মুখ গম্ভীর।

মা উৎকণ্ঠিত চিত্তে তাঁর অপেক্ষায় বসে ছিলেন। ছেলের মুখ গম্ভীর দেখে সেই উৎকণ্ঠা আরো বাড়ল।

ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কি ব্যাপার রে? কিছু খারাপ খবর নাকি? তোর মুখ অত গম্ভীর কেন?

বিভূতিবাবু সকাতরে বলেছিলেন, তোমার পায়ে পড়ি আজকে কিছু জিজ্ঞেস করো না মা। কাল বিকালে বলব।

ঘা খেয়ে খেয়ে বিভূতিবাবুর আশঙ্কা হয়েছিল সুখবর আগের থেকে পাঁচ কান হলে ফলে না।

পরদিন ন'টায় খেয়েদেয়ে বেরিয়ে গেলেন। বিকালে হাসি মুখে ফিরে এসে মাকে প্রণাম করলেন।

মায়ের অবস্থা বলবার নয়। বিভূতিবাবু সকালে খেয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর হেঁসেল তুলে রেখে ঠাকুর ঘরে গিয়ে বসেছিলেন। মন ঠাকুরের দিকে, কিন্তু কান ছেলের পদশব্দের দিকে। ছেলের মুখে হাসি দেখেও দু:খিনী বিধবা আশ্বস্ত হতে পারছিলেন না। কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস করছিলেন না। নি:শব্দে উদগ্রীব হয়ে ছেলের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন।

বিভূতিবাবু বললেন, একটা চাকরি হ'ল মা। আজ না যেতে পারলে হ'ত না। সেই জন্যেই প্রসাদের বাবার অত তাড়া।

কথা শেষ না হতে বিভূতিবাবু চমকে উঠলেন : তুমি অমন করে চেয়ে আছ কেন মা? কথা বলছ না কেন? মা, চাকরি হয়েছে শুনতে পাচ্ছ না?

মা শুনতে পেয়েছিলেন নিশ্চয়। কেউ কেউ যত কঠিন দু:খই হোক না কেন অকাতরে সহ্য করতে পারেন। কিন্তু আকস্মিক আনন্দের আঘাত সইতে পারেন না। বিভূতিবাবুর মা সেই ধাতের মানুষ। একে সমস্ত দিন উপবাস তার ওপরে এই আনন্দ-সংবাদ। বিভূতিবাবুর কিছু বোঝবার আগেই মায়ের সংজ্ঞাহীন দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

কি করতে হবে বুঝতে না পেরে বিভূতিবাবু চিৎকার করে উঠেছিলেন : ওগো আমার মায়ের কি হল গো!

চিৎকারে জেঠী-খুড়িরা ওপর থেকে নেমে এলেন। কিন্তু কাছে এলেন না। কাঠের পুতুলের মত দূরে দাঁড়িয়ে রইলেন।

মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বিভূতিবাবু চিৎকার করতে লাগলেন : মা, মা! ওমা, মাগো! তুমি কথা কইছ না কেন? কথা কও!

জেঠী বললেন, মা মা করে কাকে ডাকছিস পাগলা। মা কি তোর আছে! মুখ দিয়ে লালা পড়ছে দেখছিস না?

কিন্তু সে সব কথা বিভূতিবাবুর কানেই গেল না। পাগলের মতন তিনি অবিরাম মা মা বলে ডেকে চলেছেন আর অঝোরে কাঁদছেন। যখন তাঁর নিজেরও বিশ্বাস হ'ল মা আর বেঁচে নেই, সেই সময় মা চোখ মেলে চাইলেন। ধীরে-ধীরে উঠে বসলেন। চারিদিকে অবাক হয়ে চাইতে লাগলেন।

জেঠী বললেন, এত ঢঙও তুই জানিস মেজ-বৌ। বাড়িশুদ্ধু লোককে ভাবিয়ে তুলেছিলি। ছেলেটা তো কেঁদে অস্থির।

মা কারো কথায় সাড়া দিলেন না। ঘরের ভিতর থেকে ছেলের জন্য খাবার নিয়ে এলেন। বললেন, খা, আমি তোর জন্যে চা করে আনি।

সময় পেলেই এই কাহিনীটি ঠাকুমা নাতি-নাতনিদের শোনান। বলেন, চাকরি হ'ল। কুড়ি টাকা মাইনে।

বসন্ত আর নন্দিনী হেসেই অস্থির : কুড়ি টাকা মাইনেতেই এই?

ঠাকুমা বলেন, তখনকার কুড়ি টাকা আজকের দিনে তিনশো টাকার সমান। তা জানিস?

বলেন, সেই কুড়ি টাকাই আমরা খরচ করে উঠতে পারতাম না। আর জানিস, আমার কথাই সত্যি হল।

—কি কথা?

—শ্বশুরই তোর বাবার চাকরি করে দিলেন।

—তার মানে?

—তার মানে প্রসাদের বোনের সঙ্গেই তো তোর বাবার বিয়ে হ'ল। বিভূতির ওপর প্রসাদের বাবার নজর ছিল অনেক দিন থেকেই। বিভূতির চাকরি পাকা হবার পর যখন তিনি বিয়ের প্রস্তাব করলেন, আমি এক কথায় রাজী হয়ে গেলাম। তিনি পণের কথা তুলতে আমি বলেছিলাম, আপনার মেয়ে-জামাইকে আপনি যা দেবেন তাই ওরা খুশি হয়ে নেবে।

বলতে বলতে ঠাকুমার চোখ সজল হয়ে আসে। নন্দিনীর মা খুব গুণের মেয়ে ছিলেন। তিনি এ-বাড়ীতে আসার পর থেকেই বিভূতিবাবুর উন্নতি শুরু হ'ল। কিন্তু তিনি ভোগ করে যেতে পেলেন না। বিয়ের কয়েক বৎসরের মধ্যেই বসন্ত আর নন্দিনীকে রেখে তিনি পরলোকগত হন। নন্দিনীর বয়স তখন এক বৎসর আর বসন্তের চার।

ঠাকুমা দু:খ করে প্রায় বলতেন, কি ভাগ্য করেই এসেছিলাম। ঘর আর বাঁধতে পারলাম না। স্বামীর ঘরও না, ছেলের ঘরও না।

দুই

বিভূতিবাবুর স্ত্রী নেই, এই যা, নইলে তাঁর ত সুখের সংসার। মা সংসারটি গুছিয়ে রেখেছেন। মেয়ের দৃষ্টি সব সময় বাপের দিকে। আর বিভূতিবাবু কর্মক্ষেত্রে অনেক উপরে উঠেছেন, ম্যাট্রিক পাশ করে যা হওয়া যায় না।

অফিসে যতক্ষণ থাকেন, বিভূতিবাবু কাজের মধ্যে ডুবে থাকেন। কাজে ফাঁকি দেওয়া তাঁর কুষ্ঠীতে নেই। তাঁর দ্বিতীয় গুণ, সততা। কায়মনোবাক্যে তিনি সৎ। অত নীচের থেকে যে অত উপরে উঠেছেন, তার মূল কারণ এই দুটি গুণ। তাঁর সহপাঠীদের যাঁরা বি.এ. এম.এ. পাশ করেছেন, তাঁরাও আজ বিভূতিবাবুকে হিংসা করেন।

পৃথক হবার পর যে আঘাত সব চেয়ে বেশী করে বিভূতিবাবুর বুকে বেজেছিল, সে হচ্ছে তাঁর সমবয়সী খুড়তুতো-জাঠতুতো ভাইবোনদের ব্যবহার। তারা বিভূতিবাবুর সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিয়েছিল। পিছন থেকে বিভূতিবাবুকে টিটকারিও দিত। বিভূতিবাবু কোন সাড়া দিতেন না। বাড়ীতে বেশীক্ষণ থাকতেন না। দিনের বেশীর ভাগ সময় অফিসেই কাটতো। অবশিষ্ট সময় পার্কে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে হাসি-গল্পে কাটতো। বাড়ীতে যেটুকু সময় থাকতেন সেটুকু সময় চোরের মতন থাকতেন। চুপি চুপি কথা বলতেন, যেটুকু না বললেই নয়। মায়ের সঙ্গে কথা হ'ত রাত্রে শোবার সময়, কেউ যেন না শুনতে পায়।

এ বাড়ীর হাওয়া তাঁর বিষের মতো বোধ হত। সব সময় চিন্তা ছিল কবে এ বাড়ী থেকে বাইরে আসতে পারবে। প্রথম সুযোগেই এ বাড়ী ছেড়ে একটা ভাড়া বাড়ীতে গিয়ে উঠলেন। আবার তার মুখে হাসি ফুটলো। কণ্ঠে স্বর। তাঁর মাও ভাড়া বাড়ীতে এসে নি:শ্বাস ফেলে বাঁচলেন। আগের বাড়ীতে তাঁর দিন আরো খারাপ কেটেছিল। বিভূতিবাবুর তবু অফিস ছিল, বাইরে বন্ধুবান্ধব ছিল। মায়ের কেউ ছিল না। আত্মীয় স্বজনও না। আজ অবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু দূর এবং নিকট আত্মীয়দের আসা-যাওয়া আরম্ভ হয়েছে বটে, সেদিন কিন্তু কেউ ছায়াও মাড়াতো না।

কিন্তু এখন এসে লাভ হয় না। মা স্বভাবতই কথা কম বলতেন। চারিদিক থেকে আঘাত পেয়ে পেয়ে হাসি কথা আরও কমে গিয়েছিলো। কাজের সময় মুখ বন্ধ করে কাজ করে যেতেন। যখন কাজ থাকত না, তখনও বিছানায় শুয়ে থাকতে পারতেন না। রান্না ঘরের এক কোণে চুপ করে বসে থাকতেন।

সে অভ্যাস আজও আছে। সেদিনের চেয়ে আজ অবশ্য সংসার কিছুটা বড় হয়েছে। তবু সে এমন কি বড় হয়েছে? যে বৃহৎ পরিবারের বধূ হয়ে তিনি এসেছিলেন সে তুলনায় নিতান্তই ছোট। তাঁর অবকাশ ভরাট করার মতো যথেষ্ট বড় নয়। এখনও হাতে যখন কাজ থাকে না, তখন আগের মতই রান্না ঘরের এক কোণে চুপ করে বসে থাকেন।

বৃহৎ পরিবারের যে কথাটা বলা হ'ল অনেক লোকজন, অনেক শব্দ, অনেক কোলাহলের মধ্যে মানুষ হওয়ারও একটা মাধুর্য আছে। তখন টানা বারান্দার এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত অনেক ভাইবোন বসে খেতো। তাদের সমবেত কোলাহলে বাড়ী সরগরম হয়ে উঠতো। এখন একটি ছোট টেবিলেই সব কুলিয়ে যায়। একধারে বিভূতিবাবু, অন্য ধারে বসন্ত আর নন্দিনী। এই তো খাওয়ার লোক।

মাঝে-মাঝে বিভূতিবাবুর মন সেই পুরানো দিনে চলে যায়। খেতে খেতে চমকে চারিদিকে চেয়ে কি যেন খোঁজেন।

মা জিজ্ঞাসা করেন, কি খুঁজছিসরে? কাকে খুঁজছিস?

বিভূতিবাবুর চমক ভাঙ্গে। অপ্রস্তুতভাবে বলেন, না কাউকে খুঁজিনি।

থেকে থেকে এক-একদিন সেই বৃহৎ পরিবারের মধ্যাহ্ন-ভোজনের দৃশ্য আজও বিভূতিবাবুর চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

বিভূতিবাবুর আরামের এতটুকু ত্রুটি কোথাও নেই। মা সব সময় সতর্ক। কিন্তু তাঁর বয়স হয়েছে। সব তাঁর নজরে পড়েও না, সব সময় সব জিনিস খেয়ালও থাকে না। সেই ত্রুটি পূরণ করেছে নন্দিনী।

নন্দিনীর স্কুল আছে, পড়াশুনা আছে। কিন্তু তার ফাঁকে তাকে বাবার কফিটি দরকার সেদিকেও ঠিক খেয়াল রাখতে হয়।

নন্দিনীর বাবার জন্য এই ব্যস্ততায় ঠাকুমা হাসেন। বলেন, ওরে তোকে ব্যস্ত হতে হবে না। তুই নিজের কাজ কর।

নন্দিনী বলে, আমার আর কি কাজ?

—কেন পড়াশুনা। পড়াশুনা নেই?

—পড়াশুনা সেরেই তো আসছি।

ঠাকুমা বলেন, ওরে তোকে ব্যস্ত হতে হবে না। আমি এখনও অনেকদিন বাঁচবো।

নন্দিনীও হেসে বলে, তুমি বাঁচো না অনেকদিন, কে আপত্তি করেছে? তাই বলে আমি আমার কাজ করবো না?

—করবি, আগে লেখাপড়া শেখ, পাসটাস কর, আমি মরি, তারপরে করবি।

ঠাকুমার কণ্ঠে ঈষৎ বিরক্তির সুর। কথাগুলো নন্দিনীর ভালো লাগলো না। কিন্তু কিছু বললে না।

কয়েকদিনের মধ্যেই নন্দিনী দেখতে পেলে, ঠাকুমার কর্মক্ষমতা যেন বেড়ে গেছে। ভোরে উঠে স্নান করে রান্না চড়ানোর অভ্যেস তাঁর চিরকালের। কিন্তু চা-টা নন্দিনীই তৈরী করতো। বাবাকে তাগাদা দিত। দেখা গেল ঠাকুমাই চা তৈরী করছেন। ছেলেকে নাতিকে নিজের হাতে দিয়ে আসছেন। নন্দিনীকেও। কাপড় না কেচে এ বাড়ীতে রান্নাঘরে মেয়েদের ঢোকবার রীতি নেই। নন্দিনীর কাপড় কাচতে কাচতে ঠাকুমার চা হয়ে যায়।

দু'একদিন দেখে নন্দিনী একটা বুদ্ধি বার করলো। ঠাকুমার ঘরেই সে শোয়। করলে কি, ঠাকুমা ওঠবার আগেই উঠতে লাগলো। উঠে উনান ধরিয়ে কাপড়টা কেচে নিলে। ঠাকুমা উঠে কাপড় কাচতে কাচতে সে চা তৈরী করে ফেললে।

ঠাকুমা চেয়ে চেয়ে দেখলেন, নন্দিনী মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে বাবার ঘরে দাদার ঘরে চা নিয়ে চলে গেল।

ঠাকুমা ঝঙ্কার দিলেন, এত ভোরে চা নিয়ে যাচ্ছিস, বিভূতি কি উঠেছে?

যেতে যেতে নন্দিনী বললে, উঠেছেন।

—শুধু উঠলেই তো হবে না। মুখ ধুয়েছে?

নন্দিনী সিঁড়ির কয়েক ধাপ উপরে উঠে গিয়েছে। সেখান থেকেই বললে, মুখ ধুতে আর কতক্ষণ লাগবে?

ঠাকুমার আর ভালো ক'রে গা ধোয়া কাপড় কাচা হ'ল না। কোন রকমে কাপড় কেচে, গায়ে দু-ঘটি জল ঢেলে উপরে এলেন। দেখলেন, বিভূতিবাবু বারান্দার ডেক চেয়ারটিতে বসে পরম পরিতৃপ্তির সঙ্গে চা খাচ্ছেন। সামনে রেলিঙে ঠেস দিয়ে নন্দিনী দাঁড়িয়ে।

দেখে ঠাকুমার আপাদমস্তক জ্বালা করে উঠলো। কিন্তু সে জ্বালা চেপে রেখে ছেলেকে বললেন, এত ভোরে তোর ঘুম ভেঙে গেছে? না, মুখপুড়ীটা ঘুম ভাঙিয়ে দিলো?

মুখপুড়ীর প্রসঙ্গে বিভূতিবাবু ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। বললেন, না মা। ঘুম তো আমার ভোরেই ভাঙ্গে। চায়ের অপেক্ষায় কুঁড়েমি ক'রে পড়ে থাকি।

ঠাকুমা বললেন, তাই বুঝি? আমাকে বলিসনি তো। বললে আরো ভোরেই তোকে চা করে দিতে পারি।

ঠাকুমা কাপড় ছাড়তে চলে গেলেন।

ঠাকুমা ঝঙ্কার দিলেন, এত ভোরে চা নিয়ে...

পরদিন ভোরে।

ঠাকুমা আর নন্দিনী এক ঘরে পাশাপাশি খাটে শুয়ে। তখন সবে প্রথম পাখিটি ডাক দিয়েছে। নন্দিনীর চট করে ঘুম ভেঙ্গে গেল। চোখ মেলে চেয়ে দেখলো, পাশের খাটে ঠাকুমা নেই। নন্দিনী তড়াক করে খাটের উপর উঠে বসলো। চোখ কচলে দেখলো, সত্যিই খাটে ঠাকুমা নেই।

কোথায় গেলেন? কোথায় যেতে পারেন? বাবার জন্য চা তৈরী করতে গেলেন?

বিচিত্র নয়।

নন্দিনী আর বিছানায় বসে থাকতে পারলো না। খাট থেকে নেমে দরজা খুলে বেরিয়ে আসতেই দেখে, সামনেই ঠাকুমা এক হাতে চায়ের পেয়ালা নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছেন!

নন্দিনী বেকুব।

ঠাকুমা বিজয়গর্বে তার পাশ দিয়ে গিয়ে বিভূতিবাবুর ঘরে ঢুকলেন।

—ও বিভূতি ওঠ। এখনও ঘুমোচ্ছিস? তোর জন্যে চা এনেছি।

চায়ের নামে বিভূতিবাবু বিছানায় উঠে বসলেন। হাত বাড়িয়ে পেয়ালাটা নিয়ে তাতে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, আ:।

বললেন, এত ভোরে চা আনলে যে?

ঠাকুমা বললেন, উনুনটা ধরালাম, ভাবলাম তোকে এক পেয়ালা চা করেই দিই। কেন, তুই এত ভোরে চা পছন্দ করিস না?

বিভূতিবাবু খুশীর সঙ্গে বললেন, পছন্দ করি না আবার! খুব পছন্দ করি। খুব ভোরেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তখন চায়ের পিপাসা লাগে। তখন থেকে এক পেয়ালা চায়ের জন্যে বিছানায় শুয়ে-শুয়ে এপাশ ওপাশ করি।

—তা বলিসনি তো কোনদিন?

—এইটুকুর জন্য তোমাদের কষ্ট দিতে ইচ্ছে করে না।

এইটেই বিভূতিবাবুর বৈশিষ্ট্য। কখনো নিজের জন্য কাউকে তিনি কষ্ট দিতে চান না। মা চা এনে দিলেন, তিনি খুশী হলেন। কিন্তু মাকে কোনদিন বলতে পারেননি, ঘুম ভেঙ্গে উঠে পাঁচটার মধ্যে চা খেতে আমার ভালো লাগে।

ঠাকুমা হেসে বললেন, জানা রইল। এখন থেকে রোজ এই সময় চা পাবি।

বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নন্দিনী সব শুনলে। কিন্তু করার কিছু নেই। আজকের যুদ্ধে তার হার হ'ল। কাল আবার দেখা যাবে। বজ্রগর্ভ মেঘের মতন নি:শব্দে দাঁড়িয়ে রইল।

ঠাকুমা বেরিয়ে আসতেই জিজ্ঞাসা করলে, দাদার জন্যে চা দিলে না?

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ঠাকুমা বললেন, তার তো এখন দুপুর রাত। তার জন্যে ভাবিস না, সে উঠলেই চা পাবে।

ঠাকুমা তরতর করে নেমে গেলেন।

নন্দিনীর গলার আওয়াজ পেয়ে বিভূতিবাবু ভিতর থেকে ডাকলেন, এত ভোরে তুই উঠে পড়েছিস, মা?

ঘরের মধ্যে এসে খাটের বাজু ধরে দাঁড়িয়ে নন্দিনী বললে, আমি তো রোজই ভোরে উঠি, বাবা।

—রোজই ভোরে উঠিস? আমি ভেবেছিলাম রাত্রে বুঝি ঘুম হয় না।

নন্দিনী ঈষৎ অভিমান ভরে বললে, কেন বাবা, কালও এই সময় তোমাকে চা করে দিলাম না?

বিভূতিবাবুর মনে পড়লো, বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, দিয়েছিলি বটে। তবে এত ভোরে নয়, আর একটু পরে। তাই না?

নন্দিনী বললে, আজ একটু বেশী ভোরে হয়নি বাবা? এর চেয়ে একটু পরেই তো ভালো।

বিভূতিবাবু হেসে বললেন, চায়ের কি সময় অসময় আছে রে? যখন দিবি তখনই ভালো।

নন্দিনী জিজ্ঞাসা করলে, তোমার চায়ে চিনি বেশী হয়নি তো?

সবিস্ময়ে বিভূতিবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, চিনি বেশী হবে কেন?

নন্দিনী হেসে বললে, ঠাকুমা চিনি একটু বেশী দেন।

বিভূতিবাবু হো-হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, চিনি বেশী দেন না রে, চিনি বেশী লাগে।

—তার মানে?

বিভূতিবাবু বললেন, তার মানে বুঝলি না? মা ঠাকুমার হাতে মধু আছে। তাই ওঁরা চা করলেই মিষ্টি বেশী লাগে।

বলে বিভূতিবাবু আবার হো হো করে হেসে উঠলেন।

যাকে বলে অঘোষিত যুদ্ধ, তাই আরম্ভ হ'ল ঠাকুমা ও নন্দিনীর মধ্যে। শুধু চা নিয়েই নয়, সর্বক্ষেত্রেই। বিভূতিবাবু অফিস যান ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাবার আগেই। তাঁর অফিসের পোশাক ঠিক করে রাখার কাজটা ঠাকুমা বুড়ো মানুষ, পারেন না। এ কাজটা অনেক দিন থেকেই নন্দিনীর হাতে এসে গেছে। ঠাকুমা আপত্তি করেননি। বিভূতিবাবুর (এবং অন্য সকলেরও) ঘর গোছানোর কাজটাও ঠাকুমার ঠিক আসে না। এটাও নন্দিনীর হাতে চলে এসেছে। কিন্তু রান্নাঘরের কাজ ঠাকুমা ছাড়তে প্রস্তুত নন। সেইখানেই যুদ্ধটা জোর চলছে।

অঘোষিত যুদ্ধ। তার মানে যুদ্ধ কেউ ঘোষণা করেনি, যুদ্ধ ঘোষণার দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না। অথচ যুদ্ধ চলছে।

আবার একে ঠাণ্ডা লড়াইও বলতে পারো। কোন কোন ক্ষেত্রে ঠাণ্ডা লড়াই-ই চলছে। লড়াই নয়, লড়াইয়ের প্যাঁচ কষাকষি।

যেমন রান্না ঘরের দুর্গটা নন্দিনী আক্রমণ করতে চায়, কিন্তু সমস্ত রান্নাঘরটা দখল করতে চায় না। শুধু সকালের চা, বিকেলের চা-জলখাবার এইটুকু সে দখল করতে চায়। রান্নার উনানটা দখল করতে চায় না। সে সামর্থ্যও নেই, সময়ও নেই।

সকালের চা এবং জলখাবার কদিন তার হাতে এসেছিল। টের পেয়ে ঠাকুমা তা ফের হস্তগত করে নিলেন।

অবশ্য সকালের দিকের জয় পরাজয়ের চূড়ান্ত মীমাংসা এখনও হয়নি। মাঝে মাঝে ফাঁক তালে ঠাকুমা উঠবার আগেই নন্দিনী উঠে পড়ে। এবং চা করে বাবাকে দিয়ে আসে। রোজ নয়, মাঝে মাঝে। ভোরে ওঠার প্রতিযোগিতায় নন্দিনী ঠাকুমার সঙ্গে পেরে ওঠে না। বেশীর ভাগ দিন ঠাকুমাই আগে ওঠেন।

জেদের আতিশয্যে একেকদিন বিভ্রাটও ঘটে। নন্দিনী হয় তো উঠে পড়লো, তখন বেশ কিছুটা অন্ধকার দেখা যাচ্ছে। কাক কোকিলও ডাকেনি। কিন্তু কাক কোকিল ডাকার জন্য অপেক্ষা করতে গেলে ঠাকুমা উঠে পড়তে পারেন। উঠে পড়লে আর তাকে কেটলিতে হাত দিতে দেবেন না। তখন উনান ধরাবারও সময় হয়নি। নন্দিনী ষ্টোভ জ্বেলেই কেটলি বসিয়ে দিলো।

প্রতিপক্ষকে অতর্কিত আক্রমণের একটা আনন্দ আছে। সেই আনন্দে নাচতে নাচতে নন্দিনী চা তৈরী করে ফেললো, এক কাপ বাবার জন্য, এক কাপ নিজের জন্য। জয়ের উত্তেজনায় তার মুখ আরক্ত।

ঘড়িতে তিনটে বাজল।

চা নিয়ে ওপরে উঠতে গিয়ে নন্দিনী এক মুহূর্ত থমকে গেল। মোটে তিনটে? তাহলে এখনও রাত আছে বলতে হবে, এত রাত্রে চা দেওয়া কি ঠিক হবে? বাবা হয়তো ঘুমুচ্ছেন। কিন্তু তৈরী চা নষ্ট করা ঠিক হবে কি?

নন্দিনী বাবার ঘরে গেল। নিদ্রিত বাবাকে ডেকে তুললো।

বাবা অবাক! কিরে?

—চা।

বিভূতিবাবু জানলার বাইরে চাইলেন। বললেন, এখনও অন্ধকার রয়েছে যে রে?

নন্দিনী বললে, তা হোক। রাত পোহালে আমার সাপ্তাহিক পরীক্ষা। স্থির করেছিলাম ভোরে উঠে পড়বো। উঠলাম ঠিক সময়েই। ভাবলাম একটু চা খেলে ভালো হয়। চা যখন করতেই হ'ল তখন তোমার জন্যও এক কাপ করলাম।

হাত বাড়িয়ে পেয়ালাটা নিয়ে বিভূতিবাবু চায়ে চুমুক দিলেন।

নন্দিনী জিজ্ঞাসা করলে, ভালো লাগছে না বাবা?

বিভূতিবাবু উপর্যুপরি কটা চুমুক দিয়ে বললেন, চা আবার ভালো লাগে না রে? খুব ভালো লাগছে।

নন্দিনীর ভয় আছে, ঠাকুমা উঠে পড়তে পারেন। সে আর দাঁড়ালে না। পড়বার ঘরে গিয়ে একটা বই নিয়ে সামনে খুলে রেখে তারিয়ে-তারিয়ে চা খেতে লাগলো।

কান খাড়া রয়েছে। ঠাকুমা কখন নামেন খেয়াল রাখা চাই।

হ্যাঁ, ঠাকুমা নামছেন থুপথুপ করে।

নন্দিনী নি:শব্দে বসে রইল।

উনান ধরানো হ'ল। তাও নন্দিনী টের পেল। এই ফাঁকে ঠাকুমা কাপড় কাচা গা ধোয়া সেরে নেবেন। খানিক পরে পেয়ালার ঠুং ঠাং শব্দ পাওয়া গেল। ঠাকুমা চা ঢালছেন।

কয়েক মিনিট কেটে গেল। ঠাকুমা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছেন।

নন্দিনী মনে মনে হাসল, কৌতূহলও হ'ল। ব্যাপারটা দেখা দরকার। পা টিপে টিপে ঠাকুমার পিছু-পিছু উপরে উঠলো।

ঠাকুমা বাবার ঘরে গেলেন। সামনে চায়ের পেয়ালা! পেয়ালাটা কি কাল থেকে পড়ে আছে?

ঠাকুমা কয়েক পা এগিয়ে গেলেন।

বিভূতিবাবু জেগেই ছিলেন। কড়িকাঠের দিকে চেয়ে কি ভাবছিলেন। পায়ের শব্দে চমকে তাকিয়ে দেখেন, মা চা নিয়ে আসছেন।

—আবার চা! তোমাদের ব্যাপার কি বলো তো? রাতদুপুরে নন্দিনী এসে এক পেয়ালা চা খাইয়ে গেল। আবার তুমি এলে আর এক পেয়ালা চা নিয়ে!

ঠাকুমা অপ্রস্তুত।

—মুখপুড়ী মেয়েটা রাতদুপুরে উঠে তোকে চা খাইয়ে গেছে? ওর কাণ্ডই অমনি। তা হলে আর চা খাবি না?

আগ্রহে হাত বাড়িয়ে বিভূতিবাবু বললেন, খাব না কেন? চা কখনও আমি আপত্তি করি? শুনে রাখো, যেদিন আমি চা খেতে আপত্তি করবো, জানবে আমার শরীর ভালো নেই।

বাইরে থেকে নন্দিনী কথাটা শুনলে। ভাবলে, এ যুদ্ধের একটা মোটামুটি ফয়সালা হ'ল। সকালে বাবা দুপেয়ালা চা খাবেন তা যেই আগে দিন আর যেই পরে দিন। কিন্তু পরের দিন তাতেও বিভ্রাট বাধল। নন্দিনী ভোরে উঠবার গা করলো না। প্রথম পেয়ালা চা ঠাকুমা দিলেন, তার পরে নন্দিনী যেই দ্বিতীয় পেয়ালা চা তৈরী করতে যাবে, ঠাকুমা আপত্তি তুলে তাকে রান্নাঘর থেকে বার করে দিলেন।

বসন্ত তার পড়ার টেবিলে বসে একখানা নভেল পড়ছিলো। ঠাকুমার কাছ থেকে তাড়া খেয়ে নন্দিনী সেখানে এসে দাঁড়ালো।

নন্দিনীর ছলছল চোখের দিকে চেয়ে বসন্তর নভেলের নেশা কেটে গেল। বললে, কি হয়েছে রে নন্দিনী? তোর চোখ এমন ছলছল করছে কেন?

সহানুভূতির ছোঁয়া পেয়ে নন্দিনীর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ার কথা। কিন্তু ভিতরে তার নাকি ক্রোধের আগুন জ্বলছে,—ঠাকুমার বিরুদ্ধে ক্রোধ।

চোখ মুছে বললে, ঠাকুমার সঙ্গে একদিন আমার হয়ে যাবে দাদা।

আশ্চর্য হয়ে বসন্ত জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়ে যাবে রে?

—ঝগড়া।

—সেকি রে?

—হ্যাঁ। বাবার আমি সেবা করি ঠাকুমা তা মোটে সহ্য করতে পারেন না।

বসন্ত হাঁ করে বোকার মত তার মুখের দিকে চেয়ে রইল। ওর কথার এক বর্ণও সে বুঝতে পারছিল না। নন্দিনী মাথা দুলিয়ে বলে চলল, তুমি না হয় বাবার মা। আমিও তো বাবার মেয়ে। না কি বল?

...ঠাকুমার সঙ্গে একদিন আমার হয়ে যাবে দাদা।

—নিশ্চয়।

—আমারও তো বাবার ওপর অধিকার আছে। বল ভাই।

—নিশ্চয়।

—তুমি আমাকে বাবার জন্য চা করতে দেবে না, খাবার করতে দেবে না, তবে আমি করবোটা কি? বাবার কাছে বসে একটু হাসি-গল্প করলে কোথা থেকে এসে একটা না একটা ছুতো করে আমাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেবে।

বসন্ত খুব উৎসুক হয়ে উঠলো। হাতের নভেলখানা টেবিলের ওপর বন্ধ করে রেখে জিজ্ঞাসা করলে, তুই যে নভেলের মত করে বলতে আরম্ভ করলি। রীতিমত ঘোরালো প্ট! বেশ ভালো করে গুছিয়ে বল দিকি শুনি। ঠাকুমা তোমায় হিংসা করেন?

—দস্তুর মত।

—কেন?

—তা কি করে জানবো?

—কিছু অনুমান করতে পারো না?

—না।

—তা হ'লে? বসন্ত চিন্তা করতে লাগলো ঠাকুমা যদি নন্দিনীকে হিংসাই করেন, তো কেন করেন? এর ভেতরে কি কারণ থাকতে পারে? ষাট বছরের একজন বৃদ্ধা মহিলা তেরো বছরের বালিকাকে কি কারণে হিংসা করবে?

বসন্তর বয়স ষোলোর কাছাকাছি। ক্লাস নাইনে পড়ে। কিন্তু পাঠ্য পুস্তকের চেয়ে নভেলের উপরই তার অনুরাগ বেশী। এই অল্প বয়সে সে যে কত নভেল পড়েছে (তার মধ্যে ডিটেকটিভ উপন্যাসই বেশী) তার ইয়ত্তা নেই। ক্ষুধা-তৃষ্ণার সময় ছাড়া তার মন সব সময় কল্পনারাজ্যে ঘুরে বেড়ায়। সে স্মরণ করতে চেষ্টা করলে, দুটি অসমবয়সী নারীর মধ্যে হিংসার সম্পর্ক কোন বইয়েতে পড়েছে কিনা।

হতাশভাবে বসন্ত বললে, না:, নভেল আমি পড়েছি, কিন্তু এ রকম ঘটনা কোন নভেলে পড়িনি।

বলা শেষ না হতেই বিভূতিবাবু ঘরে এসে উপস্থিত হলেন। সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি পড়ল নভেলটির ওপর।

বললেন, এখন নভেল পড়া হচ্ছে? পড়াশুনা নেই! এবার হাফইয়ার্লীর রেজাল্ট বেরিয়েছে?

বেরিয়েছে। বসন্ত ফেল করেছে। সেইটা নিয়ে খুব মানসিক উদ্বেগের মধ্যে আছে। কিন্তু সে কথা বাবার কাছে চেপে গেল।

বললে, না।

নভেলটা হাতে করে নিয়ে বিভূতিবাবু বেরিয়ে গেলেন। নন্দিনী বিস্ময়ের সঙ্গে বললে, তোমাদের হাফইয়ার্লীর রেজাল্ট এখনও বেরোয়নি?

ফিক করে হেসে বসন্ত বললে, কবে বেরিয়ে গেছে! বাবার সই হয়ে যথারীতি জমা হয়ে গেছে।

—তবে যে বললে রেজাল্ট বেরোয়নি?

—তা কি বলবো? নভেল হাতে স্বীকার করবো ফেল করেছি? তাহলে আজ সকালে বাবার হাতে রক্ষে ছিল!

—তাহলে বাবার সই হয়ে স্কুলে জমা পড়লো কি করে?

হেসে বসন্ত বললে, আমি তো বাবার উত্তরাধিকারী। তার হয়ে সই করবার আমার অধিকার নেই?

ক্রুদ্ধ কণ্ঠে নন্দিনী বললে, ছি: দাদা, তুমি বাবার সই জাল করেছো? বেপয়োয়া ভাবে বসন্ত বললে, করেছি। পড়াশুনা আমার ভালো লাগে না। করে কিচ্ছু হয় না। দেখিসনি, এই পাড়াতেই কতগণ্ডা বি.এ. এম.এ. পাশ করে ফ্যা ফ্যা করে বেড়াচ্ছে?

—তবে এত ছেলে পড়ছে কেন?

—পড়ছে, কারণ না পড়েই বা করবে কি? তবু তো বাবার হোটেলে নিশ্চিন্তে দুবেলা দুটো জুটছে।

তিন

বিকেলে অফিস থেকে বিভূতিবাবু ফিরলেন জ্বর গায়ে। মুখ থমথম করছে। চোখ আরক্ত। দেখেই নন্দিনীর সন্দেহ হ'ল।

জিজ্ঞাসা করলে, বাবা, তোমার শরীর কি ভালো নেই?

সাড়া না দিয়ে বিভূতিবাবু ক্লান্তভাবে বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে পড়লেন। নন্দিনী উদ্বিগ্নভাবে তার প্রশ্নের পুনরুক্তি করতে বিভূতিবাবু স্বীকার করলেন, দুপুর থেকেই শরীরটা ভালো বোধ হচ্ছে না।

নন্দিনী হাঁটু গেড়ে বসে বাবার জুতো মোজা খুলে দিলে। আলনা থেকে একখানা কাপড় এনে দিয়ে বললে, অফিসের পোশাক ছেড়ে ফেলে কাপড়টা পর। আমি তোমার চা আনছি। খেয়ে বরং বিছানায় শুয়ে পড়ো।

ঠাকুমা তখন বাথরুমে। শরীর খারাপ বলে অফিস থেকে আজ বিভূতিবাবু একটু সকাল-সকাল ফিরেছেন। ঠাকুমা তৈরী ছিলেন না। তাই ছেলের আসা টের পাননি। এই সুযোগে নন্দিনী চা তৈরী করতে গেল। খাবারটা তো করাই ছিল। ঠাকুমা বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসবার আগেই নন্দিনী চা-খাবার নিয়ে উপরে গেল। এসে দেখলে, বাবার অফিসের পোশাক ছাড়া হয়নি। ক্লান্তভাবেই চোখ বন্ধ করে তিনি ডেক চেয়ারে বসে আছেন। নন্দিনীর পায়ের শব্দে চোখ মেলে চাইলেন।

পাশের টিপয়ে চা-খাবার রেখে নন্দিনী বললে, তুমি অফিসের পোশাক এখনও ছাড়োনি? আচ্ছা, চা-খাবার আগে খেয়ে নাও, তারপরে পোশাক ছেড়ে শুয়ে পড়বে। শরীর কি খুব খারাপ করছে?

নিজের শরীর সম্বন্ধে বাড়ীশুদ্ধ সবাইকে বিব্রত করতে বিভূতিবাবু কখনই চান না। আর বাড়ীতে আছেই বা কে? বুড়ী মা, আর বালিকা কন্যা। বসন্ত বাড়ীতে থাকেই তো কম।

সুতরাং তিনি নন্দিনীর শেষ প্রশ্নের জবাব দিলেন না। শুধু বললেন, খাবারটা নিয়ে যা। কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। আমি শুধু চাটুকু খেয়ে শুয়ে পড়বো।

তাই করলেন।

নন্দিনী তাঁকে একখানা চাদর ঢাকা দিলে। কপালের উত্তাপ পরীক্ষা করলে। বললে, গা-যে পুড়ে যাচ্ছে! থার্মোমিটারটা একবার দিই।

জ্বর বেশীই বটে। ১০৩০ ডিগ্রী।

বিচলিতভাবে নন্দিনী বললে, ডাক্তারকে খবর দেবো বাবা?

বিভূতিবাবু বললেন, কিছুই দরকার নেই, ইনফ্লুয়েঞ্জাটা আজকাল চারিদিকেই হচ্ছে। বোধ হয় তাই। কাল সকালেই ছেড়ে যাবে।

এমন সময় ঠাকুমা এলেন। বারান্দাতে ছেলের জুতোমোজা দেখেই তিনি বুঝলেন, বিভূতি এসেছে। টি-পয়ের উপর চায়ের শূন্য পেয়ালা এবং অভুক্ত জলখাবার দেখে তিনি বিস্মিত হলেন। তাঁকে না জানিয়ে চা-জলখাবার দেওয়াটা যে তাঁর উপর নন্দিনীর টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা, তা বুঝতে বিলম্ব হ'ল না। কিন্তু বিভূতিবাবু জলখাবার খাননি কেন?

ঘরের মধ্যে উঁকি দিতেই দেখতে পেলেন বিভূতি খাটের উপর চাদর ঢাকা দিয়ে শুয়ে। কাঁদকাঁদভাবে নন্দিনী এসে তাঁকে ফিসফিস করে বললে, বাবা অফিস থেকে জ্বর নিয়ে ফিরেছেন ঠাকুমা।

—জ্বর!

ঠাকুমার মুখ শুকিয়ে গেল। বুকের ভিতর কি যেন ধক করে একটা ধাক্কা দিল।

নন্দিনী বললে, খুব জ্বর ঠাকুমা। থার্মোমিটার দেওয়া হ'ল ১০৩০ ডিগ্রী। আমি ডাক্তার ডাকার কথা বলছিলাম, বাবা নিষেধ করেছেন।

তার কণ্ঠে অনুনয়ের সুর। সে তেজ নেই। বুঝেছে, ডাক্তার ডাকার সম্বন্ধে কেউ যদি বাবাকে রাজী করাতে পারেন তো সে ঠাকুমা।

ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে ঠাকুমা ঘরের ভিতরে এলেন; বললেন, ও নিষেধ করলেই হবে? জ্বর বেশী হলে ডাক্তার ডাকতে হবে না? হ্যাঁরে বিভূতি, কখন থেকে জ্বরটা হ'ল?

কাঁদকাঁদভাবে নন্দিনী এসে তাঁকে ফিসফিস করে বললে...

বিভূতিবাবু ক্লান্তকণ্ঠে বললেন, টিফিনের পর থেকেই শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে। তারপরেও কিছুক্ষণ কাজ করেছি। তিনটের সময় আর পারলাম না। মাথার শিরা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে।

মা বললেন, বেশ করেছিস। তা, ডাক্তার ডাকতে নিষেধ করেছিস কেন?

ক্লান্তকণ্ঠে বিভূতিবাবু বললেন, ও কিছুই নয় মা। ইনফ্লয়েঞ্জা, কাল সকালেই সেরে যাবে।

মা বললেন, তাই যেন সারে। তাই বলে ডাক্তার ডাকতে হবে না?

নন্দিনীর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, বসন্ত কোথায় রে? তাকে বল এখুনি গিয়ে নন্দ ডাক্তারকে খবর দিতে।

বিভূতিবাবু কি বলতে গেলেন, কিন্তু সে কথা ঠাকুমা শুনলেন না।

নাম যাই হোক রোগটা পাঁচদিন ধরে বিভূতিবাবুকে মাথা তুলতে দিল না। একদিন রাত্রে তো ভুল বকতে লাগলেন। ঠাকুমা, নন্দিনী, বসন্ত খুব ভয় পেয়ে গেল। ডাক্তারের আশ্বাস সত্বেও জ্বর না ছাড়া পর্যন্ত কারো ভয় গেল না। খাওয়াদাওয়া নাম মাত্র; ঠাকুমা কোনরকমে দুটো ভাতে-ভাত ফুটিয়ে দেন। সেই সময়টুকু ছাড়া আর সমস্ত সময় তিনি ছেলের বিছানার পাশে। তেমনি অবস্থা বসন্তর, তেমনি নন্দিনীর।

ঠাকুমার সঙ্গে নন্দিনীর যে যুদ্ধ চলছিল এ ক'দিন, তা ধামাচাপা ছিল। প্রত্যেক মুহূর্তে ঠাকুমার নন্দিনীকে দরকার হচ্ছিল, নন্দিনীর ঠাকুমাকে। আর এমন যে আড্ডাবাজ বসন্ত, সেও চব্বিশ ঘণ্টা বাড়িতেই আছে।

দু:খে অনেক সময় ভাঙ্গা জিনিস জোড়া লাগে। বিভূতিবাবুর অসুখে যে দুশ্চিন্তা ঠাকুমার, সেই দুশ্চিন্তা নন্দিনীর, সেই দুশ্চিন্তা বসন্তর। বিভূতিবাবুর অসুখে অন্তত কিছুদিনের জন্য ওদের পরস্পর ভাব হয়ে গিয়েছিল।

অসুখটা সত্যই ভয়ের কিছু ছিল না। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই বিভূতিবাবু সুস্থ হয়ে উঠলেন। আর কয়েকদিন পরেই অফিসের কাজেও যোগ দিলেন।

প্রথম যেদিন বিভূতিবাবু অফিসে গেলেন, সকলের মনেই চিন্তা, যে রকম দুর্বল হয়ে পড়েছেন তাতে অফিসে কেমন থাকবেন কে জানে! মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া বিচিত্র নয়। চাপরাসীটাকে বারবার বলে দেওয়া হয়েছে সব সময় বাবুর কাছাকাছি থাকতে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠবার-নামবার সময় সে যেন বাবুর হাতে-কাছেই থাকে। কিন্তু তাতেও সোয়াস্তি নেই। দুপুরে আহারাদির পর মাদুরখানি বিছিয়ে ঠাকুমা শোবার চেষ্টা করলেন। দুপুরে একটু নিদ্রা যাওয়া তাঁর চিরকালের অভ্যেস।

কিন্তু নিদ্রা কি আসে। একবার শোন, একবার উঠে বসেন, একবার বারান্দায় এসে রাস্তার দিকে চান, বিভূতিবাবু ফিরছেন কিনা।

কি একটা পর্ব উপলক্ষে বসন্ত ও নন্দিনী দুজনেরই স্কুল দুটোয় ছুটি হয়ে গেল। দুজনেই হন্তদন্ত হয়ে বাড়ী ফিরেছে, বাবা ফিরেছেন কিনা, তাঁর কোনো খবর পাওয়া গেছে কিনা।

—না। সেই তো ভাবছি রে! একবার ঘর একবার বার করছি। একটা কথা কইবার লোক নেই। তোরা এলি, বাঁচলাম।

তিনজনে একসঙ্গে ভাবতে বসল।

সকলেরই এক প্রশ্ন, তুমি কেমন আছ? কি করে তোমার খবর পাওয়া যায়? আজ অফিস না যেতে দিলেই ভালো হত। আর একটু সুস্থ হয়ে কাজে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বিভূতিবাবু যা অফিস পাগল লোক, একটা দিন কামাই করা তাঁর ধাতে সয় না। এক সঙ্গে দশদিন কামাই ইতিপূর্বে তিনি কখনও করেছেন বলে কারো মনে পড়ে না। ছোট-খাটো অসুখ তিনি গ্রাহ্যই করেন না।

ঠাকুমা বললেন, এক একজন লোক থাকে, অফিস না গেলে যাদের ভাত হজম হয় না। আমার ভাসুর বলতেন, রবিবারটা যে কেন এসেছিল, কে জানে।

বসন্তর খেলা ছিল। সে আর ভাবতেও পারলে না, অপেক্ষাও করতে পারলে না। আবার খেয়ে বেরিয়ে পড়ল।

নন্দিনী জিজ্ঞাসা করলে, বাবা এসে কি খাবেন?

ঠাকুমা অনেক কথা ভেবেছেন, শুধু এ কথাটাই ভাবেন নি। ঔষুধ পথ্যের হিসাব তার মাথায় ঢোকে না।

তিনি বললেন, বিভূতি এসে যা বলবে, তাই করে দেব।

—ততক্ষণ তিনি অপেক্ষা করবেন?

—তাছাড়া উপায় কি?

নন্দিনী বললে, জল গরম করে ফ্লাক্সে রেখে দাও। বাবা এলে তাকে হরলিক্স করে দিও।

ঠাকুমা সাগ্রহে বললেন, সেই ভালো কথা, হিটারে একটু জল গরম কর না। ওর আসবারও সময় হয়ে এসেছে।

অনেকদিন পরে এই প্রথম ঠাকুমা বিভূতিবাবুর পথ্যের ভার নন্দিনীর ওপর দিলেন।

চার

বিভূতিবাবু সুস্থ হয়ে উঠলেন। শরীরের দুর্বলতা ও গ্লাানি কেটে গেল। ঠাকুমা-নন্দিনীর সম্পর্ক আবার যে-কে সেই দাঁড়াল। ঠাকুমা ছেলের ভার আবার সম্পূর্ণ নিজের হাতে নিলেন।

তাঁর ব্যাপারটা হয়েছে এই। শিশুকালে বিভূতিবাবু পিতৃহীন হয়েছেন। তখন থেকেই তাঁর সমস্ত ভার মায়ের ওপর পড়েছিল। এই যে একমাত্র সন্তানের উপর একচ্ছত্র অধিকার, এ ঠাকুমা কিছুতেই ছাড়তে রাজী নন। অত্যন্ত কঠিন এবং সতর্ক দৃষ্টিতে এই অধিকার তিনি রক্ষা করে এসেছেন। নন্দিনীর মাকেও তিনি এই অধিকারে হাত দিতে দেননি। বিয়ের পর নন্দিনীর মা মাত্র বছর পাঁচেক বেঁচে ছিলেন। স্বভাবতই তিনি নিরীহ, শান্তিপ্রিয় এবং কিছুটা অলস প্রকৃতিরও ছিলেন। শাশুড়ীকে তিনি বাঘের মত ভয় করতেন। সুতরাং কোন গোলমাল হয়নি। গোলমাল হচ্ছে নন্দিনীকে নিয়ে।

নন্দিনী কার মত হয়েছে কে জানে! ওর বাবা-মা দুজনেই শান্ত প্রকৃতির। কিন্তু ওরা দুটি ভাইবোনে সৃষ্টিছাড়া হয়েছে।

ঠাকুমা মাঝে-মাঝে ঝংকার দেন, তুই এমন হলি কেন বলতো? তোর মা সাত চড়ে রা দিত না। তোর বাবা মাটির মানুষ। তুই এমন দক্কোসা হলি কেন?

নন্দিনী হেসে জবাব দেয়, আমিও তাই ভাবি ঠাকুমা, এমন হলাম কেন। আমি বোধহয় তোমার মত হয়েছি।

ঠাকুমা রাগতে গিয়েও হেসে ফেললেন। বললেন, আমি কি তোর মতন দক্কোসা?

—ওরে বাবা! আমি তো তোমার কাছে কিছুই নই। বাঘিনী যেমন তার বাচ্ছাকে পাহারা দিয়ে বেড়ায়, তোমার বুড়ো খোকাটিকেও তেমনি তুমি দিন-রাত্রি পাহারা দিচ্ছ। কেউ হাত বাড়িয়ে আদর করতে গেলেও তুমি ফোঁস করে ওঠ!

ঠাকুমা স্বীকার করলেন, তা হয়ত উঠি। আমার খোকা আমারই। অন্যের তাকে হাত বাড়িয়ে আদর করতে যাওয়ারই বা দরকার কি?

স্পষ্ট করে এরকম প্রসঙ্গ আর কখনও ওঠে নি। যখন উঠেছে, তখন এর একটা হেস্তনেস্ত করবার জন্য নন্দিনী কোমর বাঁধল। বললে, তোমার খোকা তোমারই থাক, কিন্তু আমাদেরও তো বাবা। বাবার ওপর আমাদের কোন অধিকার থাকবে না?

ঠাকুমা বললেন, আগে আমার ছেলে, তার পরে তোদের বাবা। আগে আমি, তার পরে তোরা। আমি যতক্ষণ বেঁচে আছি ততক্ষণ আমার অধিকারে কেউ তোমরা হাত দিতে এস না।

নন্দিনী রেগে বললে, তুমি কবে মরবে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে?

—হ্যাঁ, হবে।

নন্দিনী বললে, না, হবে না। আজ বিকেলে আমি বাবার জন্যে কাটলেট করবো।

—মাংসের?

—হ্যাঁ।

—না। জান না, মাংস বিভূতির সহ্য হয় না?

—ওটা তোমার মনগড়া কথা। মাংসের কাটলেট কোনদিন দিয়ে দেখেছ?

ঠাকুমা জেদের সঙ্গে বললেন, আমি জানি, তা দেখব কি।

নন্দিনীও জেদের সঙ্গে বলে, তুমি জান না। আমি জানি, বাবা রেষ্টুরেন্টে গিয়ে মাংসের কাটলেট খেয়ে আসেন।

ঠাকুমা ঈষৎ দমে গেলেন। বললেন, কি করে জানলি?

—কত দিন দাদাভাই দেখেছে। আমিও মুখে গন্ধ পেয়েছি।

দুজনের কথাই সত্যি। বিধবা মায়ের হেঁসেলে মাংস রান্নার অসুবিধা ছিল। সেজন্যে মাছ-মাংস ক্বচিৎ কখনও রান্না হত। মায়ের অসুবিধা বুঝে ছেলে কখনও মাংসের জন্যে বায়না করতেন না। বরং নিরামিষেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন।

তাই বলে আমিষে তাঁর রুচি ছিল না, তাও নয়। বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে হোটেলে গিয়ে সাধ মেটাতেন। মা জানতে পারতেন না। একদিন জানতে পারলেন। মাংসটা খারাপ থাকার ফলেই হোক অথবা অন্য যে কোন কারণেই হোক বিভূতিবাবু অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বিষক্রিয়ার মতো। মা বুঝিয়ে দিলেন, বিভূতিবাবুও বুঝলেন, মাংস তাঁর সহ্য হয় না। সেই থেকে অনেকদিন মাংস তিনি খাননি। খাননি ভয়েও বটে, পয়সার অভাবেও বটে।

নন্দিনীও ঠিকই বলেছে, বাবা হোটেলে চপকাটলেট খান। অর্থাৎ চাকরি পাওয়ার পর থেকে হাতে পয়সা আসায় এবং বন্ধু-বান্ধবের চাপে পড়ে তিনি আবার হোটেলে খাওয়া ধরেছেন। এ খবরটা ঠাকুমা জানতেন না।

কিন্তু যখন শুনলেন, তখন আর নন্দিনীর প্রস্তাবে আপত্তি করলেন না। বাড়িতে চপ-কাটলেটও আর রোজ হবে না। সপ্তাহে একদিনও হবে কিনা সন্দেহ। নন্দিনীর শখ হয়েছে, করুক। দুদিন পরে তো শ্বশুর বাড়ী যাবে। এসব তৈরী করা শেখাও তো দরকার।

কিন্তু ঐ পর্যন্ত।

নিরামিষ খাবারই প্রত্যহ হত,—সিঙাড়া, কচুরি, নিমকি ইত্যাদি। সে সমস্ত ঠাকুমাই করতেন। নন্দিনীকে হস্তক্ষেপ করতে দিতেন না। সে অদূরে বসে খাবার তৈরী করা দেখত, শিখত। মাঝে মাঝে ঠাকুমাকে অনুনয় করত, তাকে খাবার করতে দেওয়া হোক। এক একদিন ঠাকুমা দিতেনও তাকে শেখাবার জন্য। কিন্তু বেশীরভাগ দিনই দিতেন না। নিজের অধিকার সম্বন্ধে এই একমাত্র সন্তানের বিধবা জননী অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। এমনকি, ছেলের খাবারও তিনি নন্দিনীকে নিয়ে যেতে দিতেন না। নিজে নিয়ে যেতেন। সামনে দাঁড়িয়ে থেকে চেপে-চুপে খাওয়াতেন। নইলে তৃপ্তি পেতেন না।

বিভূতিবাবু সিঙ্গাড়ায় একটা কামড় দিতেই...

একদিন বিভূতিবাবু খাচ্ছেন। সামনে মা দাঁড়িয়ে। পাশে নন্দিনী একটা টুলের উপর বসে। বিভূতিবাবু সিঙাড়ায় একটা কামড় দিতেই নন্দিনী হাঁ হাঁ করে উঠল।

বিভূতিবাবুর হাত থেকে সিঙাড়া পড়ে গেল। ঠাকুমা এবং বিভূতিবাবু দুজনেই অবাক।

নন্দিনী মাটি থেকে সিঙাড়াটা কুড়িয়ে তার থেকে একটা চুল বের করলে। পাকা চুল, ঠাকুমার মাথারই নিশ্চয়ই।

ঠাকুমা অপ্রস্তুত। ওই চুল যদি বিভূতিবাবুর পেটে যেত তাহলে কি হত! ঠাকুমা শিউরে উঠলেন। শিউরে উঠবার মত কিছুই নয়। সব বাড়ীতেই মাঝে মাঝে খাবারের সঙ্গে এক আধটা চুল পাওয়া যায়। তাতে কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হয় না।

কিন্তু অন্য বাড়ীর কথা স্বতন্ত্র। তারা হয়ত গ্রাহ্যই করে না। তাদের পেটও হয়ত মজবুত। এক-আধটা চুলে কিছুই করতে পারে না। কিন্তু বিভূতি তো তা নয়। তাঁর পেট দুর্বল। শিশুর মতো দুর্বল। সত্য কথা বলতে কি, এত বয়সেও তিনি মায়ের কাছে শিশু হয়ে রয়েছেন।

তাই মা শিউরে উঠলেন। তাঁর চোখ ছলছল করে উঠল।

বললেন, এমন তো হয় না। বোধহয় চোখে কম দেখছি রে। চোখের আর দোষ কি, বয়স তো কম হল না।

বিভূতিবাবু মাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, ওর জন্যে তুমি অমন করছো কেন? এমন তো কত হয়।

লজ্জিত ভাবে ঠাকুমা বললেন, কিন্তু নন্দিনী যদি না দেখত, তাহলে কি হত?

বিভূতিবাবু হা হা করে হেসে উঠলেন, কি আবার হত? এমন তো মাঝে মাঝেই হয়। নন্দিনী না দেখলে আমার চোখে পড়ত। আমি ফেলে দিতাম।

ঠাকুমা বললেন, এমন মাঝে মাঝেই হয়?

বিভূতিবাবু বললেন, হবে না কেন? চুল উড়ে কখন খাবারে পড়বে, কেউ খেয়াল রাখতে পারে?

ঠাকুমা যেন আপন মনেই বলতে লাগলেন, আগে হত না, এখন হচ্ছে। চোখের ওপর আর ভরসা করা যাচ্ছে না।

চিন্তিত মুখে তিনি নীচে চলে গেলেন।

বিভূতিবাবু মেয়েকে ধমক দিলেন, একগাছি চুল নিয়ে তুই এমন করলি, মা অপ্রস্তুত।

লজ্জিত ভাবে নন্দিনী বললে, তুমি কামড় দিলে যে! ভাবলাম, তোমার পেটে চলে যাবে।

বিভূতিবাবু বললেন, তাই যায়! দেখ, চুল সহজে পেটে যায় না। তুই এমনভাবেই বললি, মা কি রকম লজ্জা পেলেন দেখ ত? এর চেয়ে চুলটা পেটে যাওয়া ভালো ছিল।

নন্দিনী চুপ করে রইল।

বিভূতিবাবু বলতে লাগলেন, আমার মায়ের কথা ভাব। অল্প বয়সে বিধবা হয়েছেন, আমি ছাড়া তাঁর আর কেউ নেই, কিছু নেই। আমিই তাঁর সমস্ত পৃথিবী।

নন্দিনীও আর থাকতে পারলো না। বললে, তুমি ছাড়া আমাদেরই বা কে আছে বল?

বিভূতিবাবু বললেন, আজ নেই, কাল হবে। শ্বশুর শাশুড়ী, দেওর-ননদ, স্বামী-পুত্র—একটা সম্পূর্ণ নতুন জগৎ তোর সামনে রয়েছে। এই দিক দিয়ে মায়ের সঙ্গে কারও তুলনা চলে না।

বিভূতিবাবু বেড়াতে বেরিয়ে গেলেন।

বসন্তের সঙ্গে নন্দিনীর কথা হচ্ছিল?

—শুনেছ দাদাভাই, ঠাকুমা আজ কিরকম অপ্রস্তুত হয়েছিলেন?

—কি হয়েছিল?

—হয়নি কিছুই। কিন্তু তিল থেকে তাল হল।

—ঝগড়া?

না না। জলখাবারের জন্যে সিঙাড়া করেছিলেন। তার একটাতে চুল ছিল। কিছুই ব্যাপার নয়। বাবা কত সান্ত্বনা দিলেন। বললেন, ও হয়েই থাকে। চুল কখন উড়ে গিয়ে খাবারে পড়ে কেউ বলতে পারে না। কিন্তু কে কার কথা শোনে? দেখে এলাম, রান্নাঘরে বসে-বসে ঠাকুমা কাঁদছেন।

—কেউ কি বকেছিল?

—না।

—তবে? কান্না কিসের?

—সেই তো মজা। তাঁর ভয় হয়েছে, তিনি চোখে কম দেখছেন।

—তা তো দেখতেই পারেন। বুড়ো হয়েছেন।

—কিন্তু সে তুলনায় চোখ ভালোই আছে বলতে পার। উনি তো দিব্যি দেখেন।

—তবে বলছেন কেন।

—ঐ যে চুল পড়ল, তিনি দেখতে পেলেন না। এমনি কত দিন চুল পড়বে, খেয়ে বাবার শরীর খারাপ করবে।

—বেশ তো একটা ঠাকুর রাখা হোক না।

বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে নন্দিনী বললে, ঠাকুমা ঠাকুর রাখবেন? সেই ঠাকুর তাঁর ছেলের খাবার তৈরী করবে। ঠাকুমার প্রাণ থাকতে তা হবে না।

বসন্ত বললে, তবে কি হবে?

—সেইটে ঠিক করতে পারছেন না বলেই তো কান্না। একটা আশ্চর্য মানুষ! ছেলে-ছেলে করে জীবনটা পাত করলেন। ছেলের ভার কাউকে দিয়ে বিশ্বাস নেই। আমাকে দিয়েও না।

বসন্ত হেসে বললে, তোর সঙ্গে ঝগড়াটা এখনও চলছে?

—ঝগড়া তো নয়। দড়ি টানাটানি।

নন্দিনী হাসতে লাগল।

বসন্ত বললে, সেই দড়ি টানাটানির কথাই জিজ্ঞেস করছি। মিটে গেছে?

—সে কি মেটবার? বল ভাই, আমি বড় হচ্ছি। নিজের হাতে বাবাকে, তোমাদের সবাইকে এক আধটা রান্না রেঁধে খাওয়াবার শখ হয় না? তা কিছুতে আমাকে হেঁসেলে ঢুকতে দেবেন না। কিন্তু আমিও একটা বুদ্ধি করেছি।

—কি বুদ্ধি?

—ঠাকুমাকে গিয়ে বলেছি, বাড়িতে মাংস হয় না, বাবা লুকিয়ে লুকিয়ে হোটেল থেকে খেয়ে আসেন। শুনে তো মুখ শুকিয়ে গেল। তাই নাকি? বললাম, হাঁ বাবার মুখে মাঝে মাঝে গন্ধ পাই।

—পাস নাকি?

—তুমি পাগল হয়েছ? তাই আবার পাওয়া যায় নাকি? বাবা যাবেন লুকিয়ে লুকিয়ে মাংস খেতে? মিথ্যে কথা বানিয়ে বললাম।

—তার পরে?

—তার পরে বললাম, আজ ভাবছি দাদাকে দিয়ে কিমা আনিয়ে খানকয়েক কাটলেট করব। ঠাকুমা দোটানায় পড়লেন। নিজে মাংস ছোঁন না, কাটলেট করতেও জানেন না নিশ্চয়ই। অথচ বাবার খাবার তৈরীর ভার আমার হাতে ছেড়ে দিতেও ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু ছেলে খেতে ভালবাসে। কাজেই ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন। ঠিক হয়েছে, রবিবারে-রবিবারে মাংসের কিছু খাবার আমি করব।

স্ফূর্তির সঙ্গে হাত চাপড়ে বসন্ত বললে, হুররে! এই তো নন্দিনী একটা পয়েন্ট জিতল।

মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে নন্দিনী বললে, দাঁড়াও না। আরও একটা পয়েন্ট জিতবার ব্যবস্থা করছি।

—এই সিঙাড়ার পয়েন্ট?

—হাঁ। ঠাকুমাকে বোঝাতে শুরু করেছি, খাবারটা বরং আমিই তৈরী করব, তুমি দেখিয়ে দেখিয়ে দেবে।

—রাজী হয়েছেন?

নন্দিনী হেসে বললে, এত সহজে? ভাবছেন।

বসন্ত বললে, ভাবছেন আর কাঁদছেন। নয়?

—হাঁ। আজ বিকেলেই বোঝা যাবে, একটা পয়েন্ট জিততে পারলাম কিনা।

নন্দিনী হাসতে হাসতে বেণী দুলিয়ে চলে গেল।

পাঁচ

বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে নন্দিনী কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলে, ঠাকুমা ডাকেন কিনা। রান্নাঘর থেকে কোন সাড়া পাওয়া গেল না।

নন্দিনী স্কুল থেকে ফিরেছে, ঠাকুমা কি টের পাননি? নন্দিনী জুতোর খট খট শব্দে বাড়ীটাকে সচকিত করে বার দুই অকারণে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করলে। তথাপি ঠাকুমার সাড়া পাওয়া গেল না। জোরে জোরে নন্দিনী কয়েকবার ঝি-চাকরকে ডাকলে। তাও ঠাকুমার সাড়া পাওয়া গেল না।

অবশেষে নন্দিনী নিজেই নীচে রান্নাঘরে গেল। দেখলে, ঠাকুমা ময়দা মাখছেন। জিজ্ঞাসা করলে, সিঙাড়া হবে? আমি কি তোমাকে সাহায্য করব?

—না। তা দরকার হবে না। সিঙাড়া হচ্ছে না।

নন্দিনীর মনে হল, ঠাকুমা যেন মুখ নামিয়ে হাসি গোপন করলেন।

নন্দিনী জিজ্ঞাসা করলে, কি হচ্ছে?

—নিমকি।

নন্দিনীর মনে হল ঠাকুমা আবার যেন হাসি গোপন করলেন।

নিমকি। এতে চুল পড়ার আশঙ্কা কম। সেইজন্যে নন্দিনীকে দরকার হচ্ছে না। বুড়ী ভাঙ্গে, তবু মচকায় না। অন্তত আজকের দিনটা তো জিতলেন। নন্দিনীর এক পয়েন্ট পাওয়া হল না।

কিন্তু নন্দিনীও সোজা মেয়ে নয়। বললে, বাবা কিন্তু নিমকির চেয়ে সিঙাড়াই বেশী ভালোবাসেন।

অর্থাৎ সিঙাড়া করা হোক এবং তার ভার নন্দিনীর ওপর দেওয়া হোক। কিন্তু ঠাকুমা তার চেয়ে এককাঠি সরেস। ব্যঙ্গ ভরে হেসে বললেন, বিভূতি কি ভালোবাসে, না বাসে, তা আর তুই আমাকে শেখাতে আসিস না।

নন্দিনী হেরে গেল। শুকনো মুখে ওপরে চলে গেল।

বসন্ত জিজ্ঞাসা করলে, কিরে, মুখ শুকনো কেন?

ম্লান হেসে নন্দিনী বললে, হেরে গেলাম।

—কি হল?

—আজ সিঙাড়া নয়, নিমকি।

—তার মানে নিমকিতে চুল পড়বার আশঙ্কা নেই?

—রাইট! এ বাড়ীতে সিঙাড়া বোধহয় বন্ধ হল। আমারও আর পয়েন্ট জেতা হল না।

বসন্ত বললে, দেখলি তো, পুরনো চাল ভাতে বাড়ে। বৃদ্ধা মহিলার মাথায় ভেলকি খেলে। ওর সঙ্গে পারবি না।

নন্দিনী বললে, দেখ না, আমার মাথায়ও কম ভেলকি খেলে না। নিমকি আর ক'দিন খাওয়াবেন?

বসন্ত হেসে বললে, অনন্তকাল। তার মানে ঠাকুমা যতদিন বেঁচে আছেন।

—তোমার কাছ থেকে যে কোন সাহায্য পাচ্ছি না।

হাত উলটে বসন্ত বললে, নিমকি সিঙাড়ার ব্যাপারে আমি কি করতে পারি বল। হত ক্রিকেট, কটা চার মারতাম দেখতিস।

একটা কাল্পনিক বল হাতে করে ছুঁড়ে দিয়ে বসন্ত বেরিয়ে গেল। কিন্তু তখনই আবার ফিরে এসে বললে, একটা কথা বলি শোন।

—বল।

—বৃদ্ধা ভদ্রমহিলার পেছনে অমন করে লাগিস না।

উনি আমাদের জন্যে যা করছেন, তার তুলনা নেই।

—তা কে অস্বীকার করছে?

—অস্বীকার যখন কর না, তখন লাগছো কেন?

—লাগিনি তো। আমি বলি, বাবার জন্য মাঝে মাঝে আমাকে খাবার করতে দিতে। উনি তাতে রাজী নন। তোমাদের খাওয়াতে আমারও সাধ হয়।

—তার ঢের সময় পাবে। তোমার বিয়ের এখনও অনেক দেরী। এর মধ্যে আমাদের পয়সায় আমাদের খাওয়াবার সময়ের অভাব ঘটবে না।

লজ্জায় নন্দিনীর মুখ আরক্ত হয়ে গেল। রেগে বললে, যাও, তুমি বড় বাজে বক। তোমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে না।

বলে একরকম ছুটে বেরিয়ে চলে গেল। ক'দিন উপর্যুপরি নিমকি-কচুরি হল। কিন্তু ঠাকুমা বুঝলেন, খাবার বড় একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে। সিঙাড়া এখন হওয়া দরকার। কিন্তু সেদিনের ঘটনার পরে তিনি কেমন দমে গেছেন। নিজের ওপর বিশ্বাসটা কমে গেছে।

বিভূতিবাবুকে একদিন বললেন, আমার চোখটা একদিন দেখান দরকার রে।

—কেন, কি হয়েছে?

কুণ্ঠিতভাবে ঠাকুমা বললেন, চোখে একটু কম দেখছি। আর আগের মত দেখতে পাচ্ছি না।

বিভূতিবাবু হেসে বললেন, বয়স হচ্ছে না? এ বয়সে আগের মত দৃষ্টি কি থাকে?

—তুই কি বলিস, চোখ দেখানোর দরকার নেই?

—না, না। সন্দেহ যখন হয়েছে, তখন দেখানো উচিত। কাছেই আমার একটি বন্ধু আছেন, চোখের ডাক্তার। আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি। বসন্ত নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে আসবে।

—সেই ভাল!

ঠাকুমা খুশী হয়ে চলে গেলেন। মনটা বোধ হয় ভাল হয়েছে। নন্দিনীকে ডাকাডাকি করতে লাগলেন।

উপর থেকে নন্দিনী সাড়া দিলে, কি বল।

—একবার নীচে আয়।

নন্দিনী নীচে রান্নাঘরে গেল। জিজ্ঞাসা করলে, কি, বল।

ঠাকুমা হেসে বললেন, আজ ভাবছি সিঙাড়া করা যাক।

নিস্পৃহভাবে নন্দিনী বললে, বেশ তো, করো না কেন। বলেই নন্দিনী চলে যাচ্ছিল।

ঠাকুমা ডাকলেন, যাচ্ছিস কোথায়? পুরটা তোকেই করতে হবে যে।

নন্দিনী জয়ের আনন্দে মনে মনে খুশী হয়ে গেল। প্রকাশ্যে দৃঢ়কণ্ঠে বললে, তা যদি বললে ঠাকুমা তোমাকে পরিষ্কার বলি, আমি যদি করি তাহলে সবটাই আমি করব। পুরটা আমি করব, বাদবাকী তুমি করবে, তারপর খাবার সাজিয়ে বাবার কাছে নিয়ে যাবে, তা চলবে না। কি করবে বল।

ঠাকুমা স্তব্ধভাবে কিছুক্ষণ নন্দিনীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। দেখতে-দেখতে তাঁর দৃষ্টি জলে ঝাপসা হয়ে গেল; ঠোঁট কাঁপতে লাগল। শান্ত হতে একটু সময় নিলেন।

তারপর উঠে পড়ে বললেন, তা তুইই কর। বলে ওপরে চলে গেলেন। নিজের শোবার ঘরে জানলার গরাদে মাথা দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

বিয়ের পর যখন প্রথম তিনি শ্বশুরবাড়ী এলেন, তখন যে ঘরটি তিনি পেয়েছিলেন সেই ঘরের সঙ্গে এই ঘরটির কোথায় যেন একটু মিল আছে। সে ঘরেও এরকম একটা জানলা ছিল, সেখান থেকে বড় রাস্তার মোড় পর্যন্ত দেখা যেত।

এই জানলার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সেই কথা তাঁর মনে পড়ল। দিনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কতই না পরিবর্তন হয়। তখন ঠাকুমা নববধূ ছিলেন। সেকালের সঙ্গে একালের কতই না তফাত। বেশ-ভূষা, চাল-চলন সব দিক দিয়েই স্বতন্ত্র।

ঠাকুমা ডাকলেন, যাচ্ছিস কোথায়?

সেই ঘরে স্বামীর মৃত্যুর ছবি তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল। সর্বত্র আলো জ্বলছে, তবু কি অন্ধকার। আত্মীয়- স্বজনেরা খবর নিতে আসছেন-যাচ্ছেন, তবু কি অসহায় নি:সঙ্গতা।

দেখতে দেখতে চারিদিক থেকে ঝড় বৃষ্টি আরম্ভ হল। জোর করে তাঁর ঘর থেকে নীচে একটা অন্ধকার ঘরে তাঁকে নামিয়ে দেওয়া হল। ভোর থেকে রাত নটা পর্যন্ত অবিশ্রান্ত খাটুনির বিনিময়ে একবেলা দুটি অন্ন।

তারপর বিভূতি বড় হল। পাশ করলে। তাকে আর পড়াতে পারা গেল না বটে, কিন্তু ভগবানের অনুগ্রহে প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই একটা চাকরি পাওয়া গেল। আজ যে সুখশান্তি, তার মূলে সেই চাকরি।

তারপরে বিভূতির বিয়ে। একে একে দুটি সন্তান হল। এতদিনে ঠাকুমার সংসার হল। কিন্তু বৌমাটি সেই আনন্দ দীর্ঘ দিন উপভোগ করতে পেলেন না। তাঁর ডাক এসে গেল। বসন্ত আর নন্দিনীকে শাশুড়ীর হাতে তুলে দিয়ে তিনি চোখ বুজলেন। সেও সহ্য হল। কিন্তু এইবার?

এত ঝড়-ঝাপটা গেল, কোন দিনই এক মুহূর্তের জন্যও তিনি নৌকার হাল ছাড়েন নি। এইবার কি হাল ছাড়তে হবে?

ঠাকুমা শিউরে ওঠেন।

ঠাকুমার চাপাচাপিতে তাঁকে চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হল। অনেকক্ষণ ধরে পরীক্ষা করে তিনি বললেন, ছানি।

শুনে বিভূতিবাবু চমকে উঠলেন। তাঁর মাও।

—কি হবে?

—অপেক্ষা করতে হবে।

—কতদিন?

ডাক্তার বললেন, তা বলা যায় না। কারো কারো ছানি শীঘ্র পাকে, কারো বা দেরী হয়। মোটকথা যতদিন না ছানি পাকছে, ততদিন কিচ্ছু করা যাবে না।

বিভূতিবাবু বললেন, কতদিনে পাকবে তাও নিশ্চয় করে বলা যাচ্ছে না?

না। ডাক্তার বললেন, মাসখানেক পর আর একবার নিয়ে আসবেন। তাহলে বুঝতে পারব কি গতিতে পাকছে, আর কতদিনই বা দেরি হবে। যে কোন ক্ষেত্রেই হোক তিন চার বছরের আগে পাকছে না।

বিভূতিবাবু এবং তাঁর মা সমস্বরে বলে উঠলেন, তিন-চার বছর?

ঠাকুমা কাঁদতে-কাঁদতে বললেন, তিন-চার বছর এরকম করে কাটাতে হবে! কাজেকর্মে খুব অসুবিধা হয়। তার আগে একটা ব্যবস্থা করা যায় না, বাবা?

ডাক্তারবাবু বললেন, আমার তো হাত নয় মা। আপনি মাঝে মাঝে আসবেন। যখনই সময় হবে তখনি ব্যবস্থা করা যাবে, কোন চিন্তা করবেন না।

ঠাকুমা বললেন, তাহলে আমি আবার আসছে সপ্তাহে আসব, কি বলেন বাবা?

তাঁর ব্যগ্রতা দেখে ডাক্তারবাবু হেসে ফেললেন। বললেন, না মা, আপনি মাসছয়েক পরে আসবেন।

মাস ছয়েক!—ঠাকুমা বেশ দমে গেলেন,—অতদিন কিভাবে থাকব?

ডাক্তারবাবু হেসে বললেন, কিচ্ছু অসুবিধা হবে না আপনার। থাকতেই হবে, উপায় তো নেই।

ডাক্তারখানা থেকে ফিরে এসে ঠাকুমা দেখলেন, পরম উৎসাহের সঙ্গে নন্দিনী রান্না আরম্ভ করে দিয়েছে। এত মনোযোগের সঙ্গে খুন্তি নাড়ছে যে, ঠাকুমাকে দেখতেই পেলে না।

ঠাকুমা নি:শব্দে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন হাল তাঁর হাত থেকে খসে পড়ছে। আর রাখা গেল না। অজান্তেই তাঁর বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।

সেই শব্দে সচকিত হয়ে নন্দিনী চেয়ে দেখলে দোরগোড়ায় ঠাকুমা দাঁড়িয়ে। তাঁর দাঁড়ানোর ভঙ্গী এবং চোখের দৃষ্টি দেখে নন্দিনী ভয় পেয়ে গেল। সর্বস্ব খোয়া গেলে মানুষের চোখের দৃষ্টি যেমন হয় তেমনি।

কিন্তু মুখে হাসি টেনে নন্দিনী জিজ্ঞাসা করলে, ডাক্তার কি বললে?

ঠাকুমার কাছ থেকে কোন সাড়া না পেয়ে নন্দিনী বলতে লাগল, তোমায় ফিরতে দেরি দেখে আমি রান্না চড়িয়ে দিলাম। ভাত, আলুসিদ্ধ আর মাছের তরকারি। ক্লান্ত হয়ে এসেছ, তুমি গিয়ে শুয়ে পড়োগে ঠাকুমা। আমাদের রান্নাটা হয়ে গেলেই উনুনটা নিকিয়ে তোমার জন্যে লুচি-তরকারি করে দেব।

ঠাকুমার কাছ থেকে তথাপি কোন সাড়া পাওয়া গেল না। তিনি নি:শব্দে উপরে চলে গেলেন।

ব্যাপারটা নন্দিনীর ভাল লাগল না। ডাক্তার ভয়ের কিছু বলেছেন কিনা কে জানে। কিন্তু তার রান্না ছেড়ে যাওয়ার উপায় নেই। দাদা হয়ত ব্যাপারটা জানতে পারে। সে দাদাকে ডাকতে লাগল।

বসন্ত রান্নাঘরের দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে বলল, অত চেঁচাচ্ছিস কেন? কি হয়েছে?

—ঠাকুমাকে ডাক্তার কি বললো রে?

বসন্ত ইতিমধ্যে বাবার কাছ থেকে সব খবর পেয়েছিল। বললে, অপেক্ষা করতে হবে।

—কিসের জন্যে?

—অপারেশনের জন্যে। এখনও চোখ পাকেনি।

নন্দিনী হেসে বললে, ছানির আবার কাঁচা পাকা আছে নাকি?

—থাকবে না? সবেরই কাঁচা পাকা থাকে।

—কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?

—তা ডাক্তার বলতে পারেন নি। ছমাস পরে যেতে বলেছেন।

—ততদিন কি করবেন?

—কি আর করবেন? যেমন কাজ করে যাচ্ছেন, তেমনি কাজ কর্ম করবেন।

বসন্ত পড়তে চলে গেল।

ছয়

ঠাকুমার এক চিন্তা, চোখটা যদি নষ্ট হয়ে যায়, কি করব?

বিভূতিবাবু সান্ত্বনা দেন, চোখ নষ্ট হবে কেন? এ কলকাতা শহর। এখানে বড় বড় ডাক্তার আছে। অপারেশন করলেই সেরে যাবে। আবার দৃষ্টি ফিরে পাবে। আবার কাজকর্ম করবে। তার জন্যে ভাবছ কেন?

শুনে ঠাকুমা খানিকটা আশ্বস্ত হন। সত্যি তো, এখানে না হয় কি। পুরনো ঝিয়ের মা হাসপাতাল থেকে চোখ কাটিয়ে এসেছিল। এ তো তাঁর নিজের চোখে দেখা। কিন্তু সবেতেই ব্যতিক্রমও আছে।

ঠাকুমা কুণ্ঠিতভাবে জিজ্ঞাসা করেন, কিন্তু আমার চোখ যদি ভাল না হয়? এমন তো হয়, চোখ কাটাল, কিন্তু চোখ ভাল হল না। তাহলে কি করব?

বিভূতিবাবু সাহস দেন, মানুষের দুটো চোখ, একটা নষ্ট হলেও আর একটা তো রইল। তুমি অত ভয় পাচ্ছ কেন?

ঠাকুমার মন বুঝল কিনা কে জানে! তিনি চুপ করে রইলেন। সেদিকে চেয়ে বিভূতিবাবু বললেন, আর ভগবান না করুন, যদি তোমার দুটো চোখই যায় তা হলেই বা ভাবনা কি? তোমাকে খেটে খেতে হবে না। অসহায় তো নও। তোমার নাতি আছে, নাতনি আছে। তারা তোমাকে খুব ভালবাসে। তারপরে আমিও আছি। তোমার সেবা যত্নের কিছুমাত্র ত্রুটি হবে না।

ঠাকুমা হাসি মুখে বললেন, আমার কথা আমি ভাবছি নাকি?

—তবে কার কথা ভাবছ?

—সংসারের কথা। তোর খাওয়া দাওয়ার বড় অযত্ন হবে।

এতক্ষণে ঠাকুমার মনের কথা বেরিয়েছে। তাঁর চিন্তা নিজের জন্য নয়, ছেলের জন্য।

বিভূতিবাবু বললেন, সে কথাই বা ভাবছ কেন? চোখের কথা ছেড়ে দাও। কাল যদি তোমার মৃত্যুই ঘটে, তাহলে আমরা কি বানে ভেসে যাব?

ঠাকুমা বললেন, মরণ হলে বাঁচি। তোর কি হচ্ছে না হচ্ছে সে তো দেখতে আসব না। কিন্তু অন্ধ হয়ে পড়ে থেকে তোদের কষ্ট দেখতে পারব না। এই কথাই ঠাকুরকে অষ্টপ্রহর বলছি। হয় আমাকে তুলে নাও, নয় আমার চোখ সারিয়ে দাও, অন্য অবস্থাটা যেন করো না ঠাকুর।

বিভূতিবাবু স্থির দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মাকে তিনি জানেন অত্যন্ত দাম্ভিক এবং অত্যন্ত আত্মসম্মান-জ্ঞানসম্পন্ন। দু:খ তিনি জীবনে কম পাননি। কিন্তু কোন দিন কারো কাছে হাত পাতেন নি। কাউকে নিজের দু:খের কথা বলতে তিনি ভালবাসতেন না। মস্ত বড় দম্ভ নিয়ে মস্ত বড় দু:খ তিনি হেলায় সহ্য করে এসেছেন। সেই মা যদি অন্ধ হয়ে যান, তাঁকে যদি প্রতি মুহূর্তে পরের সাহায্য নিতে হয়, তাহলে তিনি কি করে বাঁচবেন, এসম্বন্ধে বিভূতিবাবুরও সন্দেহ আছে।

তিনি বললেন, কিছু ভেবো না মা। ঠাকুর তোমার কথা নিশ্চয় শুনবেন। তোমার চোখ নিশ্চয় ভাল করে দেবেন।

—তাই বল বাবা, তাই বল।

উঠতে গিয়ে ঠাকুমা আবার বসলেন। বললেন, এই এক চিন্তা আমার হয়েছে। দিনে ঘুমোলেই রাত্রে ঘুম নেই। জানিস?

বিভূতিবাবু বললেন, এই তো তোমার দোষ। বাজে কথা নিয়ে ভাব। দিনরাত্রি ভেবো না। কোন দুশ্চিন্তা করো না। ওই দুশ্চিন্তাতেই চোখ নষ্ট হয়।

ঠাকুমা চমকে উঠলেন, তাই নাকি রে? দুশ্চিন্তা খুব খারাপ?

বিভূতিবাবু বললেন, ভীষণ খারাপ। ওর চেয়ে খারাপ কিছুই হতে পারে না। তুমি দুশ্চিন্তা করো না। চোখ কাটবার দরকারই হবে না। আপনা-আপনি সেরে যাবে।

ঠাকুমা লাফিয়ে উঠলেন, তাই নাকি রে? সত্যি বলছিস?

—সত্যি নয়তো কি তোমার সঙ্গে রসিকতা করছি মা? কত দেখলাম সারতে। তুমি দেখ না দিন কতক চেষ্টা করে।

নন্দিনী বসন্তকে বললে, ছেলেবেলায় বইতে পড়েছিলাম চক্ষু অমূল্য রত্ন। এতদিনে তার মানে বুঝলাম।

বসন্ত হেসে বললে, তোকে আমি খুব বুদ্ধিমতী ভাবতাম। এই সামান্য কথাটা বুঝতে এতদিন লাগল?

নন্দিনী বললে, আগে বুঝেছিলাম কথার মানে পড়ে। আজ ঠাকুমাকে দেখে আসল মানেটা বুঝলাম। চোখের জন্য ঠাকুমার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। কি করলে চোখ ভাল হবে, দিনরাত সেই চিন্তা, তার সঙ্গে আবার একটা নতুন চিন্তা জুটেছে।

—আবার কি চিন্তা জুটল?

নন্দিনী বললে, বাবা বলে দিয়েছেন দুশ্চিন্তা ছেড়ে দিলে চোখ এমনিই ভাল হয়ে যেতে পারে, অপারেশনের দরকার হবে না। তাই এখন দুশ্চিন্তা না করার চিন্তাতেই ব্যস্ত!

বসন্ত বললে, কি সর্বনাশ! কিন্তু আমি জানতে চাচ্ছি, তাতে তোমার কিছু সুবিধা হল কিনা?

নন্দিনী বললে, কিছুমাত্র না। ঠাকুমা আগে আমাকে রান্নাঘরে ঢুকতেই দিতেন না। এখন ঢুকতে দেন, হেসে কথা বলেন, চোখের সম্বন্ধে কে কি বলে গেল সবই গল্পও করেন, কিন্তু তালে ঠিক আছেন।

—তার মানে?

—তার মানে, কি খাবার হচ্ছে দেখাবেন। কেমন করে হয়, কেমন করে করতে হয় বলবেন। এক আধখানা হাতে দেবেনও, কিন্তু খাবার তৈরী করতে দেবেন না। ঠাকুমার আসল ব্যাধিটা কি জান?

—কি?

—চোখ নয়।

—তবে?

—ছেলে।

বসন্ত বললে, আর একটু পরিষ্কার করে বল।

নন্দিনী বললে, ঠাকুমার দুশ্চিন্তা বল, আর যা কিছুই বল চোখ নিয়ে নয় মোটেই। তাঁর দুশ্চিন্তা ছেলেকে নিয়ে। তাঁর চোখ গেলে ছেলের সেবা যত্ন কে করবে?

বসন্ত বললে, তা যেন বুঝলাম। মা আর ছেলে। কিন্তু তুইও তো কম যাস না। বাবার সেবা করবার জন্যে তুইও তো মরিয়া হয়ে উঠেছিস। ঠাকুমার বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণা করেছিস।

নন্দিনী বললে, বা:, আমার বাবা নন?

বসন্ত বললে, বাবা তো আমারও। কিন্তু তার খাবার তৈরী করবার জন্য আমি তো ব্যস্ত হই না।

নন্দিনী বললে, তুমি বেটা ছেলে, খাবার তৈরী করা বেটা ছেলেদের কাজ নয়। সেবা করাও নয়। তোমাদের মায়ামমতা কম। তোমাদের সঙ্গে আমাদের অনেক তফাত।

—যেমন?

—যেমন তোমরা খেতে ভালবাস, আমরা খাওয়াতে ভালবাসি।

—খেতে ভালবাসিস না?

—বাসব না কেন? খেতে আবার কে না ভালবাসে? কিন্তু আমরা খাওয়ার চেয়েও খাওয়াতে ভালবাসি।

মুরুব্বীর মত মাথা নেড়ে বসন্ত বললে, তোরা ভারি বোকা রে। আমরা আগে গাণ্ডেপিণ্ডে খেয়ে নি। তার পরে যা খেতে পারলাম না, তা দয়া করে মেয়েদের জন্য ফেলে রাখলাম। আর রান্না ভাল হয়েছে বললে তোরা বিগলিত হয়ে পড়িস। মুখের জিনিসটাও দিয়ে দিস।

গর্বিতভাবে নন্দিনী বললে, সেই আমাদের মহত্ব।

বসন্ত বললে,—মহত্ব-র মানে জানিস।

—কি?

—বোকামি।

—বোকামি?

—আজকালকার ছেলেদের পরিভাষায় মহত্ব মানে বোকামি। শুধু মহত্বই নয়, এতদিন লোকে যা কিছুকে মানুষের সদগুণ বলে মনে করে এসেছে,—দয়া, মায়া, ক্ষমা, পরোপকার প্রভৃতি সব কিছু আমরা বোকামির পর্যায়ে ফেলেছি।

তিক্ত কণ্ঠে নন্দিনী বললে, খুব ভাল কাজ করেছ! এসবকে বোকামির পর্যায়ে ফেলে, হাওয়াই সার্ট আর চোঙা প্যান্ট পরে রাস্তায় রাস্তায় বাউণ্ডুলে সেজে ঘুরছ! বড় লাভ হচ্ছে তোমাদের, না?

বসন্ত বললে, লাভ হোক আর না হোক, লোকসানের হাত থেকে তো বেঁচেছি।

—তাই ভাবছ বুঝি? তোমাদের লোকসান হবে ভরাডুবির লোকসান।

রেগে গরগর করে নন্দিনী ভেতরে চলে গেল।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বাইরের বারান্দায় দেয়ালে ঠেস দিয়ে ঠাকুমা চোখ বন্ধ করে মালা জপছেন। নন্দিনী সেখানে গিয়ে তাঁকে ধরলে। জিজ্ঞাসা করলে, আচ্ছা ঠাকুমা, তুমি বাবার কথা দিন-রাত্তির এত ভাব কেন? বাবা কি কচি ছেলে?

ঠাকুমা বললেন, ওরে সত্যিই কচি ছেলে। বছর গুণতিতে বয়স হয়েছে। কিন্তু মনের দিকে দিয়ে এখনও কচি ছেলে। এখনও আমি দেখেছি, ওর ক্ষিদে পেয়েছে কি পায়নি তা বুঝতে পারে না। ওকে জিজ্ঞেস কর, ও কি খাবে কিম্বা কি খেতে ভালবাসে, ও বলতে পারবে না।

ঠাকুমা হাসতে লাগলেন।

নন্দিনী বললে, কি যে বল ঠাকুমা! বাবা অত বড় একটা অফিসের কর্তাব্যক্তি। লাখ লাখ টাকার ব্যবসা চালাচ্ছেন। আর তিনি কচি ছেলে!

ঠাকুমা বললেন, সে চালাক গে। কিন্তু বাড়ী ফিরলেই ও কচি ছেলে হয়ে যায়। কচি ছেলেরও অধম।

নন্দিনী বললে, তা যদি হয়ে যান তো সে তোমার জন্যেই হয়ে যান। অতবড় অফিস চালাচ্ছেন, কেননা সেটা তাঁকে চালাতে হয়। তাঁর মাথা সেখানে কাজ করে। আর এখানে ছোট ছেলে হয়ে যান, তার মানে এখানে তাঁর মাথার কোন কাজই তুমি রাখ না। তিনি অফিস থেকে ফিরে কোন কাপড়টা পরবেন, তুমি ঠিক করে রেখেছ, কি খাবেন তাও তুমি ঠিক করে রেখেছ। বাবার জন্যে ঘরে তোমার ছক সাজান রয়েছে। উনি এসে একবার হাত বুলিয়ে গেলেই তার কাজ সারা। বুঝতে পেরেছ?

ঠাকুমা চুপ করে নন্দিনীর কথা শুনে যাচ্ছিলেন।

নন্দিনী বললে, সে জন্যে যে লোকটা তাঁর অফিসে দোর্দণ্ড প্রতাপ ম্যানেজার, তোমার বাড়ীতে তিনি পাঁচ বছরের কচি ছেলে।

ঠাকুমা জিজ্ঞেস করলেন, সেটা কি খারাপ?

মাথায় একটা ঝাঁকি দিয়ে নন্দিনী বললে, ভয়ানক খারাপ। অতবড় একটা মানুষকে বাড়ীতে তুমি বাড়তে দাও নি। সমস্ত দিন বাইরে নানা লোকের সঙ্গে লড়াই করে বাড়ী এসে দেখেন, মা পাখাটি বাড়িয়ে তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছেন। তিনি অমনি কচি ছেলে সেজে পাখার তলায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। এ ভয়ানক খারাপ নয়?

ঠাকুমা বললেন, খারাপ হতে যাবে কেন? বাইরে মা নেই। সেখানে সমানে সমানে লড়াই। সে একটা জায়গা। এটা বাড়ী। এখানে মা আছে, এখানটা আলাদা। পোশাক ছাড়ার ব্যাপার আর কি? বিভূতি অফিসে যায় বিলিতি পোশাক পরে। বাড়ী এলে সেই পোশাক ছেড়ে সে আমার ছেলে হয়। এর মধ্যে খারাপের কি আছে? পঁয়তাল্লিশ বছর এই ভাবে চলে এসেছে। কোন অঘটন তো কখনও ঘটেনি। তার জন্যে তোদের হিংসের কি আছে?

—আছে বইকি। আমরা বাবাকে পাচ্ছি না। বাবা অফিসে বড় সাহেব। বাড়ীতে ছোট ছেলে। এর মধ্যে আমাদের বাবা কোথায়?

—কেন, পাস না?

—না। সত্যি কথা বলতে কি, বাবার সঙ্গে আমাদের কথাই কম হয়। অথচ ইচ্ছে করে, সন্ধ্যের পরে বাবা যখন খোলা ছাতে তক্তাপোশে বিছানা করে শুয়ে পড়েন, আমরা তাঁর কাছে বসে গল্প করি।

—করিস না কেন? কে নিষেধ করেছে?

—তুমি।

—আমি!

—হ্যাঁ, তুমি। মুখে কিছু বল না। কিন্তু ছাতে এসে দেখি বাবার বিছানার পাশে টিনের চেয়ারটিতে বসে হাত পাখা নিয়ে বাবাকে ঘুম পাড়াচ্ছ। উনি তো আমাদের বাবা নন, তোমার ছেলে। আমরা ফিরে যাই।

ঠাকুমা অবাক হয়ে নন্দিনীর মুখের পানে চেয়ে রইলেন। এ ছবি কোনদিন তাঁর চোখে পড়েনি।

বসন্তকে ডেকে ঠাকুমা বললেন, হাঁ ভাই বসন্ত, আমি তো একটা মুশকিলে পড়েছি।

ঠাকুমার মুশকিলের কথাটা বসন্ত কিছুটা জানে। জিজ্ঞাসা করলে, কি মুশকিল ঠাকুমা।

—তোর বাবা আমাকে চিন্তা করতে নিষেধ করলেন। তা চোখের চিন্তা আমি করি না, বাবা। আমার চিন্তা তোর বাবার জন্যে আর তোদের নিয়ে। সে চিন্তা মরার আগে আর যাবে না। তবে অনেক কমিয়ে এনেছি। কিন্তু আর একটা চিন্তা জুটল যে!

—কি চিন্তা?

ঠাকুমা বললেন, কাল নন্দিনীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। নন্দিনী আমার উপর ভীষণ খাপ্পা।

—কেন ঠাকুমা?

—আমি নাকি তোর বাবাকে তোদের কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছি।

—ও একটা পাগলী! ওর কথা ছেড়ে দাও ঠাকুমা।

ঠাকুমা বললেন, পাগলী তো নয়। ভেবে দেখলাম, ওর কথা একেবারে মিথ্যে নয়। তোদের কাছ থেকে আড়াল করবার জন্য অবশ্য নয়, কিন্তু আমি যে তোর বাবাকে দিনরাত ঘিরে ঘিরে থাকি, এতো কিছুটা সত্যি। অস্বীকার করব কি করে?

ঠাকুমা একটু চুপ করে থেকে বললেন, কিন্তু ওতো একদিনের অভ্যেস নয়। তোর বাবার যত বয়স তত দিনকার অভ্যেস। ছাড়ি কি করে বলত তুই। তোর বাবার চিন্তা করা ছাড়া আর আমার কি আছে?

ঠাকুমার চোখ ছল ছল করে উঠল।

শুনে বসন্তর খুব কষ্ট হল। বললে, ছাড়বে কেন ঠাকুমা? কে তোমাকে ছাড়তে বলছে?

—তোরাই বলছিস।

বসন্ত বললে, আমি বলিনি ঠাকুমা। যদি বলে থাকে তো নন্দিনী বলেছে। আমার একটা কথা শুনবে?

—বল।

—তুমি নন্দিনীকে বাবার কাজের কিছু কিছু ভার দাও। তুমি যখন থাকবে না, তখন ওকেই তো করতে হবে। এখন থেকে না শিখলে করবে কি করে?

ঠাকুমা ধীরে ধীরে বললেন, কিন্তু ব্যাপারটা কি জানিস? সব মানুষই জানে যে একদিন যেতে হবে। কেউ থাকতে আসেনি। আর এখান থেকে কিছু নিয়ে যাওয়াও যায় না। তবু বাড়ী করছে, ঘর করছে, মামলা-মোকদ্দমা করছে, চুরি, রাহাজানি, খুন করছে, কি করছে না বল? আমারও তাই হয়েছে। দিনরাত ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করছি, তোর বাবাকে, তোদের দুজনকে রেখে যেন যেতে পারি। কিন্তু তবু যতক্ষণ আছি, ততক্ষণ প্রাণ ধরে তোর বাবার ভার কাউকে দিতে পারছি না।

বসন্ত অবাক হয়ে ঠাকুমার স্বীকারোক্তি শুনে যাচ্ছিল। বলবার কথা খুঁজে পাচ্ছিল না।

ঠাকুমা শেষে বললেন, তা হোক। নন্দিনীর রাগটা তো ভাঙ্গাতে হবে। মেয়েটা খুবই রেগে গেছে। এই একাদশীর দিন ওর ওপর সমস্ত রান্নার ভার চাপাব। মাঝে মাঝে খাবারও করতে দিতে হবে। কি বল?

মুচকি হেসে ঠাকুমা চলে গেলেন।

সাত

মুখে বলা এক, কাজে করা আর।

ঠাকুমার সদিচ্ছার অভাব ছিল না। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সব সদিচ্ছা পূরণ করতে পারছিলেন না। একাদশীর দিন নন্দিনীর উপর রান্নার ভার দেবার আন্তরিক ইচ্ছা ছিল। কিন্তু শেষ অবধি নন্দিনীকে ডাকা আর হয়ে উঠলো না।

সকালে যখন নামলেন, নন্দিনীকে ডাকার কথাটা তখনও মনে ছিল। কিন্তু রান্নাঘরে ঢোকামাত্র ভুল হয়ে গেল। সেইটাই অভ্যাস। চিরকাল একাই রান্নাঘরে ঢোকেন। ঝি তাঁকে সাহায্য করে। ঝির সঙ্গে গল্প করতে করতে একাই সব রান্না সেরে ফেলেন।

একাদশীর দিনও তাই হলো। মনে পড়লো যখন বসন্ত আর নন্দিনী 'খেতে দাও' বলে এসে দাঁড়াল।

বসন্ত অবাক হয়ে গিয়েছিল। খেতে খেতে বললে, এরকম তো কথা ছিল না ঠাকুমা।

ঠাকুমা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কি কথা?

তুমিই মনে করে দেখ, একাদশীর দিন কি কথা ছিল।

তখনও ঠাকুমার মনে পড়ল না।

ইশারাতে বসন্ত বললে, নন্দিনীর ওপর রান্নার ভার দেবার কথা ছিল না?

তখন মনে পড়ল।

বললেন, ও, সে আমার মনে ছিল। কিন্তু স্কুল কামাই হবে বলে বলিনি। নন্দিনী, এই রবিবারে তোমায় কিন্তু রান্নার ভার নিতে হবে। বসন্তকে বলে দেবে কি বাজার হবে। কি রান্না হবে তোমাকেই ঠিক করতে হবে। রান্না মানে শুধু খুন্তি নাড়া নয়।

বলে হাসতে লাগলেন।

তোয়াজে নন্দিনী খুশী হল। বললে, আমি পারি না নাকি? তোমাকে আমি সেদিন রান্না ঘরে ঢুকতেই দেব না। আঁশ-নিরামিষ সমস্ত রান্না আমি করে দেব।

ঠাকুমা হেসে বললেন, এই কথাগুলো মনে থাকে যেন! তখন যে কথায় কথায় ডাক পাড়বে ঠাকুমা একবার এসোতো, তা হবে না। আমি সকালে পূজার ঘরে ঢুকব, খাবার সময় বেরুব।

নন্দিনীও বললে, এই কথাই রইল। আমিও ডাকব না, তুমিও আসবে না।

বসন্ত নিজের থেকেই বলে উঠলো, আমি সাক্ষী রইলাম।

নন্দিনী দাদাকে কিন্তু পুরো বিশ্বাস করে না। একটা কিছু ঘুষ পেলেই সে সরে দাঁড়ায়।

বললে, আচ্ছা তুমি সাক্ষী রইলে। কিন্তু শেষকালে বেইমানী করো না যেন।

বসন্ত লজ্জিত হাস্যে বললে, ছেলেবেলায় সে যা করেছি, করেছি। আর আমি বেইমানী তো করি না।

নন্দিনী বললে, না, করো না আবার? তোমার তো গুণের ঘাট নেই। এবার কিন্তু বেইমানী করলেও আমি শুনবো না।

বলে ঠাকুমার মুখের দিকে চেয়ে বললে, আমি কিন্তু কোন কথা শুনব না। সকালে উঠে গা-ধুয়ে রান্না ঘরে ঢুকব। কোন বায়নাক্কা শুনব না।

ঠাকুমা বললেন, না না কোন বায়নাক্কা করব না। কিন্তু নুন-ঝালটা দেখিয়ে দিতে হবে।

রেগে নন্দিনী বললে, না।

ঠাকুমা হেসে বললেন, তুই নিজে পারবি?

বসন্ত ফোড়ন কাটলে, যা পারবি না নন্দিনী তা নিয়ে জেদ করিস না।

আর যায় কোথায়!

নন্দিনী খাবার ফেলে লাফিয়ে উঠে পড়ল।

—যা, ওরকম রান্না আমি রাঁধি না।

ওরে নন্দিনী, খাওয়া ফেলে যাসনি। তুই যা বললি তাই হবে।—ঠাকুমা আর বসন্ত এক সঙ্গে চিৎকার করে উঠলো।

কিন্তু কে কার কথা শোনে! নন্দিনী আর ফিরল না। ঠাকুমা, বসন্ত দুজনেই অপ্রস্তুত।

নন্দিনীর কথা বসন্ত কিছুটা বুঝলেও ঠাকুমা একেবারেই বুঝতে পারে না। এগার বছর বয়সে ঠাকুমার বিয়ে হয়েছিল। ঠাকুমাদের যুগটা ছিল গৌরীদানের যুগ। তখন নয় বছর বয়সে কিংবা তার চেয়েও কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত। সে হিসেবে বলা যেতে পারে ঠাকুমার একটু বড় বয়সেই বিয়ে হয়েছে। চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি তো পাকা গিন্নী। শ্বশুরবাড়ীতে থাকতেন। সুতরাং বাপ-মাকে সেবা করার প্রশ্ন ওঠে না। নন্দিনীর বয়স চৌদ্দ। এবয়সে ঠাকুমার দিন কেটেছে বাপের বাড়ীতে বাপ-মা-ভাইবোনদের নিয়ে নয়, শ্বশুরবাড়ীতে শাশুড়ী-শ্বশুর, স্বামী-দেওর-ভাসুর, জা-ননদ নিয়ে। মাঝে মাঝে ক্বচিৎ কখনও বাপের বাড়ী এলে বিনা কাজে আলস্য-মন্থর দিনগুলি আনন্দে কাটিয়ে দেওয়ার দিকেই লক্ষ্য থাকত।

নন্দিনীরা স্বতন্ত্র যুগের মেয়ে।

তারা স্কুলে-কলেজে পড়ে। কুড়ি-বাইশ কিংবা তারও চেয়ে আরও বড় বয়সে বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামীর কর্মস্থলে চলে যায়। শ্বশুর-শাশুড়ী, ভাসুর-দেওর, জা-ননদ নিয়ে ঘর করার সুযোগও বড় একটা ঘটে না। কেউ কেউ আবার চাকরিও করে। তাদের আবার ঝি-চাকরের সংসার। যেকোন ক্ষেত্রেই হোক তাদের জীবন সঙ্কীর্ণ দাম্পত্য জীবন।

ভাল-মন্দর কথা হচ্ছে না। যুগের পরিবর্তন হচ্ছে। সমাজে যে পরিবর্তন এসেছে তারই কথা বলা হচ্ছে। ঠাকুমাদের পক্ষে নাতনীদের বোঝা আজকাল কঠিন হয়েছে।

তাই ঠাকুমার পক্ষে নন্দিনীকে বুঝতে অসুবিধা হয়।

সমাজ বদলেছে, কিন্তু বয়সের একটা ধর্ম আছে। যে ধর্ম বড় একটা বদলায় না। এই বয়সে মেয়েদের মনে স্নেহ-মায়া-মমতার স্ফুরণ হয়। তার জন্য একটা অবলম্বন চাই। নন্দিনী সেই অবলম্বন খোঁজে তার অসহায় বাবার মধ্যে, সহোদর ভাইয়ের মধ্যে।

বসন্ত বাবাকে ভক্তি করে। তাইতেই তার মন তৃপ্ত। নন্দিনীও তার বাবাকে ভক্তি করে। কিন্তু তাইতেই তার মন তৃপ্ত নয়। তার ক্ষেত্রে পিতৃভক্তির সঙ্গে সন্তান-বাৎসল্যের রস এসে মিশেছে। বাবাকে সে সন্তানের মত স্নেহে অভিষিক্ত করতে চায়।

এইখানেই তার সঙ্গে ঠাকুমার প্রতিযোগিতা লেগেছে।

কেউ তার অধিকার ছাড়তে রাজী নয়। না মা, না মেয়ে।

একদিন ঠাকুমা রেগে বললেন, দাঁড়া, বিভূতিকে বলে তোর বিয়ের ব্যবস্থা করছি। তোকে বিদায় করতে না পারলে আর এবাড়ীতে শান্তি নেই।

নন্দিনীও বলল, করো না দেখি, কেমন বিদায় কর। এম. এ. পাশ না করে আমি এবাড়ী ছেড়ে নড়ছি না।

বিস্মিত কণ্ঠে ঠাকুমা বললেন, সে সব তো অনেক দেরি?

নন্দিনী হেসে বললে, তা কিছু দেরি আছে বৈকি।

—ততদিন আমাকে জ্বালাবি?

—এ তো তোমার বড় অন্যায় কথা ঠাকুমা। আমার বাবার জন্যে আমি দু-একটা খাবার করি, কি তার সেবা-শুশ্রূষা করি, তাতে তুমি জ্বালাতন হবে কেন?

সত্যি। কেন হবেন? এ প্রশ্নের কোন জবাব নেই। এবং জবাব দিতে না পেরে আপনিই ঠাকুমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, কেন, সে আমি তোদের বলতে পারব না। মা হ, তারপর বুঝবি।

নন্দিনী হেসে জিজ্ঞাসা করলে, ঠাকুমা, তুমি কি কোনদিন মেয়ে ছিলে না?

মেয়ে? কি জানি, ছিলাম নিশ্চয়ই।—ঠাকুমা হেসে বললেন, সে ঠিক মনে পড়ে না। কেন বলতো?

—তাহলে মেয়ের কথা বুঝতে।

ঠাকুমা রেগে বললেন, তুই কি বলতে চাস, মেয়ে মায়ের বড়?

এই সময় বসন্ত পাশ দিয়ে কোথায় যাচ্ছিল। তাকে থামিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে ঠাকুমা বললেন, তুই বলতো বসন্ত, মা বড়, না মেয়ে বড়? তুই এর মীমাংসা করে দে।

বসন্ত একবার ঠাকুমার আর একবার নন্দিনীর দিকে চাইলে। হেসে বললে, তাহলে একটা গল্প বলি ঠাকুমা : একবার ব্যাসদেবের সঙ্গে শঙ্করাচার্যের এক বিষয় নিয়ে তর্ক হয়। কে মীমাংসা করে দেবে? বললেন, চল উভয়ভারতীর কাছে যাই। তিনিই মীমাংসা করে দেবেন। গেলেন দুজনেই উভয়ভারতীর কাছে। তাঁকে তর্কের বিষয় বললেন। শুনে তিনি বললেন, দেখুন, শঙ্করাচার্য সাক্ষাৎ শঙ্কর, মানে শিব। আর ব্যাসদেব তো সাক্ষাৎ নারায়ণ। তাঁদের মধ্যে বিবাদ উপস্থিত হলে আমি কি করতে পারি?

বলে বসন্ত বললে, আমারও হয়েছে তাই। তুমি সাক্ষাৎ ঠাকুমা। নন্দিনী সাক্ষাৎ নন্দিনী। আমি সামান্য লোক। তোমাদের বিবাদের মীমাংসা করতে আমি পারব না।

বসন্ত হনহন করে বেরিয়ে চলে গেল।

ঠাকুমা আর নন্দিনী পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে হো হো করে উচ্চকণ্ঠে হেসে উঠলেন।

পড়বার ঘরে বসে নন্দিনী পড়া করছিল। এমন সময় বসন্ত এল।

জিজ্ঞাসা করলে, দুহিতা শব্দের মানে কি বলতো?

নন্দিনী বললে, তা আর কে না জানে! দুহিতা মানে মেয়ে।

—কি করে হল জানিস?

—না। কি করে?

বসন্ত বললে, হুঁ হুঁ বাবা, সেটি তো জান না!

নন্দিনী বললে, তুমি বলে দাও না।

বসন্ত বললে, দোহন করা থেকে। পুরাকালে মেয়েরাই দুগ্ধ দোহন করত। সেই দোহন শব্দ থেকেই দুহিতা শব্দের উৎপত্তি। একথা কেন মনে পড়ল জানিস?

—না।

—পথে আসতে দেখছি একটা বাড়ীতে বিয়ে হচ্ছে। খুব সানাই বাজছে। বহু লোক এসেছে। তাদের খাওয়া দাওয়া চলছে। মনে পড়লো, এই তো বাবা দুহিতা। পুরাকালে এরা দুগ্ধ দোহন করত। এখন বিয়ের সময় বাপকে দোহন করে!

বসন্ত হো হো করে হাসতে লাগল।

নন্দিনী বললে, আহা! তাই বুঝি! দোহন তো বরের বাপ করে। মেয়েদের এতে কোন হাত আছে নাকি? তা যদি থাকতো তাহলে প্রত্যেক মেয়ে বাবাকে বলতো, আমাকে কিছু দিতে হবে না বাবা, তোমার আশীর্বাদ ছাড়া আমি আর কিছু চাই না।

বলতে বলতে নন্দিনীর চোখে জল এসে পড়লো। তারপর বললে, বাপের ঘাড়ে ঋণের বোঝা চাপিয়ে কোন মেয়ের বিয়ে করতে ইচ্ছা করে না, জানো? এর জন্যে কত মেয়ে যে আত্মহত্যা করেছে তা গুনে শেষ করা যায় না। যাকগে। তুমি এখন যাও। আমার পড়া আছে।

বসন্ত যাবার কোন উপক্রম দেখালে না। পাশের একটা চেয়ারে বসে পড়ে বললে, তুই এত পড়িস কেন?

—পাশ করতে হবে না?

—কি হবে পাশ করে? তুই তো আর চাকরি করতে যাবি না। দিব্যি পরের ঘাড়ে বসে খাবি।

হাত নেড়ে নন্দিনী বললে, পরের ঘাড় অত সস্তা নয়, মশাই। ভোর থেকে রাত দশটা পর্যন্ত খাটলে তবে দুবেলা দুমুঠো ভাত পাবে। তাছাড়া পড়ছি যখন, তখন পাশ করতে হবে না?

বসন্ত বললে, কি জানি। আমাকে তো চাকরি করে খেতে হবে, কিন্তু পড়বার কোন আগ্রহই তো নেই। ভাবি, কি হবে পড়াশুনো করে? চাকরি কই? কোথায় চাকরি? পাশ করেও ভ্যারেন্ডা ভাজা, না করেও ভ্যারেন্ডা ভাজা। তবে শুধু শুধু রাত জেগে পড়ে শরীর নষ্ট করার মানে কি?

নন্দিনী বললে, তাই যদি বুঝে থাক, তাহলে পড়া ছেড়ে দাও। মিছেমিছি বাপের পয়সা নষ্ট কোর না। আর যদি পড়, তাহলে মন দিয়ে পড়ে ভাল করে পাশ করো।

বসন্ত বিরক্তভাবে বলল, এই হচ্ছে তোদের দোষ। বড় মাষ্টারি করিস।

নন্দিনী হেসে বললে, মাষ্টারি আবার কি করলাম?

—এই যে বললি, মন দিয়ে পড়াশুনা করবে। রাস্তায় রাস্তায় মন্দ ছেলেদের সঙ্গে খেলা করবে না। কখনো কুবাক্য বলবে না। তোরা অল্প বয়সে বড় পেকে যাস।

বলে উঠতে যাচ্ছিল। কি মনে পড়ে যাওয়ায় ফের বসে বললে, ঠাকুমার খবর কী রে? ক-পয়েন্ট জিতলি?

নন্দিনী হেসে বললে, এক পয়েন্টও নয়।

বসন্ত বললে, এ আমি জানতাম। ঠাকুমা বড় শক্ত চীজ! দন্তস্ফুট করে কার সাধ্যি! তবে তুইও সোজা পাত্র নস। লেগে থাক, হয়তো পারবি।

একটা আড় মোড়া ভেঙে নন্দিনী বললে, লেগে তো আছি। দেখা যাক কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

আট

রবীন্দ্রনাথের একটা গান আছে : 'আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্র-ছায়ায় লুকোচুরি খেলা'। শরৎ কালে ধানের ক্ষেতে রোদ ছুটেছে আর তার পিছু পিছু ছুটেছে ছায়া। হঠাৎ দেখা গেল ছায়ার পিছনে ছুটছে রোদ। এখন ছায়া সাধ্য-সাধনা করছে রোদকে, পরমুহূর্তে রোদ সাধ্য-সাধনা করছে ছায়াকে।

ঠাকুমা এবং নন্দিনীর ব্যাপারটাও দাঁড়িয়েছে সেই রকম।

ঠাকুমা নন্দিনীকে তোয়াজ করছেন রবিবারে সব রান্না নন্দিনী করবে। নন্দিনীর মন খুশী-খুশী। হঠাৎ কি হয়ে গেল। নন্দিনী রেগে গেল। ভাতের থালা ফেলে উঠে চলে গেল। সে রান্না করবে না।

তারপরেই আবার নন্দিনী ঠাকুমাকে তোয়াজ করতে আরম্ভ করলে, পরের রবিবারে সে রান্না করবে।

ঠাকুমা বললেন, বেশ, করিস। সেইজন্যে তো তোকে বললাম রান্না করবার জন্যে। তা তোর দেমাক হলো।

নন্দিনী হেসে বললে, আমাকে রাগিয়ে দিলে কেন?

ঠাকুমা বললেন, কি এমন বলেছিলাম, যে মেয়ের অত রাগ?

নন্দিনী বুঝেছে, সেদিনের রাগটা ঠিক হয়নি। সে নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল মেরেছে। বললে, বেশ। আর রাগব না।

তারপরে আব্দারের ভঙ্গীতে বললে, আমি কিন্তু দুবেলা রান্না করব সেদিন।

—দুবেলাই?

—হ্যাঁ।

—পারবি?

—খুব পারব। তুমি বুড়ো মানুষ পার, আর আমি পারব না?

ঠাকুমা ভেতরে-ভেতরে রেগে গেলেন। প্রকাশ্যে হেসে বললেন, তোর আস্পর্ধা তো কম নয়! আমার সঙ্গে তোর তুলনা করিস!

ঠাকুমার বাইরের হাসিটাই নন্দিনীর চোখে পড়ল, ভিতরের ক্রোধটা নয়।

সে হেসে বললে, তুলনা কই করলাম ঠাকুমা? যা বললাম তার অর্থ, তোমার সঙ্গে আমার তুলনা চলে না। তুমি বুড়ো হয়েছো, চোখে দেখ না। আমি বুড়োও হইনি, চোখেও দেখি।

ঠাকুমা রাগে জ্বলে উঠলেন। বললেন, তাই বুঝি?

নন্দিনী বললে, তাই তো বললাম।

ঠাকুমা মনে মনে বললেন, আচ্ছা।

শনিবার রাত্রে ঘুমোবার আগে পর্যন্ত নন্দিনী জানত, কাল সে রান্না করবে। কী রান্না করবে তার একটা ছকও মনে মনে তৈরী করতে করতে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল।

পরদিন সকালে উঠে দেখে, ঠাকুমা রান্নায় বসে গেছেন।

নন্দিনী চেঁচিয়ে বললে, ওকি ঠাকুমা! আজ আমার রান্নার কথা যে! ভুলে গেছ?

মুখ আড়াল করে ঠাকুমা একটা কুটিল হাসি গোপন করলেন। বললেন, ভুলিনি রে, সকালে উঠে আরেকটা কথা মনে পড়ে গেল।

—কী কথা?

—মনে পড়ে গেল, আজ চাপড়া ষষ্ঠী।

—চাপড়া ষষ্ঠী তো কি হয়েছে?

—আজ ছেলের মাকে ছেলের পাতে ভাত ধরে দিতে হয়।

নন্দিনী অবাক। বললে, সেদিন বলোনি কেন?

একগাল হেসে ঠাকুমা বললেন, মনে ছিল না রে। বুড়ো হয়েছি, সব সময় সব কথা মনে পড়ে না।

তর্ক নিষ্প্রয়োজন। ঠাকুমা যখন একবার হেঁসেলে ঢুকেছেন, তখন নন্দিনীকে আর রান্নায় হাত দিতে দেবেন না। সে দুমদুম করে পা ফেলে নিজের পড়ার ঘরে চলে গেল।

যাকে বলে 'ভাঁড় আনতে ষাঁড় পালায়, ষাঁড় আনতে ভাঁড় পালায়'। ষাঁড়ে-ভাঁড়ে আপস আর হয় না।

এত যে কাণ্ড হচ্ছে, বিভূতিবাবু তার কিছুই জানেন না। তিনি অফিস থেকে ফেরেন, জামা-কাপড় ছাড়েন, হাত-মুখ ধোন, চা জলখাবার খেয়ে ক্লাবে বেরিয়ে যান। রাত্রে ফেরেন, খাবার খান, খেয়ে শুয়ে পড়েন।। তাঁর নির্ঝঞ্ঝাট দিনগুলি এমনি করেই কাটে।

কোন কোন দিন ক্লাবে যেতে ভাল লাগে না। চাঁদের আলোয় খোলা ছাদে তক্তাপোশে তাঁর বিছানা হয়। মা কাছে এসে বসেন। মাতা-পুত্রের অনেকক্ষণ পর্যন্ত নানা গল্প হয়। কত পুরোন দিনের গল্প হয়। কত আজকের দিনের কথা।

এমনি করে দিন যায়।

হঠাৎ একদিন তাঁর মনে হলো, কি যেন ঘটেছে। সব যেন ঠিক ঠাক নেই।

কিন্তু কি ঘটেছে? কি ঠিক নেই?

মাকে জিজ্ঞাসা করেন, মা সবাই ভাল আছে তো?

মা বলেন, হ্যাঁ সবাই তো ভাল আছে।

ভাল আছে? ভাল। কিন্তু তবু বিভূতিবাবুর মন খুঁতখুঁত করে।

জিজ্ঞাসা করেন, নন্দিনী ভাল আছে?

—আছে বৈকি।

—কি করছে?

—পড়া করছে।

বিভূতিবাবু আপন মনেই বলেন, অনেকদিন দেখিনি যেন মেয়েটাকে।

ঠাকুমারও মনটা খারাপ হয়ে যায়। আহা! মেয়েটা অনেকদিন বোধহয় বাপের কাছে আসেনি। অভিমানেই আসেনি। কার ওপর অভিমান? বাপের ওপর নয় নিশ্চয়ই। ঠাকুমার ওপর অভিমানেই মেয়েটা নিশ্চয়ই বাপের কাছে আসেনি। কিন্তু ঠাকুমাই বা কি করবেন? তিনি তো আর নন্দিনীকে বাপের কাছে আসতে নিষেধ করেননি।

নন্দিনী বলে, ঠাকুমা নাকি বাপকে তাদের কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছেন! কি আড়াল করে রেখেছেন? ঠাকুমা ছেলের কাছে তাঁর নিজের জায়গাটিতে এসে বসেন। ওরাও ওদের জায়গাটিতে এসে বসলে পারে। কেউ তো নিষেধ করেনি।

তবু ছেলের কথায় যে দু:খের সুর বাজল তা মায়ের বুকেও বিঁধল।

ঠাকুমা বললেন, ডাকব নন্দিনীকে?

—না থাক।

বিভূতিবাবু চোখ বন্ধ করলেন।

মা অনেকক্ষণ বসে রইলেন। অনেক গল্প করলেন। কিন্তু গল্প আর জমল না।

ছেলের দু:খে মায়ের মন ভারী হয়ে উঠলো। খাবার সময় হয়ে এসেছিল। বিভূতিবাবু ওপরে বসে একলা খান। ছেলেরা নীচে রান্না ঘরে। আজ ঠাকুমা করলেন কি, সকলকে একসঙ্গে রান্নাঘরে জায়গা করে দিলেন।

একসঙ্গে খেতে বসে বিভূতিবাবুর মন খুশী হয়ে উঠলো। যেন অনেকদিন পরে ছেলেমেয়েদের দেখতে পেলেন।

জিজ্ঞাসা করলেন, তোরা কোথায় থাকিস রে?

বসন্ত বাপের সঙ্গে বড় একটা কথা বলে না। নন্দিনী বললে, বাড়ীতেই ছিলাম।

বিভূতিবাবু বললেন, দেখিনি তো।

নন্দিনীর মনে হলো বলে, দেখবে কি? যা তোমার রায়বাঘিনী মা দিনরাত তোমায় পাহারা দিচ্ছেন, কাছে ঘেঁসে কার সাধ্যি!

কিন্তু সে কথা বললে না। বললে, পড়া করছিলাম।

—তোর পরীক্ষা কবে রে?

—এখনও দেরি আছে।

—মাষ্টারমশাই আসছেন রোজ?

নন্দিনী ঘাড় নেড়ে জানালে, আসছেন।

অনেকদিন পরে বাপে-মেয়েতে কথা। বিভূতিবাবু স্বভাবত স্বল্পভাষী। কিন্তু আজ যেন তাঁকে কথায় পেয়ে বসেছে। ভেবেচিন্তে কথা নয়, যা মুখে আসছিল সেই কথা।

জিজ্ঞাসা করলেন, তোর কোন ক্লাস হল রে?

নন্দিনী এবং সেই সঙ্গে বসন্তও অবাক হয়ে গেল! ছেলেমেয়েরা কোন ক্লাসে পড়ে বাবা তা জানেন না!

নন্দিনী বললে, ক্লাস এইট চলছে।

ওদের বিস্মিত চোখের দৃষ্টিতে বিভূতিবাবু অপ্রস্তুত হলেন। গভীরভাবে বললেন, পড়। মন দিয়ে পড়াশুনা কর। এখন থেকে না পড়লে শেষে পরীক্ষায় ভাল করে পাশ করতে পারবে না।

ঠাকুমা পড়াশুনার কথা বোঝেন না। তিনি লক্ষ্য করলেন, বিভূতিবাবু আজ যেন দুটি বেশী খেলেন। কদিন থেকে তাঁর খাওয়া যেন ধীরে ধীরে কমে আসছিল।

বিভূতিবাবুকে দুটি ভাত বেশী খাওয়ানোর চেয়ে আনন্দের আর কিছু ঠাকুমার ছিল না। ছেলেবেলায় দুটি ভাত বেশী খেয়ে বিভূতিবাবু মায়ের কাছ থেকে দুটি পয়সা আদায় করতেন। বড় হলে পয়সা আদায়ের ব্যবস্থাটা লোপ পেয়ে যায়। কিন্তু মাতৃহৃদয়ের ভিতরের আনন্দটা আজও অব্যাহত আছে।

পরদিন সকালে অফিস যাবার জন্য বিভূতিবাবু যখন খেতে বসলেন, ঠাকুমা বসন্ত, নন্দিনীকেও ডাকলেন : তোরা এই সঙ্গে খেয়ে নে না। হেঁসেলের ঝামেলাটা তাহলে সকাল সকাল চুকে যায়।

ওরা অবাক।

বসন্ত বললে, আমরা এখন খাব কি ঠাকুমা? আমাদের কি স্কুলে যাবার সময় হয়েছে?

ঠাকুমা বললেন, তা হোক। না হয় খেয়ে দেয়ে একটু বিশ্রাম করবি। সেটাও তো কিছু খারাপ না।

নন্দিনী ঝাঁঝের সঙ্গে বললে, তুমি কি পাগল হয়েছ ঠাকুমা! আমাদের কখন স্কুল। এখনও স্নান করিনি। এখন থেকে সাত-তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে বিশ্রাম করব!

ঠাকুমাকে অগত্যা কৌশলটা ফাঁস করতে হল। বললেন, কি জানিস, কাল দেখলাম কিনা তোদের সঙ্গে খেতে বসে বিভূতি দুমুঠো ভাত বেশী খেলে।

ওরা দুই ভাই বোনে হো হো করে হেসে উঠল। বললে, এক চালাকি রোজ রোজ খাটাবে ভেবেছ। কাল খেয়েছেন, খেয়েছেন। তাই বলে আজও খাবেন। তোমার ছেলে কি কচি ছেলে? পেটের আন্দাজ নেই?

ওরা খেলে না। বিভূতিবাবু একলাই খেলেন। ঠাকুমার মনে হয়, কালকের মত তৃপ্তি করে আজ বিভূতি খেলে না। নাতি-নাতনীর ওপর তিনি রেগে গেলেন। ভাবলেন, আজকালকার ছেলেমেয়ের কি বাপের ওপর শ্রদ্ধা আছে?

বসন্ত, নন্দিনীও ঠাকুমার একটা দুর্বলতার সুযোগ পেয়ে গেল। রাত্রেও বাবার সঙ্গে খেতে বসল না।

ঠাকুমা ডাকতে গেলেন।

নন্দিনী বিরক্ত ভাবে বললে, আমাদের এখন জ্বালিও না ঠাকুমা। আজ বাদে কাল পরীক্ষা। যাকে বলে 'শিরে সংক্রান্তি'। আমাদের খেতে দেরি আছে। তুমি যাও।

বলে উচ্চ কণ্ঠে ইতিহাস পড়তে লাগল।

অগত্যা বিভূতিবাবুর রাত্রের খাবার ঠাকুমা ওপরে নিয়ে গেলেন। প্রতিদিনকার মত উপরের বারান্দায় বিভূতিবাবু একাই খেলেন। চোখের দোষ, কী মনের ভুল কে জানে, এবেলাতেও ঠাকুমার মনে হয়, বিভূতির খাওয়াটা তৃপ্তি করে হল না। হয়তো পেটই ভরল না। রাত্রিতে ক্ষিধে পেয়ে যাবে।

রান্নাঘরে গিয়ে লুকিয়ে ঠাকুমা একপ্রস্থ কেঁদে নিলেন।

কিন্তু শুধু কাঁদলেই তো হবে না। দুমুঠো ভাত বেশী খাওয়াবার জন্য দুফোঁটা চোখের জল বেশী ফেললে কিছু হবে না। নাতি-নাতনী দুটো কথা শোনে না। ঠাকুমার কথা শুনে তারা হাসে। যেন ব্যাপারটা একটা প্রকাণ্ড রসিকতা।

বসন্ত বেটাছেলে, বারমুখ। তাকে বললে কিছুই কাজ হবে না। নন্দিনী, হাজার হোক, মেয়েমানুষ। মেয়েদের বাপের উপর টান থাকে। মায়ামমতা থাকে। বুঝিয়ে বললে সে হয়তো বুঝবে।

ঠাকুমা তাকেই বললেন। বললেন, তোর তো বাপের ওপর খুব টান নন্দিনী। না কি বল?

নন্দিনী কিছুই বললে না। শুধু জিজ্ঞাসুচিত্তে ঠাকুমার মুখের দিকে চেয়ে রইল।

ঠাকুমা আবার বললেন, আমি জানি তোর বাপের ওপরে খুব টান।

সবিস্ময়ে নন্দিনী জিজ্ঞাসা করলে, কি ব্যাপার?

ঠাকুমা বললেন, তোর বাবার খাওয়া কমে গেছে লক্ষ্য করেছিস।

সেটা যে একটা লক্ষ্য করবার মত ব্যাপার তাই নন্দিনীর ধারণা নেই।

বললে, না।

ঠাকুমা বললেন, হ্যাঁ। আমি কদিন থেকে লক্ষ্য করছি বিভূতি সেদিন যেমন তৃপ্তি করে খেয়েছিল তেমন তৃপ্তি করে আর খাচ্ছে না।

নন্দিনী জিজ্ঞাসা করলে, কোনদিন?

—যেদিন তোরা দুই ভাইবোনে বিভূতির সঙ্গে খেতে বসেছিলি।

—সেদিন হয়তো শরীরটা ভাল ছিল।

—শরীর নয়, মন। তোদের সঙ্গে তোর বাপের দেখাই তো হয় না। বাপের মন তাতে ভাল থাকে?

নন্দিনী বললে, তা আমরা কি করব? আমাদের করবার কিছু নেই।

—কেন নেই? তোরা বাপের কাছে একটু বসতে পারিস না? তার সঙ্গে খেতেও তো পারিস।

নন্দিনী গম্ভীর হয়ে বললে, না, পারি না। তোমাকে তো বলেছি, বাবাকে তুমি আমাদের কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছ।

ঠাকুমাকে আর কথা বলবার সুযোগ না দিয়ে নন্দিনী চলে গেল।

ঠাকুমা নিজের জালে নিজেই পড়ে গেছেন।

বসন্ত সংসার সম্বন্ধে উদাসীন,—ছেলেরা যা হয়ে থাকে। সে দু'বেলা দুটি খায়। পড়ে কি না পড়ে; বাইরে বাইরে আড্ডা দিয়ে বেড়ায়। আর নন্দিনী শক্ত মেয়ে। অত্যন্ত জেদী। তার সেই যে গোঁ—ঠাকুমা তার বাবাকে তার কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছেন,—সেটা সে কিছুতেই ছাড়ছে না। এদিকে মায়ের চোখকে ফাঁকি দেওয়া যায় না; বিভূতিবাবুর খাওয়া দিন দিন কমে যাচ্ছে।

ঠাকুমা অস্থির হয়ে উঠলেন। তিনি কার কাছে যাবেন? দু:খের কথা কাকে বলবেন? তাঁর কথা শুনবারও কেউ নেই, তাঁর দু:খ বোঝবারও কেউ নেই।

কয়েকদিন মন গুমরে থেকে তিনি অবশেষে বিভূতিবাবুর কাছেই গেলেন।

বললেন, হ্যাঁরে তোর শরীরটা কী ভাল যাচ্ছে না?

বিভূতিবাবু অবাক। বললেন, কেন, ভাল যাবে না কেন? ভালই তো যাচ্ছে।

ম্লান হেসে ঠাকুমা বললেন, মায়ের চোখকে কি ফাঁকি দেওয়া যায় রে! আমি জানি ভাল যাচ্ছে না।

বিভূতিবাবু মহা বিব্রত হয়ে পড়লেন। ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছেন, মা যখন তার স্বাস্থ্য নিয়ে পড়েন, তখন তাঁকে নাজেহাল করে ছাড়েন। সুস্থ শরীরকে অকারণে ব্যস্ত করবার দক্ষতা তাঁর অসামান্য। বোধকরি সব মায়েদেরই এই দক্ষতা অল্প-বিস্তর আছে।

বিভূতিবাবু ভয় পেয়ে বললেন, বিশ্বাস করো, মা, আমি ভালই আছি। বেশ ভালই আছি। সত্যি কথা বলতে কি, এমন ভাল অনেক দিন ছিলাম না।

অবিশ্বাসের ভঙ্গীতে ঠাকুমা বললেন, আমাকে লুকিয়ে কি করবি? আমি জানি কেন তোর শরীর-মন খারাপ।

মাকে নাছোড়বান্দা দেখে বিভূতিবাবু হেসে ফেললেন। বললেন, তাও জান? আচ্ছা বল, কেন শরীর-মন খারাপ।

ঠাকুমা বললেন, বলব শুনবি? ছেলেমেয়েদের সঙ্গ পাস না বলে।

বিভূতিবাবু আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন, ওরা আমাকে কবে সঙ্গ দেয়? বসন্তটা তো আমার ছায়া দেখলে লুকিয়ে পড়ে চিরকাল। নন্দিনী ছোট বয়সে আমার কাছে এসে বসত বটে, বড় হয়ে পড়ার চাপ বাড়ার জন্যে বোধহয় আসতে পারে না। সেজন্যে আমার মনই বা কেন খারাপ হবে, শরীরই বা কেন খারাপ করবে?

ঠাকুমা বললেন, মেলা বাজে বকিসনে। আমি মা। তোর মনের কোন কথাটা আমি বুঝতে পারি না?

বিভূতিবাবু বললেন, সব কথা হয়তো বুঝতে পার মা। তবু বলব এই কথাটা বুঝতে পারনি।

ঠাকুমা এবার রেগে গেলেন।

বললেন, বুঝতে পারিনি? তবে শোন বলি। সেদিন তুই ছেলেমেয়েদের সঙ্গে একসঙ্গে খেতে বসেছিলি মনে আছে?

—আছে।

—সেদিন তুই বেশ তৃপ্তি করে খেয়েছিলি। দু'মুটো ভাত বেশীই খেয়েছিলি।

—তা হতে পারে।

—হতে পারে নয়, হয়েছে। তুই একটি ভাত বেশী খেলে আমি বুঝতে পারি, জানিস?

বিভূতিবাবু হেসে বললেন, না তা জানি না।

ঠাকুমা নিজের কথার ঝোঁকেই বলে চললেন, সেদিন তৃপ্তি করে খেলি। তারপর ওরা আর তোর সঙ্গে বসছে না। তোরও খাওয়া কমে গেল।

বিভূতিবাবু জোড় হাত করে বললেন, দোহাই তোমার, এ অনুমান সত্যি নয়। এসব বাজে কথা ভেবে তুমি নিজের শরীরও নষ্ট করো না, আমার শরীরও নষ্ট করো না।

বিভূতিবাবু হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলেন।

নয়

দেখতে দেখতে ঠাকুমা যেন কী রকম হয়ে গেলেন।

রান্না-বাড়া, সংসারের কাজ-কর্ম সবই করছেন। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু কিছু ভুল হয়ে যাচ্ছে। এই সংসারের প্রত্যেকটি ঘর তাঁর নিজের হাতে সাজান। কোথায় কোন জিনিসটি আছে তাঁর নখদর্পণে। এখন ভুল হচ্ছে। সব সময় সব কথা মনে পড়ছে না।

বসন্ত হাঁকলে, ঠাকুমা সার্টটা কোথায়?

ঠাকুমা বললেন, ঐখানেই আছে।

—কোন খানে?

—যেখানে থাকে। আলনায়। দয়া করে চোখ মেলে একটু দেখ।

বসন্তর স্কুলের বেলা হয়ে যাচ্ছিল। বড্ড তাড়া।

বললে, চোখ মেলেই দেখছি ঠাকুমা। কোথাও পাচ্ছি না।

ঠাকুমা উঠলেন। যেখানে সার্ট থাকে এবং যেখানে থাকে না সমস্ত জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজলেন। কোথাও পাওয়া গেল না।

আপনমনেই বললেন, কোথায় গেল?

হঠাৎ মনে পড়ল, সার্টটা ময়লা দেখে তিনি সাবান দেবার জন্য সরিয়ে রেখেছেন।

বললেন, সেটা সাবান দেবার জন্য ফেলে দিয়েছি রে।

আর একদিন।

স্কুলে যাওয়ার মুখে নন্দিনীর চিৎকার শোনা গেল : ঠাকুমা, আমার পেনটা কোথায়?

নীচের থেকে ঠাকুমা ঝঙ্কার দিলেন : তা আমি কি জানি?

—জান না তো, কে নিলে?

—বলছি তো আমি জানি না। দিন-রাত্তির নেত্য করে বেড়াচ্ছিস, কোথাকার জিনিস কোথায় ফেলেছিস, তোরাই জানিস। আমাকে টানাটানি করছিস কেন?

খুঁজতে খুঁজতে আলমারীর মাথার ওপর ফাউন্টেন পেনটা পাওয়া গেল ধোপার খাতার মধ্যে।

বললে, এই তো পাওয়া গেল।

ঠাকুমা বললেন, পাবি না কেন? বাড়ীর থেকে যাবে কোথায়?

নন্দিনী হেসে বললে, কোথায় পাওয়া গেল জান?

—ঐখানেই কোথাও ছিল। চোখ মেলে তো দেখ না।

—তোমার ধোপার খাতার মধ্যে ছিল। নিশ্চয় তুমি ধোপার খাতা লেখবার জন্যে কলমটা নিয়েছিলে। তারপরে ভুলে গেছ।

ঠাকুমার মনে পড়ল। বললেন, তাই বটে রে। কালকেই নিয়েছিলাম ধোপার খাতাটা লিখতে। তারপরে ভুলে গেছি।

বলেই বললেন, আজকাল আমার সব ভুল হচ্ছে রে। সব সময় সব কথা মনে পড়ছে না।

নন্দিনী হেসে বললে, ভুলের আর দোষ কি? বয়স কত হল?

ঠাকুমা বললেন, আমার বয়সের হিসেব বিভূতি। বিভূতির চেয়ে আমি পনেরো বছরের বড়।

বলেই অন্যমনস্ক হয়ে বললেন, বিভূতিকে নিয়ে পনেরো বছর বয়সে বিধবা হই। সেকি আজকের কথা!

নন্দিনী বললে, বাবার বয়স পঁয়তাল্লিশ হলো। তাহলে তোমার বয়স ষাট।

ঠাকুমা বললেন, ষাট কি কম বয়স রে! বিধবার ষাট বছর বয়স অনেক বয়স।

ঠাকুমার কণ্ঠস্বর গাঢ় হয়ে উঠল।

ঠাকুমা কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছেন। ডাকলে সাড়া পাওয়া যায় না। রান্না চড়িয়ে হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। তাঁর হাতের রান্না ছিল অপূর্ব। সেই রান্না যে খেয়েছে সে আর ভুলতে পারে নি। সে রান্নাও কি রকম খারাপ হয়ে গিয়েছে।

একদিন বিভূতিবাবু বললেন, মা, তোমার শরীর কি ভাল নেই?

মা বললেন, কেন ভালই তো আছে।

বিভূতিবাবু চুপ করলেন।

ঠাকুমা বললেন, ওকথা জিজ্ঞাসা করলি কেন? আমার শরীর কি খুব খারাপ দেখাচ্ছে?

বিভূতিবাবু বললেন, না এমনি জিজ্ঞাসা করলাম।

বিভূতিবাবু খাচ্ছিলেন। ঠাকুমা সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ঠাকুমা বললেন, তরকারিটা কি ভাল হয়নি বিভূতি? বিভূতিবাবু হেসে ফেললেন। মায়ের মনে আঘাত দেওয়ার ইচ্ছা ছিল না।

বললেন, না মন্দ হয়নি। কিন্তু কদিন থেকে তোমার রান্নার সে স্বাদ পাচ্ছি না। তাই জিজ্ঞাসা করছিলাম, তোমার শরীর ভাল আছে কিনা?

ঠাকুমা জবাব দিলেন না। গুম হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। একটু পরে বললেন, একটা ঠাকুর রাখবি?

বিভূতিবাবু বললেন, এই বয়সে তুমি কষ্ট করে রান্না কর, আমার ভাল লাগে না। কতদিন ঠাকুর রাখার কথা তোমাকে বলেছি। তুমিই রাজী হওনি। বলেছ, আমি যতদিন আছি ততদিন ঠাকুর রাখবি না। এখন যদি তোমার মত হয়ে থাকে, তাহলে ঠাকুরের খোঁজ করতে পারি।

—তাই দেখ। আমার রান্না খেতে তোর কষ্ট হচ্ছে।

বলে উদগত অশ্রু গোপন করবার জন্য বোধহয় ঠাকুমা দ্রুতবেগে সরে গেলেন।

আহারান্তে বিভূতিবাবু নন্দিনীকে ডাকলেন। বললেন, হ্যাঁরে তোর ঠাকুমার দিকে নজর-টজর রাখিস?

নন্দিনী অবাক হয়ে বললে, কেন কি হয়েছে?

বিভূতিবাবু বললেন, মায়ের শরীরটা বোধহয় ভাল যাচ্ছে না। কাজে কর্মে একটু আধটু সাহায্য করিস।

নন্দিনী বললে, সাহায্য করব কাকে? তিনি কি কারও সাহায্য নেবেন? একা সমস্ত করবেন। কাউকে রান্নাঘরে ঘেঁষতে দেবেন না।

বিভূতিবাবু বললেন, জানি। ওঁর সাধ আছে। কিন্তু বয়স তো হচ্ছে, সাধ্য নেই। তুমি বড় হয়েছ, কৌশলে মিষ্টি কথায় ওঁর হাতের কাজ কেড়ে নেবে, তবে তো। দেখছ মায়ের রান্না কত খারাপ হয়ে গেছে।

নন্দিনী সায় দিলে : হ্যাঁ। আমি দেখেছি, রান্না চড়িয়ে তিনি বসে-বসে অন্যমনস্ক ভাবে কী যেন ভাবেন। কতদিন রান্না পুড়ে যায়। গন্ধে চমক ভাঙলে সে রান্না ফেলে দিয়ে আবার রান্না চড়ান। ঠাকুমার কি হয়েছে কে জানে?

—তাই নাকি?

—আজকাল সন্ধ্যার পরে তোমার কাছেও বসেন না। কিংবা বসলেও তখনি উঠে চলে যান। সংসার থেকেই যেন ওঁর মন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।

বিভূতিবাবু বললেন, তাই নাকি রে! আমাকে বলিসনি তো এসব কথা।

নন্দিনী বললে, না, বলিনি। কি আর বলব?

বিভূতিবাবু বললেন, ঠাকুর রাখার কথা বলছিলাম। অন্যদিন রাজি হন না। আজ যেন মনে হল নিমরাজি।

ব্যস্তভাবে নন্দিনী বললে, না বাবা, ঠাকুর রাখতে যেও না। তাহলে আর ঠাকুমা বাঁচবেন না। তিনিই রান্না করবেন। অবসর সময়ে আমি সাহায্য করব। দেখি কি হয়।

বিভূতিবাবু চিন্তিত মুখে আপিস গেলেন।

মা আর বাঁচবেন না, তাঁকে ছেড়ে চলে যাবেন, এ অবস্থার কথা ভাবতেই তিনি চোখে অন্ধকার দেখলেন।

কদিনের মধ্যে বাড়ীটা কিরকম বিপর্যস্ত অবস্থায় এসে দাঁড়াল।

ঠাকুমা সব সময় গুম হয়ে বসে। কাজকর্ম সবই নিয়মিত ভাবে করছেন। কিন্তু মুখেও হাসি নেই, মনেও স্ফূর্তি নেই। বিভূতিবাবুর কিরকম আলুথালু ভাব। মায়ের খাটুনি অসম্ভব বেড়েছে। এবয়সে অত খাটুনি পোষাচ্ছে না। অবিলম্বে একটা রাঁধবার ঠাকুর পাওয়া না গেলে মা হয়তো মারাই যাবেন। নন্দিনী যে নন্দিনী, ঠাকুমার সঙ্গে নিত্য রেষারেষি, সেও ঠাকুমার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সব সময় ঠাকুমার পিছুপিছু ঘুরছে ঠাকুমাকে সাহায্য করবার জন্য। সুযোগ বেশী পাচ্ছে না। তবু যেটুকু সুযোগ পাচ্ছে তাতেই কৃতার্থ।

শুধু বসন্তর ভাবের কোন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। সে যে ঠাকুমাকে ভালবাসে না, তা নয়। স্বভাবত:ই সে ভাবনা-চিন্তার ধার ধারে না। বিশেষত: ঠাকুমা তো বিছানা নেননি। সুতরাং সে ব্যাপারের গুরুত্ব বিশেষ উপলব্ধি করতে পারে না।

ঠাকুর খোঁজা আরম্ভ হয়েছে। এ বাড়ীতে, বিশেষ করে, ঠাকুমার জন্য নিরামিষ রান্নার প্রাধান্য বেশী। একটা করে ঠাকুর আসছে। পরীক্ষা দিচ্ছে। পাশ করতে পারছে না। ঠাকুমার রান্না যে খেয়েছে, অন্য রান্না তার মুখে রোচা কঠিন।

এরকম করে পরপর চার-পাঁচটা ঠাকুর এলো-গেলো। ঠাকুমা কাউকেই পছন্দ করলেন না। দিনকয়েক নন্দিনীও রাঁধলে। সেও উত্তীর্ণ হতে পারলে না।

বিভূতিবাবু সগর্বে হেসে বললেন, আমার মায়ের রান্না যে খেয়েছে, তার আর কোন রান্না মুখে রুচবে না।

অনেকদিন পর ঠাকুমার মুখে হাসি ফুটলো।

বললেন, কিন্তু আমার রান্না যে খারাপ হয়ে যাচ্ছে, বাবা। তোমরা করবে কি?

বিভূতিবাবু বললেন, তোমার খারাপ রান্নাই অমৃত। সত্যিকথা বলতে কি, তোমার রান্নার জন্যে ঠাকুর খুঁজছি না। তোমার শরীরের জন্যে ঠাকুর খুঁজছি। এতো পরিশ্রম তোমার আর সহ্য হচ্ছে না।

শুনে ঠাকুমা প্রসন্ন হলেন বলে মনে হল না।

ঠাকুমাই রান্না করে যেতে লাগলেন। ঠাকুর খোঁজাও চলতে লাগল। নন্দিনী স্থির করেছে, যতদিন ঠাকুর না পাওয়া যায়, ততদিন সে পড়ার সময় কমিয়ে ঠাকুমাকে সাহায্য করবে। ঠাকুমার আচার-নিয়মের সংসার। নন্দিনী আচার- নিয়ম পালন করে যেতে লাগল। ঠাকুমার শিক্ষায় রান্নাতেও হাত আসতে লাগল। সবচেয়ে আশ্চর্য, ওদের দুজনের মধ্যে রেষা-রেষিটা এই কদিনে অনেক কমে গেছে। কি জানি কেন, ঠাকুমা মন দিয়ে নন্দিনীকে রান্না শেখাতে লাগলেন। ঠাকুমার কতকগুলি বিশেষ রান্না ছিল। কয়েকদিনের মধ্যেই নন্দিনী সেগুলিও আয়ত্ত করে ফেললে।

একদিন তো রান্না খেয়ে বিভূতিবাবু পরম খুশী। সেদিন ঠাকুমার বিশেষ একটি তরকারি রান্না হয়েছিল।

বললেন, এই তো মা তোমার হাত ফিরে এসেছে। তোমার সেই অপূর্ব রান্না।

—আজ সব রান্না নন্দিনী রেঁধেছে।

ঠাকুমার কণ্ঠস্বরে খুশী এবং অখুশী মেশান।

বিভূতিবাবু বললেন, নন্দিনী রেঁধেছে? তোমার সাগরেদের রান্না তবে উতরে গেল!

ঠাকুমা বললেন, তাই বলে ওতো আর রোজ রাঁধতে পারবে না। ওর তো পড়াশুনা আছে।

—তা বটে।

একটু ভেবে বিভূতিবাবু বললেন, ভাল ঠাকুর তো পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু তোমার খাটুনি তো কমা দরকার। আমি বলি কি, যে ঠাকুর পাওয়া যাচ্ছে তাই একটা রাখা যাক। প্রতি রবিবারের রান্না তুমি দেখিয়ে দেবে, নন্দিনী রাঁধবে। ছয়টা দিনের অরুচি সেইদিন ছাড়ান যাবে।

বিভূতিবাবু হা হা করে হাসতে লাগলেন।

ঠাকুমা বললেন, দেখ। যা ভাল বোঝ কর।

দশ

অবশেষে একটি ভাল রাঁধুনী বামুন পাওয়া গেল। কোন একটি বিধবা জমিদার গৃহিনীর খাস পাচক। নিরামিষ রান্নায় সিদ্ধহস্ত। আমিষ রান্নার হাতও ভাল।

প্রথম দিনই সে সকলের চিত্ত জয় করল।

ঠাকুমা খুশী। তাঁর বিভূতির খাওয়ার কষ্ট আর রইল না। তাঁর যত চিন্তা বিভূতির জন্য।

ভোরে যথারীতি তিনি নীচে নামেন। কি রান্না হবে বলে দেন। বাজার এলে তরকারি কুটে দেন। একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে রান্নার তদারক করেন। তারপরে উপরে পূজার ঘরে গিয়ে বসেন।

এতদিন পূজার সময় কম পেতেন। আজ অনেকদিন পরে নির্ঝঞ্ঝাট অবকাশের মধ্যে পূজায় বসলেন।

ছুটি ছুটি ছুটি!

পূজার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নন্দিনীকে বসন্তকে ডেকে ঠাকুমা বললেন, ওরে জানিস, আজ থেকে আমার ছুটি হয়ে গেল!

ওরা বললে, তোমার আবার ছুটি কিসের? তুমি কি চাকরি করতে নাকি?

চোখ বড় বড় করে ঠাকুমা বললেন, ভীষণ চাকরি! বিনা ছুটির চাকরি। অফিসের চাকরিতে ছুটির ব্যবস্থা আছে। আমার চাকরিতে একটি দিনও ছুটি ছিল না।

নন্দিনী জিজ্ঞাসা করলে, আর তোমার কাজ রইল না?

—না। তুই সেই গানটা গাস না, ''বিনা কাজে বাজিয়ে বাঁশি, কাটবে সারা বেলা''? আজ থেকে আমার সেইদিন এসে গেল।

বসন্ত জিজ্ঞাসা করলে, একটি রাঁধবার ঠাকুর আসতেই কি তুমি এতবড় লম্বা ছুটি পেয়ে গেলে?

ঠাকুমা হেসে বললেন, না রে। তাই মনে হচ্ছে বটে। কিন্তু আসলে তা নয়। কিছুদিন থেকেই মনে মনে আমি ছুটির জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম।

নন্দিনী বললে, ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলে তো, আমাকে রান্নাঘরে ঢুকতে দিতে না কেন?

একটু চিন্তা করে ঠাকুমা বললেন, তখন পারিনি। তখন আমার মন কাজের মধ্যে ডুবে ছিল। তারপরে পারতাম। তখন তোকে ডেকেও ছিলাম। তুই এলি না।

নন্দিনী হেসে বললে, আমার রাগ নেই?

নন্দিনীর গাল টিপে ধরে আদর করে ঠাকুমা বললেন, তোমার আবার রাগ নেই? তুমি বাপের আদুরে মেয়ে। তোমার রাগকে সবাই ভয় পায়।

নন্দিনী বললে, তবে তুমি ভয় করতে না কেন?

—ভয় করলে আমার চলত না বলে।

—কেন চলত না?

ঠাকুমা হেসে বললেন, কেন চলত না বুঝতে পারিস নি!

—বাবার জন্যে?

—হ্যাঁ। আমার একদিকে বিভূতি, আরেকদিকে স্বর্গ-মর্ত সব।

নন্দিনী বললে, আজ তো পারলে?

—আজ যে ছুটি হয়ে গেল রে পাগলী!

বসন্ত বললে, ছুটি হয়ে গেল তো তোমার চোখে জল কেন ঠাকুমা?

—জল!

ঠাকুমা তাড়াতাড়ি চোখ মুছে নিলেন। বললেন, কাজে যাদের আনন্দ, ছুটি যতবড় আনন্দেরই হোক না কেন, ছুটিতে তাদের চোখে জল আসে।

তারপর ব্যস্তভাবে বললেন, বিভূতির অফিস যাওয়ার সময় হয়েছে। রান্নার কতদূর হল দেখে আসি।

নন্দিনী হেসে বললে, তাহলে তোমার এখনও পুরো ছুটি হয়নি?

সিঁড়ি দিয়ে নামতে-নামতে ঠাকুমা বললেন, পুরো ছুটি কি একদিনে হয় রে! ক্রমে ক্রমে হবে।

কিছুদিন পরে।

বিভূতিবাবু খোলাছাদে তক্তাপোশে শুয়ে ছিলেন। বিশ্রাম করছিলেন। কিছুক্ষণ আগে তিনি অফিস থেকে ফিরেছেন।

নন্দিনী আর বসন্ত পাশে এসে দাঁড়াল।

ঠাকুমা বিভূতিবাবুকে আর ওদের কাছ থেকে আড়াল করেন না। তবু, পড়ার চাপের জন্যে হোক আর পুরোন অভ্যাস বশেই হোক, বাপের কাছে বড় একটা আসে না। এমন সময় তাদের আসতে দেখে বিভূতিবাবু অবাক হলেন। বললেন, কি রে?

ওরা একবার পরস্পরে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। নন্দিনীই কথাটা পাড়লে। বললে, ঠাকুমাকে দেখেছ বাবা?

বিভূতিবাবু চমকে উঠলেন : কেন?

নন্দিনী বললে, কী যে হয়েছে, তা তিনিই জানেন। ঠাকুর রাখা থেকেই তাঁর শরীরটা মনে হয় খারাপ যাচ্ছে।

বসন্ত বললে, মনটাও ভাল যাচ্ছে না।

বিভূতিবাবু শুয়ে ছিলেন। উঠে বসলেন। চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁর কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করিসনি?

নন্দিনী বললে, জিজ্ঞাসা করলে বলেন, ছুটি হয়েছে।

ছুটি!—বিভূতিবাবু অবাক।

নন্দিনী বললে, ঠাকুর আনা বোধ হয় ভাল হয়নি বাবা।

বিভূতিবাবু বললেন, ভাল হয়নি? ঠাকুর না রাখলে ওঁকে বাঁচান যেত না।

নন্দিনী বললে, তাও সত্যি। কিন্তু এটাও ভাল বোধ হচ্ছে না।

বিভূতিবাবু ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। বললেন, কি রকম বল দিকি।

বসন্ত বললে, শুধু বলছেন, আমার ছুটি হয়ে গেল।

বিভূতিবাবু বললেন, ছুটি? কিসের?

বসন্ত হেসে বললে, কাজের থেকে ছুটি, দায়িত্বের থেকে ছুটি, সমস্ত বন্ধন থেকে ছুটি।

বিভূতিবাবু বললেন, তাই নাকি?

নন্দিনী বললে, তাই তো বলছিলাম। ঠাকুর রাখার ধাক্কাটা বোধ হয় উনি সহ্য করতে পারছেন না।

বিভূতিবাবু বললেন, না না ও কিছু না। এই সংসারের সমস্ত বোঝা মা এতদিন মাথায় করে বয়ে আসছিলেন। সেটা একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। মাথার বোঝা নামাবার ফলে যেমন হালকা বোধ করছেন, অভ্যাসটা চলে যাওয়াতে তেমনি অসোয়াস্তি হয়তো ভোগ করছেন। ওটা দিন কয়েক থাকবে। তারপর কেটে যাবে ধীরে ধীরে। তোরা চিন্তা করিস না।

বিভূতিবাবু ফের নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়লেন।

নন্দিনী আর বসন্ত চলে গেল তাদের পড়ার ঘরে।

বসন্ত বললে, বাবা যাই বলুন, ঠাকুমার ভাবগতিক আমার কিন্তু ভাল লাগছে না।

নন্দিনী বললে, দেখ, ঠাকুমাকে বাবা যেমন চেনেন, তেমন আর কেউ চেনেন না। তিনি যখন বলছেন ভয়ের কিছু নেই, তখন আর ভাবনা করা মিথ্যা।

এমন সময় ঠাকুমা এলেন। বললেন, হ্যাঁরে, বসন্ত, কাল রবিবার। তোর ইস্কুল তো ছুটি।

বসন্ত বললে, রবিবার তো চিরদিনই ছুটি।

ঠাকুমা হেসে বললেন, তাই তো বলছি। কাল আমাকে একবার কালীঘাট নিয়ে যেতে পারিস? অনেক দিন মাকে দেখিনি।

বসন্ত হেসে বললে, অনেকদিন মাকে না দেখে যদি চলে থাকে, তাহলে কালকের দিনটাও চলুক না।

—কেন তোর কিছু অসুবিধা আছে?

—অসুবিধা একটু আছে।

ঠাকুমা বললেন, তা থাক। সময় যখন পাওয়া গেছে, তখন আমি একটা দিনও দেরি করতে চাই না। তোদের সব কাল হয়। কাজে গেঁতোমি। জানিস না, গেঁতোমি করতে করতে রাবণরাজার স্বর্গের সিঁড়ি আর হয়ে উঠল না।

নন্দিনী বললে, তবে যাও দাদা। ঠাকুমার স্বর্গের সিঁড়িতে বাধা দিও না। বলতো আমিও যেতে পারি।

নন্দিনী যাবে শুনে ঠাকুমা খুব খুশী। বললেন, তুইও যাবি? তাহলে খুব ভাল হয়। দেখ, ছেলেরা বাউণ্ডুলে। গৃহস্থ মেয়েদের ধর্মে মতি থাকা দরকার।

বসন্ত বললে, দরকার তো এতদিন কালীঘাট যাওনি কেন?

হেসে ঠাকুমা বললেন, সময় পাইনি, ভাই। সংসারে যা জড়িয়ে ছিলাম। এখন ছুটি পেয়েছি তাই যাচ্ছি।

ওরা ঠাকুমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ছুটির কথায় ঠাকুমার চোখ ছলছল করে উঠেছে।

—তাহলে একথাই রইল। আমরা খুব ভোরে বেরুব। ধর পাঁচটায়। স্নান করে মাকে পূজা দিয়ে আমরা নটার মধ্যে ফিরে আসব।

বলেই ঠাকুমা তাড়াতাড়ি চলে গেলেন।

তাঁর কল্যাণে পূজা, দর্শন সবই বেশ ভালভাবে হল।

বিভূতিবাবু কথাটা শুনলেন। খুশীই হলেন বলে মনে হল।

বললেন, মা তুমি বাড়ীর বাইরে কখনও বড় একটা বেরোও না। আমাকে ছেড়ে দূরে তুমি যেতে পারবে না জানি। কাছাকাছি যেখানে যাওয়ার ইচ্ছা হবে, আমাকে জানাবে। আমি ব্যবস্থা করব।

বসন্তর দিকে চেয়ে বললেন, মাকে ট্যাক্সি করে নিয়ে যাবি। নাহলে মার কষ্ট হবে। মা ট্রামে কখনও চড়েছেন বলে মনে তো পড়ে না।

বলে মায়ের দিকে চাইলেন।

অপ্রস্তুতভাবে ঠাকুমা বললেন, না না, চড়েছি বইকি। দু-চার বার চড়েছি।

বসন্ত খুব যত্ন করে ঠাকুমাকে নিয়ে গেল। একটি ভাল পাণ্ডা পাওয়া গিয়েছিল। তাঁর কল্যাণে পূজা, দর্শন সবই বেশ ভালভাবে হল। ঠাকুমা খুশী।

ফেরবার পথে বসন্ত বললে, চল ঠাকুমা, তোমাকে হাইকোর্ট দেখিয়ে নিয়ে যাব।

নন্দিনী হেসে বললে, হাইকোর্টে।

ঠাকুমা বললেন, সেখানে ঠাকুর-দেবতা কিছু আছে নাকি?

বসন্ত হেসে বললে, আছে বইকি! কাঁচাখেগো দেবতা আছে।

ঠাকুমা ভয় পেয়ে বললেন, না ভাই, ওসব দেখব না। তাছাড়া তোর বাবার খাবার সময় হয়ে গেছে। আমি কাছে দাঁড়িয়ে না থাকলে তার খাওয়াই হয় না।

কিন্তু ওরা যখন বাড়ী ফিরল, তখন বিভূতিবাবু অফিসের পোশাক পরে বেরুচ্ছেন। রবিবারেও তাঁকে কয়েক ঘণ্টার জন্য অফিসে যেতে হয়।

ওরা ট্যাক্সি থেকে নামছেন, বিভূতিবাবু দরজার গোড়ায় হাসিমুখে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, পূজা দিয়ে এলে মা? কেমন দর্শন হল?

ঠাকুমা সেকথার উত্তর দিলেন না। প্রসাদী ফল-ফুল-মিষ্টি ছেলের মাথায় ঠেকিয়ে শুষ্ক কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, তোর খাওয়া হয়ে গেল?

চাঙাড়ির প্রসাদ যথাস্থানে নামিয়ে রেখে ঠাকুমা ছুটলেন বিভূতিবাবুর খাবার জায়গায়। তিনি যা আশঙ্কা করছিলেন—পাতে অনেক কিছু পড়ে আছে।

ঠাকুরকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, বাবুর খাওয়ার কাছে তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে?

ঠাকুর বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ।

ঠাকুমা রেগে জিজ্ঞাসা করলেন, বাবু ভাল করে খাননি তো? রান্না ভাল হয়নি? একদিন ছিলাম না সেইজন্য যত গণ্ডগোল।

নন্দিনী এলো : কি হয়েছে ঠাকুমা?

বিরক্তকণ্ঠে ঠাকুমা বললেন, আমার আবার তীর্থ করা। একদিন ছিলাম না, আমার ছেলেটার খাওয়া হল না।

নন্দিনী হেসে বললে, খাওয়া হল না, কে বললে?

ঠাকুমা বললেন, পাতে কত জিনিস পড়ে আছে, দেখছিস না?

নন্দিনী হেসে বললে, তোমার ছেলে তো কচি ছেলে নয়, ঠাকুমা। যা খাবার, ঠিক খেয়েছেন।

ঠাকুমা রেগে ফেটে পড়লেন। বললেন, তাই যদি তোরা বুঝতিস, তাহলে আমার চিন্তার কি ছিল?

ঠাকুমার ঠাকুর দর্শন শেষ হয়ে গেল। কথা ছিল এরপর একদিন দক্ষিণেশ্বর বেলুড় যাওয়া হবে। ঠাকুমা গেলেন না। এরা বুঝলে, বিভূতিবাবুর খাওয়ার সময় থাকতে পারবেন না বলে গেলেন না।

ঠাকুমার কাজ হল, সকালে উঠে ভাঁড়ার বের করে দেওয়া, তরকারি কুটে দেওয়া এবং রান্নার নির্দেশ দিয়ে পূজায় বসা, তারপর বিভূতিবাবুর খাওয়ার কাছে এসে দাঁড়ানো। অন্য কাজের ব্যতিক্রম ছিল। কিন্তু বিভূতিবাবুর খাওয়ার কাছে দাঁড়ানোর কোন ব্যতিক্রম ছিল না। দুইবেলা খাওয়ার সময় এবং সন্ধ্যাবেলা জলখাবারের সময় সমস্ত কাজ ফেলে তিনি উপস্থিত থাকতেনই।

এমনি চলছিল।

হঠাৎ একদিন রাত্রে দেখা গেল, বিভূতিবাবুর খাওয়ার সময় তিনি অনুপস্থিত।

বিভূতিবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, মাকে দেখছি না ঠাকুর?

এতক্ষণে ঠাকুরেরও হুঁশ হল। চারিদিক চেয়ে বললে, কই, দেখছি না তো।

—কোথায় গেলেন?

তা ঠাকুরও জানে না। আন্দাজে বললে, বোধহয় পূজার ঘরে রয়েছেন।

আপন মনেই বিভূতিবাবু বললেন, এতক্ষণ তো মা পূজার ঘরে থাকেন না!

খেয়ে উঠে মায়ের ঘরে গিয়ে দেখেন, মা খাটের ওপর চোখ বন্ধ করে শুয়ে।

—মা।

ঠাকুমা চোখ মেলে নি:শব্দে চাইলেন।

বিভূতিবাবু চিন্তিতভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, শরীরটা কি ভাল বোধ হচ্ছে না মা?

ঠাকুমা অস্পষ্টস্বরে কী যে বললেন বোঝা গেল না।

মায়ের ললাটের উত্তাপ পরীক্ষা করে বিভূতিবাবু চমকে উঠলেন : উ:! গা যে পুড়ে যাচ্ছে।

থার্মোমিটার দেওয়া দরকার। এবাড়ীতে যে কোথায় কি আছে কিছুই তিনি জানেন না। নন্দিনীকে ডাকলেন।

থার্মোমিটার দিয়ে দেখা গেল ১০৩০ ডিগ্রী জ্বর। বসন্তকে পাঠানো হল ডাক্তারের কাছে।

ডাক্তার এলেন। ঔষধ দিলেন। বললেন, তিনি বাড়ীতেই থাকবেন। দু-ঘণ্টা পর যেন ফোনে তাঁকে জানান হয় রোগিনী কেমন আছেন।

একদিনে ভয়টা কেটে গেল। দুদিন পরে জ্বরও ছেড়ে গেল। ডাক্তার বললেন, খুব দুর্বল। কিছুদিন ধরে সাবধানে রাখতে হবে।

সেবা যত্নের কোন ত্রুটি হল না। বসন্ত, নন্দিনী তো আছেই, বিভূতিবাবুও অফিস থেকে ছুটি নিয়ে দিনরাত্রি মায়ের বিছানার কাছে রয়েছেন।

সেদিন সকালবেলা ফলের রস করে নিয়ে নন্দিনী ঠাকুমার শিয়রে এসে দাঁড়াল।

—এটুকু খেয়ে নাও তো ঠাকুমা।

ঠাকুমা চোখ মেলে চাইলেন। একবার নন্দিনীর দিকে, একবার বিভূতিবাবুর দিকে।

শীর্ণ ক্লান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার ছুটি এখনও হয়নি?

বিভূতিবাবু হা হা করে হেসে উঠলেন : কী ছেলেমানুষের মত বলছ, মা? মায়েদের কখনও ছুটি হয়?

—হয় না?

—না। মায়েদের ছুটি হয় না, মা। আমার মায়েরও ছুটি নেই।

শুক্লাতিথির চাঁদের মত একফালি হাসি ঠাকুমার ওষ্ঠাধরে ফুটে উঠল। ফলের রসটুকু খেয়ে তিনি যেন নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করলেন।

সকল অধ্যায়
১.
মাটি
২.
ভুতের গল্প
৩.
হর্ষবর্ধনের অশ্বরোগ
৪.
সেই মেয়েটি
৫.
বিদ্যাসাগরের ছেলেবেলা
৬.
গোয়েন্দা
৭.
ইতিহাস ছাড়িয়ে
৮.
যমালয়ে জীবন্ত মানুষ
৯.
ডাকিনীর ডাক
১০.
শত্রুতা
১১.
রেলে
১২.
অতু
১৩.
এক যে ছিল বাঘিনী
১৪.
দাওয়াই
১৫.
বিশ্বের বিস্ময় হেলেন কেলার
১৬.
ফুলের বিবাহ
১৭.
মংলুফলায় সোনা
১৮.
একটি গল্প করার মত গ্রাম
১৯.
লালমণি পাখি
২০.
প্লাবন
২১.
ছাত্র-সঙ্গীত
২২.
জয়-পরাজয়
২৩.
এখন শিউলি-বেলা
২৪.
আশ্বিনে
২৫.
ছড়া
২৬.
পোড়ো কুঁড়ে
২৭.
মা (উপন্যাস)
২৮.
গোর্কির ছেলেবেলা
২৯.
সেয়ানে সেয়ানে
৩০.
সুড়ঙ্গের রহস্য
৩১.
এক ঝাঁক গল্প
৩২.
কঙ্কাল
৩৩.
নতুন করে জাগো মা
৩৪.
বেতাল-পঞ্চবিংশতি
৩৫.
ভবঘুরের চিঠি
৩৬.
নিলাম দামী চশমা
৩৭.
শরৎ এল
৩৮.
কৈশোর
৩৯.
আলোর ডাকে
৪০.
অগ্রদূত
৪১.
টাকার কথা
৪২.
সাহস চাই!
৪৩.
ভোজবাড়ীর ব্যাপার
৪৪.
আবাহনী
৪৫.
এবার পূজায়
৪৬.
বামুনের স্বর্গবাস
৪৭.
মজার ধাঁধা
৪৮.
আংটির পাথর
৪৯.
মনমঞ্জুষা
৫০.
নিখিল বঙ্গ গরু সম্মেলন
৫১.
মিকি ডাক আর দিসনে
৫২.
মেঘনাদবধ
৫৩.
চৌধুরী-বাগ
৫৪.
জাদু বিদ্যা
৫৫.
বাবার চিঠি
৫৬.
গানের কথা
৫৭.
আমার প্রথম শিকার আভিযান
৫৮.
বিশ্বক্রীয়া ওলিম্পিক
৫৯.
বাংলার বন্যা
৬০.
শরতে
৬১.
আনন্দ আশ্বিনে
৬২.
টোটকা কিছু
৬৩.
জলদি করুন দাদা
৬৪.
কিশোর বিজ্ঞানীর আসর
৬৫.
সঙ্গীতের মৃত্যু
৬৬.
ছত্রপতি
৬৭.
মেঘ ও বৃষ্টি
৬৮.
মধুপালের আবির্ভাব

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%