দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

শুদ্ধসত্ব বসু
অনেক দিন আগেকার একটা ঘটনার কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল। মানুষের জীবনে এমন অনেক ঘটনা আছে—যেগুলো মাঝে মাঝে মাথা উঁচু করে এক একবার স্মৃতির সাগরে ভেসে ওঠে। বিশেষ করে এক রকমের কোনো ঘটনার হয়তো আলোচনা হচ্ছে—অমনি সমান্তরাল ঐ রকমের একটা ঘটনা টপ করে মনে পড়ে যায়।
আমারও ঘটনাটা সেই রকম ভাবেই মনের মধ্যে এল।
কথা হচ্ছিল ঘোঁৎনাদের বৈঠকখানায় বসে। পূজোর ক'দিন ওদের ওখানেই রোজ আড্ডা বসছে। ঘোঁৎনার দাদু আর রাঁধুনি ছাড়া আর কেউ এখন নেই—সবাই পূজোর ছুটিতে হরিদ্বার গেছেন বেড়াতে। ঘোঁৎনার দাদু থাকেন ওপর তলায়। আমরা ক'জন বন্ধু মিলে নীচের মহলে আড্ডা জমিয়েছি পুরোদমে।
তারিণীদা যথারীতি বললেন—ট্রামে গত মাসে একটা অদ্ভুত ছোটখাটো ডাকাতি দেখলুম।
ট্রামে ডাকাতি?
হ্যাঁ, ডাকাতিই বলবো ব্যাপারটিকে, তবে ডাকাত-ব্যাটার বুদ্ধির তারিফ করতে হয়।
তারিণীদাকে আমরা সবাই চিনি। সত্যিমিথ্যে, বাস্তব, আজগুবি, সম্ভাব্য, অসম্ভব—সব রকম মিলিয়ে মিশিয়ে উপভোগ্য কোনো কিছু তিনি পরিবেশন করবেনই।
আমরা সবাই উৎসুক হয়ে উঠলুম। বলুন, বলুন—চারিদিক থেকে সরব অনুরোধ ঘোষিত হলো।
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তারিণীদা বললেন—ব্যাপারটা ঠিক ডাকাতি নয়—বুঝলি, এ এক ধরনের উঁচুজাতের ছিনতাই বলতে পারিস। গত মাসে যখন আমি খিদিরপুর থেকে আসছিলাম একটা একত্রিশ নম্বরের ট্রাম ধরে, ঘটনাটি ঘটে তখন। ফার্স্ট ক্লাশে উঠতে পারিনি—বড় ভিড় ছিল। সেকেণ্ড ক্লাশে কোনোরকমে উঠে ভেতরে সেঁধোতেই বরাতজোরে একটা বসার জায়গা পেয়ে গেলাম, সেই স্টপে তিনজন লোক নেমে গেল। সে জায়গায় বসলাম আমি।
তারিণীদা, আপনি ভাগ্যবান লোক—বাসে ট্রামে উঠলেই আপনি বসতে পান;—কিন্তু আমরা আপাতত: আপনার দেখা সেই ডাকাতি না ছিনতাই—সেই খবর শোনার জন্যে ছটফট করছি। এখন কি আপনার ট্রামভ্রমণ রচনা শুনতে মন চাইছে?
সব জিনিসেরই একটা ব্যাকগ্রাউণ্ড, একটা পটভূমি তৈরী না হলে কিছু হয় না।—গম্ভীরভাবে তারিণীদা শুরু করলেন—ঘাসের ওপর দিয়ে খসখস করে ট্রাম ছুটছিল, যেন হড়কে হড়কে যাচ্ছে—এমনই ট্রামের স্পীড; জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছি—মেঘলা আকাশ রোদ নেই, ঔজ্জ্বল নেই, কেমন যেন বোদা বোদা দিন! হঠাৎ একটা কি চীৎকার উঠলো ট্রামের মধ্যে—সেদিকে চোখ ফেরাতেই দেখি—একটা লোক সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, তার হাতে দড়িবাঁধা রূপোলিরঙের নধরকান্তি এক ইলিশমাছ। তার হাতের ঐ মাছটা নিয়ে ঝগড়া বেঁধেছে।
তার মানে?
মানে আর কি? প্রথমটা আমি ভাবলাম ইলিশমাছ—তায় ওইরকম তাগড়াই স্বাস্থ্যের—ও নিয়ে ঝগড়া হতে পারে। সবারই লোভ হয় দখল করার; কেউ বোধ হয় কিছু টিটকিরি করে থাকবে, এই বাজারে—এমন টাটকা জিভে-জল আনানো ইলিশ নিয়ে যাচ্ছে, কালো টাকা না হলে কেউ কি এমন চকচকে ইলিশ কিনতে পারে? কিন্তু একটু পরেই বুঝলুম—ব্যাপারটা ঠিক যা আন্দাজ করেছিলুম—তা নয়।
তবে?
লোকটা যখন মাছ হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো ট্রাম থেকে নামার জন্যে, তখন তার সামনের সিটে বসা আধময়লা পোশাকপরা এক আধবুড়ো লোক বলে উঠলো—মাছটা নিচ্ছেন কেন? মাছ ত' আমার। লোকটা যেন প্রথমে একটু থতিয়ে যাবার ভান করলে, পরে বেশ জোরের সঙ্গে বললে—তার মানে?—যা বুঝলুম, মাছের মালিকানা নিয়েই ঝগড়া। ঝগড়া যখন বেশ পেকে উঠেছে—তখন লোকটা ঐ আধবুড়োর সিটের কাছ থেকে একটা ছাতা তুলে নিয়ে বললে—এবার বলুন—এ ছাতাটাও আপনার? বেশ লোক মশাই আপনি? হেঁ-হেঁ-হেঁ করতে করতে লোকটা মাছ ও ছাতা নিয়ে বেশ সদর্পে সগৌরবে নেমে গেল একবালপুর স্টপে।
যতক্ষণ ঝগড়া হচ্ছিল—ততক্ষণ কিন্তু ওই আধবুড়োই যে মাছ আর ছাতার মালিক—কিছুতেই মনে হয় নি, আমার কেন, ট্রামের আরও বিশ-তিরিশ জনের। পরে বুড়োর কথাবার্তা শুনে—বুঝলুম লোকটা ছাতা আর ইলিশমাছ দুটোই ছিনতাই করে নিয়েছে।
ছিনতাইয়ের তারিফ করতে হয় কিন্তু—আমি বললাম, বিশেষ করে ছাতাটা নেওয়ার কায়দাটি; মাছ নিয়ে ঝগড়া, কিন্তু ছাতাটা হাতে নিয়ে লোকটা বুড়োকে চ্যালেঞ্জ করে যখন বললে যে এবার বলুন—ছাতাটাও আপনার—তখন অন্তত: ছাতার মালিক যে ওই লোকটা সে সম্পর্কে আর কারুরই সন্দেহ হলো না।
তারিণীদা ফের শুরু করলেন—ছাতার জন্যে আধবুড়োর মনে কোনো খেদ দেখলুম না। ভীষণ পুরনো, সাত তালিমারা ছেঁড়া ছাতা; ও ছাতাটা নাকি সাংঘাতিক অপয়া, কোনো কাজে যদি ও সঙ্গী থাকে, তবে নির্ঘাৎ সে কাজ হবে না। বুড়োটি তাই ছাতাটা বেহাত হওয়ার জন্যে বরং মনে খুশীই হয়েছিল!
খুশী হয়েছিল?
হ্যাঁ, তাইত' সে বললে! ছাতাটা ইচ্ছে করে দু চারবার হারাবার জন্যে সে এখানে ওখানে ফেলে রেখে এসেছে, কিন্তু ছাতাটি ঠিক তাকে চিনে ফের তার কাছে হাজির হয়েছে।
এবার আমরা সবাই একযোগে কি রকম কি রকম করে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে তারিণীদাকে বিব্রত করার চেষ্টা করি।
তারিণীদা কোনো কিছুতেই কখনো ঘাবড়ান না! বললেন —মাছ চুরি যাবার পর ত' তার সজীব ছাতার মাহাত্ম্য শোনাতে বলতে পারি না। তবু ছাতাটা কেমন করে যে ঠিক মালিককে চিনতে পারে—তা জানার কৌতূহল যে না হয়েছিল—তা নয়। আমি খুব নরমসুরে বললুম—ওই অপয়া ছাতার কথা বললেন না—ওটা সঙ্গে আছে বলেই বোধ হয় মাছটা বেহাত হলো! তা ছাতাটা যখন এতই সব্বনেশে—তখন ওটাকে নিয়ে না বেরোলেই ত' হতো।
আধবুড়ো লোকটা ছাতার কথায় একটু উত্তেজনা বোধ করলে, বললে—যাবার সময় ও ব্যাটাকে ট্রামেই ফেলে রেখে নেমে গেলাম ওয়াটগঞ্জের মোড়ে; ওমা, নামার পরই দেখি ট্রামের জানলা দিয়ে সদাশয় এক ভদ্রলোক ওটি বাড়িয়ে দিয়ে আমার হাতে গুঁজে দিয়ে দেঁতো হাসি হেসে বললেন—আপনার ছাতা। নিজের ছাতা ট্রামশুদ্ধ সবাই জানে, তাই না বলতে পারলাম না; বরং শুকনো একটা ধন্যবাদ জানিয়ে ছাতাটা বগলদাবা করে হাঁটতে শুরু করলাম। তারপর চা খেতে ঢুকলাম একটা ছোট রেষ্টুরেন্টে,—উদ্দেশ্য ছাতাটাকে কোণে রেখে চা খেয়ে পয়সা দিয়েই সরে পড়ব—যেন ভুল করে ছাতাটা ফেলে গেছি। কিন্তু তা কি হবার যো আছে মশাই এই ধম্মপুত্তুর যুধিষ্ঠিরের দেশে! চা খেয়ে যথারীতি পয়সা মিটিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে বেশ কয়েকপা এসেছি—এই ধরুন পোয়াটাক রাস্তা হবে—এখনকার হিসেবে আধ কিলোমিটার আর কি,—পেছন থেকে ও মশাই, ও মশাই বলে চিৎকার করতে করতে চায়ের দোকানের ছোঁড়াটা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে—হাতে তার ওই ছাতা। কাছে এসে সে বললে—আজ্ঞে, আপনার ছাতা, দোকানে ফেলে এসেছেন। ছেলেটার দৌড় আর চিৎকারে বেশ লোক জমা হয়ে গিয়েছিল। বাধ্য হয়েই ছাতাটা নিতে হল, চাইকি দশ পয়সা বকশিস পর্যন্ত করলুম ছেলেটাকে। ছাতাটিকে ছাড়ালে না ছাড়ে, শুধু দায়ভাগ বাড়ে-গোছের ব্যাপার হয়ে উঠলো!

...চায়ের দোকানের ছোঁড়াটা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে—হাতে তার ঐ ছাতা।
তারিণীদা বললেন—সত্যি ওই অপয়া ছাতাটা অবশেষে ঘাড় থেকে নেমেছে,—এই যা রক্ষে, শুধু একটা গোটা ইলিশের ওপর দিয়েই গেছে।
কি জানি, ঘাড় থেকে ভূত নামলো কি না!
ছাতার কথা নিয়েই আমার এই কাহিনী। ওই যে বলছিলাম না সমান্তরাল একটা গল্প শুনেই হঠাৎ মনে পড়ে গেল এই কথাটা।
আমার কাহিনীর নায়ক ছেঁড়া তালিমারা ছাতা নয়, একেবারে আনকোরা নতুন দামী একটা ছাতা। ছাতাটা আমার নয়, দাদার। দাদা সৌখিন মানুষ, জিনিসপত্র যা-কিছু ব্যবহার করেন—বেশ দামী আর পছন্দমতো। কি যে দুর্বুদ্ধি আমার হলো—টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে দেখে আমি একদিন দাদার ওই ছাতাটা নিয়েই বের হলাম। অনভ্যাসের ফোঁটায় কপাল চড়চড় করার মতো আর কি! ট্রামে কি কোনো রেস্তোরাঁয় ছাতাটি হারিয়ে যখন বাড়ি ফিরেছি—তখন বাড়িতে রীতিমতো হইচই হচ্ছে। বিষয়বস্তু ওই ছাতা। কে ওই ছাতা নিয়ে বের হয়েছে—সকলের সেটাই হলো প্রথম জিজ্ঞাস্য। ছাতা নিয়ে আমি বড় একটা বের হই না; ট্রামবাসে উঠে আজকাল বুকের ছাতিই সামলাতে পারি না, হাতের ছাতির খোঁজ রাখার কথা স্বাভাবিকভাবেই মনে থাকে না। বাড়ির সবাই অবশ্য আমাকে বাদ দিয়েই ভাবছিল।
আমি বাড়ি ঢুকতেই বৌদি জিজ্ঞাসা করলো—ঠাকুরপো, তোমার দাদার ছাতাটা জানো?
ছাতা? আমি স্বস্তির নি:শ্বাস ছেড়ে বলি—ছাতা? তাই বলো। রাস্তা থেকে হইচই শুনে ভাবলুম বাড়িতে বুঝি ডাকাত পড়েছে! ছাতা হারিয়েছে—এইত! তা আর একটা কিনে নিলেই চলবে'খন।
বলো না ঠাকুরপো, তুমি জানো?
হ্যাঁ জানি, কাল পরশুর মধ্যে ছাতাটা পেলেই ত' হলো—বলে আমি সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেলাম।
পেছন থেকে বোধ হয় দাদা বলে উঠলেন—পেলেই হলো, ছাতার সিকগুলো ছিল ইংলিশ-মেক, এখন ও জিনিস আর বাজারে পাওয়াই যায় না!
ছাতা হারানোর বেদনা যে কতদূর মর্মান্তিক—তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারে না। ছাতা হারানোর বিষে যে যাতনা কি সে আর ক'জন বুঝবে? তবু মনকে নানা শোকের কথা ভেবে সান্ত্বনা দিই। ছাতা হারানোর শোকের চেয়ে কি মা-কে হারানোর দু:খ বেশী বেদনাদায়ক নয়? মা-র শোক ভুলেছি, আর ছাতার শোক ভুলতে পারব না? হ্যারিসন রোড কি চীনাবাজার থেকে ভালো একটা ছাতা কিনে এনে দিলেই হবে'খন।
বন্ধুরা উপদেশ দিলে—শোকের শ্রেষ্ঠ ওষুধ হলো সময়। কয়েকটা দিন যেতে দে—ছাতার কথা তুই এমনিই ভুলে যাবি—
হয়তো ভুলে যেতামও, কিন্তু ভোলা গেল না। ভোলা গেল না শুধু আমার এক অফিস-ফ্রেণ্ডের গুরুর কথা শুনে। অফিসের বন্ধুটি বললে—আমার গুরু বলেন—প্রকৃতি কখনও কোথাও শূন্য স্থান রাখে না, পূর্ণ করে, Nature abhors vacuum এক জায়গার বাতাস গরম হয়ে ওপরে উঠে গেলে —চট করে আশেপাশের বাতাস এসে সেই খালি জায়গা দখল করে নেয়। করে কি না বলো?
আমি কিছুটা বোকার মতো বিহ্বলসুরে বললাম—এর সঙ্গে আমার ছাতা হারানোর সম্পর্কটা ত' ধরতে পারলাম না।
সম্পর্ক আছে বন্ধু, আছে। আমার গুরু হচ্ছে ঈশপেরও গুরু। ঈশপ ভাগ্যক্রমে আগে এসেছেন, তাই তাঁর গল্পকে সমাজনীতি, জীবননীতি বলে চালানো হচ্ছে, কিন্তু জ্ঞানের দিক থেকে, বিশেষ করে ব্যবহারিক জ্ঞানের দিক থেকে আমার গুরুর তুলনা নেই।
মেনে নিলাম। কিন্তু ছাতা হারাবার সঙ্গে তার গুরুপদেশটির তাৎপর্য বুঝতে পারলুম না। সে বললে—আরে বোকা, তোর ছাতা হারিয়েছে; তোর ক্ষেত্রে ছত্রজনিত যে শূন্যতা তৈরী হচ্ছে—তা প্রকৃতির ইচ্ছে নয়, তুই সেটা পূর্ণ কর। তোর ছাতা হারিয়েছে—তুই এবার কারুর ছাতা হারিয়ে দে; ঈশপ বলেছেন—Tit for tat. আমার গুরু প্রাকৃতিক জগতের নিয়ম মাফিক কাজ করতে বলেছেন—
এই মন্ত্রের পরেও তবু ছাতার শোক আমি ভুলতে পারতুম, কিন্তু বন্ধুটি রোজই দুবার করে অফিস বসার পর আর ছুটির সময় নিয়ম করে জিজ্ঞাসা করতে লাগলো—কিরে, প্রকৃতির মুখ রক্ষা করলি?
বন্ধু-গুরুর উপদেশকে এক আধবার যে 'দি আইডিয়া' ভেবে মনে মনে না লাফিয়ে উঠেছি—এমন নয়; এমনকি অফিসের হল ঘুরে চারিদিকে চোখ বুলিয়েও নিয়েছি,—দাদার সৌখিন ছাতার বদলে তেমন কোনো দামী ছাতা যদি চোখে ঠেকে—
ছাতা হারানোর কষ্টটা তবু পাৎলা হয়েই আসছিল, এমনকি বন্ধুর তাগিদ সত্বেও প্রাকৃতিক নিয়মের তাৎপর্যটুকুও মন থেকে চলে যাচ্ছিল।
এমন সময় হঠাৎ একটা দৃশ্য দেখে আমি চমকে উঠলাম। ড্যালাউসি যাচ্ছিলাম। বাসে ঠিক আমারই পাশের সীটে বসে যে ভদ্রলোক, তাঁর হাতে অবিকল আমার সেই হারানো ছাতা! আমি চমকে উঠলাম। এ কি করে সম্ভব? বর্ষাকালটা এখনো চলছে, ভাদ্রের মাঝামাঝি, পথে বের হলে এখনো ছাতার দরকার হয় বৈকি! এ সময়ে কেউ আর নূতন ছাতা কিনছে না—অন্তত: এমন দামী আর এই রকম সৌখিন ছাতা। তাছাড়া, ভদ্রলোককেও ত' খুব ফিটফাট সৌখিন বলে মনে হচ্ছে না। দাদার ছাতাটা আমি খুব ব্যবহার করিনি—তবু তার বাঁট, কুচকুচে কালো কাপড়, সাইজ—মোদ্দা কথা, ছাতার চেহারাটা আমার মনে গাঁথা হয়ে গিয়েছিল। এই ছাতাটার দিকে এক মনে তাকালাম অনেকক্ষণ ধরে—হ্যাঁ, অবিকল সেই ছাতা!
অবশ্য এক রকমের ছাতা কি আর দুটো হতে নেই? বাজারে এক ব্র্যাণ্ডের হাজার হাজার ছাতা আছে—এও হয়তো তেমনি ব্যাপার। কিন্তু ছাতাটার দিকে তাকালে আমার মন কোনো যুক্তিই মানতে চায় না। দাদা যেখান থেকে ছাতাটা কিনেছিলেন—এই ভদ্রলোকও হয়তো সেখান থেকে ওই রকমের আর একটা ছাতা—
ভদ্রলোক হঠাৎ আমার দিকে কেমনভাবে তাকালেন, তিনি কি রকম নার্ভাস হয়ে পড়লেন বলে মনে হলো। আমি একবার তাঁর দিকে আর একবার তাঁর ছাতার দিকে তাকাচ্ছিলাম। তিনি বেশ শক্ত করেই তাঁর ছাতাটি ধরে রাখলেন, আমার কি রকম লজ্জা করতে লাগলো।
ঐ ভদ্রলোকও যাচ্ছিলেন ড্যালাউসি, একই বাস স্টপে দুজনে নামলাম। আমি একটু এদিক ওদিক তাকালাম—দেখি না ভদ্রলোক কোনদিকে যায়। ভদ্রলোক পূব দিকের রাস্তা ধরে এগোতে লাগলেন, আমিও তাঁর পিছু নিলুম—চতুর গোয়েন্দা যেমন সাহসী দস্যুকে ফলো করে—কতকটা যেন সেই ধরনের ব্যাপার। আমার মনে কিন্তু তখন ঈশপশিষ্যের মন্ত্র কাজ করতে শুরু করেছে। আমারই ছাতা আমারই সামনে অন্যের মাথা রক্ষে করবে?
ভদ্রলোক একটা রেষ্টুরেণ্টে ঢুকলেন; আমিও ঢুকলাম সেখানে—এক কাপ চায়ের অর্ডার দিলাম। আমার শ্যেন দৃষ্টি শুধু এই ভদ্রলোকের ওপর, বিশেষ করে তাঁর হাতে ধরা ওই ছাতাটির ওপর।
কিন্তু সেই ভদ্রলোককে বলিহারি! ছাতাটা একবারের জন্যেও হাতের মুঠোর বাইরে রাখলেন না। একটা চপ না কি নিলেন, সেটি খাচ্ছেন ডান হাতে—আর বাঁ হাতে ছাতাটি শক্ত করে ধরে রেখেছেন। ঐভাবে চা-ও খেলেন, একটা সিগারেটও ধরালেন; তবু ছাতাটি ধারে-কাছে কোথাও রাখলেন না।
ব্যাপারটা কি? আমি যে ওঁর পিছু নিয়েছি—তা কি টের পেয়ে গেলেন নাকি? ছাতা সম্পর্কে এত সতর্ক কেন?
ক্যাশ কাউণ্টারে আমিও গেছি দাম দিতে—ভদ্রলোকও এসেছেন। ভদ্রলোকের বুক পকেট থেকে মণিব্যাগ বার করার সময় ছাতাটি মেঝেয় পড়ে গেল, সেই ফাঁকে আমি ছাতাটি ভালো করে দেখার সুযোগ পেলুম—এটা আমার ছাতা নয়। একমাত্র সাইজ, আর বংকিম বাঁট ছাড়া ছাতার আর কোনো মিল নেই! দাদার ছাতার কাপড়টা ছিল সিল্কের, আর এই ছাতার কাপড়টা সিল্কের নয়।
কিন্তু মনটা কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। টিট ফর ট্যাট। এক জায়গার বাতাস সরে গেলে অন্য জায়গার হাওয়া এসে সেই শূন্যস্থান পূর্ণ করে! প্রাকৃতিক নিয়ম।
আমি যে ছাতাটি হারিয়েছি—তার চেয়ে এটি হয়তো একটু কম দামের; তা হোক। পৃথিবীতে চিরদিনই এই হয়ে আসছে, এক পক্ষ জিতবে, আর এক পক্ষ হারবে। সমান সমান হয় কদাচিৎ। এই ছাতার খেলায় না হয় আমার হারই হলো। এই ছাতাটি এখন কি করে হাত করি?
ভদ্রলোক রেষ্টুরেণ্ট থেকে বেরিয়ে রাস্তায় অল্পক্ষণ দাঁড়ালেন। কি যেন ভাবলেন—আমার দিকে একবার দেখলেন বলে মনে হলো। কিন্তু পাপীর মন আমার—আমি সোজা সরল দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাতে পারলাম না। তিনি হঠাৎ তাঁর গতিপথের দিক পরিবর্তন করে সোজা স্ট্র্যাণ্ড রোডের দিকে হাঁটা দিলেন। প্রাকৃতিক নিয়ম প্রমাণ করার জন্যে আমিও নাছোড়বান্দা! বলা বাহুল্য, আমিও ভদ্রলোকের পিছু নিলাম—রইলো আমার নিজের কাজকর্ম!
একটু এগোতেই ভদ্রলোক ঠিক আন্দাজ করে নিলেন—আমি তাঁর পিছু নিয়েছি। দেখি তিনি বেশ জোর কদমে হাঁটা শুরু করেছেন। বেগতিক দেখে আমিও জোরে জোরে হাঁটতে শুরু করলাম, হেঁটেও যখন দেখলাম যে চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছেন তিনি, আমি প্রায় দৌড়েই তাঁর কাছ বরাবর এসে পড়লাম। এবার ভদ্রলোকটি স্পষ্টই বুঝতে পারলেন, হঠাৎ তিনি একেবারে আমার মুখোমুখি থমকে দাঁড়ালেন। ভাবখানা এই যে— কি চাই মশাই আপনার? আমি কি চোর না খুনী? কেন পিছু নিয়েছেন!
আমিও ঘাবড়াবার পাত্র নই। মন্ত্রের সাধন কিম্বা শরীর পাতন। ছাতাটা গস্ত করতেই হবে। ভদ্রলোক কি থট রীডিং জানেন নাকি? আমার মনের কথা জানলেন কি করে? ওঁর ছাতাটির প্রতিই যে আমার মনোযোগ সে কথাটি এমন স্পষ্ট করে বুঝলেন কি ভাবে? সেই জন্যেই কি ছাতাটাকে প্রাণের চেয়ে প্রিয় ভেবে অমন জোরে আঁকড়ে ধরলেন? একটি মুহূর্তের জন্যেই সেই শক্ত কবল আর শ্লথ করেননি?
আমি বেশ বুঝতে পারলুম—ভদ্রলোক আমার হাত থেকে মুক্তি পাবার চেষ্টা করছেন। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে আমাকে অপ্রস্তুত করার চেষ্টা করেও যখন দেখলেন যে আমি তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁরই ছাতাটি পুংখানুপুংখরূপে দেখছি—তখন তিনি আবার সরে যাবার চেষ্টা করলেন; চলতি কোনও ট্রামে বাসে উঠে আমার নাগালের বাইরে চলে যাবেন নাকি? বলা যায় না—সে চেষ্টা যে করছেন না—তাই বা কে বলতে পারে?
আমি মনে মনে ঠিক করলাম ছাতিটা জোর করেই কেড়ে নেব, যদি না ছাড়ে চীৎকার করবো—'ছাতা চোর, ছাতা চোর' বলে। মনে মনে সেই কায়দাটাও বার দুয়েক ভেঁজে নিলাম। ও.কে.—এইবার কাজ শুরু করি।
কিন্তু হায়রে! এক মুহূর্তেই আমার সব চেষ্টা বিফল হয়ে গেল। আমি জয়গুরু ঈশপশিষ্য বলে যে মুহূর্তে সজোরে ভদ্রলোকের হাত থেকে ছাতাটা কেড়ে নিতে যাবো,—ভদ্রলোক ঠিক সেই সময় আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন। আমি যেই ছাতাটায় হাত দিয়েছি—ভদ্রলোক কেমন যেন অপ্রতিভ হয়ে পড়লেন, লজ্জায় সংকোচে একেবারে কুঁকড়ে গিয়ে বললেন—আপনার ছাতা? সরি, এই নিন! বাসে এটি বেওয়ারিশ ভেবে আমি, মানে ঠিক ম্যানেজ করা নয়—বাসে পড়ে থাকবে কেন—
বলতে বলতে ভদ্রলোক ছাতাটি আমার হাতে জমা দিয়ে হাইকোর্টগামী চোদ্দ নম্বর মার্কা এক ট্রামে লাফিয়ে উঠলেন!
বুঝলাম—ভদ্রলোকই আমার যথার্থ দাদা; ঈশপ শিষ্যের দীক্ষা গ্রহণের দিক থেকে অন্তত:।
—
হাসলে মানিক! হাসো খানিক!!
হর্ষবর্ধন
'নির্জলা কথাটা বানান করো দেখি।' ক্লাশের দিদিমণি শুধালেন মেয়েদের।
শুদ্ধ বানান করল সবাই।
'এখন ওর মানে কী, তোমরা কেউ বলতে পারো?'
'বলব দিদিমণি, বলব মানে?' উঠে দাঁড়াল আমার বোন ইতু : 'নির্জলা মানে হচ্ছে সেই দুধ, যা গয়লারা বলে থাকে, কিন্তু কখনই কাউকে দেয় না।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন