দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

অজয় বসু
বিশ্বক্রীড়া ওলিম্পিক—শুধু কথার কথাই নয়। কথায় ও কাজের হিসেবে সার্থক নামকরণ।
চার বছর অন্তর ওলিম্পিকের আসর পাতা হলে সেখানে সারা বিশ্বের তরুণ তরুণীরা এসে জড়ো হয়। তারা স্বাস্থ্যের, সুস্থতার, স্বচ্ছ মানসিকতার প্রতীক। যৌবনের ধর্মাচরণে—তারা বাড়তি প্রাণশক্তিকে সেই আসরে উজাড় করে দিয়ে আসে। অনাবিল আনন্দের খোঁজে তারা খেলাধূলায় মাতে। মৈত্রীর মহামন্ত্র উচ্চারণ করে পরস্পরের হাতে শুভেচ্ছার রাখী পরিয়ে দেয়।
ওলিম্পিকের আসরকে তাই শুধু ক্রীড়াভূমি না বলে বিশ্বমানবের মিলনভূমি বলেও মনে করা যায়। ওলিম্পিক অনুষ্ঠান, সত্যিই এক আইডিয়া বটে!
আধুনিক কালে এই আইডিয়ার অঙ্কুরোদগম ঘটেছিল ফরাসী চিন্তানায়ক ব্যারন পিয়ের দ্য কুবারটিনের চেতনায়। ব্যারনের লক্ষ্য ছিল সৎ ও সুন্দর, বিবেকবান ও সাহসী মানবগোষ্ঠী গড়ে তোলার। লক্ষ্যপথে এগিয়ে যাওয়ার জন্যে তামাম দুনিয়াকে ডাক দিয়ে তিনি তাই ঊনবিংশ শতাব্দীর সায়াহ্নে ওলিম্পিক ক্রীড়ার পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছিলেন ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে। একালে ওলিম্পিক ক্রীড়ার আরম্ভ সেই লগ্নে।
কিন্তু 'আরম্ভের পূর্বেও আরম্ভ আছে। সন্ধ্যাবেলায় দীপ জ্বালার আগে সকাল বেলার সলতে পাকানো'র মতো। ওলিম্পিকের সকাল সেই পুরাকাল। বিস্মৃত যুগে। প্রাগৈতিহাসিক আমলে।
কবে যে শুরু তা সঠিকভাবে বলার উপায় নেই। অনুমান, খৃষ্টের জন্মের হাজার বা ততোধিক বছর আগে প্রাচীন গ্রীসে এই পুণ্য অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘটেছিল। কথিত আছে যে গ্রীক দেবতা ক্রোনোসকে যুদ্ধে পরাস্ত করে দেবরাজ জিউস যে বিজয়োৎসবের আয়োজন করেন গ্রীসের জীবনেতিহাসে তাই ওলিম্পিক অনুষ্ঠান রূপে ভাস্বর হয়ে থাকে।
এই মতও সর্বসম্মত নয়। অন্যান্য মত, গ্রীকবীর পেলপস; গ্রীক উপাখ্যানের নায়ক মহাবলী হারকিউলিস হলেন প্রাচীন ওলিম্পিক ক্রীড়ার জনক।
কিন্তু মত ও অন্যমতের টানাপোড়েনে জড়িয়ে পড়ার দরকারই বা কি? প্রাগৈতিহাসিককালের বিস্মৃত অধ্যায়গুলি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে যদি ইতিহাসের পাতায় দৃষ্টি মেলে দিতে পারি তাহলে জানা যাবে যে আনুষ্ঠানিক মতে ওলিম্পিকের শুরু ৭৭৬ খৃষ্ট পূর্বাব্দে।
তখন হেলাস (প্রাচীন গ্রীকভূমি) খণ্ড বিখণ্ড। এক একটি অঞ্চলে এক একজন নায়ক বা রাজা। যুদ্ধ বিগ্রহ লেগেই আছে। স্বার্থ, দ্বেষ, হিংসা ও ভেদবুদ্ধির নির্লজ্জ প্রকাশে হেলাসের তখন নাভিশ্বাস উঠছে।
মতানৈক্য ও পারস্পরিক দ্বন্দ্বে গ্রীস যখন বহু বিভক্ত তখন তাকে একীভূত, সংহত করার ডাক দিলেন আঞ্চলিক প্রধান স্পার্টার লাইকারগাস ও এলিসের ইফিটাস। তাঁরা একজাতি, একপ্রাণ, একতার মন্ত্র গেয়ে বললেন, ওলিম্পিক আমাদের জাতীয় উৎসব। এসো, একদিনের জন্যে বাদ বিসম্বাদ ভুলে আমরা একজাতি উৎসব প্রাঙ্গণে একাত্ম হয়ে উঠি।
সেই ডাকে বস্তু ছিল। গ্রীকেরা কান পেতে ডাক শুনল। ওলিম্পিককালে হানাহানি বন্ধ হলো। সমগ্র হেলাসে ওই লগ্নে অখণ্ড শান্তি স্থিতিশীল হলো। আদর্শ হলো জয়যুক্ত।
একালেও আমরা সেই আদর্শেরই পুজো করছি। কালান্তরের দুনিয়া মত ও পথের স্বাতন্ত্র্যে আরও বিভক্ত। তাই ওলিম্পিকের মতো এক পুণ্য অনুষ্ঠানের আয়োজনে মৈত্রী প্রসারের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি।
ওলিম্পিয়াডের অর্থ চার বছরের অন্তর্বর্তী কাল। সাধারণভাবে বলা যায় যে অতীতে এই অনুষ্ঠানের কার্যসূচীভুক্ত হতো সঙ্গীত, আবৃত্তি, বক্তৃতা, আলোচনা ও খেলাধূলা।

প্রথম পর্বে উৎসবের আঙিনায় খেলাধূলার বিশিষ্ট ভূমিকা ছিল কিনা, তা বলা কঠিন। তবে উত্তরপর্বে খেলাধূলার আয়োজনই মূলকর্মকাণ্ডে পরিণত হয়। গ্রীকরা বীরের জাতি। তারা সুঠাম ও সুন্দর, শক্ত ও সবল দেহের ভক্ত। অশক্ত ও অসুন্দরেরা ছিল সামাজিক ঘৃণা ও উপহাসের পাত্র। তাই শরীরের উৎকর্ষ সাধনেই দেহ গঠনের সহজ ও স্বাভাবিক পথ খেলাধূলার চর্চাকে প্রাচীন গ্রীস যত্নে ও ঐকান্তিক আগ্রহে আঁকড়ে ধরেছিল।
এই অনুরাগ ও আগ্রহের ব্যাপ্তি সমাজের সর্বস্তরেই। ধনী, নির্ধন, বিজ্ঞ, অজ্ঞ কেউই সেদিন ওলিম্পিক ক্রীড়ার প্রভাব, স্পর্শ ও শিক্ষা থেকে সরে থাকতে পারে নি। গ্রীক বিদগ্ধজন কাব্যে মহাকাব্যে, পর্বতগাত্রে, তুলির টানে ওলিম্পিকের কাহিনীকে অক্ষয় পরমায়ু দিয়ে গিয়েছেন।
এলিসের পিসা শহরের কাছে ওলিম্পিয়ার নয়নাভিরাম প্রান্তরে বসতো গ্রীকদের এই জাতীয় উৎসবের আসর। প্রান্তরের উত্তরে পর্বতমালা, দক্ষিণ ও পশ্চিমে প্রবাহিত আলফিয়াস ও ক্লাডিয়াস নদীর দ্বিমুখী ধারা। আর পূর্বধারে গড়ে ওঠে শ্বেতপাথরের স্টেডিয়াম, অনুশীলন কেন্দ্র বা জিমনাসিয়াম এবং ধাবনচক্র। অন্যূন ষাট হাজার দর্শকের আসন ছিল স্টেডিয়ামে। আর ক্রীড়াভূমির ট্র্যাক ছিল দুশো গজ বিস্তৃত।
সেদিন ওলিম্পিয়া প্রান্তর ঘিরে ছিল গ্রীক স্থাপত্যকলার আরও কতো অম্লান নিদর্শন। তার মধ্যে বিশিষ্টতম হল দেবরাজ জিউসের আকাশছোঁয়া মন্দির।
ষাট ফুট উঁচু মন্দিরে চল্লিশ ফুট দীর্ঘ বিগ্রহ জিউস। হাতির দাঁতে গড়া, সোনায় মোড়া এই বিগ্রহ বিশ্বের বিস্ময়। তবে এ মূর্তির আজ আর অস্তিত্ব নেই। তুর্কী হানাদারেরা মূর্তিটাকে লুট করে নিয়ে যায় কনস্ট্যানটিনোপলে। অনেক বছর পর এক সর্বগ্রাসী অগ্নিকাণ্ডে মূর্তিটিও ধ্বংস হয়ে যায়।
শুধু জিউসের মূর্তিই নয়, ওলিম্পিয়া প্রান্তরের সমস্ত ঐশ্বর্যই ষষ্ঠ শতাব্দীর ভূকম্পন ও বন্যায় পাতালে নেমে গিয়েছিল। গত শতকের শেষভাগে অনুসন্ধিৎসু জার্মান প্রত্নতাত্বিকদের চেষ্টায় ওলিম্পিয়া প্রান্তরের জীর্ণ, ভগ্নাবশেষ উদ্ধার পায়।
দেবরাজ জিউস ছিলেন ওলিম্পিকের প্রাণ ও প্রেরণা। অনুষ্ঠানের শুরুতে সবাই তাঁর উদ্দেশ্যে পুজো দিয়ে ন্যায় ও ধর্মপথে সুস্থ প্রতিযোগিতা চালাবার অঙ্গীকার নিতো। জিউসের মন্দির প্রাঙ্গণে অতসী কাঁচের সহায়তায় সূর্যরশ্মি কেন্দ্রীভূত, ঘনীভূত করে পূতাগ্নি প্রজ্বলিত হোতো। সেই পূতাগ্নি অনির্বাণ। আজও তা দুনিয়ার মানসলোককে আলোকিত করে রেখেছে। তাই আজও ঐতিহ্য অনুসরণে প্রতিটি ওলিম্পিকের আগে শ্রদ্ধায় ও নিষ্ঠায় ওলিম্পিয়া প্রান্তর থেকে পূতাগ্নি বহন করে নিয়ে আসা হয় আধুনিক ক্রীড়াকেন্দ্রে।
জিউসের মন্দিরের অদূরে ছিল পবিত্র অলিভ কুঞ্জ। ওলিম্পিক বিজয়ীদের অলিভ পাতার শিরোপা ও পবিত্র তালপত্র উপহার দেওয়া হোতো। সোনা, রূপার মেডেল নয় কিন্তু সেই পত্র-মুকুটের মূল্য অমূল্য, সমগ্র হেলাসের অন্তর মন্থন করে স্নেহরস বর্ধিত হোতো পাতার মুকুটে।
গ্রীকদের স্বর্ণযুগে কেবলমাত্র খাঁটি গ্রীকেরাই ওলিম্পিকে যোগ দিতে পারতো, অন্যেরা নয়। খ্রীষ্টপূর্ব ১৪৬ সনে গ্রীকভূমি রোমান সাম্রাজ্যের কুক্ষিগত হওয়ার কিছু পরে রোমানরা আসরে নেমে পড়ে। কিন্তু গ্রীকদের কাছে বারবার হেরে যাওয়ায় শাসকের দম্ভ প্রচণ্ড বিকারের আকারে ফেটে পড়ে একদিন।

ওলিম্পিকের প্রারম্ভিক অনুষ্ঠান :পুতাগ্নি ও অলিভিশাখা গ্রহণ

প্রেরণার উৎস : ওলিম্পিয়া-প্রান্তরে জিউসদেব ও হেরা দেবী সুবিখ্যাত প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ । প্রত্যেক ওলিম্পিয়াডের ক্রিয়া প্রতিযোগিতায় জিউসদেবের মন্দিরের ভগ্নাবশেষ থেকে প্রবিত্র মশাল জ্বেলে রিলে প্রথায় প্রতিযোগিতার জন্য নির্দিষ্ট ওলিম্পিক নগরে নিয়ে যাওয়া হয় ।

আধুনিক অলিম্পিকের জনক ব্যারন পিয়ের দ্যা কুবারটিন

শৌর্য ও সৌন্দর্যের অমর প্রতীক : প্রাচীন গ্রীসের অমর ভাস্কর মাইরোঁ খোদিত ডিসকোবোলো 'র এই প্রতিমূর্তিটি আজও সমগ্র বিশ্বে এ্যাথলেটিকস -এর প্রতীক হিসাবে সন্মান পান ।
সেই সূত্রেই শাসক রোমানরা একদিন শাসিত গ্রীকদের ঘর বাড়ী জ্বালিয়ে, প্রাণে মেরে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চায়। চিন্তাশীল গ্রীকেরা একদা যেখানে মিলনের মহাকেন্দ্র গড়ে তুলতে চেয়েছিল, শক্তিমদেমত্ত, বিকৃতমনা রোমানরা চায় সেখানে বিদ্বেষের বিষ ছড়িয়ে দিতে। থিওডোসিয়াম তখন সাম্রাজ্যের অধীশ্বর। আন্দোলনের গতি ধ্বংসের পথ ধরেছে দেখে ৩৯৪ খৃষ্টাব্দে (অন্য মতে ৩৯৩ খৃষ্টাব্দে) তিনি রাজাজ্ঞায় ওলিম্পিক অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
নতুনকালে পুনরনুষ্ঠান হোলো প্রথম ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে এথেন্সে, মূলত: ব্যারন পিয়ের দ্য কুবারটিনের চেষ্টায়। কুবারটিনের আগে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি জার্মানীর অর্ণেস্ট কর্টিয়াস গাটসমুর এবং গ্রীসের মেজর ইউয়ানজেলিস জাপ্পাসও ওলিম্পিক ক্রীড়ার পুন: প্রবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু স্বপ্ন সার্থক হয় কুবারটিনের চিন্তায় ও উদ্যমে।
সেই থেকে আধুনিক কালে প্রতি চার বছরে ওলিম্পিক ক্রীড়ার অনুষ্ঠান হয়ে আসছে। শুধু প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় এর গতি স্তব্ধ হয়েছিল। যুদ্ধান্তে আবার নতুন উৎসাহে বিশ্বক্রীড়ার আয়োজন বসেছে।
আধুনিক কালে ওলিম্পিক অনুষ্ঠানের প্রসার চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েছে। ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে নামমাত্র কটি দেশের ক্রীড়াবিদেরা এথেন্সের মার্বেল স্টেডিয়ামে হাজির ছিলেন। কিন্তু সামনের অক্টোবরে মেকসিকো শহরে ঊনবিংশ ওলিম্পিক উপলক্ষে একশ'পনেরোটি, কি তারও বেশি দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। ওলিম্পিকের আদর্শ ও যথার্থ সম্পর্কে বিশ্ববাসী যে নি:সন্দেহ, আয়োজনের ব্যাপ্তিতেই তার সুস্পষ্ট প্রমাণ।
এথেন্সের পর ওলিম্পিক ক্রীড়ার অনুষ্ঠান হয় পর্যায়ক্রমে প্যারিসে (১৯০০), সেন্ট লুইসে (১৯০৪), লণ্ডনে (১৯০৮), স্টকহোমে (১৯১২), অ্যানটোয়ার্পে (১৯২০), প্যারিসে (১৯২৪), আমস্টারদামে (১৯২৮), লস এঞ্জেলসে (১৯৩২), বার্লিনে (১৯৩৬), লণ্ডনে (১৯৪৮), হেলসিঙ্কিতে (১৯৫২), মেলবোর্ণে (১৯৫৬), রোমে (১৯৬০) ও সবশেষে টোকিওতে (১৯৬৪)। এশীয় অঞ্চলে ওলিম্পিকের প্রথম আসর ১৯৬৪ সালে বসলেও, ১৯৪০-এ ওই অনুষ্ঠান টোকিওতে হবার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ বাধায় তখনকার মতো তা পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
'ওলিম্পিকে জয় নয়, যোগদানই বড় কথা। জীবনেও বড় কথা বিজয় লাভ নয়—সংগ্রাম। প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়, সততার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাই লক্ষ্য'—এই শাশ্বতবাণী উচ্চারণ করেই ব্যারন কুবারটিন আধুনিক কালকে যে আইডিয়ায় উজ্জীবিত করেছেন, সেই আইডিয়া অবিনশ্বর। প্রাচীন গ্রীসের ও আধুনিক দুনিয়ার জীবনেতিহাস পাঠ করলেই সে সম্বন্ধে সব সংশয় দূর হয়ে যাবে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন