ইতিহাস ছাড়িয়ে

দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

মণীন্দ্র দত্ত

এক

১৮০৩ খৃষ্টাব্দ। জানুয়ারি মাস।

প্যারি নগরীর বিখ্যাত লুভর চিত্রশালার কক্ষে কক্ষে ঘুরে বেড়াচ্ছিল একটি কিশোর। তার দুই চোখে শিল্পীর স্বপ্ন। কাঁধের ঝোলানো ব্যাগে শিল্পের সরঞ্জাম—তুলি, রং, ইজেল।

কিশোর ইংলন্ডের অধিবাসী। জাতিতে ইংরেজ। পল্লী অঞ্চলের এক মধ্যবিত্ত গৃহস্থ বাড়ির সন্তান। সংসারে তার একমাত্র আশ্রয় বিধবা মা।

স্কুলের পড়া শেষ করেই কিশোর জিদ ধরল, ফ্রান্সে যাবে, ছবি আঁকা শিখবে, বড় শিল্পী হবে।

মা অনেক বোঝালেন, লন্ডনে গিয়ে যে কোন বিষয় নিয়ে লেখাপড়া করতে বললেন, কিন্তু ছেলে নাছোড়বান্দা—ফ্রান্সে সে যাবেই।

একমাত্র ছেলে। তার আব্দারই শেষ পর্যন্ত জয়ী হল। মা রাজী হলেন ছেলের প্রস্তাবে। চোখের জল মুছতে মুছতে তাকে ট্রেনে তুলে দিলেন।

ছ'মাস হল কিশোর প্যারিতে এসেছে। এই ছ'মাসে সে অনেক দেখেছে, অনেক শিখেছে। সারা ফ্রান্স জুড়ে তখন নবজীবনের বন্যা নেমেছে। প্রতিটি মানুষের চোখে-মুখে নতুন আশা, নবীন স্বপ্নের উদ্দীপনা। প্যারি-র আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে নবজীবনের মুক্তি-মন্ত্র : সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা।

কিশোরের মনেও লেগেছে সে মন্ত্রের দোলা, সে স্বপ্নের ছোঁয়া। কেমন যেন একটা স্বপ্নাচ্ছন্নতার ভিতর দিয়ে কেটে যাচ্ছিল তার প্রবাসের দিনগুলি।

কিন্তু আজ সকাল থেকেই কিশোরের মনটা যেন মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মত বেদনায় ম্লান। সকালের ডাকেই মা'র চিঠি এসেছে। তিনি বার বার সকাতর অনুরোধ জানিয়েছেন, কিশোর যেন অবিলম্বে ইংলন্ডে ফিরে যায়! কারণ—

চিঠিখানা পকেটে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে কিশোর। প্যারির পথে পথে অনেক ঘুরেছে। অশান্ত বিক্ষিপ্ত মন কিছুতেই শান্ত হয়নি। অবশেষে লুভরের চিত্রশালায় ঢুকেছে। সে জানে, এখানে এলেই মনের সব অশান্তি, সব অস্থিরতা দূর হয়ে যাবে। চিত্রশালার কক্ষে কক্ষে কত কালজয়ী শিল্প-চাতুর্যের অক্ষয় স্বাক্ষর। সেদিকে দৃষ্টি পড়লেই কিশোরের মন ভুলে যায় সব জ্বালা, সকল যন্ত্রণা।

কিন্তু আজ তার মন কিছুতেই শান্ত হল না। চিত্রশালার কক্ষে কক্ষে বৃথাই সে ঘুরে বেড়াল। কোন কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারল না। পকেটের চিঠিখানা তাকে যেন সব জায়গা থেকে ভূতের মত তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।

আবার পকেটে হাত দিল কিশোর। সেই চিঠি। মা'র চিঠি।

বুকের ভিতর ধ্বক করে উঠল আবার। উত্তেজনায় অশান্ত হয়ে উঠল মন।

দ্রুত পা ফেলে চিত্রশালা থেকে বেরিয়ে এল কিশোর। রাস্তার পাশেই একটা কাফে। সেখানেই ঢুকে পড়ে এক কাপ কফির অর্ডার দিয়ে এক কোণে গিয়ে বসে পড়ল।

কফিতে চুমুক দিয়ে মা'র চিঠিখানা ভাঁজ খুলে মেলে ধরল চোখের সামনে।

মা লিখেছেন : দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দিনের পর দিন যে রকম জটিল হইয়া উঠিতেছে, তাহাতে মনে হয় অদূর ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে একটা শত্রুতার সম্পর্ক গড়িয়া উঠিবে। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এখন ফ্রান্সের সর্বময় কর্তা। অথচ এখানে প্রধানমন্ত্রী পিট হইতে আরম্ভ করিয়া ছোট-বড় অনেকেই নেপোলিয়নের নামে খড়গহস্ত। এ অবস্থায় তোমার পক্ষে আর প্যারিতে থাকা সমীচীন নয়। তুমি অবিলম্বে দেশে ফিরিয়া আসিবে।

চিঠিখানা ভাঁজ করে পকেটে রাখতে রাখতে কিশোর বার বার ঘাড় নেড়ে নিজের মনেই বলতে লাগল, না, না, এ কখনও হতে পারে না। শিল্প ও কলা দেশকালের গণ্ডীর অতীত। দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক যাই হোক না কেন, কোন শিল্প বা কলাশিক্ষার্থীর তাতে কিছু আসে যায় না। সেদিক থেকে তার কখনও কোন বিপদ ঘটবে না—ঘটতে পারে না।

দুর্ভাগ্য কিশোরের—সেই অঘটনই একদিন ঘটল। এবং অনতিবিলম্বেই ঘটল। রাজনৈতিক ঘনঘটায় আচ্ছন্ন হল সাধারণ মানুষের জীবনের নীল আকাশ। সূর্য-চন্দ্র মুখ ঢাকল। হারিয়ে গেল নক্ষত্রের হাসি। আঝোর ধারায় নামল দু:খের বরষা।

দুই

১৮০৩ খৃষ্টাব্দ। ফেব্রুয়ারি মাস।

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট শান্তি আলোচনার জন্য ইংলন্ডের রাজদূত লর্ড হুইটওয়ার্থকে নিজ ভবনে আহ্বান করলেন, প্রকাণ্ড টেবিলের এক পাশে বসলেন রাজদূত, আর অন্য দিকে বসলেন তিনি। আলোচনা শুরু হল।

নেপোলিয়ন বললেন : ''আপনারা সমুদ্রের অধীশ্বর, কিন্তু স্থলভাগে আমার একাধিপত্য। আসুন সব বিবাদ ভুলে আমরা বন্ধুভাবে মিলিত হই। সমগ্র পৃথিবীর ভাগ্য আমরা পরিচালিত করি। ফ্রান্স ও ইংলন্ড একত্র হলে মানুষের প্রভূত কল্যাণ সাধিত হবে।''

রাজদূত হুইটওয়ার্থ কোন কথা বললেন না। গম্ভীর মুখে নীরব রইলেন। নেপোলিয়ন আবার বললেন : ''আপনারা যুদ্ধ চান কি শান্তি চান, স্পষ্ট করে বলুন। যদি যুদ্ধই চান, তাহলে অবিলম্বে আগুন জ্বলে উঠবে। আর যদি শান্তি চান, তাহলে আলেকজান্দ্রিয়া ও মাল্টা আপনাদের পরিত্যাগ করতে হবে। বলুন, কি চান?''

শান্তি আলেচনা ভেঙে দিয়ে হুইটওয়ার্থ ইংলন্ডে ফিরে গেলেন। তীব্র কণ্ঠে ঘোষণা করলেন : ''কোথায় নেলসন, প্রস্তুত হও। কোথায় ওয়েলিংটন, সৈন্য সাজাও। এক উদ্ধত যুবকের দুরাকাঙ্খায় পৃথিবী বিপন্ন হয়ে উঠেছে। তাকে ধ্বংস কর।''

আসন্ন মহাদুর্বিপাকের প্রথম পদক্ষেপ শুরু হল। সমুদ্রপথে যেখানে যত ফরাসী বাণিজ্য-জাহাজ ছিল, ইংরেজ রণতরী সেগুলিকে আক্রমণ করল, অবাধে লুঠ করল।

এ সংবাদ যখন ফ্রান্সে নেপোলিয়নের কাছে পৌঁছুল ক্রোধে তিনি জ্ঞানহারা হয়ে পড়লেন। সেই মধ্যরাত্রে ফরাসী পুলিশের কর্মাধ্যক্ষকে তিনি আদেশ দিলেন : ''সারা ফ্রান্সে আঠার হতে ষাট বৎসর বয়সের ইংরেজ যে যেখানে আছে নির্বিচারে বন্দী কর।''

হাজার হাজার ইংরেজ সন্তান তখন নি:শঙ্কচিত্তে ফ্রান্সে বাস করছে। বিনা মেঘে তাদের মাথায় বজ্র ভেঙে পড়ল। এক রাতের মধ্যে তারা সকলেই বন্দী হল ফ্রান্সের কারাগারে।

তিন

ফ্রান্সের উপকূলবর্তী বোলন বন্দর।

বন্দর হতে কিছুটা দূরে অরণ্যবেষ্টিত একটি প্রাচীন দুর্গ। হয়তো এক সময়ে কোন সম্ভ্রান্ত পরিবারের বাস-ভবন ছিল। কালক্রমে জনপরিত্যক্ত হয়ে জীর্ণদশায় উপনীত হয়েছিল। সাম্প্রতিক জরুরী প্রয়োজনে এখন বন্দীনিবাসরূপে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সেই জীর্ণ দুর্গের এক জীর্ণতর প্রায়ান্ধকার কক্ষে বন্দী নি:সঙ্গ কিশোর। সঙ্গে আছে শুধু ছবি আঁকবার সরঞ্জামে ভরা ব্যাগটি।

ঘরের এক পাশে দেয়ালের সঙ্গে লাগানো একটি পাথরের বেদী। স্থানে স্থানে ভাঙা। তারই উপরে একটি জীর্ণ শয্যায় উপুড় হয়ে কিশোর শিল্প-চর্চায় মগ্ন। দেয়ালের গায়ে কুলুঙ্গিতে জ্বলছে একটি অর্ধদগ্ধ মশাল। তার অস্থির কম্পিত আলোয় কিশোর আঁকছে নি:সঙ্গ বন্দীশালার স্কেচ।

একটা কি রঙ খুঁজতে ব্যাগে হাত ঢোকাতেই বেরিয়ে এল ভাঁজ করা একখানি কাগজ।

কিশোরের বুকের ভিতরটায় যেন ছ্যাঁৎ করে আগুনের ছ্যাঁকা লাগল।

তার মা'র লেখা সেই চিঠি।

হতভাগিনী! দিব্যদৃষ্টিতে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন প্রবাসী সন্তানের আসন্ন বিপদের ছবি। তাই তাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। জরুরী আহ্বান জানিয়েছিলেন দেশে ফিরে যেতে।

মা! মাগো! মা জননী আমার!

অব্যক্ত কাতর কণ্ঠে কেঁদে উঠল কিশোর। কাগজখানা সমেত দুই হাতে মুখ ঢাকল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

নিজের বন্দী-জীবনের দু:খ-দুর্দশার জন্য এ কান্না নয়। এ কান্না হতভাগিনী মায়ের দুর্বহ যন্ত্রণার কথা স্মরণ করে! তার বন্দীর সংবাদ শুনে না জানি কী দু:সহ যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছেন তার স্নেহময়ী জননী।

মা! মাগো! মা জননী আমার! তোমার ডাক আমি শুনব। আমি যাব। তোমার কাছে আমি ফিরে যাব।

ধীরে ধীরে দৃঢ়সংকল্পে কঠিন হল কিশোরের মন, কিশোরের দেহ। বন্দীনিবাস থেকে পালাবার চেষ্টায় সে তৎপর হয়ে উঠল।

পরিধানের জামা খানিকটা ছিঁড়ে জলে ভিজিয়ে তাই দিয়ে দুহাতে চেপে ধরল অর্ধদগ্ধ মশালটা। মুহূর্তে নিভে গেল আলো। এক রাশ অন্ধকার ঘরখানাকে গ্রাস করল।

এক লাফে জানালার উপর উঠে দাঁড়াল কিশোর। দুই দুর্বল মুঠিতে প্রাণপণ শক্তিতে চেপে ধরল জানালার লম্বা লম্বা শিক। পুরানো মরচে-ধরা লোহার শিক একটু একটু করে বেঁকতে লাগল। আর উত্তেজনায় অধীর হয়ে উঠল কিশোরের মন।

পথ তৈরি। এইবার শেষ লাফ। হালকা পায়ে নীচের মাটিতে লাফ দিয়ে পড়ল কিশোর। উঠে দাঁড়িয়ে একবার চারদিকে তাকাল। ঘন অন্ধকার আর ঘন অরণ্যে ঢাকা চারধার।

ত্রস্ত হরিণের মত সমুদ্র-উপকূল লক্ষ্য করে ছুটতে লাগল কিশোর।

চার

গভীর উত্তেজনায় সমুদ্রতীরে পদচারণা করছেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট।

সম্মুখে উত্তাল তরঙ্গায়িত সমুদ্র। অপর তীরে ইংলন্ড। মাঝখানে ত্রিশ মাইল বিস্তীর্ণ সফেন সমুদ্র। বৃটিশ রণতরীর সুকৌশল সমাবেশ দূরতিক্রমণীয়।

তবু পার হতে হবে এই সফেন সুরক্ষিত তরঙ্গমালা। ইংরেজ শক্তিকে আঘাত হানতে হবে তার নিজের দেশে—ইংলন্ডের মাটিতে। অন্য পথ নেই। জলপথে ইংরেজ তখন অজেয়।

কিন্তু কেমন করে তিনি পার হবেন এই ত্রিশ মাইল জলপথ? তারই দুশ্চিন্তায় অস্থির ভাবে সমুদ্রতীরে পদচারণা করছেন নেপোলিয়ন।

সহকারী বললেন, এ অসম্ভব কম্যান্ডার!

চকিতে ঘুরে দাঁড়ালেন নেপোলিয়ন। তাঁর দুই চোখে যেন জ্বলে উঠল অগ্নির স্ফুলিঙ্গ। দৃঢ়কণ্ঠে বলে উঠলেন, অসম্ভব! না, জগতে কিছুই অসম্ভব নয়। অসম্ভব শব্দটাকে আমি ফরাসী অভিধান থেকে মুছে ফেলে দেব।

নেপোলিয়নের সেই উত্তেজিত ক্রুদ্ধ মূর্তি দেখে সহকারী আর কিছু বলতে সাহস করল না। মুখ নীচু করে চুপ করে রইল। সমুদ্রের দিকে চোখ রেখে নেপোলিয়ন আবার বলতে লাগলেন, পাঁচ ঘণ্টা—মাত্র পাঁচ ঘণ্টার জন্য ইলিশ চ্যানেলকে যদি আমার দখলে আনতে পারতাম, তাহলে সারা ইংলন্ডকে এমন শিক্ষা দিতাম যে অনাগত কোন কালে সে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত না।

পাঁচ

অরণ্য-সীমা পার হয়েই ভয়ে, বিস্ময়ে, আতঙ্কে সহসা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো কিশোর।

কালো আকাশে অগণিত নক্ষত্রের ঝিকিমিকি। তারই ক্ষীণ আলোয় ঝিলমিল করছে সমুদ্রের সহস্র তরঙ্গশীর্ষ। অসীম অন্ধকারের বুকে সমুদ্র-তরঙ্গের সীমাহীন মিছিল।

কেমন করে সে পার হবে এই তরঙ্গবিক্ষুব্ধ সমুদ্র? কেমন করে পৌঁছবে সমুদ্রের অপর তীরে? পৌঁছবে তার মা'র কোলে?

ও কি?

দূর হতে যেন ভেসে এল কার অস্পষ্ট পদধ্বনি। সভয়ে কিশোর অরণ্যের অন্ধকারে গা ঢাকা দিল।

কেউ নেই। হয়তো কোন দূরবর্তী উপকূল-রক্ষীর পায়ের শব্দ।

কিন্তু এমন করে চুপ করে অরণ্যের অন্তরালে বসে থাকলে তো হবে না। নষ্ট করবার মত এতটুকু সময় হাতে নেই। রাত প্রায় শেষ হয়ে এল। যেমন করে হোক রাতের অন্ধকার থাকতে থাকতেই সমুদ্র পার হবার ব্যবস্থা তাকে করতেই হবে।

সাধু যার ইচ্ছা, ঈশ্বর তার সহায়।

মনের সংকল্প যদি বজ্রকঠিন হয়, তখন অসম্ভবও সম্ভব বলে প্রতীয়মান হয়।

কিশোরেরও তাই ছিল। মনে মনে সমুদ্র পার হবার এক অসম্ভব ব্যবস্থা কল্পনা করে সে অসাধ্য সাধনে ব্রতী হল।

অনেকগুলো শুকনো গাছের বাকল জোগাড় করে বুনো লতাপাতা দিয়ে সেগুলোকে শক্ত করে বেঁধে সে একটা ভেলা তৈরি করে ফেলল।

চারদিক ভাল করে দেখে নিয়ে বালির উপর দিয়ে টানতে টানতে সেই ভেলা ভাসিয়ে দিল সাগর-জলে।

সাগরের ঢেউয়ের আঘাতে টলমল করে উঠল ভেলা। অধীর উৎসাহে কিশোর লাফ দিয়ে ভেলায় চড়ে বসল।

মা! মাগো! মা জননী আমার!

মাতৃনাম স্মরণ করে কিশোর বাকলের ভেলা ভাসিয়ে দিল তরঙ্গবিক্ষুব্ধ সাগর-বুকে।

ছয়

সমুদ্রতীর।

একখণ্ড পাথরের উপর বাঁ পা তুলে হাঁটুর উপর দুই হাত রেখে সামনে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছেন নেপোলিয়ন।

সম্মুখে মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে বন্দী কিশোর। অদূরে সাগর-বেলায় তার বড় সাধের বাকলের ভেলা। সমুদ্রে ভেলা ভাসিয়ে দেবার পরেই ফরাসী উপকূলরক্ষীর হাতে বন্দী হয়েছে কিশোর।

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিশোরের দিকে তাকিয়ে নেপোলিয়ন বললেন, সত্য বল বালক, তুমি কে?

মুখ তুলে নির্ভীক কণ্ঠে কিশোর বলল, আমি ইংরেজ। ছ'মাস হল ছবি আঁকা শিখতে এসেছিলাম শিল্পতীর্থ প্যরি নগরীতে।

—সত্য বলছ তুমি গুপ্তচর নও?

—গুপ্তচরবৃত্তিকে আমি মনেপ্রাণে ঘৃণা করি।

—এই তরঙ্গ-ভীষণ সাগর তুমি ওই ক্ষুদ্র ভেলায় চড়ে পার হতে চাও, এই অসম্ভব কথাই কি আমি বিশ্বাস করব?

—আপনার অনুমতি পেলে এই মুহূর্তে আবার ওই ভেলায় চড়ে সাগরে ভাসতেই আমি চাই।

—কিন্তু কেন তোমার এই অসম সাহসিক প্রচেষ্টা? দেশে তোমার কে আছে যার জন্য তোমার এত উৎকণ্ঠা?

আবার মুখ তুলল কিশোর। তার দুটি চোখ অশ্রুভারে টলমল করছে। ধীর শান্ত গলায় সে বলল, দেশে আমার মা আছেন। তিনি সেখানে একেবারে একা। আমি ছাড়া তাঁর আর কেউ নেই। তাছাড়া তিনি রুগ্না। মাকে দেখবার জন্য মন আমার বড়ই ব্যাকুল হয়েছে। তাই অসীম দু:সাহসে ভর করে বন্দীশালা থেকে পালিয়েছি। আর উপায়ান্তর না দেখে বাকলের ভেলায় সমুদ্র পার হতে চেয়েছি। আপনি বিশ্বাস করুন, এ ছাড়া আর কোন উদ্দেশ্য আমার নেই।

মুখ তুলে নির্ভীক কণ্ঠে কিশোর বলল, আমি ইংরেজ।

কিশোরের কণ্ঠ আবেগে রুদ্ধ হয়ে এল। গভীর আগ্রহভরা দুই চোখ মেলে সে নেপোলিয়নের দিকে চেয়ে রইল। তার কাতর আবেদনে নেপোলিয়নের বীর হৃদয় করুণায় গলে গেল। কিশোরের দুই কাঁধে হাত রেখে স্নেহমধুর কণ্ঠে তিনি বললেন, বিশ্বাস করি। বালক, মাতৃভক্ত সন্তানের সব কথাই আমি বিশ্বাস করি। তোমার কথাও আমি বিশ্বাস করেছি। কোন ভয় নেই বৎস, তোমার স্নেহময়ী মা'র কোলে তুমি যাতে নির্বিঘ্নে ফিরে যেতে পার, সে ব্যবস্থা আমিই করে দেব।

কিশোরের দুই চোখ ভরে আনন্দের অশ্রু ঝরে পড়ল। তবু দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে সে বলল, কিন্তু এই উত্তাল সমুদ্র—

মৃদু হেসে নেপোলিয়ন বললেন, মাতৃভক্তি সমুদ্রের চেয়েও বড়। সেই ভক্তির ভেলায় চড়ে তুমি হেলায় সাগর পার হবে।

—আপনি কি বলছেন?

—এই স্বর্ণমুদ্রাগুলি তোমাকে দিলাম। আমার নাম করে এগুলি তোমার মাকে দিও। আর—

চকিতে মুখ ফিরিয়ে সহকারীকে লক্ষ্য করে নেপোলিয়ন আদেশ দিলেন, অবিলম্বে একখানি ছোট ফরাসী-পোতে সন্ধি-পতাকা উড়িয়ে এই ইংরেজ বালককে যে কোন বৃটিশ জাহাজে তুলে দিয়ে এস।

সহকারী ইতস্তত করে বলল, আরও একটু খোঁজখবর না করে—

দৃঢ়কণ্ঠে গর্জে উঠলেন নোপোলিয়ন : নির্দ্বিধায় আমার আদেশ পালিত হোক, এই আমি চাই। যাও বালক, তোমার মা'র কাছে ফিরে যাও। আমি আশীর্বাদ করি, তোমার যাত্রাপথ নির্বিঘ্ন হোক। তোমার মা দীর্ঘজীবিনী হোন।

কিশোর হাঁটু ভেঙে বসে সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানিয়ে সাশ্রুনেত্রে বলল, আপনি আমার দেশের শত্রু তবু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, আপনার জয় হোক।

ইতিহাসের পাতায় কিশোরের কাহিনী এখানেই শেষ। কিন্তু তার প্রার্থনা?

সে কি ঈশ্বরের কাছে পৌঁছেছিল?

সেন্ট হেলেনায় নির্বাসিত একটি নি:সঙ্গ মানুষের করুণ দীর্ঘশ্বাস কি সে প্রার্থনাকে ব্যঙ্গ করেছিল?

হাসলে মানিক! হাসো খানিক!!

হর্ষবর্ধন

ইস্কুলে ভর্তির পর থেকে রোজই মা'র কানে আমার নানান দুষ্টুমির খবর উঠত।

একদিন ইস্কুল থেকে ফিরতেই মা শুধালেন, রাম, আজ তুই দুষ্টুমি করিসনি তো ইস্কুলে?

না মা! মাকে অবাক করে দিলাম এক কথায়।

সে কিরে দাদা! তুই আবার দুষ্টুমি না করে থাকতে পারিস? অবাক হয়ে গেল আমার ভাই সত্যও।

কি করে করবো? বেঞ্চির উপর দাঁড়িয়ে কি দুষ্টুমি করা যায় না কি?

অবাক হবার পালা এবার আমার।

তাহলেও তুই দুপাশের দুই ছেলের মাথায় খুব কষে গাঁট্টা লাগাতে পারতিস...

কি করে লাগাব শুনি? হাতের নাগালে পেলে তো? নিজের কান ধরে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল যে!

সকল অধ্যায়
১.
মাটি
২.
ভুতের গল্প
৩.
হর্ষবর্ধনের অশ্বরোগ
৪.
সেই মেয়েটি
৫.
বিদ্যাসাগরের ছেলেবেলা
৬.
গোয়েন্দা
৭.
ইতিহাস ছাড়িয়ে
৮.
যমালয়ে জীবন্ত মানুষ
৯.
ডাকিনীর ডাক
১০.
শত্রুতা
১১.
রেলে
১২.
অতু
১৩.
এক যে ছিল বাঘিনী
১৪.
দাওয়াই
১৫.
বিশ্বের বিস্ময় হেলেন কেলার
১৬.
ফুলের বিবাহ
১৭.
মংলুফলায় সোনা
১৮.
একটি গল্প করার মত গ্রাম
১৯.
লালমণি পাখি
২০.
প্লাবন
২১.
ছাত্র-সঙ্গীত
২২.
জয়-পরাজয়
২৩.
এখন শিউলি-বেলা
২৪.
আশ্বিনে
২৫.
ছড়া
২৬.
পোড়ো কুঁড়ে
২৭.
মা (উপন্যাস)
২৮.
গোর্কির ছেলেবেলা
২৯.
সেয়ানে সেয়ানে
৩০.
সুড়ঙ্গের রহস্য
৩১.
এক ঝাঁক গল্প
৩২.
কঙ্কাল
৩৩.
নতুন করে জাগো মা
৩৪.
বেতাল-পঞ্চবিংশতি
৩৫.
ভবঘুরের চিঠি
৩৬.
নিলাম দামী চশমা
৩৭.
শরৎ এল
৩৮.
কৈশোর
৩৯.
আলোর ডাকে
৪০.
অগ্রদূত
৪১.
টাকার কথা
৪২.
সাহস চাই!
৪৩.
ভোজবাড়ীর ব্যাপার
৪৪.
আবাহনী
৪৫.
এবার পূজায়
৪৬.
বামুনের স্বর্গবাস
৪৭.
মজার ধাঁধা
৪৮.
আংটির পাথর
৪৯.
মনমঞ্জুষা
৫০.
নিখিল বঙ্গ গরু সম্মেলন
৫১.
মিকি ডাক আর দিসনে
৫২.
মেঘনাদবধ
৫৩.
চৌধুরী-বাগ
৫৪.
জাদু বিদ্যা
৫৫.
বাবার চিঠি
৫৬.
গানের কথা
৫৭.
আমার প্রথম শিকার আভিযান
৫৮.
বিশ্বক্রীয়া ওলিম্পিক
৫৯.
বাংলার বন্যা
৬০.
শরতে
৬১.
আনন্দ আশ্বিনে
৬২.
টোটকা কিছু
৬৩.
জলদি করুন দাদা
৬৪.
কিশোর বিজ্ঞানীর আসর
৬৫.
সঙ্গীতের মৃত্যু
৬৬.
ছত্রপতি
৬৭.
মেঘ ও বৃষ্টি
৬৮.
মধুপালের আবির্ভাব

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%