দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

দীনবন্ধু মিত্র
নবরূপায়ণ
দীননাথ কাশ্যপ
প্রথম পরিচ্ছেদ
যমালয়। গ্রীষ্মকাল। দারুণ গরম পড়েছে। এত গরমে দিনের বেলায় রাজকার্যে মন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না দেখে, রাজর্ষি যমরাজ রাত্রিবেলায় কাছারি আরম্ভ করলেন।
কাছারি বসেছে। সভামণ্ডপ গ্যাসের আলোয় আলোকিত। বিস্তীর্ণ ফরাসী গালিচা বিছানো। ফরাসীপ্রুসীয় মহাযুদ্ধ বাধার পূর্বক্ষণে গালিচা কেনা হয়েছিল। দেয়ালে নিপুণ শিল্পীশ্রেষ্ঠ ম্যাকেবের তৈরী ঘু ঘু ঘড়ি, আর বিরাটাকার কয়েকখানা আয়না—তাতে পুরো চেহারা দেখা যায়। কিন্তু আয়নাগুলো ঢাকা, তাদের উপর আচ্ছাদন। কারণ কালান্তর যম নিজেই একদিন আয়নায় নিজের চেহারা দেখে এক নাগাড়ে দশ ঘণ্টা এগারো মিনিট মূর্চ্ছিত অবস্থায় পড়েছিলেন। তারপর থেকে আয়নাগুলোর ঐ অবস্থা।
দেওয়ালে অতি সুন্দর সব ছবি টাঙানো। সেসব মর্তের ইন্দ্রপুরী লন্ডন নগরের রঙ্গমঞ্চের সুন্দরীশ্রেষ্ঠা নটি ও অভিনেত্রীদের ছবি মনে হয়। কলকাতার কয়েকজন মহানুভব ব্যক্তির ফোটোও ঝুলছে।
নরকরাজের সামনে আলবোলা। আলবোলায় সাপের মতো বাঁকা আশি হাত দীর্ঘ নল। নলের মুখটা সোনার। মহারাজ আলবোলা টানছেন। রাজমহলে তৈরী তামাকের ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে জিজ্ঞেস করলেন, ''আজ কি কি বিশেষ কাজ আছে?''
প্রধান মুন্সী চিত্রগুপ্ত তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালেন; সসম্ভ্রমে অভিবাদন করে বললেন, ''হজুর, পি. এন্ড ও. কোম্পানীর স্টীমারে ব্রিন্ডিসি ঘুরে একখানা সরকারী চিঠি এবং বায়ু-যানে একখানা বেনামী দরখাস্ত এসেছে। দুটোই এসেছে বঙ্গদেশ থেকে এবং দুইয়ের উপরই 'জরুরী' লেখা।''
যমরাজের হুকুম মতো মুন্সীপ্রবর সরকারী চিঠিখানা আগে পড়তে শুরু করলেন :
মহামহিম মহিমাসাগর শ্রীল শ্রীযুক্ত সংহারনিরত
মুদগরহস্ত রাজাধিরাজ যমরাজ মহোদয়
অপ্রতিহতপ্রতাপেষু—
অধীনের নিবেদন এই যে, শ্রীপাদপদ্ম হইতে বিদায় লইয়া সৈন্যবাহী জাহাজে চড়িয়া আমি বসন্ত ঋতুর গোড়ায় কলিকাতা নগরে পৌঁছাই। কলিকাতার প্রায় সমস্ত লোক—স্ত্রীপুরুষ, ধনীদরিদ্র, শিশুবৃদ্ধ, হিন্দুমুসলমান, ব্রাহ্মখীষ্টান নির্বিশেষে প্রায় সবাই মহা সমাদরে গভীর আলিঙ্গন করিয়া আমাকে পাদ্যঅর্ঘ্য মধুপর্ক দ্বারা পূজা করিয়াছেন, কমপক্ষে শতকরা নব্বই জন আমার ভীম পরাক্রমে বশীভূত। যে কয়জন এখনও বাহিরে আছেন, তাঁহাদেরও বশে আনিতে চেষ্টা করিতেছি। কিন্তু এ কাজে সম্পূর্ণ সফল হইব বলিয়া মনে হয় না। ঐসব ব্যক্তির জন্য শেষ পর্যন্ত 'কৃষ্ণ' দাদাকে অর্থাৎ মাননীয় কালাজ্বর মহোদয়কে পাঠাইবার দরকার হইতে পারে। কলিকাতার একজন যুবাপুরুষ ঔষধ অভিধেয় একপ্রকার মন্ত্রপূত শান্তিজলের সাহায্যে আমার কাজে বিশেষ বিঘ্ন সৃষ্টি করিতেছেন। তাঁহাকে একবার বাগে পাইলে আমি ছাড়িব না।
সেনাপতিকে কলিকাতায় প্রতিনিধি হিসাবে রাখিয়া আমি সসৈন্যে দিগ্বিজয়ে বাহির হইয়াছি এবং সর্বত্র ঘুরিয়া বেড়াইতেছি। ইস্ট ইন্ডিয়া এবং ইস্টার্ণ বেঙ্গল রেলের দুই পাশের সমুদয় অঞ্চল সম্পূর্ণ অধিকৃত হইয়াছে। ঢাকা, ময়মনসিংহ, শ্রীহট্ট, কাছাড়, ত্রিপুরা, বাখরগঞ্জ, নোয়াখালি ও চট্টগ্রামে যুদ্ধের আগুন জ্বলিয়াছে। ঐসব এলাকা শীঘ্রই আমাদের অধিকারে আসিবে।
ভারতবর্ষের সব স্থানেই আমি অশ্বমেধের ঘোড়া পাঠাইব দিগ্বিজয়ের নিদর্শন হিসাবে এবং সর্বত্রই কৃতকার্য হইব সন্দেহ নাই। আপনি তজ্জন্য কিছুমাত্র দুশ্চিন্তা করিবেন না। বোম্বাই, মাদ্রাজ, আগ্রা, লাহোর প্রভৃতি প্রধান প্রধান প্রদেশে দূত পাঠাইয়াছি, কিন্তু কেহ কোথাও বিরুদ্ধতা করে নাই। পাঞ্জাবের অধিপতি অজাতশত্রু রণজিৎ একদিন ভারতবর্ষের মানচিত্র দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, 'লালরঙে চিহ্নিত স্থানগুলি কাহাদের অধিকারে?' প্রত্যুত্তরে জানিলেন ইংরেজদের। তখন তিনি বলিলেন, 'সব লাল হো যায়গা।' রণজিতের এই ভবিষ্যদ্বাণী আমার দিগ্বিজয়ের ক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ প্রযোজ্য।
যমালয়ের কারাগারে স্থানের অভাব বলিয়া আপনার আদেশ মত বন্দী পাঠান বন্ধ রাখিলাম। ইতি তারিখ ১৫ শ্রাবণ।
একান্ত বশম্বদ
শ্রীডেংগুচন্দ্র হাড়ভাঙা।
চিঠির বক্তব্য শুনে কালান্তক যম বড়ই পুলকিত হলেন, চিত্রগুপ্তকে বললেন, ''ডেংগুচন্দ্রকে লিখে পাঠাও তার বীরত্বপূর্ণ কাজকর্মে আমি সবিশেষ খুশী হয়েছি। শীঘ্রই উপযুক্ত পুরস্কার পাঠানো হচ্ছে। কলকাতার কয়েকজন ব্যক্তি এখনো ডেংগুচন্দ্রকে পূজো করেনি শুনে ব্যথিত হলাম। লিখে দাও, তারা যদি শীত আসার আগেই ডেংগু মহাশয়ের পদানত না হয়, তবে 'কৃষ্ণ' চন্দ্রকে পাঠানো হবে। 'কৃষ্ণ' চন্দ্র বুড়ো হয়েছেন, তাই দূর দেশে যেতে চান না। কিন্তু একান্ত দরকার হলে যেতে হবেই।''
মুন্সীপ্রবর চিত্রগুপ্ত এবার অন্য দরখাস্তখানা পড়া শুরু করলেন :
দুষ্টদমন শিষ্টের পালন শ্রীযুক্ত ধর্মরাজ যমরাজ
মহোদয় অখণ্ডপ্রবলপ্রতাপেষু—
গতকাল বেলা এক প্রহরের সময় বাগেরহাট সাবডিভিসনের অন্তর্গত লোচনপুর পরগনার মান্যবর শ্রীযুক্ত বাবু পতন রায় জমিদার মহাশয়ের লোকদের সহিত প্রমাদ নগরের পূজনীয় শ্রীযুক্ত রামনাথ চৌধুরী গাঁতিদার মহাশয়ের লোকদের ভয়ঙ্কর দাঙ্গা হইয়া গিয়াছে। উভয় পক্ষে বহুসংখ্যক লাঠিয়াল, সড়কিওয়ালা, গাঢ়োয়ালী এবং দেশোয়ালীর অবৈধ জমায়েত ঘটিয়াছিল।
এই দাঙ্গায় অনেক লোক হত হইয়া ধানক্ষেতে পড়িয়া থাকে। মহারাজের দূতেরা আসিয়া সকলকেই লইয়া গিয়াছে বটে, কিন্তু কেবল একজনকে লইতে পারে নাই। একজন গাঢ়োয়ালীর প্রচণ্ড লাঠির ঘায়ে চৌধুরী মহাশয়ের সদর নায়েব নব চাটুয্যের মাথাটি দু ফাঁক হইয়া ফাটিয়া যায় এবং তিনি সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হন। কিন্তু রায় মহাশয়ের কর্মচারীরা নায়েব মহাশয়ের মৃতদেহ এমন গুপ্ত স্থানে লুকাইয়া ফেলিয়াছে যে, আপনার দূতেরা এবং আপনার প্রতিনিধি স্থানীয় লোচনপুরের পুলিস ইন্সপেক্টারের লোকেরা তাহার কিছুমাত্র সন্ধান পায় নাই।
মৃত নায়েব মহাশয়কে লোচনপুরের কাছারিবাড়ির বড় আটচালার পশ্চিম পাশের কামরায় দড়ি দিয়া ছাওয়া একখানা চারপায়ায় শুয়াইয়া রাখা হইয়াছে। তাঁহার পা হইতে মাথা পর্যন্ত একখানি চাদর দিয়া ঢাকা। যদি পত্রপাঠ দূত পাঠান, তবে নায়েব মহাশয়ের মৃতদেহ ধরা পড়িবার সম্ভাবনা।
এই দরখাস্তের এক কেতা অবিকল নকল আপনার পুলিসস্থ ভ্রাতার নিকট পাঠাইলাম।
ইতি।
দরখাস্তের বয়ান শুনতে শুনতে যমরাজ মহাঅস্থির হয়ে পড়েন। ব্যাকুল কণ্ঠে চিত্রগুপ্তকে বললেন, ''মুন্সীবর বিষম সাংঘাতিক কাণ্ড দেখছি। দুর্বোধ্যও বটে। আমার তো হৃৎকম্প হচ্ছে। কী সর্বনাশ আমার জন্যে জমা হচ্ছে, বুঝতে পারছি নে। প্রাণ যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ আমার অধীন। কিন্তু আশ্চর্য! জমিদারের ধূর্ত কর্মচারীরা গণ্যমান্য একজন প্রধান ব্যক্তির লাশ দু দিন লুকিয়ে রাখলো! প্রলয় ডিপার্টমেন্টের অধ্যক্ষ দেবাদিদেব মহাদেব শুনতে পেলে কি অবস্থা দাঁড়াবে, ভাবতে পার? আমি কি আর আস্ত থাকবো? এক্ষুণি একসেট দ্রুতগামী বেহারা পাঠিয়ে দাও। তাদের বলে দাও, যেন এই রাতের মধ্যেই তারা নায়েব মশায়ের লাশ আমার সামনে এনে হাজির করে। পিতৃদেবের ঘুম থেকে ওঠার আগে অর্থাৎ দিনমণির উদয় হবার পূর্বেই তারা যদি যমালয়ে ফিরতে পারে, তাহলে ফুর্তি করার জন্যে তাদের একটা বাঁধা আধুলি বকশিশ দেব।''
সঙ্গে সঙ্গে হুকুম তামিল হয়—চিত্রগুপ্ত আটজন বেহারা পাঠিয়ে দেন।
এদিকে, রামনাথ চৌধুরীর মৃত নায়েবকে লোচনপুরের কাছারির বড় আটচালার পাশের ঘরে গায়েব করার পর পতন বাবুর কর্মচারীরা খবর পেল, ঘটনাটা পুলিস সাবইন্সপেক্টারের কানে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে হন্তদন্ত হয়ে লাশটা তারা অন্যত্র সরিয়ে ফেলল। চারপায়াখানা খালি পড়ে রইল।
লোচনপুর পরগনার অন্তর্গত বিশ্বনাথপুর মহালের গোমস্তা কুড়রাম দত্ত। কুড়রামের বয়স পঁয়তাল্লিশ বছর। মাথায় সুদীর্ঘ কোঁকড়া চুল, মাঝখানে টিকি, টিকিতে দুটো তামার মাদুলি বাঁধা। কপাল চওড়া, মাঝখানের রেখা দুটো দেখতে রাজদণ্ডের মতো। ভ্রূ জোড়া স্পষ্ট নজরে পড়ে না। চোখ ছোট, কিন্তু নিষ্প্রভ বা নিস্তেজ নয়। নাক লম্বা, কিছুটা মঙ্গোলিয়ান ধাঁচের। নাকের দুই ফুটোর মধ্যে রঙ-বেরঙের চুল। গোঁফ লম্বা, ঘন ও শক্ত—সবসময় খাড়া হয়ে আছে, হপ্তায় একবার কেয়ারি করা হয়। গলায় কৃষ্ণকলিফুলের বিচির মতো অক্ষের মালা—সোনার তারে বাঁধা। বাহুতে ইষ্টকবচ, মাঝখানে রক্তচন্দনের ফোঁটা। আঙুলে দুটো আংটি—একটা রূপোর অন্যটা সোনার। পরনে ময়ূরকণ্ঠ চেলির জোড়। পায়ে ফুলপুকুরে চটি। সর্বাঙ্গে লোম। মাথার চুলে বসবাসের জায়গায় টান পড়ায় ক্রমবর্ধমান উকুনবংশ গায়ের লোমে উপনিবেশ স্থাপন করেছে। পেটটি মোটা, কিন্তু নিরেট, তাই এখনো ভুঁড়ির পর্যায়ে ফেলা যায়নি।
কুড়রাম মাতৃদেবীর অবিমৃষ্যকারিতার ফলে আঁস্তাকুড়ে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। ধাই তাঁকে সেখান থেকে কুড়িয়ে আনে, তাই তাঁর নাম হয় কুড়রাম। কুড়রাম যেমন দাঙ্গাবাজ, তেমনি মামলাবাজ। জাল করতে তাঁর জুড়ি নেই। লেখার কাজেও কুড়রাম সিদ্ধহস্ত। কিছুকাল তিনি কবির দলে ছিলেন, গান বাঁধতেন।
দারুণ হুঁশিয়ার লোক কুড়রাম। পাটোয়ারগিরি করেন। খাজনা আদায় করা, তার হিসেব রাখা এবং হিসেবনিকেশ করে বুঝিয়ে দেওয়াই তাঁর কাজ। কুড়ি বছর তিনি এই পাটোয়ারগিরি করছেন। তা সত্বেও এই কুড়ি বছরের মধ্যে তিনি নিকেশী দেনায় একবার মাত্র জমিদারদের চুনের গুদাম আর বার তিনেক মাত্র সরকারী জেলখানা ঘুরে এসেছেন।
রামনাথ চৌধুরীর নায়েবের লাশ অন্যত্র সরিয়ে ফেলার পরপরই সেখানে এসে হাজির হলেন কুড়রাম দত্ত এবং বিশ্রামের উদ্দেশ্যে নিজের বাকসটা মাথায় দিয়ে চারপায়াটায় শুয়ে পড়লেন।
বাকসটা অতি প্রাচীন। ডালার উপর আধ ইঞ্চি ময়লা জমে আছে। বাঁ পাশে একটা ফুটো হয়েছিল, তা দিয়ে আরসুলা ভিতরে ঢুকে একখানা কান-ফোঁড়া খাতা কেটে ফেলে। তাই আরসুলার ভবিষ্যৎ আক্রমণ রোধ করার জন্য ফুটোটা গালা দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। জন্ম থেকেই বাকসের কোথাও কোন পেতলের সাজ কাজ নেই। পুরাকালে পেতলের একখানা মুখপাত ছিল, কিন্তু বহুকাল হলো তা উধাও হয়েছে। বাকসের মুখের ধারে একটা করে শ্বেতচন্দনের, রক্তচন্দনের আর হলুদের অর্ধচন্দ্র আঁকা।
বাকসের ভিতরে নানাবিধ জিনিসপত্র—এক দিস্তা সাদা কাগজ, কলম-রাখা বাঁশের চোঙা একটা, তার মধ্যে তিনটে কঞ্চির কলম ও একটা খাগের কলম, শজারুর কাঁটা একটা, লোহার বাঁটের ছুরি একখানা, আধখানা কাঁচি, সাতখানা কান-ফোঁড়া আর তিনখানা খেরো-মোড়া খাতা, একটা চুনের পুটলি, একখানা খাপ-খোলা আর একটা খাপঅলা চশমা, গলাসিদেওয়া একটা কাচের দোয়াত ইত্যাদি। বাকসটা একখানা মোটা সাদা থান কাপড় দিয়ে খুঁটে খুঁটে গেরো দিয়ে বাঁধা।
চারপায়ায় শুয়ে কুড়রাম অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লেন। গভীর ঘুমে তাল-লয় ঠিক রেখে নাক ডাকছে—ফরর-ফরর-ফরাৎ ফরর-ফরর—ফরর-ফরাৎ। এমন সময় নি:শব্দে আটচালায় ঢুকলো যম-প্রেরিত বাহকেরা। তারপর আর কি! চোখের নিমেষে কুড়রাম সমেত চারপায়া তুলে নিয়েই তারা দে ছুট।

জীবন্ত মানুষের ভয়ঙ্কর চড় খেয়ে...
ছুট তো ছুট,—বাহকেরা ছুটছে কুড়রামকে নিয়ে। রাত থাকতে থাকতে কত্তার কাছে বমাল পৌঁছুতে পারলেই বকশিশ! কিন্তু দক্ষিণ দোর দিয়ে যমপুরীতে কেবল তারা পা দিয়েছে, অমনি গুড়ুম করে তোপ পড়লো।
জঝা:! রাত কাবার—সব পণ্ডশ্রম!
কি আর করা! বাহকেরা বৈতরণী নদীর পাড়ে কুড়রামের চারপায়া নামালে। প্রাত:ক্রিয়াদি তাহলে সেরে নেওয়া যাক। চারপায়া রেখে তারা যে যার কাজে মন সংযোগ করতে গেল।
কাজ শেষ করে যথাসময়ে ফিরে এসে তারা চারপায়া তোলার তোড়জোড় করছে, এমন সময় কুড়রাম আড়মোড়া ভেঙে খাটের উপর উঠে বসলেন। দেখলেন, তাঁকে এক অপরিচিত দেশে নিয়ে আসা হয়েছে। যমরাজের প্রাসাদের কাছে ঝাউ-বীথি দেখে তাঁর দৃঢ় ধারণা হলো, রামনাথ চৌধুরীর কাছারিতে তাঁকে চুরি করে আনা হয়েছে, এখানে তাঁকে গুম করা হবে।
এদিক-ওদিক তাকিয়ে কুড়রাম দেখেন : কাছে পিঠে লাঠিয়াল বা সড়কিওয়ালা কেউ নেই, আছে শুধু রোগা পটকা হাড়-জিরজির আটজন বাহক। তাদের তিনি এক-এক চড়ে ভূমিসাৎ করতে পারেন;—অতএব এই হলো পালানোর সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
বেহারারা খাট তোলার জন্যে এগিয়ে এসে খাট ধরতে যাবে, কুড়রাম অমনি তাদের প্রচণ্ড এক-এক চড় কষে দিলেন, তর্জনগর্জন করতে করতে বললেন, ''নচ্ছার বেটারা, জানের ভয় থাকে তো চারপায়ার কাছেও ঘেঁষবি নে। পতনবাবুর প্রধান পাটোয়ার আমি, ভয় করবো কিনা তোদের রামনাথ চৌধুরীকে? এই দণ্ডে তোদের কাছারিবাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাণ্ডবদাহন করে যাব। আমার দাপটে বাঘে গোরুতে এক ঘাটে জল খায়, জানিস? এক প্রহরের মধ্যেই তোদের মনিবের মুণ্ডপাত করে ছাড়বো।''
জীবন্ত মানুষের ভয়ঙ্কর চড় খেয়ে আটজন বেহারার তিনজন ততক্ষণে পাক খেতে খেতে মাঝ বৈতরণীতে গিয়ে পড়েছে, তিনজন ভয়ের চোটে চেহারা পালটে ডোমকাকের রূপ ধরে আকাশে উড়তে উড়তে তারস্বরে দারুণ চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছে, একজন ছুটেছে ঊর্ধ্বশ্বাসে মরিবাঁচি করে—যমরাজকে খবর দেবার জন্যে, আর বাকিজন খাটের পাশে দাঁড়িয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছে।
অবস্থা দেখে কুড়রামও বেসামাল, ক্ষুদে চোখ ঠেলে বেরিয়ে এসেছে, গোঁফগুলো আরো শক্ত, আরো খাড়া হয়ে উঠেছে : ''কী ভয়ঙ্কর কাণ্ড রে বাবা! এ আবার কোথায় এলাম? বেহারা মরে ডোমকাক হয় কি করে?''
তাঁর দুশ্চিন্তা দেখে বেহারাটি বললে, ''মশাই গো, এটা চৌধুরীদের কাছারিবাড়ি না, এটা যমপুরী। মোরা নবঠাকুরকে আনতি গিয়েলাম, তা ভুল করে তোমারে এনে ফেলিচি। মারামারি করবেন না। আর মোরে যা বলবেন, তাই করবো।''
অ্যাঁ! বলে কি! —কুড়রামের প্রবল বুক-ধড়ফড়ানি আরম্ভ হয়,—সর্বোনাশ!
একটু পরে কথঞ্চিৎ সুস্থ হয়ে তিনি বেহারার সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করলেন। খবরাখবর সব যদ্দূর পারা যায় ওর কাছ থেকেই বের করে নিতে হবে। শেষকালে বাকস থেকে একখণ্ড কাগজ বের করে তিনি লিখতে বসলেন। লিখছেন একখানা পরোয়ানা! লেখা শেষ হলে বার দুই-তিন সেটা মনে মনে পড়ে বেহারার মাথায় বাকসটা চাপিয়ে তিনি বললেন, ''চল, আমায় যমরাজের কাছে নিয়ে চল।''
বেহারা 'যে আজ্ঞে' বলে পথ দেখিয়ে চললো।
প্রাত:কৃত্যাদি প্রভাতকর্ম সেরে কৃতান্ত বাহকদের ফিরে আসার প্রতীক্ষা করছেন। মন বড়ই চঞ্চল—উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সীমা নেই। এমন সময় কুড়রামের চড়ে গোঙাতে গোঙাতে বাহকটা ঝড়ের বেগে এসে উপস্থিত, বললে, ''কত্তা মশাই, পেলিয়ে যাও, পেলিয়ে যাও, আর অক্ষে নেই। মাল্লে, মাল্লে। বৈতর্ণীর ধারে একজন বীর এয়েছে, তোমার মুণ্ডপাত করবে। এক চড়ে আট্টা কাহার ঘাল করেছে।''
''বলিস কি?'' চিত্রগুপ্ত জিজ্ঞেস করেন, ''লাশ এনেছিস?''
''লাশ! কুথায় পাব?'' বেহারা বললে, ''নব ঠাকুরকে কনে নুকিয়েচে, তার অন্দি সন্দি পালাম না। মোদের কাঁদে একটা নতুন যম এসে পড়েচে।''
''সর্বনাশ! তা, নতুন যমকে পাঠালে কে?'' যম জিজ্ঞেস করেন।
''কে আবার পাঠাবে? সে আপনি এয়েছে।''
যম কি বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় বাকস মাথায় বেহারাকে নিয়ে কুড়রাম এসে হাজির। যমরাজের হাতে তিনি পরোয়ানাখানা দিলেন। যমরাজ চিত্রগুপ্তকে হুকুম করলেন সেখানা পড়তে। চিত্রগুপ্ত পড়া শুরু করেন :
ইজ্যতাছার শ্রীযমালয়াধিপতি
কৃতান্ত মালুম করিবা।
ইহা আর অবিদিত নাই যে, ইতিপূর্বে তুমি অবিরাম শত শত অপরাধ করিয়াছ, তজ্জন্য তোমার দণ্ড লাভ করা উচিত ছিল। কিন্তু তোমার অতীতের অপূর্ব কার্যদক্ষতার নজির থাকায়, তখন তোমার অপ্রতিহত রাজদণ্ডের প্রচণ্ডতা ক্ষুণ্ণ করা হয় নাই। কিন্তু কয়েক বৎসর হইল, তুমি সাতিশয় পাষণ্ড হইয়াছ। ভণ্ডামি ষণ্ডামি তোমার অঙ্গের আভরণ হইয়াছে। তোমার দ্বারা রাজকার্য সম্পন্ন হইবার কিছুমাত্র সম্ভাবনা নাই। তুমি এমনি অকর্মণ্য যে, জমিদারের কয়েকজন অল্প বেতনভোগী আমলা তোমার চক্ষে ধূলা দিয়া তরফ ছানির নায়েবের মৃতদেহ অনায়াসে গায়েব করিয়া রাখিল। অতএব তোমাকে লেখা যাইতেছে যে, তুমি পরোয়ানা প্রাপ্তি মাত্র অশেষ গুণালঙ্কৃত শ্রীযুক্ত বাবু কুড়রাম দত্ত মহোদয়কে চার্জ বুঝাইয়া দিবা। তোমাকে পদচ্যুত করা হইল। বিষয়টি বহুৎ বহুৎ জরুরী জানিবা। ইতি।
সদাশিবের পরোয়ানা হাতে পড়তেই যমরাজের গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। পরোয়ানার বয়ান শুনতে শুনতে তাঁর হাত-পা অসাড় হয়ে এল এবং পড়া শেষ হতেই তিনি কেঁদে ফেললেন। সে কী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না! যমের কান্না সহজে কি বাগ মানে! শেষে কাঁদতে কাঁদতে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ''দত্তজ মশায় কখন চার্জ নেবেন?''
''এক্ষণি—এই দণ্ডে।'' কুড়রাম জবাব দেন।
চিত্রগুপ্ত তৎক্ষণাৎ কাজে লেগে গেলেন। চার্জের কাগজপত্র তৈরি করে দুজনকে দিয়ে সই করিয়ে নেওয়া হলো। যমরাজ নেমে এলেন সিংহাসন থেকে, বসলেন গিয়ে পারিষদবর্গের সঙ্গে।
আনন্দে ডগমগ কুড়রাম। চোখমুখ দিয়ে যেন পুলকচ্ছটা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। হেলে দুলে সিংহাসনে গিয়ে বসেই তাঁর প্রথম হুকুম হলো চিত্রগুপ্তের উপর—খাজনা আদায় ও বাকির হিসেব অবিলম্বে তৈরি করতে হবে।
পদচ্যুত যম উসখুস করছিলেন। এবারে কুড়রামকে সম্বোধন করে বললেন, ''ধর্মরাজ, আমার কয়েক দিনের বেতন ও আদায় তহসীলের খরচা বাবদ কিছু প্রাপ্য আছে। সেগুলো পেলে আমি খরচপত্র করে বাড়ি যেতে পারি।''
ধর্মরাজ কুড়রাম বললেন, ''আমি এ বিষয় ভগবান ভবানীপতি মহাদেবকে জানাবো। তিনি মঞ্জুর করলে আপনার মাইনে ও আদায়-তহসীলের খরচা চুকিয়ে দেয়া হবে।''
নতুন যমের এবম্বিধ জবাব পেয়ে পুরনো যম অন্তরে মর্মান্তিক আঘাত পেলেন। বিপন্ন কণ্ঠে বললেন, ''ধর্মরাজ, আস্তাবলে যে মোষ দুটো আছে, তার একটা সরকারী, অন্যটা আমার নিজের কেনা। যদি অনুমতি হয়, আমার নিজ খরিদা মোষটি আমি নিয়ে যাই।''
ধর্মরাজ কুড়রামের এবার দরাজ কণ্ঠ, ''তুমি দুটোই নিয়ে যাও। কলকাতা থেকে আমি শীগগিরই চারঘোড়ার গাড়িওলা বাবুদের এখানে আনাচ্ছি।''
পুরনো যম চলে যেতেই, নতুন যম সভা ভঙ্গ করে বেরিয়ে পড়েন শহর পরিদর্শন করতে।
যমালয়ের রাস্তাঘাট সব অতি সঙ্কীর্ণ এবং বড়ই অসমতল অর্থাৎ এবড়ো-থেবড়ো —ফিটন বা বেরুচ্চ, আফিস যান বা ব্রাউন বেরী চলার উপযোগী মোটেই নয়। কি করেই বা হবে? যিনি সবার উপরে, তিনিই যেখানে মোষের পিঠে চলাফেরা করেন, সেখানে রাস্তার অবস্থার দিকে কারো দৃষ্টি থাকার কথা নয়। ধর্মরাজ কুড়রাম ইঞ্জিনীয়ারদের উপর চটে লাল, হুকুম দিলেন—এক ঘণ্টার মধ্যে সমস্ত রাস্তা চওড়া ও সাফ-সাফাই করে ফেলতে হবে, অন্যথা ইঞ্জিনীয়ারদের কারো ঘাড়ে মাথা থাকবে না : তাদের ঘাড় থেকেই সেগুলো সাফ করে ফেলা হবে।
অবস্থা খুবই ঘোরালো! চিত্রগুপ্ত বললেন, ''ধর্মরাজ! রাস্তা চওড়া করতে গেলে অনেক বড় মানুষের বাড়ি পড়বে। সে সব বাড়ি ভাঙার আগে তাদের মূল্যনির্ধারণ বিধিসঙ্গত মনে হয়। সে জন্য একজন ডেপুটি কালেকটর দরকার। এখানে যাঁরা আছেন, তাঁরা সারভেইং জানেন না।''
''বেশ,'' ধর্মরাজ বললেন, ''সারভেইংয়ে ওস্তাদ একজন ডেপুটিকে আনিয়ে দিচ্ছি।''
যমালয়ের বিদ্যালয়টি দেখে কুড়রামের পরিতাপের অবধি রইল না। এমন যে দুইটি বিদ্যা, আদায়-বাকির হিসাব লেখা আর কবিওলার গান বাঁধা, তার পঠন-পাঠনের কোন ব্যবস্থাই বিদ্যালয়ে নেই। ছাত্রেরা না জানে আদায়-বাকির হিসাব লিখতে, না পারে কবিগান বাঁধতে। সুতরাং বিষয় দুইটির পঠন-পাঠনের জন্য কুড়রাম তখনি দুটো শ্রেণীর পত্তন করলেন।

যমরাজ-মহিষী কালিন্দী
সৈন্যশালা, হস্তীশালা, অশ্বশালা, ধনাগার, কারাগার হাসপাতাল, পাগলা গারদ দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হলো। গায়ের লোম আর নজরে পড়ে না। শিবের মন্দিরে কাঁসর-ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে। বৈতরণীর কূলে পুরুতরা সন্ধ্যা করতে বসেছেন। কুড়রাম প্রাসাদে ফিরলেন।
দেবরাজ-মহিষী ত্রিদিবেশ্বরী শচী যেমন অজরা অমরা, যমরাজ মহিষী কালিন্দীও তেমনি। তবে শচীর রূপ দেখলে মনে আনন্দ হয়, কালিন্দীর রূপ দেখলে আতঙ্ক দেখা দেয়।
কালিন্দী ঘোর কালো ও খুব মোটা। পেটের বেড় চোদ্দ গজ দুই ফুট পাঁচ ইঞ্চি। মাথা হাতীর মতো, দুটো ঢিবিতে ভাগ করা, রোগা রোগা পাতলা চুল। সিঁথিতে সাত হাত লম্বা, দু হাত চওড়া, আধ হাত উঁচু সিন্দুরের রেখা। কপাল বেজায় চওড়া, উপত্যকা অধিত্যকায় সমাকীর্ণ অর্থাৎ বিষম ঢেউ খেলানো, নয়তো সেখানে বসিয়ে বারোজন ব্রাহ্মণ ভোজন করানো যেত। নাক খুব খাটোও নয়, লম্বাও নয়। নাকে একটা নথ দুলছে, নথটা আকারে কুমোরের চাকার মতো। নোলকটা যেন এক কলসী, মুক্তো দুটো সুপক্ব বিলেতী কুমড়ো। দাঁতগুলো লম্বা, উঁচুও খুব, ওষ্ঠ দিয়ে ঢাকা পড়ে না। জিভটা গোজিহ্বা, হাত দিলে করকর করে,—ডাক্তাররা দেখলে বলবেন কালিন্দীর জ্বর হয়েছে। গায়ের চামড়া কোমলও নয় মসৃণও নয়—হাতীর গায়ের মতো খসখসে।
নতুন রাজার মনস্তুষ্টির জন্য কালিন্দী বেশভূষায় মনোনিবেশ করেছেন। সকাল দশটা-এগারোটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিপাটি করে চুল বাঁধতেই কাটলো। তারপর শাড়ি বাছাই। একে একে একশো বিরাশিখানা শাড়ি পরা হলো। কিন্তু কোনটাতেই মন ওঠে না। শেষে একখানা চুনুরি শাড়ি পছন্দ হলো।
সারা অঙ্গে কালিন্দীর আধ মণ সরষের তেলের ঢেউ খেলছে। প্রকাণ্ড গালে মুখামৃত অর্থাৎ থুথু দিয়ে অভ্র লাগানো হয়েছে, তার খণ্ডগুলো দৃশ্যমান। দু-পায়ে বাইশ গাছা মল। ঘু ঘু ঘড়িতে ঘু ঘু করে এগারোটা বাজলো। যমরাজ মহিষী অমনি বাঁ হাতে পানের বাটা আর ডান হাতে ভরা ঘট নিয়ে ঝমঝম করতে করতে অপরিচিত নতুন রাজাকে দেখতে ও অভিবাদন করতে চললেন।
শয়ন মন্দিরে চমৎকার আস্তরণে ঢাকা বিস্তীর্ণ মনোরম শয্যায় শুয়ে আছেন কুড়রাম। তাঁর মাথায় শুধু এক চিন্তা —''যমালয় থেকে পালাই কি করে? জালিয়াতি ধরা পড়লে নির্ঘাৎ দ্বীপান্তর। পুরনো যম আপিল করলেই সব ফাঁস হয়ে যাবে। তখন?''
ঘরে অসলারের বাড়ির ঝাড় জ্বলছে। বিছানার কাছে খান কয়েক সেরউডের বাড়ির কোচ আর চেয়ার।
কালিন্দী ঘরে ঢুকলেন। দাঁতের পাটি বের করে একটু হেসে নমস্কার করলেন কুড়রামকে।
কুড়রামের চোখ ছানাবড়া। কোন রকমে সামলে নিয়ে ক্ষীণকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ''কে তুমি, কল্যাণী?''
''আমি যমরাজ মহিষী কালিন্দী—আপনার দাসী।'' কালিন্দী জবাব দেন।
''মেরেছে!'' কুড়রামের ভাবনা-চিন্তা সব ঘুলিয়ে গেল, ''আর রক্ষে নেই! যদিও বা দু-একদিন থাকা যেত, তা এ মূর্তির সঙ্গে যখন দেখা হলো, তখন আর উপায় নেই।''
কুড়রামকে বিচলিত দেখে কালিন্দী ঘাবড়ে গেলেন। রাজা কি তাহলে চটে আছেন! কালিন্দী স্তব আরম্ভ করলেন, ''প্রভু, তোমার সেবায় আমি দিনরাত প্রাণপাত করবো। তোমার একান্ত দাসী আমি—
তুমি শ্যাম আমি প্যারী,
তুমি শুক আমি শারী।
তুমি বেড়ী আমি হাঁড়ি,
তুমি ঘোড়া আমি গাড়ি।
তুমি বোলতা আমি চাক,
তুমি ঢাকী আমি ঢাক।
তুমি পোকা আমি ফুল,
তুমি কর্ণ আমি দুল।
ইত্যাদি ইত্যাদি।।
কুড়রামের প্রায় অন্তিম দশা। ওরে বাবা! স্তবের কি ভাষা! আর চোখ-মুখ হাত-পায়েরই বা কী প্রচণ্ড বিক্ষেপ! কুড়রামের পেটের ভাত চাল হয়ে গেল। বুকের ভিতর দড়াশ দড়াশ শব্দ হচ্ছে। তিনি নেতিয়ে রইলেন বুক চেপে ধরে। বেশ কিছুক্ষণ গেল ধাক্কা সামলাতে। শেষে চড়ুকে হাসি হেসে বললেন, ''শোভনে! তোমার বচনামৃত আমার কানে যেন মধু ঢেলে দিলে। শত অশ্বমেধ যজ্ঞ করলে, তবেই না তোমা হেন বিদূষী রূপবতী ললনার সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভের সৌভাগ্য ঘটে। কিন্তু দেবী, আজ আমি এত ক্লান্ত যে, কথা বলতে পারছি নে। তার উপর আমার বংশগত যক্ষ্মাকাশ আছে, তাই সেন মশায় আমাকে অতিরিক্ত পরিশ্রম না করতে এবং যথোপযুক্ত বিশ্রাম নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। দিন তিনেক পরে, কথঞ্চিৎ সুস্থ হয়ে, তোমার সঙ্গে আলাপ করবো।''
কালিন্দী কি আর করেন। কুড়রামের মুখে একটা পানের খিলি গুঁজে দিয়ে বিদায় নিলেন।
ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো কুড়রামের। তারপর আয়েশ করে তিনি খিলিটি কেবল চিবোতে গেছেন,—হড়হড় হড় হড়—ওরে বাবা!—ওয়াক ওয়াক—ওরে বাবা!—ওয়াক ওয়াক। বমির চোটে কুড়রামের অন্নপ্রাশনের অন্ন পর্যন্ত উঠে এল। পানের মধ্যে ভাঁটপাতা, নিম, মাছের আঁশ আর কুইনিন। ওগুলো সব যমরাজ-মহিষীর প্রিয় পানের মশলা। ধর্মরাজ কুড়রাম হাঁপাতে হাঁপাতে প্রতিজ্ঞা করলেন, নারী জাতির দেওয়া পানের খিলি না খুলে তিনি আর কখনো মুখে দেবেন না।
শুয়ে পড়লেন কুড়রাম। সে-রাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে তিনবার কালিন্দীর মুখ দেখে তিনি ডুকরে উঠেছিলেন।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
পদচ্যুত যম বাড়ি ফিরেছেন। অবসন্ন কাতর। মাকে সব ঘটনা খুলে বলতেই, মা ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠলেন। দু চোখে জলের ধারা আর থামে না। মা কাঁদে, ছেলেও কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে মা বলেন, ''বাবা যম, কি উপায় হবে এখন? এই দুর্ভিক্ষের সময় তোমার চাকরিটা গেল। এ রাবণের বংশকে বাঁচাবে কি দিয়ে?''
যম মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন।
শেষে কিছুটা আত্মস্থ হয়ে মা বললেন, ''যাই হোক, বাবা, খেয়ে নাও। তারপর তোমায় নিয়ে আমি বিষ্ণুঠাকুরের কাছে যাব, লক্ষ্মীকে দিয়ে তাঁকে অনুরোধ করাবো। আজকাল অঞ্চল প্রভাব খুবই প্রবল।''
যম খেতে বসলেন বটে, কিন্তু ভাত আর মুখে ওঠে না। দুশ্চিন্তায় ও অবসাদে খাওয়ার কি আর রুচি থাকে। ছেলে খেতে পারছে না দেখে মায়ের প্রাণ আকুলি-বিকুলি করে, দু:খে বুক যেন ফেটে যায়। ছেলেকে তিনি নানা ভাবে সান্ত্বনা দেন, কত সাহস যোগান। শেষে বলেন, ''ভয় কি বাবা, এত নিরাশ হচ্ছো কেন? তোমার এত কালের কর্ম—কখনই একেবারে ছাড়িয়ে দেবে না। বিশেষ করে লক্ষ্মীঠাকুরুণ অনুরোধ করলে কেউই বিরুদ্ধতা করবে না। আর একান্তই যদি কাজ যায়, তাহলেও ভেঙে পড়ার কি আছে!—তুমি চিকিৎসা-ব্যবসা শুরু করবে। তোমার হাতযশের কথা সবাই জানে। আর আমিও অনেক শিল্পকাজ জানি। জুতো, টুপি মোজা বুনে তোমায় আমি সাহায্য করবো।''
জননীর সাহস বাক্যে যমরাজের দুর্ভাবনা অনেকটা দূর হয়, মনে ভরসা পান। তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে উড়ানিখানা কুঁচিয়ে তিনি কাঁধে ফেললেন, ঠনঠনের জুতো জোড়া পায়ে দিলেন, তারপর একগাছা বাঁশের লাঠি হাতে মায়ের সঙ্গে রওনা দিলেন বিষ্ণুলোকের দিকে।
দিনের শেষ। লক্ষ্মী বসে আছেন নিজের কামরায়। এমনিতেই তিনি সর্বাঙ্গ সুন্দরী, তাই গায়ে গহনা দেবার দরকার পড়ে না,—আছে শুধু মণিবন্ধে দুগাছা হীরের বালা, পায়ে চারগাছা জলতরঙ্গ মল, কোমরে একছড়া মোটা সোনার গোট আর গলায় দুনর মুক্তামালা; মাথায় জলভরা মেঘের মতো উজ্জ্বল কালো চুল, তাতে ফিরিঙ্গী খোঁপা বাঁধা, আর কানে দুলছে কাচপোকা-হুলের মতো নীল পান্না। সুন্দর ঠোঁট দুটো ছাঁচি পানে হিঙ্গুলের মতো টুকটুকে লাল। পরনে রেলওয়ে পেড়ে সিমলার ধোপদুরস্ত ফিনফিনে শাড়ি একখানা।
লক্ষ্মী দুর্গেশনন্দিনী পড়ছিলেন। পড়ার জায়গায় চিহ্ন দিয়ে বইখানা মুড়ে তিনি আয়েষার বিষাদের কথা ভাবছেন, এমন সময় যম-জননী এসে গলায় আঁচল দিয়ে প্রণাম করলেন। লক্ষ্মী আসার কারণ জিজ্ঞেস করতেই যমের মা কেঁদে ফেললেন। কাঁদতে কাঁদতে আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত শেষ করে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললেন, ''মা, আপনি ত্রিলোক প্রতিপালন করছেন। আমার যমের কি উপায় হবে? তার উপর দয়া করুন, মা। যম আমার একদিনেই আধখানা হয়ে গেছে।''
চিন্তিত মুখে লক্ষ্মী বললেন, ''সত্যি বাছা, দু:খের কথাই বটে। যমের চাকরি গেছে শুনে মর্মাহত হলাম। কিন্তু শিবের হুকুম নড়ানো নিতান্ত দু:সাধ্য ব্যাপার। কারো কথায় তিনি আমল দেন না। যাই হোক বাছা, আর কেঁদ না তুমি। ঠাকুরকে বলে দেখি, যতদূর পারি তোমার উপকারের চেষ্টা করবো।''
যম-জননী অনেকটা আশ্বস্ত হলেন, লক্ষ্মীকে আশীর্বাদ করে বললেন, ''মা, আপনার ধনে পুত্রে লক্ষ্মীলাভ হোক। মা, আপনি মনে করলে সবই করতে পারেন। বিষ্ণু ঠাকুরকে আপনি বিশেষ করে বলুন, আমার যমকে তিনি যেন আবার কাজে বহাল করে দেন। মা, আমি বুড়ো হয়েছি, আর বেশী দিন বাঁচবো না। যে কদিন বাঁচি, দেখবেন আপনার দয়ায় যেন কষ্ট না পাই।''
দয়ার্দ্র কণ্ঠে লক্ষ্মী বললেন, ''বাছা, আমায় আর বেশী বলতে হবে না। তোমার দু:খে সত্যিই আমি খুব ব্যথিত হয়েছি। যমকে তুমি বৈঠকখানায় বসতে বলো। আমি ঠাকুরকে ডেকে পাঠাচ্ছি।''
যমের মা বেরিয়ে গেলেন।
দাসীকে ডেকে লক্ষ্মী বললেন, ''বিন্দী, যা তো, ঠাকুরকে এক্ষুণি একবার বাড়ির ভেতর ডেকে আন।''
বিষ্ণু সম্প্রতি একজোড়া নতুন গরুড় কিনেছেন। পাখি দুটোর পরিচর্যায় তিনি মহা ব্যস্ত। একবার 'ওহো বেটা' বলে এটার গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন তো, পরক্ষণে ''ওহো ও বেটা'' বলে অন্যটাকে আদর করছেন; সময় সময় কোঁচার খুঁট দিয়ে তাদের ঠোঁট মুছিয়ে দিচ্ছেন, কখনো বা সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাদের বাঁকানো গ্রীবার তারিফ করছেন,—এমন সময় বিন্দী এসে উপর-আদালতের সমন সার্ভ করলো।
বিষ্ণু যদিও খুব গরুড়প্রিয়, তবু সমন মতো কাজ না করলে ওয়ারেন্ট জারী হতে পারে আশঙ্কায় তিনি তক্ষুণি বিন্দীর পিছনে ধাওয়া করলেন। এবং লক্ষ্মীর ঘরে ঢুকে বললেন, ''আসামী হাজির, শাস্তি বিধান করুন।''
নারায়ণী কপট রাগের ভান করেন, ''কথার শ্রী দেখ না! ওসব বললে যে আমার অমঙ্গল হয়, দাসীকে অপ্রস্তুত করা হয়, সে কাণ্ডজ্ঞানও নেই।''
বিষ্ণু বললেন, ''আচ্ছা, আচ্ছা। এখন বলো কি প্রার্থনা।''
লক্ষ্মী। আমি ভিক্ষা চাই।
বিষ্ণু। কি ভিক্ষা?
লক্ষ্মী। দাও তো বলি।
বিষ্ণু। আগে থেকে অঙ্গীকার করতে পারি না।
লক্ষ্মী। কেন?
বিষ্ণু। কারণ আমার এমন কিছুই নেই, যা তোমাকে দেই নি।
লক্ষ্মী। একটা জিনিস নতুন পেয়েছ।
বিষ্ণু। তাও তোমার। কি জিনিস—নাম বলো।
লক্ষ্মী। পরোপকার করার উপায়।
বিষ্ণু। তাও দিলাম।
খুশী মনে লক্ষ্মী এবার বিষ্ণুর হাত ধরে কৃতজ্ঞ কণ্ঠে বললেন, ''সদাশিব যমের চাকরি ছাড়িয়ে দিয়েছেন, তার সেই চাকরিটি আবার তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। যমের মা এতক্ষণ এখানে বসে কাঁদছিল। আহা! বুড়ীর দু:খ দেখে আমি চোখের জল রোধ করতে পারি নি। আমার উপর তোমার অকৃত্রিম স্নেহ কতখানি জানি, সেই জোরে আমি কথা দিয়েছি, যমকে তার কাজ আবার পাইয়ে দেব।''
বিষ্ণু অবাক। ভ্রূ কুঁচকে বললেন, ''বলছো কি! যমের চাকরি গেছে? সদাশিব যমের এমন কি গুরুতর অপরাধ পেলেন যে, সভার অনুমোদন না নিয়েই তাকে পদচ্যুত করলেন! যাই হোক, তুমি যখন তার ওকালতনামায় সই দিয়েছ, তখন ধরে নেওয়া যায়, সে কাজ পেয়ে বসে আছে। ব্রহ্মাকে নিয়ে আমি অচিরাৎ মহাদেবের কাছে যাচ্ছি। মনে হয়, যমকে ভয় দেখানোর জন্যেই মহাদেব এরকম কড়া হুকুম দিয়েছেন। আবার তার চাকরিতে বহাল হবার পুরো সম্ভাবনাই আছে।''
বিষ্ণুর নির্দেশ মতো কোচম্যান বিসমার্ক ব্রাউভার্নার ফিটনে নতুন গরুড় জোড়া জুতে আনে। গাড়িতে উঠে বসে নারায়ণ তাকে পদ্মযোনির অর্থাৎ ব্রহ্মার সপ্তসরোবরোদ্যানে যেতে বললেন। গ্রীষ্মকালে ব্রহ্মা উদ্যানে বাস করেন।
পদচ্যুতির পরোয়ানাখানা যম নারায়ণের হাতে দিয়ে, কোচম্যান যেখানে বসে, সেই কোচবাকসে গিয়ে উঠে বসলেন।
ঘর ঘর করে গাড়ি ছুটে চলেছে। নারায়ণ পরোয়ানা পড়ছেন। সদাশিবের স্বাক্ষর দেখে তাঁর ক্ষণেকের জন্যে কেমন একটু সন্দেহ হলো, কিন্তু শিব হয়তো গাঁজায় দম দিয়ে সই করেছেন মনে হতেই আর কোন সন্দেহ রইলো না। পরোয়ানা পড়া শেষ হলো, গাড়িও সপ্তসরোবরোদ্যানে পৌঁছে গেল।
সরোবর-তীরে বিস্তীর্ণ গালিচা পাতা। ঠাণ্ডা জলীয় হাওয়া বইছে। ব্রহ্মা সেখানে বসে হাওয়া খেতে খেতে বেদ চারখানার চতুর্থ সংস্করণের প্রুফ দেখছেন। প্রুফ সংশোধনে তাঁর এমনি অখণ্ড মনোযোগ যে, বিষ্ণু সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন তা টেরও পান নি।
ব্রহ্মার অবস্থা দেখে বিষ্ণু গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ''প্রজাপতি, প্রণাম হই।''
ব্রহ্মা ধড়মড় করে মুখ তুলে বিষ্ণুকে দেখেই অপ্রস্তুত। তাঁকে সসম্মানে আলিঙ্গন করে বললেন, ''বাবাজী যে অসময়ে?''
''বিশেষ কাজ না পড়লে কি আর আপনাকে বিরক্ত করতে আসি?'' বিষ্ণু জবাব দেন, ''তা, আপনার বেদের চতুর্থ সংস্করণ বের হতে আর কত দেরী? বেদ নিয়ে আপনি এমনি ব্যতিব্যস্ত যে, আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসতেও ভয় হয়।''
ব্রহ্মা বাধা দেন, ''কি যে বলেন বাবাজী! আমি আপনার আশ্রিত—এ আপনারই বাড়ি, আপনারই বাগান, আমিও আপনার। যখনি ইচ্ছে হবে, আসবেন। আপনি এলে বেদের উন্নতি বই অবনতি হয় না। আগামী শীতের গোড়াতেই চতুর্থ সংস্করণ বেরিয়ে যাবে মনে করছি।''
হঠাৎ বিষ্ণুর পিছনে যমকে দেখতে পেয়ে ব্রহ্মা অবাক হলেন, ''কী ব্যাপার! অকালে কালের আগমন! নিশ্চিত কোন বিভ্রাট বেধেছে। তা, যমের শরীর এত রোগা কেন, অসুখবিসুখ করে নি তো?''
বিষ্ণু বললেন, 'আর বলেন কেন! যমরাজের মানসিক অবস্থা যারপরনাই বিপর্যস্ত, দু:খে দুশ্চিন্তায় অপ্রকৃতিস্থ হবার যোগাড়। সদাশিব তাকে বরখাস্ত করেছেন। পরোয়ানাখানা পড়ে দেখুন।''
পড়া শেষ করে ব্রহ্মা বললেন, ''যমের এ বিপদ ঘটবে, আমি আগে থেকেই টের পাচ্ছিলাম। কয়েক বছর হলো, যম রাজকার্য দেখাশুনো একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছেন। উনি এমনি কাপুরুষ যে, ভয়ে পরশ্রীকাতর দুর্দান্ত নরাধমদের ছায়াও মাড়াতেন না, বেছে বেছে নিরপরাধ মিষ্টি স্বভাবের ভদ্র ব্যক্তিদেরই কেবল প্রাণ নিয়েছেন। কাজকর্মে কৃতান্তের যে রকম ঢিলেমি চলেছে, তাতে সদাশিবকে দোষ দিতে পারি নে। তিনি উচিত কাজই করেছেন।''
বিষ্ণু বললেন, ''সবই সত্যি। তবু যম আপনার সন্তান, হাজার অপরাধে অপরাধী হলেও তাকে মার্জনা করা উচিত। তাছাড়া যম আপনার একান্ত অনুগত, বহুকালের চাকর। তাকে একেবারে বরখাস্ত করা বোধহয় বিচারসম্মত হবে না।''
এতক্ষণে যমের মুখে কথা ফুটলো। করজোড়ে হেঁট হয়ে তিনি অতি বিনীত ভাবে বললেন, ''মার্জনা করুন—অন্তত: এবারের মতো। এই আপনার সামনে আমি শপথ করছি, আর কখনো আমায় কাজে অমনোযোগী দেখতে পাবেন না।''
ব্রহ্মা বিষ্ণুকে জিজ্ঞেস করলেন, ''তা বাবাজীর কি ইচ্ছা?''
''মার্জনা করা।'' দয়ার সাগর সহৃদয় হৃষীকেশ জবাব দেন।
ক্ষণকাল চিন্তা করে ব্রহ্মা সর্বান্ত:করণে বিষ্ণুর মতে সায় দিলেন।
''বেশ। তাহলে তৈরি হয়ে নিন।'' বিষ্ণু বললেন, ''মহেশ্বরের কাছে এখুনি যাওয়া দরকার। ফিটন তৈরি। যেতে পাঁচ মিনিট, আসতে পাঁচ মিনিট।''
মাথা নেড়ে ব্রহ্মা বললেন, ''বাবাজী, ওটি করবেন না। আজ বেলা শেষ হয়েছে, যেতে আসতে রাত হয়ে যাবে। বিশেষ করে আপনি তো জানেন, সন্ধ্যের পর মহেশ্বরকে প্রকৃতিস্থ পাওয়া ভার। তাই যমকে আজ বাড়ি যেতে বলুন। কাল সকালে আটটা বাজার আগেই আমি মহেশ্বরের ওখানে গিয়ে পৌঁছাব। আপনিও সে সময় যমকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হবেন।''
ব্রহ্মা-বিষ্ণুর পদধূলি নিয়ে যম বিদায় নিলেন।
ব্রহ্মা এবার এগিয়ে এসে বিষ্ণুর হাত ধরে বললেন, ''উঁহু, বাবাজী, সেটি হবে না। না খেয়ে যেতে পারবেন না। কিছু খানদানী ব্যাপার আছে। শচীনাথ ইন্দ্রসাহেব বাড়ির কিছু খাদ্যাদি পাঠিয়েছেন। আপনার অনুপস্থিতির জন্য সে সব খোলাই হয় নি।'' বলে ব্রহ্মা চোখ টিপে হাসলেন।
পরদিন। সকাল আটটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকী। মহাদেব নিজের কামরায় বিস্তীর্ণ ব্যাঘ্রচর্মের উপর বসে আছেন। দু হাতে কমণ্ডলু সাপটে ধরে গরম চা খাচ্ছেন। পাশে ভগবতী। শিরীষ ফুলের চেয়েও কোমল আঙুল দিয়ে শশাঙ্কশেখর মহাদেবের পিঠের ঘামাচি মারছেন।
গত রাত্রে শুলপাণি সিদ্ধি খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। সিদ্ধি শিবের মৌতাত, তাই অজ্ঞান হবার কথা নয়। তাহলে ব্যাপারটা কি?
নন্দী নতুন বাজারে গাঁজা কিনতে গিয়ে শোনেন, সিদ্ধিতে নেশা না হলে ঝুল মিশিয়ে দিতে হয়। এদিকে সিদ্ধিতে নেশা হয় না বলে মহাদেব দৈনিক তাকে উঠতে বসতে গালাগালি করেন। নন্দী তাই গত রাত্রে ষাঁড়ের ঘর থেকে খানিকটা ঝুল এনে সিদ্ধিতে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। তাইতেই ধূর্জটির ঘোরতর নেশা হয়।
নেশার প্রথম ধাক্কায় ব্যোমকেশ 'ব্রাভো নন্দী' বলে হাসতে শুরু করেন। কিন্তু তা ক্ষণেকের জন্য। নেশা পেকে আসতেই তিনি অম্বিকার গায়ে ঢলে পড়েন।
পার্বতী যেমন পতিপ্রাণা, তেমনি তাঁর ঘেন্নাও খুব। বমির চোটে তখন বিছানা ভাসছে, তিনি হাবুডবু খাচ্ছেন। নোংরা বিছানা তাড়াতাড়ি সরিয়ে ফেলে আবার তিনি পরিপাটি বিছানা করে অসাড় অজ্ঞান পিনাকপাণিকে শুইয়ে দিলেন। তারপর গসনেলের সাবান নিয়ে সোজা খিড়কির পুকুরে। গসনেলের সাবানে আপাদমস্তক ভাল করে ঘষে স্নান সেরে তিনি নতুন কাপড় পরলেন। তবু কিন্তু বমির গন্ধ যায় না। শেষে ল্যাভেন্ডার সেন্ট ছিটিয়ে তিনি স্বস্তি পান। মৃত্যুঞ্জয় তখন মড়ার মতো বিছানায় পড়ে আছেন। তালপাখা দিয়ে তাঁকে বাতাস করতে করতে ভগবতীও নিজে একসময় ঘুমিয়ে পড়লেন।
চা খেয়ে মহাদেব বললেন, ''দেবী, আমার শরীর এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। রাঁধুনীকে বলো, আমায় যেন সকাল সকাল মৌরলা মাছের ঝোল দিয়ে চারটি ভাত দেয়।''
হাসতে হাসতে ভগবতী বললেন, ''তা তো বুঝলাম। কিন্তু রাত্রির কাণ্ড-কারখানা কি মনে আছে? যে কাণ্ড করেছিলে, তাতে তোমাকে যে আর জ্যান্ত দেখবো, ভাবতে পারি নি। সেই রাতে আমায় কিনা ঘাটে গিয়ে গা ধুয়ে আসতে হলো।''
মহাদেব লজ্জায় পড়েন। কুণ্ঠার সঙ্গে বললেন, ''দেবী, তোমার রাঙা পায়ে আমি পদে পদে অপরাধী। তোমার চরণকমল ধরে সবিনয়ে নিবেদন করছি, আমার অপরাধ মার্জনা করো।''
মহাদেব মহেশ্বরীর দু পা জাপটে ধরে আছেন, এমন সময় ব্রহ্মা এসে হাজির। আর লজ্জায় ভগবতীর মাথা হেঁট। শিব বললেন, ''ব্রহ্মা, আমি ভগবতীর ধ্যান করছিলাম। আপনি এসেছেন, ভালই হলো। আমার হয়ে একটু তদ্বির করুন, দুটো কথা বলুন।''
ব্রহ্মা জিজ্ঞেস করেন, ''অভয়ার অভিমান কিসে হলো?''
''আর বলেন কেন!'' মহাদেব বললেন, 'গত রাত্রে সিদ্ধির চোটটা একটু বেশি হয়েছিল। তাতে অভয়ার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে।''
''কিন্তু ও তো আপনার সাপ্তাহিক রঙ্গ। ও জন্যে তো সুশীলা শৈলবালা কখনো অভিমান করেন না।'' ব্রহ্মা মন্তব্য করেন।
মহাদেব বাধা দেন, ''না, বাবা, হাসির মার বড় মার। অপরাধ করেছি! বেশ তো সেই মতো ঘা কতক দিয়ে দাও, দেনা-পাওনা সমান হয়ে যাক। তা নয়, উলটে কিনা ফিক ফিক করা হাসা আর মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা—বড্ড অপ্রস্তুত হতে হয়, বুঝলেন।''
ব্রহ্মাকে উদ্দেশ্য করে ভগবতী এবার বললেন, ''ঠাকুর, ওঁর কথায় কান দেবেন না। উনি অষ্টপ্রহর আমার সঙ্গে ঐরকম ঠাট্টা-বটকেরা করে থাকেন। আমি ওঁর চরণসেবার দাসী, আমার কাছে অপ্রস্তুত বা কুণ্ঠিত হবার কি আছে?''
''না হে, চতুর্মুখ,'' মহাদেব প্রতিবাদ জানান, ''অন্নদা আমার জটের উকুন—সতত শিরোধার্য। দাসী বলে আমার অকল্যাণ করছেন।'
এবার রাগের ভান করেন ভগবতী, ''বেশ তো, উকুনকে তাহলে নখে নখে টিপে নিপাত করো, যমের বাড়ি চলে যাই।''
ঠিক তক্ষুণি দেখা গেল, বিষ্ণুর সঙ্গে যম আসছেন। হাসতে হাসতে মহাদেব বললেন, ''ভগবতী, তোমার যম জামাই দুই-ই হাজির। যার কাছে ইচ্ছা, যেতে পার।''
ঘোমটা টেনে ভগবতী অন্য ঘরে চলে গেলেন।
যমের দিকে তাকিয়ে মহাদেব জিজ্ঞেস করলেন, ''ব্যাপার কি? যম এমন মনমরা কেন?''
জবাব দিলেন ব্রহ্মা, ''যে মূল মাটি থেকে রস টেনে নেয়, তা কেটে ফেলে আপনি জিজ্ঞেস করছেন, গাছ শুকিয়ে গেল কেন? যম আমাদের সবার অত্যন্ত অনুগত। তাই আমার ও নারায়ণের বিশেষ অনুরোধ, তাকে আপনার মার্জনা করতে হবে। যম দোষী নয়, এমন কথা আমরা বলিনে—যম হাজার হাজার দোষে দোষী। আপনি একলাই সিদ্ধান্ত নিয়ে যমকে বরখাস্ত করে তার জায়গায় কুড়রাম দত্তকে নিয়োগ করেছেন, তার যৌক্তিকতা সম্বন্ধেও আমাদের কোন প্রশ্ন নেই। আপনার আদেশ আমরা অবশ্যগ্রাহ্য বলে মনে করি। কিন্তু সবাই জানে, আপনার রাগ বিদ্যুৎ চমকের মতো ক্ষণস্থায়ী আর দয়া বাতাসের মতো চিরপ্রবাহিত। তাই হে বদান্যতার মহাসমুদ্র, বগলাবল্লভ! যমের উপর দয়া করুন, দু:খ ও নৈরাশ্যের সাগর থেকে তাকে উদ্ধার করুন।''
মহাদেব হাঁ করে ব্রহ্মার বক্তৃতা শুনছিলেন। বক্তৃতা শেষ হলেও হাঁ বন্ধ হলো না। ক্ষণেক পরে ব্রহ্মার আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিয়ে তিনি বললেন, ''ব্রহ্মা, আমি গাঁজা খাই বটে, কিন্তু গাঁজাখোরের মতো কাজ করি নে। আপনি এতক্ষণ কি সব প্রলাপ বকলেন, তার একটা বর্ণও আমার বোধগম্য হয় নি। গত রাত্রে বোধহয় আপনার মাত্রা বেশি হয়ে গেছলো। আমার বিশ্বাস ছিল, সোমরসে তিনটে মাত্র অবস্থার উদ্ভব হয়—নাক ঘামে, ঘুম হয় আর প্রস্রাব বাড়ে। আজ জানলাম—না, চতুর্থ আর একটা উপসর্গও দেখা দেয়। সেটা হলো প্রলাপ। যমের উচ্ছিষ্টও আমি স্পর্শ করি নি। অথচ আপনি বলছেন, তাকে আমি বরখাস্ত করেছি। কোন দিন আপনাকে বলতে শুনবো, ত্রিদিব-অধিপতিকে আমি দ্বীপান্তর পাঠিয়েছি।''
ব্রহ্মা তো হতভম্ব : ব্যাপার কি তাহলে? এ যে আরো জটিল হয়ে পড়লো! অসহায় চোখে তিনি বিষ্ণুর দিকে তাকাতেই, বিষ্ণু 'সদাশিব'-স্বাক্ষরিত পরোয়ানাখানা মহাদেবের দিকে এগিয়ে দিলেন।
বিস্ফারিত চোখে মহাদেব আদ্যোপান্ত পড়লেন পরোয়ানাখানা—একবার ...দুবার...তিনবার। বগল চুলকে নিলেন বার দুয়েক। তারপর কয়েকবার ঢোক গিলে বললেন, ''এতো বড় মুশকিল! না: এ পরোয়ানা আমার দপ্তর থেকে বের হয়নি। উঁহু স্বাক্ষরটা আমার স্বাক্ষরের মতো বটে, কিন্তু আমি হলপ করে বলছি, আমি এ সই করি নি। আমার সেরেস্তায় এক মাসের মধ্যে যমের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগই আসে নি, তা এ পরোয়ানা বের হবে কেন? ভারী ফ্যাসাদের ব্যাপার দেখছি।''
যমের দিকে তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ''চার্জ কি বুঝিয়ে দিয়েছ?''
''আজ্ঞে হ্যাঁ।''
''আমায় উদ্ধার করেছ!'' মহাদেব খেঁকিয়ে ওঠেন। ক্ষণকাল চুপ করে থেকে বলেন, ''আমার মনে হয়, এ কাণ্ড অসুরেরাই করেছে। অনেক কাল দেবাসুরে যুদ্ধ হয় নি, এ পরোয়ানা সেই যুদ্ধেরই সূত্রপাত। আর দেরি না করে, এক্ষুণি আমাদের যমপুরীতে যাওয়া দরকার।''
বিষ্ণু জিজ্ঞেস করেন, ''আচ্ছা যম, কত সৈন্যসামন্ত এসেছে কুড়রামের সঙ্গে?''
''একটা প্রাণীও না।'' যম জবাব দিলেন, ''কিন্তু প্রভু, কুড়রাম একাই এক হাজার। কৃষ্ণ-অবতারে আপনি কংসালয়ে গিয়ে হাতে মাথা কেটেছিলেন, আর কুড়রাম থাপ্পড় মেরে কয়েকজন বাহকের মুণ্ডু উড়িয়ে দিয়েছে।''
ব্রহ্মা প্রস্তাব করেন, ''শচীনাথকে সংবাদ দেওয়া হোক।''
কিন্তু বিষ্ণু অতখানি হৈ-চৈ গণ্ডগোল করতে চান না। তাঁর বিশ্বাস, কোন আমুদে লোক যমকে ন্যাকা হাবলা দেখে কিঞ্চিৎ রসিকতা করেছে।
ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর, তিনজনই কুড়রাম-দর্শনের জন্য বিশেষ ব্যগ্র হয়ে পড়েন। এবং স্পেশাল ট্রেন যোগে যমকে সঙ্গে নিয়ে অচিরাৎ যমালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
পারিষদবর্গে পরিবেষ্টিত হয়ে কুড়রাম সিংহাসনে বসে আছেন। চিত্রগুপ্ত অভিবাদন করে বললেন, ''ধর্মরাজ, কারাগারগুলো বড় না করলে বন্দীদের অত্যন্ত কষ্ট হচ্ছে। যে পরিমাণে লোক আসছে, তাতে আরো দুটো কারাগার দরকার হবে মনে হয়।''
ধর্মরাজ কুড়রাম জবাব দেন, ''কিচ্ছু ভেব না। এমন উপায় বাৎলে দিচ্ছি, যাতে কারাগার বড় করার প্রয়োজনই থাকবে না। অবিলম্বে তুমি অকালমৃত্যু ব্যাটাকে হাতে গলায় শেকল দিয়ে বেঁধে কারাগারে ফেলে রাখ। এক মাসের মধ্যেই দেখবে কারাগার আদ্দেক খালি পড়ে আছে।''

মহাদেবের এবার চোখ পড়লো যমের উপর।...চোখমুখ খিঁচিয়ে উঠলেন তিনি...
হুকুম শুনে চিত্রগুপ্তের হাত কচলানি শুরু হয়। মাথা চুলকোতে-চুলকোতে আমতা আমতা করে তিনি বললেন, ''আজ্ঞে, অকালমৃত্যু পুরনো যমের বড় প্রিয়পাত্র ছিল। উপরন্তু সভা থেকেই সে নিযুক্ত হয়েছে। তাই তার কারাবাসের আদেশ আপিলে খারিজ হবার সম্ভাবনা।''
চিত্রগুপ্তের কথা শুনে কুড়রাম ক্ষেপে আগুন। ক্ষুদে ক্ষুদে চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। বাকসের উপর সজোরে এক প্রচণ্ড চাপড় মেরে তিনি হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, ''আমার নাম হুকুম, তোমার নাম তামিল। তোমায় হুকুম দিচ্ছি, তামিল করো। ভবিষ্যতে কি হবে না হবে, তা নিয়ে তোমার মাথা ঘামানোর দরকার নেই।''
কুড়রাম হুকুম লিখতে বসেন,—রাগে হাত কাঁপছে এমন সময় পদচ্যুত কৃতান্তকে নিয়ে ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর সভামণ্ডপে এসে উপস্থিত।
কুড়রাম তাড়াতাড়ি সসম্ভ্রমে নেমে এলেন সিংহাসন থেকে। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরকে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
মহেশ্বর কুড়রামের আপাদমস্তক ভাল করে যাচাই করে নেন। শেষে জিজ্ঞেস করলেন, ''আচ্ছা বাপু, যমালয়ে তুমি সশরীরে এলে কি করে?''
সবিনয়ে কুড়রাম বললেন, ''প্রভু, আমি লোচনপুর কাছারির আটচালায় শুয়ে ছিলাম, এমন সময় যমের বাহকেরা আমায় এখানে এনে ফেললে। এখানে এসে মহা দুর্ভাবনায় পড়লাম। অপরিচিত দেশ, সহায়সম্বলহীন —কি করি! শেষে কাগজ কলম নিয়ে একখানা পরোয়ানা লিখে যমকে বরখাস্ত করলাম। অবশ্য হুজুরের নামটা জাল করতে হয়েছিল, কিন্তু তা নিতান্ত দায়ে পড়ে, স্রেফ আত্মপক্ষ সমর্থনে। তা ছাড়া বিশেষত: 'ধ্যায়েন্নিত্যং মহেশং রজতগিরিনিভং চারুচন্দ্রাবতংসং' ধ্যান করতে করতে সে সময় আমি স্বাক্ষরটা করেছিলাম। অতএব, হে প্রভু শশাঙ্কশেখর নীলকণ্ঠ মহেশ্বর! অধমের অপরাধ মার্জনা করুন।''
কুড়রামের স্তবে মহাদেব ততক্ষণে জল হয়ে গেছেন। বললেন, ''তা তো বুঝলাম, বাপু। কিন্তু জালিয়াতি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। তাই দ্বীপান্তরস্বরূপ তোমায় লোচনপুরের কাছারিবাড়িতে ছেড়ে দিয়ে আসছি,—কেমন? আচ্ছা, এস তাহলে।''
মহাদেবের এবার চোখ পড়লো যমের উপর। সঙ্গে সঙ্গে মেজাজ তিরিক্ষে হয়ে উঠলো। কোথায় বা সেই মৌরলা মাঝের ঝোল আর আয়েস করে বিশ্রাম, আর কোথায় বা এই বেহদ্দ ঝক্কি-ঝামেলা! চোখমুখ খিঁচিয়ে উঠলেন তিনি, ''বলি বাপু, কি হলো এটা? তোমার মাতব্বরি তো মরা মানুষের উপর, তাদের নিয়েই কারবার। সে সব ফেলে তুমি কিনা জীবন্ত মানুষের কাছে গেলে চালাকি করতে। জীবন্ত মানুষ এনেছিলে তো মাত্তর একটা। তার ঠ্যালায়ই এই দশা—যাকে বলে ত্রিভুবন চক্কর! দাও, নাকে কানে খত দাও, খত দাও....হ্যাঁ হ্যাঁ....আচ্ছা, ....থাম, হয়েছে।''
কিন্তু তাতেও কি রাগ পড়ে! গালাগালি করে যমের নিকুচি করতে করতে ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর যে যাঁর বাড়ি রওনা হলেন।
প্রকাণ্ড দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে নাকে হাত বুলোতে বুলোতে যমরাজ আবার সিংহাসনে গিয়ে বসলেন।
লোচনপুরের কাছারিবাড়ি। কুড়রামের ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে দেখেন, কাছারিবাড়ির আটচালার পাশের ঘরে চারপায়ার উপর তিনি শুয়ে আছেন।
—
শরৎ
মহ: রায়হান আলি খাঁন
বাদলা কেটে মেঘলা আকাশ ফরসা হল ঐ,
হিমেল বাতাস আনন্দে তাই করছে যে হৈচৈ।
শিশির কণা ঘাসের ডগে শিরশির দে যায়
সাদা সাদা কাশের ফুলে ধরার দেহ ছায়।
কচি মেঘের চপল খেলা দেখে আকাশ পরে—
সবুজ রঙের পরশ লাগে শিশুদের অন্তরে।
রুটীন বাঁধা জীবনটাতে ছুটির খবর খুঁজি,
বর্ষা শেষে বাংলাতে আজ শরৎ এল বুঝি!
বনে বনে মধুর লোভে জোটে হাজার অলি,
বাঁধন-হারা খুশির ছটায় করতে কোলাকুলি।
ফুলের পরাগ আবির মেখে এমনি শরৎ ভোরে
হৈ হল্লায় মাতব সবাই, থাকব না কেউ ঘরে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন