দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

স্বপনবুড়ো
তোমরা কি কেউ এমন ছেলের সন্ধান রাখো, যে প্রথম দিন পাঠশালায় গিয়েই অ-আ-ক-খ প্রভৃতি অক্ষরগুলি সব পড়তে, চিনতে আর লিখতে শিখেছিল?
ভূ-ভারতে এমন ছেলে খুঁজে পাওয়া শক্ত। এই ছেলেটি হচ্ছে মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামের মাথাভারী ঈশ্বরচন্দ্র।
এই ঈশ্বরচন্দ্র ছেলেবেলায় তার মা-বাবার কাছ থেকে কেমন যত্ন, আদর আর শাসন লাভ করে মানুষের মতো মানুষ হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল, সেই কাহিনী কিশোর বন্ধুদের শুনিয়ে দিচ্ছি।
ঈশ্বরচন্দ্র পণ্ডিতের বংশে জন্মেছিল। কিন্তু ওরা ছিল বড় গরীব। যাকে বলে দিন চলে না।
ঈশ্বরচন্দ্রের ঠাকুর্দা ছিলেন সারা দেশে নামকরা পণ্ডিত রামজয় তর্কভূষণ। কিন্তু সংসারে তাঁর মন টিকতো না। মাঝে মাঝে বাড়ী থেকে তিনি উধাও হয়ে যেতেন। অনেক কাল তাঁর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যেত না।
একবার তিনি স্বপ্ন দেখলেন, তাঁর সংসারে এক মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করবেন।
এই স্বপ্ন দেখে তিনি হিমালয় পর্বত থেকে দেশে ফিরে এলেন।
তাঁর ছেলে ঠাকুরদাসের এক ছেলে হল ১২২৭ সনের ১২ই আশ্বিন, বেলা ঠিক বারোটায়।
তর্কভূষণ সেই সময় পুঁথি খুলে কি পড়ছিলেন। বাড়ীতে শঙ্খের শব্দে তিনি সচকিত হয়ে উঠলেন। জানতে পারলেন, ঠাকুরদাসের স্ত্রী—তাঁর বৌমা ভগবতী দেবী একটি পুত্রসন্তান লাভ করেছেন।
তিনি একটা পুঁথি খুলে একটা মন্ত্র বের করলেন। আলতা গুলে সেই মন্ত্র নিয়ে একেবারে আঁতুড় ঘরে উপস্থিত হলেন। মায়ের কোলে সুন্দর ছেলেটি। শিশুটির সর্ব অঙ্গে সুলক্ষণ। তর্কভূষণ তাড়াতাড়ি শিশুটির জিভের তলায় সেই আলতা গোলা দিয়ে একটি মন্ত্র লিখে দিলেন।
পুত্রবধূকে বললেন, বৌমা, ভয় পেয়ো না। একজন মহাপুরুষ তোমার কোলে এসেছেন। ইনি আমাদের বংশের মান বাড়াবেন। কিন্তু ছেলেটি বড় একগুঁয়ে হবে। যা ধরবে, তা সে করবেই। আমি ওর নাম রাখলাম 'ঈশ্বর'।
তোমরা এই নাম কখনো বদলাবে না। এই নামেই ও দেশবিখ্যাত হবে।
ভগবতী দেবী পরম আনন্দে শ্বশুরের পায়ে প্রণাম জানালেন।
তর্কভূষণ আঁতুড় ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ছেলে ঠাকুরদাসের অনুসন্ধান করতে লাগলেন। ছেলে গিয়েছিল হাটে। তিনি মহা উৎসাহে বাড়ী থেকে একটু এগিয়ে গেলেন। দেখলেন, ঠাকুরদাস সওদা করে ফিরে আসছে। তার সারা দেহ থেকে ঘাম ঝরছে।
তর্কভূষণ মহা উৎসাহে ছেলেকে বললেন, ওরে ঠাকুরদাস, আমাদের একটি এঁড়ে বাছুর হয়েছে। শুনে ঠাকুরদাসও খুব খুশি। তাড়াতাড়ি সওদা নামিয়ে রেখে গোয়াল ঘরের দিকে ছুটল। তর্কভূষণ হাসতে হাসতে বললেন, ওরে ওদিকে নয়, আমার সঙ্গে আয়, এঁড়ে বাছুর দেখিয়ে দিচ্ছি। —তিনি ছেলেকে আঁতুড় ঘরে নিয়ে গিয়ে এঁড়ে বাছুর দেখিয়ে দিলেন।
—এঁড়ে বাছুর আমি এমনি বলিনি। এই ছেলে এঁড়ে বাছুরের মতোই একগুঁয়ে হবে। যা ধরবে, তাই করবে। আমি ছেলের নাম রেখেছি ঈশ্বর। এ ছেলে আমাদের বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে।
ঠাকুরদাস নীরবে পিতার পায়ে প্রণাম জানালেন।
ঈশ্বরচন্দ্র ছেলেবেলায় খুব দুরন্ত ছিল। সঙ্গীসাথীদের নিয়ে সারাদিন দুষ্টুমি করে বেড়াতো। কারো বাড়ীর সামনে জঞ্জাল ফেলত, কারো বাগান থেকে ফল পেড়ে নিয়ে আসত, কারো উঠোনের কাঁচা পেয়ারা ছিঁড়ে ছড়িয়ে দিত।
একদিন ঈশ্বর ভারী জব্দ হয়েছিল। মাঠে যবের শীষ বেরিয়েছে। তাই ছিঁড়ে নিয়ে সে মুখে পুরে চিবুতে লাগল। যবের শীষে ছিল মোটা শুঁয়োপোকা। একেবারে গলার ভেতর চলে গেল। ঈশ্বরের দম বন্ধ হয়ে আসে আর কি! ওর ঠাকুমা গলায় আঙুল চালিয়ে দিয়ে তবে সেই শুঁয়ো পোকা বের করে আনেন।
ঈশ্বর কাঁদো-কাঁদো হয়ে বললে, ঠাকুমা, এমন কাজ আর করব না।
বীরসিংহ গ্রামে একটা পুকুর ছিল। তার নাম—শচীবামনা পুকুর। ছেলেবেলায় এই পুকুরকে কেন্দ্র করে ঈশ্বরচন্দ্রের যত দৌরাত্ম্যি চলত।
এই পুকুরের একধারে একটা বিরাট অশ্বত্থ গাছ ছিল। ঈশ্বর তার দস্যি দল নিয়ে এই অশ্বত্থ গাছে উঠে খুব হৈ-চৈ করত। তা ছাড়া শচীবামনা পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সদলবলে সাঁতার কাটত ঈশ্বরচন্দ্র। অশ্বত্থ গাছের নীচে 'মহাপ্রভুর স্থান' ছিল। পুরোহিত ঠাকুর সেখানে ফলমূল নৈবেদ্য সাজিয়ে বসলেই ঈশ্বর কোথা থেকে ছুটে এসে ছোঁ মেরে নৈবেদ্যের বাতাসা আর ফলমূল নিয়ে পালিয়ে যেত।
আবার এই পুকুরের ধারেই একটা বাছাই করা জায়গা ছিল। সেখানে ঈশ্বরচন্দ্র খেলার সাথীদের জুটিয়ে নিয়ে কপাটি খেলত।
বর্তমানে এই পুকুরের পাড়েই ঈশ্বরচন্দ্রের মায়ের নামে 'বীরসিংহ ভগবতী মালটিপারপাস ইন্সটিটিউশন' চলছে। একদিন ঈশ্বরচন্দ্রই তাঁর মায়ের নামে এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীকালে মাতা ভগবতী দেবী ও পত্নী দীনময়ী দেবী এই পুকুরে স্নান করতেন।
ছেলেবেলায় ঈশ্বরচন্দ্র তার সঙ্গীসাথীদের নিয়ে সারাটা গ্রাম তোলপাড় করে রাখত। প্রতিবেশীদের বাড়ীতেও অত্যাচার নেহাৎ কম হত না। এ জন্যে তার মা-বাবাকে অনেক সময় কথা শুনতে হত।
যাই হোক, এভাবে কেবল দুরন্তপনা করে সময় নষ্ট করলে ত চলবে না। ঠাকুরদাস ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, ছেলের হাতে-খড়ি দিতে হবে।
বীরসিংহ গ্রামের পাঠশালার পণ্ডিতের নাম কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। ঈশ্বরের পাঁচ বছর পাঁচ মাস পাঁচ দিন কেটে গেল। ঠাকুরদাস তাঁকে সঙ্গে নিয়ে কালীকান্তের পাঠশালায় ভর্তি করে দিলেন।
বিকেলে কালীকান্ত পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্রকে কোলে করে ঠাকুরদাসের কাছে এসে উপস্থিত হলেন। বললেন, অবাক কাণ্ড ঠাকুরদাস! আজই ঈশ্বরের সব অক্ষর পরিচয় হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, শ্রীমান একদিনেই অক্ষরগুলো লিখতে শিখে গেছে।
ঠাকুরদাস অবাক হয়ে বললেন, বল কি খুড়ো, এও কি কখনো সম্ভব?
কালীকান্ত পণ্ডিত মিটিমিটি হাসছেন। উত্তর দিলেন, বেশ ত, তোমার যদি বিশ্বাস না হয়, তবে ঈশ্বরকে পরীক্ষা করে দেখ।
ঠাকুরদাস সব রকমে ছেলেকে পরীক্ষা করে দেখলেন। উল্টো পাল্টা করে প্রশ্ন করলেন,শ্লেটে লিখতে বললেন। ঈশ্বর গড়গড় করে সব বলে আর লিখে বাবাকে অবাক করে দিলে।
এই রকম আরো একটি ঘটনা ঘটেছিল কয়েক বছর পর। তখন ঈশ্বরচন্দ্রের বয়েস আট বছর। গ্রামের পাঠশালার পড়া শেষ করে ঈশ্বর বাবার সঙ্গে চলেছে কলকাতায় পড়তে।
পথে মাইল স্টোন দেখে ঈশ্বর বাবাকে জিজ্ঞেস করল, বাবা, পথের ধারে বাটনা-বাটা শিল পোঁতা রয়েছে কেন?
ঠাকুরদাস উত্তর দিলেন, ওটা বাটনা-বাটা শিল নয়। ওটার নাম হচ্ছে 'মাইল স্টোন'। কলকাতা থেকে জায়গাটা কত মাইল দূর সেই অঙ্কটা এক মাইল পর পর ওই পাথরে লেখা আছে। এই রকম মাইল স্টোন তুমি পথে আরো দেখতে পাবে।
হাঁটা পথে কলকাতায় চলেছে ঈশ্বরচন্দ্র। বাবার সঙ্গে পথ চলতে চলতে মাইল স্টোন দেখে বালক ঈশ্বরচন্দ্র ইংরেজী এক-দুই-তিন সংখ্যাগুলি অতি সহজেই শিখে নিল। ঠাকুরদাস নানা ভাবে ছেলেকে পরীক্ষা করে দেখলেন। ঈশ্বর নির্ভুলভাবে ইংরেজী সংখ্যাগুলি আয়ত্ত করে ফেলেছে।
এমনি অদ্ভুত ছিল ঈশ্বরচন্দ্রের মেধা।
গ্রামের পাঠশালায় পড়বার সময়ও ঈশ্বর পাঁচ-ছয় বছরের পড়া তিন বছরে শেষ করে ফেলেছিল। কালীকান্ত পণ্ডিত বলতেন, এতদিন ধরে পাঠশালা চালাচ্ছি, এত ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়েছি, কিন্তু এমন মেধা কারো দেখি নি।

...বাবা, পথের ধারে বাটনা-বাটা শিল পোঁতা রয়েছে কেন?
ঈশ্বরের ঠাকুর্দার কথা অক্ষরে-অক্ষরে ফলেছিল। ঠিক এঁড়ে গরুর মতোই ছিল ঈশ্বরচন্দ্রের গোঁ। একবার যা ধরত, কিছুতেই তার নড়চড় হবার যো নেই। যদি বলত, আজ নাইব না, তা হলে কিছুতেই তাকে স্নান করানো যেত না।
সেই জন্যে ঠাকুরদাস কাজ হাঁসিল করবার জন্যে উল্টো করে কথা কইতেন। হয়ত ঈশ্বরের সেদিন স্নান করা দরকার, ঠাকুরদাস কিন্তু বলতেন, বাবা ঈশ্বর, আজ আর স্নান করে দরকার নেই!
সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বর মাথা নেড়ে প্রতিবাদ করে বলে উঠত, না-না, আজ আমি স্নান করবই।
এই কৌশলে বাবার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হত।
ঠাকুরদাস তাঁর বাবার কথা মনে রেখেছিলেন। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেছিলেন, এই ছেলে একদিন বড় হবে, লেখাপড়া শিখবে, দশজনের একজন হবে, আর তাদের দু:খ-কষ্ট দূর করবে।
দারিদ্র্যের জন্যে ঠাকুরদাস নিজে বেশী লেখাপড়া শিখতে পারেন নি। অল্প বয়েসেই পড়াশোনা ছেড়ে তাঁকে কলকাতায় গিয়ে সামান্য মাইনের চাকরী নিতে হয়েছিল। নিজের জীবনে যেটা সম্ভবপর হয় নি, তিনি মনে-মনে সঙ্কল্প করেছিলেন, —ছেলেকে দিয়ে সেই অপূর্ণ সাধ পূর্ণ করবেন।
ছেলেকে নিয়ে যখন তিনি কলকাতায় গিয়ে উপস্থিত হলেন, তখন তিনি মাত্র দশ টাকা বেতন পেতেন। কিন্তু মনে তাঁর অদম্য উৎসাহ। ছেলেকে মানুষ করে তুলতে হবে।
ঠাকুরদাস বড়বাজারে জগদ্দুর্লভ সিংহের কাজকর্ম দেখাশোনা করতেন। আর তাঁর বাড়িতেই থাকতেন। ছেলেকে নিয়েও তিনি সেখানে উঠলেন।
সকাল বেলায় ঠাকুরদাস কতকগুলি ইংরেজী বিল যোগ দিচ্ছিলেন। একে 'ঠিক' দেয়া বলে। বালক ঈশ্বর খানিকক্ষণ বাবার কাজ দেখে বলল, বাবা, আমিও ওই রকম ঠিক দিতে পারি।
বালকের কথা শুনে জগদ্দুর্লভ ভারী অবাক হলেন। তিনি জানতেন, ঈশ্বর এখনো ইংরেজী শেখেনি। ঠাকুরদাস জগদ্দুর্লভ বাবুকে ঈশ্বরের মাইল স্টোনে ইংরেজী সংখ্যা শেখার কথা বললেন, তখন জগদ্দুর্লভ সিংহ কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে বালক ঈশ্বরকে কয়েকটি বিল যোগ দিতে দিলেন।
আশ্চর্য ব্যাপার!
বালক ঈশ্বরচন্দ্রের ঠিকে কোনো ভুল নেই!
অনেকে বলেছিলেন, ঈশ্বরচন্দ্রকে ইংরেজী স্কুলে ভর্তি করতে। কিন্তু পিতা ঠাকুরদাসের মনের বাসনা ছেলে পণ্ডিত হোক। তাঁদের পণ্ডিতের বংশ। তাঁর বাবার দেশ-জোড়া নাম। ছেলে পণ্ডিত হবে, আরো বহু ছেলেকে বিদ্যা দান করবে, —এই ঠাকুরদাসের একান্ত ইচ্ছে।
তিনি শেষ পর্যন্ত ছেলেকে সংস্কৃত কলেজেই ভর্তি করে দিলেন। কেন না, মনে মনে ঠাকুরদাসের বাসনা ছিল, ছেলে দেশের বাড়ীতে টোল খুলবে। কত ছেলে এসে সেখানে বিদ্যালাভ করে যাবে।
ঈশ্বর একবার যা পড়ে, তা কখনো ভোলে না। সংস্কৃত কলেজের শিক্ষকগণ তার অসাধারণ বুদ্ধি আর মেধা দেখে চমৎকৃত হলেন। অল্প কয়েক দিনের ভেতরই ঈশ্বরচন্দ্র সকলের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠল।
ঈশ্বরকে প্রত্যহ বড়বাজার থেকে সংস্কৃত কলেজে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতে হয়। প্রায় চার মাইল পথ। শুধু তাই নয়, বালককে এক হাতে সব কাজ করতে হত। ঠাকুরদাস শুধু বাজারটা করে দিতেন। ঈশ্বরকে উনুন ধরানো, বাটনা বাটা, কুটনো কোটা, বাপকে খাওয়ানো, নিজের খাওয়া শেষ করে বাসন পর্যন্ত মাজতে হত। রান্না উনুনে চাপিয়ে তারই ফাঁকে ফাঁকে নিজের পড়া তৈরি করতে হত। তবু এই অল্প পড়াতেই ক্লাশে প্রথম। দু:খ-কষ্টের ভেতর দিয়ে ছেলে স্বাবলম্বী হোক,—ঠাকুরদাস তাই চেয়েছিলেন। নিজেও খুব ছেলেবেলা থেকে কষ্ট করে বড় হয়েছিলেন। সোনা আগুনে পুড়ে খাঁটি হোক—এই ছিল তাঁর আন্তরিক বাসনা। তাই তিনি ছেলের কষ্ট দেখেও দেখতেন না। ওদিক থেকে মুখ একেবারে ফিরিয়ে রাখতেন।
দিনের বেলাটা যে করে হোক চলে যেত। কিন্তু রাত্তিরে ওই দুধের বালক আর পেরে উঠত না। অনেক সময় রান্না চাপিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। তরকারী পুড়ে একেবারে অঙ্গার হয়ে যেত!
ঠাকুরদাস ফিরে এসে ছেলেকে খুব প্রহার দিতেন। ঈশ্বর অনেক সময় ঘুমের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্যে আপন টিকিতে দড়ি বেঁধে ঘরের কড়িবরগার সঙ্গে সেই দড়ি শক্ত করে এঁটে রাখত। রান্না চাপিয়ে দিয়ে পড়তে বসত। যেই ঢুল আসত অমনি দড়িতে টিকির টান পড়ত,—আর ঘুম যেত ভেঙে। এই ভাবে এক সঙ্গে তাকে তিন ভাবে যুদ্ধ করতে হত। উনুনে রান্না করত, তারই ফাঁকে ফাঁকে পড়াশোনা চালাত, আর ঘুম পেলে টিকির টানে ঘুম ভাঙত।
তবু দারুণ পরিশ্রমে অনেক সন্ধ্যায় ঈশ্বর ঘুমিয়ে পড়ত। ঠাকুরদাস বাসায় ফিরে এসেই ছেলেকে ধরে খুব প্রহার করতেন।
ঈশ্বরের কান্নার শব্দ শুনে ওপর থেকে নীচে নেমে আসতেন জগদ্দুর্লভবাবুর বিধবা বোন রাইমণি। এই রাইমণির স্নেহচ্ছায়ায় বালক ঈশ্বরচন্দ্র অনেকটা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেত।
রাইমণি ঈশ্বরচন্দ্রের ওপর পীড়ন সহ্য করতে পারতেন না। তাই ঠাকুরদাসকে খুব তিরস্কার করতেন। বলতেন, কাকাবাবু, আপনি যদি ছেলেটাকে যখন তখন এমন করে মারেন, তবে আপনাকে এ বাসা থেকে উঠে যেতে হবে। চোখের সামনে আমরা ব্রহ্মহত্যা দেখতে পারব না।
রাইমণির মুখকে ঠাকুরদাস খুব ভয় পেতেন। তাই চুপ করে যেতেন। রাইমণি বালক ঈশ্বরকে ছেলের মতো ভালোবাসতেন। অনেক সময় ডেকে নিয়ে এটুক ওটুক খেতে দিতেন। ছেলেটা যখন সব কাজ নিয়ে হিমসিম খেত, তিনি এগিয়ে এসে ঈশ্বরের রান্না ঘরের কাছে তরকারী কুটে দিতেন, বাটনা বেটে দিতেন, উনুন ধরিয়ে দিতেন। ঈশ্বরও এই রাইমণিকে নিজের মায়ের মতো শ্রদ্ধা করত।
ঈশ্বরচন্দ্রের রান্নাঘরের দেয়ালে শত শত আরশুলা সব সময় ভীড় জমিয়ে থাকত। একদিন রান্না করতে গিয়ে ডালের ভেতর পড়ে গেল আরশুলা। খাওয়ার সময় সেটা ধরা পড়ল —ঈশ্বরের পাতে। পাছে পাতের কাছে ফেললে বাবার খাওয়া নষ্ট হয়, ঈশ্বরচন্দ্র তাই ওটা চিবিয়েই খেয়ে ফেলল, কাউকে জানতে দিল না!
ঈশ্বরকে আর একটা বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে হত। তাদের রান্নাঘরের পাশেই ছিল নর্দমা। তাতে রাশি রাশি সাদা ক্রিমির দল কিলবিল করে বেড়াত। ঈশ্বরচন্দ্র যখন খেতে বসত, সেই ক্রিমির দল হেঁটে হেঁটে একেবারে পাতের কাছে এসে হাজির হত। ঈশ্বরচন্দ্র আগে থাকতেই সাবধান হত। হাতের কাছে রাখত এক ঘটি জল। সেই জল ঢেলে দিত ক্রিমি বাহিনীর ওপর। সঙ্গে সঙ্গে ওরা আবার গিয়ে নর্দমায় পড়ত।
সংস্কৃত কলেজে ঈশ্বরচন্দ্রের পড়াশোনা দ্রুতবেগে এগিয়ে চলল। প্রত্যেক শিক্ষকই তার গুণের পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ।
ছেলেরা কিন্তু ঈশ্বরকে নিয়ে ভারী মজা করত। একে ওর মাথাটা একটু বড়, তাতে বাবার বিরাট ছাতাটা মাথায় দিয়ে ঈশ্বর যখন সংস্কৃত কলেজে রওনা হত, তখন তাকে আদৌ দেখা যেত না। মনে হত, একটা ছাতা রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে। সেইজন্যে পড়ুয়ারা ওর নাম দিয়েছিল 'যশুরে কৈ'! কেউ কেউ আবার রসিকতা করে ডাকত 'কশুরে যৈ'!
সংস্কৃত কলেজে যা পড়ত, ঈশ্বরচন্দ্রকে প্রতিদিন এসে বাবাকে সব শোনাতে হত। একটু ভুল হলে বকুনি আর প্রহার পর্যন্ত সহ্য করতে হত! এ ব্যাপারে ঠাকুরদাস একেবারে নির্মম ছিলেন। ছেলে মানুষ করার ব্যাপারে তিনি 'চাণক্যশ্লোক' (দশবর্ষানি তাড়য়েৎ) মেনে চলতেন।
একবার একটা মজার ব্যাপার হয়েছিল। ছেলেবেলায় ঈশ্বরচন্দ্র একটু তোতলা ছিল। তাই সব বিষয়ে প্রথম হয়েও এক সায়েবের কাছে মৌখিক পরীক্ষায় প্রথম হতে পারল না। অথচ ঈশ্বর বেশ ভালো রকম জানে, তার উত্তর নির্ভুল হয়েছে। ফলে তার খুব রাগ হয়ে গেল। তখন সে এঁড়ে বাছুরের গোঁ ধরল,—কিছুতেই আর সংস্কৃত কলেজে পড়বে না।
অবশেষে তার বাবা অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ছেলেকে শান্ত করলেন।
আবার ঈশ্বরের পড়াশোনা সংস্কৃত কলেজেই চলতে থাকল। পরের বছর ঈশ্বর সব বিষয়েই প্রথম স্থান অধিকার করল।
ধীরে ধীরে ঈশ্বরচন্দ্র সাহিত্যের পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হল। পণ্ডিত বলে চার দিকে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। এই সময় তার বয়েস মাত্র চৌদ্দ বছর। ঠাকুরদাস মহা আনন্দ করে ছেলের বিয়ে দিলেন। পুত্রবধূ আট বছরের সুন্দরী মেয়ে দীনময়ী—ক্ষীরপাই নিবাসী শত্রুঘ্ন ভট্টাচার্যের মেয়ে। সে সময় অল্প বয়সে ছেলেমেয়েদের বিয়ে হত।
সুলক্ষণা বউ পেয়ে মা-বাবার আর আনন্দের সীমা থাকল না।
ঠাকুরদাস সংসারের জন্যে খুব পরিশ্রম করে চলেছেন। সংসারের আয় বাড়াতে হবে। রান্নাবান্না কিন্তু আগের মতো ঈশ্বরই করে। আর একটি ভাই দীনবন্ধু এসেছে কলকাতায়। সুতরাং ঈশ্বরেরও কাজ বেড়েছে। পড়াশোনাও চলছে।
এই মেজোভাই দীনবন্ধুকে নিয়ে একদিন একটা মজার ব্যাপার হয়েছিল। সেদিন ঈশ্বরচন্দ্র ভাইকে সন্ধ্যে বেলা বাজার করতে পাঠিয়ে নিজে রান্নাঘরের কাজে লেগে গেল।
কিন্তু রাত এগারোটা বেজে যায়, দীনবন্ধু আর বাসায় ফেরে না! তখন ঈশ্বর ভাইয়ের চিন্তায় কেবলি ঘর-বার করতে লাগল। শেষে আর থাকতে না পেরে ভাইয়ের জন্য ডাক ছেড়ে কান্না শুরু করে দিলে।
আশে-পাশের লোকদের উপদেশে ঈশ্বর প্রথমে বড় বাজারে কাশীনাথবাবুর বাজারে ভাইয়ের খোঁজ করল। কিন্তু সেখানে দীনবন্ধু নেই!
তারপর ঈশ্বর জোড়াসাঁকোর নতুন বাজারে ঢুকে খুঁজতে খুঁজতে দেখে, দীনবন্ধু বাজারের এক কোণে দেয়াল ঠেস দিয়ে দিব্যি ঘুমুচ্ছে। তখন ওর ঘুম ভাঙিয়ে অতি যত্নে তাকে সে বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে এল। ঈশ্বরের মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল।
এরপর থেকে ঈশ্বর ভাইকে কোনো কাজ করতে দিত না। ওর মনটা একেবারে স্নেহ-মমতায় ভরা ছিল।
পাছে ভাইয়ের কোনো কষ্ট হয়, কিম্বা ভাই পথে গিয়ে বিপদে পড়ে, তাই নিজের কাঁধেই সব দায়িত্ব নিয়ে নিল ঈশ্বর।
রান্না করা আর সাংসারিক সব কাজ ঈশ্বর আগের মতোই চালাতে লাগলো।
তাকে দেখে আদৌ মনে হত না যে, ঈশ্বর সংস্কৃত কলেজের সব বিষয়ে একজন সেরা ছাত্র।
সংস্কৃত কলেজের সব পড়াশোনা যখন শেষ হল, ঈশ্বরচন্দ্র তখন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে প্রধান পণ্ডিতের পদ লাভ করেন। বেতন ঠিক হল মাসিক পঞ্চাশ টাকা।
তিনি যখন চাকরিতে ঢুকলেন, সেই সময় তাঁর প্রথম কর্তব্য হল, তাঁর বাবার সমস্ত খাটুনি বন্ধ করে দিয়ে দেশের বাড়ীতে পাঠিয়ে দেওয়া। ঠাকুরদাস প্রথমে যেতে রাজি হন নি। কিন্তু সেই এঁড়ে বাছুরের গোঁ! ঈশ্বরচন্দ্র বললেন, আপনি সারা জীবন আমাদের জন্য পরিশ্রম করেছেন, এইবার দেশে গিয়ে বিশ্রাম করুন। আমি মাস-মাস আপনার নামে টাকা পাঠিয়ে দেব।
ঠাকুরদাস বাড়ীতে বসে ঘরের কাজ দেখতেন, ক্ষেতখামার পরিদর্শন করতেন আর প্রতিবেশীদের সকল কাজে সাহায্য করতেন।
এইবার বিদ্যাসাগরের মা ভগবতী দেবীর কথা বলি :
মা ভগবতী ছিলেন পাকা গৃহিণী। তিনি গৃহধর্ম আর গৃহকর্ম ছাড়াও সব সময় প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনের সেবা-শুশ্রূষা করবার জন্যে উন্মুখ হয়ে থাকতেন। বিদ্যাসাগরও মায়ের নানাবিধ দানের জন্য আলাদা অর্থ পাঠিয়ে দিতেন। এমন মা না হলে এমন দয়ার সাগর ছেলে হয় কখনো!
ঈশ্বরচন্দ্রের মা-বাবা দুজনেই খুব দয়ালু ছিলেন। পরের দু:খ তাঁরা দেখতে পারতেন না। গাঁয়ের গরীব সংসারে তাঁদের অনেক গোপন দান ছিল।
যে সায়েবের নামে হ্যারিসন রোড, সেই হ্যারিসন সায়েব একবার মেদিনীপুর গিয়েছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর খুব ভাব ছিল। ঈশ্বরচন্দ্রের মা ভগবতী দেবী তাঁকে বাড়িতে নেমন্তন্ন করে নিজে কাছে বসে থেকে আপন ছেলের মতো সব দেশী রান্না খাইয়েছিলেন। সায়েব ত দেশী খানা খেয়ে খুব খুশি।
হ্যারিসন সায়েব খুব ভালো বাংলা জানতেন। তিনি ভগবতী দেবীকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা মা, আপনার ত' অনেক টাকা আছে?
এই কথা শুনে ভগবতী দেবী মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, আমার চার ঘড়া ধন আছে। একে একে তিনি ঈশ্বর, দীনবন্ধু, শম্ভু এবং শেষে সায়েবকে দেখিয়ে বললেন, এই আমার চার ঘড়া ধন।
উত্তর শুনে সায়েব বললেন, এমন মা না হলে এমন ছেলে হয়?
বিদ্যাসাগরের মা ভগবতী দেবী, একটি ভারী মজার কথা বলতেন। তিনি বলতেন বাঁশ, খড়, দড়ি, মাটি দিয়ে যে ঠাকুর আমি নিজের হাতে গড়লাম, তাকে পূজো করলে আমার কি ধর্ম হবে? তার চাইতে আমার ছেলেরাই আমার জ্যান্ত ঠাকুর। পুত্র-গর্বে মা খুব গর্বিতা ছিলেন।
ভগবতী দেবী পরের জন্যে দিনরাত পরিশ্রম করতেন। তাতে তাঁর ক্লান্তি ছিল না। দুপুর বেলা স্নানের পরেও তিনি অনেক সময় অভুক্ত থাকতেন। কি জানি, যদি কোনো অতিথি বাড়ীতে এসে পড়ে। কোনো ছেলে মুখ শুকনো করে যদি বাড়ীর সামনে দিয়ে যেত, তবে তিনি তাকে ডেকে যত্ন করে খাওয়াতেন।
ঈশ্বরচন্দ্র একবার লিখেছিলেন, ''আমি যদি আমার মায়ের গুণের একশ' ভাগের এক ভাগও পেতাম তা হলে আমি ধন্য হয়ে যেতাম।''
ছোট ভাই শম্ভুর যখন বিয়ে ঠিক হয়, মা ভগবতী ঈশ্বরকে লিখলেন বাড়ী চলে আসতে। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্র ছুটি পেলেন না। তখন তিনি মায়ের আদেশ পালন করবার জন্যে চাকরি ছেড়ে দিতে প্রস্তুত হলেন। ঈশ্বরের মাতৃভক্তি দেখে কর্তৃপক্ষ শেষ মুহূর্তে ছুটি মঞ্জুর করলেন। ঈশ্বর গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। পথে দারুণ দুর্যোগ। দামোদর নদের জল উথাল পাথাল। খেয়াঘাটে খেয়া নেই। কিন্তু ঈশ্বর মায়ের আদেশ পালন করবেনই। তিনি সকলের নিষেধ অমান্য করে 'মা-মা' বলে দামোদরের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন! তারপর সাঁতরে নদী পার হয়ে গভীর রাত্রে মায়ের চরণে উপনীত হলেন। এমনি ছিল তাঁর মাতৃভক্তি।
একবার দেশে গিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র দেখলেন, মা শীতে কষ্ট পাচ্ছেন। উনুনের ধারে বসে কাঁপছেন। ঈশ্বর জিজ্ঞেস করলেন, মা, তোমার জন্যে যে লেপ পাঠিয়ে ছিলাম, সেটা কোথায় গেল? মা ছেলের কথায় লজ্জিত হলেন। বললেন, দেশের লোকের বড় কষ্ট রে!
ঈশ্বরচন্দ্র হেসে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা মা, কখানা লেপ পাঠালে তোমার গায়ে একখানা লেপ উঠবে?
ভগবতী দেবী হিসেব করে যে কখানা লেপের কথা বললেন, তার চাইতেও একখানা বেশী লেপ ঈশ্বরচন্দ্র কলকাতা থেকে পাঠিয়ে দিলেন।
একদিন বিদ্যাসাগর মাকে বললেন, আচ্ছা মা, তোমার ত কোনো গয়না নেই। তোমার কি কি গয়না দরকার আমায় বলো। মা হেসে উত্তর করলেন, আমার আবার গয়নার কি দরকার? কিন্তু ছেলে কিছুতেই ছাড়বে না।
তখন ভগবতী দেবী বললেন, আমার তিনটি গয়না চাই। প্রথম গয়না—আমাদের গাঁয়ে একটি ইস্কুল করে দিবি, যেখানে গরীব ছেলেরা পড়তে পারবে। আমার দ্বিতীয় গয়না হবে—ওই বিদ্যালয়ে যে সব ছেলে থাকবে, তাদের খাওয়া-পরা-থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। আমার শেষ গয়না হবে—গরীবদের জন্যে একটি হাসপাতাল তৈরি করে দিতে হবে। সেখানে তাদের চিকিৎসা আর ওষুধের ব্যবস্থা থাকবে।
ভগবতী মা ছেলের কাছ থেকে পরে এই তিনটি গয়নাই পেয়েছিলেন।
বিদ্যাসাগর মশায়ের একবার খুব ইচ্ছে হল, তাঁর মা-বাবার সুন্দর ফোটো তুলে নিজের কাছে রাখবেন। পাইকপাড়া রাজবাটিতে এক সায়েব ফোটোগ্রাফার এসেছিল। বিদ্যাসাগর তাঁর সঙ্গে সব কথা ঠিক করলেন। তারপর দেশের বাড়িতে চলে গেলেন—মা বাবাকে নিয়ে আসবার জন্যে। কিন্তু বিপদ হল, তাঁরা কিছুতেই ফটো তুলতে চান না।
কিন্তু সেই এঁড়ে বাছুরের গোঁ!
মা-বাবাকে শেষ পর্যন্ত সম্মতি দিতেই হল। ঈশ্বরচন্দ্র মা-বাবাকে নিয়ে কলকাতায় চলে এলেন। তারপর তোলা হল সেই আকাঙ্খিত ফোটো।
অনেকে বলেন, ঈশ্বরচন্দ্র ভগবানে বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু তিনি তাঁর মা-বাবাকে সাক্ষাৎ ভগবান জ্ঞানে শ্রদ্ধা জানাতেন।
মা-বাবার ফোটো দুটো সব সময় তাঁর কলকাতার বাসায় টেবিলের ওপর শোভা পেত।
—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন