মেঘ ও বৃষ্টি

দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

রঞ্জিত বন্দ্যোপাধ্যায়

শুধু শুধু কেউ কাঁদে না। তোমরাও না। অবশ্য একেবারে ছোটবেলায় যখন তোমরা বায়না করে মিছিমিছি কাঁদতে, সে কথা আলাদা। কিন্তু এখন তোমরা বড় হয়েছ। এখন আর অকারণে তোমাদের চোখে জল আসে না। মনের মধ্যে দু:খ এবং অভিমান জমা হতে হতে সহ্যের সীমা যখন ছাড়িয়ে যায়, তখনই তার কিছুটা অংশ গলে গিয়ে চোখের জল হয়ে বেরিয়ে আসে।

বৃষ্টির জলও অনেকটা এইভাবেই নেমে আসে আকাশ থেকে। মেঘ জমা হতে থাকে একটু একটু করে। তারপর একসময় যখন ধরে রাখার ক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়, তখন বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়তে শুরু করে টপাটপ। তবে চোখের জলের মতো বৃষ্টির জল মনটাকে হাল্কা করে না। উল্টে, মেজাজ খারাপ করে দেয়, কারণ পথ ঘাট মাঠ ময়দান সব জল কাদায় ভর্তি হয়ে যায়। খেলাধূলা বন্ধ, এবং বাড়ীতে বন্দী তোমরা।

কিন্তু বন্দীজীবন কার আর ভাল লাগে বল। বিশেষ করে তোমাদের মতো ছেলেমেয়েদের তো এ-জিনিসটা একেবারেই অসহ্য। তাই গুরুজনেরা একটু চোখের আড়াল হলেই তোমরা বেরিয়ে পড় বাইরে। বৃষ্টিতে ভিজে জল ছিটিয়ে ছিটিয়ে খেলা কর মনের আনন্দে। তোমাদের মধ্যে যারা আরো ছোট, তারা কেউ কেউ কাগজের নৌকো ভাসিয়ে কল্পনা কর, যেন জাহাজে করে বিদেশ যাচ্ছ। আবার, বিকেলে ফুটবল খেলাটা সম্ভব হবে কি না সেটা জানার জন্যে অনেকে চোখ তুলে আকাশে তাকিয়ে দেখ, বৃষ্টিটা আর কতক্ষণ চলবে। তাদের চোখে পড়বে, আকাশটা ঘন কালো মেঘে ভরে গেছে এবং সেখান থেকেই নেমে আসছে বৃষ্টির ধারা।

সুতরাং আকাশে মেঘ থাকলে বৃষ্টি হয়।

এদিকে গুরুজনেরা সেদিন হয়তো বাড়ীর ভেতরে দরকারি কাজে খুব ব্যস্ত আছেন। সেই সুযোগে তোমরা মনের সুখে অনেকক্ষণ ধরে বৃষ্টিতে ভিজছ, জল ছিটিয়ে খেলা করছ এবং কাগজের নৌকা ভাসিয়ে বিলেতে পাড়ি দিচ্ছে। ঘণ্টাখানেক পরে দুর্ভাগ্যবশত বৃষ্টিটা থেমে গেল। তোমরা হয়তো আশ্চর্য হয়ে ভাবছ, এমন সুন্দর বৃষ্টিটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল কেন! ব্যাপারটা কি জানবার জন্যে সবাই তখন আকাশে চোখ তুলে চাইলে। দেখলে যে, আকাশে তখনো অনেক মেঘ রয়েছে, অথচ বৃষ্টি হচ্ছে না।

সুতরাং এটাও বোঝা গেল যে, আকাশে মেঘ থাকলেও বৃষ্টি না হতে পারে।

তবে এটা ঠিক যে, বৃষ্টি যখন হবে, তখন অন্তত: কিছুটা মেঘ আকাশে থাকতেই হবে। 'বিনা মেঘে বজ্রপাতের' মতো বিনা মেঘে বৃষ্টিপাতও একটা অসম্ভব ঘটনা। অবশ্য, মেঘ থাকলেই বৃষ্টি হতে হবে, এটাও আবার ঠিক নয়—যেটা তোমরা একটু আগেই দেখলে। অর্থাৎ, সোজা কথায়—সব মেঘ থেকে বৃষ্টি হয় না।

আমাদের তাহলে এবার দেখতে হবে কোন মেঘ বৃষ্টি দেয় এবং কোন মেঘ স্রেফ গায়ে ফুঁ দিয়ে আকাশে উড়ে বেড়ায় শুধু। এটা বার করতে হলে প্রথমে জানা দরকার—কত রকমের মেঘ আছে।

উচ্চতার দিক থেকে দেখতে গেলে মেঘকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায় : উঁচু মেঘ, নীচু মেঘ, এবং এই দুই-এর মাঝামাঝি যারা থাকে।

সাধারণত মাটি থেকে প্রায় দু হাজার ফুট ওপরে নীচু মেঘ বসবাস করে। কিন্তু এখানে প্রথমেই তোমাদের মনে একটা প্রশ্ন অথবা আপত্তি মাথা তুলে দাঁড়াবে, এবং সেটা হচ্ছে এই যে—মেঘগুলো অতখানি উঁচুতেই বা থাকে কেন? দশ বারো ফুটের মধ্যে থাকলেই তো বেশ হত।

তাহলে দোতলা কিংবা তেতলায় উঠে তোমরা বেশ মজা করে মেঘের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে পারতে, এখন যেমন এরোপ্লেনগুলিকে মাঝে মাঝে দেখতে পাও আকাশে অনেক উঁচুতে মেঘের মধ্যে দিয়ে চলাফেরা করতে। অবশ্য তোমাদের মধ্যে যারা দার্জিলিং-এ গেছ, তারা ঘরে বসেই মেঘের সাক্ষাৎ পেয়েছ, কারণ সেখানে নাকি জানালা দিয়ে মেঘ ঘরে ঢোকে।

কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, দার্জিলিং পাহাড়ী জায়গা। আমাদের কলকাতা থেকে প্রায় সাত হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত। সুতরাং মেঘ সেখানে ঘরের মধ্যে ঘোরাফেরা করলেও, কলকাতায় চিরদিনই তোমাদের নাগালের বাইরে থেকে যাবে।

মেঘের এই উঁচুতে বসবাস করার কারণটা নির্ণয় করতে হলে তোমাদের প্রথমে জানতে হবে—মেঘ জিনিসটা কি এবং কি করেই বা সেটা তৈরী হচ্ছে।

ইস্কুলে বিজ্ঞানের ক্লাশে 'জলীয় বাষ্প' কথাটা নিশ্চয় তোমরা শুনেছ। খুব ছোট ছোট যে সব জলকণা বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তাদেরই বলা হয় জলীয় বাষ্প। অবশ্য বাতাস বা জলীয় বাষ্প, কোনটাকেই চোখে দেখা যায় না। দুজনেই অদৃশ্য। বাতাসের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়, যখন বসন্তকালে সুন্দর ফুরফুরে হাওয়া দক্ষিণের জানলা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে, অথবা বোশেখ-জ্যষ্ঠি মাসে কালবৈশাখীর ঝড় যখন সমস্ত কিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যায় মুহূর্তে।

জলীয় বাষ্পের অস্তিত্ব তোমরা ইস্কুলে প্রমাণ করেছ কাঁচের গেলাসের মধ্যে বরফ পুরে। গেলাসের বাইরেটা আগেভাগে ভাল করে মুছে শুকনো করে নেয়া সত্বেও কিছুক্ষণ পরেই দেখা যায় যে, সেখানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণা জমে গিয়েছে। বাতাসের মধ্যে যে জলীয় বাষ্প ছিল সেইটেই কাঁচের গেলাসের ঠাণ্ডা দেয়ালের সংস্পর্শে এসে ঘন হয়ে দৃশ্যমান জলকণায় পরিণত হয়েছে। আকাশের মেঘগুলিও এইরকম জলীয় বাষ্পের সমষ্টি, যেগুলিকে ঠাণ্ডা হওয়ার দরুন আমরা চোখে দেখতে পাই।

তাহলে এটা বোঝা গেল যে, তোমাদের হাতের কাছে যে অদৃশ্য জলীয় বাষ্প থাকে, তার সঙ্গে আকাশের মেঘের তেমন একটা কোনও তফাৎ নেই—শুধু মেঘগুলি অনেক বেশি ঠাণ্ডা, এই যা।

কিন্তু জলীয় বাষ্প ঠাণ্ডা হয় কি করে? গেলাসের মধ্যে বরফ পুরে আমরা তো কিছুটা জলীয় বাষ্প ঠাণ্ডা করলাম। কিন্তু এই উপায়ে যদি মেঘের মতো প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বস্তু সৃষ্টি করতে হয়, তাহলে যে পরিমাণ বরফের প্রয়োজন হবে, তাতে কলকাতার সব শরবতের দোকান বন্ধ করে দিলেও সুরাহা হবে না। তাহলে উপায়?

উপায় প্রকৃতিদেবী নিজেই করে নিয়েছেন এবং সেটা হচ্ছে এই যে, পৃথিবীর মাটি ছেড়ে যতই ওপরে ওঠা যায়, ঠাণ্ডা ততই বাড়তে থাকে।

এবার তাহলে বোঝা গেল যে, তোমাদের নাগালের বাইরে গিয়ে মেঘগুলিকে অতখানি উঁচুতে উঠে আকাশে ভেসে বেড়াতে হয় কেন।

উচ্চতা হিসেবে মেঘকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে, যেটা তোমাদের আগেই বলেছি। এদের মধ্যে নীচু মেঘ মাটি থেকে দুই থেকে চার হাজার ফুটের মধ্যে অবস্থান করে। অবশ্য, এটা হচ্ছে মেঘের তলদেশের খবর। মেঘের মাথাটা ছ হাজার আট হাজার অথবা দশ হাজার ফুট পর্যন্ত উঠে যেতে পারে। আবার, একরকম নীচু মেঘ আছে, ইংরেজিতে যার নাম দেওয়া হয়েছে কিউমিউলোনিমবাস মেঘ, অথবা সংক্ষেপে সি-বি। এই সি-বি মেঘ দু হাজার ফুট থেকে শুরু হয় ঠিকই, কিন্তু তারপর খাড়া হয়ে সোজা ওপরে উঠতে থাকে এবং আকাশ ফুঁড়ে তিরিশ, চল্লিশ, এমন কি কোনও কোনও সময়ে ষাট হাজার ফুট পর্যন্ত পৌঁছে যায়; অর্থাৎ, পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত হিমালয়ের মাথার ওপরে আর একটা হিমালয় বসিয়ে দিলে যতখানি উঁচু হয়, তাই!

মাঝে মাঝে আকাশের বুক চিরে বিদ্যুতের লকলকে শিখা তোমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। তারপরই প্রচণ্ড কড়-কড়-কড়-কড়-কড়াৎ শব্দ। তোমরা ভয়ে আঁতকে ওঠ। এ সমস্ত কিন্তু ওই সি-বি মেঘেরই কীর্তি। তারপর, মুষলধারে যে পশলা বৃষ্টি হয়, সে-ও এই সি বি মেঘের পেট চিরেই পৃথিবীতে নেমে আসে। ধীরে ধীরে বড় হয়ে হিমালয়ের দ্বিগুণ দীর্ঘ হওয়ার দরুন ওর পেটের মধ্যে এতখানি প্রচণ্ড শক্তি লুকিয়ে থাকে, যেটা বজ্র বিদ্যুৎ ঝড় এবং বৃষ্টির আকারে বেরিয়ে আসে মাঝে মাঝে।

সি বি ছাড়াও আরও অনেক রকম নীচু মেঘ আকাশে দেখতে পাওয়া যায়, এবং ঝড় বৃষ্টি বিদ্যুৎ ইত্যাদি যা কিছু দুর্যোগের সাক্ষাৎ তোমরা পাও সারা বছর ধরে, সে সমস্ত কিছুর জন্যে এই নীচু মেঘগুলিই প্রধানত: দায়ী। অবশ্য, মাঝারি মেঘ থেকেও বৃষ্টি হয়, তবে সেটা তেমন জোরালো নয়। বরং বিরক্তিকর। একটানা টিপটিপ ঝিরঝির বৃষ্টি হয়ে যায় সারাদিন ধরে। গোটা আকাশটা মেঘে ঢাকা থাকে, যেন ধূসর রঙের একটা বিশাল চাদর কেউ বিছিয়ে দিয়েছে সেখানে। সূর্যের মুখ দেখা যায় না, শুধু একটা আবছা আলোর আভাস পাওয়া যায় আকাশে—ঘষা কাঁচের মধ্যে দিয়ে যেমন দেখায়। এই ধরণের মাঝারি মেঘ সাধারণত: মাটি থেকে দশ পনেরো হাজার ফুটের মধ্যে থাকে।

উঁচু মেঘ অনেক উপরতলার অধিবাসী। মাটি থেকে পঁচিশ-তিরিশ এবং মাঝে মাঝে চল্লিশ হাজার ফুট ঊর্ধ্বেও তারা অবস্থান করে। এত উঁচুতে থাকার দরুন এই মেঘগুলিতে কোনও জলকণা থাকতে পারে না। সবটাই অতি সূক্ষ্ম বরফের কণায় ভর্তি। এইসব মেঘ থেকে বৃষ্টিবাদল কোনকালেই হয় না। সুন্দর সরু সরু সাদা রঙের এই উঁচু মেঘগুলিকে আকাশের শোভা হিসেবেই ধরা যেতে পারে।

সকল অধ্যায়
১.
মাটি
২.
ভুতের গল্প
৩.
হর্ষবর্ধনের অশ্বরোগ
৪.
সেই মেয়েটি
৫.
বিদ্যাসাগরের ছেলেবেলা
৬.
গোয়েন্দা
৭.
ইতিহাস ছাড়িয়ে
৮.
যমালয়ে জীবন্ত মানুষ
৯.
ডাকিনীর ডাক
১০.
শত্রুতা
১১.
রেলে
১২.
অতু
১৩.
এক যে ছিল বাঘিনী
১৪.
দাওয়াই
১৫.
বিশ্বের বিস্ময় হেলেন কেলার
১৬.
ফুলের বিবাহ
১৭.
মংলুফলায় সোনা
১৮.
একটি গল্প করার মত গ্রাম
১৯.
লালমণি পাখি
২০.
প্লাবন
২১.
ছাত্র-সঙ্গীত
২২.
জয়-পরাজয়
২৩.
এখন শিউলি-বেলা
২৪.
আশ্বিনে
২৫.
ছড়া
২৬.
পোড়ো কুঁড়ে
২৭.
মা (উপন্যাস)
২৮.
গোর্কির ছেলেবেলা
২৯.
সেয়ানে সেয়ানে
৩০.
সুড়ঙ্গের রহস্য
৩১.
এক ঝাঁক গল্প
৩২.
কঙ্কাল
৩৩.
নতুন করে জাগো মা
৩৪.
বেতাল-পঞ্চবিংশতি
৩৫.
ভবঘুরের চিঠি
৩৬.
নিলাম দামী চশমা
৩৭.
শরৎ এল
৩৮.
কৈশোর
৩৯.
আলোর ডাকে
৪০.
অগ্রদূত
৪১.
টাকার কথা
৪২.
সাহস চাই!
৪৩.
ভোজবাড়ীর ব্যাপার
৪৪.
আবাহনী
৪৫.
এবার পূজায়
৪৬.
বামুনের স্বর্গবাস
৪৭.
মজার ধাঁধা
৪৮.
আংটির পাথর
৪৯.
মনমঞ্জুষা
৫০.
নিখিল বঙ্গ গরু সম্মেলন
৫১.
মিকি ডাক আর দিসনে
৫২.
মেঘনাদবধ
৫৩.
চৌধুরী-বাগ
৫৪.
জাদু বিদ্যা
৫৫.
বাবার চিঠি
৫৬.
গানের কথা
৫৭.
আমার প্রথম শিকার আভিযান
৫৮.
বিশ্বক্রীয়া ওলিম্পিক
৫৯.
বাংলার বন্যা
৬০.
শরতে
৬১.
আনন্দ আশ্বিনে
৬২.
টোটকা কিছু
৬৩.
জলদি করুন দাদা
৬৪.
কিশোর বিজ্ঞানীর আসর
৬৫.
সঙ্গীতের মৃত্যু
৬৬.
ছত্রপতি
৬৭.
মেঘ ও বৃষ্টি
৬৮.
মধুপালের আবির্ভাব

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%