ভবঘুরের চিঠি

দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

শনিবার। অফিস ছুটি। শুয়ে শুয়ে উপন্যাস পড়ছি—নায়ক পঞ্চু তরফদারের দেশোদ্ধারমূলক নাটকীয় কীর্তিকলাপ। নি:স্বার্থ দেশসেবায় নিয়োজিতপ্রাণ প্যাঁকাটি পঞ্চু কিভাবে ফুলে উঠছে, তার চমকপ্রদ বিবরণ পড়তে পড়তে বারে বারে রোমাঞ্চ জাগছে। এমন সময় দামু ঘরে ঢুকলো।

—বাবু, আপনার চিঠি।

চোখ বইয়ের পাতায়, অন্য দিকে দেবার উপায় নেই। তাই হাত বাড়িয়ে দিলাম। পঞ্চুর অবস্থা তখন খুবই অনিশ্চিত। চোরে তাড়া করেছে। প্রাণান্তকর পরিচ্ছেদ—'কি হবে' 'কি হবে' অবস্থা।

হঠাৎ চিঠিখানার দিকে নজর পড়তেই—আরে, রঙিন খামের চিঠি! বিদেশ থেকে! দেশের বাড়ির ঠিকানা ঘুরে এসেছে চিঠিখানা।

খামটার উলটো পিঠে চোখ পড়তেই চমকে উঠি। কে? আর. কে. চৌধুরী চিঠি লিখেছে। ধড়মড় করে উঠে বসেছি ততক্ষণে। খামখানা খোলারও যেন আর তর সইছে না।

অ্যাঁ, রঞ্জুর চিঠি? রঞ্জু চিঠি লিখেছে!

আমার তখনকার মনের অবস্থা ভাষায় ব্যক্ত করার নয়। অভিভূত আমি। ক্ষণেকের জন্যে চিন্তাশক্তিও বোধহয় লোপ পেয়েছিল।

আমাদের, বিশেষ করে আমার জীবনাকাশ থেকে রঞ্জু হঠাৎ একদিন উল্কার মতো উধাও হয়েছিল। সত্যিই সে যে উধাও হয়েছে, তা বুঝতেই কেটেছিল কিছুকাল। প্রথমে তা কল্পনাও করতে পারি নি।

পারা সম্ভবও নয়। রঞ্জুর সঙ্গে আমার কি সম্বন্ধ, তা যারা জানতো তারাই শুধু বুঝতে পারবে। ভাই বলো, বন্ধু বলো—আমি আর রঞ্জু ছিলাম অভিন্ন। সবাই জানতো, যেখানে রঞ্জু সেখানে আমি বা যেখানে আমি সেখানেই রঞ্জু।

তাই আমায় না জানিয়ে সে এমনি উধাও হবে, ভাবাও অসম্ভব।

প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম, রাগ বা অভিমান করে সে হয়তো কোথাও গা ঢাকা দিয়ে আছে।

কিন্তু রাগ বা অভিমান!—কার ওপর? আমার?

অসম্ভব।

আকাশ-পাতাল ঢুঁড়ে এমন একটা সামান্যতম ঘটনাও মনে পড়লো না, যাতে তার রাগ বা অভিমান করার সুদূরতম সম্ভাবনা থাকতে পারে।

তবে কি অন্য কারো ওপর? কিন্তু সে জাতের মানুষ তো সে নয়। জীবনের আরম্ভ সেই বাল্য থেকে যে দুর্ভাগ্যের আগুনে পোড় খেয়ে খেয়ে এত বড় হলো, অন্য কারো কথায় সে রাগ বা অভিমান করবে, এ হয় কি করে? ও জাতীয় ভাবপ্রবণতা তো তার ছিল না।

তবে?

কোথাও বেড়াতে গেছে? কিন্তু তা-ও তো ভাবতে পারি নে। হঠাৎ সে বেড়াতে বেরিয়ে পড়লো, অথচ আমি জানলাম না,—তাই বা হয় কি করে?

তবে কি কোন অঘটন, কোন দুর্ঘটনা ঘটলো?

দিনের পর দিন, মাসের পর মাস তাকে আমরা খুঁজেছি। পুলিসও খুঁজেছে। সম্ভব-অসম্ভব এ হেন জায়গা নেই, যেখানে তার খোঁজ করি নি। কিন্তু না, বি. এসসি. পরীক্ষা দিয়ে সেই যে সে একদিন অদৃশ্য হয়ে গেল, তারপর আর কোথাও তার হদিস মেলে নি।

কোথায় গেল রঞ্জু?...বেঁচে আছে তো?...

সত্যি কথা বলতে কি, রঞ্জুর চিন্তায় সে সময় আমার রাতের পর রাত বিনিদ্র কেটেছে, মাথার বালিশ ভিজে গেছে। দিনরাত শুধুই রঞ্জুর চিন্তা আর সম্ভব-অসম্ভব নানা আজগুবি কল্পনা।

আজ সেই রঞ্জুর চিঠি পেলাম। যেমন হঠাৎ সে একদিন উধাও হয়েছিল, তেমনি হঠাৎ আবার একদিন তার চিঠি এসে হাজির হলো।

হিসাব করে দেখলাম, তার অন্তর্ধানের তারিখ থেকে আজ পর্যন্ত তিন বছর চার মাস আঠার দিন পার হয়ে গেছে।

চিঠিখানা একবার দুবার তিনবার পড়ে ফেললাম। বসে রইলাম স্তব্ধ হয়ে।

রঞ্জুর সঙ্গে পরিচয় স্কুল-জীবন থেকে। আমাদের ইস্কুলে সে এসে ভর্তি হয়েছিল—আমারই ক্লাসে। ঠিক মনে নেই, বোধহয় পঞ্চম শ্রেণীতে।

নতুন ছেলে। অপরিচয়ের ব্যবধান প্রচুর। কিন্তু সে আর ক'দিন! দুনিয়ায় কিছু কিছু মানুষ জন্মায়, যাদের চরিত্রে এমন কিছু থাকে, যা সহজেই পরকে আপন করে, দূরকে কাছে টানে। নতুন ছেলেটির চরিত্রেও সে জাতের আকর্ষণীয় কিছু ছিল কিনা, তা বোঝার ক্ষমতা, বয়স বা ইচ্ছা কোনটাই তখনো আমাদের হয় নি।

কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই দেখা গেল, সে আমাদের মন কেড়ে নিয়েছে। শুধু আমাদেরই বা বলি কেন, স্যারেরা অর্থাৎ মাস্টারমশাইরাও তার দিকে আকৃষ্ট। তারপর সকলের অজ্ঞাতে আপনা থেকেই সে একদিন আমাদের নেতা হয়ে বসলো। কোন কিছু করতে গেলে রঞ্জনের মতামত না হলে চলে না।

হ্যাঁ, তার নাম রঞ্জন—রঞ্জনকুমার চৌধুরী। বিচিত্র অদ্ভুত ছেলেটি!—কথাটা স্যারেদের, আমাদের নয়।

লাফালাফি, ঝাঁপাঝাঁপি, সাঁতারে ও খেলাধুলোয় যেমন, মারামারিতেও তেমনি রঞ্জন ছিল প্রথম সারিতে। ইস্কুলের ব্যায়ামখানায় তার হাজিরা ছিল প্রায় নিয়মিত। মারামারির ব্যাপারে মারতে সে যেমন ওস্তাদ ছিল, কপালে তেমনি বেদম মারও তার জুটতো সময় সময়। কিন্তু সেজন্যে তার কোন আপসোস ছিল না। নালিশ করাও তার ধাতে ছিল না। জিজ্ঞেস করলে বলতো—ধ্যুৎ, ওসব নালিশ-ফালিস আমার আসে না।

একদিনের ঘটনা বলি। বেপাড়ার কিছু ছেলের সঙ্গে আমাদের ঝগড়া ছিল। ও বয়সে বিরোধের হেতুটা বড় কথা নয়, বিরোধটাই বড় কথা। লড়াইতে ওরা পারতো না আমাদের সঙ্গে,—বিশেষ করে রঞ্জু থাকলে।

সাংসারিক কাজে রঞ্জু সেদিন পাশের গাঁয়ে গেছিলো। ফিরছে, সঙ্গে দু-তিনটে ছেলে। হঠাৎ কোথায় ছিল বেপাড়ার ঐ প্রতিপক্ষ দল, হৈ হৈ করে ছুটে এল। বেশ দলে ভারী ওরা। সঙ্গীরা চাইলো পালাতে। কিন্তু রঞ্জু তা ভাবতেও পারে না। প্রতিপক্ষের ভয়ে সে পেছন ফিরে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে, আর প্রতিপক্ষ তা পেছন থেকে দেখছে আর হি হি করে হাসছে, এমন একটা দৃশ্য মনে এলেও নাকি তার গা ঘিন ঘিন করে।

সুতরাং লড়াই বাধল। তারপর বেকায়দা দেখে সঙ্গীসাথীরা একসময় হাওয়া। একা রঞ্জু—লড়ছে, মারছে। কিন্তু মার খাচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশী।

খবর পেয়ে আমরা ছুটে গেলাম। প্রতিপক্ষ পালালো বটে, কিন্তু রঞ্জুর অবস্থা কাহিল। চোখে মুখে মাথায় হাতে পায়ে কোথাও বাদ নেই,—সে জখম হয়েছে। ধরাধরি করে তাকে নিয়ে এলাম। ইস্কুলে, পাড়ায় এ নিয়ে মহা উত্তেজনা। আর সেই সঙ্গে রঞ্জুর উপর বর্ষিত হচ্ছে তার মামা ও মামীর নির্বিচার প্রচণ্ড গঞ্জনা ও গালাগালি—নির্মম মর্মান্তিক।

রঞ্জু কিন্তু নির্বিকার। মারামারির কথাটা আমি একবার তুলতেই ও থামিয়ে দিলে, শুধু বললে,—আরে দূর! ওরা বেহদ্দ কাপুরুষ। সবাই মিলে একজনকে মারতে ওদের বাধলো না। ওরা কি মানুষ?

রঞ্জুকে সেবার এগারো-বারো দিন শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল। যেমন তার সর্বাঙ্গে ব্যথা, তেমনি ধুম জ্বর। তার বিছানার পাশে আমি বসে থাকি দিনরাত, শুধু খাওয়া আর ঘুমনোর সময় ছাড়া। রঞ্জুর ইস্কুল কামাই হচ্ছে বাধ্যতামূলক। আমারও প্রায় সেই অবস্থা। রঞ্জুর উপযুক্ত চিকিৎসা করাবার সাধ্য নাকি তার মামার ছিল না। তাই আমাদের অর্থাৎ বাবাকে তার দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। বাবা-মা রঞ্জুকে বড় ভালবাসতেন।

পড়াশুনোয় অর্থাৎ ইস্কুলের পরীক্ষায় ফার্স্ট-সেকেন্ড হওয়া নিয়ে রঞ্জু বিশেষ মাথা ঘামাতো বলে মনে হয় না। ভালো ভাবে পাশ করে ক্লাসে উঠতে পারলেই সে খুশী।

কিন্তু পাঠ্য বইয়ের বাইরের পড়াশুনোয়? সেদিনের সে ঘটনাটা আজও স্পষ্ট মনে আছে। রঞ্জুর পরবর্তী জীবনে সে ঘটনার প্রভাব পড়েছিল অপরিসীম—তার জীবনের ধারাই বোধহয় পালটে দিয়েছিল।

বোধহয় অষ্টম শ্রেণীর বাৎসরিক পরীক্ষার পর। রঞ্জু সেদিন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারের কামরায় গিয়ে হাজির।

—স্যার!

অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার বিষম রাশভারী লোক এবং আমাদের ধারণায়, বদরাগীও বটে। নিরুপায় না হলে ছেলেরা পারতপক্ষে তাঁর ছায়া মাড়ায় না। ইস্কুল-লাইব্রেরীর দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। কি একটা লেখার কাজে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। রঞ্জুর কথায় ঘাড় তুলে তাকালেন।

—কি বলছো?

মাথা নীচু করে রঞ্জু বললে—বলছিলাম স্যার, আমাদের লাইব্রেরীতে গল্প, উপন্যাস, কবিতা বা ঐ ধরনের বই অনেক আছে। কিন্তু সে তুলনায় অন্যান্য বই বেশী নেই। ঐসব বই আরও কিছু থাকলে ভাল হয়, স্যার।

—অন্যান্য বই মানে? স্যারের চোখে, মনে হলো, ভ্রূকুটি।

আড়াল থেকে ওদের দুজনকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি। স্যারের রক্ত-জল-করা কণ্ঠ কানে যেতেই আমরা আঁৎকে উঠলাম—জঝা:! ফেঁসে গেল রঞ্জন চৌধুরী।

লাইব্রেরীতে কি বই আছে-না-আছে, তা নিয়ে আমাদের কোন মাথাব্যথা নেই। রঞ্জনেরই বা এমন কি মাথাব্যথা পড়লো? লাইব্রেরী থেকে সে বই নিত, জানতাম। কিন্তু কি বই নিত, তা জানার আগ্রহ আমাদের ছিল না। অবশ্যি তার কিছুটা আঁচ পেতাম, যখন বাইরের কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা উঠতো বা কোন বিতর্ক সভার আয়োজন হতো কিংবা বাৎসরিক কোন অনুষ্ঠানাদির ব্যবস্থা হতো। সেখানে রঞ্জু ছিল আমাদের প্রতিনিধি—মুখপাত্র।

রঞ্জুকে পইপই করে বারণ করেছিলাম—যাস নি! যাস নি! কি দরকার তোর ওসব ব্যাপারে মাথা গলানোর? কোথা থেকে আবার কি হবে, আর মামা-মামীর কাছে তোর লাঞ্ছনা-গঞ্জনা-গালাগালির শেষ থাকবে না।

কিন্তু কোন কথাই ও কানে তুললো না। ঐটেই ওর সবচেয়ে বড় দোষ—বড্ড একগুঁয়ে জেদী। শেষ পর্যন্ত আমরা তাই পেছু পেছু এসেছি—বলতে গেলে, তাকে সী অফ করতে।

হুঁ! বারণ শোন নি, এবার ঠ্যালা সামলাও!

কিন্তু না:! রঞ্জুর কণ্ঠ কানে এল—অন্যান্য বই বলতে আমি, স্যার, বোঝাতে চাইছি দেশ-বিদেশের কথা, জন্তু-জানোয়ারদের কথা, মানুষের বড় হবার কাহিনী, অভিযান ও আবিষ্কারের গল্প, শিকারের কাহিনী, সহজ ভাষায় লেখা ভূগোল, বিজ্ঞান, অ্যাসট্রন্যমি, এমনি সব বই।

নিস্তব্ধ ঘর। দেয়াল-ঘড়ির টিকটিক শব্দকেও হাতুড়ি পেটার আওয়াজের মতো লাগছে। রঞ্জুর দিকে স্যার নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছেন। আর আমার গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কয়েক মুহূর্ত পরে স্যার বললেন—ওসব বই কম আছে সত্যি। কিন্তু যা আছে, সেগুলো পড়েছ কি? সেগুলো আগে শেষ করো, তারপর দেখা যাবে।

তেমনি মাথা হেঁট করে সঙ্কোচের সঙ্গে রঞ্জু বললে—সেগুলো শেষ করেছি, স্যার। তাই তো আপনার কাছে এলাম।

অ্যাঁ!—আর একটু হলে আমরা হুড়মুড় করে পড়েই যাচ্ছিলাম—পাষণ্ডটা বলে কি?

স্যারও যেন আকাশ থেকে পড়লেন—পড়েছ? সব?

বিস্ময়ভরা চোখে তিনি তাকিয়ে রইলেন রঞ্জুর দিকে। শেষে ধীরে ধীরে বললেন—ওসব বই পড়তে তোমার বুঝি ভালো লাগে? ভূগোল বিজ্ঞান অ্যাসট্রন্যমিও?

স্নিগ্ধ উজ্জ্বল চোখে তিনি তাকিয়ে আছেন রঞ্জনের দিকে।

রঞ্জন হেঁট মাথায় দাঁড়িয়ে রইল।

আর আমরা? তার বিকৃত বিস্বাদ রুচির বহর দেখে আমরা তখন নিদারুণ মনস্তাপে জ্বলছি। জগা ফিসফিস করে নিস্তেজ গলায় বললে—ঈ:হ! ভূগোল বিজ্ঞান অ্যাসট্রন্যমি! আমার গা বমি-বমি করছে।

অসম্ভব নয়। জগাকে আমরা ধরাধরি করে জাম গাছটার তলায় বসিয়ে দিলাম। সে চিৎ হয়ে পড়লো।

এবার অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড স্যারের কণ্ঠস্বর কানে এল। নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছি নে। স্নেহ-মাখাকণ্ঠে স্যার বলছেন—শুনতে বড় ভালো লাগছে, বাবা। কিন্তু গল্প কবিতা উপন্যাসও তো পড়া উচিত। জীবনে ওটা রসের দিক। কথাটা এখন হয়তো ঠিক মতো বুঝতে পারবে না।

ওসব বইও পড়ি, স্যার। লাইব্রেরী থেকে নিয়েই পড়ি।—রঞ্জু বললে।

আবার ঘর নিস্তব্ধ।

ফিসফিস করে নসে বললে—এই ভূতো, দেখি তোর নাকটা, এগিয়ে দে তো, চিমটি কেটে দেখি, আমরা জেগে আছি, না স্বপ্ন দেখছি।

—কেন, নিজেরটা কি হলো? রাতে পরের হাঁড়ি ভাঙতে গিয়ে সাফ হয়েছে নাকি? ভুতো চাপা গলায় রুখে উঠলো।

নসে তেড়ে উঠতে যাবে, এমন সময় স্যারের গলা শোনা গেল—কিন্তু বাবা, তুমি যেসব বিষয়ের কথা বলছো, বাংলা ভাষায় সে সব বই তো বেশী নেই। সহজ ইংরেজী ভাষায় লেখা ওসব বই প্রচুর আছে। আমাদের লাইব্রেরীতেও আছে কিছু।

ও:! জানতাম না, স্যার।—রঞ্জুর ছোট্ট এক দীর্ঘশ্বাস পড়লো—বাংলা ভাষায় ওসব বই এত কম, জানা ছিল না, ইংরেজী বইগুলো, স্যার, নাড়াচাড়া করে দেখেছি। কিন্তু বুঝতে পারি নে। বেশীর ভাগ শব্দের মানেও জানি নে। বাড়িতে অভিধানও নেই যে তা দিয়ে বুঝবার চেষ্টা করব। আচ্ছা স্যার, তাহলে যাই—

নমস্কার করে রঞ্জন যাবার জন্যে পা বাড়াতেই স্যার ডাকলেন—শোন।

স্নিগ্ধ উজ্জ্বল চোখে তিনি তাকিয়ে আছেন রঞ্জুর দিকে। বয়স আন্দাজে সাধারণ বাঙালী ছেলের তুলনায় রঞ্জু নি:সন্দেহে লম্বা ও বলিষ্ঠ। দেখতেও সুশ্রী। মাথাভরা ঝাঁকড়া চুল। টিকলো নাক। চেহারাও বুদ্ধিদীপ্ত। বাপ-মাহারা ছাত্রটিকে অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার আজ যেন নতুন করে দেখছেন। দূরের এক জেলা থেকে সে এসেছে। বাবা-মা'র একমাত্র সন্তান। কয়েক দিনের আগু-পিছু মা-বাবা দুজনকেই হারায়। বাবা ছিলেন সে অঞ্চলের নাম করা শিকারী। জোয়ানও বটে। অবস্থা বেশ স্বচ্ছল ছিল। দেশে প্রতিপত্তিও ছিল। কিন্তু মা-বাবা চলে যেতে জমিজমাও সব উবে গেল। অনাথ বালক তাই আজ গরীব মামার বাড়ি মানুষ হচ্ছে। ইস্কুলে সে হাফফ্রীশিপ পেয়েছে। মামা অনাদিবাবু অবশ্য প্রতি বছরই ফ্রীশিপের জন্যে খুব ধরাধরি করেন, আদ্দেক মাইনে দেওয়াও তাঁর পক্ষে প্রায় দু:সাধ্য।

স্যার বললেন,—শোন, ছেলেদের মধ্যে ওসব বইয়ের সত্যিকারের পড়ুয়া কেউ আছে, জানতাম না। এবার তাই বাংলায় ও-জাতীয় বই যা পাওয়া যায়, সব খুঁজে পেতে কেনার চেষ্টা করবো। কিন্তু বেশী কিছু মিলবে বলে মনে হয় না। এক হয়, যদি ইংরেজী পড়ে বুঝতে পার। ইংরেজী শেখ না, তাহলে কিন্তু নানান রকমের বহু বই পড়ার সুযোগ পাবে, বাবা।

দুই ডাগর চোখ তুলে রঞ্জু সাগ্রহে বললে—শিখতে খুব ইচ্ছে করে, স্যার। কিন্তু কি করে শিখবো?

শুভ্র আনন্দে স্যারের চোখ মুখ যেন ঝলকে উঠলো। মুগ্ধ চোখে আমরা স্যারের দিকে তাকিয়ে আছি। নতুন দৃশ্য।

স্যার বললেন,—বেশ, বাবা, বেশ। আমিই শেখাবো। কাল থেকেই তুমি আসতে পার। ছুটির পর আসবে। ঐসব ইংরেজী বই পড়তে পড়তে ইংরেজীও শিখবে—কেমন?

রঞ্জনের কি হলো, বুঝলাম না। ক্ষণেকের জন্যে মনে হলো অত্যন্ত বিচলিত। তারপরেই স্যারের পায়ের ওপর ঢিপ করে এক প্রণাম করে সে ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

আমরাও বেরিয়ে এলাম গুপ্ত স্থান থেকে। আমাদের চোখে রঞ্জনের প্রেস্টিজ তখন প্রচণ্ড বেড়ে গেছে। হিরো—মস্ত বড় হিরো সে।

কিন্তু ও কি! ওভাবে হনহন করে সে হাঁটছে কেন? চাপা গলায় হাঁকলাম—রঞ্জু! এই রঞ্জু!

আমাদের দিকে সে কিন্তু ফিরেও তাকালো না। কোঁচার খুঁটে বারবার সে চোখ মুছছে।

সতীর্থরা সব হতভম্ব। এ ওর মুখের দিকে তাকায়—হলো কি?

আমি পেছিয়ে পড়লাম। ওর স্নেহকাঙাল মনের এই দিকটা আজ দেখতে পেয়ে আমার মনও যেন ডুকরে কেঁদে উঠল। সঙ্গীদের বললাম,—থাক। ওকে যেতে দে।

ঘটনাটা বাবা-মাকে গিয়ে বলতে কিছুক্ষণ তাঁরা কথাই বলতে পারলেন না। ব্যথায় মুখ থমথম করছে। ঘটনাটা তাঁদের মনকে কতখানি নাড়া দিয়েছিল, তা পরে বুঝলাম। আমরা এক ভাই, এক বোন। কিন্তু এর পর থেকে রঞ্জু যেন তাঁদের আর এক ছেলে হয়ে দাঁড়ালো।

রঞ্জুর মামাবাড়িতে স্নেহের লেশও অবশিষ্ট ছিল না। মা-বাবার—অবস্থাপন্ন ঘরের—একমাত্র স্নেহের দুলাল সেখানে হয়ে দাঁড়িয়েছিল নি:স্ব অবাঞ্ছিত। অনাদর, গঞ্জনা ছিল নিত্যকার ঘটনা। মামা অনাদিবাবু খুব খারাপ লোক ছিলেন বলে মনে হয় না। তাঁর চার ছেলেমেয়ে। একদিকে নিদারুণ সাংসারিক অনটন, অন্য দিকে মামার কর্তব্য—এই টানাপোড়েনে স্নেহের উৎস কবে শুকিয়ে কাঠফাটা হয়ে গেছিলো! কিন্তু এসব বোঝার বয়স আমাদের তখনো হয় নি। তাই রঞ্জুর মামা-মামীর ওপর আমার ও অন্য সতীর্থদের বিতৃষ্ণা ও রাগের অন্ত ছিল না।

মামাতো ভাইবোনদের পড়াশুনোয় বা সাংসারিক কাজকর্মে সাহায্য করতে রঞ্জুর কখনো আলসেমি দেখি নি। তবু গঞ্জনা থেকে, বিশেষত মামীর নিষ্ঠুর গঞ্জনা থেকে তার রেহাই নেই।

সময় সময় আমি ক্ষেপে যেতাম। কিন্তু রঞ্জনকে মনে হতো নির্বিকার, কোন কথাই গায়ে মাখে না। শেষে আমার তাড়নায় একদিন বললে,—যেতে দে, ভাই। আমিই তো অভাগা, নয়তো এমন করে কেউ বাবা-মাকে হারায়!

আমার তো তবু আশ্রয় জুটেছে, কত জনের তো তা-ও জোটে না।

বলতে-বলতে শেষদিকে তার গলা ধরে এল। আর আমার পক্ষে তখন চোখের জল রোধ করা দুষ্কর।

অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড স্যারের কাছে রঞ্জন যাচ্ছে তখন প্রায় নিয়মিত। নবম শ্রেণীর ষান্মাসিক পরীক্ষায় দেখা গেল রঞ্জন সেকেন্ড হয়েছে। তারপর বার্ষিক পরীক্ষায় সে রেকর্ড নম্বর পেয়ে প্রথম হলো। দশম শ্রেণীতেও তাই।

তারপর স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা। ফল বেরুলে সর্বত্র সাড়া পড়ে গেল। রঞ্জনকুমার চৌধুরী প্রথম দশজনের মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে, প্রথম জনের সঙ্গে তার মাত্র বারো নম্বরের তফাৎ। ইস্কুলে আর গোটা অঞ্চলে সে কী হুল্লোড়! স্যারেরা রঞ্জনকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

কিন্তু অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড স্যার কোথায়? রঞ্জন ও আমাদের ইস্কুলের এই অভাবনীয় কৃতিত্বে যাঁর অবদানের তুলনা হয় না, আজ আনন্দের দিনে তিনি কোথায়?

খোঁজ খোঁজ! তাঁকে পাওয়া গেল নদীর ধারে। নদীর দিকে মুখ করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন।

রঞ্জনের সঙ্গে আমরাও ছিলাম—যারা স্কুল ফাইনাল পাশ করেছিলাম। আমরা গিয়ে প্রণাম করতে স্যার আশীর্বাদ করলেন। সবশেষে রঞ্জন। কিন্তু ও কী! প্রণাম করতে গিয়ে সে উঠছে না কেন?

আরে বোকা ছেলে! বলতে বলতে স্যার রঞ্জুকে টেনে তুলেই বুকে চেপে ধরলেন। রঞ্জুর চোখের জলে স্যারের পা ভিজে গেছে।

তারপরের দৃশ্য জীবনে ভুলতে পারবো না। স্যারের পা থেকে চোখ তুলতেই আমরা থ হয়ে গেলাম।

রঞ্জুকে বুকে চেপে স্যার তার অবিন্যস্ত চুলের বোঝা আরো এলোমেলো করে দিচ্ছেন। রঞ্জুর চুলের মধ্যে তাঁর আঙুল চলছে দ্রুত। ঠোঁট কাঁপছে, নাক ফুলে ফুলে উঠছে, দুই চোখ লাল। পরক্ষণে দুই চোখ বেয়ে অশ্রুর ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল রঞ্জুর মাথায়—পিতৃ-প্রতিম শিক্ষকের হৃদয়-নিংড়ানো আশীর্বাদ।

অনির্বচনীয় দৃশ্য। আমরাও কেঁদেও ফেললাম। কেন কাঁদলাম জানি না।

পরে বুঝেছিলাম, অপুত্রক অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড স্যারের পুত্রাধিক স্নেহ রঞ্জু পেয়েছিল। স্যারের মুখে পরে শুনেছি, রঞ্জুর মতো ছাত্র তিনি শিক্ষকজীবনে আর দ্বিতীয় পান নি।

স্কলারশিপের টাকায় কলকাতায় পড়াশুনো চললেও বইপত্তর কেনা ও থাকা-খাওয়ার খরচ পুরোটা চলে না। বাবা সেটুকু বহন করবেন ঠিক হলো। অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড স্যারও চেয়েছিলেন দায়িত্ব নিতে। বাবা তাঁকে নিরস্ত করেন।

রঞ্জু শুনলো। দৃষ্টি তার দিগন্তে প্রসারিত। স্তব্ধ হয়ে বসে আছে সে। খানিক পরে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে মাথা নত করলো। আমি জানি, কোথায় তার কষ্ট। একদিকে আত্মমর্যাদাবোধ, অন্য দিকে মানুষ হবার আকাঙ্ক্ষা। নিরুপায় একটি কিশোর।

সূর্য অস্ত গেছে। রক্তরাঙা পশ্চিমাকাশ। দিগন্তবিস্তৃত বিলের প্রান্তে দুজনে বসে আছি। দুটি কিশোর মন কথা হারিয়ে ফেলেছে।

রঞ্জুর ব্যথায় সান্ত্বনা দেবার ভাষা আমি জানি নে। সে ব্যথায় অলক্ষ্যে রক্ত ক্ষরে। ওর অন্তরের ঐ মূক আর্ত কান্না যখন শুনি, তখন কে কাকে সান্ত্বনা দেয়! নিজেকে সামলাতেই তখন আমি ব্যতিব্যস্ত।

অন্ধকার ঘনিয়ে এল। ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে অবিরাম। ঝোপে ঝাড়ে বিন্দু বিন্দু জোনাকির আলো—জ্বলছে নিবছে, নিবছে জ্বলছে। নির্মেঘ আকাশে তারার ঝিলিমিলি। ইতিমধ্যে কখন আমি রঞ্জুর ডান হাতটা নিজের হাতে টেনে নিয়েছি। উন্মুক্ত নি:শব্দ আকাশ। এক সময় আস্তে আস্তে বললাম,—রঞ্জু, আমরা তো দুই ভাই, তুই আর আমি। বাবা-মাও তো তাই বলেন।

রঞ্জুর হাতটা কাঁপছে আমার হাতের মধ্যে। কয়েক মুহূর্ত পরে সে ফিসফিস করে বললে—আমি তা জানি।

বাবা কলকাতায় এসে দুজনকে কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করে দিয়ে গেলেন। পরিচিত মেসের এক ঘরে দুজনের থাকার ব্যবস্থা—পাশাপাশি সীট।

বিদায়ের সময় মামা অনাদিবাবু চোখের জল ফেলেছিলেন; রঞ্জুকে বুকে জড়িয়ে কেঁদেছিলেন তার মামীমাও। অবাক চোখে আমরা দেখেছিলাম সে দৃশ্য।

সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময় শ্রীমান রঞ্জনকুমার চৌধুরী হঠাৎ একদিন বিখ্যাত হয়ে পড়লো। কাগজে কাগজে বিরাট ফলাও করে তার ফোটো সমেত ছাপা হল—'তরুণ বাঙালী ছাত্রের অপূর্ব বীরত্ব।' 'উন্মত্ত ষণ্ডের কবল হইতে শিশুর জীবনরক্ষা।' 'ক্ষিপ্ত জানোয়ারের সহিত তরুণ ছাত্রের দু:সাহসিক লড়াই।' ইত্যাদি।

ঘটনাটা হলো : রঞ্জু আর আমি সেদিন বিকেলে জিমন্যাসিয়ামে চলেছি।

প্রসঙ্গত: তার আগে নিজের দু:খের কাহিনীটা এখানে সংক্ষেপে সেরে নি। কলকাতায় এসেও কিন্তু রঞ্জুর ব্যায়াম করার রোগ যায় নি। বড় আশা ছিল, কলেজের পরিবেশে পড়লে ওসব রোগ সাফ হয়ে যাবে। কিন্তু তা দূরের কথা রোগের প্রকোপ যেন শতগুণে বৃদ্ধি পেল। নামকরা এক মাসলঅলার আখড়ায় সে ভর্তি হলো। শুধু কি তাই? ঐ সঙ্গে লাঠি, ছোরা, বক্সিং, যুযুৎসু প্রভৃতি বিদ্যায় ওস্তাদি অর্জনের নিরলস প্রচেষ্টারও বিরাম নেই।

শেষে থাকতে না পেরে নৈরাশ্যপ্রপীড়িত কণ্ঠে একদিন বললাম—তুই তাহলে বাইসেপস বাজিয়েই খাবি? পড়াশুনোয় ইতি? বেশ বেশ! ঐ সঙ্গে ভাঙা ব্লেডের বিনি পয়সার ব্যবসাটাও এক ফাঁকে শিখে নে গুরুর কাছ থেকে।

—তার মানে?

—মানে আবার কি? এ কি আরবী-ফার্সী যে কথায় কথায় মানে বলতে হবে?

আমার মুখের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে রঞ্জু বললে—বুঝেছি। কিন্তু পাঠ্য বইয়ের কোথায় আছে বলো তো চাঁদ, স্বাস্থ্য ভাল রাখার জন্যে বা লাঠি-ছোরা খেলা শেখার জন্যে এক-আধ ঘণ্টা সময় ব্যয় করলে পড়াশুনোর ব্যাপারে তাকে অপব্যয় মনে করা হয়? না কি উলটোটাই আছে?—কি? কথা বলছিস না কেন? —যাকগে। এবার কাজের কথায় আসি। আজকালের মধ্যেই কথাটা বলতাম। শোন শ্রীমান, তোমাকেও আমার সঙ্গে যেতে হবে।

কোথায়?—সাগ্রহে জিজ্ঞেস করলাম।

—জিমন্যাসিয়ামে। নিয়মিত।

'বিদ্যুৎস্পৃষ্ট' বলে একটা কথা সাহিত্যে পড়েছি। এই মুহূর্তে তার অভিজ্ঞতা হলো। এমন একটা প্রস্তাব করার কথা ওর মনে উঠতে পারে, ভাবতেও পারি নি। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো লাফিয়ে উঠলাম।

—জিমন্যাসিয়ামে? আমি? নিয়মিত?

নির্লিপ্ত উদাসীন কণ্ঠে রঞ্জু বললে—হ্যাঁ। নয় কেন? এত অবাক হবার কি হলো?

আমার বাকস্ফূর্তি বন্ধ। শুধু বাকস্ফূর্তি কেন, সব ফূর্তিই লোপ পেয়েছে। হাতের কাছে আয়না থাকলে দেখা যেত, দু:খে, ক্ষোভে ও বিস্ময়ে আমার চোখ দুটো নির্ঘাৎ ঠেলে বেরিয়ে আসছে।

মুচকি হেসে রঞ্জু বললে—নয় কেন? কলকাতায় কলেজের আবহাওয়ায় এসে, ব্যায়াম করাটা একটা বিদঘুটে রুচিবিগর্হিত ব্যাপার বলে ধরে নিয়েছ, মনে হচ্ছে। কিন্তু শুনে রাখ শ্রীমান, ওটা ঠিক নয়। হাত-পা-টিংটিং হাড়গিলে বৃকোদর সিংরাই শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রুচির বাহন, কোন মহাপুরুষের এ অমূল্য উপদেশ কোথায় পড়েছ শুনি?

আকস্মিক প্রতি আক্রমণে তখনো আমি বেসামাল।

রঞ্জু আবার কথা বললে, কথা তো নয় যেন বিষাক্ত হুল—ভীম না হয়ে বৃকোদর হওয়া যায় না, বুঝলে শ্রীমান? বৃকোদরী কাজটা ওভাবে বেশী দিন চালানো যায় না।

আমার খাদ্যাখাদ্য বিচারের প্রতি কটাক্ষ! রাগে জ্বলে উঠলাম।

শুনেছি, নিদারুণ শোকে বাল্মীকি মুনির মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল দুনিয়ার প্রথম শ্লোক । কথাটা যে কত সত্যি, আজ টের পেলাম। দারুণ রাগে আমার আবার বাকস্ফূর্তি ঘটলো, আমি গর্জে উঠলাম—অর্থাৎ আমাকে সেইজন্যে কিং-কং, গামা, ষণ্ডা, হাতী, গণ্ডার ইত্যাদি হতে হবে, এই তো?

—হ্যাঁ। রঞ্জু মুচকি হাসলো,—অবশ্যি বৃকোদরত্ব যদি চালিয়ে যেতে চাও।

আর তা নয় তো? —ডোবার আগে আমি তখন যুক্তি হাতড়াচ্ছি।

তা নয়তো দেহযন্ত্রটাকে সুস্থ সবল কর্মক্ষম রাখার মতো এক-আধ ঘণ্টা ব্যায়াম করলেই যথেষ্ট, যা আমি করছি। এর দ্বারা তুমি কারুরই উপকার করছো না, একমাত্র নিজের ছাড়া। তারপর সারাদিন ফাংশান সংস্কৃতি রেষ্টুরেন্ট চষে বেড়াও, কোন বাধা নেই। অবশ্যি শেষেরটা একটু কম চষাই ভালো।—রঞ্জুর মুখে তেমনি বিষাক্ত হাসি।

আমি চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লাম। ও যেরকম একগুঁয়ে, যুক্তিতর্কে যখন হেরে গেছি, তখন আর রেহাই নেই।

তারপরের ঘটনা হৃদয়বিদারক। আখড়ায় আমাকে যেতে হলো এবং প্রায় নিয়মিত।

প্রথম প্রথম মাথাধরা, পেটকামড়ানি, শরীর ম্যাজমেজে ইত্যাদি এমন সব অসুখে আক্রান্ত হতাম, যা বাইরে থেকে ধরা যায় না।

একদিন তো বাথরুমে গিয়েই আশ্রয় নিলাম। পেট খারাপ।

পাঁচ মিনিট যায়। দশ মিনিট যায়। রঞ্জু বাইরে থেকে তাড়া দেয়—কি হলো?

আমি গলা খাঁকারি দিয়ে জানান দেই—এখনো ব্যস্ত।

আমার তখন বিবাগী হবার মতো মনের অবস্থা। কাঁহাতক আর দুর্গন্ধের মধ্যে বসে থাকা যায়। মারমুখো হয়ে বেরুলাম। কিন্তু রঞ্জু নির্লিপ্ত, কোন কথাই গায়ে মাখলো না। তারপর আবার সেই নিত্যকর্ম।

রঞ্জু ছুটে গেল। পরক্ষণে...

সেদিনও রঞ্জুর সঙ্গে আখড়ায় চলেছি। হঠাৎ হৈ-চৈ কানে এল—'গেল গেল' চিৎকার। তাকিয়ে দেখি, লাল জামা পরা একটা বাচ্চা মেয়ে হেলতে-দুলতে রাস্তা পার হচ্ছে। আর অন্য দিক থেকে শিং বেঁকিয়ে ছুটে আসছে প্রকাণ্ড এক ধর্মের ষাঁড়। তার দুই চোখ রক্ত বর্ণ, মুখ দিয়ে গাঁজলা বেরোচ্ছে। ষাঁড়টা ক্ষেপে গেছে, মনে হলো।

মেয়েটা এদিকে হৈ-চৈ শুনে আর ষাঁড়টাকে আসতে দেখে ভয়ে রাস্তার মাঝেই দাঁড়িয়ে পড়েছে।

'গেল গেল' বলে সবাই চেঁচাচ্ছে বটে, কিন্তু এগোচ্ছে না কেউ।

মুহূর্তমাত্র।

রঞ্জু ছুটে গেল। পরক্ষণে মেয়েটাকে তুলে নিয়ে উলটো ফুটপাতে গিয়ে উঠলো। আর ষাঁড়টাও ঠিক তক্ষুনি ভোঁস ভোঁস করতে করতে বেরিয়ে গেল তীরবেগে। আর এক মুহূর্ত দেরি হলে মেয়েটা বা রঞ্জু কেউ আস্ত থাকতো না।

ষাঁড়টার কিন্তু কি খেয়াল হলো, কিছু দূর গিয়েই সে ফিরে দাঁড়ালো। তারপর আবার ছুটলো মেয়েটি ও রঞ্জুর দিকে।

পাশেই ফুটপাতের ওপর ঝাঁপতোলা এক পানবিড়ির দোকান। সেখান থেকে একখানা বাঁশ তুলে নিয়েই রঞ্জু রাস্তায় গিয়ে পড়লো।

উড়ে দোকানী ছুটে এল হাঁ-হাঁ করে। পরক্ষণে ক্ষ্যাপা ষণ্ডমূর্তির দিকে নজর পড়তেই, 'ই: বাপ-অ জগড়নাথ অ' বলে পেছন ফিরেই দে ছুট। এক হাতে সে কোমরের সামনের দিককার কাপড় চেপে ধরেছে। কাপড়টা বোধহয় খুলে পড়ার অবস্থা। পেছনে ফুটপাথের ওপর দিয়ে খোলা কাছা টেনে নিয়ে সে চোখের পলকে গলির মোড়ে অদৃশ্য হলো।

এমনি অবস্থা আরো অনেকের।

এদিকে কি যে ঘটলো, ঠিক বুঝলাম না। ষাঁড়টা তেড়ে আসতেই রঞ্জু পাশ কাটালো। পরক্ষণে দেখলাম, ষাঁড়টা হুমড়ি খেয়ে পড়লো। বাঁশটা তার দুই পায়ের ফাঁকে। চোখের পলকে রঞ্জু ষাঁড়টার দুই শিং চেপে ধরলো মাটিতে। তার চিৎকার শোনা গেল,—শীগগির ওর পেছনের পা দুটো বেঁধে ফেল! শীগগির, শীগগির!

এত বড় ঘটনাটা ঘটে গেল বোধহয় দু-তিন মিনিটের মধ্যে। ঘামে নেয়ে উঠেছি। রঞ্জুর চিৎকারে বুঝি সম্বিৎ ফিরে এল। ছুটে এলাম। দুর্দান্ত ক্ষ্যাপা ষাঁড় ঝুটোপুটি করছে। যাই হোক সমবেত চেষ্টায় তার চার পা-ই বেঁধে ফেলা হলো। পরে শোনা গেল, আরো জনা পাঁচেককে সে জখম করে এসেছে। তার মধ্যে একজনের অবস্থা সঙ্কটজনক।

তারপর দ্রুত পটপরিবর্তন : থানা-পুলিশ, দারোগা ও ডেপুটি পুলিশ কমিশনারের আগমন ও বাহবা, খবরের কাগজের রিপোর্টারদের আগমন ও প্রশ্নবাণ, ফোটোগ্রাফারদের ক্লিক ক্লিক শব্দ ইত্যাদি ইত্যাদি। পরদিন খবরের কাগজে সংবাদ বের হলো—শ্রীমান রঞ্জনকুমার বাঙালী ছাত্র তরুণদের আদর্শ। বাঙলার অতীত গৌরব ফিরাইয়া আনিতে হইলে বাঙালী যুবকদের আজ পড়াশুনায় এবং শক্তি, সাহস ও বীরত্বে রঞ্জনকুমারের ন্যায় হইতে হইবে—ইত্যাদি ইত্যাদি।'

তারপরেই শুরু হলো বেধড়ক কান্ড : মেসে, পাড়ায়, আখড়ায়, কলেজে, বিভিন্ন ক্লাবে হুল্লোড় অভিনন্দন এবং দেশ থেকে বাবা ও অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড স্যারের আগমন—শ্রীমান রঞ্জুকে একেবারে পেড়ে ফেললে।

ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় রঞ্জু পঞ্চম হলো। আমি জানতাম, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার তার গোপন বাসনা ছিল। কিন্তু সে বি. এসসি-তে ভর্তি হলো। আমি বি.এ.-তে।

ফোর্থ ইয়ারে ওঠার কিছুদিন পর থেকেই রঞ্জুর মধ্যে একটা পরিবর্তন নজরে পড়ছিল। এমনিতেই সে কথা বলে কম, গম্ভীর প্রকৃতির। কিন্তু এ সময় তাকে আরো গম্ভীর আর খুব অন্যমনস্ক মনে হতো। অনেক দিনই সে বেশির ভাগ সময় বাইরে-বাইরে কাটাতো আর অনেক রাত জেগে পড়তে।

সে সময় অবশ্যি তার এই ভাবান্তরে বিশেষ গুরুত্ব দেই নি। দিলে বোধহয় পরে এতখানি পস্তাতে হতো না।

আমরা পরীক্ষা দিলাম। রঞ্জুর কথায় বুঝলাম, পরীক্ষা সে মোটামুটি ভালোই দিয়েছে। তারপরেই হঠাৎ একদিন তার অন্তর্ধান।

রেজাল্ট বেরোলে দেখা গেল, কেমিস্ট্রী অনার্সে সে ফার্স্ট ক্লাশ সেকেন্ড হয়েছে।

তারপর তিন বছর চার মাস আঠারো দিন পরে রঞ্জুর প্রথম পত্র পেলাম। দীর্ঘ পত্র। লিখেছে কানাডা থেকে।

পত্রের অনেকখানিই নিতান্ত ব্যক্তিগত। আমাদের না জানিয়ে অন্তর্ধান ও দীর্ঘ অজ্ঞাতবাসের কৈফিয়ৎ সে দিয়েছে অনেক জায়গা জুড়ে। লিখেছে, এর ফলে আমাদের বিশেষ করে আমার কি অবস্থা হয়েছিল, তা সে দূর থেকে মনশ্চক্ষে প্রতি মুহূর্তে দেখতে পাচ্ছিল। লিখেছে, 'বিশ্বাস কর, তোরই মতো গোপনে আমি কেঁদেছি, দিনের পর দিন।....তবু চলে এলাম। কারণ পৃথিবী ঘোরার স্বপ্ন আমার ছোটবেলা থেকে। বারে বারে মনে হতো—জন্ম-অভাগা আমি, এগারো-বারো বছর বয়সেই করুণাময় ঈশ্বর যাকে সব বাঁধন থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন, ভবঘুরের অনির্দেশ জীবনই বোধহয় তার ললাট লিখন।...নিজের মনের অস্থিরতা আর তোদের ব্যথা থিতিয়ে পড়ার জন্যে এই অজ্ঞাতবাস বোধহয় দরকার ছিল। অন্তত: আমার তাই মনে হয়েছে।'

তারপর জনে জনে প্রত্যেকের খবরাখবর চেয়ে শেষে কি করে সে দেশ থেকে বেরোতে পারলো তার বিবরণ দিয়েছে।

'রবার্টকে তোর মনে পড়ে?—সেই ইংরেজীভাষী কানাডিয়ান ছেলেটিকে, ফোর্থ ইয়ারে পড়ার সময় সেবার সুন্দরবনে শিকার করতে গিয়ে যার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল? পৃথিবীজোড়া ব্যবসা তাদের—ইঞ্জিনিয়ারিং, পেট্রোল ও অন্যান্য খনিজ, সমুদ্রে তিমি, সীল প্রভৃতি শিকার, এমনি সব হরেক রকমের কারবার। যাকে বলে কোটি-কোটিপতি মালটি-বিলিঅ্যানিয়্যার, তারা তাই।...কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার হলো, কয়েকদিনের মেলামেশার ফলে রবার্ট আমার ভারী ন্যাওটা হয়ে পড়ে।...

'...তার বাবার সঙ্গেও পরিচয় হলো। ব্যবসার স্বার্থে ছেলেকে নিয়ে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছেন। দিলদরিয়া মানুষ।... কলেজের ছুটির পর ওদের কাছে যেতে হতো, বেরোতেও হতো। যাকে বলে জবরদস্তি, অবশ্য ভালোবাসার।...

'রবার্ট আমার কাছে বাংলা শিখতে শুরু করেছিল। বুদ্ধিমান, তাই কিছু দিনের মধ্যেই কাজ চালানোগোছের ভাষা রপ্ত করে ফেললো। যা কিছু ফ্যাসাদ বাধতো উচ্চারণ নিয়ে।...রবার্ট প্রায়ই বলতো, আমাদের দেশে চলো। দেখবে পৃথিবীটা কি বিরাট।...তার কথায় গভীর আন্তরিকতা থাকলেও বিশেষ আমল দিতাম না। ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝলাম তখুনি, যখন তার বাবা মেলসাম সাহেবও একদিন পাড়লেন কথাটা। ওদের ব্যবহারে ও কথাবার্তায় কিছুদিন যাবৎ বুঝতে পারছিলাম, আমাকে ওদের কেন জানি নে খুব ভালো লেগেছে। তার পরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত। আমি রাজী হলাম। ঠিক হলো, বি. এসসি পরীক্ষার পরই রওনা হবো। সব ব্যবস্থাই ওদের।'

সবশেষে সংক্ষেপে সে লিখেছে তার অভিজ্ঞতার কথা—'এ কয় বছরে ঘুরেছি বহু জায়গায়। আজো ঘুরছি। জীবনে যা চেয়েছিলাম, যা স্বপ্ন দেখতাম, তা এমন করে মিলে যাবে, কে ভাবতে পারে! চাওয়ার সঙ্গে পাওয়ার, নেশার সঙ্গে পেশার এমন মিল বোধহয় কদাচিৎ নজরে পড়ে।...ঐ সব অভিজ্ঞতার ঘটনা যদি জানতে চাস লিখিস।....'

রঞ্জুকে পত্র লিখলাম।

তারপর থেকেই পত্রের আদানপ্রদান চলেছে নিয়মিত আমাদের মধ্যে। রঞ্জু মাঝে মাঝে টাকা পাঠায়—তার পরিমাণ মোটেই কম নয়, অন্তত: আমাদের দেশের হিসাবে। তার নির্দেশ মতো সে টাকার যথোচিত বিলিব্যবস্থা করার দায়িত্ব আমার উপর। টাকা সে পাঠায় বাবার কাছে, অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড স্যারের কাছে আর মামা অনাদিবাবুর কাছে।

বাবা সে টাকা নেন না। রঞ্জুর অনুনয় সত্বেও। আমায় বললেন—ছেলের টাকা নিতে বাপের আবার আপত্তি কি? কিন্তু এখন তো দরকার হচ্ছে না। ওটা তুই রঞ্জুর নামে ব্যাঙ্কে জমা রাখ।

অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড স্যারেরও টাকা নিতে প্রথমে তীব্র আপত্তি ছিল। কিন্তু রঞ্জুর চিঠির পর এবং বাবার ও আমার অনুরোধে তিনি শেষ পর্যন্ত রাজী হয়েছেন। রঞ্জুর চলে যাওয়ার কিছুকাল পরেই তিনি রিটায়্যার করেন। স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। দুটি মেয়ে নিয়ে চারজনের সংসার প্রায় অচল। রঞ্জুর টাকায় পরে মেয়ে দুটির বিয়ে হয়।

রঞ্জুর মামা-মামীর টাকা নিতে আপত্তির প্রশ্নই ওঠে না। আপত্তি তাঁদের ছিল, তবে তা অন্য ক্ষেত্রে—টাকার বিলিব্যবস্থার দায়িত্ব ও অন্যদের টাকা দেওয়া নিয়ে। ব্যাপারটা রঞ্জুকে লিখতে গিয়েও পারি নি, মন বেঁকে বসলো। কিন্তু পরে বুঝলাম, মামা অনাদিবাবু এত বড় একটা অন্যায় বরদাস্ত করতে না পেরে, শেষ পর্যন্ত আমার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে রঞ্জুকে চিঠি লিখেছিলেন। সে চিঠির উত্তর এল আমার কাছে লেখা পত্রের মধ্যে। তারপর থেকে মামাবাবু চুপ।

অভাবই সাধারণ মানুষের স্বভাব নষ্ট করে ফেলে। ঈর্ষা, মানসিক দৈন্য ও হীনতা তাকে টেনে নিয়ে চলে অন্ধকার সুড়ঙ্গ পথে। রঞ্জুর মামা-মামীকে তাই কি দোষ দেব! তবু স্বীকার করতে লজ্জা নেই, ক্ষণেকের জন্যে হলেও তার ছায়া পড়েছিল আমার মনের ওপর। রঞ্জুর পত্রে নিজের এই ক্ষুদ্রতা আমার কাছে বিরাট হয়ে ধরা পড়ে। রঞ্জু কত ঊর্ধ্বে, আর আমি কোথায়! নিজের মনের এই অন্ধকারকে আমি কোন দিন ক্ষমা করতে পারি নি—তা ক্ষণিক হলেও পারি নি।

যাক গে ওসব কথা। মানুষের জীবনের সাময়িক আলোছায়ার খেলা মাত্র। আসল হচ্ছে রঞ্জুর সেই চিঠিগুলো—আমার কাছে যা অমূল্য সম্পদ। যেমন অভিনব তাদের বিষয়বস্তু, তেমনি বিস্ময়কর। এক ভবঘুরের বিচিত্র রোমাঞ্চকর জীবনের রোজনামচাও বলা চলে। নিস্তরঙ্গ জীবন আমাদের, তাই সময় সময় সেসব বিশ্বাস করাও কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু আমি জানি, তার প্রতিটি কথা সত্যি।

ভবঘুরের রোজনামচা শুরু করি এবার। তার তৃতীয় পত্র থেকেই শুরু করা যাক। সমুদ্রে প্রথম সে তিমি শিকারে বেরিয়েছে, তারই কাহিনী।

উদ্বেল সমুদ্র—অশান্ত উত্তাল। জাহাজে চলেছি তিমি শিকার করতে। আমি অবশ্যি শিকারী নই—দর্শকমাত্র। সঙ্গে রবার্ট। এই আমার প্রথম তিমি-শিকারে যাত্রা। কিন্তু সেদিন সাংঘাতিক যে বিপদের মুখে পড়েছিলাম, তাতে এটা শেষ যাত্রা হওয়াও অসম্ভব ছিল না।

সকাল বেলা। একটু আগেও আকাশ পরিষ্কার ছিল। দেখতে দেখতে হাওয়া বাড়তে শুরু করলো। আকাশে মেঘ জমেছে। পাক খেয়ে খেয়ে ছুটছে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ। চারদিক কুয়াশায় ঢাকা। বেশী দূর দৃষ্টি চলে না। উত্তাল সমুদ্রে ঢেউয়ের পর ঢেউ এসে আছাড় খেয়ে পড়ছে জাহাজের গায়ে। সফেন সমুদ্র-জলে এক-একবার নেয়ে উঠছি।

সমুদ্র-গর্জন আর ঢেউয়ের মাঝে জাহাজটা আছাড়িপিছাড়ি খাচ্ছে মোচার খোলার মতো। পাহাড় সমান উঁচু ঢেউয়ের মাথায় সে উঠছে, মুহূর্তের জন্য দোদুল্যমান অবস্থায় সেখানে দুলছে অনিশ্চিতভাবে, পরক্ষণে তীরবেগে খাড়া নামছে নীচের দিকে—মাথা নীচু দিকে করে। আর প্রতিবারই আমার মনে হচ্ছে—এই শেষ! আর বোধ হয় উঠতে হবে না, নির্ঘাৎ পাতালে যেতে হবে।

বড্ড দুলছে জাহাজটা। এত দুলছে যে পা ঠিক রাখা কঠিন। তুই তো জানিস, আমার নার্ভ খুব দুর্বল নয়। তবু মাথা ঘুরতে শুরু করেছে। পা টলছে। কেমন যেন অসুস্থ বোধ করছি।

জাহাজটা বড় নয় বিশেষ। রবার্ট বললে—জাহাজের তলাটা অনেকটা ধনুকের মতো গোল। তাই দোলে বেশী। এ দোলায় বহু-ওস্তাদ মাল্লা-খালাসীও কাহিল হয়ে পড়ে, তুমি তো কোন ছার।

তিমি ও তিমি-শিকার স্বচক্ষে দেখার সাধ অনেক দিন থেকে। সমুদ্র-দানবকে সমুদ্রে তার নিজস্ব পরিবেশে দেখিনি কখনো।

মেঘ ও কুয়াশা পাতলা হয়ে এল। বাতাসের বেগও কমেছে।

ধীরে ধীরে আকাশ পরিষ্কার হলো। কুয়াশা কেটে গেছে। রোদে ঝলোমলো শান্ত সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে কে বলবে, কিছুক্ষণ আগেও তার ক্রুদ্ধ উন্মত্ত তাণ্ডবে আমাদের দু:খের সীমা ছিল না। ডাইনে-বাঁয়ে সামনে-পেছনে—যত দূর দৃষ্টি যায়—চোখে পড়ে শুধু নীল জলরাশি, ছোট ছোট খণ্ড ঢেউগুলো রোদে চিকচিক করছে।

হঠাৎ চিৎকার কানে এল—তিমি! ডাইনে! দলে অনেকগুলো।

আমি লাফিয়ে উঠলাম, যেন বিদ্যুতের শক লেগেছে। ঘড়ি দেখলাম, দু ঘণ্টার উপর জাহাজ ছেড়েছি।

চিৎকার এসেছে মাস্তুলের মাথা থেকে। সেখানে কাঠের তৈরি ঘেরা-জায়গাটায় দাঁড়িয়ে একজন লোক দূরবীণ দিয়ে সমুদ্রে তিমি খুঁজছে তন্নতন্ন করে। জায়গাটা দেখতে অনেকটা প্রকাণ্ড এক পিপের মতো—মাস্তুলের সঙ্গে আটকানো।

চোখে দূরবীণ লাগিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। কিন্তু না:! কিছুই চোখে পড়ে না।

ক্যাপ্টেন ডেভিড বললেন—এখনো ওরা বহু দূরে আছে।

পূর্ণ বেগে জাহাজ চলেছে। ক্যাপ্টেন ডেভিড ও রবার্টের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছি ব্রীজের ওপর, অর্থাৎ উঁচু পাটাতনের ওপর—যেখানে দাঁড়িয়ে ক্যাপ্টেন আদেশ-নির্দেশ জারি করেন।

ভিতরে ভিতরে উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছি। হঠাৎ দূর সমুদ্র থেকে এক গম্ভীর গর্জন কানে এল।

গর্জন! খোলা সমুদ্রে কিসের গর্জন!

ক্যাপ্টেন যেন আমার মনের কথা বুঝতে পারলেন—তিমির গর্জন, তবে গলার নয়, নাকের।

সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার হল ব্যাপারটা। ক্যাপ্টেন আরো কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সময় পেলেন না। বহু দূরে সমুদ্রে জলের ফোয়ারা দেখা গেছে। তিনি তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেলেন। জাহাজের গতিবেগ আরো বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই সুযোগটার জন্যে রবার্ট যেন মুখিয়ে ছিল, মনে হলো। বললে,—কি, তিমি-টিমি সম্বন্ধে জানো কিছু? ঐ যে ক্যাপ্টেন বললো, গর্জনটা তিমির নাম থেকে আসছে, বুঝলে কিছু?

আমিও সুযোগ ছাড়লাম না। বোকা বোকা মুখ করে আনাড়ীর মতো বললাম—কি আর বুঝবো? মনে হলো, ওরা নাক ডেকে ঘুমোয়।

—তোমার মাথা! বলেই ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকালো। আমার এতখানি আনাড়ীপনা বোধহয় ও আশা করে নি, তাই সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

কিন্তু আমার নিঁখুত অগারামের অভিনয়ে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ও আশ্বস্ত হলো। বললে—তিমি এক কালে স্থলচর প্রাণী ছিল জানো?

—তিমি? স্থলচর প্রাণী?

—হ্যাঁ। সুদূর কোন এক আদিম যুগে ওরা ডাঙা থেকে জলে নেমে যায়। কেন, বলা দুষ্কর। ওরা স্তন্যপায়ী প্রাণী।

আমি নিরেট বোকার অভিনয় করে চলেছি—তিমি স্তন্যপায়ী প্রাণী! বলো কি?

হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিকই বলছি।—বিজ্ঞের মতো রবার্ট বললে—ওদের ডিম হয় না, বাচ্চা হয়। সাধারণত: একটাই বাচ্চা হয় এবং হয় বেশ বড় আকারে। কারণ জন্মেই তো ওদের জলে সাঁতার কাটতে হবে। কদাচিৎ যমজ বাচ্চাও দেখা যায়। মাছের মতো ওদের কানকো-ফুলকো নেই, তাই জল থেকে ওরা অক্সিজেন নেয় না, ডাঙার প্রাণীর মতো, ফুসফুসের সাহায্যে বাতাস টেনে নেয়।

রবার্টের গুরুগম্ভীর বক্তৃতা ও মুখের হাবভাব দেখে হঠাৎ হেসে ফেলেই অন্য দিকে মুখ ফেরালাম। আশঙ্কা হলো, রবার্ট বোধ হয় দেখে ফেলেছে। কিন্তু না, সেদিকে নজর দেবার তার ফুরসৎ নেই। তিমি-সম্পর্কিত তার জ্ঞানভাণ্ডার উজাড় করে দেবার জন্যে সে তখন মরিয়া। হাতে সময় খুব কম, তিমিগুলোর কাছে জাহাজ পৌঁছনোর আগেই কাজটা সেরে ফেলতে হবে। তাই অসহিষ্ণু কণ্ঠে বললে—কি হলো?

মুখ ফিরিয়ে ন্যাকার মতো বললাম—কি আর হবে? তোমার কথায় তাজ্জব বনে গেছি। যেভাবে ঝড়ের মতো বলে চলেছ, তাতে সবটা হজম করারও সময় পাচ্ছি নে।

—তা তো হবেই। তারপর শোন। তিমি যেমন জলের ওপর ভাসে, তেমনি জলের তলায়ও কাটায়। পনেরো-কুড়ি মিনিট, আধঘণ্টা, পয়তাল্লিশ মিনিট পর্যন্ত। জলের তলায় ডুব দেবার আগে ওরা নাক দিয়ে বাতাস টেনে ফুসফুস ভর্তি করে। তারপর নিশ্বাস ছাড়ার সময় হলেই জলের ওপর ভেসে ওঠে। নাকটা আগে ভাসে, কারণ ওটা মাথার ওপর কিনা তাই। তখন ওরা এতক্ষণের বন্ধ-করা নিশ্বাস প্রচণ্ড জোরে ত্যাগ করে আর বাতাস টেনে নেয়। সেইসময় ঐ শব্দ হয়। বুঝতে পারছো?

—হুঁ, তা পারছি কিছু কিছু, কিন্তু—

হাত নেড়ে আমায় থামিয়ে দিয়ে রবার্ট বললে—আর ঐ যে জলের ফোয়ারা দেখছো, ওটা হলো ফুসফুস থেকে বেরিয়ে আসা ঐ গরম নিশ্বাসের পরিবর্তিত রূপ, গরম জলীয় বাষ্প। বাইরের ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে আসতেই গরম ঐ জলীয় বাষ্প জলকণায় রূপান্তরিত হয়। তখন তাকে দেখায় জলের ফোয়ারার মতো।

রবার্ট থামলো। তীব্র গতিতে জাহাজ এগিয়ে চলেছে। তিমিগুলোর ফোয়ারা আর দেখা যাচ্ছে না। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করলাম,—আচ্ছা তুমি যে বললে, তিমি এককালে ডাঙায় ছিল, তার প্রমাণ কি?

এ প্রশ্নের জন্যে রবার্ট প্রস্তুত ছিল না। থতমত খেয়ে গেল। শেষে তো-তো করে বললে : প্রমাণ আবার কি?—বিজ্ঞানীরা তো তাই বলেন—

রবার্টের কাছ থেকে কয়েক হাত দূরে সরে গিয়ে বললাম—না হে লম্বকর্ণ মশাই, জবাবটা ঠিক হলো না। তিমি যে এককালে ডাঙার প্রাণী ছিল, তার অনেক প্রমাণ আছে। প্রথমত: তাদের রক্ত মাছেদের মতো নয়, আমাদেরই মতো। মাছ পুরোপুরি জলের জীব বলে জলের তাপ অনুযায়ী তার রক্তের তাপ বাড়ে কমে। গরম জলে তাপ বাড়ে, ঠান্ডা জলে তাপ কমে, তাই সমতা ঠিক থাকে। কিন্তু ডাঙার জীব তিমি, তার শরীরে সেরকম কোন ব্যবস্থাই নেই। দ্বিতীয়ত: ওদের বাচ্চা হয়, ওরা স্তন্যপায়ী। তৃতীয়ত: এককালে ওদের সর্বাঙ্গ লোমে ঢাকা ছিল। কিন্তু প্রয়োজন না থাকায় ধীরে ধীরে সবই প্রায় ঝরে গেছে। অল্প কিছু লোম শুধু মুখের দিকে এখনো দেখা যায়, কালে কালে হয়তো তাও থাকবে না। চতুর্থত: ডাঙার জানোয়ারদের মতো ওদেরও চারখানা পা ছিল। লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি তাকে ধীরে ধীরে শেষ পর্যন্ত মাছের আকারে এনে দাঁড় করিয়েছে। জীবজগতে অব্যবহার্য ফালতু কোন অঙ্গের স্থান নেই, জানো তো? কালে কালে তা ছেঁটে বাদ যাবেই। ওদের সামনের পা দুটো বদলাতে বদলাতে ডানায় রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু পেছনের পা দুটো একেবারেই লোপ পেয়েছে, যেহেতু তার কোন দরকারই নেই। তিমির দেহ কাটা হলে তার পেছন দিকে মাংসের মধ্যে দু দিকে এখনো দু খণ্ড হাড় দেখতে পাবে, বুঝলে বাবা পঞ্চাননের বাহন? ঐ দুটোই সেই দু পায়ের অবশেষ—শেষ নির্দশন। কালে কালে ওটাও আর থাকবে না।

কথা শেষ করেই আমি ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়লাম ক্যাপ্টেন ডেভিডের দিকে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে রবার্ট এতক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। আমি থামতেই সে গর্জে উঠলো, ঘুষি পাকিয়ে ছুটলো আমার পেছনে : তবে রে পাষণ্ড শয়তান, আবার সেই ইয়ার্কি! এতক্ষণ ন্যাকামি হচ্ছিল!

হারপুন কামানে হাত রেখে ক্যাপ্টেন ডেভিড দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পাশে গিয়ে আমি দাঁড়ালাম। ভাল ছেলের মতো রবার্টও এসে দাঁড়ালো অন্য পাশে। ক্যাপ্টেনের পাশে ও সব করা শোভা পায় না। সমুদ্রের দিকে আমার তখন অখণ্ড মনোযোগ। দু-একবার চোখের কোণ দিয়ে লক্ষ্য করলাম, রবার্টের চোখ দিয়ে অগ্নিবর্ষণ হচ্ছে, যেন বলছে,—রোসো, ক্যাপ্টেন তো আর সব সময় থাকছে না; তারপর তোমার একদিন, কি আমার একদিন।

ক্যাপ্টেনের নির্দেশে জাহাজের গতি কিছু কমিয়ে দেওয়া হলো। চোখে দূরবীণ লাগিয়ে দেখছি। পাঁচটা তিমি—তিরিশ-পঁয়ত্রিশ সেকেন্ড অন্তর বার চারেক আওয়াজ করলো—অবশ্যি ঐ নাক দিয়েই। জলের ফোয়ারা উঠলো পনেরো-ষোল ফুট পর্যন্ত। তার পরেই যেন কোন এক অদৃশ্য সংকেতে পাঁচটা বিশাল কালো দেহের উপরিভাগ বৃত্তাকারে ধীরে ধীরে আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠলো। মাথা ডুবল আগে, পিঠ ধনুকের মতো ভেসে উঠে বৃত্তাকারে নেমে গেল জলের নীচে। সব শেষে জলের উপর শূন্যে ভেসে উঠলো লেজ, দেখতে জাহাজের প্রকাণ্ড প্রপেলারের মতো। ধীরে ধীরে লেজটাও খাড়া নেমে গেল জলের তলায়। পাঁচটা তিমিই অদৃশ্য।

মুগ্ধ বিস্ফারিত চোখে আমি তাকিয়ে আছি। সত্যিই, দেখার মতো দৃশ্য। খাঁটি সমুদ্র-দানব—কী বিশাল আর কী ভয়ঙ্কর। জলে স্থলে অন্তরীক্ষে এত বড় জানোয়ার আর নেই। কত বড় বিশাল দেহ, অথচ কী সাবলীল স্বচ্ছন্দ তার চলাফেরা!

হারপুন কামানের পাশে ক্যাপ্টেন দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর নির্দেশে জাহাজের গতি আবার পুরো বাড়িয়ে দেওয়া হলো। কামানটার দিকে আমি এগিয়ে গেলাম। এর আগে কখনো হারপুন কামান দেখিনি।

তিমি শিকারের জন্যেই এই অস্ত্রটির অবিষ্কার। আগে বল্লম ছুড়ে বা হাত হারপুন ছুড়ে তিমি শিকার করা হতো। কিন্তু তা ছিল যেমন কঠিন, তেমনি বিপজ্জনক। তার ফলে প্রতি বছরই বহু লোকের প্রাণহানি ঘটতো।

হারপুন কামানের হারপুনই আসল মূল অস্ত্র। ওটা ওজনে প্রায় শ খানেক পাউন্ড, লম্বা চার ফুটের মতো। এক জোড়া দণ্ডের মাথায় ফাঁপা একটা জায়গা থাকে, ইংরেজীতে বলে 'ক্যাপ'। সেটা বারুদজাতীয় বিস্ফোরকে ভর্তি করা হয়। এটাকে বলে 'বোমা'। কামান ছোড়ার তিন সেকেন্ড পরে বোমা ফাটে। হারপুনের আগায় ক্যাপের ঠিক পেছনে থাকে বারো-তেরো ইঞ্চি লম্বা চারটে কাঁটা—তাদের গড়ন ঠিক বঁড়শি বা তীরের ফলার মতো। কাঁটাগুলো একসঙ্গে আটকানো থাকে। বোমা ফাটার সঙ্গে-সঙ্গে তিমির শরীরের মধ্যে গিয়ে কাঁটাগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আটকে যায়।

কি, বুঝতে পারছিস কিচ্ছু? চাক্ষুস না দেখলে ঠিক মতো বোঝা শক্ত। যাই হোক, ওই দণ্ডের সঙ্গে শক্ত মোটা দড়ি বা কাছি বাঁধা থাকে। লম্বায় তা দু মাইলেরও উপর হয়। তিমির গায়ে হারপুন বিঁধে গেলে, এই লম্বা কাছির সাহায্যে তাকে খেলিয়ে ওপরে তোলা হয়—ঠিক যেমন মাছ খেলানো হয়। ছিপে যেমন হুইল থাকে, এক্ষেত্রেও তেমনি থাকে কপিকল বা হুইলজাতীয় একটা যন্ত্র। ইংরেজীতে বলে 'উইনশ'। এই 'উইনশ'-এর সাহায্যে দরকার মতো দড়ি গুটানো বা ছাড়া হয়।

কামান দিয়ে হারপুনটা এত জোরে ছোড়া হয় যে, তিমির শরীরের মধ্যে ঢুকে বোমা ফাটতেই হারপুনের লোহার টুকরোগুলো চারদিকে সজোরে ছিটকে যায়। অনেক সময় তিমি সঙ্গে-সঙ্গে মারা পড়ে।

ঘুরে ফিরে কামানটা দেখছি, এমন সময় প্রায় কুড়ি মিনিট পরে আবার একটা ফোয়ারা দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। তিমিটা অদৃশ্য হয়েছে। অন্য তিমিগুলোর পাত্তা নেই।

ক্যাপ্টেন বললেন—ওটা দল থেকে বেরিয়ে এসেছে।

ইঞ্জিন-সিগন্যাল বেজে উঠলো। পুরোদমে জাহাজ ছুটেছে। মিনিট বারো পরে প্রায় সিকি মাইল দূরে আবার রূপালী মেঘের ফোয়ারা উঠলো আকাশে। জাহাজ ছুটছে সেই দিকে। কাছাকাছি পৌঁছনোর আগেই কিন্তু দানবটা আবার ধনুকের মতো পিঠ বেঁকিয়ে বৃত্তাকারে ডুব দিলে। লেজটা খাড়াভাবে শূন্যে দোলালো কয়েকবার। তারপর ব্যস—অদৃশ্য।

এমনিভাবে চললো প্রায় আড়াই ঘণ্টা। কখনো সে দূরে সরে যাচ্ছে, কখনো জলের তলায় অদৃশ্য হচ্ছে। কখনো বা কাছাকাছি এসে জাহাজের সমান্তরালভাবে চলেছে আমাদের সঙ্গে। ফুট ছয়েক জলের নীচে দেখা যাচ্ছে তার ভয়াল ছায়ামূর্তি—মনে হয় যেন সুদূর অতীত যুগের দৈত্যাকার কোন আদিম প্রাণীর আবছা ছায়াছবি।

ওর কাণ্ড দেখে সন্দেহ হয়, ও বুঝি খেলা করছে আমাদের সঙ্গে। যতবারই কাছাকাছি যাই, ও ডুব দেয়, লেজটা শুধু আকাশে তুলে বার কয়েক আন্দোলিত করে—যেন আমাদের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাচ্ছে। তারপর তাও অদৃশ্য হয়।

আবার জোর বাতাস বইতে শুরু করেছে। সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্র উন্মাদ। শুধু ঢেউ আর ঢেউ আর ঢেউ। পাহাড় প্রমাণ ঢেউয়ে জাহাজখানা আছাড়িপিছাড়ি খাচ্ছে। পা ঠিক রাখতে পারছি নে।

ক্যাপ্টেন হারপুন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর ঠিক পেছনে দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছি আমি ও রবার্ট।

ক্যাপ্টেন বললেন—আর কিছুক্ষণ এভাবে চললে, এবারকার মতো আশা ত্যাগ করতে হবে।

মনটা দমে গেল। ব্যর্থ হবে এ অভিযান?

কিন্তু না:! মিনিট সতেরো পরে আবার দেখা গেল তিমিটাকে। জলের হাত দুয়েক নীচে সুবিশাল এক দানব মাছের মতো অনায়াস স্বাচ্ছন্দ্যে সাঁতার কেটে চলেছে। মাঝে মাঝে সে ডুব দিচ্ছে, কিন্তু তা কয়েক সেকেন্ডের জন্যে, বেশী নীচে নামছে না।

জাহাজের গতি প্রায় স্তব্ধ। ইঞ্জিনে শব্দ নেই বললেই হয়। ধীরে—অতি ধীরে জাহাজ এগিয়ে যাচ্ছে তিমিটার দিকে।

আবার সে অদৃশ্য হলো। ক্যাপ্টেন ডেভিড চিৎকার করে বললেন—মিনিট খানেকের মধ্যেই আবার ও উঠে আসবে। তৈরী থাক।

দু পা ফাঁক করে ক্যাপ্টেন কামানের উপর ঝুঁকে পড়েছেন। উত্তেজনায় আমার হাত কাঁপছে। চোখে দূরবীণ ঠিক রাখতে পারছি নে। জাহাজ এত দুলছে যে দাঁড়াতেও পারছি নে। জলের ঝাপটা এসে নাকে কানে মুখে লাগছে ভীষণ জোরে।

হঠাৎ ক্যাপ্টেনের হাতের পেশী শক্ত হয়ে উঠলো। পলকের জন্যে জলের নীচে দেখলাম, দৈত্যাকার এক ছায়ামূর্তি উপরে উঠছে। পরক্ষণে জলের নীচে যেন প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটলো। জল তোলপাড় করে বিকটাকার এক দৈত্য লাফিয়ে উঠল আকাশে। জলের ঝাপটায় সব ঝাপসা। সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপ্টেনের প্রচণ্ড কামান-গর্জন। কানে তালা লাগার অবস্থা। প্রায় কুড়ি ফুট দূরে গিয়ে তিমিটা জলে আছাড় খেয়ে পড়লো।

সর্বনাশ! —রবার্ট বললে—দানবটা যদি কুড়ি ফুট ওদিকে না পড়ে এদিকে পড়তো, তাহলে আর রক্ষে ছিল না। আশি-নব্বুই টন ওজনের ঐ দানবের ঘায়ে জাহাজ সঙ্গে সঙ্গে চুরমার হতো, সেই সঙ্গে আমরাও। কেউ প্রাণে বাঁচলেও শেষ রক্ষে হতো না। হাঙ্গরের পাল টেনে ছিঁড়ে খেত।

আমার মেরুদণ্ড শিরশির করে উঠলো। একবার ভেবে দ্যাখ আশি-নব্বুই টন! অর্থাৎ প্রায় তেইশ শো মণ!

কামানের ধোঁয়ায় সব আচ্ছন্ন। ধোঁয়া সরে যেতে দেখা গেল, তিমিটা অদূরে কাৎ হয়ে জলে ভাসছে—অসাড় নিষ্পন্দ।

কে একজন চেঁচিয়ে উঠলো—সাবাড় হয়ে গেছে!

বিহ্বল চোখে তাকিয়ে আছি : রূপকথা-জগতের এক প্রাগৈতিহাসিক মহাকায় ভয়ঙ্কর দানব যেন, আকারে ও শক্তিতে যে দুনিয়ায় সবার উপরে! তবু কয়েক মিনিট আগেও যে মহাশক্তিধরের সাবলীল স্বচ্ছন্দ চলাফেরা মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখেছি, এমনিভাবে সে হঠাৎ শেষ হয়ে গেল—এত অল্পে? মনের কোথায় যেন ব্যথার সুর বাজছে।

আস্তে আস্তে সে তলিয়ে গেল। কাছিটা টানটান হয়ে আছে।

কয়েক মুহূর্তের জন্যে সব কিছুই যেন স্থির নিষ্পন্দ নির্বাক। শেষে ক্যাপ্টেন ডেভিডের কণ্ঠ কানে এল।

—হারপুনটা বোধ হয় মোক্ষম জায়গায় হার্টে গিয়ে বিঁধেছে। তাই কিছু বোঝার আগেই ও সাবাড়!—ক্যাপ্টেনের চোখে মুখে সাফল্যের ক্ষণিক হাসির ঝিলিক।

মিনিট দুয়েক পরে ডেভিড তিমিটাকে টেনে তোলার হুকুম দিলেন। 'উইনশ' চালিয়ে দেওয়া হলো। টানটান কাছি একটু একটু করে উপরে উঠে আসছে।

কিন্তু একি! কাছিটা হঠাৎ ঢিলে হয়ে গেল কেন?

পরক্ষণে আবার সেই টানটান। তারপরেই দেখা গেল, হড়হড় করে কাছি উপরে উঠে আসছে।

ক্যাপ্টেনের চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।

তিমিটা মরে নি!

মিনিট দুয়েক পরে প্রায় দেড় শো গজ দূরে ভেসে উঠে সে নিশ্বাস ছাড়লো।

তখনকার আমার মনের অবস্থা ভাষায় ব্যক্ত করতে পারবো না। ও এত সহজে মরে নি জেনে কেমন যেন আরাম বোধ করছি। নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছি ওর দিকে। সমুদ্র ইতিমধ্যে শান্ত হয়েছে।

তারপরেই ঘটলো সেই নিদারুণ অঘটন।

তিমিটা হঠাৎ ফিরলো, ধাওয়া করলো জাহাজের দিকে—প্রথমে মন্থর গতিতে। কিন্তু সেকেন্ডে সেকেন্ডে তার বেগ বাড়ছে।

ডেভিড লাফিয়ে উঠলেন, চিৎকার ছাড়লেন—সর্বনাশ! পিছু হটো! পিছু হটো! জোরে—জোরে—আরো জোরে! পুরো বেগ দাও জাহাজে!

বেগে ছুটে আসছে আহত জানোয়ার। সাদা ফেনায় দেহ প্রায় ঢাকা। হিংস্র আক্রোশে বিরাট লেজের মুহুর্মুহু: ঝাপটা মারছে ভয়ঙ্কর জোরে। প্রায় এসে গেছে!

ডেভিড যেন পাগল হয়ে গেছেন। লাফাচ্ছেন আর গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছেন—শীগগির! শীগগির! এসে গেছে! জাহাজটা ডুবিয়ে দেবে! জাহাজ জানোয়ারটার সঙ্গে সমান্তরাল করো। যেন সোজাসুজি জাহাজে ঢুঁ মারতে না পারে। এসে গেছে! এসে গেছে! হা ভগবান!

পরক্ষণে অতিকায় আহত দানব সর্বশক্তি দিয়ে মাথার ঘা মারলো জাহাজে। মহা ভাগ্যি আমাদের, আঘাতটা সামনাসামনি বা সোজাসুজি লাগলো না—লাগলো তেরছাভাবে। থরথর করে ভীষণ কেঁপে উঠলো জাহাজ, হটে গেল খানিকটা। সে ঘা মেরেছে জাহাজের প্রপেলারে। প্রপেলারের ব্লেড ঘুরছে তীব্র বেগে। ব্লেডে লেগে তার মুখ থেকে বড় বড় কয়েক খণ্ড চর্বি কেটে বেরিয়ে গেল। সে হটে গেল। খুব বরাত জোর বলতে হবে, প্রপেলারের কোন ক্ষতি হয়নি, ব্লেডও ভাঙে নি।

ডেভিড তখনো সমানে চেঁচাচ্ছেন আর লাফাচ্ছেন।

তিমিটা জাহাজের সমান্তরালভাবে সাঁতার কেটে আসছে। গোটা মাথাটা তার জলের ওপর। উ: কী বিরাট মাথা! কী বিরাট মুখের হাঁ!

জানোয়ারটার গতি ধীরে ধীরে মন্থর হয়ে এল, সেই সঙ্গে একটু একটু করে শান্ত হলেন ডেভিড সাহেবও। কয়েক মুহূর্ত পরে উভয় পক্ষই ঠান্ডা। তিমির গতি স্তব্ধ হয়ে গেছে। ডানা দুটো সোজা করে সে কাৎ হয়ে গেল। তার 'মরণ খেঁচুনি'র ইতি এখানেই। আস্তে আস্তে ডুবে গেল সে।

তিমিটা হঠাৎ ফিরলো, ধাওয়া করল জাহাজের দিকে...

জোরে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। সর্বাঙ্গ দিয়ে দরদর করে ঘাম ছুটছে। সবারই এক অবস্থা। কি বাঁচাই না আমরা বেঁচে গেছি অতি অল্পের জন্যে!

পরে দেখেছিলাম, তিমিটা ওজনে ছিল তেইশ শো মণের ওপর আর লম্বায় প্রায় পঞ্চাশ হাত। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ ওজনে সাধারণত: কত হয়?—দেড় মণ পৌনে-দুমণ! আর লম্বায়? সাড়ে তিন হাত-চার হাত। ব্যাপারটা তাহলে একটু কল্পনা করে দ্যাখ। এত বড় মহাকায় জানোয়ার যদি সজোরে এসে মাথা দিয়ে জাহাজে সোজাসুজি ঘা দিতে পারতো, তাহলে জাহাজের পাশ ভেঙে নির্ঘাৎ প্রকাণ্ড গর্তের সৃষ্টি হতো। জাহাজ ডুবে যেত কয়েক মুহূর্তেই। তারপর?—সোজাসুজি হাঙ্গরকুলের পেটে।

উত্তেজনার পর অবসাদ। ক্লান্ত লাগছে নিজেকে। দু:স্বপ্নের এই আতঙ্ক—এতখানি আমি কল্পনা করতে পারি নি।

তিমিটা এবার সত্যিই মারা গেছে নি:সন্দেহ হয়ে তাকে ওপরে তোলার কাজ শুরু হলো। উইনশে কাছি জড়ানো হচ্ছে। একটু একটু করে তিমিটা উঠে আসছে। আমি রেলিংয়ে ঝুঁকে পড়লাম। ধীরে ধীরে তার ছায়ামূর্তি স্পষ্ট হলো। প্রাগৈতিহাসিক যুগের দানবাকার এক মহা আতঙ্ক যেন সমুদ্রের তলা থেকে উঠে আসছে! সমস্ত দেহটা উঠে এল জলের ওপর। ওজনের ভারে জাহাজ কাৎ হয়ে পড়েছে।

রবারের লম্বা মোটা একটা হৌজ পাইপ আনা হল। তার একদিকে বাতাস ভর্তি করার পাম্প লাগানো, ফুটবলে বা মটরের টিউবে বাতাস ভরার জন্যে যে পাম্প আমরা দেখে থাকি তেমনি, তবে আকারে অনেক বড়। অন্য দিকে ইস্পাতের টিউব লাগানো, তার মাথাটা তীক্ষ্ণ ছুঁচল। তিমির পেটে টিউবটা সেঁধিয়ে দিয়ে পাম্প চালু করা হলো।

তিমির ভেতরটা বাতাসে ভর্তি হচ্ছে, তার দেহ ভাসছে জলের ওপর। বাতাস পাম্প করা শেষ হতেই টিউবটা বের করে গর্তটা দড়ির ফেঁসো দিয়ে ভালো করে বন্ধ করে দেওয়া হলো। মোটা শেকল দিয়ে মাল্লারা জাহাজের গায়ে বেঁধে ফেললে তিমিটাকে।

ছবির মতো কাজ চলছে। আমি ভাবছি অন্য কথা। ভাবছি নিজের দেশ ভারতের কথা।

তিমির ব্যবসা খুবই লাভজনক ব্যবসা। ইউরোপ ও আমেরিকার দেশে দেশে, জাপানে ও অন্যান্য দেশে এ ব্যবসায়ে লক্ষ লক্ষ লোক খাটছে। তাদের তিমিশিকারের বড় বড় জাহাজ পৃথিবীর সব সমুদ্র চষে বেড়াচ্ছে। সব সমুদ্রেই তিমি আছে। আছে ভারত মহাসাগরেও। কিন্তু তিমি ধরার কথা আমরা কি স্বপ্নেও কখনো চিন্তা করেছি? দূর থেকে যখন ভাবি, কখনই মনে হয় না আমরা স্বাধীন জাত। স্বাধীনতার অন্যতম বড় লক্ষণ, দেশের সাধারণ মানুষের সর্বাঙ্গীণ আর্থিক উন্নতি। কিন্তু কোথায় তা? বড় দু:খ হয়। কত স্বপ্ন কত সাধ! —সব ব্যর্থ হয়ে গেল!

থাক ওসব কথা। তিমির কথায় আসি। তিমি আছে বহু রকমের—ছোটবড় নানা জাতের নানা আকারের। তাদের স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যও বিভিন্ন। কিন্তু অতো খুঁটিনাটির মধ্যে গেলে হয়তো তোর ধৈর্যের ওপর অবিচার করা হবে। তিমিকে মোটামুটি বড় দুটো ভাগে ভাগ করা যায় : দাঁতওয়ালা তিমি আর দাঁতহীন তিমি।

দাঁতওয়ালা তিমিরা খায় ছোটবড় মাছ, স্কুইড প্রভৃতি সামুদ্রিক জীব।

তিমির রাজ্যে দন্তহীনেরাই সবচেয়ে বিচিত্র জীব। এদের মুখে দাঁত নেই বটে, কিন্তু তার বদলে আছে অন্য একটা বস্তু, আর সেইটাই সবচেয়ে বিচিত্র।

বিজ্ঞানীরা বলেন, এক কালে এদেরও দাঁত ছিল। কিন্তু যে কারণেই হোক এরা খাওয়ার অভ্যাস পালটাতে থাকে, শুধু করে ছোট ছোট জিনিস খেতে। তাদের সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য হয় খোলসওয়ালা একরকম প্রাণী—আকারে তারা অতি ছোট। প্রায় সব সমুদ্রেরই বিশেষ বিশেষ অংশে এরা অসংখ্য অগুনতি ঝাঁক বেঁধে ভেসে বেড়ায়। বাংলা ভাষায় এদের কোন নাম নেই, ইংরেজীতে বলে 'শ্রিম্প'। 'ক্রিল'ও বলে সময় সময়।

অতি ক্ষুদে ক্ষুদে শ্রিম্প খেতে দাঁতের দরকার হয় না, দরকার হয় অন্য কিছুর। প্রকৃতির নিয়মে তাই ধীরে ধীরে এদের দাঁত লোপ পেল, তার বদলে সেখানে জন্মালো যে জিনিস, বাংলায় তারও কোন প্রতিশব্দ নেই। ওপরের চোয়াল বা মাড়ি থেকে মোটা মোটা আঁশ নেমে এল নীচের দিকে ঝালরের মতো—নারকেলের ছোবড়া দিয়ে তৈরি পুরু মোটা আস্তরণের মতো। বাংলায় কি বলবি একে? ঝালর? ঝাঁঝরি? ইংরেজীতে বলে ব্যালীন বা ওয়েইল বৌন ( Baleen বা Whale bone ) খুব নমনীয় এগুলো। তিমি এক-এক গ্রাসে লক্ষ লক্ষ শ্রিম্প জল সমেত মুখের মধ্যে পোরে। খুব পুরু মোটা আর প্রকাণ্ড ওদের জিভ। সেই জিভ দিয়ে সে উপরের টাকরায় চাপ দিলেই জল বেরিয়ে যায়। মুখের মধ্যে থাকে শুধু শ্রিম্পের গাদা। এই জল ছাঁকা কাজের জন্যেই দাঁতের বদলে ঐ ব্যালীনের দরকার।

এই ব্যালীন খুব দামে বিক্রী হয়।

তিমি যখন স্থল থেকে জলে নামলো, তখন তার শরীর গরম রাখার ব্যবস্থা চাই। সে ডাঙার স্তন্যপায়ী জীব, মাছের মতো তার সুবিধে নেই। জলের মধ্যে গায়ের লোমও বিশেষ কাজে আসে না। প্রকৃতি তাই ধীরে ধীরে লোমের পোশাক খুলে নিয়ে তার গায়ে চর্বির খুব পুরু মোটা এক কম্বল লাগিয়ে দিলে। চামড়া ও মাংসের মাঝখানেই এই চর্বির কম্বল। কোন কোন তিমির—বিশেষ করে যেসব তিমি ঠান্ডা জলে থাকে, তাদের গায়ের এই কম্বলটা অত্যধিক মোটা।

এই চর্বি থেকে যে তেল পাওয়া যায়, তার দামও অত্যধিক। হাড় ও মাংস থেকে জমির সার তৈরী হয়। জাপানীরা আবার তিমির মাংস খায়। সুতরাং মাংসটাকে তারা ওভাবে অপচয় করে না।

তিমির জগতে নীল তিমিই আকারে সবচেয়ে বড় হয়। তাদেরও দাঁত নেই, আছে ব্যালীন। শুধু তিমির জগতে কেন, জলে স্থলে অন্তরীক্ষে এরকম মহাকায় জানোয়ার কোন দিন জন্মায় নি—না এখন, না অতীতে। কোটি কোটি বছর আগে যেসব অতিকায় ডাইন্যস্যর দুনিয়ার বুকে বিচরণ করতো, তাদের সবচেয়ে বড়টাও লম্বায় ও ওজনে নীল তিমির সমকক্ষ নয়।

দৈত্য-হাঙ্গরের পাল—সমুদ্রের নেকড়ে ওরা! রক্তের গন্ধ পেয়ে...

এ পর্যন্ত এক শো এগারো ফুট লম্বা নীল তিমি ধরা পড়েছে। এক শো এগারো ফুট মানে?—চুয়াত্তর হাত। হয়তো তার চেয়েও বড় আছে।

ঊননব্বই ফুট লম্বা এক নীল তিমির কথা জানি। এক জাপানী ব্যবসায়ী কোম্পানী ধরেছিল। তার শরীরের মোটা অংশটার পরিধি ছিল তেতাল্লিশ ফুট ছয় ইঞ্চি। লেজের এ কোনা থেকে ও কোনা পর্যন্ত কুড়ি ফুট। প্রত্যেকটি ডানা প্রায় দশ ফুট। নীচের চোয়ালটাই ছিল বাইশ ফুট দশ ইঞ্চি।

তিমিটার পুরো ওজন দাঁড়িয়েছিল তিন লক্ষ সাত শো সাত পাউন্ড—একশো পঞ্চাশ টনের অর্থাৎ চার হাজার মণের কাছাকাছি! ব্যাপারটা বোঝ। জিভটাই ওজনে ছিল ছ হাজার পাউন্ড, লিভার বা যকৃত দু হাজার পাউন্ড আর হার্ট নশো পাউন্ড।

জাপানীরা তিমির মাংস খায়। এই এক তিমি থেকেই জাপানী কোম্পানী পেয়েছিল সাতাশ হাজার নয় শো ডলার—তেল থেকে ন হাজার ন শো ডলার আর মাংস থেকে আঠার হাজার ডলার!

গল্পে পড়েছি তিমির মানুষ গেলার কাহিনী। তুইও পড়েছিস হয়তো। ওসব নিছক গল্প—আজগুবী বানানো মনগড়া। তিমি মানুষ খেতে পারে না দুটো কারণে—এক, মানুষ তার খাদ্যই নয়; দুই, তার কণ্ঠনালী এত সরু যে, মানুষ গেলা বা খাওয়ার কথা সে ভাবতেও পারে না।

রেলিং ধরে দাঁড়িয়েও নানা কথা ভাবছি আমি। তিমিটাকে জাহাজের সঙ্গে বেঁধে রেখে মাল্লারা কখন চলে গেছে খেয়াল করি নি, অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ তিমিটার দিকে নজর পড়তেই চমকে উঠলাম।

কি ওটা!

জলের মধ্যে একটা ছায়ামূর্তি যেন সট করে জাহাজের তলায় সরে গেল।

চোখের ভুল?—কিন্তু না, ঐ আবার, ঐ আর একটা! কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দেখি, তিমিটার আশেপাশে সব দিকেই ঐ ছায়ামূর্তি—নি:শব্দে তীরবেগে ছুটোছুটি করছে। তাদের পেটের নীচের সাদা অংশ ঝিলিক দিয়ে উঠছে মাঝে মাঝে।

তারস্বরে হাঁক ছাড়লাম রবার্ট ও ডেভিড সাহেবের উদ্দেশ্যে।

দৈত্য-হাঙ্গরের পাল—সমুদ্রের নেকড়ে ওরা! রক্তের গন্ধ পেয়ে ছুটে এসেছে, শকুনের মতো ঘিরে ধরেছে তিমিটাকে। এক এক কামড়ে তিমির গা থেকে চর্বি ও মাংসের বড় বড় খাবলা তুলে নিয়েই গিলে ফেলছে। গিলছে গোগ্রাসে।

ডেভিড যেন ক্ষেপে গেলেন।—শেষ করবে! ওরাই খেয়ে শেষ করবে তিমিটাকে! হাড়গোড় ছাড়া কিছু রাখবে না।—আবার শুরু হয় তাঁর চ্যাঁচানি আর লাফানি।

বল্লম দিয়ে রবার্ট ঘা মারলে একটাকে। সট করে সরে গেল সেটা। যাবার আগে ওপর দিকে মুখ তুললো একবার। সুতীক্ষ্ণ ভয়াল দু পাটি দাঁত ঝকমক করে উঠল ক্ষণেকের জন্যে। হিংস্র নিষ্ঠুর আক্রোশে যেন দাঁত খিঁচিয়ে উঠলো। আমি শিউরে উঠলাম।

মাল্লারা হাত-হারপুন ছুড়ছে। ডেভিডের হারপুন একটার পিঠে গিয়ে বিঁধলো। তবু কি নিরস্ত হয় হিংস্র জানোয়ার? হারপুন নিয়েই সে ছুটে গিয়ে এক দলা মাংস খাবলে নিয়ে গিলে ফেললে!

জাহাজের ডেকে তোলা হলো হাঙ্গরটাকে,—চোদ্দ ফুট লম্বা! আমার প্রায় আড়াই গুণ! আকারে এটা কিন্তু মাঝারি, এর চেয়ে বড় আছে।

হারপুনের কাজ চলে আস্তে। হারপুন দিয়ে ওদের হটানো যাবে না। ডেভিড ও আমি রাইফেল তুলে নিলাম। ওদের মাথায় মারতে হবে। ডেভিড মারলেন ঊনিশটা, আমি দশ। ওরা হটে গেল।

ক্যাপ্টেনের নির্দেশে জাহাজ তখন পূর্ণবেগে ছুটে চলেছে বন্দরের দিকে। পেছনে তাকিয়ে দেখি, জ্যান্ত হাঙ্গরের পাল মরা জ্ঞাতিগোষ্ঠীকে টেনেছিঁড়ে খাচ্ছে।

ক্লান্ত অবসন্ন দেহে রবার্ট ও ক্যাপ্টেন ডেভিডের সঙ্গে ধীরে ধীরে নীচে নেমে গেলাম চা খেতে।

সকল অধ্যায়
১.
মাটি
২.
ভুতের গল্প
৩.
হর্ষবর্ধনের অশ্বরোগ
৪.
সেই মেয়েটি
৫.
বিদ্যাসাগরের ছেলেবেলা
৬.
গোয়েন্দা
৭.
ইতিহাস ছাড়িয়ে
৮.
যমালয়ে জীবন্ত মানুষ
৯.
ডাকিনীর ডাক
১০.
শত্রুতা
১১.
রেলে
১২.
অতু
১৩.
এক যে ছিল বাঘিনী
১৪.
দাওয়াই
১৫.
বিশ্বের বিস্ময় হেলেন কেলার
১৬.
ফুলের বিবাহ
১৭.
মংলুফলায় সোনা
১৮.
একটি গল্প করার মত গ্রাম
১৯.
লালমণি পাখি
২০.
প্লাবন
২১.
ছাত্র-সঙ্গীত
২২.
জয়-পরাজয়
২৩.
এখন শিউলি-বেলা
২৪.
আশ্বিনে
২৫.
ছড়া
২৬.
পোড়ো কুঁড়ে
২৭.
মা (উপন্যাস)
২৮.
গোর্কির ছেলেবেলা
২৯.
সেয়ানে সেয়ানে
৩০.
সুড়ঙ্গের রহস্য
৩১.
এক ঝাঁক গল্প
৩২.
কঙ্কাল
৩৩.
নতুন করে জাগো মা
৩৪.
বেতাল-পঞ্চবিংশতি
৩৫.
ভবঘুরের চিঠি
৩৬.
নিলাম দামী চশমা
৩৭.
শরৎ এল
৩৮.
কৈশোর
৩৯.
আলোর ডাকে
৪০.
অগ্রদূত
৪১.
টাকার কথা
৪২.
সাহস চাই!
৪৩.
ভোজবাড়ীর ব্যাপার
৪৪.
আবাহনী
৪৫.
এবার পূজায়
৪৬.
বামুনের স্বর্গবাস
৪৭.
মজার ধাঁধা
৪৮.
আংটির পাথর
৪৯.
মনমঞ্জুষা
৫০.
নিখিল বঙ্গ গরু সম্মেলন
৫১.
মিকি ডাক আর দিসনে
৫২.
মেঘনাদবধ
৫৩.
চৌধুরী-বাগ
৫৪.
জাদু বিদ্যা
৫৫.
বাবার চিঠি
৫৬.
গানের কথা
৫৭.
আমার প্রথম শিকার আভিযান
৫৮.
বিশ্বক্রীয়া ওলিম্পিক
৫৯.
বাংলার বন্যা
৬০.
শরতে
৬১.
আনন্দ আশ্বিনে
৬২.
টোটকা কিছু
৬৩.
জলদি করুন দাদা
৬৪.
কিশোর বিজ্ঞানীর আসর
৬৫.
সঙ্গীতের মৃত্যু
৬৬.
ছত্রপতি
৬৭.
মেঘ ও বৃষ্টি
৬৮.
মধুপালের আবির্ভাব

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%