দাদুর বেড়াল

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

ভোরবেলা হরি-নারায়ণ, হরি-নারায়ণ, বলতে-বলতে দাদু আমাদের ঘরের সামনে এসে রোজ যেমন দাঁড়ান তেমনি দাঁড়ালেন৷ রোজকার মতোই আকাশে তখন সবে আলো ফুটছে৷ একটা কি দুটো পাখি ঘুমচোখে আমার পড়া মুখস্থ করার মতো কুঁতিয়ে-কুঁতিয়ে ডাকছে৷ দাদুর ওজন ভরা বাতাস বইছে৷ বাতাস অবশ্য নেই আজ৷ শেষ রাতে তেড়ে বৃষ্টি হয়ে গেছে৷ আকাশ মেঘলা৷ শুয়ে-শুয়ে, চোখ পিট-পিট করে আমি আকাশ দেখে নিয়েছি৷ চারপাশ নিস্তব্ধ গুমোট৷ দাদু রোজ যেমন ডাকেন সেই রকম ভারী, ভাবগম্ভীর গলায় ডাকলেন, ‘খোকা উঠে পড়ো৷ আমি এগোচ্ছি৷’ দাদুর গলা শুনে বাবা রোজ যেমন ঘুমচোখে পাশের দিকে হাত বাড়িয়ে আমার ডান কানটা ধরে বার কতক নেড়ে দেন সেই রকম নেড়ে দিলেন৷ আমি রোজ যেমন ধড়মড় করে উঠে বসে, দু-হাঁটুতে মাথা গুঁজে বলি, ‘যান, আসছি’ ঠিক সেই রকমই বলে, সামনে পিছনে দুলুনে চেয়ারের মতো দুলতে লাগলুম৷ এইভাবে দুললে ঘুম মাথা ছেড়ে পায়ের দিকে নেমে যায়৷ এই সময়টায় রোজ আমার যেমন হিংসে হয় তেমনি হল৷ বাবা কেমন আরও কিছুক্ষণ শুয়ে থাকবেন৷ অনেক রাত পর্যন্ত জেগে অঙ্ক করেন, তাই দাদু তাঁকে ঘুমোবার অনুমতি দিয়েছেন৷ আমি রাতে জাগতেও পারি না, জাগার অনুমতিও নেই৷ দাদু বলেন, বৃদ্ধ আর শিশু হল পাখির মতো৷ ভোরে উঠে কলরব করবে৷ দাদু যেমন হরি নারায়ণ, হরি নারায়ণ করছেন৷ আমি বলেছিলুম, তা হলে তো পাখির মতো সন্ধে বেলায় শুয়ে পড়া উচিত৷ না, তা হবে না৷ এ পাখি হল প্যাঁচা আর কাকের মিশ্রণ৷ রাত দশটা পর্যন্ত হুতোম প্যাঁচা৷ ডানা মুড়ে, লাল চোখে টেবিলের সামনে৷ খোলা বই৷ মাস্টারমশাই৷ কিন্তু ভোরে কাক৷ এ পাখি, নতুন জাতের পাখি--‘প্যাঁকাক’৷

দাদুর পরনে ন-হাতি পট্টবস্ত্র৷ ধবধবে বিশাল বুকে ইয়া মোটা সাদা-সাদা পইতে৷ পায়ে খটাস-খটাস খড়ম৷ হাতে বেতের সাজি৷ আর এক হাতে অর্ডার দিয়ে তৈরি করানো অ্যালুমিনিয়ামের আঁকসি৷ বাঁশের আঁকসি রোজ-রোজ খুলে যায় বলে, বাবার প্ল্যানে এটা তৈরি করে দিয়েছেন দাদুর এক মক্কেল৷ ইচ্ছে মতো বড় ছোট করা যায়৷ স্বর্ণ চাঁপা গাছ থেকে যখন ফুল পাড়া হবে আঁকসি তখন বড় হবে৷ রক্ত-করবীর কাছে এসে একটু ছোট হবে, টগরে এসে আরও ছোট৷ বাড়ি ঢোকার সময় ছাতার মাপ৷ আমি দাদুর ফুল তোলার সঙ্গী৷ ফুল তোলার পর এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দাদু আমাকে ছোটাবেন কিছুক্ষণ৷ তারপর কান ধরে কুড়িবার ওঠ বোস৷ আমার বয়েসে দাদুর নাকি ওজন ছিল চল্লিশ সের৷

আমি যখন বাগানে গেলুম দাদুর সাজিতে ততক্ষণে জবা কিছু টগর আর গুলঞ্চ মুখ বার করে বসে আছে৷ কিন্ডারগার্টেন স্কুলের ছেলেরা যেন ফোলা-ফোলা মুখে টাব-গাড়ি চেপে চলেছে৷ আমি যেতেই দাদু বললেন, ‘মিলিটারিতে কী নিয়ম জানো? ফলইন বললেই সঙ্গে-সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়তে হবে৷ একটু দেরি হলেই সাজা৷ পিঠে ওজন নিয়ে সাত মাইল দৌড়৷ কী করছিলে এতক্ষণ?’

রোজ যা হয় তাই হয়েছিল৷ আমি খাটের দেওয়ালের দিকে, বাবা ধারের দিকে৷ পা না সরালে নামি কী করে? গুরুজনকে ডিঙিয়ে নামতে নেই৷ শাস্ত্রে আছে৷ বললুম, ‘পায়ে আটকে গিয়েছিলুম৷’

দাদু কী শুনলেন জানি না৷ বললেন, ‘ভেরি গুড৷ ব্যায়ামের ফল ফলবেই৷ পা বড় হচ্ছে৷ মানুষের বাড় তো পায়ের দিক থেকেই হয়৷ গাছের মতো আর কি! নীচের দিক থেকে ওপর দিকে বেড়ে ওঠে৷ সজনে ডাঁটা, বটের ঝুরি, মাথার চুল, দাড়ি এসব বাড়ে নিচের দিকে! মানুষ বাড়ে ওপর দিকে৷’

কথা বলতে-বলতে দাদু আঁকসিটা বড় করে ফেললেন৷ তার মানে এইবার স্বর্ণচাঁপার ওপর আক্রমণ চলবে৷ বাগানে পাশাপাশি দুটো চাঁপা গাছ৷ গেটের দু-পাশে লম্বা প্রহরীর মতো সোজা দাঁড়িয়ে আছে৷ বর্ষাকাল৷ তলায় বড়-বড় ঘাস হয়েছে৷ পাতা-টাতা পড়েছে অনেক৷ দাদু একটা কথা প্রায়ই বলেন, সাবধানের মার নেই, মারের সাবধান নেই৷ আজও তাই বললেন৷ বলে, আঁকসি দিয়ে ঘাসের ঝোপ দুলিয়ে দিলেন৷ ঘাসে সাপ থাকতে পারে৷ খোঁচা মেরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়৷ তিনবার হরিনারায়ণ বলতে যতক্ষণ সময় লাগে ততক্ষণ৷ তিনি জেগে থাকলে প্রথম খোঁচাতেই ফোঁস করে বেরোবেন৷ ঘুমিয়ে থাকলে শেষ হরিনারায়ণেই ফণা তুলে উঠবেন৷

ঘাস-ঝোপ দুলে উঠল আর ফোঁস শব্দ নয় অস্পষ্ট একটা মিউ ডাক শোনা গেল৷ দাদুর কাঁধে পালোয়ানের লাঠির মতো আঁকসি, হাতে সাজি, সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে বললেন, ‘কিছু শুনতে পেলে?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ, মিউ৷’

দাদু আরও ঝুঁকে পড়ে বললেন, ‘এদিকে এসো৷’

এগিয়ে গেলুম৷ দাদু জিগ্যেস করলেন, ‘ওটা কী?’

ঘাস আর পাতার আড়ালে ছোট্ট এক তাল তুলোর মতো একটি বেড়ালছানা৷ এত ছোট যেন চিনে বাদামের খোলার মধ্যে ঢুকে যেতে পারে৷ শেষ রাতের বৃষ্টিতে ভিজে গেছে৷

‘তুলব দাদু!’

‘নিশ্চয় তুলবে৷ জীবে দয়া করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর৷’

‘মা কিন্তু বেড়ালের নাম শুনলে তেলেবেগুনে জ্বলে যায়৷ দেখলে কী হবে বুঝতে পারছেন?’

‘ওটা আমার ওপর ছেড়ে দাও৷ তুমি আগে ওটাকে তোলো৷’

তৃণশয্যা থেকে ভিজে বেড়ালছানাটাকে বুকে তুলে নিলুম৷ ধবধবে সাদা৷ প্রায় মরেই এসেছে৷ ঠান্ডায় চোখদুটো বুজে আছে৷ খুলতে পারছে না৷ ডাকার শক্তি নেই৷ গায়ে ছিট-ছিট কাদা লেগে আছে৷ দাদু দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, ‘শয়তান!’

‘কে শয়তান দাদু?’

‘যে এ বেড়াল শিশুটিকে এইভাবে এখানে ফেলে দিয়ে গেছে৷ সারারাত নিজে শুয়ে রইল নরম বিছানায় পাতলা চাদর মুড়ি দিয়ে৷ আর এই জীবটাকে ফেলে রেখে গেল মৃত্যুর মুখে৷ ভগবানের আদালতে তোমার বিচার হবে৷ তুমিও বেড়াল হবে৷ তোমার মতো আর এক শয়তান এই ভাবে ফেলে রেখে যাবে৷ আর তখন আমি তোমাকে তুলব না৷’

‘কী করে বুঝবেন দাদু, যে সেই বেড়ালটা বেড়াল-রূপী শয়তান?’

‘দেখলেই বুঝতে পারব৷ ঘুটঘুটে কালো রং, বুরুশের মতো লোম, কর্কশ গলা৷ সে আমি দেখলেই চিনব৷’

‘বাবা কিন্তু ওসব একেবারেই বিশ্বাস করেন না৷’

‘তোমার বাবা ঘোড়ার ডিম জানে৷ অঙ্ক ছাড়া কিছুই জানে না৷ ভূত আছে কি না তাই জানে না৷ বলে ভূত আবার কী? আমি ম্যাথেমেটিসিয়ান৷ প্রমাণ ছাড়া কিছু মানতে রাজি নই৷ তাহলে তোমার অঙ্কশাস্ত্রের শূন্যটা কী? শূন্যের কোনও প্রমাণ আছে? তুমি বড় তর্ক কর! ঠিক বাপের ধাতটি পাচ্ছ! নাও, ওর বুকের কাছে কানটা ঠেকিয়ে দেখো তো ধুকপুক করছে কি না?’

বেড়ালটাকে এতক্ষণ বুকের কাছে চেপে ধরেছিলুম৷ জামাটা ভিজে উঠেছে৷ সামান্য নড়াচড়া করছে যখন বোঝা যায় বেঁচে আছে৷ আবার কান লাগিয়ে নোংরা করি কেন? ‘বেঁচে আছে দাদু৷ নড়াচড়া করছে৷’ বেড়ালটা ঠিক সময় আমার বুকের কাছে আর এক বার মিউ করে উঠল৷ ঠান্ডায় চোখ জুড়ে গেছে৷ পৃথিবীকে দেখতেই পাচ্ছে না৷ আমাকে তো নয়ই৷ তবু মুখটা আমার মুখের দিকে তুলে এমন করুণ সুরে মিউ করে উঠল! ভীষণ মায়া লাগল৷ মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে এনে বৃষ্টির রাতে আমাদের বাগানে চুপি-চুপি ফেলে দিয়ে যে চলে গেছে সে ভয়ংকর নিষ্ঠুর৷ দাদুর আদালতে তার নামে মামলা করা উচিত৷ মিউ ডাকে বেড়ালটা যেন বলতে চাইছে, তোমাদের হাতেই আমার জীবন মৃত্যু৷ বাঁচালে বাঁচব, মারলে মরব৷ ইস্, রাতে কুকুরেও তো মেরে ফেলতে পারত!

দাদু বললেন, ‘নাও, ওকে ভেতরে নিয়ে চল৷ হট ব্যাগ দিতে হবে৷ ফুটবাথ করাতে হবে৷’

‘ভেতরে নিয়ে যাব কী করে দাদু? কুকুর আছে না?’

‘হ্যাঁ, তাই তো! আমি তখনই তোমার বাবাকে বলেছিলুম, কুকুর টুকুর না পোষাই ভালো৷ এক বাড়িতে কুকুর আর বেড়াল রাখা যায় না৷ জন্মশত্রু৷’

‘না দাদু, তখন ও কথা আপনি বলেননি৷ বলেছিলেন, কুকুর মানুষের বেস্ট ফ্রেন্ড৷ প্রত্যেক সভ্য মানুষের কুকুর পোষা উচিত৷ আর তখন আমাদের বাড়িতে কোনও বেড়াল আসেনি৷’

দাদু রেগে গিয়ে বললেন, ‘তোমার সঙ্গে আমি এই জীবন মরণ সমস্যার সময় তর্ক করতে চাই না৷ আমাকে একটা রাস্তা বের করতে হবে৷’

‘কী রাস্তা বের করবেন দাদু? একে নিয়ে বাড়ি ঢুকলেই আমাদের টম সঙ্গে-সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করে ফেলবে৷’

হ্যাঁ, করলেই হল? করে দেখুক না! মেরে শেষ করে দেবো৷’

‘মা তো বলেন, আমরা দুজনেই নাকি আপনার আদরে বাঁদর হয়ে গেছি৷’

‘আদরে বাঁদর হয় না, মানুষ হয়৷ তোমার মা তোমার বাবার মতোই৷ সবজান্তা৷’

রাস্তা দিয়ে ব্রঙ্কাইটিসের কাশি কাশতে-কাশতে নেত্যকালীবাবু প্রাতভ্রমণে চলেছেন৷ প্রতিবার কাশির দমক থামলে তিনি একবার ‘ওরে বাবা’ বলে গোটা কতক কথা বলেই আবার কাশিতে চলে যান৷ তার মানে ব্যাপারটা এই রকম দাঁড়ায়, কাশি, ওরে বাবা, কথা, কাশি, ওরে বাবা, কথা৷

রোজ আমাদের বাড়ির সামনে এসেই নেত্যকালীবাবুর একটা কাশির দমক আসবে৷ আজও তাই এসেছে৷ সামনে ঝুঁকে পড়ে কাশছেন৷ দাদু যেন আশার আলো দেখলেন৷ অন্যদিন নেত্যবাবু কথা বলতে চাইলেও দাদু হুঁ-হাঁ, আচ্ছা, আচ্ছা করে এড়িয়ে যান৷ আজ নিজেই এগিয়ে গিয়ে ডাকতে লাগলেন, ‘ও নেত্য, নেত্য৷’ নেত্যবাবুর কাশি তখনও চলেছে৷ একটা হাত তুলে বোঝাতে চাইলেন, শুনেছি, শুনেছি উত্তর দিচ্ছি৷ দাদুর তো সবেতেই অধৈর্য৷ মুখ দেখলেই বোঝা যায় গলা টিপে কাশি থামাবার ইচ্ছে হচ্ছে৷ অবশেষে থামল৷ সোজা হয়ে নেত্যবাবু বললেন, ‘ওরে বাবা, কী বল?’

‘একটা বেড়াল বাচ্চা নেবে?’

‘অ্যাঁ, কী বললে?’

‘তুমি কানেও কি আজকাল কম শুনছ? কী শরীরই করেছ! একটা বেড়াল বাচ্চা নেবে?’

নেত্যবাবু এই সাত সকালে এমন একটা দানের প্রস্তাব স্বপ্নেও মনে হয় ভাবেননি৷ নাক মুখ সিঁটকে বললেন, ‘রামোঃ বেড়াল? বেড়াল আবার মানুষে নেয়! গোরু হলে নিতে পারি৷’

দাদু রেগে বললেন, ‘ভাগো, ভেগে পড়ো৷ স্বার্থপর৷ কেন, তোমার অত বড় বাড়ি, একটা বেড়ালকে মাসখানেক আশ্রয় দিতে পারো না! তারপর তো বড় হয়ে নিজের রাস্তা নিজেই দেখে নেবে৷’

‘সে তো তুমিও দিতে পারো৷ তোমারও তো বেশ বড় বাড়ি, বাগান৷’

‘আরে মূর্খ, আমার বাড়িতে যে বাঘের মতো একটা কুকুর৷ সাধে তোমাকে বলছি!’

‘দেখ মুকুজ্যে, বয়েস তোমারও কিছু কম হল না! কুকুর, বেড়াল, পাখি! আর জড়িয়ে পোড়ো না, মায়া কাটাও, মায়া কাটাও৷ মনে করো, শেষের অ, সেদিন-অ কিই ভয়ংকর-অ৷’

আবার কাশি৷ দাদু মুখ ঘুরিয়ে, খড়মের খটাস-খটাস শব্দ তুলে আমার দিকে সরে এসে বললেন, ‘এ দেশের কোনও দিন উন্নতি হবে না৷ সব স্বার্থ, সব স্বার্থ৷’

বাগানে এতক্ষণ আমরা কী করছি দেখার জন্য মা এসে হাজির৷ আমরা কোলে বেড়াল ছানাটাকে দেখে লাফিয়ে উঠলেন, ‘ফেল, ফেল, ফেলে দে৷’

দাদু বললেন, ‘তুই আমার মেয়ে হয়ে এমন নিষ্ঠুরের মতো কথা বলতে পারলি তুলসী!’

মা বললেন, ‘তুমি ওটাকে পুষবে না কি?’

‘পোষা তো পরের কথা, আগে ওটাকে বাঁচাতে হবে৷’

‘তোমার টম ওটাকে খেয়ে ফেলবে বাবা৷ তুমি ও শয়তানকে জান না৷ ওই দেখো৷’

ঘরের জানলায় সামনের পা দুটো তুলে দিয়ে, মুখ বের করে দিয়ে টম ফোঁস-ফোঁস করছে, আর বিস্কুট দেখে যেমন জিভ চোকায়, সেইরকম জিভ চোকাচ্ছে৷ দাদু টমের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই যে টম৷ আমার টমবাবু, এটা বিস্কুট নয়, তোমার বন্ধু, ফ্রেন্ড৷ আমাকে বললেন, ‘একটু কাছে নিয়ে যাও, ওকে একটু দেখাও৷ আমি এই সেদিন একটা ইংরিজি বইয়ে ছবি দেখেছি, কুকুরের ঘাড়ে উঠে তিনটে বেড়াল নাচছে৷ ট্রেনিং-এ কী না হয়৷’

টমের দিকে এক পা এগোতেই, ঘাঁউ করে অ্যায়সা এক ডাক ছাড়ল, আমার কোলে মর-মর বেড়ালটাও চমকে উঠল৷ মা দাদুকে বললেন, ‘কী বুঝলে? ওর হিংসে তুমি জানো না বাবা৷ ঠিক মানুষের মতো৷ সেদিন তপনের ছেলেটাকে কোলে নিতেই সে কী লাফালাফি! কোল থেকে ফেলে দেবে৷ রাগ করে তিন দিন কথা বলেনি৷ যেদিন দুধ খেতে চায় না, সেদিন যেই বলি জলি, টমের দুধটা খেয়ে যা তো, অমনি এদিক, ওদিক তাকিয়ে ল্যাজ ঝুলিয়ে, সুড়-সুড় করে খেয়ে নেয়৷’

আমাদের পাশের বাড়িতে একটা লোম-ওলা কুকুর আছে৷ তার নাম জলি৷ টম তখনও জানালায় ফোঁস-ফোঁস করছে৷ এত জোরে ফোঁস-ফোঁস করছে, জানালার গ্রিল থেকে ধুলো উড়ে যাচ্ছে৷ দাদু বললেন, ‘ম্যাথেমেটিসিয়ানকে ডাক৷ বল, আমি ক্যাবিনেট মিটিং ডেকেছি৷’

মাকে আর ডাকতে যেতে হল না৷ দাদুর পরেই বাবা বাগানে আসেন৷ বাবাই-বাগান করিয়ে৷ আমরা কেবল ফুল তুলি৷ মাঝে মধ্যে ডাল ভেঙে ফেলে, ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকি৷

বাবা সব শুনছেন৷ শুনবেন না কেন? এতক্ষণ ধরে হইচই হচ্ছে৷ চশমা পরে এসেছেন৷ চশমা পরে এলেই বুঝতে হবে, কাজের কথা হবে, আমাকে বললেন, ‘দেখি, ওর, কনডিশানটা কী?’

বাচ্চাটাকে হাতে নিলেন৷ ‘ইস ভিজে চুপসে গেছে৷ একটা তোয়ালে চাই৷ চোখে ড্রপস দিতে হবে, আর চায়ের কাপের গরম সেঁক৷ ড্রপারে করে বিশ ফোঁটা টেপিডওয়ার্ম দুধ খাওয়াতে হবে৷ এক ডোজ অ্যাকোনাইট সিকস একস৷’ মাকে বললেন, ‘যাও তোয়ালে নিয়ে এসো৷’

মা বললেন, ‘মানুষের তোয়ালে?’

‘হ্যাঁ, মানুষের, সেইটাই হয়ে যাবে বেড়ালের৷’

মা চলে যেতেই দাদু খুশি-খুশি মুখে বললেন, ‘সাধে তোমাকে বলি ম্যান অফ অ্যাকসান! আচ্ছা, এটা এখন থাকবে কোথায়?’

কামিনী গাছতলার বাঁধানো বেদিতে বসে বাবা বললেন, ‘এ বাড়িতে না রাখতে পারলেই ভালো হয়৷ টমকে বিশ্বাস নেই৷ ধরলে, ছিঁড়ে দু-টুকরো করে দেবে৷’ বাবা খুব চিন্তিত৷ মা তোয়ালে এনে বাবার হাতে দিলেন৷ বাচ্চাটাকে তোয়ালে জড়িয়ে আমার হাতে দিতে-দিতে বললেন, ‘আসুন, আমরা একটু মাথা ঘামাই৷’ মাকে আবার ফরমাশ, ‘একটা খাতা আর ডট পেন নিয়ে এসো৷’

বাড়িতে কিছু হলেই মাকে যা খাটতে হয়! সাজি রেখে দাদুও বসে পড়েছেন৷ খাতা আর ডট এসে গেল৷ মাকে বললেন, ‘তুমিও বসো৷’

কাগজে কলমে কী হবে কে জানে? বাবা বলেন, গণিতে নাকি সব সমস্যার সমাধান আছে৷ আমার মনে হয়, সরল করো কিংবা সুদ কষায় এ সমস্যার সমাধান নেই৷ টাইম অ্যান্ড মোশানে থাকতে পারে৷ যেমন, টম যদি এক লাফে ছ-হাত যায় আর বেড়ালটাকে কত দূরে রাখলে টম জীবনেও ধরতে পারবে না৷ সেই শামুকটা, যে জীবনেও বাঁশের ডগায় উঠতে পারল না৷

বেদিতে বাবা বসেছেন পা মুড়ে, আচার্যের মতো৷ হাতে ডট পেন৷ সামনে খোলা খাতা৷ বাবা বললেন, ‘আশেপাশে এই পাড়ায় কে বেড়ালটাকে রাখতে পারে? নিন ভাবুন৷’

দাদু বললেন, ‘বুঝলে, একজনকে আমার বড় মনে ধরেছে৷’

‘বলুন, বলুন!’

‘তোমার জ্যাঠাই মা৷ আমাদের মেজ বউ৷ খাঁটি হরিভক্ত৷ গলায় তুলসীর মালা৷ একটি মাত্র ছেলে৷ সেও পরম বৈষ্ণব৷ সখি গো বলে যখন কীর্তনে টান ধরে হৃদয়ে যেন গামছা মোচড়ানোর অনুভূতি হয়৷’ বাবা লাফিয়ে উঠলেন, ‘আঃ, এতক্ষণে আপনি ঠিক জায়গায় এসে ঘা মেরেছেন৷’

‘তা হলে তুমি তোমার জাঠতুতো ভাইকে একটা চিঠি লেখো৷ খোকা আগে অনুমতি নিয়ে আসুক৷ আমি ততক্ষণে ফার্স্ট এড দি৷’

বাবা চিঠি লিখতে লাগলেন, ‘প্রীতিভাজনেষু কানু, পৃথিবীতে পরের জন্যে বাঁচাটাই সবচেয়ে বড় বাঁচা৷ আর দাদু কোলের ওপর বেড়াল ফেলে হাতে আই ড্রপসের শিশি নিয়ে বলছেন, ‘দেখি মা, দেখি, চোখ দুটো একটু মেরামত করে দি!’ বাবা চিঠি লিখতে-লিখতে বলছেন, ‘ওষুধের গায়ে নির্দেশটা একবার পড়ে নিন৷ বেড়ালের চোখে দেওয়া যায় কি না! মা একটু দুধ আর তুলো এনেছেন৷ এলাহি ব্যাপার৷ ও-দিকে টম ভুক-ভুক করছে৷ বেশি জোরে ডাকতে পারছে না, পাছে আমরা ভাবি হিংসে হয়েছে৷ আবার চেপে রাখতেও পারছে না৷ কাশির মতো৷

বাবার জ্যাঠাইমা, মানে আমার দিদা, বৈষ্ণব হলে কী হবে, ভীষণ রাগি৷ সব সময় রাগ-রাগ চোখে তাকান৷ অ্যাই, জুতো খোল৷ জুতো খোল৷ রাস্তায় কিছু মাড়াসনি তো? গঙ্গাজল ছিটো৷ আহাহা, বিছানার চাদরটা কুঁচকে দিলি কেন? আবার ঠাকুর ঘরে গিয়ে কি খট-খট করছিস? এইরকম একটা না একটা কিছু নিয়ে বকাবকি করবেনই৷ আমি অবশ্য গ্রাহ্য করি না৷ আমার কাজ আমি ঠিক করে যাই৷

চিঠি নিয়ে যখন গেলুম, দিদা তখন রান্নাঘরের সামনে বসে নারকোল কুরছেন৷ একথালা সাদা-সাদা ফুলের মতো নারকোল হয়েছে৷ বেশ লোভ লাগছে৷ এক চামচ চিনি দিয়ে এক থাবা মুখে ফেলতে পারলে মন্দ হতো না৷ সে হওয়ার উপায় নেই৷ আমি ডাক পিওনের মতো হেঁকে উঠলুম,

‘চিঠি৷’

‘কার চিঠি?’

‘বাবার৷ এই নিন৷’

দিদা দুহাত গুটিয়ে নিয়ে, মুখচোখ কেমন করে বললেন, ‘ছুঁয়ো না, বাসী জামাকাপড় ছেড়েছ?’

‘কখন, কোন ‘সকালে?’

‘দাও, চিঠিটা আমার হাতে আলগোছে ফেলে দাও৷ দশ-পা দূরে বাড়ি, চিঠি লেখার কী হল? তোমার বাবা যে কত কায়দাই জানে! যাও ঘর থেকে চশমাটা এনে দাও৷ দেখো, এক করতে আর এক করে বোসো না যেন৷ তোমার হাত-পাকে আমার বিশ্বাস নেই৷’

চশমা এনে দিদার হাতে দিতে-না-দিতেই কাকু বাজারের থলে হাতে বাড়ি ঢুকলেন৷ বেশ হাসি-হাসি মুখ৷ মনে হয়, ভালো মোচাই পেয়েছেন৷ নারকোল কোরা হচ্ছে যখন৷

‘কী রে সকাল বেলাই?’ বাজারের থলেটা দেওয়ালে কাত হল৷ দিদা খ্যাঁক করে উঠলেন, ‘ওখানে কাল রাতে চটি ছেড়েছিলি, মনে আছে?’

‘ওখানে কোথায় গো? সে তো ওইখানটায়৷’

‘তুই আমার চেয়ে ভালো জানিস?’

‘আমার জুতো, আমি জানব না, তুমি জানবে?’

‘হ্যাঁ, আমাকেই জানতে হয়৷’

‘আচ্ছা বাবা, এই নাও৷’ কাকু ব্যাগটা তুলে দিদার সামনে নামিয়ে দিলেন৷’

‘এই নে চিঠিটা পড়৷ তোর দাদা লিখেছে৷’

কাকু চিঠিটা নিয়ে জোরে-জোরে পড়তে লাগলেন৷ ‘স্নেহভাজনেষু গোপাল, ভক্ত আর দয়ালু ব্যক্তি হিসেবে, তোমার একটা পরিচয় আছে৷ ত্রিসন্ধ্যা না করে জল স্পর্শ করো না৷ শ্রীচৈতন্যের নামে তোমার চোখে জলের ধারা নামে৷ তোমার উদারতার পরিচয় আগেও কয়েকবার পেয়েছি৷ আশা করি আর একবার পাব৷ আমাদের বাগানে আজ কে বা কাহারা একটি বেড়াল ছানা ফেলে দিয়ে গেছে৷’

দিদা হাঁ-হাঁ করে উঠলেন, ‘হবে না, বেড়াল-টেড়াল হবে না৷’

কাকু আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘কী হবে না হবে না করছ? এখনও চিঠিটার এক প্যারা বাকি৷’

‘ওই প্যারাতে আছে, আমাদের বাড়িতে কুকুর, বেড়ালটাকে তোমরা রাখো৷ বেড়াল বৈষ্ণব নয়৷ কথায় বলে বেড়াল তপস্বী৷ ও আপদ আমি ঢুকতে দোব না৷’

‘আহা, চিঠিটা তুমি শোনই না৷’

দিদা জোরে-জোরে নারকোল কুরতে লাগলেন৷ খুব রাগ হয়েছে৷ কাকু বাকি অংশ পড়ছেন, ‘এতটুকু একটি প্রাণী৷ অতি অসহায়৷ করুণ মিউ-মিউ ডাকে জগতের কৃপা ভিক্ষা করছে৷ ওদিকে লোলুপ কুকুর অপেক্ষায় আছে, পেলেই ছিঁড়ে খাবে৷ আমার জ্যাঠাইমার দয়ার শরীর৷’

সঙ্গে-সঙ্গে দিদার প্রতিবাদ, ‘না, আমার দয়ার শরীর নয়৷

‘হ্যাঁ তোমার দয়ার শরীর৷’

‘মুখে-মুখে তক্ক করবি না গোপাল৷’

‘তোমার দয়ার শরীর না হলে, আমার দয়ার শরীর হয় কী করে?’

‘তুমি দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ৷’

‘না আমি দেবকুলে...’

দিদা ভীষণ ধমকে উঠলেন, ‘চুপ কর৷’

কাকু সঙ্গে-সঙ্গে পড়া শুরু করলেন, ‘বেড়াল বড় হলে আর বাড়িতে থাকে না৷ সাবলম্বী সন্তানের মতোই গৃহত্যাগ করে৷ অতএব মাত্র এক মাসের জন্যে বেড়ালটাকে তোমার নিরাপদ আশ্রয়ে রাখলে বড়ই বাধিত হব৷ আমি রোজ সকালে এক পোয়া পরিমাণ দুধও পাঠাব৷ কিংবা দুধের টিন৷ যেটা তোমার সুবিধে৷ প্রীত্যন্তে৷’

কাকু আমাকে জিগ্যেস করলে, ‘বেড়ালটা কেমন দেখতে রে?’

‘দুধের মতো সাদা৷’

‘ন্যাজ?’

‘ন্যাজটা জলে ভিজে গেছে তো৷ সে ভাবে লক্ষ করিনি৷’

‘যাক, ঠিক আছে৷ তুই তা হলে নিয়ে আয়৷ আমার অনেক দিনের বেড়ালের শখ৷ হ্যাঁ রে, বড় হলে ন্যাজটা বেশ মোটা হবে তো? ন্যাংলা ন্যাজের বেড়াল আমরা দু-চক্ষের বিষ৷’

‘হ্যাঁ কাকু, মোটা হবে৷ যে টুকু দেখেছি, তাতে মনে হয় মোটা ধাতের ন্যাজ৷’

দিদা হুঙ্কার ছাড়লেন, ‘গোপাল৷’

কাকু হুঙ্কার ছাড়লেন, ‘মা৷’

‘তুই বেড়াল এনে দেখ৷’

‘হ্যাঁ, দেখবই তো৷’

আমি পালিয়ে এলুম৷ এসে দেখলুম সুন্দর দৃশ্য৷ দাদু তোয়ালে জড়ানো বেড়াল কোলে আর বাবা পেনসিল উঁচিয়ে বাগানের পথে এপাশ-ওপাশ পায়চারি করছেন৷ আমাকে দেখেই দুজনে একইসঙ্গে প্রশ্ন করলেন,

‘রিপোর্ট কী? রিপোর্ট কী?’

আমি একটু চেপে চুপেই বললুম৷ সবটা না বলাই ভালো৷

‘কাকু বললেন, নিয়ে আয়, আমি তো একটা বেড়ালের অপেক্ষাতেই ছিলুম৷’

দাদু সঙ্গে-সঙ্গে বললেন, ‘দেখলে তো আমি তোমাকে কী বলেছিলুম? ভক্তরা স্বপ্ন পায়৷ ভগবান বেড়ালের রূপ ধরে আসছেন৷ নিশ্চয়ই ভোরের স্বপ্ন৷ তা হলে আর দেরি কেন? যাত্রা শুরু করিয়ে দি, দুর্গা বলে৷ পুজোটুজো সব মাথায় উঠে গেছে হে৷ ফুল শুকিয়ে গেল৷’

‘হ্যাঁ, তা হলে যাত্রা শুরু হোক৷’

আমার পিসতুতো বোন রেখা এসে গেছে৷ পাশেই থাকে৷ ঠিক হল আমরা লটবহর নিয়ে যাব৷ মাদ্রাজ থেকে বাবা আঙুর এনেছিলেন, সেই আঙুরের বাস্কেটটা এল৷ বেড়াল নাকি বাস্কেটে শুতে ভালোবাসে৷ বাবা বিলিতি বইয়ে ছবি দেখেছেন৷ নরম টার্কিশ তোয়ালে তো এসেই আছে৷ স্টেনলেস স্টিলের গেলাসে আধ গেলাস দুধ এল৷ একটা স্টিলের প্লেট এল৷ সব রেডি৷ এইবার স্টার্ট৷ বাবা বেড়ালটার কপালে হাত রেখে বললেন, ‘মানুষ হয়ে এসো মানু৷’

দাদু আশীর্বাদ করার ভঙ্গিতে বললেন, ‘তুমি অনেক বড় হবে৷’

বাবা সব দেখে টেখে বললেন, ‘আর একটু সাবধান হওয়া ভালো, কী বলেন?’

‘অবশ্যই, অবশ্যই, সাবধানের মার নেই, মারের সাবধান নেই৷ কী করতে চাও বলো?’

‘একটা ছাতা চাই৷’

‘কেন বল তো? রোদ লাগবে?’

‘রোদ নয়, যে-কোনও সময় কাক আর চিল ছোঁ মারতে পারে৷’

‘ঠিক বলেছ হে৷ একেই বলে অঙ্কের মাথা৷’

সঙ্গে-সঙ্গে ছাতা এসে গেল৷ রথের দিন পূর্ণ ঠাকুর যে ভাবে ছাতার তলায় নারায়ণের সিংহাসন নিয়ে হন-হন করে হাঁটেন আমিও সেই ভাবে হাঁটছি৷ বাবা আবার হিসেব করে বলে দিয়েছেন, মাথা থেকে ছাতা যেন দশ ইঞ্চির বেশি ফাঁক না হয়৷ তা হলে ছোঁ মারতে পারে৷ বেড়ালটা খুব কাবু হয়ে আছে৷ তা না হলে খচর মচর করে কোল থেকে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করত৷ পেছন-পেছন রেখা আসছে৷ হাতে লটবহর৷ রকে দিদা আর বসে নেই৷ কাকু এপাশে, ওপাশে বাঘের মতো পায়চারি করছেন৷ খুব রাগারাগি হয়ে গেছে দুজনে, দিদার চশমার খাপটা এক পাশে পড়ে আছে৷ ও-পাশ থেকে এ-পাশে ঘোরার মুখে কাকু আমাদের দেখতে পেলেন, ‘বাঃ-বাঃ, এসে গেছিস?’

‘কাকু দিদা এত রেগে যান কেন?’

‘ও বয়েস হলেই মানুষের রেগে যাওয়া স্বভাব হয়৷ হ্যাঁ বললে না, না বললে হ্যাঁ৷ আমিও কি এখন কম রেগে আছি ভাবছিস? বেরোতে দিচ্ছি না, চেপে আছি৷’

‘তা হলে?’

‘তা হলে আবার কী? আমি বলেছি বেড়াল থাকবে তো থাকবে৷ আমি বাঘ পুষব, দেখি মা কী করে! আগে মাসিকে দিয়ে শুরু করি৷’

রেখা মেঝেতে থেবড়ে বসে সঙ্গের জিনিসপত্রের হিসেব বোঝাতে লাগল, ‘এই হল তোমার বেড়ালের বাড়ি৷ এই ছাতাটা হল ছাদ, এই হল দুধের গেলাস, এই হল তোমার গিয়ে দুধের থালা, আর তোয়ালে৷’

‘ছাতাটা নয় রে রেখা৷ ছাতাটা নিয়ে যেতে হবে৷ আমরা তা হলে যাই কাকু!’

কাকু অসহায়ের মতো মুখ করে বললেন, ‘আমাকে একটু ট্রেনিং দিয়ে যা তরু৷’

‘এর আবার ট্রেনিং-এর কী আছে কাকু? এই বাস্কেটে শুয়ে থাকবে৷ মাঝে-মাঝে দুধ খাবে৷ আবার শুয়ে পড়বে৷ আবার দুধ খাবে৷ আবার শুয়ে পড়বে৷ মিঁউ করলেই বুঝবেন খিদে৷ ম্যাঁও করলেই বুঝবেন রাগ৷ ঘড়র-ঘড়র করলেই বুঝবেন, কোলে উঠবে৷ আর মিঁঞাও করলেই বুঝবেন, পালাবার তাল খুঁজছে৷’

‘এই তো ওদের ভাষা, ম্যাঁও, মিঁউ, মিঁঞাও, মাঁও৷’

মাঁওটা তো বললি না৷’

‘ওটা তো আমি ঠিক জানি না কাকু৷ বাবার কাছে জেনে এসে বলব৷’

রেখা বললে, ‘আমি জানি৷ মাঁও মানেই দুষ্টুমি করার ইচ্ছে, মাঁও মানে আও আর কী৷ টেবিলের ওপর থেকে কিছু একটা ফেলব৷ ফেলে ভাঙব৷’

‘আচ্ছা, তা হলে তোরা আয়৷’ করুণ গলা কাকুর৷

‘আপনি কিছু ভাববেন না কাকু, আমরা মাঝে-মাঝে এসে দেখে যাব, খবর নিয়ে যাব৷’

দাদুর আজ আর কোর্টে যাওয়া হল না৷ বাবা অ্যাটম নিয়ে রিসার্চ করেন৷ তিনি ঠিক সময়ে খেয়ে দেয়ে বেরিয়ে গেলেন৷ পুজোটুজো সেরে দাদু সাড়ে দশটার সময় এক বাটি মুড়ি নিয়ে আরাম করে বেতের চেয়ারে বসলেন৷ খোলা পিঠে ইয়া মোটা সাদা এক গোছা পইতে আড়া আড়ি পড়ে আছে৷ দাদু বলেন, ব্রহ্মদৈত্যের পইতে৷ পইতেতে চাবি বাঁধা৷

মুড়ি খেতে-খেতে দাদু মাকে বললেন, ‘বুঝলি, বেড়ালটার একটা ব্যবস্থা হওয়ায় বড় আনন্দ পেলুম৷ ভালো ঘরে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার মতো আনন্দ৷’

মায়ের অত জীবে দয়া নেই৷ ‘হুঁ বলে রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে রইলেন৷ দাদু আপন মনেই বক-বক করে চললেন৷ দেখতে-দেখতে ঘড়ির কাঁটা ঘুরে দুপুরের দিকে চলে গেল৷ খাওয়াদাওয়া সারার পর দাদু বললেন,

‘আয় বুড়ো ফুরফুরে হাওয়ায় একটু ঘুমোনো যাক৷’

আদর এলে দাদু আমাকে বুড়ো বলেন৷

দুজনেরই ঘুম এসে গিয়েছিল৷ এমন সময় নিচে থেকে মা ডাকলেন, ‘জ্যাঠাইমা এসেছেন৷’

নাড়া দিয়ে দাদুর ঘুম একটু পাতলা করার চেষ্টা করলুম৷ ‘দাদু, দিদা এসেছেন৷’

ঘুমের ঘোরে দাদু বললেন, ‘কোন দিদা?’

‘বেড়াল দিদা৷’

সঙ্গে-সঙ্গে ঘুম ছেড়ে গেল৷ উঠে বসলেন৷ শুনতে পাচ্ছি, দিদা ওপরে উঠতে-উঠতে বলছেন, ‘সব সুখের শরীর৷ বেলা তিনটে অবদি পড়ে-পড়ে ঘুম৷ রাজমিস্ত্রি হলে ভারায় উঠে এখন ইট গাঁথতে হতো৷’

দাদুর মুখ দেখে মনে হল বেশ লজ্জা পেয়েছেন৷ পা নামিয়ে বিদ্যাসাগরি চটি পরছেন৷ দিদা ঘরে ঢুকলেন৷ সাদা ধবধবে থান কাপড়৷ চোখে চশমা৷ বেশ রাগ-রাগ মুখের ভাব৷

‘এই যে, ঘুম ভাঙল? বেশ আছেন যা হোক! যা শত্রু পরের ঘরে৷ অ্যাঁ৷’

দাদু উঠে দাঁড়িয়ে মৃদু গলায় বললেন, ‘কেন বলুন তো? কেন বলুন তো?’

‘কেন বলুন তো?’ দিদার গলা বেশ চড়েছে৷ ‘একটা ফাটা রেকর্ড পাঠিয়ে বেশ আরামে দিব্যি দিবানিদ্রা হচ্ছে৷ ওদিকে অষ্টপ্রহর মিউ-মিউ করে আমাকে তিষ্ঠোতে দিচ্ছে না৷’

আমি জিগ্যেস করলুম, ‘কাকু কোথায় দিদা!’

সঙ্গে-সঙ্গে জ্বলে উঠলেন, ‘তিনি অফিসে৷ তাঁর আর কী! হাসি-হাসি মুখে বলে গেলেন, একটু দেখো মা৷’ কে দেখবে বাবা ওই জিনিসকে৷ একবার দুধ খাওয়াতে গেলুম৷ থালায় পড়ে চান হয়ে গেল৷ এখন আষ্টেপৃষ্ঠে লাল পিঁপড়ে ছেঁকে ধরেছে৷’

দাদু লাফিয়ে উঠলেন, ‘অ্যাঁ বলেন কী? বুড়ো?’

‘আজ্ঞে দাদু৷’ গ্যামাকসিন৷’

মা এসে দাঁড়িয়েছেন৷ লক্ষ করা হয়নি৷ ধীর গলায় বললেন, ‘উঁহু, মরে যাবে৷ হলুদ৷’

দিদা বললেন, ‘হলুদ কি গ্যামাকসিন, সে তোমরা বোঝো৷ বেড়ালটাকে দয়া করে নিয়ে এসো৷ আমি দায়িত্ব নিতে পারব না৷’

দিদার চড়া-চড়া কথায় মায়ের মনে হয় একটু রাগ হল৷ আমারও বেশ রাগ হচ্ছে৷ মা বললেন, ‘আমরা লজ্জিত৷ আপনার অসুবিধে করার জন্যে৷ আমরা এখুনি নিয়ে আসছি৷’

দাদু যেন বল পেলেন, ‘তুই যাবি?’

‘হ্যাঁ যাই৷ জীবটাকে পিঁপড়েতে মেরে ফেলবে তা তো আর হয় না৷’

আমরা দুজনে গিয়ে দেখলুম বেড়ালটার শোচনীয় অবস্থা৷ কোথায় তোয়ালে, কোথায় বাস্কেট৷ জুতোর র‌্যাকের সঙ্গে খাটো দড়ি দিয়ে বাঁধা৷ দুধে ভিজে লোম ড্যালা-ড্যালা৷ ছোট-ছোট থাবায়, নাকে, কানে মহানন্দে লাল পিঁপড়ে ঘুরছে৷ কিছু দূরে দেওয়ালে শ্রীচৈতন্য গলায় মালা পরে হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন৷

মা আমাদের দলে এসে গেছেন৷ আর কীসের ভয়৷ দেখতে-দেখতে পিঁপড়ের বংশ নির্বংশ৷ বেড়ালটাও যেন এতক্ষণে মা পেয়েছে৷ ঘড়ড়-ঘড়ড় শব্দ করছে, আর আদুরে গলায় মিউ-মিউ করে ডাকছে৷ বেড়াল আবার ফিরে চলল৷ এ যেন উলটো রথ৷ মায়ের আঁচলের তলায় ম্যাও৷ কেন জানি না বেড়াল শব্দটা মায়ের ভালো লাগে না৷ একটু আদরটাদর এলেই বেড়ালকে ম্যাও বলেন৷ ম্যাও কোলে মা চলেছেন আগে-আগে৷ লটবহর নিয়ে আমি পিছনে৷

বাবা অফিস থেকে ফিরে এসেছেন৷ এখনও জামাকাপড় ছাড়েননি৷ দুজনেই বেশ উত্তেজিত৷ আমাদের ফিরতে দেখে দুজনেই হইহই করে বলে উঠলেন, ‘ওয়েলকাম পুসি, ওয়েলকাম পুসি৷’

মা ম্যাওকে আঁচলে করে টমকে ফাঁকি দিয়ে দাদুর লাইব্রেরিতে নিয়ে এসেছেন৷ বাবা তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন৷ টম এখন দোতলায় জানালার সামনে বসে গলা সাধছে৷ দাদু মায়ের কোল থেকে পুসিকে নিজের কোলে নিয়ে বললেন, ‘বাঁচা গেল বাবা৷ ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে এল৷’ তারপর বারোয়ারি তলায় পুজোর নাটকের মেনিদার মতো বাঁ-হাতে বেড়াল ধরে, ডান হাতটাকে বাতাসে গোল করে ঘুরিয়ে বললেন, ‘এই হল তোমার সাম্রাজ্য৷ অসংখ্য ইঁদুর ঘুরছে আইনের বইয়ের ফাঁকে-ফাঁকে৷ আইন বাঘা-বাঘা অপরাধীদের কাত করলেও ক্ষুদ্র ইঁদুরের কিস্যু করতে পারে না৷ এইবার তুমি এসেছ৷ তুমি পারবে৷ তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাও৷ তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাও৷’

মা দু-হাত তুলে দাদুকে থামালেন, ‘আর হাসি নয়, আর হাসি নয়৷ এখনও হাসির সময় আসেনি৷ রাত আসছে৷ কে কোথায় থাকবে ঠিক করুন৷

বাবার মাথা আবার ঘামতে শুরু করল৷ ইউরেকার মতো বাবার চিৎকার, ‘পেয়েছি, পেয়েছি, ডগ গেট৷’

বেড়াল কোলে দাদু র‌্যাকের কাছ থেকে উল্লাসে লাফিয়ে উঠলেন, ‘ইয়েস, ডগ গেট৷’

পর মুহূর্তেই দুজনে চুপসে গেলেন, ‘সে তো তৈরি করাতে সময় লাগবে!’ তা হলে?’

আবার বাবার আবিষ্কার, ‘পেয়েছি, পেয়েছি৷ আইন দিয়ে কুকুর ঠেকাব৷’ ‘সে কী?’

‘দেখবেন, যখন করব তখন সেটা কী?’

দোতলায় ওঠার সিঁড়ির মাঝের বড় ধাপে রাত দশটার সময় কোমর উঁচু একটা বড় র‌্যাক পড়ল, দেওয়ালে-দেওয়ালে ঠাস হয়ে৷ সার-সার সাজানো হল ল-ম্যানুয়েলস৷ ইয়া মোটা-মোটা বইয়ের দুর্ভেদ্য দেওয়াল৷ দোতলায় দাদু আর বেড়াল৷ নিচের তলায় টম৷ বইয়ের পাঁচিলে পা তুলে গলা বাড়িয়ে, জিভ বের করে টম হ্যা-হ্যা করছে৷

বাবা বললেন, ‘যতই চেষ্টা করো আইন লঙ্ঘন করার ক্ষমতা তোমার নেই৷ তবে তোমার আছে, কারণ তুমি বেড়াল৷ আপনি ওকে ঘরে বন্ধ করে রাখুন৷ কাল সকালে মিস্ত্রি ডেকে গেট তৈরি করানো হবে৷’

নিচে থেকে আমরা দুজনে দাদু আর দাদুর বেড়ালকে, ‘গুড নাইট’ করলুম৷ টম ভুক করল৷

দাদু বললেন, ‘কাল সকালে তোমরা আমাকে গুডমর্নিং না করালে এই আইন টপকে আমার পক্ষে বাগানে যাওয়া সম্ভব হবে না যে!’

বাবা বললেন, ‘আমাকে তা হলে কাল একটু বে-আইনি করে ভোরে উঠতে হবে৷’ ‘শুভরাত্রি৷’

টম এতক্ষণ ছোট-ছোট ঢেঁকুরের ভুক-ভুক তুলছিল৷ আর সামলাতে পারল না৷ এবার উদাত্ত ভেউউউ!

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%