জনার্দনের জরদার কৌটো

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

কোমরের কাছে গেঁজেতে হাত রেখে জনার্দন বললে, আমার জরদার কৌটো? মুখে দু-খিলি পান পুরেছে আর ঠিক সেই সময় জরদার কৌটো গেল হারিয়ে৷ সামনেই বিশাল উনুন৷ তার ওপর বিশাল হাঁড়ি৷ জয়েন্ট ফ্যামিলির ভাত ফুটছে টগবগ করে৷ জনার্দনের এক হাতে হাতা৷ এই হাঁড়িটার সামনে জনার্দনকে দেখলেই আমাদের ভয় করত৷ মনে হতো জর্নাদন ইচ্ছে করলে আস্ত একটা মানুষকে ওই হাঁড়ির মধ্যে ফেলে কাবাব বানিয়ে ছেড়ে দিতে পারে৷ একটু ভালো রাঁধে বলে মেজাজও তেমনি৷ ‘জরদার কৌটাটা জান তুমি?’ লাল-লাল দুটো চোখ বড় করে জনার্দন এমন ভাবে আমাকে প্রশ্ন করল, মনে হয় যেন আমিই তার কোমর থেকে খুলে নিয়েছি৷ ঠিক ওই সময়টায় আমার রান্নাঘরে থাকার কথা নয়, পড়ার ঘরেই থাকার কথা৷ একটু আমসত্ত্বের লোভে এসে পড়েছিলুম৷ কিছুতেই পড়ায় মন বসছিল না, কেবলই ভেতর থেকে কে যেন বলছিল—ওরে কাল রাতের আমসত্ত্ব আমাকে আর একটু খাওয়া৷ আমি একবার ধমকে দিলুম, না এখন আমসত্ত্ব নয়৷ তোমার জন্যে আমি এই সাত-সকালেই চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ি আর কি! এখন পড়ো৷ সামনে পরীক্ষা না! এই শোনো, পুরু আলেকজান্ডার সাহবেকে কী বলছে৷

রাখ তোর আলেকজান্ডার৷ আগে আমসত্ত্ব একটু-একটু ছিঁড়ে জিভে ফেলে দেখ—কোথায় তোর পুরু, কোথায় তোর আলেকজান্ডার৷

না ভাই তোমার ছলনায় অত সহজে ভুলছি না৷ বহুবার বিপদে পড়েছি৷ আমি এখন পড়ব৷ আলেকজান্ডার পুরুকে জিগ্যেস করলেন, তুমি কিরূপ ব্যবহার প্রত্যাশা করো? রাজার নিকট হইতে রাজা যেরূপ ব্যবহার প্রত্যাশা করে৷

একটু আমসত্ত্ব দে ভাই৷

জ্বালিয়ে মারলে৷ চল দেখি কোথায় তোর আমসত্ত্ব৷ ভেতরের মানুষটার তাগিদে পড়ে শেষকালে আসতেই হল, আর এসেই হল বিপদ৷ জরদার কৌটো গেল হারিয়ে৷ ভালো মানুষের মতো করে বললুম, জানি না তো৷

জান না৷ জনার্দন যেন ধমকে উঠল৷ তুমি জান না তো কে জানে?

তাও জানি না৷

একটা চকচকে এতটুকু কৌটোর ওপর তোমার লোভ ছিল না? একটু ঘাবড়ে গেলুম৷ সত্যি কথা বললে ‘হ্যাঁ’ বলতে হয়৷ হ্যাঁ বললেই ব্যাপারটা অনেক দূর গড়াবে৷ জনার্দন নয়কে হয় করে ছাড়বে৷ প্রমাণ করবে আমার লোভ ছিল, সেই লোভ থেকেই আমার পাওয়ার ইচ্ছে হয়েছিল, সেই ইচ্ছে থেকেই কৌটোটা আমার হাতে এসেছিল৷ বাড়ির লোকে তো মানবেই৷ জনার্দনের কথা জজে পর্যন্ত মানবে৷ নানা ছোটখাটো ব্যাপারে আমার লোভ এবং সেই সংক্রান্ত পাপ কাজের কথা সকলেই জানে৷ দাগি আসামি হয়ে গেছি৷

জনার্দনের একপাশের গাল মুখে ঠুসে দেওয়া দু-খিলি পানে ফুলে আছে৷ সেই অবস্থায় বিশাল হাতাটা হাঁড়িতে ঢুকিয়ে ভাত নাড়তে-নাড়তে বলল, কৌটোটা বের করে দাও খোকাবাবু, তা না হলে মনে আছে তো সেই বটুয়া হারাবার কথা৷

সেই বটুয়া, আবার সেই বটুয়া৷ কতকাল আগের কথা৷ তখন তো আমি নাক-কান মলে সকলের সামনেই স্বীকার করেছিলুম আর অমন কাজ কখনও করব না৷ আবার সেই বটুয়ার কথা আসছে কী করে৷ যার যা কিছু হারাবে সবই কি আমার দোষ! বেশ মজা দেখছি৷

জনার্দনদা তুমি বিশ্বাস করো সত্যি আমি তোমার জরদার কৌটো নিইনি৷

নাওনি তো তুমি বাপু, চুপি-চুপি আমার পিছনে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কী দেখতে এসেছিলে শুনি৷ দেখছিলে আমি জানতে পেরেছি কি না! তাই না!

বাঃ, কী সুন্দর যুক্তি৷ উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে—এলুম একটু আমসত্ত্ব চুরি করতে আর পড়ে গেলুম জরদার কৌটো চুরির দায়ে!

ঠাকুর ঘর থেকে পুজো সেরে মা ততক্ষণে রান্নাঘরে নেমে এসেছেন৷ বিশটা লোকের রান্না, তায় রবিবার৷ বড় একটা রুই মাছ চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে৷ মানুষ কাটা যায় এরকম একটা বড় বঁটি মাছের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে৷ মোক্ষদা এলেই কাটাকুটি শুরু হয়ে যাবে৷ কোণের দিকে ঝাড় মতো একটা গাছ খাড়া দাঁড় করানো৷ কাটোয়ার ডেঙ্গো৷ তলায় বসে আছে প্রমাণ সাইজের আস্ত একটা কুমড়ো৷ রবিবারের বিশেষ খাওয়ার বিশেষ আয়োজন৷

মা জিগ্যেস করলেন, কী রে জনার্দন ভাত নেবে এসেছে!

কী করে নামবে মা?

কী করে নামবে কী রে? যেমন করে নামে৷

মুখে একটু জরদা না ঢোকালে হাঁড়িটা চাগাব কী করে!

তা মুখে একটু জরদা দে না বাবা, কে বারণ করেছে!

কৌটোটাই মেরে দিয়েছে, জরদা আর পাচ্ছি কোথায়?

কে মেরেছে?

কে আবার, যে আমার বটুয়া মেরেছিল৷ সেই খোকাবাবু৷

মা এবার আমাকে নিয়ে পড়লেন, দে না বাবা কৌটোটা বের করে৷ জরদা মুখে না দিলে জনার্দন হাঁড়ি নামাতে পারে না, জানিস-ই তো৷ ভাত গলে গেলে তোর বাবা আবার খেতে পারবে না৷ কুরুক্ষেত্র হয়ে যাবে৷

বিশ্বাস করো মা, আমি লুকিয়ে রাখিনি৷

সাতসকালে রান্নাঘরে ঢুকে ঘুর-ঘুর করছিস কেন? নিশ্চয়ই কিছু তালে আছিস—মা একটু রেগেই বললেন৷

আমি সত্যি কথাই বলছি মা, একটু আমসত্ত্ব চুরি করতে এসেছিলুম৷

আমসত্ত্ব! তোর জন্যে কি কিছুই রাখার উপায় নেই রে৷

চুরি করতে এসেছিলুম বলেছি, চুরি তো এখনও করিনি৷ সত্যি কথার কোনও দাম নেই দেখছি এ বাড়িতে৷

ওরে আমার সত্যবাদী যুধিষ্ঠির রে৷

তুমি জর্জ ওয়াশিংটনের নাম শুনেছ?

সে আবার কে? কোনও সাহেব বুঝি? ওসব সাহেব-টাহেবের নাম-টাম আমি শুনিনি৷ জানিও না৷ তার সঙ্গে আমাদের কী সম্পর্ক?

আছে-আছে৷

মা আমার কথায় কান না দিয়ে আঁচলের গেরো খুলে একটা টাকা বের করে জনার্দনের হাতে দিয়ে বললেন, পরে একটা কৌটো কিনে নিস বাবা এখন ভাতটা নামা৷—ছোঁ মেরে টাকাটা হাত থেকে নিতে জনার্দনের শরীরে যেন অসুরের বল এসে গেল৷ জয় জগরনাথন বলে, বিশাল হাঁড়িটা উনুন থেকে নামিয়ে নর্দমার কোণে নিয়ে গিয়ে দুম করে ফেলল৷

কম শয়তান নাকি৷ হাড়ে-হাড়ে চিনি আমি ওকে৷ জরদার কৌটোটা তোমার রোজ হারিয়ে যায় তাই না! জগতটাই স্বার্থপরের৷ আমি ঘুড়ি কেনার জন্যে চার আনা চাইলে মার হাত গলে পয়সা বেরোয় না৷ আর যেহেতু জনার্দন ভাতের প্যাঁচ মারতে পারে, আর অমনি পাখা মেলে মার আঁচল থেকে টাকা উড়ে আসে৷

শোনো মা৷

আমার এখন শোনার সময় নেই৷

শুনতে তোমাকে হবেই৷ জর্জ ওয়াশিংটনের গল্পটা আমি তোমাকে শোনাবই৷ শিশু ওয়াশিংটন বাবার ফুল বাগানে একদিন খোলা তলোয়ার হাতে ঘুরছে৷ এগাছে সেগাছে কোপ মেরে ধার পরীক্ষা করছে৷ বাগানের সবচেয়ে দামি গাছটা এই করে কচুকাটা হয়ে গেল৷ ওয়াশিংটনের বাবা তাঁর সাধের গাছের অবস্থা দেখে লাফিয়ে উঠলেন৷ কে করেছে এই সর্বনাশ? অপরাধীকে শাস্তি পেতে হবে৷ কোনও ক্ষমা নেই৷ সকলে ভয়ে তটস্থ৷ শিশু ওয়াশিংটন নির্ভয়ে এগিয়ে বললেন, আমি করেছি৷ তলোয়ারের ধার পরীক্ষা করেছি৷ ব্যস, সত্যবাদীর সাতখুন মাপ৷ একেই বলে সত্যবাদিতার পুরস্কার, বুজেছ মা৷

জীবনে ক’টা সত্যি কথা বলেছিস শুনি?

আমি সবসময় সত্যি কথাই বলার চেষ্টা করি, তোমরা ভাব মিথ্যে বলছি৷

কই বউমা আমার দুধটা—দাদু এসে রান্নাঘরে উঁকি মারলেন৷ পরনে ধবধবে কালো চওড়া পাড় ধুতি, গোলগলা বড় হাতা গেঞ্জি৷

আজ একটু দেরি হয়ে গেল বাবা—মা বেশ মোলায়েম করে উত্তর দিলেন৷

দাদুর আবার সবকিছু নিয়মে বাঁধা৷ এই বয়সেও চেহারা একেবারে সোজা সরল৷ টকটকে গায়ের রং৷ এখনও রোজ কোর্টে বেরোন৷ দাদু একটু হেসে বললেন তোমার তো মা কোনও দিন দেরি হয় না৷ বলেই জনার্দনকে উদ্দেশ্য করে বললেন,—কিরে জনারদন ভাত হৌচি৷ দাদু একটু ওড়িয়া ভাষা ছাড়লেন৷

মা প্যানে দুধ ঢালতে-ঢালতে বললেন, ওই যে শয়তানটার জন্যে আজ সব গন্ডগোল হয়ে গেল৷

মা সরাসরি আমাকে শয়তান বলায় মনটা আমার ভীষণ খারাপ হয়ে গেল৷

দাদু আমার একটা হাত শক্ত মুঠোয় ধরে বললেন, কী করেছিস রে ছোকরা?

কী আর করবে৷ পাকা চোর হয়ে উঠেছে৷—আমি কিছু বলার আগেই মা বলে উঠলেন৷

সে কি রে৷ এই বয়সেই পাকা চোর৷ আর একটু বড় হলে তো ডাকাতি করবি৷ তখন তো এই বুড়োটাকেই কোর্টে গিয়ে তোর জন্যে দাঁড়াতে হবে৷

ওর জন্যে দাঁড়াবেন না বাবা৷ কিছুদিন হাজতে পচলে যদি ওর শিক্ষা হয়৷—মা দুধ চাপাতে-চাপাতে কথাটা এমন ভাবে বললেন যেন সত্যি-সত্যিই আমি চুরি ছেড়ে ডাকাতি করব৷ অথচ আমি চোরও নই ডাকাতও নই৷

দাদু আঙুল দিয়ে আমার চিবুকটা উঁচু করে তুলে ধরে জিগ্যেস করলেন, কী চুরি করেছ ইয়ংম্যান?

উত্তরটা আমাকে আর দিতে হল না, মা বলে দিলেন জর্নাদনের জরদার কৌটো৷

জরদার কৌটো৷—দাদু হই-হই করে হেসে উঠলেন৷ এত মূল্যবান জিনিস থাকতে কি না জরদার কৌটো৷ তা দাদু তুমি একটু খেয়েছ নাকি?

আমি চুরি করিনি দাদু৷ ওর জরদার কৌটো রোজই হারায়৷ মার কাছ থেকে টাকা আদায়ের কৌশল৷

দাদু নাকটাকে মুখের কাছে এনে বললেন, একটু হাঁ করো তো৷

আমি হাঁ করে দাদুর নাকে একটু হাওয়া ছাড়লুম৷

দাদু নাকটাকে সরিয়ে নিয়ে বললেন, বাঃ চমৎকার গোলাপের গন্ধ৷ কতটা খেয়েছ দাদু৷ জরদায় যে মাথা ঘুরবে৷ ঘুরছে না?

আমি খাইনি তো ঘুরবে কী করে?

গোলাপের গন্ধটা তা হলে এল কী করে? দাদুর ওকালতি জেরা৷

এখন সত্যি কথা বলতে গেলে বলতে হয় মা’র বালিশের তলা থেকে কিছু পয়সা নিয়ে সাতসকালেই গোলাপি রেউড়ি খেয়ে বসে আছি৷ কিন্তু বললেই তো মা বলবেন, চোর৷ অথচ মার পয়সা তো ছেলেরই পয়সা৷ উত্তর না দিয়ে সুড়সুড় করে পড়ার ঘরের দিকে চলে যাওয়াই ভালো৷ যেতে-যেতে শুনলাম দাদু বলছেন, দুপুরে খাওয়ার পর আমাকে একটু ভাগ দিও দাদু৷

কীসের ভাগ?—বাবার গলা! ছাদের ঘর থেকে মুগুর ভেঁজে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন৷

সে আমাদের দাদু-নাতির ব্যাপার৷—দাদু বাবার রাগ জানতেন, তাই কথাটা চাপার চেষ্টা করলেন৷ কিন্তু বাবার কাছে অত সহজে কি কিছু চাপা যায়! পালটা প্রশ্ন করলেন, না-না, আমি অনেকক্ষণ ধরে ছাত থেকে শুনেছি রান্নাঘরে হই-হই হচ্ছে৷ তাছাড়া সাতসকালে পড়ুয়া ছেলে রান্নাঘরে ঘুর-ঘুর করছে কী কারণে?

দাদু বললেন, ওর একটু দুধ খাওয়ার ইচ্ছে হয়েছিল৷

দুধ! বাবা এবার হেসে উঠলেন, আজন্ম যার দুধের সঙ্গে অহি-নকুল সম্পর্ক সে আজ হঠাৎ সেধে দুধ খেতে এসেছে৷ আজকের বার আর সময়টা তা হলে লিখে রাখতে হচ্ছে৷—বাবা আর কথা না বাড়িয়ে নিজের কাজে চলে গেলেন৷

আমি আবার ফিরে এলুম আলেকজান্ডারের ক্যাম্পে৷ পুরু বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ পরাজিত হয়েও পরাজয় স্বীকার করছেন না৷

যাক পুরুকে বাগে আনা গেছে৷ রাজা রাজাকে সম্মান দিয়েছেন৷ পুরু ফিরে এসে চলেছেন মাথা উঁচু করে তাঁর নিজের শিবিরে৷ একটা ঝামেলা মিটল৷ সামনে এখন আর এক বিশাল ঝামেলা—সেই ফুটো চৌবাচ্চা৷ এক দিক দিয়ে যেই জল ঢুকছে আর এক দিক দিয়ে একটু-একটু করে বেরিয়ে যাচ্ছে৷ এই ফুটো চৌবাচ্চা ভরা কি মানুষের কম্ম৷ উপায় থাকলে সিমেন্ট দিয়ে একটা ফুটো বন্ধ করে দিতুম৷ মনে-মনে ভাবি৷ কিন্তু উপায় যখন নেই তখন ভরতি করতেই হবে৷ প্রাণটা আবার ব্যাকুল হয়ে উঠল৷ জিভে এখনই এই মুহূর্তে সুস্বাদু একটু কিছু দেওয়া দরকার৷ হয় চানাচুর না হয় মা’র ঘরের তাকের ওপরে তুলে রাখা চামচ খানেক ফাইন মোরব্বা৷ এই হৃদয়হীনদের বাড়িতে কিছুই জুটবে না জানি৷ সেই সাতসকালে লুচি আর আলু ভাজা দিয়ে গেছে পড়ার ঘরে৷ আবার যা কিছু জুটবে তা বেলা একটার সময়৷ আনারসের চাটনি হচ্ছে নাকি! মনে হল হচ্ছে৷ একবার খবরটা আনতে পারলে মনটা শান্ত হতো৷ যাওয়ার উপায় নেই৷ জনার্দনের জরদার কৌটোর নিকুচি করেছে৷ অঙ্কটার উত্তর মিলছে না৷ উদাহরণেও করে দেওয়া নেই৷ মাস্টারমশাই রোজই বলেন, আমার মতো ফাঁকিবাজ নাকি ভূ-ভারতে দ্বিতীয়টি জন্মায়নি৷ কিন্তু বাবা, অঙ্কর বই যাঁরা লিখেছেন৷ তাঁদের মতো ফাঁকিবাজ ক’জন আছেন৷ উদাহরণে সহজ অঙ্ক করে দেবেন একটা-দুটো, আর শক্তগুলো করব আমরা?

মনঃসংযোগ করার উপায় আছে! ফ্যাচ-ফ্যাচ শব্দ শুনেই বুঝেছি সামনের আকাশে উড়ছে বিপুলের ময়ূরপঙ্খী৷ ওড়াতে জানিস না, ওড়াতে যাস কেন? আমি চৌবাচ্চা ভরছি আর তুমি সামনের ছাদে ঘুড়ি ওড়াবে! এই হল জগতের নিয়ম৷ কেন? এত আইন হচ্ছে দেশে, এমন একটা আইন করা যায় না একই পাড়ায় সব ছেলে একইসঙ্গে পড়বে, একইসঙ্গে খেলবে৷ একজন পড়বে আর একজন চোখের সামনে লোভ দেখিয়ে ঘুড়ি ওড়াবে, এটা কী ধরনের ব্যাপার? এই তো এইখান থেকে চোখ তুলতেই দেখতে পাচ্ছি সামনের বাড়ির পার্থ এয়ারগান নিয়ে পাখি মারছে৷ ওই তো বাঁটুল পেয়ারা গাছের মগডালে উঠে ডাঁসা-ডাঁসা পেয়ারা চিবোচ্ছে৷ আমি কিছু করতে যাই, অমনি মা, বাবা, দাদু, জ্যাঠামশাই এমন কি জনার্দন পর্যন্ত হই-হই করে উঠবে—

ঘুড়ি! ঘুড়ি ওড়াবার সময় জীবনে অনেক পাবি৷ আগে লেখাপড়া শিখে বড় হ৷

গুলি! সেও তো সব মা’র বাক্সে চাবি বন্ধ৷ চাইলে বলবেন, বড় হ, পাশটাশ করে গুলি খেল না, কেউ বারণ করবে না৷ গল্পের বই নিয়ে বসলেই সবাই বলবে, পরে পড়ার অনেক সুযোগ পাবি এখন পড়ার বই পড়৷

বড় হয়ে বাবার মতো যখন গোঁফদাঁড়ি বেরোবে তখন যেন আমি ছাদে উঠে ক্যাচ-ক্যাচ করে ঘুড়ি ওড়াব, মাঠে গিয়ে গুলি নিয়ে গাব্বু পিল খেলব৷ সবাই স্বার্থপর৷ জগতটাই স্বার্থপরের জগৎ৷ মনটা এখন উদাস হয়ে গেল৷ আর কিছু করা যায় না এই মন নিয়ে৷ চৌবাচ্চার জল ঢুকুক আর বেরোক৷ আমার কিছু করার নেই এ মন নিয়ে৷ এখন একটু আমসত্ত্ব পেলে মন্দ হত না৷ কিন্তু রান্নাঘরে কড়া পাহারা৷

কখন যে দশটা বাজবে৷ নীল আকাশের দিকে তাকাতেই নজরে পড়ল৷ রামদার পায়রার ঝাঁক খুব উড়ছে৷ কালো পায়রাটা কি লাট খাচ্ছে৷

বাঃ বিপুলের ময়ূরপঙ্খীটা এবার বেশ উড়ছে তো! একি আমার কানে হাত দিচ্ছে কে! বড়-বড় লোমওলা হাত৷ ঘাড় ঘোরাতে পারছি না৷ আঃ, লাগছে যে৷

লাগবার জন্যেই তো৷ এই তোমার পড়া হচ্ছে বাঁদর৷—বাবার গলা৷

পড়ছিই তো৷ ইতিহাস পড়া শেষ৷ এই দেখো অঙ্ক করছি৷

বাবা কানটা বেশ করে পাকাতে-পাকাতে বললেন, সকাল থেকে কতবার ওঠা হয়েছে?

মাত্র একবার৷ জিগ্যেস করো মাকে৷

জনার্দনের জরদার কৌটো কে নিয়েছে?

আমি নিইনি৷ বিশ্বাস করো, জরদার কৌটো নিয়ে আমি কী করব?

কী করবে? আমার নস্যির কৌটো নিয়ে কী করেছিলে সেবার?

তখন ফাইনাল পরীক্ষা ছিল৷ পুলক বলেছিল একটু দিলে ঘুম ছেড়ে যাবে৷

এখন সেই পুলকই বলেছে একটু করে জরদা খেলে গোবর ভরতি এই মাথায় অঙ্ক-বুদ্ধি এসে যাবে৷ তাই না? কানটা ধরে মনের সুখে বাবা একটা ঝাঁকানি দিলেন৷ চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল৷

পুলকের সঙ্গে আমার তিন মাস আড়ি৷ সে কিছু বলেনি৷ জরদার কৌটো জানি না৷

তোমাকে আমি সার্চ করব৷

প্রথমে বুক পকেট—একগোছা জলছবি বেরোল৷

যত পয়সা নষ্ট৷ এত পয়সা পাচ্ছ কোথায়! কে দিচ্ছে শুনি?

এগুলো কেনা নয়৷ পরেশদা দিয়েছেন৷

বুঝেছি৷ এইবার সমস্ত বইয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে লাগাও৷ ব্যাড টেস্ট৷

বাবা জামার পাশ পকেট খুঁজলেন৷ আমার কোনও জামারই পাশ পকেট নেই৷ প্যান্টের একটা পকেটে হাত ঢোকাতে গেলেন৷ ঢুকবে কেন অতবড় হাত৷ পুরোনো প্যান্ট৷ পড়-পড় করে সেলাই ছিড়ল৷ বাবা তখন দুটো আঙুল কাঁচির মতো করে ঢোকালেন৷ বাঁ-পকেট থেকে একটা খাওয়া চকোলেটের কাগজ বেরুল৷

এটা কী? রোজ ক’টা করে চলছে? এইবারে দাঁতগুলো যাবে৷ ক্রিমি হবে৷ এই তো প্যাঁকাটির মতো চেহারা! কে তোমার এই সর্বনাশ করছে? এর একটা ব্যবস্থা করতে হবে৷

আর-একটা পকেট থেকে একটা খালি দেশলাইয়ের খোল বেরুল৷

এটা কী বস্তু? ও, সিগারেট ফোঁকা ধরেছ বুঝি? বাঃ এই তো চাই৷ উন্নতির শেষ সীমায় পৌঁছেছ৷ লায়েক হয়ে গেছ৷

আমি নানারকম দেশলাইয়ের খোল জমাচ্ছি, হবি৷

হবি! দেখি আমার নাকের কাছে হাঁ কর৷

হা করে হাওয়া ছাড়লুম৷

এই তো জরদার গন্ধ৷ ভর-ভর করে বেরোচ্ছে৷ ছিঃ-ছিঃ, একী অধঃপতন৷

ওটা জরদার গন্ধ নয়৷ গোলাপি রেউড়ির গন্ধ, সকালে খেয়েছিলুম৷

তোমার কোনও কথাই আমি বিশ্বাস করি না৷ যত বখা ছেলের সঙ্গে মিশে তুমি অধঃপাতে গেছো৷ এই পাড়া থেকে না সরাতে পারলে তুমি একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে৷ হায়-হায় বংশের একটি মাত্র ছেলে!

চেয়ার নয়, চৌকি নয় মেঝেতে মাথায় হাত দিয়ে বসে বাবা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলছেন, আর হায়-হায় করছেন৷ এমন সময় দাদু এলেন৷

এ কী, এভাবে বসে, কি হয়েছে কী? অঙ্ক পারেনি?

মাথাটা দু-হাত দিয়ে ধরা অবস্থাতেই বাবা বললেন, অঙ্ক না পারলে বুঝতুম একদিন পারবে৷ এ জন্মে না পারুক পরের জন্মে পারবে৷ অঙ্কের মাথা নিয়ে সবাই আসে না৷

তবে কী হয়েছে?

একেবারে উচ্ছন্নে গেছে৷ এই দেখুন পকেট থেকে বেরোল৷

দেশলাইয়ের খোলটা বাবা টুসকি মেরে সামনের মেঝেতে ছুঁড়ে দিলেন৷ দাদু নিচু হয়ে আশ্চর্য কিছু দেখছেন এইভাবে দেখে বললেন, দেশলাই৷ তারপর সোজা হয়ে বললেন, খালি না ভরতি?

খালি৷

খালি! থাক৷ খালি যখন ভয়ের কিছু নেই৷ অগ্নিকাণ্ডের সম্ভাবনা নেই৷

উত্তেজিত কণ্ঠে বাবা বললেন, বুঝছেন না কেন, সিগারেট খাওয়া ধরেছে৷ ডেইলি দশটা, বিশটা সিগারেট চলছে৷ ইয়ার বন্ধু জুটেছে বিস্তর৷ দেখেছেন এই বয়েসেই ঠোঁট দুটো ঝুল কালো৷

কিছু বলার নেই৷ লিভার খারাপ বলে বাবা নিজেই হোমিওপ্যাথিক ওষুধ দিচ্ছেন৷ আর একটা দেশলাই বেরোতেই সিগারেট খাওয়ার কথা এসে গেল কী করে?

দাদু বললেন, এ তো দেখছি তোমার হল গিয়ে রজ্জুতে সর্পভ্রম৷ একটা দেশলাইয়ের খোল সিগারেট খাওয়া প্রমাণ করে না৷ এ কথা কোনও জজে মানবে না৷ আমি আজ ফর্টি ইয়ার্স ওকালতি করছি৷

বাবা বসে-বসেই বললেন, জনার্দনের পুরো জরদার কৌটোটা সকালেই গিলে বসে আছে৷ তামাকে আর জরদায় চুর৷ দেখছেন না, একটু মাথা ঘুরছে না—পা টলছে না৷ তার মানে ভেতরে-ভেতরে কতদিনের অভ্যেস৷

দাদু বিরাট এক ঘর হাসি হেসে বললেন, আরে ওর মুখে গোলাপি রেউড়ির গন্ধ৷ তুমি দেখছি তিলকে তাল করছ৷ মেকিং মাউনটেন অফ এ হোল হিল৷ দাদু আমার দিকে ফিরে বললেন, যাও৷ তুমি এ ঘর থেকে যাও৷ তোমার রবিবারের ডিউটি শুরু করে দাও৷ ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন, বাবাকে তিনি ম্যানেজ করছেন৷ রবিবারের ডিউটি মানে ফেদার ডাস্টার দিয়ে দাদুর আইনের বইয়ের ধুলো ঝাড়া৷ পুরস্কার হল দুটো বড় তালশাঁস সন্দেশ৷ ধুলো ঝাড়ার সময় একটা সন্দেশ৷

খাওয়ার ঘরে পরপর আসন পড়েছে৷ বাবার উলটোদিকে আমি বসেছি৷ বাবার মুখ অসম্ভব গম্ভীর৷ জনার্দন হাতা-হাতা ভাত দিয়ে গেল, মা এলেন ঘিয়ের বাটি নিয়ে৷ ভাজা হয়েছে কয়েক রকম৷ দাদু বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার মেঘ দেখছি এখনও কাটেনি৷’ বাবা বললেন, ‘কিছু মেঘ আছে যা সহজে কাটে না৷ মাই ফিউচার ইজ ভেরি ডার্ক৷’

দাদু মুখে এক গাল ভাত তুলে নিয়ে বললেন, ‘বাঃ চমৎকার গন্ধ তো৷ বাসমতী দিয়েছে বুঝি এবার রেশনে! হ্যাঁ বউমা?’

মা বললেন, ‘না-না, এমনি সাধারণ চাল৷’

বাবা বললেন, ‘গন্ধটা কিন্তু ভালো৷’

দাদু আবার জনার্দনের রান্নার ভীষণ ভক্ত৷ বললেন, ‘এ জনার্দনের হাতের গুণ৷’

ভাতের ওপর হাতা-হাতা ডাল পড়ল৷ দাদু ভাত ভেঙে যেই ভাত মাখতে গেলেন, ভাতের পাহাড় থেকে চকমকে কী একটা তেড়েফুঁড়ে বেরিয়ে এল৷ একটা মাঝারি আকৃতির কৌটো দু-আঙুল দিয়ে তুলে ধরে দাদু বললেন, এটা কী রে? জাফরানি পাতি জরদা, উঁচু-উঁচু করে লেখা৷ এই তো জরদার কৌটো৷

বাবা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন৷

কৌটোটা দাদু দু-হাত দিয়ে খুলে ফেললেন৷ সিদ্ধ জরদার গন্ধে ঘর ভরে গেল৷ ভাতের গন্ধের রহস্য এবার ধরা পড়ল৷ দাদু ডাকলেন, ‘জনারদন অ৷’ জনার্দন মাছ নিয়ে ঢুকল৷

‘এটা কী দিয়েছিস ভাতে?’

জনার্দন অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল৷ তারপর পানের ছোপ লাগা দাঁত বের করে এক মুখ হেসে বলল, ‘আমার জরদার কৌটো বাবু৷ কোথায় ছিল?’

‘দূর ব্যাটা৷ জরদা ভাতে দিয়েছিস৷ ভূত কোথাকার৷ দাঁড়া একটু চেখে দেখি৷’ দাদু একটু মুখে দিলেন, ‘বাঃ, গ্র্যান্ড৷ তোর বুদ্ধি আছে রে জনার্দন৷ তুই রেশনের পচা চালকে বাসমতী করে ছেড়েছিস৷’ দাদু বাবার দিকে ফিরে বললেন, ‘দেখলে তো শুধু-শুধু ছেলেটার দোষ দিচ্ছিলে৷ জনার্দন ব্যাটা জরদা ভাতে দিয়ে বসে আছে৷ বুঝলি জনার্দন রোজ একটু করে জরদা ভাতে দিবি৷ তা হলেই রেশনের এই পচা গন্ধ চালও খাওয়া যাবে৷’

বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমাকে আমি সন্দেহ করেছিলুম৷ সকালে তোমাকে আমি অনেক হেনস্তা করেছি৷ আমি দুঃখিত৷ একসকিউজ মি৷’

খাওয়া শেষ হয়ে যেতে দাদু বললেন, ‘যাও হাত-মুখ ধুয়ে এসে বাবাকে প্রণাম করো৷’

আসন ছেড়ে উঠলুম৷ সমস্ত ঘরটা বোঁ করে ঘুরে গেল৷ মনে হল বাবা দাদু ঘুরে আমার জায়গায় চলে এসেছেন৷ তারপর আর মনে নেই৷ অস্পষ্ট শুনলুম, বহুদূর থেকে কে যেন বলছেন, ‘হাঁড়িটা বড় হলে কী হবে ডিবেটাও তো কম বড় নয়! তা অতটা জরদার রস মিশেছে ভাতের সঙ্গে, তাই মাথা ঘুরে গেছে৷’

আমার চিকিৎসা

মাথা ঘুরে চিৎপাত হয়ে আসনে পড়ে থাকলেও, আমাকে ঘিরে কী হচ্ছে সবই বুঝতে পারছি৷ বাবা মাকে বলছেন, ‘ওকে এক তোলা নুন খাইয়ে দাও, হুড়-হুড় করে সব বেরিয়ে যাক পেট থেকে৷ দোক্তার বিষ, সাংঘাতিক বিষ৷’ দাদু বললেন, ‘আরে না-না, তোমার যেমন চিকিৎসা! সব যদি বেরিয়েই গেল, বেচারা খেল কী করতে৷ ওকে বরং আর এক ডিশ আনারসের চাটনি দাও৷ মিষ্টিতে বিষটা কেটে গিয়ে বেশ একটা নেশামতো হবে, পড়ে-পড়ে ঘুমোক৷’

দাদুর দাওয়াই শুনে উঠে বসতে ইচ্ছে করছিল৷ ঘাড়টা একবার জোর করে তোলারও চেষ্টা করলুম৷ না ভীষণ ঘুরছে৷ জগৎ অন্ধকার৷ বাবা অত সহজ মানুষ নন, সঙ্গে-সঙ্গে প্রতিবাদ—‘বলেন কী, নেশা করবে! এই বয়েসে নেশা করলে, আরও একটু বড় হলে কী করবে৷ আরও বড় নেশা? তারপর এখনই তো ছিঁচকে চোর, এরপর ডাকাতি৷ না-না, নো আনারসের চাটনি, ওই নুনই হল বেস্ট মেডিসিন৷ গুলে ফেলো, গুলে ফেলো, আধ গেলাস জলে৷ দেরি করছ কেন?’

বাবা মাকে তাড়া লাগালেন৷ মা খুব ভয়ে-ভয়ে বলেন, ‘ওকে আর নাইবা কিছু দেওয়া হল, যেমন আছে ওইরকমই পড়ে থাক কিছুক্ষণ৷’

বাবা সঙ্গে-সঙ্গে প্রশ্ন করলে, ‘তুমি কার দলে?’

দাদু হাসতে-হাসতে বললেন, ‘এর মধ্যে তুমি আবার দলাদলি আনছ কেন? আমি তোমার চে বয়সে বড়৷ গুরুজনের কথাই তো বউমা শুনবে৷ দুজনে দুরকম বলছি, বেচারা উভয় সংকটে পড়েছে৷’

জনার্দন এতক্ষণ চুপ করেছিল৷ একপাশ থেকে এইবার তার গলা শোনা গেল, ‘খোকাবাবুকে আর দুটি ভাত মাছ মেখে খাইয়ে দিন মা সব চাপা পড়ে যাবে৷’

‘তুমি চুপ করো৷’ বাবা ধমকে উঠলেন৷

‘দাঁড়াও তোমার বিচার হবে৷’ উকিল দাদু শাসিয়ে দিলেন৷ জনার্দন চুপ মেরে গেল৷ বাবা বললেন, ‘আনারসের চাটনিতে কী উপকার হবে শুনি! খানিকটা চিনি, খানিকটা টক, তাতে দোক্তার কী হবে?’

দাদু আমার আইন কেটে জোড়া লাগান, কেমিস্ট্রিতেও যে তাঁর এত দখল জানা ছিল না! দাদু বললেন, টকটক মিষ্টি-মিষ্টি জিনিসটা পেটে গিয়ে বেশ খানিকটা অম্বল করে দেবে৷ অম্বল মানেই অ্যাসিড৷ সেই অ্যাসিড তাড়াতাড়ি সব হজম করে দেবে৷ আর হজম করার পরিশ্রমে ও ঘুমিয়ে পড়বে৷ তোমাকে কী বোঝাব বলো৷ তুমি তো নিজেই ডাকসাইটে কেমিস্ট৷’

বাবা কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলেন৷ তারপর বেশ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘মানতে পারলুম না৷ মানতে পারলুম না আপনার থিওরি৷’

‘না মানার কী আছে! তুমি কেমিস্ট, আমি ক্রিমিন্যাল ল ইয়ার৷ জীবনে ক’টা বিষ খাইয়ে খুনের কেস করেছি জানো! দোক্তাপাতার বিষ দিয়ে আফ্রিকায় মানুষ মারে৷ জানো তুমি! আমি সব জানি৷ বিষ কিসে নির্বিষ হয় তাও আমার জানা আছে হে৷’

বাবা আবার ভাবতে শুরু করলেন৷ এদিকে সেই মাথা ঘোরার মধ্যেও আমার প্রিয় আনারসের চাটনিটা এগিয়ে আসতে-আসতেও পেছিয়ে যাচ্ছে দেখে ভীষণ হতাশ লাগছে৷ বরাতে এক তোলা নুন জলই লেখা আছে৷ বাবা একবার যা বলেন তাকে না করানো ভীষণ শক্ত৷

বাবা বললেন, ‘দাঁড়ান হঠাৎ একটা কিছু দেওয়ার আগে আমাকে মেটিরিয়া মেডিকাটা একবার দেখতে দিন৷ বিষে-বিষে বিষক্ষয়৷ ওকে একটা বিষ জাতীয় কোনও জিনিস দিতে হবে কম ডোজে৷’

‘বেশ, তাহলে আমাকে একটু দেখতে হচ্ছে পয়েজন ম্যানুয়েলটা৷ আমিও সহজে তোমাকে ছাড়ছি না৷’ দাদুরও লড়াইয়ের ভাব৷ দুজনে মামলা লড়ে ফয়সালা হবে, তারপর আমার ভাগ্যে হয় আনারস, না হয় নুন, না হয় নিমপাতা কিংবা ক্যাস্টর অয়েল৷

বাবা চটি পায়ে ফটফট করে আগে বেরিয়ে গেলেন৷ দাদু শুঁড় তোলা বিদ্যাসাগরী পরে পিছনে-পিছনে৷ সকলে চলে যাওয়ার পর মা এগিয়ে এসে আমার মাথার কাছে বসে আস্তে-আস্তে ডাকলেন—‘খোকা?’

পিটপিট করে তাকালুম৷

‘কেমন আছিস এখন?’

‘ভালো৷ দেবে একটু আনারস৷’

মা তাড়াতাড়ি বললেন, ‘এখন কিচ্ছু না, চোখ বুজিয়ে পড়ে থাক৷ কর্তাদের ব্যবস্থাটা আগে দেখি৷ উঠলেই মার খেয়ে মরবি৷’

‘শোনো’৷

‘বল!’

‘নুন দিতে বললে তুমি চিনি দিও মা৷ তা না হলে, কষ্ট করে যা খেয়েছি সব বেরিয়ে যাবে৷’

‘সে দেখা যাবে৷ তুই যেমন আছিস তেমনি থাক৷ এঁটো হাতটা আসনে রেখেছ কেন মুখপোড়া৷ আসনটা এঁটো হচ্ছে না?’ হাত শুকিয়ে কড়কড় করছে৷ শুকনো পাতের কাছে বড়-বড় কালো-কালো ডেয়ো পিঁপড়ে ঘুরছে৷

‘পিঁপড়ে কামড়ে দেবে যে মা৷’

‘চুপ কর, চুপ কর, চোখ বুজো, ওঁরা আসছেন৷’

‘মনে রেখো মা, নুন নয় চিনি৷’

প্রথমে, বাবা ফিরে এলেন৷ তার মানে মেটিরিয়া মেডিকা দেখা হয়ে গেছে৷ খাওয়ার ঘরে ঢুকেই ধীর পায়ে কয়েকবার এদিক-ওদিক পায়চারি করলেন৷ তারপর দু-হাত পিছনে রেখে, সামনে ঝুঁকে, এক দৃষ্টিতে আমাকে দেখছিলেন৷ চোখটা একবার মাত্র অল্প একটু ফাঁক করে বাবাকে দেখে নিলুম৷ ভীষণ চিন্তিত মুখ৷ এ মুখ আমার চেনা, রাগের নয়, শাসনের নয়! উদ্বিগ্ন মুখ৷

শুয়ে আছি, একটু কাত হয়ে৷ মেঝের দিকের চোখটা মাঝে-মাঝে একটু ফাঁক করছিলুম৷ দাদুর বার্নিশ করা চটি এগিয়ে আসছে! পেছন থেকে বললেন, কী দেখেছ? বাবা সোজা হলেন৷ সোজা হয়ে দাদুর দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, হ্যানিমেন সাহেবের সেই এক কথা—সিমিলি সিমিলিবাস৷

সে আর নতুন কথা কী হে! আমাদের শাস্ত্র তো বহু আগেই বলে রেখেছে বিষে-বিষে বিষক্ষয়৷ কথায় তো আর কাজ হবে না হে, ছেলেটাকে তো আর ফেলে রাখা যায় না এইভাবে৷ ওই দেখো, মিটসেফের তলা থেকে লাখে-লাখে লাল পিঁপড়ে মার্চ করে আসছে৷ হাতে এঁটো লেগে আছে যে!

পিঁপড়ে তেড়ে আসছে শুনে, ভীষণ ভয় পেয়ে গেলুম৷ মনে হল উঠে এক দৌড় দি৷ উঠতে পারব মনে হয়৷ মাথা ঘোরাটা একটু কমেছে৷ কিন্তু উঠে পড়লেই ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে যাবে৷ হালকা হয়ে যাবে৷ বাবা যেই দেখবেন ঠিক হয়ে গেছি, সঙ্গে-সঙ্গে তিরিশটা অঙ্ক, এক প্যাসেজ টানম্লেশন, সাবস্ট্যানস, প্রেসি সব ধরিয়ে দেবেন৷ দুপুরটা গড়িয়ে-গড়িয়ে, মজা করে কাটাবার সুযোগ, হাতে এসেও হাতছাড়া হয়ে যাবে৷

বাবা কিছু বলার আগেই, দাদু বললেন, নাও ধরো, তুমি মাথাটা ধরো আমি পায়ের দিকটা ধরি, চ্যাঙদোলা করে বিছানায় নিয়ে গিয়ে ফেলি৷ তারপর তোমার সিমিলি সিমিলিবাস কী বলে শোনা যাবে!

বাবা বললেন, ওর মা থাকতে আমরা ধরব কেন, যার কাজ সেই এসে করুক৷

আমি জানি, বাবা ইচ্ছে করলে একাই আমার ঘাড়ের কাছটা দু-আঙুলে ধরে, বেড়াল ছানার মতো বিছানায় ছুড়ে ফেলে দিতে পারেন৷ বাবার সে শক্তি আছে৷ তবে ওই, বাবার সব নিয়মের ব্যাপার৷ যার যা কাজ তাকে তাই করতে হবে৷ মা’র কাজ ছেলেকে কোলে করে সেইরকম অবস্থায় বিছানায় নিয়ে যাওয়া৷ রাস্তাঘাটে হলে বাবা কি দাদু তুলতে পারেন৷ রান্নাঘরে নিয়মের ব্যতিক্রম চলবে না৷

দাদু বললেন, মেয়েদের তুমি খেতে দেবে না কি! সবে সবাই খেতে বসেছে৷

খেতে বসেছে! বাবা ভীষণ অবাক হয়ে দাদুর মুখের দিকে তাকালেন—বলেন কী! এতবড় একটা বিপদ, ছেলেকে ফেলে রেখে, মা বসে গেলেন খেতে! বাবার কথায় দাদু অবাক হলেন ঠিক বলেছ হে! খেতে বসবে কী করে! খেতে বসতে তো পারে না৷ কুপুত্র যদি বা হয়, কুমাতা কখনও নয়৷ নিশ্চয়ই খেতে বসেনি, ভুল বলেছি৷ একবার ডেকে দেখি, বউমা, বউমা৷

মা তো দরজার ওপাশেই ছিলেন৷ চাপা গলায় মিহি করে উত্তর দিলেন যাই বাবা!

দাদু বিজয়ীর মতো মুখ করে বললেন, দেখলে! আমি তোমাকে বলিনি! সব আছে৷ কেউ খেতে বসেনি৷ বসতে পারে না কি! ছেলেকে ফেলে রেখে মা কখনও খেতে পারে! তোমাকে দেখেই সব দরজার পাশে গিয়ে লুকিয়েছে৷

লুকিয়েছে মানে! আমি বাঘ না ভাল্লুক! না চোর-পুলিশ খেলা হচ্ছে?

বাবার কথা শুনে দাদু হো-হো করে হেসে উঠলেন—এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি এতবড় একটা সরকারি চাকরি করো কী করে? অ্যাঁ! বোকা উকিল তবু চলে যায়৷ জজসায়েবের দয়া হয়৷ আহা বুড়ো উকিল, শামলাটার রং চটে গেছে, মুখটা শুকিয়ে গেছে, কতদিন মক্কেল জোটেনি৷ যাও বা একটা পেয়েছে, দাও জিতিয়ে দাও৷

আপনার শামলার রং চটে গেছে? বাবা বিব্রত গলায় দাদুকে প্রশ্ন করলেন৷

আমার শামলার রং চটে যাবে কেন? ফাসক্লাস আছে৷ এই তো সেদিন তৈরি করালুম৷ ঝকঝক করছে কালো গ্যাবার্ডিন৷

তবে যে বললেন, রঙচটা শামলা৷ আপনি আমাকে বলেননি কেন! বগলে করে নিয়ে যান, বগলে করে নিয়ে আসেন৷ বুঝব কী করে! এসব মেয়েদের দেখা উচিত! আপনার বউমার উচিত ছিল...৷

আঃ তোমাকে নিয়ে তো মহাজ্বালা হল দেখছি৷ আমি বলছি এক তুমি মানে করছ আর এক৷ বলছি...৷

আপনি আর কী বলবেন, আমিই একটা অপদার্থ, আপনার কোনও কিছুরই খবর রাখি না, চাকরি,—চাকরি৷ ছি-ছি ভালো করে খাওয়াও হয় না৷ দুধ দেয় সকালে-রাতে!

দুধের কথা আবার কোথা থেকে এল?

দুধের কথা এল না? এই বললেন, জজসাহেব বলছেন মুখটা শুকিয়ে গেছে৷

কার মুখ শুকিয়ে গেছে! আমার!

আপনার ছাড়া আবার কার!

কী মুশকিল, হাতে পাঁজি মঙ্গলবার৷ তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, দেখো তো মুখটা শুকনো না গোল! জানো এই বয়সে আমি এখনও ব্যায়াম করি৷

শুধু ব্যায়াম করলেই হবে৷ ব্যায়ামের সঙ্গে খাদ্যও তো চাই৷

আর তো পারি না৷ দুজনেই আমার কথা ভুলে গেছেন৷ এদিকে সার-সার পিঁপড়ে আমার কানের একচুল দূর দিয়ে কুচকাওয়াজ করে খাদ্যের সন্ধানে চলেছে৷ উঠেই পড়ি, এইভাবে কতক্ষণ শুয়ে থাকা যায়৷ এরচে দুপুরের তিরিশটা অঙ্ক ঢের ভালো ব্যবস্থা! দেখা গেল, আমার চেয়ে আমার মার ধৈর্য অনেক কম৷ মা চুপ করে না থাকতে পেরে নিয়মভঙ্গ করে জিগ্যেস করলেন,—কী বলছিলেন বাবা?

দাদু বললেন—ও এসে গেছ! কখন এলে, খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেছে?

মা মৃদুস্বরে বললেন—না এখনও হয়নি৷

সে-একী৷ যাও-যাও খাওয়া-দাওয়া করে নাও৷ চা খাওয়ার সময় হয়ে গেল যে!

বাবা বললেন—ওই করে-করেই তো লিভারটা গেছে৷

মা বললেন, কী করে খেতে বসি ছেলেটা ওইভাবে পড়ে আছে৷

মার কথা শুনে বাবা আর দাদু দু-জনেই লাফিয়ে উঠলেন, দেখেছ? ছি-ছি-ছি-ছি৷ চলো-চলো, খোকার তুমি মাথার দিকটা ধরো৷ তোমার আর পায়ের দিকটা ধরে কাজ নেই৷ ব্যাটা রোজ রাত্তিরে পাশে শুয়ে-শুয়ে অনবরত কিক করে আর গোল-গোল বলে চিৎকার করে৷ পায়ে ধরে দেখি বুড়োটাকে যদি বল আর না ভাবে৷

মা বললেন, না-না আমিই কোলে করে নিয়ে যাচ্ছি৷

না-না বউমা, তোমার ক্ষমতায় কুলোবে না, ব্যাটা দেখতে-দেখতে লম্বা হয়ে গেছে কতটা দেখেছ৷ তোমাকেও ছাড়িয়ে গেছে৷ এই ছেলেটাই দেখছি আমাদের বংশের ধারা রাখবে৷ তুমি তো আর পারলে না৷

বাবার এমনি দুর্দান্ত স্বাস্থ্য, কেবল উচ্চতাটাই একটু কম৷ দাদু নিজে ছ’ফুটের কাছাকাছি, জ্যাঠামশাইও পাঁচ ফুট ন’ইঞ্চির কম ছিলেন না৷ বড় জ্যাঠামশাইকে দেখিনি, তবে শুনেছি দৈত্যের মতো ছিলেন৷ দাদুর কথার অমান্য হবে না৷ মা আর আমাকে তোলার চেষ্টা করলেন না৷ বাবা ধরলেন ঘাড়ের তলা, দাদু ধরলেন দুটো ঠ্যাং৷ আমি বেশ দোলায় চেপে চলেছি৷ হাত দুটো দুদিকে দোল-দোল করে দুলছে৷ খাওয়ার ঘর থেকে বেরোবার মুখে দরজার পাশে একটা ডিসের ওপর একমুঠো ভিজে কিশমিশ৷ ডানদিকেই যখন, ডান হাতের নাগালের মধ্যে রয়েছে, হাতের সূক্ষ্ম কাজ, হাতকেই করতে দেওয়া উচিত৷ যে ক’টা পারলুম তুলে নিয়ে মুঠোয় ধরে রাখলুম৷ বড় প্রাণের জিনিস৷ চাইলে যখন পাওয়া যায় না, তখন পেয়ে কেন ছেড়ে দি৷ বাবা প্রথমে বাবার ঘরেই ঢুকতে যাচ্ছিলেন৷ বাবার ইচ্ছেতে তো আর গাড়ি চলছে না৷ গাড়ির ড্রাইভার দুজন৷ আমি এখন দু-চাকার গাড়ি৷ দাদুর হাতে স্টিয়ারিং৷ আমি পায়ের দিকে চলেছি৷ দাদু মোড় না ঘুরে সোজা এগিয়ে চললেন৷ বুঝলুম এ গাড়ি দাদুর বিছানায় গ্যারেজ হবে!

দাদুর ঘরে ঢুকতেই নাকে পোড়া চুরুটের গন্ধ লাগল৷ দাদু ভীষণ চুরুট খান৷ হাতে মোটা পার্কার কলম৷ সামনে মোটা-মোটা আইনের বই, পাশে-পাশে ভাঁজ করা-করা কোর্টের কাগজ, চোখে ঝকঝকে পুরু লেনসের চশমা, মুখে ইয়া মোটা চুরুট৷ টেবল ল্যাম্পের আলোয় ঘাড় নিচু করে দাদু বসে থাকেন৷ মাথার চারপাশে ধোঁয়ার মেঘ৷ বাবা ঘরে ঢুকেই বললেন ঘরটা বড় অস্বাস্থ্যকর হয়ে আছে৷ দোক্তা-পোড়া দোক্তা-পোড়া গন্ধ বেরোচ্ছে৷ দাঁড়ান একটা-দুটো জানলা খুলেদি৷

দাঁড়াও, দাঁড়াও, এখুনি ছেড়ে দিও না, পড়ে গিয়ে ছেলেটার মাথা ফেটে যাবে যে৷ আগে বিছানায় বাঁদরটাকে ফেলি৷

বাবাকে বিশ্বাস নেই৷ জানলা খুলতে হবে বলে মাথার দিকটা ছেড়ে দিয়ে দৌড়লেই হল৷ বাবা বললেন—সে তো বটেই, বিছানায় আগে বোঝাটা নামাই৷ বাবা নামাতে যাচ্ছিলেন, দাদু হাঁ-হাঁ করে উঠলেন কী যে করো, উত্তরদিকে মাথা করতে আছে? ঘুরে যাও, ঘুরে যাও, অ্যা, এইবার ঠিক হয়েছে৷ ধপাস করে ফেলে দিও না, আস্তে-আস্তে নামাও৷

বিছানা তো! নরম বিছানা, লাগবে কেন? স্প্রিং টিং নষ্ট হয়ে তুলোটুলো বেরিয়ে গেছে নাকি? আপনার দোষ কী জানেন, কিছুতেই কিছু বলতে চান না৷ যাক আগে আমি মাথার দিকটা রাখব, না আপনি আপনার পায়ের দিকটা রাখবেন?

দুজনে একই সঙ্গে রাখব৷ কেন জানো? বলো তো কেন? খুব তো বড় বৈজ্ঞানিক?

ওর কোনও কেন নেই, বিজ্ঞানও নেই৷ সবেতেই বিজ্ঞান থাকে না কি?

এ তুমি কী বললে হে! তাহলে তো সেই আপেল পড়ার গল্পটা বলতে হয়৷ কত লোকের সামনেই তো গাছ থেকে আপেল পড়েছে৷ সামান্য ব্যাপার৷ প্রশ্ন করলেই তোমার মতো বলত, ওতে আবার বিজ্ঞানের কী আছে! কিন্তু নিউটন? হি ওয়াজ দ্য ওনলি ম্যান! কত বড় একটা আবিষ্কার ভাব তো? আচ্ছা আগে এটাকে রাখি৷ ধীরে-ধীরে এইভাবে, এই ভাবে অ্যা-অ্যা এই, এই ব্যস৷

সেই পি. সি. সরকারের ম্যাজিকের মেয়েটার মতো৷ কাঠের মতো শূন্যে ভাসতে-ভাসতে নেমে এলুম সোজা বিছানায়৷ বিছানায় নামিয়ে দিয়েই বাবা প্রশ্ন করলেন, কী বিজ্ঞান আছে এর মধ্যে! এটা তো আর আপেল নয়৷ ল অফ গ্র্যাভিটেশন তো নতুন করে আবিষ্কার করা যাবে না৷

তুমি ফিজিক্সের লাইনে চিন্তা করছ, আমি করছি ফিজিওলজির লাইনে, শরীরতত্ত্বের লাইনে৷ এই দেখো!

চোখ পিট-পিট করে আড়চোখে দেখার চেষ্টা করলুম৷ বিজ্ঞানটা আমারও জানা দরকার৷

দাঁড়াও আমার ওয়াকিং স্টিকটা আবার কোথায় রাখলুম৷ বেড়িয়ে এসে আলমারির পাশেই তো ঝুলিয়ে রাখি৷ দেখি আলনায় রেখেছি কি না৷ না নেই তো! চেয়ারের পিছনে! না খাটের ছতরিতে! না৷ কোথায় গেল বলো তো? ছড়ি দিয়ে দাদু বাবাকে কি বিজ্ঞান বোঝাবেন? হি-হি করে হাসতে ইচ্ছে করছে৷ প্যাটাপ্যাট করে বাবাকে পেটাবেন নাকি! পড়া পারেননি৷ হাসিটা কষ্ট করে চেপে রাখলুম৷ পেটে একটা ঢেউ খেলে গিয়ে কোঁক, কোঁত করে শব্দ হল৷ বাবা ভেন্টিলেটারের দিকে তাকিয়ে বললেন—সবক’টাকে বোজাতে হবে৷ পাখির বাসা হয়ে বসে আছে৷

সে তুমি বোজাও, কিন্তু ছড়িটা! তুমি আর কী বুঝবে বলো বৃদ্ধের নড়ি কৃপণের কড়ি৷

বাবা নিচু হয়ে খাটের তলাটা দেখতে-দেখতে বললেন, গঙ্গার ঘাটে ফেলে আসেননি তো?

সেখানে ফেলে আসব কেন? সকালে তো আমি হরিশঙ্করদের বাড়িতে গিয়েছিলুম! ছড়িটা গঙ্গার ধারে যাবে কী করে?

বাবা উঠে দাঁড়ালেন—তাই বলুন৷ এতক্ষণ বলেননি কেন? ওই হরিকাকার বাড়িতেই ফেলে এসেছেন৷ আমি চোখ বুজিয়েই দেখতে পাচ্ছি হরিকাকার বাইরের ঘরে সেই উঁচু কালো চেয়ারটার পেছনে ছড়িটা দুলছে৷

চোখ বুজিয়ে দেখতে পাচ্ছ? হরিকে তুমি এতই বেহিসেবী ভাব, কাণ্ডজ্ঞানশূন্য ভাব! ও আমার কত বছরের মক্কেল জানো? লাস্ট টোয়েন্টি ইয়ারস আমি ওর জন্যে ফাইট করছি! লোয়ার কোর্ট থেকে কেস হাইকোর্টে এসেছে, এরপর সুপ্রিম কোর্টে যাবে৷ আমারও জেদ চেপে গেছে৷ ওই নারকোল গাছ আমি হরিকে লড়ে এনে দোবোই৷ সেই হরির ওখানে ছড়ি ফেলে এলে এতক্ষণ আমাকে ফেরত পাঠাত না ভাবো?

হরিকাকার কাণ্ডজ্ঞানের কথা আর বলবেন না৷ কাণ্ডজ্ঞান থাকলে একটা নারকোল গাছ নিয়ে কেউ বছরের পর বছর কেস চালায়, এত টাকা খরচ করে?

দাদু আলমারির পিছন দিকে উঁকি মেরে দেখতে-দেখতে বললেন—নাঃ বয়েসটা সত্যিই বেড়েছে হে৷ গত শীতে গলাবন্ধটা ট্রামে হারিয়ে এলুম৷ ছাতাটা ওষুধের দোকানে ফেলে এলুম, আর পেলুম না৷ তুষার বললে, কাউন্টারের ওদিকে ফেলে গেছেন, কী করব বলুন, কে হাতে করে তুলে নিয়ে চলে গেছে! আজ হারালুম ছড়িটা৷ তোমারই কাজ বাড়ল৷

ছড়ি একটা কেন, একশোটা আমি তৈরি করে দোবো৷ এবারে করে দোবো চেরিগাছের ছড়ি৷ কিন্তু ছড়ি দিয়ে আপনি কী বিজ্ঞান বোঝাবেন!

দাদু টেবিলের ওপর থেকে কালো রঙের গোল রুলারটা তুলে নিলেন—ঠিক আছে ছড়ি না পাই এইটা দিয়ে তোমাকে বোঝাই৷

পিটির-পিটির করে দেখছি দাদুর কায়দা৷ দাদু জানলার দিকে পিছন করে দাঁড়িয়ে আছেন৷ বাবা আমার দিকে পিছন ফিরে দাদুর দিকে তাকিয়ে আছেন৷ দাদু রুলারটাকে মেঝের সঙ্গে সমান্তরাল করে বলেন—এই দেখো, মনে করো খোকা এইভাবে আছে৷ মেরুদণ্ডটা মেঝের সঙ্গে সমান্তরাল৷ মনে করো এই দিকটা মাথা, ও দিকটা পা৷ এখন এই পুরো জিনিসটা সোজা এইভাবে না নামালে কী হতে পারে! ধরো মাথাটা একটু বেশি ঝুলে গেল, খ্যাট করে ঘাড়ে খটকা, ডিসলোকেশনও হয়ে যেতে পারে৷ ধরো কোমরের দিকটা একটু বেশি ঝুলে গেল, খট করে কোমরে খটকা স্পাইন্যাল কর্ড ড্যামেজও হয়ে যেতে পারে৷ মানুষের শরীর নিয়ে ছেলেখেলা চলে না৷ বাচ্চা ছেলে! কত সাবধান হতে হবে৷

আমি পুরো মানতে রাজি নই৷ এই তো সেদিন ব্যায়াম সমিতিতে জিমন্যাসটিকস দেখতে গেলুম৷ আপনি তো সভাপতি হয়েছিলেন৷ দেখেছেন তো শরীরকে কীভাবে দোমড়াচ্ছে৷ আর্চ হচ্ছে, পিকক হচ্ছে, সমারসল্ট খাচ্ছে৷ কারুর কিছু হতে দেখলেন?

এই নাও! ওতো ট্রেনিং রে বাবা! ট্রেনিং-এ কি না হয়! বিষ্টু ঘোষ তো বুকে হাতি তোলে, তা বলে তুমি তুলতে পারবে! তুমি তো পাঁচশো ডন মারো, মুগুর ভাঁজো! শক্তি তো তোমার কম নয়, হাতির দরকার নেই—তুমি ওই সিন্দুকটা বুকে নিয়ে, বেশি না এক সেকেন্ড শুয়ে থাক তো দেখি৷ ওই তো আমাদের বক্সার গোবর্ধন, ধাঁই-ধাঁই করে নাকে ঘুসি খায়, তোমার নাকে একটা টুসকি মারি তো, নাকের জলে চোখের জলে হয়ে যাবে!

বেশ, এটা আমি মেনে নিলুম৷ তা ওকে ওই দিকে পা করে শোয়ালে কী ক্ষতি হত৷ বালিশগুলো তো ওই দিকেই ছিল৷ মাথার বালিশে মাথাটা রেখে দিলেই তো হত৷ ঘুরে যেতে বললেন কেন?

ওটা কোন দিক!

বাবা একটু বিপদে পড়লেন৷ জামগাছের দিকটা কোন দিক? বাবা বললেন, দাঁড়ান, ওই জানলার দিকে সূর্য ওঠে, তাহলে ওটা পুব৷ পুবের দিকে মুখ করে দাঁড়াই, হাত দুটো দুপাশে তুলি, পিছনটা পশ্চিম, বাঁ-হাতের দিকটা উত্তর, ডান হাতের দিকটা দক্ষিণ৷ ইয়েস দ্যাট ইজ উত্তর! উত্তর দিক৷

বারকয়েক উত্তর দিক, উত্তর দিক বলে থেমে পড়েছেন৷ দাদু হাসছেন৷ হাসির শব্দটা ভারি মিষ্টি৷ চোখ দুটো পিটপিট করে দুজনে কী অবস্থায় আছেন একবার দেখে নিলুম৷ দু-হাত কোমরে রেখে বাবা আছেন দাঁড়িয়ে, দাদু একটা ভাঁজ করা তোয়ালে দিয়ে ঠোঁটের ওপর ঝুলে থাকা গোঁফ সোজা করছেন৷ এক ঝলকের দেখা৷ এর চে বেশি দেখতে গেলেই ধরা পড়ে যাবো৷ দাদুর ছড়িটা যে পেয়ারা গাছের নিচু ডালে ঝুলছে সেটা এখন নয় পরে বলব৷ বাবা বললেন,—লেগে গেল৷

কী লেগে গেল বলো তো?

তোয়ালের একটা সাদা সুতো গোঁফে জড়িয়ে গেছে৷

তাই বলি কেমন যেন হাঁচি-হাঁচি পাচ্ছে৷ সর্দি হওয়ার তো কথা নয়, জীবনে ক’বার হয়েছে...দাদু ভ্যাঁচ করে হাঁচলেন৷...কবার হয়েছে৷ আবার ভ্যাঁচ...গুনে৷ আবার ভ্যাঁচ...গুনে বলতে৷ আবার ভ্যাঁচ৷

বাবা বললেন—দাঁড়ান-দাঁড়ান, সুতোটা এমন জায়গায় আছে যেন নাকে কাঠি দিচ্ছে, আমি আগে সরিয়ে দি৷ কীভাবে জড়িয়েছে, গুটিয়ে পাকিয়ে বসে আছে৷ ওই জন্যে আমি গোঁফের বালাই রাখিনি৷ সব সাফ৷

দাদু বললেন—কী যে বলো, গোঁফ ছাড়া পুরুষ মানুষকে কেমন যেন মেয়ে-মেয়ে লাগে৷ তোমার তো এক সময় একটা বাটারফ্লাই ছিল, ছিল না? সেটা গেল কোথায়?

ওই তো লাস্ট জুনে উড়িয়ে দিলুম৷ প্রথমত তাড়াতাড়ির সময় হিসেবে ঠিক থাকত না, এপাশ-ওপাশ ছোট হয়ে যেত৷

তার মানে বাটারফ্লাইয়ের দুটো ডানা ছোটবড় হয়ে যেত৷ জানি৷ যাবেই, স্বাধীন প্রফেসান কিংবা ডিকটেটার ছাড়া ও গোঁফের হিসেব রাখা ভেরি ডিফিকাল্ট৷ অত সময় কোথা! দেখলে না লাস্ট হিটলারের সঙ্গে-সঙ্গেই ও গোঁফ অদৃশ্য হয়ে গেল৷ মনে পড়ে ছেলেবেলায় তোমাকে আমি বারবার বলতুম...

কী বলতেন?

আমাদের বংশে কেউ কখনও পরের দাসত্ব করেনি, সব স্বাধীন জীবিকা, সময়ের রাজা, তুমিও নিজেকে সেইভাবে তৈরি করো৷ শুনলে না৷ সেই চাকরির দিকেই...ভ্যাঁচ৷

দাদু আবার হাঁচলেন৷

বাবা বললেন—এটা মনে হয় সর্দির হাঁচি৷ সুতোটা তো ফেলেই দিলুম৷

না হে না৷ সর্দি হতে যাবে কোন দুঃখে৷ রোজ ভোরে সূর্য ওঠার আগে আমি ঠান্ডা জলে স্নান করি৷ শাস্ত্র মেনে চললে শরীর খারাপ হয় না, হতে পারে না৷ হিমালয়ের মুনিঋষিদের সর্দি হয়েছে কোনওদিন শুনেছ কি? মহাভারত-রামায়ণে কোথাও পড়েছ কি?

আজ্ঞে জগন্নাথদেবের কিন্তু জ্বর হয়েছিল৷

আহা জগন্নাথদেব তো ভগবান হে৷ ভগবানের নানারকম লীলা থাকে৷ তুমি সব গোলমাল করে ফেলছ৷

ভ্যাঁচ৷ দাদু আবার হাঁচলেন৷

বাবা বললেন—এই সিজন চেঞ্জের সময়, ভোরে চান আপনার আর চলবে না৷ এ হাঁচিটা আপনার সর্দিরই৷

কিছুতেই না৷ এ কি সাপের হাঁচি পেয়েছ যে বেদেয় চিনবে! এ হল মানুষের হাঁচি—ভ্যাঁচ৷ দাদু আবার হাঁচলেন, হেঁচে বললেন—আচ্ছা জরদা খেলে কি হাঁচি হয়, তোমার জানা আছে?

আজ্ঞে না৷ হাঁচতে তো দেখিনি তবে নতুন-নতুন খেলে হেঁচকি উঠতে দেখেছি৷

হেঁচকি? ওই, হেঁচকি আর হাঁচি একই জিনিস৷ মুখ দিয়ে না বেরিয়ে নাক দিয়ে বেরোচ্ছে৷ দাঁড়াও এক গেলাস জল খাই সব ঠিক হয়ে যাবে৷

সে কী? এখনও এক ঘণ্টা হল না, জল খাবেন কী!

তাও তো বটে, ক’মিনিট বাকি আছে খাওয়ার পর একঘণ্টা হতে? ভ্যাঁচ৷

এ সর্দি ছাড়া কিছু হতেই পারে না৷ সিওর সর্দি৷ অ্যালার্জি, আপনার তোয়ালেতে অ্যালার্জি আছে৷

কী যে বলো, রোজ তোয়ালে দিয়ে মুখ মুচছি কিচ্ছু হল না, হঠাৎ আজ কেন হবে৷ না বাপু মানতে পারলুম না৷

তাহলে সর্দি৷ ভোরবেলা ঠান্ডা জলে চান আর চলবে না৷ করতে হয় গরম জলে করবেন৷ আপনার বউমাকে বলব শেষ রাতে উঠে গরম জল করে দিতে৷

কেন আমার মাকে মারবে! বেচারা সারাদিন খেটে-খেটে জেরবার৷ বিশ্রাম বলতে ওই তো রাতের একটু ঘুম, সেটাও কেন কেড়ে নেবে?

তাহলে আমি করে দেব৷

তোমারও তো বিশ্রাম দরকার৷ ভ্যাঁচ৷ বেশ বুঝলুম দাদু হাঁচিটা চাপবার চেষ্টা করেছিলেন, যেমন আমি বাবার সামনে করি৷ চাপা হাঁচি যখন বেরোয় বিকট শব্দে বেরোয়৷ তা না হলে দাদুর হাঁচি কাশির মতোই মিষ্টি৷ বাবা বললেন,—এবার আপনার কথা আমি মানতে পারলুম না৷ বিশ্রাম হল আপেক্ষিক জিনিস৷ জানেন, গান্ধীজি মাত্র দু-ঘণ্টা ঘুমোতেন৷ নেপোলিয়ানের সারাটা জীবনই তো কেটে গেল ঘোড়ার পিঠে৷ বিশ্রাম হল মনের চাহিদা৷ মনের নির্দেশে চললে কেউ সুপারম্যান হতে পারে না? জানেন, রোজ সকালে আমি একশোবার মুগুর ভাঁজি৷

আরে সে তুমি আমাকে কী বলবে? আমি রোজ সকালে দশ মাইল হাঁটি৷ দেখবে-দেখবে আমার ফিজিক্যাল ফিটনেস৷ দাঁড়াও দেখাচ্ছি৷ ভ্যাঁচ৷

পাছে বাবা আবার হাঁচি সম্পর্কে কিছু বলে ওঠেন, এই ভেবে দাদু বললেন,—এ হাঁচিটা এমনি হল৷ দেখলে না আগের হাঁচিটার চেয়ে অনেক কম জোর৷ মনে হয় ভেতরে কোথাও আটকে ছিল৷ এতক্ষণে খোলসা হল৷

বাবা একটু শব্দ করে হাসলেন৷ হাসি শুনেই মনে হল, দাদুর কথা আদৌ বিশ্বাস করেনি৷ ঠিক তাই৷ বাবা বললেন—এ হাঁচিটাও ওই এক সিরিজেরই হাঁচি৷ এটাকে আমি ফাউ বলে মেনে নিতে পারছি না৷ সর্দি হয়েছে৷ ওষুধ খেতে হবে৷ প্রথম দিন চান বন্ধ, তারপর কাঁচাপাকা জলে চান৷ প্রথম দিন ভাত বন্ধ৷ শুকনো দিতে হবে৷ তারপর দেখতে হবে একাদশী অমাবস্যা পড়ছে কিনা৷ যদি পড়ে তদ্দিন শুকনো টেনে যেতে হবে৷ আমি চোখ দুটোকে বেশ কায়দা করে পিটপিট চেয়ে দেখে নিলুম দাদুর মুখের অবস্থা৷ মুখটা বেশ করুণ হয়ে গেছে৷ দাদু হাত নেড়ে বললেন,—তুমি কি আমাকে জোর করে রুগি বানাতে চাও? আর তিনদিন পরেই একাদশী৷ তার মানে তিনদিন আমার ভাত বন্ধ৷ হোয়াট ডু ইউ মিন৷ ইজ ইট অ্যান আইডিয়াল ডাক্তারি?

অফ কোর্স! আপনি তো বলতেন—এ স্টিচ ইন টাইম সেভস নাইন৷ সময়ে একটি সেলাই ন’টি সেলাই বাঁচায়৷

আরে, এ তো বেশ মজা৷ ছিঁড়লই না তুমি সেলাই চালাতে চাও৷

দাদুর কথা শেষ হতে-না-হতেই, আমি বিকট শব্দে হেঁচে ফেললুম৷ একেবারে আচমকা৷ চাপবারও সুযোগ পেলুম না৷ বাবা সঙ্গে-সঙ্গে দাদুর দিক থেকে আমার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন,—এই তো৷ উঠে পড়ো, উঠে পড়ো৷ অত জোরে হাঁচতে যখন পেরেছ, ঝেড়েঝুড়ে উঠতেও পারবে৷ শুয়ে-শুয়ে আর তোমাকে খেলা দেখাতে হবে না৷ গেট আপ, গেট আপ৷

কাঁহাতক চোখ বুজিয়ে পিটির-পিটির করে তাকানো যায়৷ একভাবে মড়ার মতো কাঠ হয়ে পড়ে থাকাই বা যায় কতক্ষণ৷ দাদুর ঘরে আবার ছোট-ছোট মশা হয়েছে৷ তখন থেকে পায়ে কামড়াচ্ছে৷ কানের কাছে প্যান-প্যান করছে৷ এর চে চোদ্দোটা সরল করা কি চৌবাচ্চার অঙ্ক কষা ঢের সহজ৷

দাদুও মাথার দিকে এসে দাঁড়িয়েছেন৷

ও বাবা, ড্যাব-ড্যাব করে চেয়ে আছে৷ কী দাদু কেমন আছ এখন৷

দাদু একটা চোখ একটু ছোট করে বুজিয়ে দিলেন, বলো এখনও ভীষণ দুর্বল লাগছে৷ মাথা ঘুরছে৷

মাথাটা ভোঁ-ভোঁ করছে দাদু৷

করবেই তো দাদু৷ জনার্দনের বুনো জরদা, শুয়ে থাকো, শুয়ে থাকো৷ এখন নো নড়াচড়া৷ বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন,—বুঝলে এইবার বুঝেছি, জরদা ইজ দ্য কজ৷ সর্দি নয়, জরদা অ্যালার্জি হয়ে গেল৷ প্রথমে আমার হাঁচি, তারপর দেখ ওর হাঁচি৷

আমার তাহলে হল না কেন?

তুমি হলে গিয়ে অ্যান্টি অ্যালার্জিক৷ জরদায় তোমার যেমন অ্যালার্জি নেই তেমনি তোমার আবার ডাস্ট অ্যালার্জি৷ নাকে ধুলো গেলেই তুমি কাত৷

তাহলে আপনি বলছেন, ও এখন শুয়েই থাকবে৷ দুপুরটা মাটি৷ না একটু ট্রানস্লশন, না অঙ্ক৷

আঃ তোমার বুঝলে সব ভালো, তোমার ওই আয়রন ডিসিপ্লিনটা মাঝেমধ্যে তোমাকে কেমন যেন হৃদয়হীন করে ফেলে৷ একেই তো ওকে শোয়ানো কার বাপের সাধ্য৷ সেই শুয়েই যখন পড়েছে থাক না একটু শুয়ে৷ একটু ঘুমোক৷ বিকেলের দিকে মুখটা একটু ট্যাঁপোর টোপোর হবে৷

তাই হোক৷ আমি তাহলে আপনার চেয়ারের হাতলটা মেরামত করে ফেলি৷

কোন চেয়ারটা?

ওই যে, যেটাকে সেদিন ওই বাবু পিছন দিকে ওলটাতে-ওলটাতে চেয়ারসুদ্ধ ডিগবাজি খেয়ে হাতলটিকে চেয়ার ছাড়া করেছেন৷ এই বয়েসের যে ক’টা ছেলে দেখলুম সবক’টার মধ্যেই মানুষের ভাগ এক আনা, পনেরো আনাই হনুমান৷

হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলেছ ঠিক৷ সবক’টা রামের বাহন৷ নিজেদের বাড়িটাকে ভাবে লঙ্কা৷ একটু যদি অযোধ্যা ভাবতে শিখত! তা তুমিও একটু বিশ্রাম করে নাও না বাপু৷ ও তোমার চেয়ার সারাই পরে হবে৷

কাজই আমার বিশ্রাম৷ মক্কেলদের সামনে হাতল ভাঙা চেয়ারে বসেন, আই ডোন্ট লাইক ইট৷ এটা কি সরকারি অফিস?

বাবা আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে বললেন,—শোবে শোও, মাইন্ড ইট রাত আটটার মধ্যে আমার সমস্ত হোম-টাস্ক চাই৷ ছেলেদের ব্যাপার আমি জানি, গিভ দেম অ্যান ইঞ্চ, এক ইঞ্চি দাও সঙ্গে সঙ্গে এক বিঘা চাইবে৷

আমার ড্যাবরা-ড্যাবরা চোখের সামনে দিয়ে বাবা গটগট করে বেরিয়ে গেলেন৷

দাদু কিছুক্ষণ আমাদের ঝুল বারান্দাটার দিকে উদাস চোখে তাকিয়ে রইলেন৷ ইজিচেয়ারটা একপাশে দুটো পা ছড়িয়ে পড়ে আছে৷ একটা চড়াই পাখি ইজিচেয়ারের ঝুল কাপড়ে পিড়িক-পিড়িক করে নাচানাচি করছে৷ পাশেই একটা টুলে সেদিনের খবরের কাগজটা হাওয়ায় অল্প-অল্প উড়ছে৷ আস্তে করে ডাকলুম, দাদু৷

দাদু ফিরে তাকালেন৷ কেমন যেন মনমরা৷

কী হল দাদু? বাবা তো আপনাকে বকেননি৷ একটু জোরে কথা বলেছেন৷ বাবা তো জোরেই কথা বলেন৷

সে জন্যে নয় রে দাদু৷ সে জন্যে নয়৷ হঠাৎ মনে হল বয়েসটা সত্যিই বেড়ে গেছে৷ হু-হু করে বুড়ো হয়ে যাচ্ছি৷ প্রদীপের তেল ফুরিয়ে আসছে দাদু৷ একদিন দপ করে নিভে যাবে৷ মাঝে-মাঝে ভাবি, হয়তো দেখে যেতে পারব তুইও তোর বাবার মতো বড় হয়েছিস, ডাক্তার কি ইঞ্জিনিয়ার হয়েছিস৷ তা কি হয় রে বুড়ো? সব কি আর দেখে যাওয়া যায়!

না আর শুয়ে থাকা যায় না৷ উঠে বসতে হল৷ গলার কাছটা কেমন করছে৷ দাদু নেই৷ এ যেন ভাবা যায় না৷ এইবার দাদুকে একটু বকে দিতে হচ্ছে—কী হচ্ছে দাদু এইবার৷ এ সব আপনার কী কথা৷ কই আগে তো কখনও বলতেন না৷ আমি শুনব না, শুনব না...৷

নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলুম না৷ আমি কেঁদে ফেলেছি৷

দুপুরবেলা জনার্দনের ভোঁস-ভোঁস করে খানিকটা ঘুম চাইই চাই৷ মা অত করে বলেছেন, দেখো জনার্দন বিছানা বালিশ একটু পরিষ্কার রাখার চেষ্টা কোরো৷ মাঝে-মাঝে একটু কাচাকাচির ব্যবস্থা করতে পারো তো৷ কে কার কথা শোনে৷ মাথায় জবজবে করে তেল মাখবে৷ বালিশের অবস্থাও সেইরকম৷ তেলচিটে৷ চিমটি কাটলে ময়লা উঠে আসে৷

মাকে আমি বারবার বলেছি, দেখো মা, জনার্দনদা ঠিক আমার বইয়ের আলমারির কাছে চিৎপাত হয়ে শুয়ে থাকে, আমার বইটই নিতে ভীষণ অসুবিধে হয়৷ কেন জানি না, মা বোধহয় আমার চে জনার্দনকেই বেশি ভালোবাসে৷ ভালোবাসবেই তো৷ ভালোমন্দ নানারকম রেঁধে-টেঁধে খাওয়ায়৷ উঠতে-বসতে মা-মা করে৷ ভোরবেলা রোজ কোথা থেকে সাজি-সাজি ফুল পেড়ে এনে দেয়৷ বেশি আদর তো হবেই৷ আমি চুরি করে গুড় খাই, মাঝে-মাঝে মা’র কথা শুনি না, তর্ক করি৷ মা বললে, সেই জরদার কৌটোর ব্যাপারের পর থেকেই তুই জনার্দনের পেছনে লেগে আছিস৷ বেচারা সারাদিন খুব খাটে, যদি তোর আলমারির কাছে হাওয়ায় একটু শুয়েই থাকে, তাতে তোর গা জ্বলে যায় কেন?

মা না বুঝলে কী করে বোঝাব৷ আমার মা’র এমনি সব ভালো, কেবল একটু অবুঝ৷ মাথায় নিজের মতো কিছু একটা ঢুকলে, ব্যস হয়ে গেল, সেটা আর সহজে বেরোবে না৷ যেমন মা’র ধারণা তিমির ডিম হয়৷ বই খুলে দেখালুম, না মা তিমির বাচ্চা হয়, এই দেখো৷ মা বললে, রেখে দে তোর বই৷ মাছের আবার বাচ্চা হয় নাকি?

আমার সেই অবুঝ মাকে কিছুতেই বোঝাতে পারি না, বারে-বারে জনার্দনকে ডিঙিয়ে-ডিঙিয়ে আলমারি থেকে আমার বই নিতে ভীষণ অসুবিধে হয়৷ একে আমি ছোট, তুমিই বলো চার ফুট একটা মানুষ ছ’ফুট উঁচু তাক থেকে কত অসুবিধে করে বই নামাই৷

মা বললেন, হিংসুটে অমানুষরা ওই কথাই বলে থাকে৷ আসলে সারা দুপুর আড্ডা মারার তাল৷ পড়ার ইচ্ছে থাকলে আগেই তো বইটই বের করে নিতে পারিস৷

মা’র সঙ্গে ঝগড়া তর্ক করতে চাই না৷ বইয়ে পড়েছি, জননী জন্মভুমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী৷ দুপুরবেলা কি একটু শান্তিতে বসার উপায় আছে! ইশকুলে ছুটি তো কী হয়েছে৷ বিশটা অঙ্ক, এক প্যাসেজ ট্রানস্লেশন৷ দু-পাতা হাতের লেখা৷ ছ’টা প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ৷ সাবসটেনস, প্রেসি৷ একটা যদি না করেছ, মার হবে না ঠিকই৷ বাবা মারের পক্ষপাতী নন৷ মেরে কিছু হয় না, মার ঘ্যাঁচড়া হয়ে যায়৷ কথা বন্ধ৷ বয়কট করো৷ অন্ধকার ভবিষ্যতের ছবি আঁকো৷ ও ছেলে আর কী করবে, রিকশা টানবে, চায়ের দোকানের বয় হবে৷ দোরে-দোরে ভিক্ষে করবে৷ লেখাপড়া শিখেই চাকরি পাচ্ছে না, মুখ্যুর কী হবে জলের মতো পরিষ্কার৷

ইস, নীল আকাশে নারকেল গাছের মাথার ওপর বিশুর চাঁদিয়ালটা কীরকম লাট খাচ্ছে! আর ছাদের সিঁড়িতে আমার ময়ূরপঙ্খী নেতিয়ে পড়ে আছে৷ আমিও কি এখুনি পারি না চড়চড় করে বেড়ে গিয়ে বিশুর চাঁদিয়ালের বারোটা বাজিয়ে দিতে৷ ঠিকই পারি৷ কিন্তু আমার বিশটা অঙ্ক কে কষে দেবে৷ বাবা বললেন, এখন ওসব নয়৷ পড়ার বয়েসে চেপে পড়ে যাও৷ পাশটাশ করো, ঘুড়ি ওড়াবার, ড্যাঙগুলি খেলার অনেক সময় পাবে৷ হ্যাঁ, বাবার মতো যখন আমার গোঁফ-দাড়ি বেরিয়ে যাবে তখন আমি অপিস কামাই করে ছাদে উঠে ভো-মারা করব৷ মাঠে গিয়ে ড্যাঙগুলি পেটাব৷ গুরুজনের কথা শুনতেই হবে৷ অমান্য করলেই বখাটে-বদমাইশ৷

অনুবাদের প্রথম লাইনটাই মারাত্মক৷ তার মাথার গোলমাল৷ তার ইংরেজি হল হিজ৷ মাথা হল হেড৷ তাহলে হিজ হেড৷ হয় গোলমাল৷ হয় হল ইজ৷ হিজ হেড ইজ৷ মরেছে, গোলমালের ইংরেজি কী? গোলমাল তো নয়েজ৷ এ গোলমাল তো সে গোলমাল নয়৷ ছিটিয়াল? না ওভাবে হবে না৷ করতে হবে এইভাবে—তার মাথায় ছিট আছে৷ হি হ্যাজ ছিট ইন হিজ হেড৷ ছিটের ইংরেজি কী? ছিট মানে তো কাপড় নয়৷ হি হ্যাজ ক্লথ ইন হিজ হেড৷ এই যদি লিখি বাবা রাস্তা থেকে লোক ধরে এনে ডেকে-ডেকে দেখাবেন৷ দেখে যাও, দেখে যাও, বাহবা বাহবা!

সুবল মিত্তিরের বেঙ্গলি টু ইংলিশ ডিকশনারিটা পেড়ে আনি৷ যদিও অভিধান দেখে অনুবাদ করা বারণ৷ বাবা জানতে পারলে খাতা ছুড়ে ফেলে দেবেন৷ জনার্দন বোধহয় ওই জন্যেই আলমারি আটকে শুয়ে থাকে৷ বাবার গুপ্তচর৷ সব কথা বাবাকে বলা চাই৷ ছোটবাবু, খোকা আজ এই করেছে৷ ওই করেছে৷ পাশের বাড়ির টিনের চালে ঢিল মেরেছে৷ কেন ঢিল মারব না? পাশের বাড়িতে তিরিক্ষি মেজাজের এক বুড়ি থাকে৷ ছাদে কিছু পড়লেই অ্যায়সা গালাগাল দেয়৷ মজা লাগে৷

ডিকশনারিটা রয়েছে একেবারে সেই ওপরের তাকে৷ জনার্দন ঘুমুচ্ছে চিত হয়ে হাঁ করে৷ মাথাটা আলমারির দিকে৷ মাথার কাছে পানের বটুয়া৷ বাবুর পান ছাড়া এক মুহূর্ত চলে না৷ দাঁতের অবস্থা দেখো! খোলা গা৷ পৈতেটা জীবনে কাচে না৷ ডিঙি মেরে ডিকশনারিটা ধরেছি৷ যেমনি মোটা তেমনি ভারী৷ টেনে বের করেছি ঠিকই৷ এইবার নামাতে হবে৷ জনার্দন যদি একবার দেখতে পায় আমি তার মুখের ওপর দু-পাশে পা রেখে ফাঁক হয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমার পিণ্ডি চটকে দেবে৷ ভাগ্য ভালো একবার ঘুমোলে সহজে জাগে না৷

ভাগ্যটা বেশিক্ষণ ভালো রইল না৷ ডিকশনারিটা হাত ফসকে ওই অত উঁচু থেকে সোজা জনার্দনের বুকের উপর পড়ল৷ মাঝে-মাঝে হাঁপানিতে ভোগে৷ বাবার কাছে তখন হোমিওপ্যাথির ওষুধ খায়৷ বইটা সপাটে পড়তেই জনার্দন কোঁক করে একটা শব্দ করে উঠে বসল৷ ব্যস, আর দম নিতে পারে না৷ মুখ-চোখ লাল৷ কী রে বাবা, মরে যাবে নাকি? মাকে ডাকি৷ দক্ষিণের ঘরে মা সবে শুয়েছেন৷ শোওয়ার আগে শাসিয়েছেন, চুরি করে আচার খাবে না৷

ও মা, জনার্দনদার দম আটকে গেছে৷ বইটা আমি সঙ্গে-সঙ্গে সরিয়ে নিয়েছি৷ মা ঘুম চোখে বললেন, বুকের ওপর থেকে ওর হাত দুটো সরিয়ে দে৷

হাত তো সরানোই আছে৷ ও উঠে বসে আছে৷

মা বললেন, ধরে শুইয়ে দে৷ পাশ ফিরে শুতে বল৷

তুমি দেখবে এসো না৷ ও বোধহয় মরে যাবে মা৷ আমি ভয়ে কেঁদে ফেলেছি৷ মা তাড়াতাড়ি উঠে এলেন৷ জনার্দন তখনও একইভাবে বসে আছে৷ শ্বাস নেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করছে৷ ওঃ সুবল মিত্তিরের ক্ষমতা আছে! এক ডিকশনারিতেই একটা লোক মরমর৷ জনার্দন মারা গেলে আমার ফাঁসি হয়ে যাবে৷ ছোট বলে ছেড়ে দেবে নাকি!

আমার চেঁচামেচি শুনে মাকে সেই উঠে আসতে হল৷ জনার্দনের দম আটকে গেছে৷ চোখ-মুখ জবাফুলের মতো লাল৷ এক সময় রঙটা বেশ ফরসাই ছিল৷ এখন সারাদিন উনুনের কাছে থেকে-থেকে একটু কালচে মেরে গেছে৷ মা এসেই আমার ওপর তেড়িয়া,—কী করেছিস ওকে? নাকে কাঠি ঢুকিয়েছিস?

কাঠি? কী আশ্চর্য! কাঠি ঢোকাতে যাব কেন?

আশ্চর্যের কিছু নেই, তুমি সব পারো৷ নস্যি গুঁজেছিস?

নস্যি! নস্যি আমি পাব কোথায়?

তোমার সন্ধানে সব থাকে৷ সেদিন গুনছুঁচ দিয়ে ওর কান বিঁধোতে গিয়েছিলিস, মনে আছে!

সে আলাদা ব্যাপার৷ কানে রুপোর মাকড়ি পরার সখ হয়েছিল৷ জনার্দনদাই তো আমাকে বলেছিলেন৷ তাই ঘুমন্ত অবস্থায় উপকার করতে গিয়েছিলুম৷

আজকে কী উপকার করতে গিয়ে এই অবস্থা করেছ শুনি!

আমি সবসময় সত্যি কথাই বলি, কিন্তু কেউ বিশ্বাস করে না৷ সবার আগে অবিশ্বাস করে মা৷

ওর বুকে ডিকশনারি পড়ে গেছে মা৷ ধড়াম করে ডিকশনারি৷

সে আবার কী?

অভিধান গো, অভিধান৷ সুবল মিত্তির পড়ে গেছে ওই শেলফের ওপর থেকে৷

কী করে পড়ল!

হাত থেকে সিলিপ করে৷

বই কি সাবান নাকি? সিলিপ করে পড়ে গেল!

উঁচুতে ছিল, তেমনি ভারী, হাত ফসকে দুম৷

মা আমার দিকে কটমট করে তাকালেন৷ বুঝলুম সন্ধেটা আমার হয়ে গেল৷ কথাটা বাবার কানে উঠবেই৷ তারপর যা-যা হওয়ার, তাই হবে একে-একে৷ কেউ আমাকে বাঁচাতে পারবে না৷ দাদু হয়তো চেষ্টা করবেন৷ তা করলেও বরাতে আজ দুঃখ আছে, গভীর দুঃখ৷

মা জনার্দনকে শুইয়ে দিলেন৷ বুকে হাত ডলে দিচ্ছেন৷ জনার্দন যেন মায়ের আর এক ছেলে৷ চুড়ির শব্দ হচ্ছে কিনকিন করে৷ মনে হল আমারও তো কিছু কর্তব্য আছে৷ মাকে সাহায্য করলে অপরাধটা হয়তো কিছু কমতে পারে!

জল আনব মা, এক গেলাস জল৷

থাক খুব হয়েছে, তোমাকে কিছু আর করতে হবে না, দয়া করে নিজের কাজে যাও৷ সারাটা দুপুর একটা-না-একটা অপকম্ম৷ স্কুলগুলো কেন যে বন্ধ হয়!

যত দোষ আমার৷ যত দোষ স্কুলের! তবু জনার্দন সেই বইয়ের আলমারির কাছেই শোবে৷ তাকে সরানো যাবে না৷ একেই বলে কাজির বিচার৷ ব্লটিং পেপার পুড়িয়ে নাকের কাছে ধোঁয়া দোব!

কেন ওর ফিট হয়েছে! দেখছিস না দম আটকে গেছে৷

দম আটকায় কেন মা?

তুই এখান থেকে যাবি?

জনার্দনের দম খুলতে-খুলতে মা এক ধমক লাগালেন৷ আমিও সহজে ছাড়ার পাত্র নই৷ সহজে দমে গেলে চলবে না৷ সেদিন হেডস্যার ক্লাসে বলেছিলেন, বিপদে মোরে রক্ষা কর এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়৷

বাবার বাক্স থেকে এক পুরিয়া হোমিওপ্যাথিক ওষুধ আনব মা৷

মায়ের মুখ দেখে মনে হল, এবার আর কথা নয় ধোলাই হবে৷ ঠিক আছে বাবা, ভালো করতে গেলে মন্দ হয়৷ বাবার ঘরে ঢুকে নিজেই এক চামচে মিল্ক সুগার আর দু-তিন রকম ওষুধের গুলি একসঙ্গে মিশিয়ে খেয়ে ফেললুম৷ জনার্দন না খাক নিজেকে খাওয়াতে দোষ কী!

এখন আর বাড়িতে কারুর তেমন অসুখ-বিসুখ হচ্ছে না৷ মা’র মাথা ধরছে না, ফ্যাঁচ-ফ্যাঁচ করে সর্দির হাঁচি হচ্ছে না৷ অনেকদিন আমার পেট খারাপ হয়নি৷ গবাদা মারা যাওয়ার পর থেকেই তেলেভাজার দোকান বন্ধ৷ কোথায় পাব ইয়া বড়-বড় সাইজের গোটা-গোটা ডালের বড়া, টেনিস বলের সাইজের ফুলুরি৷ কামড়ালেই ধোঁয়া৷ ভেতরে গায়ে-গায়ে লেগে থাকা কাঁচা লঙ্কার টুকরো৷ মুখে গরমের ভাপ, কাঁচা লঙ্কার হুহা ঝাল৷ আমার পয়সা থাকলে গবাদার জন্যে একটা স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করিয়ে দিতুম৷ জনার্দনও মানুষ, গবাদাও মানুষ ছিলেন৷ দুজনে কত তফাত! গবাদার হাতের ঘুগনি, গামাখা শুকনো আলুর দম৷ পারবে জনার্দন, অমন টেস্ট করতে? জনার্দন কেবল গোলমাল পাকাতেই পারে, আর পারে হাপরের মতো হাঁপাতে৷

কিন্তু এখন কী হবে! লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু৷ মিল্ক সুগারের শিশিটা সাংঘাতিক খালি করে ফেলেছি৷ বাবা দেখলেই ধরে ফেলবেন৷ বলা যায় না, আজ রাতেই হয়তো দাদুকে ওষুধ দেওয়ার ভীষণ ইচ্ছে হবে৷ তখন শুরু হয়ে যাবে আমার বিচার৷ একটা নয়, তিন-তিনটে অপরাধ! প্রথম, ডিকশনারি দেখা, সেটা আবার স্প্লিপ করে জনার্দনকে আধমরা করে দিয়েছে৷ নিশ্চয়ই মাকে আজ রাঁধতে হবে৷ শেষ অপরাধ, চুরি করে ওষুধ খাওয়া৷ এর সঙ্গে যোগ হবে, অঙ্ক ভুল, অনুবাদ ভুল, প্রশ্নোত্তরে বানান ভুল, কমা, ফুলস্টপের গোলযোগ৷

মিল্ক সুগারটাকে বাড়াতে হবে৷ যেভাবেই হোক বাড়াতে হবে৷ হে মা! বুদ্ধি দাও৷ এ মা নয়৷ এ মায়ের তেমন বুদ্ধি নেই৷ ওই মা৷ সবার ওপরের মা৷ ছবির মা৷ কী ভেজালে মিল্ক সুগার বাড়ে৷ পেয়েছি, পা গিয়া৷ অ্যারারুট৷ রান্নাঘরে, মিটসেফে অ্যারারুট আছে৷ কী বরাত! মিটসেফের তালায় চাবিটা ঝুলছে৷ মা আঁচলে বাঁধতে ভুলে গেছে৷ মা, এভরি ডে তোমার কেন এমন ভুল হয় না! এদিকে বলো ভুলো মন৷ কোথায় কী রাখি আজকাল আর কিছুই মনে থাকে না৷ মিটসেফে চাবি লাগাতে কিন্তু ঠিক মনে থাকে৷ ভগবান তুমি আছ৷ এখনও আছ৷ গড হ্যাজ৷ কেবল মাঝে-মাঝে থাক না, যেমন অঙ্ক পরীক্ষার দিন, তুমি হাওয়া খেতে চলে যাও৷

ও গড! রস বড়া৷ আহা টাপুর-টুপুর হয়ে রসে ফুলে আছে৷ মা আসার আগেই গোটা দুই সাফ করে দি৷ এখনও ভার হয়ে আছে৷ তা হলেও স্টক করে রাখি৷ একটু পরেই তো খিদে পেয়ে যাবে৷ এইবার অ্যারারুট৷ কোনও একটা কৌটোয় থাকবে৷ মনে হয় এই কৌটোটাই হবে৷ সাদা-সাদা গুঁড়ো লেগে আছে৷ আর বেশিক্ষণ মিটসেফের সামনে থাকা ঠিক হবে না৷ ধরা পড়ে যাব৷ কৌটোটা নিয়ে পালাই৷ মায়ের গলা পাচ্ছি—কী জনার্দন, একটু ঠিক হল! কেমন লাগছে এখন! জল খাবে! জনার্দন জল খাবে৷ জনার্দন জরদা খাবে৷ জনার্দন চিৎপাত হয়ে সন্ধে পর্যন্ত শুয়ে থাকবে৷ বুকে বই পড়ে যত না লেগেছে তার চেয়ে অনেক বেশি লাগার ভান করবে৷ বাবা অফিস থেকে এসে দাঁড়াতে-না-দাঁড়াতে মা’র রিপোর্ট হবে৷ আমার ডাক পড়বে৷ উত্তম-মধ্যম হবে৷ এ সব না হলে জনার্দন জন্মেছে কেন?

যাক সে যখন হবে তখন হবে, এখন একটা দিক সামলাই৷ অয়েল পেপারে অ্যারারুট ঢালি, যেটুকু মিল্ক সুগার পড়ে আছে লোভ সামলে না খেয়ে সেটুক অ্যারারুটের সঙ্গে মেশাই, মিশিয়ে শিশিতে ভরে রাখি৷ দাদু প্রায়ই বলেন, বুদ্ধির্যস্য বলং তস্য৷

এখানে চটচট করছে কী? পায়ে লাগছে চ্যাটচেটে৷ খোকা তুই মিটসেফ খুলেছিলি৷ খোকা!

মরেছে, দু-চার ফোঁটা রসবড়ার রস হয়তো মেঝেতে পড়ে গেছে মুখে পোরার সময়৷ চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে পড়তে থাকি যেন শুনতে পাচ্ছি না মা’য়ের গলা৷

—অমাবস্যার রাত্রে পরিষ্কার আকাশের দিকে তাকালে অজস্র জ্যোতিষ্ক দেখা যায়৷ অ্যঁা-অ্যঁা—অজস্র জ্যোতিষ্ক দেখা যায়৷ যেগুলি মিটমিট করে, যেগুলি মিটমিট করে, যেগুলি মিটমিট করে...৷

খোকা আ-আ—

না আর না শুনে উপায় নেই৷ ‘যাই মা৷’

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে৷ সেই তারাটা পশ্চিম আকাশে মন্দিরের মাথায় জ্বলজ্বল করছে৷ আজ আমার খুব হবে৷ কেউ বাঁচাতে পারবে না৷ দাদুও না৷ কী করে পারবেন৷ বারোটা অঙ্কের মধ্যে ছ’টাই পারিনি৷ তিনটে ট্রানস্লেশন পারিনি৷ চুরি করে দশটা রসবড়া খেয়ে ফেলেছি৷ মা ধরে ফেলেছেন৷ জনার্দন এক কাপ গরম দুধ খেয়ে সন্ধে থেকেই চিৎপাত হয় পড়ে আছে৷ মা রান্নাঘরে৷ মেজাজ সপ্তমে চড়ে আছে৷ কেরোসিনের টিন খালি৷ উনুন ধরাতে জীবন বেরিয়ে গেছে৷ আজ যে আমার কী হবে! দাদু কোর্ট থেকে ফিরে এলেন৷ বেশ খুশ মেজাজ৷ একটা অনেক দিনের ঘুচুং-ঘুচুং কেসে আজ জিতে এসেছেন৷ কেসটা খুব মজার৷ একটা নারকেল গাছ নিয়ে দু-পক্ষের লড়াই৷ দাদুর মুখেই শোনা কোথাকার কোন গ্রামের দিকের ব্যাপার৷ দু-ভাইয়ের লড়াই? মাঠের সীমানায় একটা নারকেল গাছ৷ এ বলে আমার ও বলে আমার৷ মারদাঙ্গা৷ শেষমেশ কোর্টকাছারি৷ আপিল হাইকোর্ট৷ বিশ বছরের মামলার ফয়সালা হল এতদিনে৷ ছোট ভাই জিতলেন৷ গাছটা অবশ্য গতবছর বাজে পুড়ে মরে গেছে৷ দাদু বললেন, ‘মামলা হল রোকের ব্যাপার, জেদাজেদির ব্যাপার, সম্মানের ব্যাপার৷ ও গাছ রইল কি গেল দেখার দরকার নেই৷ লাভ হল কি লোকসান হল তাও নয়৷ হারজিতের খেলা৷’

দাদুর হাতে খাবারের ঠোঙা? চ্যাঙারিটা মা’র হাতে দিতে-দিতে দাদু বললেন, ‘বউমা, বড্ড লোভ হল৷ সামলাতে পারলুম না৷ কিনে ফেললুম খাস্তা কচৌরি৷ আহা কী মোলায়েম চেহারা৷ শুধু কষ্ট করে জিভে ফেলে রাখ আপনি মিলিয়ে যাবে৷ চোখ বুজিয়ে গোটা পাঁচেক মেরে দাও তারপর আমার মা’র হাতের এক কাপ চা, গোম মেরে বসে থাকো, মনের মধ্যে গান শুনতে পাবে৷’

মা বললে, ‘তারপর যখন পেট খারাপ হবে?’ ‘ও পুকুরপানি!’ দাদু অদ্ভুত-অদ্ভুত সব কথা বলেন, কচুরিকে কচৌরি, রুটিকে চপেটি, পেট খারাপকে পুকুরপানি৷

‘আরে পুকুরপানি হলে বেলের মোরব্বা আছে৷ গোটা আষ্টেক চাকা মুখে ফেলে দাও৷ পেট একেবারে দম মেরে যাবে৷’

চ্যাঙারিটা দেখেই আমি ঘেষটে-ঘেষটে কাছে চলে এসেছিলুম৷ গরম খাস্তা কচুরির কী সুন্দর গন্ধ৷ জিভে জল এসে যাচ্ছে৷ সঙ্গে নিশ্চয় হিং দেওয়া তরকারি আছে৷ দাদু আবার তরকারি দিয়ে খাস্তা কচুরি খেতে ভালোবাসেন৷ একেবারে পাতার তলায় টক-মিষ্টি চাটনি৷

‘আমি রেখে আসব মা?’

‘আজ্ঞে না৷ তোমাকে আর দয়া করে রেখে আসতে হবে না৷ তোমাকে আমার হাড়ে-হাড়ে জানা হয়ে গেছে৷ স্বভাব চরিত্র, দোষ গুণ৷ এখান থেকে এখন সরে পড়ো৷ তোমার মতো চোর পাশে-পাশে ঘুর-ঘুর করলে ভয় হয়৷’

দাদু মোড়ায় বসে জুতোর ফিতে খুলছিলেন৷ মা’র দিকে তাকিয়ে হাসতে-হাসতে বললেন, ‘দোষ নেই৷ কিস্যু দোষ নেই ও ব্যাটার৷ গন্ধ যা ছাড়ছে না, তুমিই হয়তো এখুনি টপাটপ গোটাকতক মুখে ফেলে দেবে৷ আমার নিজেরই মনে হচ্ছে চোখ বুজিয়ে হাঁ করি আর তুমি আমার মুখে একটা ফেলে দাও৷’

বাবা ওকে আপনি একদম আস্কারা দেবেন না৷ সারাদিন ওর উৎপাতে বাড়িতে টেঁকা যায় না৷’

অ্যায় শুরু হল৷ এইবার একে-একে একটু-একটু করে ঘুরতে-ফিরতে আমি যা করেছি, আমি যা করিনি সব বলা হবে৷ বড়দের সংসারে ছোটদের যেন কোনও বন্ধু নেই৷

দাদু মায়ের কথা খুব একটা মন দিয়ে শুনছেন বলে মনে হল না৷ আপন মনেই হাসছেন আর বলছেন, ‘এর নাম জগৎ৷ বুঝলে বউমা৷ মানুষে-মানুষে খেয়োখেয়ি, মারামারি, লোভ, হিংসে৷ মক্কেলে-মক্কেলে মারামারি উকিলদের পোয়াবারো৷ ন্যাঃ, ঘেন্না ধরে গেল৷ আইন ব্যবসা এবার ছেড়েছুড়ে দোব৷ অনেক বয়স হল৷ এইবার রিখিয়ায় গিয়ে জীবনের বাকি দিনটা কাটিয়ে দোব৷’

‘বাঃ আর আমরা এখানে একলা পড়ে থাকব৷’ মার ঠোঁট ফুলে গেল৷

‘আর কী হবে বউমা, সংসারের এই তো নিয়ম৷ সব ছেড়ে একদিন তো যেতেই হবে! কেউ আগে, আর কেউ পরে৷ মানুষের সবই সয়ে যায়৷ প্রথম-প্রথম একটু ফাঁকা লাগবে ঠিকই! একেবারে যাওয়ার দিন তো ঘনিয়ে এল৷’

মা দাদুর কথা শুনে ফোঁস-ফোঁস করে কেঁদে উঠল৷ বড়দের এই একটা ব্যাপার দেখছি, কী যেসব কথা বলেন, বকুনি নয়, মার নয়, চোখে জল এসে গেল৷ দাদুরও আজকাল ভীষণ পালাই-পালাই কথা হয়েছে! সব কথাতেই এক কথা, এইবার যেতে হবে গো, এইবার যেতে হবে গো৷ গেলেই হল৷ আমি আছি না৷ কোমর ধরে ঝুলে পড়ব৷ জুতো ছড়ি লুকিয়ে রাখব৷ চশমা হাওয়া করে দোব৷ দাদু আমাকে চেনেন না৷ সাংঘাতিক ছেলে, ভালো আছি তো আছি৷ রেগে গেলে জ্ঞান থাকে না৷ এখনই একটু-একটু রাগতে শুরু করেছি৷ মাকে কাঁদানো৷ কচুরি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে৷

মাকে কাঁদতে দেখে দাদু উঠে দাঁড়ালেন, ‘এই দেখ৷ আমার মার চোখে জল, তোমার মতো কোমল-প্রাণ সংসারে বড় দুঃখ পাবে মা৷ এখানে জরা, ব্যাধি, মৃত্যু, ছাড়াছাড়ি৷’

মা ধরা গলায় বললেন, ‘ওসব আমি জানি না৷ আমি আপনাদের সংসারে এসেছি সকলকে নিয়ে থাকতে, কাউকে ছেড়ে দিতে পারব না৷ যেতে হয় আমি আগে যাব৷’

‘তা কি হয় মা৷ যে আগে আসবে তাকে আগে যেতে হবে৷ যে পরে আসবে তাকে পরে৷ তোমার এখন কত কাজ বাকি৷ ওই হনুমানটা মানুষ হবে৷ বড় হবে৷ তবে তো তোমার ছুটি মিলবে মা৷ আমার সব কাজ শেষ৷ হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল পার করো আমারে৷ পারের কর্তা শোন বার্তা তাই ডাকি তোমারে৷’

মা’র সামনে দাদু মোচ্ছব তলার ভোলা কীর্তনীয়ার মতো হাত নেড়ে দু-লাইন গান গেয়ে উঠলেন৷ এতে মায়ের কান্না না কমে আরও বেড়ে গেল৷ দাদু মার মাথায় একটা হাত রাখলেন৷ কালো কোটের তলায় সাদা ধবধবে জামার হাতা৷ চকচকে বোতাম৷ আলো পড়ে ঝিকঝিক করছে৷ দাদু বলছেন, ‘শিগগির চোখ মোছো৷’

মা তো চোখ মুছলই না৷ দাদুর কালো কোটে মুখ গুঁজে ফুলে-ফুলে কাঁদতে লাগল৷ আমার হঠাৎ কেমন তিন মাস আগে বিপুলের দাদুর মারা যাওয়ার কথা মনে পড়ল৷ ফুল, খাট, কীর্তন, বিপুলের কান্না৷ আমার ভেতরটাও এখন যেন কেমন-কেমন করছে৷ এই বাড়িতে আমরা আছি, দাদু নেই ভাবাই যায় না, ধ্যাৎ ভাবাই যায় না৷ মা’র পিছন দিকটা জাপটে ধরে খুব খানিকটা কেঁদেনি৷ গলার কাছটায় ভীষণ কষ্ট হচ্ছে যে৷

আমাদের কুকুর টম, কোথায় ছিল মাকে কাঁদতে শুনে ছুটে এসেছে৷ ঠিক বুঝেছে দাদুর কাণ্ড৷ খুব বকতে শুরু করেছে, ভুক-ভুক, ভেউ-ভেউ করে৷

দাদু বলছেন, ‘আর বলব না বউমা, এ সব কথা আর বলব না৷ তোমার কুকুর সামলাও৷’ টম চিৎকার করছে আর মাঝে-মাঝে দাদুর দিকে লাফিয়ে-লাফিয়ে উঠছে৷ এইবার কেমন জব্দ?

একবার উঁকি মেরে দেখলুম অল্প ফাঁক করে৷ দাদু সন্ধ্যাহ্ণিকে বসেছেন৷ হালকা নীল আলো জ্বলছে ঘরে৷ সাদা ধূপের ধোঁয়া উঠছে পাকিয়ে-পাকিয়ে৷ মহাভারত না পুরাণে একটা ছবি দেখেছিলুম, হাজারটা ফণাঅলা সাপ৷ ধূপের ধোঁয়া ওপরে উঠে সেইভাবে ছড়িয়ে পড়ছে৷ দেখতে বেশ মজা লাগে৷ ওই ধোঁয়ার ফণার তলায় নিশ্চয় কৃষ্ণ শুয়ে আছেন৷ আমি পুজোটুজো করি না তো তাই দেখতে পাচ্ছি না৷ দাদু নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছেন৷ কেমন পাথরের মূর্তির মতো বসে আছেন৷ আমাদের ঠাকুর ঘরে মূর্তি আছে বুদ্ধদেবের৷ কোলের ওপর হাত মুড়ে সোজা বসে আছেন, দাদু যেন বুদ্ধদেব হয়ে বসে আছেন৷ মাথার সাদা চুলে সামনে সিঁথি৷ ইয়া মোটা সাদা পৈতে ধবধবে সাদা পিঠে সাপের মতো শুয়ে আছে৷ চোখ বোজানো৷ ধীরে-ধীরে নিঃশ্বাস পড়ছে৷ চোখের কোণে মনে হয় জল গড়িয়েছে৷ কেমন যেন চিকচিক করছে৷

দরজাটা ভেজিয়ে দিলুম শব্দ না করে৷ কখন যে আহ্ণিক শেষ হবে ভগবান! কত কথা বলার আছে আমার৷ ঘড়ির কাঁটা ঘুরে চলেছে৷ আর আধঘণ্টা, তারপরই বাবা এসে পড়বেন৷ দাদু আসেন হাসি-হাসি মুখে৷ বাবা আসেন গম্ভীর মুখে৷ এসে কারুর সঙ্গেই তেমন কথা বলেন না৷ ওই সময় মুখ দেখলেই ভয় করে৷ বাবারা কেন যে এত রাগী হন! দাদুরা কেমন সুন্দর৷ দাদুর বিছানায় ঘুমিয়ে পড়লে কেমন হয়! ঘুম তো পেয়েই আছে৷ এইমাত্র পড়তে বসেছিলাম৷ তিনবার টেবিলে মাথা ঠুকে গেছে৷ মাথা ঠুকে-ঠুকেই বোকা হয়ে গেলুম৷ চোখ কড়কড় করছে৷ দাদুর পাশ বালিশটা জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়তে কী আরামই না লাগবে! না বাবা ঘুমোলে কেস আরও খারাপ হয়ে যাবে৷ ঘুম তো একসময় ভাঙবেই, সকাল তো একসময় হবেই৷ তখন? তখন কী হবে! বরাতে যা আছে তাই হোক৷

রান্নাঘরে মা গুনগুন করে গান গাইছে৷ মেজাজটা ভালো আছে মনে হয়৷ সন্ধের শাঁখ বাজাবার সময় আমি পিছনে দাঁড়িয়ে শাঁখের শব্দের সঙ্গে সুর মিলিয়ে তিনবার পুউউ করেছি যেমন রোজ করি৷ অন্যদিন হাঁটু গেড়ে প্রণাম করি ঠাকুরদের, আজ শুয়ে পড়ে করেছি৷ যেমন করে দণ্ডি কাটে সেইভাবে৷ মা এসব দেখেও দেখেনি৷ তখনও আমার ওপর খুব রাগ৷ সন্ধের সময় ঢকঢক করে খুব জল খেতে দেখে একবার বলেছিলেন—হ্যাঁ জল খেয়ে-খেয়ে পেটটা জয়ঢাক করে ফেল৷ অম্বল হয়েছে৷ আর হবে না৷ তেঁতুল চলেছে, গুড় চলেছে, গণ্ডা-গণ্ডা রসবড়া৷ পেটের আর দোষ কী! মানুষের পেট তো৷

অম্বল কাকে বলে কে জানে৷ বড়দের কথায়-কথায় খালি অম্বল, বদহজম আর পেট গরম৷ মা গান গাইছে তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা৷ এই সময় একবার মাকে গিয়ে ধরি৷ কাজ হলেও হতে পারে৷ আগেও দেখেছি, মা যখন গান গায় তখন মায়ের সব রাগ জল হয়ে যায়৷

‘মা৷ মা গো৷’

‘বলে ফেলো৷’

‘খাবার কথা নয় কিন্তু, আগেই বলে রাখছি৷ তুমি ভাববে খাই-খাই করতে এসেছি৷’

‘ভনিতা রেখে বলে ফেল৷’

‘জনার্দনদা তো এখন বেশ ভালোই আছে৷’

‘কেন! তুই কি চাস খারাপ থাকুক৷’

‘ইস! তা কেন! আমি বলেছিলুম, তাহলে বাবাকে বলে আর লাভ কী! ব্যাপারটা চেপে যাও না কেন?’

‘আর কিছু বলার আছে!’

‘তোমার আর কী বলো মা, বাবা এসে দাঁড়াতে-না-দাঁড়াতেই চা দেবে তারপর কুটুর-কুটুর করে বলবে আমি এই করেছি সেই করেছি৷ বাবা তো আর দাদু নন৷ মুখটা আরও রাগ-রাগ হয়ে যাবে৷ একেই অঙ্ক পারিনি৷ তারপর আমার কী হবে তুমি বেশ ভালোই জানো৷ মা হয়ে তোমার কি উচিত হবে মা ছেলেকে কষ্ট দেওয়া৷’

‘আর কিছু?’

‘আর কী মা, এবার তোমার বিচার৷’

ফ্যাঁস করে ভাতের ফেন উতলে উঠল, মা তাড়াতাড়ি হাতা নিয়ে তেড়ে গেলেন৷ হে ভগবান মাকে সুবুদ্ধি দাও৷ পেছনে পায়ের শব্দ হল৷ দাদু এসে দাঁড়িয়েছেন৷

‘এখানে তোমার কী হচ্ছে বক্কেশ্বর!’

আমার যে কত নাম! কখনও বক্কেশ্বর, কখনও বৃন্দাবন, কখনও খোকা, কখনও হনুমান, কখনও ফেলুবাবু৷ মা ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, ‘আমাকে উপদেশ দিতে এসেছে বাবা৷’

‘উপদেশ!’ দাদু হা-হা করে হেসে উঠলেন, ‘নিশ্চয় সৎ উপদেশ!’

হ্যাঁ, খুবই সৎ৷ ওনার কীর্তিকাহিনি যেন বাবাকে না বলেদি৷ সব অপকর্মের সাক্ষী হয়ে বসে থাকতে হবে, আদালতে পেশ করা চলবে না৷’

‘উত্তম প্রস্তাব৷ তা আজকের কী-কী অপরাধ?’

‘খুন জখমের চেষ্টা, রাহাজানি, ছিঁচকে চুরি৷’

‘এক সঙ্গে এত! এত! সাজা তাহলে যাবজ্জীবন দাঁড়াবে দেখছি৷ বড় উকিল চাই৷ কেসটা আমাকেই হাতে নিতে হচ্ছে৷ চলো দেখি কী করা যায়৷’

উনুনের গনগনে আগুনে মা’র মুখটা ঠিক সন্ধি পুজোর আরতির সময় মা দুর্গার মতো দেখাচ্ছে৷ মনে-মনে বললুম, মা দয়া করো৷ কবে যে পুজোর ছুটি পড়বে!

দাদুর একটা হাত আমার কাঁধে৷ গা থেকে কী সুন্দর চন্দনের গন্ধ বেরোচ্ছে! আমার দাদু ঠাকুর৷ নিশ্চয় ঠাকুর৷ মুখটা কী সুন্দর ঈশ্বরের মতো, যিশুর মতো৷ আমি বড় হয়ে দাদুর মতো হব৷ কোনওদিন, কোনও কথায় রেগে যাব না৷ সবসময় হাসব৷ সকলের উপকার করব৷ উকিল হয়ে ধবধবে সাদা জামা পরে কোর্টে যাব৷ ভীষণ-ভীষণ সব মামলা জিতে ইয়া বড়-বড় খাস্তা কচৌরি নিয়ে বাড়ি আসব৷ পুজোর কাপড় পরে ঠাকুরের সামনে বসে ধ্যান করব৷ কেয়া মজা৷

দাদু তাঁর ঘরে এসে ইজিচেয়ারে বসলেন৷ আমাকে বললেন, ‘ওই চেয়ারটায় বোসো পাণ্ডা৷’ চেয়ারটা এত বড় যেন আমাদের স্কুলের হেড মাস্টারমশায়ের চেয়ার৷ মা আবার একটা গদি করে দিয়েছে৷

দাদু একবার হাই তুলে তিনবার টুসকি মারলেন৷ দাদুর ঘুম পেয়েছে৷ আমারও একটা হাই উঠল৷ হাই ভীষণ হিংসুটে৷

‘তোমাকে কীভাবে বাঁচাই! একসঙ্গে এত অপরাধ! দাদু ভীষণ ভাবনায় পড়লেন৷ আর কী? সময় তো ঘনিয়ে এল৷

‘পেয়েছি, পেয়ে গেছি৷’ দাদু লাফিয়ে উঠলেন, ‘মিল গিয়া৷’

চেয়ারে সোজা হয়ে বসলুম৷ ভেতরটা কেমন করছে৷

‘নাও টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালো৷’

হাত বাড়িয়ে সুইচটা টিপতেই আলো ছিটকে পড়ল৷ এইবার৷ আলো দিয়ে কি বাবার হাত থেকে বাঁচা যাবে!

‘যাও সংস্কৃত বইটা নিয়ে এসো৷ যাবে আর আসবে৷ তা না হলে বাঁচবার রাস্তা নেই৷’ দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলুম৷ যাওয়ার সময় জানলা দিয়ে উঁকি মেরে রাস্তাটা একবার দেখে নিলুম৷ বাবা আসছেন কি না! না আসছেন না৷ তবে আসার সময় হয়েছে৷ সংস্কৃত বই নিয়ে ফিরে এলুম৷ দাদু চেয়ারে বসেছেন আলোর সামনে৷ চোখে চশমা৷ মুখটা কেমন গম্ভীর করেছেন!

‘এদিকে এসো৷ সংস্কৃতে তুমি ভীষণ উইক৷ আমাদের বংশের ছেলে হয়ে সংস্কৃত জানবে না! কাম হিয়ার৷’

আমি আর একটা চেয়ারে গুটিগুটি বসলুম৷

চশমার ভেতর থেকে আমার দিকে তাকিয়ে দাদু বললেন, ‘একটু হম্বিতম্বি করব৷ বাবা এলে আরও করব৷ সংস্কৃতই তোমার আজ রাত্রে বাঁচার একমাত্র রাস্তা৷’

দাদু বললেন, ‘বেশ জোরে-জোরে পড়ো নরঃ নরৌ, নরাঃ৷’ বেশ জোরে-জোরে বারকতক পড়ার পর মনে একটা সন্দেহ হল৷ হ্যাঁ ঠিকই৷ সংস্কৃত তো সকালের জিনিস! বাবা প্রায়ই বলেন, মনে করবে তুমি তপোবনে আছ৷ ভোর হচ্ছে৷ আকাশ জবা ফুলের মতো টকটকে লাল৷ নানারকমের পাখি ডাকছে৷ এখানে নানা রকমের পাখি আর পাবে কোথায়! কাক ডাকছে কা-কা করে আর তুমি পড়ে চলেছ, ভূ, ভূবৌ, ভূবঃ, ভূম, ভূবৌ৷ রাতে সংস্কৃত! ঠিক সন্দেহ করবেন৷ কথাটা দাদুকে বলা উচিত৷

‘দাদু’?

‘বলো, কী আবার হল?’

‘না হয়নি কিছুই তবে রাতে সংস্কৃত পড়তে দেখলে বাবা রেগে যাবেন৷ বলবেন, রেখে দাও৷ মুখস্থ-ফুখস্থ সব সকালে৷ তখন কী হবে?’

‘হুঁউ৷’ দাদু বেশ ভেবে পড়লেন৷ ‘কথাটা তুমি বলেছ ঠিক৷ বুদ্ধিমান ছেলে৷ অন্য একটা রাস্তা ভাবতেই হচ্ছে৷ ভাবতে-ভাবতেই তো এসে পড়ার সময় হল৷’

‘দাদু?’

‘বলো৷’

‘পেটের ব্যথা করাব?’

‘আরে না-না৷ এটা তোমার বিশেষ ভালো যুক্তি হল না গাধা৷ মিথ্যের আশ্রয় নেবে কেন? তাতে নিজের কাছেই নিজে অনেক ছোট হয়ে যাবে৷ না-না, ওটা ঠিক হবে না৷ ওরকম ভাবনা তুমি কখনওই ভাববে না৷’

‘তা হলে জ্যামিতি৷ জ্যামিতির দিকে বাবার ভীষণ ঝোঁক৷ অ্যারিস্টটল, ইউক্লিড, টলেমি এইসব নাম বলতে-বলতে তাঁর মুখের চেহারাই পালটে যায়৷’

‘হ্যাঁ জ্যামিতি৷ জ্যামিতিই তাহলে ধরা যাক৷ নিয়ে এসো বই৷’

জ্যামিতি নিয়ে দাদুর ঘরে ঢুকছি, মনে হল বাবার পায়ের শব্দ পেলুম সিঁড়িতে৷ ধীরে-ধীরে উঠছেন৷ আর দাঁড়ায়! প্রায় ছুটতে-ছুটতে দাদুর ঘরে গিয়ে চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়ে হাঁপাতে লাগলুম৷ বাব্বা, খুব ছোটা ছুটেছি৷ বাবার মুখোমুখি পড়ে গেলে হয়েছিল আর কী! ঝড়াস করে বইটা খুলে ফেলে ঠিকঠাক হয়ে বসলুম৷ চেয়ারটা তেমন উঁচু নয়৷ টেবিলে দাড়ি ঠেকে যাচ্ছে৷ দাদুর মুখের দিকে তাকালুম৷ মুখের একপাশে আলো পড়েছে আর একপাশে অন্ধকার৷ দাদুদের, বাবাদের কী মজা! কোনও ভাবনা নেই কোনও চিন্তা নেই৷ পড়া হয়নি, অঙ্ক হয়নি বলে কেউ বকবে না৷ দাদু কেমন মৃদু-মৃদু হাসছেন!

‘এবিসি একটি ত্রিভুজ, এবিসি একটি ত্রিভুজ’—

দাদু হাত তুলে থামিয়ে দিলেন, ‘ভয় পেও না তাড়াহুড়ো কোরো না৷ জ্যামিতি মুখস্থর জিনিস নয়৷ বইটা আমার হাতে দাও৷’

বাইরের দালানে সিঁড়ির মুখে বাবার গলার শব্দ পাওয়া গেল৷ হুঁ উঁ উঁ৷ শুনেছি রাশভারী মানুষরা এইভাবেই জানান দেন, আমি এসেছি৷ বাবার হাতে যেসব জিনিস থাকে সেসব কেউ এসে ধরে নিক, কি জিগ্যেস করুক, এলে? কেমন আছ? এসব ভীষণ অপছন্দ করেন৷ আমি একদিন শুনেছিলুম৷ মাকে বলছেন, ডোন্ট বি সিলি৷ অবশ্য আমাকে কোনওদিন কিছু বলেননি৷ আমি সামনে গিয়ে দাঁড়ালে খুশিই হন৷ সোজাসুজি পড়াশোনার কথা শুরু করে দিতে পারেন৷ দাদু বললেন, ‘খাতা খোলো৷’

খাতা খুলেছি৷ দাদু বললেন, ‘একটা সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ এঁকে ফেলো চট করে৷’

স্কেলটা খাতার ওপর ফেলে পেনসিল দিয়ে একটা লাইন টেনেছি কি টানিনি প্যাট করে সিস ভেঙে সামনে ছিটকে পড়ল৷ রোজই এইরকম হয়৷

‘যাঃ গেল তো? সাধে তোমার ওপর বাবা রেগে যান৷ তোমার অনেক বায়নাক্কা৷ পেনসিল চালাচ্ছ না খোন্তা চালাচ্ছ বোঝা মুশকিল৷ কে এখন পেনসিল কাটবে! আমি তো রাতে ছুরি ধরতে সাহস পাব না৷’

‘আমার পেনসিল কাটা কল আছে৷ কিন্তু কলটা আনতে গেলেই ধরা পড়ে যাব৷’

‘হ্যাঁ তা ঠিক৷ কল আনতে গিয়ে কলে পড়ে যাবে৷ দেখো তো আমার ড্রয়ারে একটা বেঁড়ে পেনসিল থাকতে পারে৷’

দাদুর ড্রয়ারে গোল মতো একটা চকচকে জিনিস রয়েছে৷ মেডেলের মতো দেখতে৷ কী জিনিস কে জানে! মনে হল জিগ্যেস করি, জিনিসটা কী? নিতেও ইচ্ছে করছিল খুব৷ কিন্তু না! বাবা, মা, দাদু সকলেই আমাকে শিখিয়েছেন, কারুর কোনও জিনিসে কৌতূহল প্রকাশ করবে না৷ কেউ কিছু না দিলে চেয়ে নেবে না৷

‘কী, পেলে না?’ দাদু তাড়া দিলেন৷

এতক্ষণ তো পেনসিল খুঁজিনি, মেডেলের মতো জিনিসটা দেখলুম৷ মনে হয় দাদু এটা আমাকেই দেওয়ার জন্যে এনেছিলেন৷ ভুলে গেছেন৷

‘দাদু এটা কী?’

হাত দিয়ে আলো থেকে চোখ আড়াল করে দাদু ভালো করে দেখলেন৷

‘কোত্থেকে পেলে এটা?’

‘ড্রয়ারে ছিল৷’

‘সে কী? তোমাকে দিইনি? মাসখানেক হয়ে গেল যে!’

‘এটা আমার?’

‘হ্যাঁ তোমারই তো৷ তোমার জন্যেই এনেছিলুম৷ ভুলে গেছি৷’

বাইরের দালানে বাবার গলা পাওয়া গেল, ‘জনার্দন, জনার্দন৷’

আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল৷ ‘এই রে মরেছে!’

দাদু বললেন, ‘জানো তো খোঁড়ার পা-ই গর্তে পড়ে? হঠাৎ আবার জনার্দনের খোঁজ পড়ল কেন আজ?’

বাবা আবার একবার ডাকলেন, ‘জনার্দন৷’

মায়ের গলা পেলুম৷ জনার্দনের বদলে মা দৌড়ে এসেছেন৷ এইবার শুরু হবে! আমাকে অন্যমনস্ক হতে দেখে দাদু বললেন, ‘ওদিকে কান দিও না৷ পেনসিলটা পেলে না?

‘হ্যাঁ পেয়ে গেছি৷’

‘বেশ ট্র্যাঙ্গলটা এঁকে ফেলো?’

দাদু বললে কী হবে? কান তো পড়ে আছে ওদিকে৷

মা বলছেন, ‘জনার্দনকে কী হবে!’

‘আরে আমি যে বলেছিলুম তিন কিলো পাট কিনে আনতে৷’

‘পাট? পাট কী হবে!’

‘সে তুমি বুঝবে না৷ জনার্দন কোথায়?’

‘শুয়ে আছে৷’

‘শুয়ে আছে! শুয়ে আছে কেন?’

আমি ভয়ে সিঁটিয়ে আছি৷ এইবার৷ এইবার মা বলবেন জনার্দন কেন শুয়ে আছে৷

মা বললেন, ‘শরীরটা তেমন ভালো নেই দুপুর থেকে৷’

আঃ তুমি আবার দুপুর বলতে গেলে কেন? শরীর ভালো নেই, ব্যস মিটে গেল৷ তা না দুপুর থেকে৷ বাবা বললেন, ‘কেন দই খেয়েছিল বুঝি?’

‘হ্যাঁ, এবিসি একটা ত্রিভুজ৷ কী ত্রিভুজ? সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ৷ এবি আর এসি বাহু দুটি সমান৷’

মা বললেন, ‘তা তো ঠিক জানি না’৷

‘কেন জানো না? বাড়িতে কে কী খাচ্ছে-না-খাচ্ছে তুমি জানবে না তো কে জানবে? কোন ঘরে শুয়ে আছে?’

‘এবিসি আর এসিবি কোণ দুটি সমান৷

‘ওর নিজের ঘরেই শুয়ে আছে৷’

‘দাদু সেভ মি৷’

দাদু গালে হাত বোলাচ্ছিলেন৷ মুখে মৃদু-মৃদু হাসি৷ ‘দাদু, বাবা যে এখুনি জনার্দনের ঘরে যাবেন৷ আর জনার্দন কুঁই-কুঁই করে বলতে থাকবে, খোকাবাবু বুকের ওপর ভারী ডিকশনারি ফেলে দিয়েছে৷ বাবা জনার্দনের ঘরে যাওয়ার আগে আপনি যদি একবার বারান্দার এইদিক দিয়ে যান৷’

‘কেন?’

‘আপনি গিয়ে জনার্দনকে বললে ও হয়তো চেপে যেতে পারে৷’

‘কোনও দরকার নেই৷ ফেস দ্য ট্রুথ৷ সত্যের মুখোমুখি হতে শেখো৷ তুমি তো আর ইচ্ছে করে ওর বুকে ডিকশনারি ফেলনি৷ পড়ে গেছে৷ অ্যাকসিডেন্ট ইজ অ্যাকসিডেন্ট৷ তোমাকে কিছু জিগ্যেস করলে সত্যি কথা বলবে৷’

বাবা হঠাৎ চিৎকার করে ডাকলেন, ‘খোকা, খোকা আ আ৷’

বাবা যখন খোকা-খোকা বলে ডাকেন তখন খোকার সাধ্য কী যে ঘাপটি মেরে বসে থাকবে৷ খোকা কাঁপতে-কাঁপতে সামনে হাজির হবে৷ খোকার বরাতে তখন আদর জুটতে পারে, খোকার বরাতে তখন র‌্যান্ডাম বকুনিও জুটতে পারে৷ র‌্যান্ডাম শব্দটা স্কুলের বন্ধু অশোকের কাছে শিখেছি৷ রোজই স্কুলে এসে বলে, বুঝলি, কাল বাবা আমাকে র‌্যান্ডাম ধোলাই দিয়েছে৷ আমার বাবা র‌্যান্ডাম ধোলাই দেবেন না, র‌্যান্ডাম বকতে পারেন৷ বাবা মারধোর তেমন ভালোবাসেন না৷ বকুনিতেই সব ঠান্ডা৷

আমি পৌঁছবার আগেই মা আবার হন্তদন্ত হয়ে এসেছেন! শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে-মুছতে বললেন, ‘এখন জনার্দন আবার কী করবে?’

‘জনার্দন কী করবে, জনার্দন জানে৷ তুমি কী করে জানবে বলো?’

‘রেগে যাচ্ছ কেন?’

‘জানই তো আমি একটু রাগী৷ এক ডাকে উত্তর না পেলে রাগ আরও দপ করে জ্বলে ওঠে?’

‘না, আমি বলছিলুম আমাদের সব বয়েস তো বাড়ছে, এখন রাগটাগ যত কম হয় ততই ভালো৷’

‘তুমি তা হলে মহিলা নও৷’

‘কেন?’

‘মেয়েদের বয়েস বাড়ে বলে তো শুনিনি৷ তুমিই দেখছি একমাত্র মহিলা যিনি স্বীকার করলেন বয়েস বাড়ছে৷’

মায়ের পিছনে লুকিয়েছিলুম৷ বাবা এতক্ষণ দেখতে পাননি৷ জামাটামা খুলে হ্যাঙারে ঝুলিয়ে আলনায় রাখছেন৷ হঠাৎ আমাকে দেখতে পেলেন৷ দেখেই বললেন, ‘ইস, দু-একটা বাজে কথা বলা হয়ে গেল৷ স্বভাববিরুদ্ধ কাজ৷ সত্যিই বয়েস বাড়ছে৷ বকবক করার স্বভাব এসে যাচ্ছে৷ কনট্রোল করতে হবে, চেক করতে হবে৷ গান্ধিজি সপ্তাহে একদিন মৌনী থাকতেন৷ নো মোর লুজ টকস৷ গো, গো, যাও তোমার কাজে যাও৷’

পর্বত সরে গেল৷ ফাঁকা ঘরে আমি একা বাবার মুখোমুখি৷ পেটের ভেতর কেমন করছে৷ একবার বাথরুমে যেতে পারলে ভালো হত৷ সে সুযোগ কোথায়? বাবার হাতে পড়ে গেছি৷ আর আমার রক্ষা নেই৷ বাবা বললেন, ‘বলতে পারো সেই জনার্দন বেঁচে আছে না মারা গেছে?’

‘আজ্ঞে?’

‘আই সি? হয় তুমি কালা না হয় তুমি অমনোযোগী, না হয় তুমি বোকা, ডানস, দিন-দিন জড়বুদ্ধি হয়ে যাচ্ছ৷ আর হবে না? অত খেলে আর ঘুমোলে ‘ফ্যাটি কুকই’ হয়ে যাবে?’

এই ফ্যাটি কুক শব্দটার বাংলা করলে খুবই সামান্য কথা, মনে করার মতো কিছু নয়, মোটা রাঁধুনি৷ বাবা যখনই বলবেন তখনই কিন্তু এটা গালাগাল৷ ছেলেবেলায় আমার নাকি একটা দম দেওয়া জাপানি পুতুল ছিল৷ পুতুলটার নাম ‘ফ্যাটি কুক৷’ আমার মনে পড়ে না৷ জ্ঞান হওয়ার আগেই সেটাকে আমি ভেঙে শেষ করে দিয়েছি৷ তার জন্যে দুঃখও হয়৷ জ্ঞান হয়ে আর দেখতে পেলুম না৷ এখন আর পাওয়াও যাবে না, যতই পয়সা ফেল৷ সেই পুতুলটার চেহারা ছিল অষ্টম হেনরির মতো মোটা৷ এক হাতে এক বাটি, আর এক হাতে হাতা৷ দম দিয়ে ছেড়ে দিলেই হেলে-দুলে পরিবেশনের ভঙ্গিতে চলতে শুরু করত আর মাঝে মাঝে উলটে পড়ে যেত৷ মানে অপদার্থ গোছের একটা মোটাসোটা লোক৷ আমি নাকি সেই ফ্যাটি কুক৷ অপদার্থ, বোকা, হাঁদা গঙ্গারাম৷

আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে বাবা ধমকে উঠলেন, ‘প্রশ্নটা বুঝতে পারনি, শুনতে পাওনি, না অন্য জগতে আছ?’

‘আজ্ঞে?’ আবার সেই এক আজ্ঞে৷

‘আজ্ঞে ছাড়া তুমি আর কোনও কথা বলতে শেখনি? ওই দুটি শব্দ আ আর জ্ঞে? শোনো, ভালো করে শোনো, জনার্দন মহাপ্রভু কোথায়?’

বাবা খুব রেগে গেছেন৷ এত জোরে বলছেন, শব্দের ঝঙ্কারে একটা চড়াই পাখি ছিটকে এ কড়িকাঠ থেকে উড়তে উড়তে আর এক কড়িকাঠে গিয়ে বসল৷ রাগলে কী হবে? আমার তো সেই এক উত্তর, ‘আজ্ঞে?’

‘গেট আউট৷ গেট আউট৷’

গেটের আউটে যেতে হল না৷ যাওয়ার সুযোগ পাওয়া গেল না৷ দরজার সামনে আমার দাদু৷ পায়ে খড়ম৷ গায়ে চন্দনের গন্ধ৷ বুকের ওপর চওড়া পইতে৷ চোখে আবার চশমা৷

কীসের এত উত্তেজনা?’

গরম চাটুতে জল পড়লে যেমন ছ্যাঁক করে শব্দ হয়ে বাবার উত্তরটা সেই রকম শোনাল, ‘এই যে দেখুন না, জেগে-জেগে ঘুমুচ্ছে৷ সেম প্রশ্ন, থ্রির অর ফোর টাইমস রিপিট করলুম, কোনও উত্তর নেই, ওনলি অ্যানসার আজ্ঞে?’

‘ওর উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা নেই৷’

‘এতই দুর্বল?’

‘দুর্বল নয়, ভয়?’

জনার্দন কোথায়, এর উত্তর দিতে ভয়? এ তো একটা জানা প্রশ্ন? এরপর ভূগোল পড়াতে বসে আমি যখন জিগ্যেস করব উরুগুয়ে কোথায়, তখন তো হার্টফেল করবে৷

‘নাও করতে পারে৷ হয়তো দুম করে বলেই দেবে কিন্তু জনার্দন কোথায় জিগ্যেস করলে ওর জিভ আটকে যাবে!’

‘স্ট্রেঞ্জ! রহস্যজনক ব্যাপার৷ কেন, খুন করে ফেলেছে নাকি?’

‘হোমিসাইড নয়, অ্যাটেমপ্টেড মার্ডারও নয়, জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট৷ সামান্য দুর্ঘটনা৷’

‘তার মানে? জনার্দন হাসপাতালে?’

‘না, নিজের ঘরে৷ একদিন রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে৷’

‘ঘটনাটা কী?’

‘সুবল মিত্তির পড়ে গেছে৷’

‘সুবল মিত্র?’ তিনি আবার কে? যাক তিনি যেই হোন আমার জানার দরকার নেই৷ তিনি পড়ে গেলেন আর রেস্ট নিলেন জনার্দন? এ যে সেই কাশীধামে কাক মরেছে বৃন্দাবনে হাহাকার?’

‘সুবল মিত্তির জনার্দনের ঘাড়ে পড়েছেন৷’

‘সর্বনাশ! মিস্টার মিত্তির কোত্থেকে পড়লেন? ছাত থেকে? নাইনটিন থার্টি ফোরে এইরকম একটা কেস হয়েছিল৷ একজন ছাত থেকে আর একজনের ঘাড়ে পড়ে নিজে বাঁচলেন, যাঁর ওপর পড়লেন তিন মরলেন৷ মিস্টার মিত্তির কেমন আছেন?’

‘ভালোই আছেন৷ স্পাইনটা একটু ছিঁড়ে গেছে৷’

‘ছিঁড়ে নয় বলুন ভেঙে গেছে৷ ভোগাবে?’

‘তেমন ভোগাবে না৷ রোববার তোমার হাত পড়লেই ঠিক হয়ে যাবে৷’

‘আমার হাতে? আমি পিকচারে আসছি কীভাবে?’

‘আসতেই হবে৷ বউমা শিরিসের আঠা করে দেবে, তুমি রবিবার বসে-বসে জুড়ে ফেলবে৷’ বাবা কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গেলেন৷ কার আই কিউ কম? আমার না বাবার?

বাবা হো-হো করে হেসে উঠলেন৷ ‘ইডিয়েট, ফাসক্লাস ইডিয়েট৷ এই সামান্য জিনিসটা বুঝতে আমার এতক্ষণ সময় লাগল৷ আবার ক্রশওয়ার্ড পাজল ধরতে হবে৷ বুদ্ধি ভোঁতা হয়ে আসছে৷’ বাবা হো-হো করে হাসলে বুঝতে হবে বেশ কিছুক্ষণ আর রাগবেন না৷ তারপর নিজের বুদ্ধির ওপর সন্দেহ৷ এখন আর অন্যের বুদ্ধি নিয়ে মাথা ঘামাবেন না৷ দাদু বললেন, ‘ওরকম মাঝে-মাঝে সকলেরই হয়৷ বুদ্ধি থমকে যায়৷ যন্ত্রের যেমন ঘাট থাকে বুদ্ধিরও তেমনি ঘাট আছে৷ ঘড়ির চাকার মতো৷ মাঝেমধ্যে আটকে যেতে পারে৷ এজলাসে কখনও-কখনও আমারও ওরকম হয়৷ বিপক্ষের উকিলের প্যাঁচ ধরতে পারি না৷ তারপর যখন ধরে ফেলি তখন আর আমাকে রোকে কে! প্যাঁচের ওপর প্যাঁচ, আড়াই প্যাঁচ মেরে চিত করে ফেলে দি৷’

বাবা বললেন, ‘আপনাদের লাইনে তবু বুদ্ধিকে রোজ শানাবার উপায় আছে, আমাদের লাইনে সে উপায় নেই৷ জং ধরে যায়৷ বুদ্ধি হল ক্ষুরের মতো৷ চামড়ার বেল্টে এপিঠ-ওপিঠ শানাতে হয়৷ আপনি আমাকে আজ রাতে কয়েকটা ব্রেন-টিজার দেবেন তো৷ ব্রেনকে এক্সারসাইজ না করালে দ্বিপদ গর্দভ হয়ে যাব৷’

আমি আস্তে-আস্তে দাদুর পেছন থেকে বেরিয়ে এসেছি৷ চাঁদ যেন এতক্ষণ মেঘের আড়ালে ছিল৷ ধীরে-ধীরে বেরিয়ে এল৷ বাবা বললেন, ‘এ ছেলেটাকে আর মানুষ করা গেল না৷ খাচ্ছেদাচ্ছে আর ল্যাং-প্যাং সিং হচ্ছে৷ একটা ডিকশনারির ওজন আর কত হবে৷ একটা কাঁসার গেলাস তুলতে হাত কাঁপে৷ সেদিন কী লজ্জা৷’

‘কবে হে?’

‘এই তো সেদিন৷ ভটচাজ্যিমশাইয়ের ছেলের পইতেতে আমরা মধ্যাহ্ণভোজনে গেলুম৷ খেতে বসেছি৷ আমাদের আর পাতায় বসায়নি৷ থালা, বাটি, গেলাস৷ আলাদা খাতির৷ বাবুর খেতে-খেতে জল তেষ্টা৷ ভেরি ব্যাড হ্যাবিট৷ বাড়ি হলে কান ধরে আসন থেকে তুলে দিতুম৷ বাইরে বলে দেখেও দেখলুম না৷ ইগনোর করলুম৷ গেলাস আর তুলতেই পারে না৷ একটু করে তোলে, কী করে মেজেতে পড়ে যায়৷ পাশে আর এক ভদ্রলোক ছিলেন৷ তিনি হেঁ-হেঁ করে হেসে বললেন, খোকা তুমি একেবারে অকেজো৷ পিতামাতার বদনাম করে ছাড়লে৷ লোকে বলবে, ছেলেটাকে না খাইয়ে রেখেছে৷’

‘আমার হাতে ঘি লেগেছিল, তাই স্প্লিপ করে যাচ্ছিল৷’

‘আজও কি তোমার হাতে ঘি ছিল? ডিকশনারি স্প্লিপ করে জনার্দনের ঘাড়ে পড়ল৷’ এই রে আবার যেন সেই রাগরাগ ভাবটা ফিরে আসছে৷ দাদু সামলাবার চেষ্টা করলেন, ‘না, এ ব্যাপারটা হাতে ঘি বা তুমি যাকে কেয়ারলেস বলো তা নয়৷ এটা হল উচ্চতা আর ওজন৷ হাইট অ্যান্ড ওয়েট৷’ উঃ দাদু যার উকিল, তার কীসের ভয়৷ বাবা যেন জজসাহেব৷ সাজা দেওয়ার জন্যে মুখিয়ে আছেন৷ কিন্তু বিনা বিচারে সাজা হবে না৷ সাজা দেওয়া যাবে না৷ আগে অপরাধ প্রমাণ করো৷

বাবা বললেন, ‘হাইট অ্যান্ড ওয়েট মানে?’

‘এর সঙ্গে গ্র্যাভিটিও আছে৷ উচ্চতা, ওজন আর মাধ্যাকর্ষণ৷

এই তিনজন হল গিয়ে তোমার অপরাধী৷ আর তোমার ভিকটিম, আই মিন সাফারার, ভুক্তভোগী, তার মতো কেয়ারলেস প্রাণী পৃথিবীতে দুটো পাবে না৷’

‘কেন? কেন?’

বাবা জনার্দনের হয়ে খুব লড়ে যাচ্ছেন মনে হচ্ছে৷ জজসাহেব পক্ষপাতী৷ বিচারের রায় যে-কোনও সময় ঘুরে যেতে পারে৷ দাদুই আমার একমাত্র ভরসা৷ আমার আর কে আছে! মাঝেমধ্যে একটু আধটু দুষ্টুমি করে ফেলি বলে মা আমার বিপক্ষে৷ আমি বাচ্চা মানুষ নই, বাঁদর৷ বাঁদরের সব গুণ আমার আছে, লেজটাই যা নেই৷ লেজটা থাকলে ষোলোকলা পূর্ণ হত৷ লেখা পড়ারও দরকার হত না৷ বাঁদর হলেও ছেলে তো! তাই ছুতোর মিস্ত্রি ডেকে আমগাছে একটা কাঠের ঘর করে দিতেন৷ আমি লেজ ঝুলিয়ে বসে থাকতুম৷ উঃ মায়ের কী পরিকল্পনা৷ রোজ সকালে এক ছড়া চাঁপা কলা হাতে গাছতলায় গিয়ে দাঁড়াতেন৷ আমি সড়সড় করে নেমে এসে ছোঁ মেরে কলার ছড়াটা নিয়ে গাছের ডালে কাঠের ঘরে উঠে যেতুম৷ ব্রেকফাস্ট৷ বাঁদরের ব্রেকফাস্ট৷ তারপর বাঁদরের যা কাজ আমি নাকি তাই করতুম—কলা খেয়ে খোসাগুলো ওপর থেকে মাকেই ছুড়ে-ছুড়ে মারতাম৷ অকৃতজ্ঞ এবং অসভ্য, এই হল আমার গুণ৷ আমার মানে বাঁদরের গুণ৷ মা একটা ছড়াও বলেছিলেন, তাতে অবশ্য বাঁদরের কোনও উল্লেখ নেই, তবু বলেছিলেন, উই আর ইঁদুরের দেখো ব্যবহার, কাঠ কাটে, বস্ত্র কাটে, কেটে করে ছারখার৷ আমি অবশ্য প্রতিবাদ করে বলেছিলুম, বাঁদর কত ফেথফুল অ্যানিম্যাল জানো মা! বানরবাহিনী সমুদ্রবন্ধন করে লঙ্কা ছারখার করে দিয়েছিল৷ বাঁদর না সাহায্য করলে রাক্ষস নিধন, সীতা উদ্ধার সম্ভব হতো!

মা হুঁ-হুঁ করে হেসে বলেছিলেন, একমাত্র রামায়ণ ছাড়া বাঁদর কোথাও, কখনও, কোনও ভালো কাজ করেনি৷ আমি বাঁদর, জামগাছে কাঠের খোপে ন্যাজ ঝুলিয়ে বসে আছি৷ দৃশ্যটা ভাবতেই হাসি পেয়ে গেল৷

চাপতে পারলুম না৷ খুঁকখুঁক করে হেসে ফেললুম৷

বাবা বললেন, ‘অন্যায় করে আবার হাসি হচ্ছে৷ অ্যাডিং ইনসালট টু ইনজুরি৷’

এই কথাটা বাবা প্রায়ই বলেন৷ ভয়ে চুপসে গেলুম৷ মরেছে৷ কী হবে? কী করে বাবাকে বোঝাব আমি হেসে ফেলেছি নিজেকে জামগাছে বাঁদর হয়ে বসে থাকতে দেখে৷

দাদু বললেন, ‘ও হাসেনি৷ শব্দ করে ফেলেছে৷’

শব্দটা আমি শুনেছি, ওটা চাপা হাসি৷’

‘ঢেঁকুরও হতে পারে৷ একটু আগে জল খেয়েছে তো!’

‘ওকে আপনি ডিফেন্ড করুন ক্ষতি নেই কিন্তু অসভ্যতাকে প্রশ্রয় দেবেন না৷ মাই রিকোয়েস্ট৷’

‘আই নো আই নো৷ সভ্যতা, অসভ্যতার পার্থক্য আমি বুঝি৷ আই নো দ্য ডিফারেনস৷ আচ্ছা ওকেই আমি জিগ্যেস করি৷ তুমি কি হেসেছ? সত্যি কথা বলবে৷’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ আমি কুঁককুঁক করে হেসে ফেলেছি৷ আমি যে কারণে হেসেছি, সে কারণটাও বলি৷ আমি মনে-মনে ভাবছিলুম, দাদু ছাড়া আমাকে কেউ ভালোবাসে না৷ এমনকী মাও না৷ মা বলেন আমি একটা রিয়েল বাঁদর৷ জামগাছে একটা কাঠের ঘর করে দেবেন সেইখানে আমি সারাদিন ন্যাজ ঝুলিয়ে বসে থাকব৷ মা রোজ সকালে এক ছড়া করে চাঁপা কলা দিয়ে আসবেন৷ দৃশ্যটা ভেবে আমি হেসে ফেলেছি চাপতে পারিনি৷ আমার খুব অন্যায় হয়ে গেছে৷’

দাদু হো-হো করে হেসে উঠলেন৷ মনে হল বাবার ঠোঁটের কোণেও সামান্য মুচকি হাসি৷ ঠিক দেখছি তো! দাদু হাসতে-হাসতে বললেন, ‘তোমার মা তো দেখছি ডারউইন সাহেবের থিয়োরিটা জেনে ফেলেছে৷ বাঁদর থেকেই মানুষ হয়৷ প্রসেস অফ ইভলিউশান৷ যাক, কেস ডিসমিস৷ আসামি বেকসুর খালাস!’ দাদু খালাস দিলে কী হবে, বাবার মুখ আবার গম্ভীর হয়ে উঠেছে৷

‘কিন্তু ওই হাইট, ওয়েট আর গ্র্যাভিটির ব্যাপারটা তো ঠিক ক্লিয়ার হল না৷’

‘ও ওটা তুমি বোঝনি৷ আচ্ছা শোন, লেট মি এক্সপ্লেন৷ ডিকশনারিটা ছিল র‌্যাকের ওপরে৷ হাতের নাগালের বাইরে৷ ন্যাচারেলি ও লেঙচে পাড়তে গিয়েছিল৷ বইটা ভারী৷ দু-আঙুলে ধরে টেনেছে৷ যেই শূন্যে এসেছে ল অফ গ্র্যাভিটি কাজ করেছে৷ মাটির দিকে আকর্ষণ৷ আমাদের জনার্দন কেয়ারলেস৷ স্থানকালপাত্র জ্ঞান নেই৷ তা না হলে কেউ জরদা ভাতে দেয়৷ তা না হলে কেউ চিত হয়ে র‌্যাকের তলায় শুয়ে থাকে! দুম করে ডিকশনারি পড়েছে বুকে৷ নাউ ইট ইজ ক্লিয়ার? কী ক্লিয়ার তো? এই কৈফিয়ত জজে মানবে৷ কী মানবে না?’

বাবা বেশ কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে বললেন, ‘তা অবশ্য মানবে৷’

‘তা হলে মানুষের এই পূর্বপুরুষটিকে নিয়ে আমি ঘরে যাই৷ সকালে সময় পাচ্ছি না, রাতের দিকে সংস্কৃতটা একটু দেখি।

‘সংস্কৃত?’ বাবার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল৷ ‘হ্যাঁ, সংস্কৃত! সংস্কৃতটা একটু চেপে ধরতে হবে৷ মিজারেবল অবস্থা৷ সেদিন দেখি লতা শব্দের প্রথমায় এতবড় একটা বিসর্গ লাগিয়ে বসে আছে! কিস্যু করবে না, কিস্যু পড়বে না, কিস্যু দেখবে না, খেলা, খেলা, আর খেলা৷ এদিকে সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়৷’

বাবা ডাকতে লাগলেন, ‘জনার্দন, জনার্দন৷’

দাদু অবাক হয়ে বললেন, ‘আবার জনার্দনকে ডাকছ!’

‘আমার পাট!’

‘পাট মানে?’

‘ওকে বাজার থেকে পাট কিনে আনতে বলেছিলুম৷’

‘পাট দিয়ে কী করবে?’

‘হোয়াইটওয়াশ৷ পাট দিয়ে গোটাকতক বুরুশ তৈরি করতে হবে৷’

‘সে তো যারা হোয়াইটওয়াশ করতে আসবে তারাই করে নেবে৷’

‘হোয়াইটওয়াশ তো আমি করব৷’

‘তুমি করবে মানে?’

‘শেলফ হেলপ ইজ বেস্ট হেলপ৷’

মা এলেন৷ বাবা বললেন, ‘কই পাট কোথায়?’

আমার বাবার এই নিয়ম৷ মাথায় একটা কিছু ঢুকলে আর রক্ষে নেই৷ যতক্ষণ না সেটার একটা হেস্তনেস্ত হচ্ছে ততক্ষণ হাঁকাহাঁকি, ডাকাডাকি৷ হই-হই ব্যাপার৷ আমারও এইরকম স্বভাব৷ মা তাই মাঝে-মাঝে বলেন, ‘যেমন বাপ তেমনি বেটা৷’

মা বললেন, ‘কীসের পাট?’

বাবা বললেন, ‘কী আশ্চর্য! পাট আবার কীসের পাট? জুট-জুট৷’

‘আমি ভাবলুম, জামার পাট, কী কাপড়ের পাট!’

‘কেন ভাবলে?’

‘ওই যে মাঝে-মাঝে বলো না, পাট ভাঙা জামাকাপড়৷ আবার বলো, এবাড়ি থেকে লেখাপড়ার পাট উঠে গেল৷ আবার বলো শিশির ভাদুড়ির মতো রামের পাট কেউ করতে পারবে না৷ কতরকমের পাট আছে কী করে বুঝব৷’

‘হা ভগবান, পাট, পাঠ, পার্ট, ইংরেজি, বাংলা ট, ঠ সব এক করে বসে আছে? জনার্দন কোন ঘরে?’

‘জনার্দন জনার্দনের ঘরে৷’

বাবা চটি পায়ে চটর-পটর করে বেরিয়ে গেলেন৷ দাদু বললেন, ‘মা, গেট রেডি৷ দুঃখের দিন আগত ওই৷ উনি নিজে এই সারা বাড়ি হোয়াইটওয়াশ করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন৷ বুঝতেই পারছ, কী হবে!’

‘সে কী? সে তো এলাহি ব্যাপার? ভারা বাঁধরে, চুন ভেজাওরে, রং গোলরে৷ মিস্ত্রি ছাড়া ও সব কাজ হয় না কি?’

‘সামলাও৷ নয় তো দক্ষযজ্ঞ হয়ে যাবে৷’

মা জোরে-জোরেই বলে ফেললেন, ‘হে মা সুমতি দাও৷ পাঁচ সিকে পুজো দোব মা৷’

জনার্দন বেশ মোটা হয়েছে৷ পাঁজর-ফাঁজর সব ঢাকা পড়ে গেছে৷ ফ্যাট নয়, প্লাস্টার অফ প্যারিস৷ ডাক্তারবাবু এসে গরম জলে জিপসাম গুলে জনার্দনকে মাদুরের ওপর খাড়া করে বসিয়ে ব্যান্ডেজ চুবিয়ে পরাতে-পরাতে কোমরের ওপর থেকে বগলের তলা পর্যন্ত জড়িয়ে অ্যায়সা করে দিয়েছেন! আয়রন ম্যান বলব না, চায়না ম্যান৷

সেই অবস্থায় জনার্দন আবার রান্নাঘরে এসে ঢুকেছে৷ মা একটা টুল দিয়েছে৷ সেই টুলে বসে ডালের কড়ায় হাতা চালাচ্ছে৷ একটু দূরে রান্নাঘরের সামনে খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে দাদু পায়রাদের ডালের দানাগুলো খাওয়াচ্ছেন৷ পিঠ বেয়ে সাদা পইতে নেমে গেছে কোমর পর্যন্ত৷ পেতলের চাবি ঝুলছে৷ সবে চান করেছেন৷ ভিজে-ভিজে চুল দুপাশে পাটে-পাটে আঁচড়ানো৷ কপালে চন্দনের ফোঁটা৷ পায়রাদের মধ্যেও বোকা পায়রা, চালাক পায়রা, নিরীহ পায়রা, গুণ্ডা পায়রা সবই আছে৷ দাদু একা সামলাতে পারছেন না৷ যে খাচ্ছে সে একাই খাচ্ছে৷ যে পারছে না সে পারছেই না৷ মাঝে-মাঝে দাদু ঘমকধামক লাগাচ্ছেন—ব্যাটা ইডিয়েট, সামনে এসে গায়ের জোরে খেতে পারছ না গবেট? কে তোমাকে খাইয়ে দেবে শুনি? নিজেকে চেষ্টা করে খেতে হবে৷ অ্যায় নোলে, এইবার কান ধরে বের করে দোব৷ অনেক সহ্য করেছি৷ এর আগে দুবার ওয়ার্নিং দিয়েছি৷ বি কেয়ারফুল৷ অন্যদের খেতে দাও৷’

অতগুলো পায়রার মধ্যে কে যে নোলে, দাদুই জানেন আর নোলে নিজে জানে৷

পায়রাদের ওড়াউড়ি, ঝটরপটর, লটাপটি দেখতে বেশ ভালো লাগে৷ দাদু রোজই পায়রাদের খেতে দেন৷ কিন্তু রোববার ছাড়া দেখার উপায় নেই তো৷ আমার সকাল যে কী সকাল তা আমি জানি আর আমার বাবা জানেন৷ খ্যাঁড়র করে অ্যালার্ম বাজে৷ ভোর পাঁচটা৷ বাবার গম্ভীর গলা, ‘খোকা, খোকা৷’

বারান্দায় দাদুর খড়মের শব্দ খটাস-খটাস, সঙ্গে মন্ত্র-উচ্চারণের সুর, ভবসাগর তারণ কারণ হে৷ মা ঘষছেন পুজোর চন্দন৷ সেই শব্দ খসরখসর, তখন ঘুমচোখে খোকার সকাল শুরু হল৷ দ্যুত সকালের ঘুমই তো ঘুম! আমি যদি মানুষ না হয়ে কুকুর হতুম, তাহলে কেমন মজা করে, ঠ্যাং ছড়িয়ে যখন খুশি তখন ঘুমোতে পারতুম ভোঁস-ভোঁস করে৷ ভোরে উঠে নর, নরৌ ন্যাড়া করতে হত না৷ না বাবা, এসব কথা ভাবব না৷ দাদু বলেছেন, পৃথিবী ইজ সো বিগ, ইউনিভার্স ইজ সো ভাস্ট, জ্ঞান ইজ সমুদ্র, এক জীবনে সারা দিনরাত চেষ্টা করলেও ইঁদুরের কেকের কোনা কুরে খাওয়ার মতো৷ তিলমাত্র আয়ত্তে আসবে৷ চিয়ারাপ বুড়ো৷ দাদু আবার মাঝে মাঝে আমাকে বুড়ো বলেন৷ বিগম্যান হতে হবে৷ সারা পৃথিবী আমি চষে বেড়াব৷ ইউরোপ, আমেরিকা, স্পেন, ইতালি, মাদ্রিদ৷ বোঁ-বোঁ করে প্লেনে উড়ে চলে যাব, প্রফেসার বুড়ো৷

আজ যখন রবিবার, তখন একটু দাদুর পিছনে দাঁড়ালেও বাবা কিছু বলবেন না৷ মা এসে ফিসফিস করে বলবে না, ‘বকুনি খেয়ে মরতে যদি না চাও পড়তে বসো গে যাও!’

পায়রা দেখতে-দেখতে জনার্দনের দিকে একবার তাকাতেই ভীষণ হাসি পেয়ে গেল৷ টুলে বসে আছে যেন জমিদারের বাগানের একটা স্ট্যাচু৷ অর্ধেক সাদা, অর্ধেক কালো৷ সাদা অংশটা স্থির, কালো অংশ নড়ছে-চড়ছে৷ আমার হাসি শুনে জনার্দন রাগ-রাগ মুখে ফিরে তাকাল৷ এমনিই ভীষণ রেগে আছে আমার ওপর৷ সত্যিই প্লাস্টার ভীষণ ভারী৷ তার ওপর গরম কাল৷ তার ওপর মাকে দরদ৷ মায়ের কষ্ট হবে বলে উনুনের ধারে এসে বসেছে৷ গনগনে আগুন৷ প্লাস্টারের খাঁচায় বুক৷ কোমরে কাপড়ের কষি৷ সেখানে বটুয়া গোঁজা৷ বটুয়ায় জরদার কৌটো৷ আমার হাসি শুনে দাদু ফিরে তাকালেন৷ হাতে যে ক’টা ডালের দানা ছিল সব ছড়িয়ে দিয়েছেন৷ পায়রারা গাদা-গাদি, ধাক্কাধাকি, ঝটাপটি করে খাচ্ছে!

‘এই যে বুড়ো গুন্ডা, হাসি হচ্ছে যে বড়? পিতা ঠাকুরের নজরে পড়েছ সকাল থেকে একবারও?’

বাবা সবে বাইরের টেবিলে গিয়ে বসেছেন৷ সকালের দিকে হুমড়ি খেয়ে খবরের কাগজ পড়ার অভ্যাস তাঁর নেই৷ কাগজে কী আর থাকে? কাজ৷ সবসময় কাজ করে যাও৷ পড়তে হয় ব্যাকরণ পড়ো, অঙ্কের বই পড়ো, টানস্লেশন পড়ো, লক্ষ করো ইংরেজির ব্যবহার৷ কাগজের খুনোখুনি, নাটক, নভেল, সব পোড়াও৷ সেই লাইব্রেরি থেকে একটা বই এনেছিলুম৷ গল্পের বই, আগমনি৷ জুতোর বাক্সর মধ্যে লুকিয়ে রাখতুম৷ শেষবেলায় ছাদের চিলেকোঠার ধারে বসে-বসে পড়তুম৷ কীভাবে বইটা একদিন বাবার হাতে পড়ে গেল৷ এদিকে তিনটে অঙ্ক ভুল, ওদিকে জুতোর বাক্স থেকে আগমনির আত্মপ্রকাশ৷ আর যায় কোথায়? বাবা সোজা রান্নাঘরে৷ মাকে সরিয়ে, উনুন থেকে দুধ নামিয়ে, আগমনি আগুনে৷ পুড়ে ছাই৷ ওদিকে বই পুড়ছে, এদিকে আমার চোখে জল৷ দাদু ফিসফিস করে বললেন, ‘কত দাম লেখা ছিল দাদু?’

আমি বললুম, ‘সাত৷’

‘ভাবনা নেই! কিনে দোব৷’

এতক্ষণ দাদু পায়রা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন৷ আমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জনার্দনকে দেখে ফেলেছেন৷ দাদু অবাক হয়ে বললেন, ‘এ হর-পার্বতীটি কে হে? ঊর্ধ্ববাহু ধবল, নিম্নাঙ্গ কৃষ্ণ?’

‘জনার্দন দাদু৷’

জনার্দন এইবার বেশ রাগের গলায় বললে, ‘আবার হাসা হচ্ছে! বুঝতে যদি নিজের হতো!’

দাদু মাথা নাড়লেন, ‘ঠিক-ঠিক৷ তবে জনার্দন, এখন তো বুঝলে বাবা ভাষার কত ওজন৷ একটি অভিধান বুকে পড়লে একমাস প্লাস্টার বেঁধে বসে থাকো৷ ভাষা বলশালী, ভাব তুরঙ্গ, অনন্তরঙ্গে, চলিছে তরঙ্গ৷’

কোথা থেকে একটা শ্লোক বলে দাদু আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন৷ হঠাৎ জনার্দন তিড়িং-বিড়িং করে লাফিয়ে উঠল৷

‘কী হল রে৷’

পিঠের দিকে হাত নিয়ে গিয়ে প্লাস্টারের ব্যান্ডেজের ফাঁক দিয়ে আঙুল ঢুকিয়ে জনার্দন চুলকোবার চেষ্টা করছে৷ কিছু একটা হয়েছে পিঠের দিকে৷

‘কী হয়েছে বলবি তো?’ দাদু অধৈর্য হয়ে পড়েছেন৷ জনার্দন অসহায়ের মতো মুখ করে বললে, ‘কী একটা ভীষণ কামড়াচ্ছে৷’

‘কুটকুট করে, না যাকে বলে দংশন!’ দাদুর উকিলি জেরা৷

‘আজ্ঞে দংশন!’

‘দংশন কী রে? তা হলে যে বিছে, না হয় সাপের বাচ্চা ঢুকেছে৷ নাও এবার বোঝো ঠ্যালা৷ মাদুর পেতে মেঝেতে শুয়ে থাক!’ জনার্দন প্রায় কেঁদে ফেলে আর কী! হঠাৎ দাদু আবার প্রশ্ন করলেন, ‘তুই দংশন কাকে বলে জানিস? দংশন তো সংস্কৃত শব্দ! দংশনের মানে জানিস বেটা?’

‘আজ্ঞে না৷’

‘আজ্ঞে না তো দংশন বললি কেন?’

আমি দৌড়ে গিয়ে জনার্দনের পিঠের দিকে উঁকিঝঁকি মেরে দেখতে লাগলুম৷ যদি কিছু দেখা যায় ফাঁক দিয়ে৷ অসম্ভব৷ জমাট করে বাঁধা৷ দাদু বললেন, ‘কিছুই দেখতে পাবে না৷ ছারপোকা ঢুকে বসে আছে৷ ব্যান্ডেজ, লেপ, তোশক, মাদুর, ছারপোকার প্রিয় আস্তানা৷ ঢুকেছে ছুঁচ হয়ে, বেরোবে ফাল হয়ে৷ কলোনি করে বসে থাকবে৷’

আমি বললুম, ‘জনার্দনকে একটু রোদে দিলে হয় না?’

দাদু হো-হো করে হেসে উঠলেন৷ আর তখনই বাবা চিৎকার করে ডাকতে লাগলেন, ‘খোকা-খোকা৷’

মালকোঁচা মেরে ধুতি পরে তার ওপর ফুল হাতা সাদা শার্ট পরে বাবা ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে৷ দূর থেকে মা হেঁটে আসছেন, হাতে গোটা তিন-চার বড়, মাছারি, ছোট ব্যাগ, তেলের টিন, গুড়ের ক্যান৷ বাবার ডাক শুনে, মায়ের চেহারা দেখে মন খারাপ হয়ে গেল৷ মরেছে, আজ রোববার৷ বাবা বাজার করতে ভালোবাসেন৷ আমাকে নিয়ে বাজারে ঢুকবেন৷ এখন সাড়ে সাতটা, বাড়ি ফিরতে-ফিরতে এগোরোটা৷ সে যে কী কষ্ট, আমিই জানি আর ভগবান জানেন৷ কেন যে মানুষ হয়ে জন্মালুম! ভয়ে-ভয়ে ঘরে এসে দাঁড়ালুম৷ বাবার মুখ তেমন গম্ভীর নয়৷ মানে রাগ নেই৷ রেগে নেই৷ যেন খেলতে যাবেন এইরকম উৎসাহে বলে উঠলেন৷

‘একি, তুমি এখনও রেডি হতে পারনি? গেট রেডি, গেট রেডি এথেডরেল দ্য আনরেডি৷’

নিচু হয়ে মেঝে থেকে ছাড়া কাপড় তুলে নিয়ে আঙুল দিয়ে কোঁচাতে লাগলেন৷ এমন সুন্দর সকালটা! ছেঁড়া কোটের পকেটে একগাদা চকচকে বকুল বিচি জমিয়েছি৷

শ্যামল, সুহাসরা একটু পরেই মাঠে আসবে৷ জিততাল খেলা আর হল না৷ এমন সময় দাদু ঘরে ঢুকলেন বলতে-বলতে, ‘হু ইজ আন রেডি? হি ইজ এভাররেডি৷ পিতাপুত্রে চললে কোথায়?’

মা বললেন, ‘বাজারে৷’

‘বাজারে! ভেরি গুড প্লেস৷ উঃ কতদিন বাজারে যাইনি৷ চলো আজ আমিও যাই তোমাদের সঙ্গে?’

বাবা আলনায় কোঁচানো কাপড় রাখতে-রাখতে বললেন, ‘গাড়িতে নয়, হেঁটে যেতে হবে কিন্তু৷’

‘অ সিওর৷ গটগট করে হেঁটে যাব৷ তোমাদের আগে-আগে৷ শুধু একটু সময় দাও৷ সেজেগুজে জল খেয়ে আসি!’

মা বললেন, ‘দুধ! আপনার দুধ!’

দাদুর মুখের চেহারা করুণ৷ মার হাতে পড়ে আমার মতোই অসহায় অবস্থা৷ সাতসকালে পৃথিবীতে এত খাবার জিনিস থাকতে কার ভালো লাগে চকচক করে দুধ খেতে বেড়ালের মতো? মুড়ি চানাচুর ভাজা, লুচি, আলুর দম, গরম আলুর চপ, ডবল ডিমের ওমলেট, তা না দুধ, পাকা পেঁপে, দই দিয়ে আস্ত একটা কাঁচকলা চটকানো৷ শরীর, স্বাস্থ্য করে-করেই আমার মায়ের শরীর খারাপ হয়ে গেল, মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল৷

‘দুধটা বাজার থেকে ফিরে এসে খাব, কেমন? এইমাত্র আদাছোলা খেলুম৷ দুটো খেজুর খেয়েচি আবার৷ খেজুর হল হেলথের গোল্ড মাইন৷ টু খেজুরস অ্যাট এ টাইম৷’ দুটো আঙুল তুলে দাদু খেজুর খাওয়াটা যে কত উপকারী তা মায়ের চোখের সামনে স্পষ্ট করলেন৷

বাবার ভীষণ তাড়া বলে দাদু দুধের হাত থেকে বেঁচে গেলেন৷ দাদু চলেছেন আগে-আগে৷ তাঁর পিছনে আমি, হাতে ঝোলাঝুলি৷ সবশেষে বাবা, হাতে তেলের টিন, গুড়ের ক্যান৷

অনেকদিন পরে বাজারে যাওয়ার অনুমতি পেয়ে দাদু ভারি খুশি৷ কী আনন্দ৷ যে জামাটা পরেছেন সেটাকে বলে ব্যানিয়ান৷ পাশে গলা, ঘাড়ের দিকে বোতামের বদলে ফিতের ফাঁস৷ ঘাড়ের কাছে কোঁচকানো-কোঁচকানো চুল৷ ফরসা টকটকে রং৷ সবাই বলেন, তোমার দাদু যেন পাকা পেয়ারাটি! মায়ের কত গর্ব! কথায়-কথায় বলেন, তুই তো একটা কেলেভূত৷

বাবা ভীষণ জোরে হাঁটেন৷ ঘাড় উঁচু, শরীর সোজা জুতোর শব্দ কি! খ্যাট, খ্যাট৷ চটি পরেন না৷ পায়ে সবসময় অ্যালবার্ট সু৷ চটি হল ফচকেদের৷ বাবা আমাকে মেরে দাদুর পাশাপাশি গিয়ে পড়েছেন৷ কোনও হাঁটার প্রতিযোগিতা নয়৷ বাবা হাঁটছেন আপন মনেই৷ দাদু একবার ঘাড় ঘুরিয়ে বাবা এসে পড়েছেন দেখে ঝিঁকি মেরে খুব জোরে-জোরে হাঁটতে লাগলেন যেন বাবা না ধরে ফেলেন৷ দুজনে খুব রেস চলেছে৷ দাদুও কম যান না৷ মালকোঁচা মারা কাপড়৷ পায়ে ক্যামবিসের জুতো৷ কাঁধে-কাঁধে দুজনে চলেছেন৷ আমি পিছন-পিছন আসছি দৌড়ে-দৌড়ে৷ হেঁটে পারব কেন? ওদের লম্বা-লম্বা পা আমার ছোট-ছোট পা৷ তবে দৌড়ে আমার দম বেশি৷ একটা একশো কি দুশো কি পাঁচশো মিটার রেস হয়ে যাক আমার সঙ্গে, আমিই জিতে যাব৷ খুব ওয়াকিং চলেছে৷ কেউ কাউকে হারাতে পারছেন না৷ এই মনে হচ্ছে বাবা এক হাত এগোলেন, দাদু অমনি ঝিঁকি মেরে পাশাপাশি এসে পড়ে মেকআপ করে নিলেন৷ রাস্তার দু-পাশের লোক হাঁ করে দেখছেন৷ সাতসকালে এ আবার কী? বিখ্যাত একজন উকিল আর একজন রাশভারী ইঞ্জিনিয়ার হঠাৎ কমপিটিশন লাগিয়ে দিয়েছেন৷ দিনুকাকা বাজার করে উলটোদিক থেকে ফিরছিলেন, থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন৷ তারপর চিৎকার করে বললেন—‘চিয়ার আপ, চিয়ার আপ৷’

বাজারের মোড়ে এসে দু-জনেই থেমে পড়লেন৷ দাদু একটা হাত মাথার ওপর তুলে জানিয়ে দিলেন—‘ব্যস কমপিটিশন শেষ৷ দু-জনেরই নিঃশ্বাস পড়ছে জোরে-জোরে৷ বাবার কম জোরে, দাদুর বেশি জোরে৷ বাবা ডান হাতটা সামনে এগিয়ে দিলেন৷ মুখ ভীষণ খুশি-খুশি৷ দাদু যেন পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন! দাদুর হাত ধরে সে কী জোরে-জোরে শেক হ্যান্ড, ‘ভেরি গুড, ভেরি, ভেরি গুড৷’ দাদুর মুখে কেমন লাজুক-লাজুক হাসি!

‘এখনও পারি, কী বলো?’

‘খুব পারেন৷ ডোন্ট থিঙ্ক আমি আপনাকে মার্সি দেখিয়ে ধীরে-ধীরে হেঁটেছি৷ আমার সাধ্য মতোই হেঁটেছি৷ ভেরি গুড, ইউ আর ইন ফুল ফর্ম৷ বাই দ্য গ্রেস অফ গড৷’

আকাশের দিকে বাবার মুখ, দাদুর হাতে-হাত মেলানো৷ চারপাশে ভিড় জমে গেছে৷ হচ্ছে কী এখানে? ‘কী হল কী?’ বলে একজন এগিয়ে এসেছিলেন৷ বাবা সাংঘাতিক গম্ভীর মুখে বললেন, ‘নাথিং’৷ বগলে পাট-পাট ব্যাগ চেপে ধরে ভালোমানুষ চেহারার মানুষটি ভয়ে-ভয়ে সরে পড়তে-পড়তে বললেন, বাব্বা, ‘কী মেজাজ৷’

এবার আমরা ধীরে-ধীরে হাঁটছি৷ বাজারের চৌহদ্দিতে ঢুকে পড়েছি৷ পচা পাতা, জল কাদা, ন্যাজ তোলা গরু, বেপারিদের কান ফাটানো চিৎকার৷ ঠেলাঠেলি, কনুই মারামারি৷ মাছের বাজারের বিকট গন্ধ৷ মাংসের দোকানে পাঁঠা জবাইয়ের করুণ আর্তনাদ! পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ জায়গা এই বাজার৷

আমার কাছে খারাপ জায়গা হলে কী হবে, বাবা আর দাদুর কাছে যেন স্বর্গ৷ আমি হাঁ করে ওঁদের মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি৷ দুজনে মহানন্দে কী-কী কেনা হবে, কেনা উচিত তারই পরিকল্পনা করে চলেছেন৷ এটা কি একটা দাঁড়াবার জায়গা৷ সবাই যেখানে চলেছে? পায়ের নিচে পচা পাতা, পেঁয়াজের খোসা৷ অনবরতই পিছনে ধাক্কা মেরে-মেরে সবাই যাওয়া-আসা করছেন৷ কখনও বাবা, কখনও দাদু সামনের দিকে ধাক্কা খেয়ে ঝুঁকে-ঝুঁকে পড়ছেন৷ গ্রাহ্য নেই, বিরক্তি নেই৷

দাদু বললেন, ‘শোনো, বেশ গুছিয়ে, ভালো করে বাজার করতে হলে সুন্দর পরিকল্পনা চাই৷ হ্যাপহ্যাজার্ড বাজার করা হল ওয়েস্ট অফ টাইম, মানি অ্যান্ড মেটিরিয়াল৷ কী ঠিক না?’

একটা গরুর ধাক্কা খেয়ে উলটে পড়ে যেতে-যেতে বললেন, ‘সেন্টপারসেন্ট কারেক্ট৷’

‘তা হলে লেট আস ফাইনালাইজ আওয়ার ডেজ মেনু৷’

‘ইয়েস লেট আস ডু ইট৷’

‘অনেকদিন ভাজা মুগের ডাল হয়নি, রুই কি মৃগেলের মাথা দিয়ে৷’

‘ঠিক৷ ঠিক বলেছেন আপনি৷ ভালো সোনামুগ পাওয়াই তো মুশকিল৷ গন আর দ্য গ্লোরিয়াস ডেজ৷ ওই পলিটিসিয়ানরা দেশটাকে নিজেদের স্বার্থে ছিঁড়েখুঁড়ে টুকরো-টুকরো করে দিলে, সোনা মুগের পোর্শানটা চলে গেল বেহাতে৷ এখন মালদাই ভরসা৷’

‘এই সর্বনাশের পিছনে কিন্তু তোমার ওই ইংরেজদের ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি আছে৷ ওরা কিন্তু বাপু সেন্টপারসেন্ট ভালো লোক ছিল না!’

‘আই প্রোটেস্ট৷’

‘ইংরেজদের নিন্দে তুমি সহ্য করতে পারো না, তাই তোমার প্রোটেস্ট৷ বাট দে ওয়্যার ব্যাড পিপল৷’

‘নট অ্যাজ ব্যাড অ্যাজ ইন্ডিয়ানস৷’

সেরেছে! দুজনে তক্কাতক্কি শুরু করেছেন৷ কে এখন সামলাবে! মা থাকলে দাদুকে সরিয়ে নিতেন৷ হে ঈশ্বর বড়দের সুমতি দাও৷ ঈশ্বর এলেন গরুর বেশে৷ যে গরুটা বাবাকে ঠেলা মেরে ওদিকে চলে গিয়েছিল, সেই গরুটা এবার ওপাশের তাড়া খেয়ে, আমাকে ঢুঁ মেরে দাদুর ঘাড়ের ওপর দিয়ে বিশাল একটা মুলো মুখে করে চলে গেল৷ দাদু সামনের দিকে বাবার বুকের ওপর উলটে পড়লেন৷ দাদুকে বুকে জড়িয়ে ধরে বাবা বললেন, ‘আমার মনে হয় সিরিয়াস কোনও আলোচনার পক্ষে দিস ইজ এ ভেরি ব্যাড প্লেস৷’

‘ইয়েস রাইট ইউ আর৷ চলতে-চলতে, কিনতে-কিনতে মেনু হবে৷ যেমন ধরো, সামনেই দেখছি লাল মুলো৷ রং দেখেছ? যেন জল রঙে আঁকা স্টিল লাইফ৷ মুলোর ওপর একটা মেনু খাড়া করো৷ মুলো, ছোলা, বড়ি, পালং শাক৷ তৈরি হল ঘণ্ট৷ আবার মুলো, পেঁপে, কাঁচকলা, করলা, বেগুন, সিম৷ হয়ে গেল সুক্তো৷ সামান্য কাঁচা দুধ৷ মেথি ফোড়ন৷ অ্যাজ উপকারী অ্যাজ মেডিসিন৷’

বাবা বললেন, ‘তাহলে মুলো দিয়েই ওপন করা যাক৷’ সামনেই যে লাল মুলোটা দাঁত বের করে শুয়েছিল বাবা তার পিঠে ঘ্যাঁচ করে বুড়ো আঙুলের নখ বসিয়ে রায়, দিলেন, ‘রূপ আছে গুণ নেই৷’

দাদু বললেন, ‘কী ডিফেক্ট?’

‘জালি হয়ে গেছে৷ ছিবড়ে হবে৷ মুলো হবে কীরকম, ভাতের হাঁড়ি থেকে যে স্টিম উঠছে, তার ওপর ধরলেই সেদ্ধ হয়ে খসখস করে ভেঙে-ভেঙে পড়বে৷’ ব্যাপারি বাবার চেনা৷ তাই বিরক্ত হয়ে কিছু বলছে না! তা না হলে এই ভিড়ের সময় এক ধমক দিয়ে ভাগিয়ে দিত৷

নখের পরীক্ষায় পাশ করে ছ’টা বিরাট-বিরাট বুনো হাতির দাঁতের মতো মুলো ব্যাগে ভরা হল৷ কী হবে এত মুলো কে জানে! একে না কি বলে কেনার আনন্দে কেনা৷

একটা সিম দু-আঙুলের চাপে ফাটিয়ে পরীক্ষা করা হল৷ দাদু বাবার কাঁধের ওপর দিয়ে উঁকি মেরে জিগ্যেস করলেন, ‘কী বুঝলে?’

‘চলবে৷ ভেতরের দানা বেশ সাইজে এসেছে, ‘কালো জিরে কি সরষে দিয়ে ছেঁচকিও খুব উপাদেয় হবে৷ মেয়েদের খুব ফেভারিট৷’

‘আমাদেরও৷’ দাদু সিমের একটা দানা মুখে ফেলে দিলেন৷ আমার ওপর এতক্ষণ পরে একটা কাজের ভার পড়ল৷ সিমের গায়ে হাত বুলিয়ে-বুলিয়ে দানাওলা সিম ছোট একটা ঝুড়িতে বেছে-বেছে তোলা৷ ভালো কাজ৷ মনের মতো কাজ৷ সবুজ ভেলভেটের মতো শরীর৷ তেল চুকচুকে৷ কাঁচা-কাঁচা গন্ধ৷

দাদু বললেন, ‘দেখো, সবকটার দানা থাকা চাই৷’

বাবা বললেন, ‘আমার সঙ্গে বাজার ঘুরে-ঘুরে ও এক্সপার্ট হয়ে উঠেছে৷ এই বয়েসেই পাকা পটল, কাঁচা পটল চিনতে পারে, পাকা ঢেঁড়স, কাঁচা ঢেঁড়স চিনতে শিখেছে৷’

বাবার প্রশংসা শুনে আমার একটু ডাঁট বেড়ে গেল৷ আমিও কম যাই নাকি! বাবা আর একটা বললেন না, মাছের কানকো তুলে আমি বলে দিতে পারি টাটকা না পচা! দেখতে-দেখতে দুটো ব্যাগ ভরে উঠল৷ জালি ব্যাগে বিশাল মাছ ঢুকল৷ তিনরকম মাছ, ভাজার, ঝালের, ঝোলের, কালিয়ার৷ বড়-বড় গলদা দেখে দাদু খুব বায়না ধরেছিলেন৷

বাবা বললেন, ‘নো৷ আই ওন্ট অ্যালাউ৷ চিংড়ি ইজ পয়েজন৷’

সবই ভালোয়-ভালোয় হয়ে এসেছিল৷ মুদির দোকানে তেল, খেজুর গুড়, কলাপাতায় মোড়া মাখন, মিছরি, পাঁপড়, সোনামুগ৷ বোঝা হয়েছে গন্ধমাদনের মতো৷ দোকান থেকে বেরোতে-বেরোতে দাদু বললেন, ‘হঠাৎ মনে হল ডুমুর বড় উপকারী৷’

বাবা বললেন, ‘ইয়েস ডুমুর৷ ফিগস ফর লিভার৷’

একমুখ হেসে দাদু আর এক ফ্যাচাং জুড়লেন, ‘কয়েত বেল৷ মনে পড়ে সেই ছেলেবেলায় লঙ্কা আর গুড় মেখে কয়েত বেল কলাপাতার খোলে রোল করে, দুপুরে খেজুর গাছের ছায়ায় বসে চুষে-চুষে খাওয়া৷’

‘আ কয়েত বেল৷ তখন ম্যালেরিয়ার ভয়ে ভালো করে খাওয়া হয়নি৷ এইবার, এইবার লেট আস টেক প্রতিশোধ৷’

দোকানের বেঞ্চিতে মালপত্র সমেত আমাকে বসিয়ে রেখে দুজনে প্রতিশোধ নিতে আবার বাজারে ঢুকে পড়লেন৷ দোকানের কালো রঙের ঘড়িতে এগারোটা বাজতে আর মাত্র দশ মিনিট বাকি৷ আমার বাঁ-পাশে ভেলিগুড়ের বস্তা৷ দুটো হলুদ বোলতা ভেসে-ভেসে উড়ছে৷ নাকের ডগায় তেড়ে-তেড়ে মাছি বসছে৷ ভীষণ রাগ ধরছে৷ তবু কয়েত বেলের আশায় সিঁটকে বসে থাকি৷ ডুমুর একটা থার্ড ক্লাস জিনিস৷

দুটো রিকশা৷ প্রথমটায় বাবা৷ পায়ের কাছে, কোলে হাতে অজস্র মালপত্তর৷ দেখলে মনে হবে সারা বাজারটাই কিনে ফেলা হয়েছে৷ কিছু আর বাকি নেই৷ পায়ের কাছে ব্যাগগুলোকে সামলে রাখার জন্যে বাবা সামনের দিকে ঝুঁকে আছেন৷ দ্বিতীয় রিকশায় আমি আর দাদু৷ আমার পায়ের কাছে মাছের ব্যাগ৷ একটু নিচু হয়ে হাতল দুটো ধরে রাখতে হয়েছে৷ এত বড় একটা ভেটকি মাছের ল্যাজ বেরিয়ে আছে৷ দাদুর কোলে দইয়ের হাঁড়ি৷ দ্বিতীয় অভিযানে শুধু কতবেল নয়, দইও কেনা হয়েছে৷ হারু ময়রার দই বিখ্যাত৷ বাবাতে আর দাদুতে প্রায়ই কথা হয়৷ যেমন দই তেমনি সন্দেশ৷ নোবেল প্রাইজ দেওয়া উচিত৷ অমনি তর্ক বেধে গেল৷ দাদু প্রমাণ করে ছাড়লেন, এটা আবিষ্কারের মধ্যে পড়ে না৷ এটা সৃষ্টিকর্ম, উঁচুদরের সৃষ্টি, সেরা সাহিত্যের সমান৷ সাহিত্যেও রস, হারুর সৃষ্টিতেও রস৷ ওর গোলাপি গুঁজিয়া সাহেবও চেটে দেখবে৷

হঠাৎ দাদু বললেন, ‘রোককে, রোককে৷’

রিকশা থেমে পড়ল৷ আবার কী হল? প্রায় বারোটা বাজতে চলল৷ দাদুর আবার কিছু মনে পড়ল নাকি? মরেছে৷ ডানপাশে বিরাট একটা পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকান৷ রিকশায় বসে-বসেই দাদু হাঁক মারলেন, ‘ভালো জাফরানি পাত্তি জরদা আছে মধু!’

দোকানদারের নাম মধু! এই দোকান থেকেই দাদু ধূপ, দেশলাই কেনেন৷ মধু বললে, ‘অফকোর্স৷’ মধু আবার কথায়-কথায় ইংরেজি বলে৷

‘একটা কৌটো দেখি৷’

রিকশালা নেমে গিয়ে কৌটোটা নিয়ে এল৷

দাদু হাতে নিয়ে বললেন, ‘এক নম্বর?’

‘নাম্বার ওয়ান৷ মুখে দিলেই মাথা রাউন্ড করবে৷’

‘রাউন্ড নয় রিল করবে মধু৷ ভুল ইংরেজি বোলো না৷’

‘আজ্ঞে খেয়াল ছিল না৷ অসিলেট করবে৷’

‘আহা, কোথায় কী লাগাচ্ছ? অসিলেট মানে দোলা৷ যেমন ঘড়ির পেন্ডুলাম দুলছে৷ কী ইংরেজি হবে?’

মরেছে! বাবার রিকশা কোথায় এগিয়ে গেছে, দাদু এখন মধুকে ইংরেজি শেখানো শুরু করলেন৷ আমার কাছে সবচেয়ে ইম্পর্টেন্ট জিনিস মাছ৷ এদিকে যত দেরি হবে, ওদিকে খেতেও তত দেরি হয়ে যাবে৷ মধু বললে, ‘পেন্ডুলাম অসিলেট৷’

‘উঁহু, কর্তা একবচন হলে ক্রিয়াও একবচন হবে৷ পেন্ডুলাম অসিলেটস৷ এস লাগা মধু এস লাগা৷ টেনস ঠিক হল না! তেছি, তেছ, তেছে৷ ঘটমান বর্তমান৷ প্রেজেন্ট কন্টিনিউয়াস৷’

হে ঈশ্বর বাঁচাও৷ রিকশার পিছনে একটা লরি এসে ভ্যাঁক-ভ্যাঁক করে হর্ন দিচ্ছে৷ তখন দাদু হাতটা মাথার ওপর তুলে লরিচালককে থামবার ইশারা করলেন৷ মুখে বললেন, ‘ডোন্ট ডিসটার্ব৷’ রিকশাঅলা বললে, ‘রাস্তা আটকে গেছে বাবু৷ পিছনে গাড়ির পরে গাড়ির সার৷’

আর গাড়ি৷ দাদু মধুকে টেনস শেখাচ্ছেন৷ ‘ঘড়ির পেন্ডুলাম, দ্য পেন্ডুলাম অফ দি ক্লক ইজ অসিলেটিং৷’

রিকশা চলতে লাগল৷ রাস্তা সচল হল৷

দাদু বললেন, ‘আজ জনার্দনকে একটা সারপ্রাইজ দোব৷ আজ আমরা জনার্দনের জন্মদিন করব৷’

‘জরদা জনার্দনের জন্যে কিনলেন দাদু?’

‘ইয়েস৷’

‘ওর হাঁপানি আছে৷ আবার জরদা দেবেন!’

‘হোয়াই নট৷’

মধুর সঙ্গে ইংরেজি হয়েছে৷ এখন বেশ কিছুক্ষণ ইংরেজি হবে৷

‘ডাক্তারবাবু বারণ করেছেন যে দাদু৷’

‘হ্যাং ইওর ডক্টর৷’

এর মানে কী? হ্যাং মানে ঝোলানো৷ ডাক্তারকে ঝোলাও৷ আমার একটু হিংসে হচ্ছে৷ জনার্দনের সঙ্গে তেমন ভাব হয়নি আমার৷ তাকে এত খাতির কেন? মা বলেন, ‘তোতে আর জনার্দনে যেন সাপে নেউলে৷’

বাড়ির সামনে রিকশা দাঁড়াল৷ গেটে বাবা দাঁড়িয়ে৷ মালপত্তর সব ভেতরে পাচার৷ বাবার হাতে দইয়ের হাঁড়িটা দিতে-দিতে দাদু বললেন, ‘একটু দেরি হয়ে গেল৷ মধুটাকে নিয়ে আর পারা গেল না৷ এমন ভুল ইংরেজি বলে!’

দাদু রিকশা থেকে নেমে টান-টান হয়ে দাঁড়ালেন৷ রিকঅশালা ভাড়া নিয়ে রাস্তায় একটা পাক মেরে হর্ন বাজাতে-বাজাতে চলে গেল! বাবা বললেন, ‘ওকে একটা গ্রামার কিনে দিতে হবে৷’

‘বড্ড অমনোযোগী৷ বলে দিলেও মনে রাখতে পারে না৷’

বাবা সঙ্গে-সঙ্গে বললেন, ‘ঠিক এর মতো৷’

আমি জানতুম আমার তুলনা আসবেই৷ সব খারাপেই আমি৷ আমার বরাত! দাদু অবশ্য বিনা প্রতিবাদে কিছু মেনে নেন না৷ এখনও নিলেন না৷ এই দাদুই আমার একমাত্র বন্ধু৷ দাদুর চোখে দেখলে আমার মধ্যেও অনেক ভালো খুঁজে পাওয়া যাবে৷ দাদু বললেন, ‘তুমি কি মনে করো এ টেনস জানে না?’

‘আই ডাউট৷’

‘বেশ পরীক্ষা হয়ে যাক৷ হাতে পাঁজি মঙ্গলবার কেন? লেট আস টেস্ট হিম৷ এসো ওই কামিনীগাছের বেদিতে বসা যাক৷’

আমি হাঁ হয়ে গেলুম৷ এ কী রে বাবা৷ এখন আমাকে পরীক্ষা দিয়ে প্রমাণ করতে হবে আমি মধু নই৷ দাদু বেদিতে গ্যাঁট হয়ে বসেছেন৷ বাবা ফুঁ দিয়ে ধুলো উড়িয়ে বসতে যাচ্ছেন৷ এইটাই বাবার অভ্যাস৷ যখনই কোথাও বসবেন ফুঁ দিয়ে ধুলো ওড়ানো চাই৷ মাঝেমধ্যে সিনেমায় গেলেও ওই এক ব্যাপার৷ সকলেই আশ্চর্য হয়ে যান৷ মা বাঁচিয়ে দিলেন৷ দরজার সামনে এসে বললেন, ‘আপনারা মাছ আনেননি?’

দাদু বললেন, ‘সে কি? যাঃ মাছের ব্যাগটা বোধহয় সেই দোকানেই পড়ে রইল৷ আমাদের অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড প্রফেসরের ওপর ভার ছিল৷’

তার মানে আমি৷ সঙ্গে-সঙ্গে বাবা বললেন ‘জানতুম৷ এই রকমই হবে৷’

আমি মাছের ব্যাগটা ভয়ে-ভয়ে ওপর দিকে তুলে বললুম, ‘এই তো আমার হাতে৷’

বাবা বললেন, ‘সে কী? তোমার হাতে? ভেতরে দিয়ে আসনি কেন? আচ্ছা অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড৷’

দাদু অমনি বাবাকে চেপে ধরলেন, ‘তোমার হাতেও তো দেখছি দইয়ের হাঁড়ি!’

‘ও হ্যাঁ, তাই তো৷’ বাবা আর দাদু দুজনেই হেসে উঠলেন৷ দাদু বললেন, ‘আমরা অন্য জগতে চলে গিয়েছিলুম, ইন এ ডিফারেন্ট ওয়ার্লড, যেখানে মাছ নেই, দই নেই, বাজার নেই৷’

মা বললেন, ‘বাঃ বেশ মজা তো৷ ওদিকে আঁচ বইছে আর এদিকে আপনারা বাগানে গাছতলায় বসে চড়ুইভাতি করছেন৷’

দাদু হাত তুলে বললেন, ‘স্ট্রেঞ্জ আর দ্য বিহেভিয়ারস অফ ম্যাড মেন৷’

‘ভেতরে আসুন৷ চা হয়েছে৷’

‘কিন্তু চড়ুইভাতি?’

বাবা বললেন, ‘ধরেছি৷ আপনার মনের কথা ধরে ফেলেছি৷ এই মিঠে-মিঠে রোদে ফুরফুর বাতাসে চড়ুইভাতি জমবে ভালো! আজই হয়ে যাক৷’

হাঁটুতে তালি মেরে দাদু বললেন, ‘হয়ে যাক৷’

দুজনেই হই-হই করতে-করতে মাকে একপাশে ঠেলে-ঠুলে সরিয়ে দিয়ে বাড়ি ঢুকলেন৷ মা পিছনে-পিছনে চলতে-চলতে বলছেন, ‘কী ব্যাপার? এই অবেলায় বলা নেই কওয়া নেই চড়ুইভাতি!’

আমার বেশ মজা লাগছে৷ জমবে ভালো৷ দাদু হাঁকলেন ‘জনার্দন৷’

বাবা হাঁকলেন, ‘জনার্দন৷’

মা বললেন, ‘জনার্দন কী করবে? আমাকে বলুন না!’

দাদু উত্তর দিলেন, ‘আজ জনার্দনের জন্মদিন উপলক্ষে বাগানে চড়ুইভাতি হবে৷’

‘এখন ক’টা বেজেছে জানেন?’

বাবা বললেন, ‘আজ আর ঘড়িটড়ির ব্যাপার নেই৷ আজ আমাদের পিকনিক৷ পিকনিক ইন দ্য গার্ডেন৷ আমরাও রাঁধব৷ কিন্তু জনার্দনের জন্মদিন হল কী করে? আপনি কী করে জানলেন?’

‘আমার মনে হচ্ছে৷ আই থিংক৷ আই ডাউট৷ আমার সন্দেহ হচ্ছে আজই ওর জন্মদিন৷ জন্মদিন কাছাকাছি এলেই মানুষের শরীর খারাপ হয়৷’

‘তাই না কি, তা হলে আজই ওর জন্মদিন৷’ বাবা খুব সহজেই মেনে নিলেন, বিনা প্রতিবাদে৷ দাদু চিৎকার করলেন, ‘জনার্দন৷’ জনার্দন বেরিয়ে এল হাতে ট্রে! সাজানো চায়ের কাপ!

‘এই যে জনার্দন, আজ তোর জন্মদিন৷ এই নাও তোমার জন্মদিনে জাফরানি পাত্তি৷’ জরদার কৌটো দেখে জনার্দনের মুখে হাসি ধরে না৷

বাবা আর দাদু চায়ের কাপ তুলে নিলেন৷ বাবা বললেন, ‘তোমার জন্মদিন উপলক্ষে আজ আমাদের বাগানভোজন হবে৷ মেনু—সরু চালের ভাত, মাছের মুড়ো দিয়ে কাঁচামুগের, না কাঁচামুগ নয়, স্পেশাল ভাজামুগের ডাল, আলুভাজা, ফুলকপি ভাজা, রুইমাছ ভাজা, মুলো সহযোগে ছোলাসহ, বড়িসহ পালং শাকের ঘণ্ট, বাঁধাকপি ভেটকি মাছ দিয়ে, টোম্যাটোর চাটনি, কচি কলাপাতার মোড়কে কতবেলের আচার, দই৷’

দাদু বললেন, ‘ফ্রাই হবে ভেটকির, একটু সুক্তোও চাই৷’

মা বললেন, ‘ওসব কখন হবে? এ বেলা খাবে, না ওবেলা খাবে?’

‘এ বেলা, এ বেলা৷ চারটে উনুন, চারজন রাঁধুনি, তুমি, আমি, বাবা, জনার্দন৷ আমি এটাকে প্রতিযোগিতার স্তরে নিয়ে যেতে চাই৷ যার রান্না সবচেয়ে ভালো হবে আমি তাকে বা তাঁকে একটা পুরস্কার দেব৷ আ গ্র্যান্ড প্রাইজ৷ বাবা আপনি প্রতিযোগীদের মধ্যে পদগুলো ডিস্ট্রিবিউট করে দিন৷’

‘হ্যাঁ, দিচ্ছি৷ আমি মুড়ো দিয়ে ভাজা মুগের ডাল, তুমি মাছ দিয়ে বাঁধা কপি, মেয়ে রাঁধবে ঘণ্ট, জনার্দন সুক্তো আর ফ্রাই, আমি চাটনি৷’

আমি আর থাকতে না পেরে বলে ফেললুম, ‘আমি করব কতবেলের আচার৷’

দাদু সঙ্গে-সঙ্গে বললেন, ‘অ্যাপ্রুভড্, মঞ্জুর, মঞ্জুর৷’

বাবা বললেন, সময় নষ্ট করা চলবে না৷ লেট আস মার্চ টু দ্য গার্ডেন৷’ মাকে বললেন, ‘চারটে উনুন চাই৷’ জনার্দনকে বললেন, ‘ধোয়া, কোটা সব শুরু করে দাও৷ তিনটের মধ্যে আমাদের খেতে বসতেই হবে৷ তোমার হেলপ চাই৷ শাবলটা নিয়ে এসো বাগানে একটা শামিয়ানা টাঙাতে হবে৷’

মা কিছু বলতে চাইছিলেন, বাবা বললেন, ‘নো বাগড়া৷ জীবনে অ্যাডভেঞ্চার না থাকলে একঘেয়ে হয়ে যায়৷ খোকা কুইক৷’

দাদু বললেন, ‘রাঁধুনির পোশাক পরে আমি নিচে নামছি৷’

মা অবাক হয়ে উঠনে দাঁড়িয়ে রইলেন৷ জনার্দনের হাতে জরদার কৌটো৷ আমি কাঁধে শাবল নিয়ে বাবার পিছন-পিছন চলেছি৷ বাগানে এইবার বাবার ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু হবে৷

আমার বাবা যেন অল্পেই অধৈর্য৷ অথচ আমাদের প্রায়ই বলেন, ‘ধৈর্য ধর, ধৈর্য ধর, বাঁধো বুক, শত দুঃখ জ্বালা আসিবে আসুক৷’ শাবলটা নিয়ে যেতে সামান্য দেরি হয়েছে বলে বেশ রাগ-রাগ মুখে বললেন, ‘ভেরি স্লো৷ সায়েবদের ছেলের মতো একটু চটপটে হতে পারো না৷’

শাবলটা হাত থেকে এক হ্যাঁচকা টানে কেড়ে নিয়ে, উবু হয়ে বসে ঝপাঝপ গর্ত খুঁড়তে শুরু করলেন৷ এইসব কাজে বাবা সিদ্ধহস্ত৷ আমার কিন্তু এখন মনে হচ্ছে চড়ুইভাতিটা তেমন সুবিধের হবে না৷ বাবা চাইবেন যন্ত্রের মতো কাজ৷ মানুষ তো আর যন্ত্র নয়৷ কেউই বাবার সঙ্গে তাল রেখে চলতে পারবে না৷ ঝটাপটি লেগে যাবে৷ পিকনিক তখন মাথায় উঠবে৷

বাবা গর্ত খুঁড়তে-খুঁড়তে বললেন, ‘দুটো বাঁশ পুঁতলেই হয়ে যাবে৷ বুঝেছ! এদিকে দুটো বাঁশ, ওদিকে দুটো সুপুরিগাছ৷ এমন মাথা খাটিয়ে জায়গা বেছেছি, কম পরিশ্রমেই হয়ে যাবে৷ একে বলে, কী বলে?’

আজ্ঞে, ‘বুদ্ধির্যস্যং বলং তস্য নির্বুদ্ধেতু কুত বলং৷’

‘ভেরি গুড৷ বুদ্ধির্যস্যং কীভাবে হল?’

‘আজ্ঞে বিসর্গ সন্ধি৷ বুদ্ধিঃ প্লাস যস্যং ইজিকলটু বুদ্ধির্যস্যং৷’

‘ভেরি গুড৷ ভেরি ভেরি গুড৷ তোমার সব আছে, একটু যদি পড়তে৷ লাট্টু, লেত্তি, ড্যাংগুলি, ঘুড়ি, গুলি এইসব সর্বনেশে জিনিস একটু ভোলার চেষ্টা করো না৷ ও সবের অনেক সময় পাবে৷ আগে পাশটাশ করে একজন ডাক্তার কি ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বোসো, তারপর কত খেলবে খেলো না৷ সারাদিন ঘুড়ি ওড়াও, ড্যাংগুলি খেলো, কেউ কিছু বলবে না৷ আমি নিজে তখন মাঞ্জা দিয়ে দেব৷ পেয়ারাগাছের ডাল কেটে ড্যাংগুলি তৈরি করে দেব৷ বুঝতে পেরেছ?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷’

‘কাল থেকে দেখা যাবে কেমন বুঝেছ৷’

বাবা কীরকম আশ্চর্য কথা বলেন৷ কোনও ডাক্তার কি ইঞ্জিনিয়ার এত বড়-বড় গোঁফ দাড়ি নিয়ে কখনও কি ঘুড়ি ওড়ান, না গুলি খেলেন! বড় হয়ে গেলে তখন কি ওইসব আর ইচ্ছে করবে! যে বয়েসের যা৷ কে বোঝাবে বাবাকে!

গর্ত খোঁড়া শেষ৷ পিছনের বাগানে উচ্ছে মাচার ওপর গোটাকতক বাঁশ শোয়ানো আছে৷ বাবা বললেন, ‘চলো, বাঁশ দুটো নিয়ে আসি৷’

পিছন, পিছন চললুম বাঁশ আনতে৷ উচ্ছে গাছের অসংখ্য সরু-সরু ফ্যাকড়া বাঁশগুলোকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়েছে৷ বাঁশ টানতে গেলে গাছের ক্ষতি হবে৷ বাবা বললেন, ‘দাঁড়াও, একটা চেয়ার আনি৷ মাচায় উঠে আস্তে-আস্তে, সাবধানে বাঁশ ছাড়াতে হবে৷’

মরেছে৷ দাদু কোথায়? দাদু এসে পড়লে এই বাঁশ সমস্যার হয়তো সহজ সমাধান বেরত৷ ভীষণ খিদে পাচ্ছে৷ বাবা, চেয়ার আর দাদু এক সঙ্গে এলেন৷ দাদুর কী চমৎকার সাজ! মালকোঁচা মারা ধুতি৷ তার ওপর একটা নস্যি রঙের তোয়ালে৷ গায়ে ফতুয়া৷ চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা৷ বাবা চেয়ারের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘বড় শক্ত কাজ৷ ধৈর্য আর সময় লাগবে৷’

দাদু বললেন, ‘তাহলে ছেড়ে দাও৷ নেমে এসো৷ তোমার দুটো খোঁটা লাগবে তো? বেশ লাগুক৷ আমার খাটের ছত্রি দুটো খুলে আনি৷ আবার লাগিয়ে দিলেই হবে৷’

‘উঁহুঁ, উঁহুঁ৷ ছত্রির সে স্ট্রেংথ নেই৷ একটা কাজ করলে হয়৷’

‘কী কাজ?’

‘মাচাটার ওপর উঠতে পারলে হয়৷’

‘আমি উঠব?’

‘আপনার, আমার ওজন মাচা নিতে পারবে না! হুম্মাড় হুম্মাড় করে ভেঙে পড়বে৷ একটা মাত্র পথ আছে, ছেলেটাকে ওঠান৷ তাও কায়দা করে৷’

‘কী কায়দা?’

‘গাজনের সন্ন্যাসীর কায়দা৷’

‘সে আবার কী?’

‘চড়ক৷ চড়ক দেখেছেন তো৷ বাঁশের ডগায় দড়ি বাঁধা৷ সেই দড়ি মানুষের পিঠে বাঁধা৷ চড়কগাছ থেকে সন্ন্যাসী ঝুলছে আর পাঁই-পাঁই ঘুরছে৷ ওকেও ওইরকম বাঁশের সঙ্গে বেঁধে ওপর থেকে মাচা বরাবর ঝুলিয়ে দিলে কাজটা হয়ে যায়৷’

‘উঃ তোমার মাথা বটে একখানা৷ দারুণ একটা উপায় বাতলেছ৷ চড়কগাছ দিয়ে উচ্ছে গাছ খোলা৷ তা হলে নেমে এসো৷ আর দেরি নয়৷ সেই ব্যবস্থাই করা যাক৷ আমার কাছে বেশ খানিকটা লাকলাইন দড়ি আছে নিয়ে আসি৷’ বাবা চেয়ার থেকে নামলেন, দাদু বাড়ির দিকে চললেন আমাকে বাঁশের ডগা থেকে ঝোলাবার দড়ি আনতে৷ আর আমি তীরবেগে ছুটলুম মায়ের কাছে৷ কী ভীষণ পরিকল্পনা! আমি ওপর থেকে মাচা পর্যন্ত ঝুলে নেমে আসব গাজনের সন্ন্যাসীর মতো৷ সেই অবস্থায় শূন্যে টলতে-টলতে বাঁশের গায়ে জড়িয়ে থাকা উচ্ছেলতা খুলতে থাকব৷ আমি তখনই ভেবেছি, কীরকম চড়ুইভাতি হবে আজকে৷ বাবা বাগান থেকে চিৎকার করে বলছেন, ‘পালাচ্ছ কোথায়? ভয় পেলে না কি, কাওয়ার্ড৷’

মা রান্নাঘরে৷ ঠাকুরের ভোগের পায়েস রাঁধছেন৷ আমি সোজা মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরলুম৷ পায়ের কাছে একটা চামচে ছিল, লাথি লেগে ছিটকে জলের কলের দিকে চলে গেল৷ কেটলির ওপর চা-ছাঁকনিটা কাত হয়ে শব্দ করে মেঝেতে পড়ে গেল৷ হাঁপাতে-হাঁপাতে বললুম, ‘মা বাঁচাও৷’

‘কেন? কী করেছিস? অঙ্ক পারিসনি? সমাস, সন্ধি ভুল করেছিস?’

‘বিসর্গ সন্ধি ঠিক বলেছি৷ বাবা আমাকে বাঁশে ঝোলাবার জন্যে বাঁশ খুঁজছেন৷ দাদু ওপরে গেছেন দড়ি আনতে৷’

জনার্দন বললে, ‘ঠিক হয়েছে৷ কাল সারা দুপুর ছাদে ঘুড়ি নিয়ে ফুচুত-ফুচুত৷’

‘তুমি দেখেছ?’

‘আমি কেন দেখব? আমার ফতুয়ার পিঠে এটা কার পায়ের ছাপ? মিলিয়ে দেখব? সাবান দিয়ে কেচে রোদে পেতে রেখেছিলুম৷’ জনার্দনদা পিঠ ফিরিয়ে সাদা ধবধবে ফতুয়ার ওপর নিখুঁত একটা পায়ের ছাপ দেখাল৷ আশ্চর্য ব্যাপার৷ মাপ দেখে মনে হচ্ছে আমারই পা৷ ফতুয়াটা ছিল কোথায়! ঘুড়ি ওড়াবার সময় আকাশের দিকেই চোখ থাকে৷ নিচে কী আছে তখন আর জ্ঞান থাকে না৷ একবার মায়ের বড়ি মাড়িয়ে ফেলেছিলুম৷ দুবার সমস্ত গুল ভেঙে দিয়েছিলুম৷ বার কতক আচারের বয়াম উলটে ফেলেছিলুম৷ সেসব ছিল মায়ের সঙ্গে আমার ব্যাপার৷ কিন্তু এটা কী ব্যাপার? যেখানে আমি সেইখানেই জনার্দনদা৷ স্বয়ং যেখানে নেই সেখানে হয় ফতুয়া, না হয় জরদার কৌটো, না হয় পানের বটুয়া৷ সারা বাড়িতে ফাঁদ পেতে রেখেছে৷

বাবা বলতে-বলতে আসছেন, ‘কই কোথায় পালালে?’

আমি মায়ের আঁচলের তলা থেকে কাঁপতে-কাঁপতে বললুম, ‘মা বাঁচাও৷’ গলায় যেন কান্নার সুর৷ কেঁদেই ফেলব হয়তো৷ এদিকে দাদুও রান্নাঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন৷ হাতে লকলক করছে চকচকে দড়ি৷ একটা দিক ঝুলছে হনুমানের ল্যাজের মতো৷ মনে হচ্ছে আমি যদি না জন্মাতুম তা হলে বেশ হত৷

মা পায়েসটা কোনওরকমে উনুন থেকে নামিয়ে রান্নাঘরের দরজার সামনে দাঁড়ালেন৷ দাদু আর বাবা পাশাপাশি৷ দুজনেই আমাকে বাঁশে ঝোলাবার জন্যে অধৈর্য৷ মা বললেন, ‘আপনারা কী করতে চাইছেন?’

দাদু বাবাকে থামালেন, ‘তুমি কিছু বোলো না, বলতে যেও না, মেজাজ খারাপ করে ফেলবে৷ আমি বুঝিয়ে বলছি৷ মেয়েদের সবসময় বুঝিয়ে বলবে৷ বুঝিয়ে বললে কাজ হয়৷ হ্যাঁ শোনো, আমরা ওকে বাঁশে ঝোলাব৷’

‘বাঁশে ঝোলাবেন মানে? কী করেছে ও৷’

‘ও কিছু করেনি৷ ঝোলাবার পর করবে৷’

‘কী করবে? চেঁচাবে৷’

‘চেঁচাবে কেন৷ ওকে আমরা নিচে থেকে উৎসাহ দোব৷ বেশি উঁচুতে ও ঝুলবে না, এই মাচার উচ্চতায় ঝুলতে থাকবে শূন্যে৷ তুমি ভয় পাচ্ছ কেন? মোটা দড়ি৷ এই দেখ দড়ি সহজে ছিঁড়বে না৷ আমাদের একটা দায়িত্ব নেই?’ মা বললেন, ‘আশ্চর্য ব্যাপার৷ সবই বুঝলুম৷ কিন্তু হঠাৎ এই ভর দুপুরে ছেলেটাকে ঝোলাবেন কেন?’ দাদু একপাশে সরে গিয়ে বাবাকে দেখিয়ে বললেন, ‘কেন-টা তুমি এর কাছে শোনো৷ নাও বাকিটা তুমি ব্যাখ্যা করে বলো৷’

বাবা রান্নাঘরের সামনে এগিয়ে এলেন৷ কিছু বোঝাতে হলে বাবা ভীষণ আনন্দ পান৷ অঙ্ক হলে তো কথাই নেই৷ যে অঙ্কই হোক বাবা কাত করে দেবেন৷ আমাকে অঙ্কে কাত করে, বাবা অঙ্ককে কাত করেন৷

বাবা বললেন, ‘বুঝতে হলে বাইরে আসতে হবে৷ বাইরে আসতে বলুন হাতেনাতে বুঝিয়ে দোব৷ আমি কিন্ডারগার্টেন সিস্টেমে বিশ্বাসী৷’

দাদু মা’কে বললেন, ‘বেশ তুমি তা হলে বেরিয়ে এসো৷’

আমি ফিসফিস করে মাকে বললুম, ‘তুমি বেরিও না মা৷ বাবার কিন্ডারগার্টেন মানে জানো তো! যা করতে চাইছেন তাই করে তোমাকে বলবেন, বুঝেছ তো?’

মা আমার চেয়ে বাবাকে ভালো চেনেন৷ উত্তরে নিচু গলায় বললেন, ‘ভাগ্যিস বললি৷’ উঁচু গলায় বললেন, ‘আমার এখন বাইরে যাওয়ার উপায় নেই৷ ঠাকুরের ভোগ চেপেছে৷’

উঃ মোক্ষম চাল চেলেছেন মা৷ বাব্বা! কিন্ডারগার্টেন আগে, না গৃহদেবতা আগে! দেবতার কাছে বাবা জব্দ৷ বাবা কিছুক্ষণ ভাবলেন৷ দাদুর সঙ্গে দাবা খেলতে বসে যে মুখে চাল ভাবেন এ যেন সেই মুখ৷ মায়ের আঁচলের আড়াল থেকে বাবার মুখ দেখেছি৷ দাদু যে চালে বাবাকে হারান সেই চাল দেওয়ার আগে চিৎকার করে বলেন কিস্তি মাত৷ মা মনে হয় কিস্তি মাতের চালই দিয়েছেন৷ বাবাকে বেশ ভাবতে হচ্ছে৷

আমি ভয়ে-ভয়ে একবার মায়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছি, একবার বাবার৷ দাবা খেলায় দেখেছি তো, দাদু কিস্তি মাত বলে চিৎকার করে চাল দিলেও বাবা বলেন, দাঁড়ান-দাঁড়ান৷ তারপর এক সময় একটা ঘুঁটি তুলে এ ঘর থেকে ও ঘরে সরিয়ে বলেন, নিন রাজা সামলান৷ দাদু অমনি চমকে উঠে বললেন, তাই তো? কোথা থেকে কী করলে হে৷ মা পায়েসে হাতা চালাচ্ছেন৷ আমি জানি মা কেন অমন করছেন৷ ভোগ রাঁধার সময় কথা বলতে নেই৷ কথা বললে থুতু ছিটকে ভোগে পড়তে পারে৷ বাবা যাই বলুন না কেন মাকে কিছু বলতে হবে না৷

বাবা বললেন, ‘ভোগ হচ্ছে? ও তো ফেলে দিতে হবে৷’

দাদু বললেন, ‘কেন?’

‘জিগ্যেস করছেন—কেন? খোকা তো ছুঁয়ে দিয়েছে৷ ওর ওই বাজার ঘোরা কাপড়৷ মাছ ছুঁয়েছে৷ নোংরা মাড়িয়েছে৷ ও ভোগ দেবতাকে দেওয়া চলবে না৷ আবার স্নান করে, কাপড় পালটে রাঁধতে হবে৷’

উরে বাব্বা! বাবা তো সাংঘাতিক চাল চেলেছেন এবার! এক ঢিলে দু’পাখি৷

দাদু বললেন, ‘এ হেঃ৷ সব নষ্ট হয়ে গেল৷ আবার সব রাঁধতে হবে৷’

মা এতক্ষণ পায়েস নাড়ছিলেন৷ ঠোঁটের কোণে যেন অল্প হাসি লেগে আছে৷ মা ফিরে তাকালেন৷

‘কিছুই নষ্ট হবে না বাবা৷ আপনারা বোধহয় ভুলেই গেছেন, পট্টবস্ত্র কখনও অশুদ্ধ হয় না৷ আমি পাটের কাপড় পরে রাঁধছি৷ আমাকে ছুঁল তো কী হল?’

উঃ, মা খুব জোর পালটা চাল দিয়েছেন৷ এইবার কী হয়? দাদু মায়ের কথাটাকেই বাবার কাছে ব্যাখ্যা করতে লাগলেন, ‘আরে হ্যাঁ, ঠিকই তো, পট্টবস্ত্র তো অশুদ্ধ হয় না৷ তুমি বুঝি লক্ষ করনি! আমি কিন্তু আগেই দেখেছি৷’

এইবার বাবা খুব রেগে উঠলেন, ‘ফেলে দিন আপনার শাস্ত্র৷ কে বলেছে পট্টবস্ত্রে সব শুদ্ধ৷ ওর ধুলো পা, হাতে মাটি, সারাগায়ে বাজারের হাজার লোকের ছোঁয়াছুঁয়ি, সমস্ত রান্নাঘরটাকেই অশুদ্ধ করে দিয়েছে৷’

দাদু অবাক হয়ে বললেন, ‘সে কী কথা? শাস্ত্র ফেলে দেবে? শাস্ত্র ফেলা যায়!’

‘কোন শাস্ত্রে আছে? বেদে, উপনিষদে, চণ্ডীতে? কোথায় আছে? বলুন কোথায় আছে, পট্টবস্ত্র পরে, তার আড়ালে একটা কুকুর রেখে ভোগ রাঁধা যায়?’

দাদু জিভ কেটে বললেন, ‘ছি-ছি, ওকে তুমি কুকুর বোলো না৷’

‘আহা, ওকে কুকুর বলব কেন? আমি তেমন মানুষ নই যে বংশের একমাত্র সন্তানকে কুকুরের সঙ্গে তুলনা করব৷ ওটা একটা উপমা মাত্র৷ পাটের কাপড় তো আর জীবাণুনাশক ওষুধ নয়, আপনি কী বলেন?’

দাদু বললেন, ‘তা ঠিক! তবে কি জানো, শাস্ত্র যখন বলছে তখন আমাদের মানতেই হবে৷’

‘আবার শাস্ত্র! কোন শাস্ত্র?’

জনার্দনদা এই সময় ভয়ে-ভয়ে বললে, ‘মা, আজ কি তাহলে রান্নাবান্না হবে?’

মা একটু রাগ রাগ গলায় বললেন, ‘বাবুদের জিগ্যেস করো৷’

‘না, বেলা তো অনেক হল! তরি-তরকারি, মাছ, সবই তো এলিয়ে গেল৷’

দাদু দু-জনেরই কথা শুনতে পেয়েছেন৷ বাবাকে বললেন, ‘কী বল? বেলা তো অনেক হল৷’

‘কোন বেলা?’

দাদু থতমত খেয়ে বললেন, ‘কেন, এই বেলা?’

‘হ্যাঁ এই বেলা জীবনটা কি একটা দিনের হিসেবে চালাতেই হবে? এমন কোনও বাঁধাধরা নিয়ম আছে? আমি যদি চব্বিশ ঘণ্টার পরিবর্তে আটচল্লিশ ঘণ্টার হিসেবে চলি৷ নরওয়ে হলে কী হত! সেখানে ছমাস রাত, ছ’মাস দিন৷ আমি যদি বলি টু আর্লি ফর টু-মরো!’

দাদু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন৷ মা হঠাৎ বললেন, ‘ঠাকুরও তাহলে আজ আর ভোগে বসছেন না৷ এই সব করা রইল, কাল বিকেলে বসবেন৷’

দাদু বললেন, ‘কেন? কেন?’

‘না, দুদিনে একদিন হলে তাই তো হবে৷ কে ভোগ দেবে? আপনাদের চান হবে তো সেই সন্ধেবেলা! তার মানে ভোগ আর হবে না, হবে সেই শীতল৷’

দাদু বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার নরওয়েতে কী নিয়ম? ঠাকুরের ভোগ আর শীতল কীভাবে হয়? ছ’মাস শুধুই ভোগ আর ছ’মাস শুধুই শীতল!’

মা এইবার মোক্ষম চাল চেলেছেন৷ দাদুও ছেড়েছেন সাংঘাতিক এক প্রশ্ন৷ বাবা বেশ চিন্তিত৷ ভোগের ব্যাপারটা না থাকলে আটচল্লিশ ঘণ্টায় দিন বানানো যেত৷ অসুবিধে ছিল না৷ সন্ধের শাঁক বাজলে বাবা বলতেন ভোর হচ্ছে৷ মাঝরাতে বলতেন, দুপুর হল! শেষ রাতে বিকেল৷ সব গোলমাল হয়ে গেল৷

‘বেশ তাহলে তাই হোক৷’ বেশ রাগ-রাগ গলা বাবার৷’

‘তাই হোক, মানে?’ দাদু তো সহজে বাবাকে ছাড়বেন না৷ সঙ্গে-সঙ্গে ব্যাখ্যা চাইলেন৷

‘তাই হোক মানে তাই হোক৷’

‘অনেক রকম হোকই তো আমাদের মাথায় ঘুরছে৷ পরিষ্কার করে বলো৷’

‘এ বাড়িতে আমার আর কী বলার থাকতে পারে? আমি কে?’

‘তার মানে? এ তো হল বৈরাগ্যের কথা৷ বৈরাগ্য অবশ্য আসতেই পারে৷ কামিনী ভোগ চালের সুবাসে মানুষের বৈরাগ্য আসতেই পারে৷ ভোগ না হলে তো ত্যাগ আসবে না৷’

‘কী যে বলেন আপনি? ঠাকুরের ভোগ আর মানুষের ভোগ এক হল? পায়েসের গন্ধে লোভ আসতে পারে, বৈরাগ্য আসে না৷’

‘তবে তুমি যে কেমন উদাস-উদাস গলায় বললে, আমার আর কী বলার থাকতে পারে?’

‘কেন বললুম ধরতে পারলেন না?’

‘না, আমার তো মনে হল বৈরাগ্যের সুর বাজছে৷’

‘বৈরাগ্য না ঘোড়ার ডিম৷ আমার ভীষণ রাগ হচ্ছে৷’

‘সে কী? রাগের কী হল?’

মা পায়েসের হাঁড়িটা উনুন থেকে সাবধানে তুলে নিয়ে পাশের তেপায়ার ওপর রাখলেন৷ জনার্দন বললে, ‘আজ, এবেলা তাহলে আর রান্নাবান্না হচ্ছে না?’

মায়ের গলাও বেশ রাগের, ‘জানি না৷ আমার ভোগ নেমে গেছে৷ ওঁদের জিগ্যেস করো, কী বলেন শুনে, উনুনে জল ঢেলে দাও৷’

মায়ের কথা শুনে বাবা উদাস মুখে কেমন একটা ভাব এনে বললেন, ‘আশ্চর্য ব্যাপার! রাগ তো হবে আমার৷ ভীরু, কাপুরুষ ছেলে! সেই ছেলেকে সাহসী করার চেষ্টা না করে আঁচলের আড়ালে আশ্রয় দেওয়ার চেষ্টা৷ শুধু খেলেই হয় না, শুধু ঘুমোলোই হয় না, বেঁচে থাকার অন্য মানে আছে৷ বাঁচতে জানতে হবে, বাঁচার মতো বাঁচা হল, সাহস অ্যাডভেনচার, কবিতা, রোমান্স, বীরত্ব৷ সাধে রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ কর নি৷ সাধে শেক্সপিয়ার বলেছেন, কাওয়ার্ডস ডাই মেনি টাইমস বিফোর দেয়ার ডেথ৷’

একসঙ্গে এতখানি কথা বলে বাবা একটু থামলেন, তারপর চিৎকার করে বললেন, ‘পিকনিক ক্যানসেলড৷’ মায়ের আড়াল থেকে আমি অমনি, হুররে বলে চিৎকার করে উঠলুম৷ করা উচিত হয়নি৷ তবে কাশির মতোই চাপতে পারিনি৷ গলা ফসকে বেরিয়ে এসেছে৷ জানি এর পরিণাম ভালো হবে না৷ আর হলও তাই৷ বাবা সঙ্গে-সঙ্গে বললেন, ‘এটা মনে হচ্ছে আনন্দের জয়ধ্বনি৷ নিজের দল গোল করলে যেমন চিৎকার ওঠে ঠিক সেররকম!’

দাদু বললেন, ‘সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই৷ এ হল আনন্দের জয়ধ্বনি৷’

‘আনন্দের কী হল? এ তো দুঃখের ব্যাপার৷’

‘দুঃখের কেন হবে?’

‘কেন হবে না?’

‘মনে করো রাজায়-রাজায় যুদ্ধ হচ্ছে৷ উলু খাগড়ার প্রাণ যাচ্ছে৷ কেমন? এমন সময় অনেক লড়ালড়ির পর সন্ধি চুক্তি সই হল৷ যুদ্ধ বন্ধ হল৷ তখন দেশবাসীর কী হবে? দুঃখ হবে, না আনন্দ হবে? আনন্দই হবে৷ কমন সেনস তো তাই বলে৷ এক পাশে বাজার উলটে পড়ে আছে৷ মাছ শুকিয়ে ধনুক৷ দই টকে গিয়ে জল ছাড়তে শুরু করেছে৷ উনুনের আঁচে ছাই পড়ে এসেছে৷ এমতাবস্থায় ব্যাপারটার এই যে একটা সহজ সমাধান হল, তাতে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল৷’

‘ও তাই না কি?’

‘হ্যাঁ, প্রাচীন কাল হলে, স্বর্গে দুন্দুভি বাজিয়া উঠিত, অপ্সরাগণ পুষ্প বৃষ্টি করিত৷’

‘আর আমি কী করিতাম?’

তুমি সুখে শতবর্ষ রাজত্ব করিতে, তাহার পর একদিন স্বর্গ হইতে রথ আসিত ও তোমরা দুজনে তাহাতে আরোহণ করিয়া মেঘলোক ভেদ করিয়া ইন্দ্রলোকে চলিয়া যাইতে৷ যুবরাজ সিংহাসনে আরোহন করিয়া, পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া সুখে প্রজাপালন করিত৷’

‘আমি রথ হইতে তাহাকে ঠেলিয়া ফেলিয়া দিতাম৷’

‘কাহাকে৷’

‘যে আমার সমস্ত পরিকল্পনা ও এতক্ষণের পরিশ্রম বানচাল করিয়া অপমান করিয়াছে৷’

‘অপমান? এতে অপমানের কী হল? তা হলে আমিও অপমানিত, কারণ আমিও তোমার সঙ্গে নেচেছিলুম৷’

‘আলবাত অপমান৷ আমাদের দল হেরেছে, ওদের দল জিতেছে৷ তাও কীভাবে জিতেছে? সেমসাইড গোলে৷ আমার অহঙ্কারে লেগেছে৷ রাগে আমার এক মাস কথা বন্ধ করে দিতে ইচ্ছে করছে৷’

‘কার সঙ্গে?’

‘ওদের দু-জনের সঙ্গে৷’

‘সেটা কি ঠিক হবে?’

‘আলবাত হবে৷ শুধু কথা নয় খাওয়াও বয়কট৷ আজ আর আমি আহারে বসব না, শুধু কাপের পর কাপ চা খাব৷’

‘কে করে দেবে?’

‘কে করে দেবে? আমার জনার্দন!’

‘না সেটা ঠিক হবে না৷ জানো নিশ্চয়ই, বাঙালির যত রাগ ভাতের ওপর৷ তোমাকে আজ ডবল খেয়ে প্রমাণ করতে হবে, তুমি ভেতো বাঙালি নও৷’

‘আমি এখন চা খেতে-খেতে ভেবে দেখব, আমি বাঙালি মতে চলব, না সায়েবি মতে চলব৷’ মা বললেন, ‘এই এত বেলায় চা আমি খেতে দোব না৷ খিদে মরে যাবে, লিভার খারাপ হয়ে যাবে৷’

‘আমার যাবে৷ আমার যকৃতের ভাবনা শত্রুপক্ষকে ভাবতে হবে না!’

‘খুব হবে৷ যদ্দিন আমরা বেঁচে আছি তদ্দিন আমাদের ভাবতে হবে৷ যখন থাকব না, তখন ভাবব না৷’ ঠিক এই সময় জনার্দন, গেল-গেল করে চিৎকার করে উঠল৷ কে বলেছে, ওর ফুসফুসে জোর নেই?

সকলেই চমকে উঠেছি৷ বাবার পিছন দিকে দেয়ালে কাত মেরে ছিল মাছের ব্যাগ৷ সেই বাঘা হুলোটা চোরের মতো গুটি-গুটি এসে, কখন একটা মাছ টেনে বের করে মুড়োটা চেপে ধরেছে৷ ব্যাস আর যায় কোথায়? বাবার দৃষ্টি ঘুরে গেল৷

‘এইটাই সেইটা না৷ যে বাঁদর আমার মুনিয়া পাখি খেয়েছিল? আই উইল কিল হিম৷’ হে রে রে রে করে বাবা ছুটলেন৷ বেড়াল ভয়ে মাছ ফেলে দৌড়৷

‘পালাবি কোথায়? আজই তোর শেষ রজনী৷ চোর, মিথ্যেবাদী, প্রবঞ্চক, প্রতারক, কারুর ক্ষমা নেই৷’ বেড়াল ছুটছে, বাবা ছুটছেন৷ দাদু রিলে করছেন, ‘ডানদিকের ঝোপে, ওই পালাল, সোজা-সোজা, বাঁ-পাশে লাফ মেরেছে৷ ক্যানা ঝোপের পাশে৷ যাঃ পাঁচিলে উঠে পড়েছে৷’

জনার্দন বললে, ‘মা এখনও ভগবান আছেন৷ বেড়ালের রূপ ধরে এলেন৷’

মা বললেন, ‘আয়, এবার হাত চালা৷ সূর্য পাটে বসার আগে এবেলার খাওয়াটা যাতে শেষ হয়৷’

‘নো ফিয়ার, মা, নো ফিয়ার৷’

আরেব্বাস ইংরিজি বলছে!!

জনার্দন বটুয়া থেকে পানের ডিবে আর সেই চ্যাপ্টা জরদার কৌটো বের করে রান্নাঘরের সামনে পা ছড়িয়ে বসল পান সাজতে৷ মা বললেন, ‘এই সময় আবার পান নিয়ে বসলি বাবা?’

জনার্দনের গম্ভীর গলা, ‘ভাবনার কিছু নেই মা৷ একটু ইস্টিম নিয়ে এমন হাত চালাব না যেন রেলের গাড়ি! পুঁ ঝিক-ঝিক৷ মেল টেরেন৷’

জনার্দনের বটুয়াতে কত কী আছে৷ মা বলেন, ‘ও, গতজন্মে পানের পোকা ছিল৷’ মায়ের কথা শুনে ফিক-ফিক করে হাসে৷ মা যেন কত বড় একটা প্রশংসাপত্র দিয়ে ফেলেছেন! মাঝখান থেকে চেরা শুকনো-শুকনো হলদেটে রঙের দু-টুকরো পানপাতা বেরোল৷ এতটুকু একটা চুনের কৌটো৷ খয়েরের ডিবে, সুপুরির কৌটো—আরও দু-দশটা কৌটোর ছানাপোনা৷ পান সাজতে-সাজতে আমার দিকে আড়পেতে তাকিয়ে গানের সুরে গাইতে লাগল, ‘একটু পরেই, ওরে একটু পরেই, আজ একজনের কী অবস্থা হবে, ভেবেই আমার মনটা কেমন-কেমন করছে রে! ছোটবাবু রেগে টং বড়বাবু কী করবে রে! হে জগড়নাথ, আজ একটু পরেই ফাটাফাটি হবে৷’

‘আমার দাদু আছেন৷’

আবার সেই একই সুরে, ‘থাকলে কী হবে? ছোটবাবু রেগে গেলেএএ, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, কিছুই করতে পারবে না রেএএ!’

‘আমি মামার বাড়ি চলে যাব৷’

‘কান ধরে হিড়-হিড় করে টেনে আনা হবে৷’ মা তাড়া লাগালেন, ‘কীরে জনার্দন?’

আবার সুরেই উত্তর, ‘এই যে মা জনার্দন তোমার দুয়ারে৷ রেগো না মা অন্নপুন্নে৷ পানটা পুরি মুখে, এক চিমটে জরদা দিয়ে৷’

একসঙ্গে দু-খিলি পান মুখে৷ ও কৌটো, সে কৌটো থেকে পটাপট নানা মশলা মুখে ঢুকছে৷ ঝুলোনতলার সার্কাসে জগুদা যেন বোতল ছোঁড়ার খেলা দেখাচ্ছে! মুখে পান ঢুকলে জনার্দনদা ঘণ্টা খানেকের মতো চুপচাপ৷

বাগানের দিক থেকে বাবার বিরাট গলা শোনা গেল, ‘খোকা-খোকা৷’

মরেছে৷ এইবার কী হবে? মায়ের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকালুম৷ মা বললেন, ‘তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে যুদ্ধে যাচ্ছিস৷ অত ভয়ের কী আছে রে?’

গুটি-গুটি বাগানে গেলুম৷ বাবা পা তুলে কামিনী গাছের তলায় বসে আছেন৷ মুখের চেহারায় সেই রাগ-রাগ ভাব আর নেই, কেমন একটা দুঃখু-দুঃখু ভাব৷ হাঁটুর কাছে বেশ খানিকটা জায়গা থেঁতলে গেছে৷ আমাকে দেখে বললেন, ‘যাও মার কাছ থেকে তুলো, ব্যান্ডেজ আর বেঞ্জিন নিয়ে এসো৷’

‘কী করে এমন হল বাবা?’

‘সে অনেক কথা৷’ বলে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন৷

‘মা!’

‘কী রে?’

‘দাও, তুলো দাও, বেঞ্জিন দাও!’

‘কেন রে? কার আবার কী হল?’

‘বাবার ডানপায়ের হাঁটুর কাছটা এতখানি কেটে গেছে৷ কামিনী গাছের তলায় চুপ করে গালে হাত দিয়ে বসে আছেন৷’

‘সে কী রে? চল দেখি৷’

মা চলেছেন আগে৷ পিছনে আমি, হাতে ফার্স্ট-এড বক্স৷ দাদু একটা ঝোপের মধ্যে ঢুকে কী করছিলেন৷ আমাদের দেখে বললেন, ‘হলটা কী? চললে কোথায় মায়ে-পোয়ে?’

‘বাবার পা কেটে গেছে৷ সামনের বাগানে চুপ করে বসে আছেন৷’

‘সে কী হে৷ চলো-চলো দেখি কী হল৷’

দূর থেকে বাবাকে দেখতে পাচ্ছি৷ সেই একই ভাবে বসে আছেন৷ কাটাকুটি বাবার শরীরে তো রোজকার ঘটনা৷ এত মন খারাপ হয়ে গেল কী করে? দাদু এগিয়ে গিয়ে সামনে ঝুঁকে পড়ে বললেন, ‘কীভাবে করলে? সকাল থেকে তো বেশ চলছিল, হঠাৎ এভাবে আউট হয়ে গেলে কী করে?’

বাবার মুখে কোনও কথা নেই৷ মা ফাস্ট-এড বক্স খুলে ফেললেন৷ হাতে তুলো৷ তুলোয় বেঞ্জিন৷ নিজের মনেই বলছেন, ‘হবে না? অত হুড়ুম দুড়ুম করলে হয়, সব ছোট ছেলেরও বাড়া৷ আজ এখানে কাটছে কাল ওখানে থেঁতো হচ্ছে৷ রোজ-রোজ একটা না একটা কিছু হবেই হবে৷’

দাদু বললেন, ‘এবার থেকে বেঁধে রাখতে হবে৷ শাসনের অভাব হলেই ছেলেরা বিগড়ে যায়৷ কী করতে গিয়েছিলে? গাছে চড়েছিলে?’

বাবার মুখে একটাও কথা নেই৷ উদাস চোখে এদিকে-ওদিকে তাকাচ্ছেন৷ মা তুলোসমেত বেঞ্জিন কাটা জায়গার ওপর চেপে ধরেছেন৷ আমরা হলে, বাবারে বলে চেঁচিয়ে উঠতুম৷ অসম্ভব সহ্যশক্তি বাবার৷ মা স্টিকিং প্ল্যাস্টারের মোড়ক খুলছেন৷ দাদু জিগ্যেস করছেন, ‘তুমি কি পাঁচিল টপকাতে গিয়েছিলে? মানে দু-হাতের ওপর ভর রেখে শরীরটাকে ওপরে টেনে তোলার চেষ্টা৷ বুঝেছি তখনই হাঁটুটা ছেঁচে গেছে!’

প্ল্যাস্টারের একটা কোনা ধরে মা হাঁটুতে লাগিয়েছেন কী লাগাননি, হঠাৎ বাবা বিরাট এক লাফ মারলেন, ‘তবে রে ব্যাটা?’

দাদু থতমত খেয়ে চিৎকার করে উঠলেন, ‘হাঁ-হাঁ, করো কী?’

বাবা ছুটছেন, আর বলছেন, ‘করো কী মানে? ব্যাটা আমাকে ল্যাং মেরে ফেলে দিয়েছে৷ নো মারসি৷ নো মারসি৷’

সেই বেড়ালটা৷ এতক্ষণ ঝোপে ঢুকেছিল৷ বাবার উদাস চোখ সন্ধান করছিল৷ তক্কে-তক্কে ছিলেন৷ যেই বেরিয়েছে, আবার তাড়া৷ ঘুরে পাতকো তলার দিকে৷ বাবা ছুটছেন বেড়াল ধরতে৷ আমরা ছুটছি বাবাকে ধরতে৷

বাড়ি এখন নিস্তব্ধ, চুপচাপ৷ সন্ধে হব-হব৷ পিছনের বাগানে দাদু পায়চারি করছেন৷ বেশ ভব্যসভ্য দেখাচ্ছে৷ চোখে চশমা৷ বেশ পাটপাট করে চুল আঁচড়ানো৷ ধবধবে ধুতি৷ বগলের পাশে ফিতে বাঁধা ফতুয়া৷ ঘাড় তুলে কখনও পাখি দেখছেন৷ কখনও গাছের ডাল ধরে নাড়া দিচ্ছেন৷ বেশ মেজাজে আছেন৷ অবেলায় খাওয়া হলেও শরীর তেমন ঢিসঢিস করছে না৷ মা আবার রান্নাঘরে ঢুকছেন৷ রাঙা আলুর পান্তুয়া ভাজা হচ্ছে৷ গন্ধে সারা বাড়ি ম-ম করছে৷ ছোঁক-ছোঁক করে ঘুরছি৷ গোটাকতক রসে একবার পড়লেই হয়৷ গোটাচারেক হাত সাফাই হবেই হবে৷ বাইরের রকে বসে, দু-পা দু-দিকে ছড়িয়ে জনার্দন হামানদিস্তেতে ছোট এলাচ কুটছে৷ গান চলেছে উদাত্ত সুরে৷ যেমন সুর, তেমনি ভাষা৷ সেই বিখ্যাত বেড়ালটা এখন পাঁচিলে থুবড়ি হয়ে বসে আছে৷ যেন কিছুই জানে না৷ ওর ওপর মা খুব রেগে আছেন৷ ‘একবার ঢুকে দেখুক, ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব৷’ বলার পর অবশ্য তিনবার আমি ঢুকতে দেখেছি৷ একবার পেটপুরে মাছ ভাতও খাওয়া হয়ে গেছে৷ চুরি করে দুধ সাঁটা হয়েছে কী না জানি না৷ মুখ দেখে মনে হচ্ছে হয়নি৷ যে ভাবে চোখ বুজিয়ে ভুরু কুঁচকে বসে আছে, যেন বৃন্দাবনের পিসি!

বাবা খুব বিপদে পড়েছেন৷ পায়ে চুন-হলুদের ব্যান্ডেজ বেঁধে বসার ঘরে আরাম চেয়ারে বসে আছেন৷ টুলের ওপর পা তোলা৷ বেড়ালের পিছনে শেষবার দৌড়তে গিয়ে পা মচকে ফেলেছেন৷ বেড়ালটা বেশ চালাক আছে৷ ওর মতো ঝুল কাটাতে জানলে গাদি খেলায় কি সুবিধেই না হত? গরম-গরম চুন-হলুদ থাবড়ে পায়ে কষে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে মা বলে গেছেন, চেয়ার ছেড়ে উঠলেই মজা দেখিয়ে দেবেন৷ মা যখন বাবাকে শাসন করেন তখন বেশ মজা লাগে৷ আমরা দু-জনেই তখন সমান হয়ে যাই৷ যখন বলেন, যেমন বাপ তেমনি ছেলে, সারা বাড়ি একেবারে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তখন যেন আরও মজা লাগে৷

মা দেখেশুনে একগাদা বই বের করে বাবার পাশে রেখে গেছেন৷ নানা রকমের বই৷ ছবির বই৷ শিকারের বই৷ দেশবিদেশের বই৷ এরই মধ্যে দু-কাপ চা খাওয়া হয়ে গেছে৷ কী মজা! ঘর থেকে বেরোলেই ঠ্যাঙানি হবে৷ অনেকক্ষণ থেকে লুকিয়ে-লুকিয়ে দেখছি, দরজার পাশ থেকে, পড়ায় একেবারেই মন নেই৷ একবার এ বই খুলছেন, আবার ও বই খুলছেন৷ জানলার দিকে তাকাচ্ছেন৷ পা-টাকে মাঝে-মাঝে নাচিয়ে দেখছেন৷ একবার দাঁড়াবার চেষ্টা করলেন৷ পারলেন না৷ যন্ত্রণায় মুখ কুঁচকে গেল৷

আমাকে মা বলেছেন, তুই আমার গুপ্তচর৷ একটু নজর রাখিস৷ বলা যায় না, বসে থাকতে-থাকতে হঠাৎ হয়তো ইচ্ছে হল, পাখার ব্লেড পরিষ্কার করি৷ ধুলো পড়েছে, দেখেছিস তো? পরিষ্কার করার সময়ও পাচ্ছি না ছাই৷ তেমন দেখলে আমাকে এসে খবর দিবি৷

বাবার ওঠাবসা দেখে মাথায় বেশ একটা বুদ্ধি খেলে গেল৷ গুপ্তচরদের মাথা তো ভালো হবেই৷ তা না হলে গুপ্তচর হবে কেন? লেডিকেনি না পান্তুয়া যা এখন কড়ায় ভাজা হচ্ছে, একবার রসে পড়ুক, সঙ্গে-সঙ্গে মাকে গিয়ে বলব, শিগগির যাও মা, বাবা চেয়ার ছেড়ে ওঠ-বোস করছেন৷ ব্যস, মা অমনি দুদ্দাড় দৌড়বেন৷ আর আমি অমনি, টপাটপ, যে কটা পারি৷ প্রথম দিকে গোনাগুনতির ব্যাপার থাকবে না, ধরাও পড়ব না৷

বাবা পাটাকে আবার সামনে উঁচু করে রেখে একটা ছবির বই কোলে তুলে নিলেন৷ সহজে আর ঘর থেকে বেরতে হচ্ছে না৷ রান্নাঘরে আর একবার উঁকি মেরে এলুম৷ গোটা পঁচিশ ঘন রসে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে৷ হে ভগবান, এইবার বাবার মাথায় একটু দুষ্টু বুদ্ধি দাও৷ তা না হলে মাকে রান্নাঘর ছাড়া করা যাবে না৷ মা না নড়লে দু-চারটে গববায় নমঃ করা যাবে না৷ আঃ ভগবান আমার প্রার্থনা শুনেছেন৷ বাবা বইটা দুম করে টেবিলে ফেলে দিয়ে মেঝেতে পা রেখে আপন মনে দুবার ঘাড় নাড়লেন৷ নিশ্চয়ই কিছু মতলব ভাঁজছেন৷ হ্যাঁ ঠিক তাই! উঠে দাঁড়িয়ে খোঁড়াতে-খোঁড়াতে দরজার দিকে যাচ্ছেন৷ ওই দরজা৷ খোলা বারান্দা৷ সেই বারান্দায় ফুলগাছের টব আছে৷ মানি প্ল্যান্ট ঝুলছে চারপাশে৷ বাবার নিজের হাতে করা একটা স্ট্যাচু আছে৷ ছাঁচে ঢেলে বেশ করেছেন জিনিসটা৷ গালে হাত রেখে বসে আছে একটি মানুষ৷ রাতের অন্ধকারে দেখলে চমকে উঠতে হয়৷ মনে আছে অনেক দিন আগে রাতে আমার বন্ধু এসে ওই মূর্তিটাকেই বারে-বারে জিগ্যেস করছিল, জ্যাঠামশাই, খোকা বাড়ি আছে? বার বার জিগ্যেস করেও সাড়া না পেয়ে ভয়ে দৌড় মেরেছিল৷

ওই বারান্দার দিকে যখন চলেছেন তখন বেশ বড় রকমের একটা কিছু মাথায় নিশ্চয়ই খেলেছে! এইবার মাকে ডেকে আনার সময় হয়েছে৷ চুপি-চুপি গিয়ে, ফিসফিস করে মাকে বলতে হবে৷

পিছন থেকে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে কানে-কানে বললুম, মা, তোমার দুষ্টু খোকা, মানে আমার বাবা, গুটি-গুটি গাছবারান্দার দিকে এগিয়ে চলেছেন৷ দেওয়াল ধরে ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে৷

মা হাত ঘুরিয়ে ঢাঁই করে মাথায় একটা গাঁট্টা মারলেন৷ তারপর কড়া নামিয়ে, খুন্তি রেখে বললেন, তুই এখানে একটু পাহারায় থাক বাবা৷ খাওয়ার জিনিস খোলা ফেলে রেখে যেতে পারছি না৷

আমাকে পাহারায় রেখে মা চলে গেলেন৷ বড় বিপদে পড়ে গেলুম৷ পাহারাদার কী করে চোর হবে! আমার মা কি কম চালাক! টুলে বসে আছি৷ কড়ায় বাদামি, গামলায় লাল-লাল পান্তুয়া৷ কাঠের থালায় খোয়া ক্ষীর৷ সুন্দর মিহি চিনি৷ কিশমিশ সাদা-সাদা নকুল দানা৷ তেমনি গন্ধ ছেড়েছে সুন্দর! নিজের অজান্তেই হাত কেমন গামলার দিকে এগিয়ে চলেছে৷ আর একটু হলেই একটা তুলে ফেলেছিলুম৷ হুঁশ থাকছে না৷ জনার্দন খুব গান ধরেছে৷ ভাব এসে গেছে৷ বাগানের দিক থেকে দাদু মাঝে-মাঝে বাহবা ছাড়ছেন, ভালো করে একটা গিটকিরি ছাড়৷ জগরনাথ-অ জায়গাটা আর একটু খেলিয়ে দে৷

হাঁটুর ওপর থুতনি রেখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে বসে আছি৷ জিভের জল, জিভেই শুকিয়ে এল৷ মা গেছে তো গেছেই, আসার আর নাম নেই৷ জনার্দনের গলা শুনে চমকে উঠলুম৷ কতক্ষণ আমাকে লক্ষ করছিল কে জানে?

কী, ক’টা সরালে?

মুখ তুলে তাকালুম৷ একা জনার্দন নয়, পাশে দাদু৷ মিটিমিটি হাসছেন৷ হাতে একটা পাখির পালক৷ বাগান থেকে কুড়িয়ে পেয়েছেন৷ দাদু বললেন, কী বলছিস কী? রক্ষক কখনও ভক্ষক হতে পারে! গুনতিতে কম হলে বুঝতে হবে বেড়ালে খেয়েছে৷ তা বাপু কাজটি বেশ ভালো পেয়েছ৷ পাহারা দিয়েও আনন্দ৷ তা দাদু টেস্টটা কেমন হয়েছে? বেশ জমেছে তো?

মা প্রায় ছুটতে-ছুটতে এলেন, সর-সর আঁচ বয়ে যাচ্ছে৷ সব শক্ত হয়ে গেল৷

জনার্দন বললে, মা, তোমার গোনাগাঁথা ছিল তো?

দাদু বললেন, ছাগলের পাহারায় বাঘ!

মা বললেন, ও আমার তেমন ছেলেই নয়৷ মাঝে-সাঝে একটু এদিক-সেদিক করে ফেললেও দায়িত্ব দিলে ওর চেয়ে সাধু আর কেউ নেই৷

দাদু বললেন, ও আমাদের কেষ্ট ঠাকুরটি৷ ওর চুরি, চুরি নয়, বাল্যলীলা৷

মা বললেন, আপনার ছেলেকে তো আর ধরে বেঁধে রাখতে পারছি না৷ ওই পা নিয়ে কেবল উঠে-উঠে পড়ছে৷ লেংচে-লেংচে চলে কুঁচকি আউরে উঠবে তখন আর এক কীর্তি হবে৷ আপনি ওঁকে নিয়ে একটু দাবায় বসুন না, তবু আটকে থাকবেন৷

উত্তম প্রস্তাব৷ জনার্দন!

আজ্ঞে বুঝে গেছি৷ গড়গড়া রেডি করছি৷

অম্বুরি বালাখানা, বড় বাবুর বড় খানা৷

সবাই চলে যেতে মা বললেন, খোকা বোস৷ দু-একটা চেখে দেখ তো! ঠিক হয়েছে কি না! পা মচকে পড়ে আছেন, রাতে একেবারে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাবে৷

দালানে জনার্দন চিৎকার করে উঠল, সপ অছি, সপ অছি৷

মা ছুটে গিয়ে আলোটা জ্বেলে দিলেন, তোমার মাথা অছি৷ আলবোলার নল, নিজেই ফেলেছিস, নিজেই চেঁচাচ্ছিস! কবে যে মানুষ হবি?

‘বুঝলে তোমার মতো ছটফটে ছেলের ঠ্যাং ভাঙাই উচিত৷’ ঘরে ঢুকে ছড়ি রাখতে-রাখতে দাদু বললেন৷

‘আমি ছেলে নই, বুড়ো৷ ঠ্যাং ভাঙেনি, পাটা শুধু মচকে গেছে৷’ বইয়ে চোখ রেখেই বাবা প্রতিবাদ জানালন৷’

‘ওই হল৷ মচকানির ব্যথা তো জানো না৷ মাসখানেকের ধাক্কা৷ লেংচে বেড়াও৷’

‘কালই দেখবেন সামনের রাস্তায় মার্চ করে বেড়াচ্ছি৷’

‘সেই মার্চের আগে মার্চ করতে হচ্ছে না৷ এটা জানুয়ারির শেষ৷’

‘দেখবেন না কি? আজই করে দেখাব৷’

‘মনের জোরে পারবে ঠিকই, তবে কুঁচকি হয়ে যাবে৷ সে আর এক ব্যাপার৷ বউমাকে কাত করে লাভ কী? এমনিই তো বেচারা খেটে-খেটে মরমর৷ নাও এসো৷ এক হাত হয়ে যাক৷ বেশ ঠান্ডা-ঠান্ডা আছে৷ চাদরমুড়ি দিয়ে জমবে ভালো৷’

‘তবে হয়ে যাক৷’ বাবা সোজা হয়ে বসলেন৷ দাদু বললেন, ‘এই যে হনুমান, নামাও ছক আর ঘুঁটি৷’

হাতির দাঁতের এই ঘুঁটিগুলোর ওপর আমার অনেক দিনের লোভ৷ রাজা, রানি, গজ, ঘোড়া, নৌকা৷ দুপুরে মাঝে-মাঝে নেড়েচেড়ে দেখি, আবার তুলে রাখি৷ উঃ মোগল রাজারা দিল্লির সিংহাসনে বসে আমির ওমরাহদের সঙ্গে দাবা খেলছেন৷ গোলাপের গন্ধ, আতরের গন্ধ৷ পাথর বসানো রাস্তায় ঘোড়া ছুটছে৷ তরোয়ালের যুদ্ধ৷ দুপুরটা কোথা দিয়ে যে কেটে যায়! আর আছে হাড়ের পাশা৷ মাঝে-মাঝে বিকেলে পাশা খেলার আসর বসে৷ চিৎকার ওঠে, ছকে দুই, পাঞ্জা৷ সেই হাড়ের পাশাও মাঝে-মাঝে নেড়েচেড়ে দেখি৷ দুর্যোধন, যুধিষ্ঠির এই পাশা নিয়ে খেলতেন৷ দুপুরে৷ ইন্দ্রপ্রস্থের রাজসভায়৷ শকুনি মামা চিৎকার করে উঠছেন, পাঞ্জা৷

দু-জনকে দাবায় বসিয়ে নিচে নেমে এলুম৷ জনার্দনদা দুমদাম শব্দে হামান দিস্তেতে গরম মশলা কুটছে৷ সুন্দর গন্ধ বেরচ্ছে৷ মা মনে হয় রাতে দারুণ একটা কিছু রাঁধবে৷ তা না হলে এত দুমদাম কীসের! বাগানের গেট খোলার শব্দ হল, কেউ আসছে৷ শব্দ হল, কেউ কিন্তু এল না৷ এ আবার কী ব্যাপার! সন্ধেবেলা ভূত আসবে কোথা থেকে? মনে হয় চোর৷ এখন বাগানে ঢুকে বসে রইল৷ পরে অনেক রাতে খেল দেখাবে৷

কাউকে বলব না৷ নিজে গিয়ে দেখব৷ আমি যে কত বড় বীর তা আর একবার প্রমাণ করব৷ একটু ভয়-ভয় করছে৷ ঠিক আছে খুব ভয় করলে চিৎকার করব৷ অ্যায়সা চিৎকার, চোরেরও পিলে চমকে যাবে৷ একটা পাঁচ সেলের টর্চ চাই, বন্দুক আর কোথায় পাব, দাদুর এই ছড়িটাই নিয়ে যাই৷ পিছন থেকে মাথায় মারব না, মারব ঠাঁই করে পায়ে, চোখে ফেলে রাখব চড়া টর্চের আলো৷

বাগানের পথটা এমনভাবে ঘুরে পেঁচিয়ে পিছন দিক থেকে সামনের দিকে চলে গেছে রাতের বেলা গেটের দিকে যেতে বেশ ভয় করে বাবা৷ দুটো পেল্লায়-পেল্লায় দেবদারু গাছ গেটের দু-পাশে খাড়া দাঁড়িয়ে৷ ঝোপঝাপে ঝি-ঝি পোকা ডাকছে৷ নিমগাছে জোনাকি জ্বলছে পুটুর-পুটুর করে৷

চুপি-চুপি যেতে হবে৷ সাড়া শব্দ করা যাবে না৷ চোর হলে লাফিয়ে পালাবে৷ আর যদি ভূত হয়? তাহলে কী হবে! চোরেও ভয়, ভূতেও ভয়৷ গেট দেখতে পাচ্ছি৷ অন্ধকার! কোথা থেকে একটু আলো এসে পড়েছে৷ পাশের দিকে একটুখানি জায়গায় অন্ধকার যেন জমাট হয়ে আছে৷ অল্প-অল্প নড়ছে৷ ব্যাটা চোর৷ পা কাঁপছে, তবু এগোচ্ছি৷ ওমা! একি? চোর ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠল৷ আচ্ছা ছিঁচকাঁদুনে চোর তো৷ টর্চ ফেলতেই দেখা গেল, কাঁদে কে? একটা বাচ্চা ছেলে, বগলে পুঁটলি নিয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ চোখে আলো পড়ায় ধাঁধাঁ লেগে গেছে৷ ‘মামু আছে? মামু?’

‘কে তোমার মামু?’

ছেলেটা ভীষণ একবগ্গা৷ প্রশ্ন করতেই জানে, উত্তর দিতে জানে না৷

‘মামু আছে মামু?’

‘না এ বাড়িতে তোমার মামু নেই৷’

‘হ্যাঁ আছে৷’

‘মুখে-মুখে তক্কো? বলছি নেই৷’

‘হ্যাঁ আছে৷’

‘চপ৷’ এত রাগ ধরছে৷ মনে হচ্ছে, মারি এক চড়৷ সে কাঁদতে-কাঁদতেই বলল, ‘চ্যাপ৷ অ্যাঁ মামু আছে৷ আমি জানি আছে৷’

‘দেখবে, মাকে ডাকব? আনব একবার ডেকে?’

‘না, মাকে না, মামুকে ডেকে দাও না৷’

‘আরে মূর্খ, মামু, মামু না করে মামুর নামটা বল না গবেট!’

‘ওই যে আমার মামু, নাম উচ্চারণ হয় না, তোমার বাড়িতে রাঁধে৷’

‘ও জনার্দনদাকে খুঁজছ!’

‘অ্যাঁ, খুব জরদা খায়৷’

‘এসো, তুমি ভেতরে এসো৷’

‘না, কুকুরে কামড়ে দেবে৷’

‘কুকুরে কামড়াবে কেন?’

‘হ্যাঁ, বড়লোকদের বাড়িতে কুকুর থাকবেই৷ আর সে কুকুর খেঁকি৷’

‘আরে দূর, আমাদের বাড়িতে কুকুর নেই৷’

‘হ্যাঁ আছে৷’

‘আচ্ছা গোঁয়ারগোবিন্দ ছেলে তো! বলছি কুকুর নেই৷’

‘অ্যাঁ মিথ্যে কথা৷ বাগান থাকলেই কুকুর থাকে৷’

‘কুকুর থাকলে ডাকত গবেট৷ একবারও কুকুরের ডাক শুনেছ!’

‘হ্যাঁ শুনেছি৷’

‘আরে ও তো রাস্তার কুকুর৷’

মা ওদিকে ডাকাডাকি শুরু করেছে, ‘খোকা-খোকা৷’

‘তা হলে তুমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকো৷ আমাকে মা ডাকছে৷’

রান্নাঘরের সামনে যেতেই মা বললে, ‘কোথায় যে থাকিস? রবিবার হলেই তোর আরও দুটো করে হাত-পা বেরোয়৷’

‘মা, গেটের পাশে চুপটি করে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, বলছে মামুকে ডেকে দাও৷ জনার্দনদা নাকি ওর মামা৷’

‘ডেকে আন৷’

‘আসছে না, বলছে কুকুর আছে, কামড়ে দেবে৷’

মা বললেন, ‘দ্যাখ, জনার্দন কোথায় আছে৷ নে হাঁ কর৷’ হাঁ করতেই মা আমার মুখে রসে টুসটুসে একটা পান্তুয়া ভরে দিলেন৷ জিনিসটা এবার বেশ জমেছে৷ ক্ষীর-ক্ষীর গন্ধ৷ ভাজা-ভাজা স্বাদ৷

হামান দিস্তে পড়ে আছে৷ ডান্ডাটা এক পাশে শোয়ানো৷ জনার্দন নেই৷ কোথায় গেল রে বাবা! এই তো ছিল৷ জনার্দনদার ঘরের ভেতর থেকে একটা ফোঁস-ফোঁস শব্দ বেরোচ্ছে! যাঃ ঘুমিয়ে পড়েছে বোধহয়৷ ঘর অন্ধকার৷ কোথা থেকে এক চিলতে আলো এসে পড়েছে৷ ওমা জনার্দনদা ব্যায়াম করছে৷ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দু-পাশে হাত ছড়িয়ে৷ বুকের ব্যায়াম করছে৷ হাঁসফাঁস, হাঁসফাঁস শব্দ হচ্ছে৷ হাসি চাপা যায়! যেই হেসেছি সে চমকে উঠেছে৷ লুকিয়ে-লুকিয়ে পালোয়ান হওয়ার চেষ্টা করছিল নাকি!

ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল৷ বেরিয়ে এল যেন কত বড় বীর৷ বুকটাকে আবার টানটান করেছে৷ গেঞ্জির ভেতর থেকে পাঁজর ফুটে উঠেছে৷ হেসেছি বলে রেগে গেছে ভীষণ৷

‘এখানে কী হচ্ছে, এখানে?’

‘রেগে যাচ্ছ কেন জনার্দনদা? গেটের কাছে তোমার ভাগনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে, মামু, মামু৷ যাও, দেখো গে!’

‘অ্যাঁ, সে এখানে এসেছে? আবার পালিয়ে এসেছে?’

জনার্দনদা গেটের দিকে দৌড়ল৷ ওঃ বাব্বা ঘরের মেঝেতে স্কিপিং করার দড়ি পড়ে আছে৷ নাঃ এইবার পালোয়ান হয়ে যাবে৷ সিঁড়ির কাছে আমাদের গ্র্যান্ডফাদার ঘড়ি গম্ভীর গলায় বেজে উঠল৷ রাত আটটা৷ দোতলার জানলা থেকে ভেসে এল চিৎকার, কিস্তি মাত! এ আমার দাদুর গলা৷ গেটের কাছে কান্নার শব্দ উঠল৷

এইরে মামা বোধহয় ভাগনেকে পেটাতে শুরু করেছে৷ এর নাম মামার বাড়ির আদর!

ভাগনেকে কান ধরে টানতে-টানতে নিয়ে এল জনার্দন৷ রান্নাঘরের সামনে৷ ছেলেটা তখনও ফোঁস-ফোঁস করে ফুলছে৷ পরনে ময়লা ইজের৷ ছেঁড়া-ছেঁড়া একটা গেঞ্জি৷ ইজেরের লম্বা দড়ি সামনে দুলছে৷ যেন ন্যাজ বেরিয়েছে৷

কেন পালিয়েছিস? জনার্দন আবার হাত তুলেছে মারবার জন্যে!

মা সামনে এসে দাঁড়ালেন৷ শুধু-শুধু ছেলেটাকে মারছ কেন? কে হয় তোমার?

ভাগনে৷

কোথায় ছিল?

আমি বললুম, ওই তো আমাদের গেটের সামনে দাঁড়িয়েছিল৷

ধ্যার বোকা৷ ও ছিল কোথায়? কোত্থেকে এল৷

তা আমি জানি না৷

জনার্দন বললে, আমিও জানি না৷

আমার কী মনে হয় জানো মা, ও বোধহয় উড়ে এল৷

জনার্দন ধমকের সুরে বললে, কোত্থেকে এলি? ভাগনে ফোঁপাতে-ফোঁপাতে বললে, আমি জানি না৷

জনার্দন আরও জোরে ধমক দিল, মামার বাড়ি পেয়েছিস? কোত্থেকে এলি, জানিস না!

জনার্দন কোমরের কাছে ঝুলে থাকা বটুয়া খুলে মুখে একটা পান পুরল৷ কৌটো খুলে এক চিমটে জরদা ফেলল মুখে৷ ব্যস হয়ে গেল৷ রেগে গেলেই পান, জরদা৷ আর মুখে পান জরদা ঢুকলে কথা বলার ক্ষমতা থাকে না৷ হাঁউ-হাঁউ করে৷ কারুর কিছু বোঝার ক্ষমতা থাকে না৷

মা ছেলেটির কাঁধে হাত রাখতেই ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল, আমি জানি না মা, আমি জানি না৷

এই যে আমার মাকে মা বললে, ব্যস হয়ে গেল৷ এ ছেলের ভবিষ্যৎ ভালো৷ কেউ আর একে মারতে পারবে না৷ আমাদের রান্নাঘরের সামনে বাবা একটা বেদি বাঁধিয়ে দিয়েছেন৷ রাঁধতে-রাঁধতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে ওখানে বসে একটু হাঁপ ছেড়ে নাও৷ গাছপালা আকাশ দেখো৷ কী রাঁধবে ভেবে নাও৷ ইচ্ছে হলে শুয়ে পড়ো৷ দাদু মাঝেমধ্যে ওখানে বসে দুধ খান৷ পাশে চুপটি করে বসে থাকে আমাদের পুসি৷ দুধ দেখলেই ঘড়ঘড় শব্দ শুরু করে৷ চোখ বুজিয়ে থাকলে কী হবে! মিটিমিটি চায়৷ দেখে একটু প্রসাদ রইল কি না! সেই বেদিতে মা ছেলেটাকে ধরে বসিয়ে দিলেন৷

বোসো এখানে, শুধু-শুধু বেচারাকে মারধোর করে শেষ করে দিলে৷

আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিলেন৷ না, মা, তুমি বেশ করেছ! আমার মায়ের মতোই কাজ করেছ৷ এট্টুকু ছেলে৷ হাঁটতে-হাঁটতে, কোথা থেকে কোথায় চলে এসেছে৷ পায়ে জুতো নেই, গায়ে জামা নেই, মাথায় তেল নেই! বড়-বড় ভ্যালভ্যালে চোখ, জলে টইটম্বুর৷

জনার্দন পানের পিক ফেলে এসে আবার বকাধমকা শুরু করতে যাচ্ছিল৷ মা এক ধমক লাগালেন৷ তোমরা এখান থেকে সরে পড়ো, আমি দেখছি৷

জনার্দন বললে, ও তো ছিল হাওড়ায়, সেখান থেকে এখানে এল কী করে? এ আমার ভাগনে নয়৷

মা বললেন, তার মানে? এই তো বললে তোমার ভাগনে৷

ছেলেটা কান্না জড়ানো গলায় বললে, হ্যাঁ তুমিই তো আমার মামু৷

মা বললেন, এ তোমার ভাগনে নয়৷

জনার্দন বললে, দেখতে সেইরকম৷ তবে আসবে কী করে হাওড়া থেকে?

যেভাবেই হোক এসেছে৷ এসে যখন পড়েছে তখন কী করে এল, কেন এল, অত সবের কী দরকার বাপু৷ হাত-পা ধুয়ে আসুক৷ মুখ শুকিয়ে গেছে৷ খাওয়াদাওয়া করুক৷ তারপর ধীরে-ধীরে সব শোনা যাবে৷ দাদু এলেন৷ কিস্তিমাৎ করে বেশ বীরের মতো হেঁটে আসছেন৷

নাঃ, ওকে দিয়ে কিছু হবে না, বুঝলে? অত হম্বিতম্বি করলে দাবা খেলা হয়! দাবা হল ঠান্ডা মাথার খেলা৷ একি তোমার বেড়াল ধরা! এ আবার কে? এখানে বসে আছে? এত রাত হল৷ যা-যা বাড়ি যা, মা আবার খুঁজতে আসবে, তখন মার খাবি৷ কাল সকালে আসার সময় নিমপাতা আনবি৷ এখন নিম-বেগুন খাওয়া খুব প্রয়োজন৷

মা বললেন, কাকে কী বলছেন? ও আমাদের জগো নয়৷

তবে কে?

জনার্দনের ভাগনে৷ পালিয়ে এসেছে৷

পালিয়ে এসেছে? ভালো করে বেঁধে রাখো৷ আবার পালাবে৷ কোমরে দড়ি বেঁধে জানালার গরাদে বেঁধে রাখো৷ দাদুর কথা শুনে ছেলেটা তড়াক করে বেদি থেকে লাফিয়ে পড়ে তীরবেগে বাগানের দিকে দৌড় দিল৷ ধর-ধর৷

দাদু দৌড়চ্ছেন, আমি দৌড়চ্ছি, জনার্দন দৌড়াচ্ছে, মা ছুটছেন, বেড়ালটা পর্যন্ত ল্যাজ তুলে দৌড়চ্ছে৷ বাবা নামতে পারছেন না, জানলায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করছেন, কী হল, কী হল?

পাশের বাড়ির মটকেদার বন্দুক আছে! তিনি ভাবলেন ডাকাত পড়েছে৷ ছাদে দাঁড়িয়ে বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজ করলেন, দুম, দুম৷

আমার মায়ের তো অসীম ক্ষমতা৷ কারুর কোথাও কী লুকিয়ে থাকবার উপায় আছে৷ আমসত্ত্ব চুরি করে সেদিন ধরা পড়ে গিয়ে, তিনতলার ছাদে শুকনো জলের ট্যাঙ্কের ভেতর লুকিয়ে বসেছিলুম৷ বেশ আরামেই ছিলুম৷ মনে-মনে ভাবছিলুম ট্যাঙ্কের ভেতরেই রাত কাটিয়ে দোব৷ ভোরে উঠে দাদুকে ধরে যা হয় একটা কিছু ব্যবস্থা ঠিকই হয়ে যাবে৷ ভেতর থেকে ওপর দিকে তাকালে গোল মতো আকাশ দেখা যাচ্ছে৷ মাঝে-মাঝে চিল ভেসে আসছে৷ আমি যেন সিন্দাবাদ দ্যা সেলার৷ জাহাজডুবি হয়ে এই দ্বীপে এসে উঠেছি৷

হঠাৎ দেখি আকাশের গায়ে মায়ের মুখ৷ এ কী রে বাবা! ঠিক দেখছি তো৷ চোখ রগড়ে আবার তাকালুম৷ হ্যাঁ, মায়ের মুখ৷ মা বললেন, উঠে আয় বাঁদর৷ এক সের আমসত্ত্ব সাবাড় করে তুমি এইখানে ঢুকে বসে আছ! ভেবেছ ধরতে পারব না৷ উঠে আয়৷

উঠতে গিয়ে টের পেলুম, কী ভুলই না করেছি! সেই ছাগলের কুয়োয় পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা৷ নেমেছিলুম দমাস করে লাফিয়ে৷ লাফিয়ে তো আর ওঠা যাবে না৷ ভয়ে বুক শুকিয়ে গেল৷ ও-মা তুমি আমাকে তুলে নাও৷ মা যেই দেখলেন আমি ফাঁদে পড়েছি, অমনি বললেন, ঠিক আছে, সারা জীবন তুমি ওইখানেই থাকো বসে৷ চোর হাজতেই বাস করে৷ দু-একখানা রুটি ওইখানেই ছুড়ে-ছুড়ে দোব৷

মা চলে গেলেন৷ আমি বসে-বসে কাঁদতে লাগলুম৷ চোখের জলে ট্যাঙ্কটাই হয় তো ভরে যেত৷ আমার দাদু আছেন৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি এলেন, সঙ্গে জনার্দন আর ছোট একটা মই৷

ছাদের সিঁড়ির কাছে মা একেবারে তৈরি হয়ে ছিলেন৷ ট্যাঙ্ক থেকে ছাদে নামার সঙ্গে-সঙ্গেই, আমার সে কী খাতির৷ খটাখট মাথায় গাঁট্টা৷ যেন শিল পড়ছে!

দাদু বলছেন, দশটার বেশি নয়, বড় জোর পনেরোটা৷

জনার্দন বলছে, না-না, সেরেফ তিরিশটা৷

মা বলছেন, অত সস্তা, পঞ্চাশটার কমে আমি থামব না৷

পেটে আমার আমসত্ত্ব, মাথায় গোটা-গোটা আমবাত৷ পরের দিনই প্রতিশোধ নিলুম, আধ জার মোরব্বা সাবাড়৷

জনার্দনের ভাগনেকে মা-ই আবিষ্কার করলেন৷ বাগানে ইঁদারার পাশে চুপ করে লুকিয়ে বসে আছে৷ ভয়ে বেচারা ঠকঠক করে কাঁপছে৷ মা হাত ধরে টেনে তুললেন৷ ছেলেটা ফোঁস-ফোঁস করে কাঁদছে আর বলছে, আমাকে মেরুনি গো মেরুনি, বেঁধুনি গো বেঁধুনি৷

মা আমাদের এক ধমক দিলেন, তোমরা এখান থেকে সব সরে পড়ো তো৷

দাদু বললেন, আমি জিনিসটাকে একটু ভালো করে দেখে রাখি৷ কাল সকালে, তা না হলে চিনতে পারব না৷

মা শুধু একবার জোরে হাঁকলেন—বাবা৷

দাদু অমনি বাধ্য ছেলের মতো, সুড়সুড় করে সরে গেলেন৷

ভাগনের নাম মদন৷

মদনকে আবার বসানো হল সেই বেদিতে৷ যেন গোপাল ঠাকুরটি! ছেলেটাকে বেশ দেখতে৷ ফরসা গায়ের রং৷ চোখ দুটো বড়-বড়! স্বাস্থ্যটাও নেহাত খারাপ নয়৷ এক মাথা কোঁকড়া-কোঁকড়া চুল৷

রান্নাঘরের দাওয়ায় জনার্দন বসে আছে পা ছড়িয়ে৷ মায়ের ওপর খুব রেগে গেছে৷ ভাগনেকে একটা চড়ও মারতে পারেনি৷ মারলেও তেমন সুবিধের হয়নি৷

জনার্দন ধমকের সুরে বলল, কী করে এলি?

মদন কাঁদো-কাঁদো গলায় বললে, আমি হারিয়ে গেলুম৷

কোথায় হারালি?

হাওড়ায়৷

তারপর কী করলি?

আমাকে একজন থানায় জমা করে দিলে৷

তারপর!

তারপর আমি বাবুদের নাম বললাম৷

তারপর!

ওরা আমাকে এই থানায় চালান করে দিলে৷

তারপর!

তারপর, জানো মামা, আমাকে চারখানা কচুরি খেতে দিলে৷

তারপর!

আমার কাছে তিনটে টাকা ছিল কেড়ে নিলে৷

তারপর!

তারপর আমি খুব কাঁদতে লাগলুম৷

তারপর!

তারপর একজন পুলিশ আমার কান ধরে এই বাড়ির সামনে ছেড়ে দিয়ে গেল৷

জনার্দন লাফিয়ে উঠল, ফের মিথ্যে কথা! দে, তিনটে টাকা দে৷ শিগগির বের কর৷

নেই গো মামা৷

নেই গো মামা! চালাকি পেয়েছিস!

মা আবার হুঙ্কার ছাড়লেন, জনার্দন৷

জনার্দন চুপ মেরে গেল৷ কিন্তু বেশিক্ষণ চুপ থাকা তো জনার্দনের স্বভাব নয়! আবার সে এক ফ্যাঁকড়া বের করল৷ হুমকি মেরে বললে, তুই চুরি করেছিলি৷ বল, করেছিলিস কি না?

না গো মামা, চুরি করব কী জন্যে!

হ্যাঁ, তুই চুরি করে জেলে গিয়েছিলিস৷ সেখানে লাটবাবুর নাম বলে ছাড়া পেয়েছিস৷ জনার্দন কম চালু! আমার দাদুকে সে লাটবাবু বলে৷ আর দাদু খুব খুশি হয়ে যখন-তখন বকশিস দেন৷

মদন বললে, না গো মামা, সত্যি চুরি করিনি৷

তা হলে তুই তিনটে টাকা কোথা থেকে পেলি?

হাওড়া ইস্টিশনে এক বাবুর মাল বয়ে দিলুম গো৷ খুব ভালো রোজগের হয়৷ আমি তো এবার রেলকুলি হব৷ তাহলে মায়ের আর কোনও কষ্ট থাকবে না৷

মদনের কথা শুনে আমার মা অমনি গলে গিয়ে বললেন, আহা রে! বাছা আমার! দ্যাখ, দ্যাখ, তোরা দ্যাখ সোনার চাঁদ ছেলে কাকে বলে! এই বয়েসেই মায়ের দুঃখু বুঝতে শিখেছে৷ এমন ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে৷ মদন?

কী মা?

উরেব্বাস! ছেলে কী চালু রে! কোথায় লাগে জনার্দন! মায়ের ধাত বুঝে ফেলেছে৷ মা আমাকে বলেন, একখানি ছেলে নয় তো, পিলে! এপারে পুঁতলে ওপারে গাছ বেরোবে৷ আমি যদি পিলে হই, এ হবে লিভার পিলে!

মা বললেন, চলো, চান করবে চলো, বেশ করে সাবান মেখে চান৷ খোকা?

কী-ই মা-আ৷

আমিও মদনের মতো সুর করে উত্তর দিলুম৷ মা খ্যাঁক করে উঠলেন, অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ! অত মিঠে গলা কেন হে তোমার! আসল সুর বের করো৷ যাও, তোমার একটা ভালো প্যান্ট আর জামা নিয়ে এসো, মদন চান করে উঠে পরবে৷

মদনকে বললেন, বোস, এক বালতি গরম জল করে দি, তা না হলে গায়ের ময়লা উঠবে না৷

মা গেলেন গরম জল করতে, আমি গেলুম প্যান্ট-জামা খুঁজতে৷ মনে-মনে বললুম, জোরে বলার সাহস নেই, একটু কিন্তু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে মা৷

মদনকে মানুষ করার জন্যে মা উঠে পড়ে লেগেছেন৷ মদন নাকি অসম্ভব বুদ্ধিমান৷ সেদিন বাবা মাকে বললেন, ওর চোখ দুটো একবার দেখেছ! একেবারে ঝকঝক করছে মণির মতো৷

এইসব কথা বলার মানে, আমার চোখ দুটো মরা মাছের মতো৷ তার মানে আমি এক গবেট৷ মদন গরিবের ছেলে হলে কী হবে৷ সুযোগ পেলে ও তোমার কান কেটে দেবে৷ দাঁড়াও, সেই ব্যবস্থাই হচ্ছে৷

মদনের জন্যে স্লেট-পেনসিল এসেছে৷ এসেছে প্রথম ভাগ, নব ধারাপাত, ফার্স্টবুক৷ আমার প্যান্ট, জামা পরে, সকালের জলখাবার খেয়ে মদন পড়তে বসেছে৷ আমার ওপর হুকুম হয়েছে, ওকে একটু দেখিয়ে দিস৷ দাদু দাড়ি কামাতে-কামাতে বললেন, অন্ধজনে দেহ আলো অন্নহীনে অন্ন৷ একটা ছেলে যদি জ্ঞানের আলো পায়, সেই আলোয় জগতের আলো বাড়বে৷ ভালোই হয়েছে রে গুন্ডা, ওকে পড়ালে তোর নিজেরই জ্ঞান বাড়বে৷

বাবা জুতো বুরুশ করছিলেন৷ তিনি বললেন, আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, তখন হেডমাস্টার মশাই মাঝে-মাঝে আমাদের ক্লাস নিতে বলতেন৷ তিনি বসে-বসে শুনতেন, এক-একদিন আমরা এক-একজন পড়াতুম৷ কত জ্ঞান থাকলে তবে পড়ানো যায়৷ প্রথম শিক্ষাটা পাকা হাতের হওয়া উচিত৷ বনেদ ভালো না হলে বাড়ি নড়বড়ে হয়ে যায়৷

দাদু ঠোঁট উলটে গোঁফ মেরামত করতে-করতে বললেন, বর্ণপরিচয় করাতে এম. এ., পি. আর. এস., পি. এইচ. ডি. লাগে না৷ ওই গুন্ডা হাতিটাই পারবে৷ আগে ফার্স্টক্লাস, সেকেন্ড ক্লাসে উঠুক তখন আমরা ধরব৷ দুজনে ধরে একেবারে তালগোল পাকিয়ে দোব৷ যাক মদন এখন আমার হাতে৷ এতদিনে একটা ছাত্র পেয়েছি৷ প্রহার কাকে বলে একবার দেখিয়ে দোব৷ হেডমাস্টারমশাই যে ভাবে ঝুলপি টেনে ধরেন, সেইভাবে টেনে ধরব৷ পণ্ডিতমশাই যেভাবে গাঁট্টা মারেন সেই ভাবে মারব৷ ইংরেজির শিক্ষকমশাই যেভাবে রদ্দা মারেন, সেই ভাবে মারব রদ্দা৷ একটু দূরে নির্জনে বসতে হবে, তা না হলে তেমন শাসন করা যাবে না৷ মা এসে মাস্টারকেই পিটিয়ে দেবে৷ বাগানের দিকে একটা ছোট বারান্দা আছে৷ বারান্দাটা আমার নিজের এলাকা৷ ওটাকে মা নাম দিয়েছে, শয়তানের কারখানা৷ মা যাই বলুক, ওটা আমার ওয়ার্কশপ৷ বাবাকে দেখে কত কী শিখছি! সব কাজ নিজে করে নিতে শিখব, যেমন জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ৷

দাদু আমাকে একটা বাক্স দিয়েছেন৷ একটু ভাঙা-ভাঙা৷ তা হোক৷ সেটার মধ্যে ছুরি, কাঁচি, হাতুড়ি, ছেনি, স্ক্রুডাইভার, প্লাস, পেরেক, স্ক্রু, ছুঁচ-সুতো, আলপিন সব আছে৷ একটা পিচবোর্ডের বাক্সে আমাদের পুসি থাকে৷ বাক্সটা বেশ বড়৷ বিদেশ থেকে দাদুর বই এসেছিল৷ ওই বাক্সটায় সিনেমা বসাব ভেবেছিলুম৷ পুসি কেমন করে তার বাড়ি বানিয়ে ফেলেছে৷ এমন বোকা! ভেতরে ঢুকে বসে থাকে৷ ধরতে গেলে থাবা মারে৷ কামড়াতে আসে৷ জানে না, ও যখন থাকে না, তখন আমি তো ওর বাড়ি দখল করে নিতে পারি!

বারান্দায় মদন বসেছে মেঝেতে৷ আমি বসেছি একটা প্যাকিং বাক্সে৷ মাস্টারমশাইরা একটু উঁচু আসনে বসতে পারে৷ বসার অধিকার আছে৷

পড়ানো শুরু করার আগেই একটা বউনি হল৷ মদন জিভ বের করে স্লেটে পেনসিল দিয়ে গায়ের জোরে খুব খসখস করে দাগ কাটছিল৷ লেখাপড়াটা ছেলেখেলা নাকি৷ সভ্য হয়ে বসতে পারো না! এখানে পড়তে এসেছ না, চন্দন ঘষতে এসেছ? খটাস করে মাথায় এক গাঁট্টা কষিয়ে দিলুম৷ উঁচুতে বসে থাকলে গাঁট্টাটা জমে ভালো৷ অবশ্য না মারলেও চলত৷ তবু মারতে হল৷ যে সময়ের যা৷ সন্ধের সময় শাঁক বাজাতে হয়৷ আরতির সময় ঘণ্টা বাজাতে হয়৷ ঘুম পেলে ঢুলতে হয়৷ গাঁট্টা খেয়ে মদন মাথায় তালুতে হাত বুলোচ্ছে৷

বুলোও, বুলোও, ভালো করে বুলোও৷ মায়ের পেয়ারের ছেলে হওয়ার জন্য খুব কৌশল! আমারই প্যান্ট, জামা পরে, সকালবেলা, গড়ানে চিলের ছাতে খুব স্লিপ খাওয়া হচ্ছিল৷ যেই বললুম, অ্যায় প্যান্ট ছিঁড়ে যাবে না! অমনি খুব ভ্যাংচানো হল৷

প্রথম ভাগটা সামনে ফেলে দিয়ে বললুম, নে, পড়৷ অ, আ, পড়ে যা৷

আজ আমি পুরো ষষ্ঠীবাবু৷ ষষ্ঠীবাবু আমাদের সংস্কৃত পড়ান৷ ক্লাসে ঢুকেই বলেন নাও পড়ে যাও৷ আর আমরা তখন যার যা খুশি পড়তে থাকি৷ সে এক সাংঘাতিক শব্দ৷ কানে তালা লেগে যাওয়ার জোগাড়৷ কিছুক্ষণ এইরকম চলার পর ষষ্ঠীবাবু প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে পড়েন৷ এক-একজনের পাশে দাঁড়ান, গাঁট্টা, চড়, ঝুলপি ধরে টানা, যাকে যা খুশি করতে থাকেন, আর দাঁতে দাঁত চেপে বলতে থাকেন, ঠিক করে প্যাড় ভালো করে প্যাড়৷ সারা ক্লাস ঘুরতেই ঘণ্টা শেষ৷

বইটা সামনে রেখে, চোখ বুজিয়ে মদন গড়গড় করে মুখস্থ বলে যেতে লাগল, অ, আ, ই, ঈ৷ অ্যায় অ্যায় করছি! ক, খ, গ, ঘ৷

আচ্ছা ছেলে তো৷ এতবার অ্যায় অ্যায় করছি, গ্রাহ্যই নেই৷ অ আ নিয়ে, পাঁই পাঁই দৌড়চ্ছে৷ য র ল তে চলে গেছে৷

খটাখট গাঁট্টা মারছি, মাথায় হাত চাপা দিয়ে দুলে-দুলে তারস্বরে চেল্লাচ্ছে, ব তালব্য শ৷ চন্দ্রবিন্দুতে এসে দম ছাড়ল৷ তারপর বাঘের মতো আমার ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল৷

আমি মাটিতে, আমার ওপর মোড়া, তার ওপর মদন আমার হাত দুটো চেপে ধরে, বুকের ওপর চেপে বসে বলছে, মারছ কেন? শুধু-শুধু আমায় মারছ কেন?

মদন আমার গাল খামচে দিয়েছে, এক মুঠো চুল ছিঁড়ে নিয়েছে৷ জামার বুকের বোতাম টানাটানিতে ছিঁড়ে পড়ে গেছে৷ ঝটাপটি অনেকক্ষণ চলত, যদি ঠিক সময়ে মা না এসে পড়তেন৷ মদনের গায়ে বেশ জোর আছে৷

মা আমার চুলের মুঠি ধরে হিড়-হিড় করে টেনে তুললেন, না তুললে, আমি মোক্ষম এক প্যাঁচ প্রায় মেরেই ফেলেছিলুম৷ দারা সিং-এর ইন্ডিয়ান লক৷ মদনটা এত ওস্তাদ, মেঝেতে চিৎ হয়ে পড়েছিল, চট করে উঠে বসেই দুলে-দুলে পড়তে লাগল, জল পড়ে পাতা নড়ে৷

যত দোষ নন্দ ঘোষ৷ মা চুল ছেড়ে কান ধরলেন৷ শুধু-শুধু ছেলেটাকে মারছিস কেন? মারছিস কেন? হিংসেতে একেবারে জ্বলে গেল!

তুমি শুধু-শুধু আমাকে মারছ কেন মা? আমি পড়াচ্ছি হঠাৎ ও ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে মারতে শুরু করল৷ হিংসে আমার, না হিংসে তোমার ওই মদনের৷

ভীষণ রেগে গেছি আমি৷ মদন খামচেছে! মা কান ধরে টানছেন৷ মায়ের এ কেমন বিচার৷ চিৎকার করে মদনকে বললুম, বাঁদর৷ সঙ্গে-সঙ্গে মায়ের হাতের একটা চাঁটা খেলুম৷ বুঝেছি, মায়ের সামনে মদনের কিছু করা যাবে না৷ মদন আবার নামতা পড়ছে দু এককে দুই, দুই দু গুণে চার৷ এই পড়ছিল, জল পড়ল, পাতা নড়ল৷ নিজের চোখের জল পড়ল, পাতা নড়ল৷ নিজের চোখের জল শুকিয়ে গেল, আমার চোখে জল এসে গেল৷ আমি বললুম, যাও তোমার মদনাকে আমি আর পড়াতে পারব না৷

আবার খটাস করে গাঁট্টা পড়ল মাথায়৷ ওই যে মদনা বলেছি৷

মা বললেন, তোকে তো কেউ পড়াতে বলেনি৷

আমার একটা কর্তব্য আছে৷ অন্নহীনে অন্নদান, বিদ্যাহীনে বিদ্যাদান৷

সেই দানটা নিজেকেই নিজে করো৷ সারাদিন তো বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নেই হতভাগা৷

মদন আবার ইংরেজি পড়তে শুরু করেছে, আই অ্যাম আপ, আমি হই ওপরে৷ কোথা থেকে কী সব শিখে এসেছে কে জানে! এঁচড়ে পাকা ছেলে৷

বাগানে এসে বসে রইলুম কিছুক্ষণ৷ বাগানে কাজ করার জন্যে সপ্তাহে দুদিন মালি আসে৷ আজ এসেছে৷ খুরপি দিয়ে ঘাস নিড়োচ্ছে৷ একগাদা নতুন গাছের চারা এনেছে৷ কোথায় বসাবে কে জানে৷ দাদু একটা লতানে গাছ মাচায় তোলার ভীষণ চেষ্টা করছেন৷ চনমনে রোদ উঠেছে৷ মাটি থেকে ঘাস থেকে এক ধরনের ভিজে-ভিজে ভাপ উঠছে৷ কেমন একটা মাটি-মাটি গন্ধ৷ ঘাসের ডগায় নেচে-নেচে ফড়িং উড়ছে৷ তালগোল, তালগোল পাকিয়ে হলুদ, লাল, সাদা প্রজাপতি উড়ছে৷ ফড়িং মনে হয় হেলিকপ্টারের জাত৷ ঘাসের ডগায়, একটু ওপরে বাতাসে কেমন স্থির হয়ে থাকে৷

দাদুর হঠাৎ চোখ পড়ল আমার দিকে৷

বুড়ো, ওখানে চুপ করে বসে আছিস কেন?

মা মেরেছে৷

বেশ করেছে৷ ছোটদের মাঝেমধ্যে একটু পেটাতে হয়, তা না হলে বড়দের মান থাকে না৷ কী করেছিলে দাদু?

কিচ্ছু করিনি৷ ওকে পড়াতে বসেছিলুম৷ ও বাঘের মতো আমার ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে, আমাকে আঁচড়ে দিয়েছে, খামচে দিয়েছে, চুল ধরে টেনেছে৷

বেশ করেছে৷ ও হুলোতে-হুলোতে অমন হয়৷ তা দাদু, তুমি কিছু করোনি!

কী করে করব দাদু! মা যে এসে পড়ল৷

মন খারাপ করে কী আর করবে, এদিকে এসো, একটা কাজ করো৷ কাজের কাজ৷ দাদুর সেই লতা, মাচার এপাশ দিয়ে ওপাশ দিয়ে ঝুল-ঝুল করে ঝুলছে! কচি-কচি সবুজ পাতা ধরেছে৷ বাতাস লাগলেই দুলে-দুলে উঠছে!

দাদু বললেন, আমি তোমাকে কাঁধে তুলি, পাটের সরু সুতো দিয়ে ঝুলে পড়া লতাগুলো, তোমার ওই নরম হাত দিয়ে সাবধানে, না মটকে বেঁধে দাও তো৷

কাঁধে চড়িনি কতকাল৷ কত উঁচুতে উঠে গেছি৷ মাথা ঠেকে গেছে লতাপাতায়৷ টাটকা, সবুজ রোদের আলো পড়েছে দাদুর কাঁধে, সাদা গেঞ্জিতে৷ কী ভালো যে লাগছে আমার৷ বাতাস যেন গরম আর ঠান্ডা মেশানো, শীতকালের চানের জলের মতো৷ পাতার ভেতর দিয়ে আকাশের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে সবুজ আগুন দেখছি৷ পাতার ঝোপে লাল ডুমো মতো কী একটা লেগে আছে৷ মনে হয় ফুলের কুঁড়ি৷ যেই হাত দিয়েছি, ভোঁ করে উড়ে নাকের পাশ দিয়ে চলে গেল৷ ভয়ে মাথাটা যেই টেনে নিয়েছি, টাল সামলাতে পারলুম না৷ দাদুর পিঠ গড়িয়ে পড়ে যেতে লাগলুম৷

কেউ কি পড়তে চায়! দু-হাত বাড়িয়ে, ডালপালা, লতাপাতা, মাথার ওপর যা কিছু ঝোলাঝালা ছিল আঁকড়ে ধরে ঝুলতে লাগলুম৷ দাদু করিস কী করিস কী, বলতে বলতেই, বাঁশের মাচা মচকে গেল৷ হুড়মুড়, হুড়মুড় করে গাছ মাচা সব নিয়ে মাটিতে পড়ে গেলুম৷

ভিজে ঘাস, নরম জলে ভেজা মাটি, নিচে, তার ওপর আমি, আমার ওপর লতাঝোপ, তার ওপর ভাঙা মাচা৷ বেশ লাগছে আমার৷ এত আরাম বিছানায় শুয়েও পাওয়া যাবে না৷

শুধু আমি না, দাদুও চাপা পড়েছেন৷ পাশ থেকে ফিসফিস করে বললেন, কেমন আছিস বুড়ো৷

বেশ লাগছে দাদু৷ আজ সারাদিন আমরা এইখানেই শুয়ে থাকি৷

ভালোই বলেছিস, জমিটা শুকনো হলে শুয়েই থাকা যেত, বড় ভিজে৷ জ্বর এসে যাবে৷

ঝোপের বাইরে, মালি, মদন, জনার্দনদা, মা সব এসে হাজির হয়েছেন৷ মালিদার গলা পেলুম, আমি বুড়োবাবুকে তখনই বারণ করেছিলুম মেয়ে, বাড়াবাড়ি করবেন না৷ কিছুতেই কী শুনলেন, খোকাবাবুকে কাঁধে চাপিয়ে মাচায় লতা তুলতে গেলেন৷

মালিদা আমার মাকে মেয়ে বলে৷

মা বললে, অ্যাঁ, ওই ধেড়েটাকে বাবা কাঁধে চাপিয়েছিলেন, কী সর্বনাশ! ওরে তোরা দাঁড়িয়ে কী দেখছিস৷ সরা, সরা৷ সব সরিয়ে দু-জনকে টেনে বের কর৷ কী কাণ্ড! ভেতরে তো কেউ নড়ছেও না চড়ছেও না৷

আমাদের মাথার ওপর ঝোপ ঝাপ নড়ে উঠল৷ পাতার ফাঁক বেয়ে একটা কঞ্চি ফুঁড়ে নিচে নেমে এল৷ মালিদার গলা পাওয়া গেল, সাবধান-সাবধান৷ এসব কাজ সাবানে করতে হয়৷ খোঁচা না লেগে যায়! দাদু বললেন, বুড়ো একটু চোর-চোর খেললে কেমন হয়! ওরা সামনে, চল, আমরা বুকে হেঁটে পিছন দিক দিয়ে বেরিয়ে, কৃষ্ণকলির ঝোপের মধ্যে দিয়ে, মিটার ঘরে গিয়ে লুকিয়ে পড়ি৷ ওরা আমাদের আর খুঁজে পাবে না, বেশ মজা হবে৷ দাদু চাপা সুরে খিকখিক করে হেসে উঠলেন৷

প্ল্যান অনুসারে কাজ করার জন্যে দুজনে গুঁড়ি মেরে পেছু হটতে যাচ্ছি, পিছন দিক থেকে মদন এসে ঢুকল৷—কেমন আছিস দাদা৷ লাগেনি তো! দাদু, তুমি কেমন আছ গো! অবাক হয়ে গেলুম৷ মদনকে মনে হল সত্যিই আমার নিজের ভাই৷

মদনের সঙ্গে আমার ভীষণ ভাব হয়ে গেছে৷ ছেলেটা সত্যিই ভীষণ ভালো৷ এখন মদনকে কেউ প্রশংসা করলে আমার আর হিংসে হয় না৷ মদন আমাকে ভালোবাসে, আমি মদনকে ভালোবাসি৷ মা বলেন আমার ছিল একছেলে, হল দু-ছেলে৷ জনার্দনদা মাঝে-মাঝে হেঁকে বলে, বরাত তোর খুব ভালো, তাই এই বাড়িতে এসে পড়েছিস৷ বাবা বলেন, ওর যা অঙ্কে মাথা ওকে আমি ইঞ্জিনিয়ার করব৷ আমার দাদু বলেন, আমার নাতিটা অঙ্কে একটু কাঁচা হলে কী হবে, আইনে খুব মাথা, ওকে আমি বিলেত থেকে ব্যারিস্টার করে আনব৷ হাইকোর্ট থেকে ওকে আমি সুপ্রিমকোর্ট পর্যন্ত ঠেলব৷

মদন আবার স্কুলে ভরতি হবে বলে অ্যাডমিশন টেস্ট দিয়েছিল৷ আজ রেজাল্ট বেরোবে৷ দাদু, আমি আর মদন, তিনজনে সেজেগুজে চলেছি৷ দাদুর কোর্ট এখন বন্ধ৷ খুলবে সেই জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে৷ ছুটিটা আমাদের বেশ কাটছে৷ মদন একেবারে ক্লাস ফাইভে ভরতি হবে বলে পরীক্ষা দিয়েছে৷ ছেলেটাকে আমরা ভুল বুঝেছিলুম৷ শুনে-শুনে নিজের চেষ্টায় অনেক কিছু শিখে বসে আছে৷ মাঝে একটা চায়ের দোকানে কাজ করত, সেখানে রোজ একজন শিক্ষক ভোরে চা খেতে আসতেন৷ তিনি মদনকে ভীষণ ভালোবাসতেন৷ শিক্ষকমশাইয়ের কেউ কোথাও ছিলেন না৷ তিনি নিজের ছেলের মতন মদনকে পড়াতেন৷ মদন রাতে সেই শিক্ষকমশাইয়ের ঘরে মেঝেতে চ্যাটাই পেতে ঘুমোত৷ এক-একদিন সারা রাত জেগে পড়া চলত৷ একদিন সেই শিক্ষকমশাই কোথায় যেন বেড়াতে গেলেন৷ মদনকে বলে গেলেন, দিন সাতেকের মধ্যে ফিরব৷ তিনি আর ফিরে এলেন না৷ ঘরে তালা ঝোলে৷ মদন যায় আর ফিরে-ফিরে আসে৷ সবাই বলতে লাগলেন রাজনীতির লোকেরা বিনয় স্যারকে মেরে ফেলেছে৷ তিনমাস যখন পার হয়ে গেল তখন একদিন বাড়িওলা পুলিশের সামনে তালা ভেঙে ঘরের দখল নিলেন৷ ঘরে মাস্টারমশাইয়ের যা কিছু ছিল সব পুলিশ নিয়ে চলে গেল৷ মদন মাঝে-মাঝে সেই বিনয় স্যারের কথা বলে আর হাপুস নয়নে কাঁদে৷ ও বলেছে যেখান থেকে পারে স্যারকে খুঁজে বের করবেই৷ রাস্তা চলার সময় মদন সকলের মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে৷ সেদিন বাজারের রাস্তায় এক ভদ্রলোকের পিছন-পিছন দৌড়ল৷ অনেকটা গিয়ে দেখে এসে বললে, না, বিনয় স্যার নয়৷ পিছন থেকে ঠিক সেইরকম দেখতে৷ স্কুলে আমার দাদুর খুব খাতির৷ পুজোর সময় দারোয়ানদের প্রত্যেক বছর জামা কাপড় দেন৷ দাদুকে দেখেই সব সেলাম দিতে লাগল৷ হেডমাস্টারমশাই দাদুকে দেখে এগিয়ে এলেন, আসুন মুকুজ্যেমশাই, আসুন, আসুন৷ আমার দাদু একজন বড় ডোনার৷

আমরা অফিস ঘরে বসলুম৷ সাতসকাল, অভিভাবকদের ভিড় তেমন জমেনি৷ একটু পরেই সব আসতে শুরু করবেন, রেজাল্ট-রেজাল্ট করে৷ রামাধরদা চা এনেছেন৷ হেডমাস্টারমশাই দাদুকে দেখিয়ে বললেন, আগে এঁকে দাও, এঁকে দাও৷

রামাধরদা বললেন, সে আর আমাকে বলতে হবে না৷ বড়বাবুকে আমি ঠিকই দেব৷ হেডমাস্টারমশাই মদনকে কাছে ডাকলেন, এদিকে আয়৷

মদন ভয়ে-ভয়ে চেয়ারের পাশে এগিয়ে গেল৷ হেডমাস্টারমশাই মদনের মাথায় একটা হাত রেখে বললেন, বেঁচে থাক বাবা৷ বুঝলেন মুকুজ্যেমশাই ভেরি ইনটেলিজেন্ট বয়৷ অঙ্কে একশোর মধ্যে একশো৷ বাংলায় তাই৷ ইংরেজিতে তাই৷ সুন্দর হাতের লেখা৷ একটাও বানান ভুল নেই৷ বাংলায় আমরা একটা ছোট্ট রচনা লিখতে দিয়েছিলুম, তোমার জীবনের অভিজ্ঞতা৷ ক্লাস ফাইভের ছেলে কী আর লিখতে পারে? এত সুন্দর লিখেছে মুকুজ্যেমশাই, আমারা থ হয়ে গেছি৷ শুনুন আমরা ঠিক করেছি ফাইভে নয়, ওকে আমরা সিক্সে ভরতি করব৷

মদনটা কোথা থেকে যে শিখেছে! হেডমাস্টারমশাইয়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল, দাদুকেও করল৷ জানে সব৷ আমি যা-যা জানি, ও তার চেয়েও যেন বেশি জানে৷

হেডমাস্টারমশাই বললেন, এ ছেলে আমাদের স্কুলের মুখ উজ্জ্বল করবে৷ ডিস্ট্রিক্ট স্কলারশিপ তো পাবেই, চেষ্টা করলে উচ্চমাধ্যমিকে এক থেকে দশের মধ্যে স্থান পেয়ে যেতে পারে৷

দাদু বললেন, পারে মানে, পারতেই হবে৷ আমাদের ফ্যামিলির ছেলে৷ না পারলে গাধার টুপি পরিয়ে ঘোরানো হবে৷ আচ্ছা, এই ছেলেটার কী হবে বলুন তো?

মুকুজ্যেমশাই, ও শাইন করবে সায়েন্সে নয়, আর্টসে৷ আপনার নাতি, ও যাবে কোথায়! বিপিন পাল, রাসবিহারী ঘোষ, সি. আর. দাস হবেন ওর আদর্শ৷ বাঙালি সব ব্যাপারেই বড় পেছিয়ে পড়ছে মুকুজ্যেমশাই৷

আবার বেত ধরতে হবে মাস্টারমশাই৷ আদরে-আদরে সব বাঁদর তৈরি হচ্ছে৷

মদন তাহলে ভরতি হয়ে যাক মুকুজ্যেমশাই?

হ্যাঁ হয়ে যাক৷ আমি তৈরি হয়ে এসেছি৷ দাদু টাকা বের করলেন৷ রমেনবাবু অফিসঘর থেকে ছুটে এলেন৷ বিল বই তৈরি হল৷ কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা রাস্তায় নেমে এলুম৷ মদনের হাতে নতুন বুকলিস্ট৷ নতুন জামা পরেছে চেকচেক৷ সাদা হাফপ্যান্ট৷ গায়ে পুলওভার, মা বুনে দিয়েছেন৷ ফরসা টকটকে রং৷ এই ক’মাসে স্বাস্থ্যও খুব ভালো হয়েছে৷ মদন গটগট করে হেঁটে চলেছে আগে-আগে৷ দাদু পিছন থেকে বললেন, আমি কী দেখছি জানো, ভবিষ্যৎ হেঁটে চলেছে, সামনে আরও সামনে, বড় আরও বড়৷ যেন সিংহ দরজায় তোমাদের মাথা ঠেকে যাচ্ছে৷

খুব বৃষ্টি পড়ছে৷

আজ প্রায় তিনদিন হল৷ থামবার যেন নাম নেই৷ বাগানে জল জমেছে, এক পায়ের পাতা৷ সারাদিন ব্যাঙ ডাকছে৷ চারপাশ ঝাপসা৷ ধোঁয়া-ধোঁয়া৷ জানলার কাচে বাষ্প জমে যাচ্ছে মাঝে-মাঝে৷ আকাশের দিকে তাকাতেও ভয় করে৷ সেই নীল আকাশ কোথায় গেল! আমাদের বিকেলের খেলা বন্ধ হয়ে গেছে৷

মদন আর আমি দু’জনেই জানালার খোপে উঠে বসে আছি৷ মাঝে-মাঝে বৃষ্টি একটু থামলে গাছের পাতা থেকে ফোঁটা-ফোঁটা জল পড়ছে৷ হীরের কুচির মতো৷ আশেপাশের বাড়ির উনুনের ধোঁয়া কিছু দূর উঠেই থমকে আছে৷ সামনের পথ দিয়ে কেউ-কেউ কাপড় তুলে, ছাতা মাথায় দিয়ে জল টপকাতে-টপকাতে চলেছেন৷ ছাতা ভিজে গেলে কী রকম কালো দেখায়৷

মদন এখন আমার ভাই৷ বাবা, দাদু, মা, সবাই বলেছেন, মদন এ বাড়ির আর এক ছেলে৷ ওকে আমরা ইঞ্জিনিয়ার করব৷ দেশে একটা ভালো ছেলে বাড়া মানে, দেশের-দশের উন্নতি৷ ওর যা মাথা, সুযোগ পেলে ফুল ফুটিয়ে ছাড়বে৷

মদনও একেবারে পালটে গেছে৷ ভালো ছেলের মতো সুন্দর চেহারা হয়েছে৷ চোখ-মুখ গম্ভীর৷ একটাও বাজে কথা বলে না৷ সময়-সময় আমাকেই বলে, ভালো করে পড়ো দাদা৷ তুমি একটু চেপে পড়লেই ভালো রেজাল্ট করবে৷

ওর মুখে বড়দের মতো কথা শুনলে রাগে গা জ্বলে ওঠে কিন্তু রাগ করতে পারি না৷ মদন যা বলে, যা করে, সবকিছুর মধ্যেই এমন আন্তরিকতা থাকে, ভালোবাসা থাকে, রাগ সঙ্গে-সঙ্গে জল হয়ে যায়৷ মদন এখন এমন হয়েছে, জনার্দনদাও সমীহ করে চলে৷ আমার সঙ্গে যেভাবে কথা বলে সেইভাবেই মদনের সঙ্গেও কথা বলে৷ মদন এখন আমাদের ছেলে৷ জনার্দনের কেউ নয়৷

বাগান আর রাস্তার কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে৷ খরগোশের ঘরটা দেখতে পাচ্ছি৷ একপাল সাদা-সাদা প্রাণী, গুটিসুটি মেরে বসে আছে৷ জলে বেরোতে পারছে না৷ বিশাল একটা সোনা ব্যাঙ থপাক-থপাক করে লাফাচ্ছিল৷ আমাদের বাড়ির পিছনের জোড়া পুকুর ভেসে গেছে৷ নর্দমা দিয়ে হুড়হুড় করে জল এসে বাগান ঢুকছে৷ মদন লাফিয়ে উঠল, মাছ, মাছ ঢুকছে, বড়-বড় মাছ৷

দুজনেই জানালা থেকে লাফিয়ে মেঝেতে পড়লুম৷ মা রান্নাঘরে৷ মদন আমার মাকে মা বলে৷ প্রথম-প্রথম একটু হিংসে হত, এখন আর হয় না৷ মায়ের অনুমতি ছাড়া মদন কোনও কাজ করে না৷ আমার বেশ অসুবিধে করে দিয়েছে৷ আগে মাকে না জানিয়ে কত কাজ করতুম, এখন দুপুরে একটু তেঁতুল, আখের গুড় মাখিয়ে বেশ একটু আচার মতো করে খেতে হলেও মাকে বলতে হয়৷ আর মায়েরা তেঁতুলের নাম শুনলেই চিৎকার করবেন, না, না৷ তেঁতুল খাওয়ার অধিকার যেন একমাত্র বড়দেরই৷

মদন বললে, মা, বাগানে বড়-বড় মাছ ঢুকেছে, আমরা ধরব?

মাছের নাম শুনে মায়ের চোখ বড়-বড় হল৷ তাই নাকি, তাই নাকি? কী মাছ?

ওপর থেকে দেখে মনে হল, রুই, কাতলা, কই, মাগুর, সিঙ্গি৷

অ্যাঁ বলিস কী?

মাছের নামে মা একেবারে আনন্দে আটখানা! হবেই তো৷ কার মেয়ে একবার দেখতে হবে তো! দাদু এক সময় মাছ ধরতে ভীষণ ভালোবাসতেন৷ বাবারও মাছ ধরার নেশা ছিল৷

মা বললেন, চল, আমিও যাই৷

বেশ মজা৷ ঝিপঝিপ করে বৃষ্টি পড়ছে৷ চারপাশে ধোঁয়া-ধোঁয়া৷ দু-একটা ভিজে কাক পাতার আড়ালে মাঝে-মাঝে ডানা ঝাপটাচ্ছে, এক চাতক আকাশ এফোঁড়-ওফোঁড় করে উড়ে গেল৷

ওপর থেকে বোঝা যায়নি, বাগানে বেশ জল জমেছে৷ হাঁটু পর্যন্ত ডুবডুবু৷ জলের ভেতর নরম-নরম ঘাস, পায়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছে৷ পায়ের চাপ পড়লেই ঘাসের ভেতর থেকে গরম-গরম জল বেরচ্ছে৷ আমাদের বাগানটাকে পুকুর করে ফেললে বেশ হয়! এত গাছ নিয়ে কী হবে! পুকুর একটা আলাদা জিনিস৷ হাঁস এনে ছেড়ে দোব৷ প্যাঁক-প্যাঁক করে ভেসে-ভেসে বেড়াবে৷ রকে এসে সাদা-সাদা ডিম পাড়বে৷

পায়ের ফাঁক দিয়ে গোঁত্তা মেরে, কী একটা মাছ চলে গেল৷

ও মা মাছ!

মা আর মদন দুজনে এসে জায়গাটাকে তোলপাড় করতে লাগল৷ জলে ডুবে থাকা সুপুরি গাছের দিকে তাকিয়ে অবাক৷ সাবাশ, গা-বেয়ে কী উঠছে ওসব?

ওমা, ওই দ্যাখো!

মা আর মদন গাছের দিকে তাকিয়ে আনন্দে নেচে উঠলেন, কই মাছ, কই মাছ, বড়-বড় কই৷ দোতলার একটা জানলা, অল্প একটু ফাঁক হল, বাষ্পলাগা, ঝাপসা কাচের আড়ালে দাদু৷ গলা শোনা গেল, সবুর কর, সবুর কর, আমি আসছি৷ কই বড় সুস্বাদু৷ অনেকদিন কই মাছের গঙ্গা-যমুনা খাইনি৷

সে আবার কী দাদু?

পাশের আর একটা জানলা খুলে গেল৷ বাবার গলা ভেসে এল, অতি সুস্বাদু, অতি সুস্বাদু, ওয়ান সাইড ঝাল আদার সাইড মিষ্টি৷ দাঁড়াও, দাঁড়াও, আমি আসছি৷

বাবা এলেন বিশাল বড় এক ছাঁকনি নিয়ে৷ দাদুর একটা পোলো ছিল৷ সে বেশ মজার জিনিস৷ ঝপাস-ঝপাস জলে ফেলো, তাক করে ফেলতে পারলে মাছ বন্দি, এইবার সাহস করে ওপরের ফুটো দিয়ে ভেতরে হাত চালাও৷ জ্যান্ত মাছ তুলে আনো৷

বাগান একেবারে তোলপাড়৷ একদিকে বাবা আর দাদু৷ আর একপাশে মা, আমি আর মদন৷ দাদু কমপিটিশন লাগিয়ে দিলেন, দেখি কোন দল বেশি ধরে!

বাবার ছাঁকনিতে প্রথমেই উঠল বিশাল এক মাগুর৷ লাল টকটকে৷ দেখলেই ভয় করে৷ মদন একটা মৃগেল দু-হাতে বুকের কাছে জাপটে ধরেছে৷ দাদু ছুটে আসছেন তাকে সাহায্য করার জন্যে৷ হঠাৎ আমার পায়ে কী যেন একটা জড়িয়ে ধরল৷ ভীষণ ঠান্ডা৷ পাটা জল থেকে তুলতেই জিনিসটা ঝুলে পড়ল৷ কী রে বাবা! সাপ না কি?

যেই মনে হওয়া সাপ অমনি আমি তারস্বরে চিৎকার জুড়ে দিলুম, ও মা সাপ, ও মা সাপ৷ মদন মাছ ফেলে, দাদু পোলো ফেলে, বাবা ছাঁকনি ফেলে ছুটে এলেন৷ মা বলছেন, ভয় নেই, ভয় নেই৷

কেউই আর সাহস করে এগিয়ে আসছে না৷ ইতস্তত করছে৷ এদিকে জলের তলায় আমার পায়ে সেই ঠান্ডা জিনিসটা জড়িয়েই আছে৷ আমারও পা তুলে দেখতে ইচ্ছে করছে না, সত্যিই যদি সাপ হয়৷ কামড়াবার আগে ভয়েই মরে যাব৷

মদন হঠাৎ ছুটে এসে, পায়ের কাছে জলে হাত ঢুকিয়ে দিল৷ সবাই চিৎকার করে উঠলেন, ওরে করিস কী, করিস কী?

আমি ভয়ে চোখ বুজিয়ে ফেলেছি৷ যদি সাপ হয়, মদনের হাতে নির্ঘাত কামড় মারবে৷ আমি তো মরেইছি, মদনও মরবে৷ ও, মদন, আমাকে কামড়ায় কামড়াক, তুমি যেন হাত দিয়ে ধরতে যেও না৷ চোখ বুজিয়ে-বুজিয়েই কথা কটা বলে ফেললুম৷

মদন আমার কথা শুনল না৷ খপ করে কী একটা ধরে জল থেকে টেনে তুলল৷ আমার পায়ের গোছের ওপর দিকে হড়কে গেল মোটা ফিতের মতো৷

মদন উল্লাসে চিৎকার করছে, ঢোঁড়া, ঢোঁড়া, কেউটে নয়, গোখরো নয়৷

চোখ খুলে তাকালুম৷ মদন আমার সামনে, ঠিক যেন বাচ্চা মহাদেব! গলায় চিত্রবিচিত্র সাপ জড়িয়ে আছে৷ হঠাৎ নজরে পড়ল মদনের ডান হাতের দু’আঙুলের ফাঁক দিয়ে টাটকা রক্ত গড়াচ্ছে৷

মদনের চিৎকার ছাপিয়ে এইবার আমার চিৎকার, ও মা, মদনকে সাপে কামড়েছে, ঝুঁজিয়ে রক্ত পড়ছে৷

মা ছুটে এসেও থমকে গেলেন৷ মদনের গলায় উড়ুনির মতো সাপ ঝুলছে, মুন্ডুটা চেপে ধরে আছে হাতের মুঠোয়৷ সাপটা মাঝে-মাঝে সরু সুতোর মতো জিভ বের করছে লকলক করে৷ মদনের কোনও ভয় নেই৷ সরো, সরো, বলে বাবা এগিয়ে এলেন৷ এতক্ষণ ওপাশে ছিলেন৷ মাছ ছেড়ে গাছ নিয়ে পড়েছিলেন৷ কলমের পেয়ারা গাছ লাগানো হয়েছে এক সার৷ জল থই-থই করছে, গোড়ায় জল বসে গেলে গাছ মরে যাবে৷

বাবা বললেন, সামান্য জিনিসে তোমরা বড় ভয় পেয়ে যাও৷ ঢোঁড়া সাপ কোনওদিন দেখোনি? ঢোঁড়ার বিষ থাকে না৷

দাদু বললেন, থাকে-থাকে? শনি, মঙ্গলবার খুব বিষ হয়৷

আজ কী বার?

তিনদিন নাগাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে৷ সকলেই প্রায় বার ভুলে গেছে৷ মা হিসেব-টিসেব করে বললেন, আজ শুক্রবার৷ বাবা এক ঝটকায় মদনের হাত থেকে সাপটাকে ছিনিয়ে নিয়ে পাঁচিলের বাইরে ছুড়ে ফেলে দিলেন৷ মদনের কনুই বেয়ে রক্ত ঝরছে৷ কী কামড়ান কামড়েছে রে বাবা!

মদনের পিঠে হাত রেখে বাবা বললেন, সাবাশ! এইরকম সাহসই চাই, তবেই বাঙালির ভিতু বদনাম ঘুচবে৷

মদনকে নিয়ে ভেতরে চলে গেলেন৷ আমাদের মাছ ধরা আর হল না৷ বেশ হচ্ছিল৷ পায়ে এক সাপ জড়িয়ে সব মাটি করে দিলে৷ তবে যা মাছ পাওয়া গেছে, তাইতে আজ দুপুরের খাওয়াটা জমবে ভালো৷ ছাতা উলটো করে ধরে, লাঠি দিয়ে খোঁচা মেরে-মেরে বেশকিছু গাছ বেয়ে ওঠা কই ধরা হয়েছে৷ মাগুর উঠেছে৷ গোটাকতক রুই কাতলা৷ ভালোই হবে৷

মদনের আঙুলের মাথায় সাপ ছোবল মেরেছে, বাবা আঙুল চেপে ধরে বেশ কিছুটা রক্ত ঝরিয়ে দিলেন৷ আমাকে বললেন, কার্বলিক অ্যাসিডের শিশিটা নিয়ে এসো৷

মদন হাসি-হাসি মুখে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে৷ ভয় নেই৷ যন্ত্রণা নেই৷

বাবা জিগ্যেস করলেন, কী, খুব জ্বালা করছে?

মদন বললে, না-না!

একটু করছে৷ করবেই৷ তবে তোমার সহ্যশক্তি অনেকটা আমার মতো৷ কার্বলিক পড়লে একটু বেশি জ্বালা করবে৷

মদন আঙুলটা সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বললে, তা একটু করে করুক৷

সাপের দাঁত বসানোর বেশ অদ্ভুত একটা চিহ্ণ থেকে যায়৷ কার্বলিক দিয়ে বেশ করে পোড়ানো হল৷ এতে নাকি বিষ ঝরে যায়৷ হোমিওপ্যাথিক বাক্স থেকে বেছে-বেছে একটা ওষুধ তুলে গোটাচারেক গুলি খাইয়ে দেওয়া হল৷

আমি ভয়ে-ভয়ে জিগ্যেস করলুম, ওঝা ডাকতে হবে কি? তাহলে আমতলা থেকে নিবারণ ওঝাকে ডেকে আনি৷

দরকার হবে না৷ ঢোঁড়ার বিষ মানুষের কিছু করতে পারে না৷ মানুষ তার চেয়ে অনেক বিষাক্ত৷

সন্ধের দিকে মদনের বেশ জ্বর এসে গেল৷ বিকেলে বৃষ্টি ধরেছে৷ ধরলেও চারপাশ ঘোলাটে হয়ে আছে৷ আশেপাশের বাড়ির টিনের চাল সবে শুকিয়েছে৷ একেবারে ঝকঝক করছে৷ দেখলেই মনটা কেমন যেন করে ওঠে৷ গাছের সবুজ পাতা যেন কে পালিশ করে দিয়ে গেছে৷ একটা দোয়েল মন্দিরের চূড়ায় বসে খুব শিস দিচ্ছে৷ পশ্চিম আকাশটা লাল হয়ে উঠেছে৷

বাবা যেন কোথায় বেরিয়েছেন৷ যখন বেরোলেন তখনও জ্বরের কথা মদন চেপে ছিল৷ জানতে দেয়নি৷ শেষে আর পারল না, শুয়ে পড়েছে৷ হাতের চেটোটাও বেশ ফুলেছে৷ দাদু গেছেন কবিরাজের বাড়িতে৷ বর্ষায় একটু সাবধান হতে হয়, আর সাবধান হতে হয় শীতের মুখে৷

জনার্দন তেমনি মামা! ছেলেটা জ্বরে কোঁ-কোঁ করছে, একবার আসবে তো! তিনটের সময় কোণের ঘরে কাঁথা মুড়ি দিয়ে সেই যে শুয়েছে, ভোঁস-ভোঁস নাক ডাকিয়েই চলেছে৷ মা একবার ডাকার চেষ্টা করে হেরে গেছেন৷ পাশ ফিরে শুতে-শুতে বললে, এখনও রাত আছে৷ আসলে জনার্দন আর মদনকে ভাগ্নে বলে মনে করে না৷ মদন এখন বাবুদের ছেলে৷

মদনের মাথার কাছে আমি বসে আছি৷ কপালে হাত রেখে ভয়ে হাত সরিয়ে নিয়েছি৷ অসম্ভব গরম৷ হাত যেন পুড়ে যাচ্ছে৷

বাবা বললেন, ‘আর দেরি না করে, বড় একজন ডাক্তার ডাকা উচিত৷ হাই ফিভার৷ মাঝে-মাঝে ভুল বকছে৷’

দাদু বললেন, ‘ডক্টর সরকারকে এখুনি কল দাও৷ এখুনি৷ জনার্দন৷’

দাদু হাঁক পাড়লেন৷ জনার্দন বারান্দার কোণে বসে বটুয়া খুলে পান সাজছিল৷ চট করে মুখে দু-খিলি পান, আর এক চিমটে জরদা ফেলে, পান ভরা মুখে উত্তর দিলে, ‘যাই বাবু৷’

জনার্দন দাদুর সামনে৷ দুটো গাল পানে ফুলো৷ পান খাওয়াকে দাদু অসভ্যতা মনে করেন৷ অন্য সময় হলে একধমক লাগাতেন, যাও পান ফেলে এসো৷ আজ আর কিছু বললেন না৷ জিগ্যেস করলেন, ‘ডাক্তার সরকারের চেম্বার চেনো?’

পাছে পান পড়ে যায়, ঠোঁট উলটে, জিভ জড়ানো গলায় বললে, হাঁ বাবু৷’

‘গিয়ে বলো, এখুনি একবার আসতে৷ আমার নাম করবে৷ বলবে যত রুগিই থাক সব ফেলে চলে আসতে৷ ভীষণ জরুরি৷’

‘মদনার জন্যে? ওর আবার ডাক্তার কী! জলে ভিজে জ্বর হয়েছে, তিনদিন পড়ে ছেড়ে যাবে৷ ওকে অত আদর দিবেননি৷ গ্রাম-ঘরের গরিব ছেলে, পরে আর খেটে খেতে পারবেনি৷’

জনার্দনের কথা শুনে দাদু ভীষণ রেগে গেলেন৷ চোখমুখ লাল হয়ে গেল৷ মদনের জ্বর না হলে জনার্দনকে অ্যায়সা বকতেন! ফরসা নাকের ডগা টুকটুকে লাল হয়ে আছে৷ চাপা গলায় বললেন, ‘তোমাকে যা বলা হচ্ছে তাই করো৷ বেশি পাকামো কোরো না৷’

জনার্দন গজগজ করতে-করতে রান্নাঘরের সামনে দিয়ে চলেছে৷

মা জিগ্যেস করলে, ‘কী হল কী?’

‘এক ডাক্তার দেখছে৷ বড়বাবু বললেন, আরও বড় ডাক্তার ডেকে আন৷ জ্বরজারি যেন কারুর হয় না৷ দেশঘর হলে মদনের কে চিকিৎসা করাত! পাঁচন খাইয়ে ভালো করে দেওয়া হতো৷’

‘মদনের অসুখে তোমার কোনও চিন্তা নেই! জ্বর তিনের নিচে নামছে না৷ পেটে জল তলাচ্ছে না৷ তোমার কোনও চিন্তা নেই? জনার্দন, তুমি মানুষ?’

‘আমরা গাঁ-ঘরের গরিব মানুষ, আমাদের অত ভাবলে চলে?’

‘তুমি গাঁয়ের মানুষ নয়, তুমি গরিবও নও৷ এই বাড়িতেই তোমার জীবন কেটে গেল৷ তোমার মুখে গাঁয়ের কথা মানায় না৷ আসলে তুমি মদনকে হিংসে করো৷ মদন ভালো থাকে, সুখে থাকে, মানুষের মতো মানুষ হয়, এ তোমার সহ্য হয় না৷ ছিঃ জনার্দন ছিঃ! এ বাড়িতে তুমি তো কম আদরে থাকো না! তোমাকে আমরা আত্মীয়ের মতোই ভাবি৷ তুমি হিংসে করছ ওই বাচ্চা ছেলেটাকে? প্রথম থেকেই আমি লক্ষ করছি মদনের কোনওরকম ভালো তোমার যেন সহ্য হয় না৷ মদন কী পরছে, মদন কী খাচ্ছে, মদন কেমন বিছানায় শুচ্ছে, সব খবর তোমার রাখা চাই৷ তোমার এই সাংঘাতিক হিংসের জন্যে দিন-দিন শুকিয়ে পাকিয়ে যাচ্ছো৷ মনটাকে উঁচুতে ওঠাও জনার্দন৷ মন পরিষ্কার করো৷’

মায়ের কথা শুনে জনার্দন কেমন যেন হয়ে গেল৷ মাথা চুলকোতে লাগল৷ মা বললে, ‘যাও৷ যে কাজে যাচ্ছিলে সেই কাজে যাও৷’

মিনিট পনেরোর মধ্যেই জনার্দন ফিরে এল ডাক্তারবাবুর গাড়ি চেপে৷ এই সময়টায় মদনের জ্বর ভীষণ বেড়ে যায়৷ ভুল বকতে শুরু করে৷ মুখ-চোখ লাল হয়ে যায়৷ মা মাথার কাছে বসে জলপটি লাগাচ্ছে৷ ডাক্তারবাবু ঘরে ঢুকতে-ঢুকতে বললেন, জ্বরটর খুব হচ্ছে৷ আর হবে না কেন, মশা যা বেড়েছে৷ এখন জ্বর মানেই ম্যালেরিয়া৷

মা মাথার কাছ থেকে সরে বসলেন৷ ডাক্তারবাবু মদনের কপালে হাত রাখতেই চোখ মেলে তাকাল৷ জবাফুলের মতো লাল৷ বিড়বিড় করে কিছু বলল৷ ঘরের ছাদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল৷ উঃ শব্দ করে আবার চোখ বুজিয়ে ফেলল৷

ডাক্তারবাবু খাটের পাশে বসলেন৷ মুখের চেহারা বেশ গম্ভীর হয়ে গেছে৷ নিজের মনেই বললেন, ‘বেশ দেরি হয়ে গেছে৷ কে দেখছিলেন?’

বাবা বললেন, ‘ডক্টর পাইক৷’

ডাক্তারবাবু আধশোয়া হয়ে মদনকে পরীক্ষা করতে লাগলেন৷ চোখ, বুক, হাত, হাতের তালু, পেট, পিঠ৷ বাকি রাখলেন না কিছুই৷ পরীক্ষা করতে-করতে নিজের মনেই বললেন, ‘বিচক্ষণ মানুষ কেসটা ধরতে পারলেন না৷ এতো বাড়িতে ফেলে রাখার কেস নয়!’

দাদু বললেন, ‘কি নিউমোনিয়া?’

‘নিউমোনিয়া হলে তেমন ভয় ছিল না৷ মনে হচ্ছে ম্যানেনজাইটিস?’

‘ম্যানেনজাইটিস?’

‘হ্যাঁ ঘাড় স্টিফ হয়ে এসেছে৷ অনেক আগেই হাসপাতালে পাঠানো উচিত ছিল৷ বেশ দেরি হয়ে গেছে৷’

মা জিগ্যেস করলেন, ‘ডাক্তারবাবু, ভয়ের কিছু নেই তো?’

‘ভরসাও দিতে পারছি না মা৷ যদি ম্যানেনজাইটিস হয়, তাহলে কী হবে বলা মুশকিল! দেরি হয়ে গেছে৷ বেশ দেরি৷’

ডাক্তারবাবু হাত ধুয়ে এলেন৷ তোয়ালে দিয়ে হাত মুছতে-মুছতে বললেন, ‘আর বাড়িতে ফেলে না রেখে হাসপাতালে ভরতি করে দিন৷ আজই, এখুনি৷ আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি৷’

ডাক্তারবাবু চলে যাওয়ার একঘণ্টা পরেই সাদা রঙের অ্যাম্বুলেন্স এসে গেল৷ স্ট্রেচারে শুইয়ে মদনকে তোলা হল গাড়িতে৷ মা আর দাদু গেলেন মদনের সঙ্গে৷ আমি, বাবা আর জনার্দন রয়ে গেলুম বাড়িতে৷ আমার খুব যাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছিল৷ বড়রা বারণ করলেন৷ হাসপাতাল বেড়াতে যাওয়ার জায়গা নয়৷ আমি যেন বেড়াবার জন্যেই যেতে চাইছি! মদনের জন্যে মন আমার ভীষণ খারাপ৷ বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল৷ ম্যানেনজাইটিস! সে আবার কী অসুখ! জনার্দন দেয়ালে পিঠ রেখে চুপ করে বসেছিল৷ সেও জিগ্যেস করল, ‘অসুখটা কী৷ নাম শুনিনি তো?’

বাবা বাগানে ছিলেন৷ মন খারাপ হলেই কাজে লেগে যান৷ এগাছের ডালের সঙ্গে ওগাছের ডালের জোড় কলম করছিলেন৷ ভয়ে-ভয়ে জিগ্যেস করলুম, ‘মদন ভালো হয়ে যাবে তো?’

প্রথমে শুনতেই পেলেন না৷ কাজে ডুবে আছেন৷

আবার জিগ্যেস করলুম, ‘মদন ভালো হয়ে যাবে তো!’

কাজ করতে-করতেই বললেন, ‘প্রে টু গড৷ প্রার্থনা করো৷ প্রার্থনা করো৷’

সন্ধের সময় মা আর দাদু ফিরে এলেন৷ মদনকে কেবিন-এ রাখা হয়েছে৷ কাল সকালে মেরুদণ্ড ছেঁদা করে কী একটা রস টেনে বের করে নিলেই মদন ভালো হয়ে যাবে৷ রাতে মা না-কি হাসপাতালে থাকবে৷ মা তাড়াহুড়ো করছেন৷ দাদু চান করবেন, গরম জল চাই৷ জনার্দনের পাত্তা নেই৷ গেল কোথায়? বাবা বলছেন, গেল কোথায়? মা বলছেন, গেল কোথায়? দাদু বলছেন, গেল কোথায়?

সব আছে, জনার্দন নেই৷ সে রাতে জনার্দন ফিরল না৷ দুশ্চিন্তার ওপর দুশ্চিন্তা৷ সারারাত দাদু ঘুমোতে পারলেন না৷ বাবা আর মা দু-জনেই হাসপাতালে৷ আটটার সময়ে ফিরে এসে যেই শুনলেন জনার্দন সারারাত ফেরেনি, ছুটলেন থানায়৷ ডায়েরি হয়ে গেল৷ সারা বাড়ি কেমন যেন হয়ে গেল৷ মদন নেই৷ জনার্দন হারিয়ে গেছে৷ সকলে ছটফট করছে৷ বয়েস হয়েছে৷ অসুস্থ মানুষ৷ গাড়ি চাপা পড়ল! না ছেলেধরায় ধরল!

দাদু বললেন, ‘বিপদ কখনও একা আসে না৷ দলবলসহ আসে৷ চলো যাই, আমরাই খুঁজতে বেরই৷ পুলিশের আশায় বসে থাকলে হবে না৷’

সারা দুপুর হন্যে হয়ে ঘুরে দুজনে ফিরে এলেন চোখমুখ লাল করে বেলা শেষে৷ কারুর মুখে কোনও কথা নেই৷ কার জন্যে বেশি দুশ্চিন্তা বোঝা যাচ্ছে না৷ মদনের জন্যে, না জনার্দনের জন্যে৷

বিকেলবেলা খেলার মাঠে বসে আছি৷ মদন নেই৷ কে আমাদের টিমে ক্যাপ্টেন হবে৷ হঠাৎ শানু এসে বললে, ‘ভূত দেখবি?’

‘ভূত? কোথায় ভূত?’

‘ওই যে গুঁইদের পোড়ো মন্দির৷ ওখানে ভূত ডাকছে৷’

দুজনে ভাঙা পাঁচিল টপকে ভেতরে গেলুম৷ মন্দির এক সময় বিশাল ছিল৷ এখন ভেঙে নেমে এসেছে মাটিতে৷ ভেতরে কালো শিবলিঙ্গ অন্ধকারে ঝাপসা হয়ে আছে৷ বেলগাছ, আমগাছ, কাঁঠালগাছ৷ একটু আগে দাদু রাগ করে বলছিলেন, জনার্দনকে বাঘে খেয়েছে৷ এখন মনে হচ্ছে, আমাকেই না বাঘে খায়৷

উঁচু মন্দিরে ওঠার সিঁড়ি, ভেঙে-ভেঙে লাট খেয়ে তালগোল পাকিয়ে পড়ে আছে৷ শানু বললে, ‘ওই শোন৷’

মন্দিরের ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ আসছে, ওঁয়া, ওঁয়া৷ কে রে বাবা! ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে কোনওরকমে আমরা ওপরে উঠলুম৷ ফুটিফাটা চারপাশ৷ বট অশ্বত্থের চারা বেরিয়েছে৷ ঘাসের জঙ্গল৷ যত কাছে এগোচ্ছি শব্দ তত স্পষ্ট হচ্ছে, ওঁয়া-ওঁয়া৷ মন্দিরের ভেতরে বেলাশেষের অন্ধকার ঘন হয়ে আসছে৷ বিশাল শিবলিঙ্গ৷ হঠাৎ নজরে পড়ল, বাবার মাথায় কেউ পুজো চড়িয়েছিল৷ শুকনো-শুকনো ফুল আর বেলপাতা৷ শিবলিঙ্গের ঠিক পিছন দিক থেকে শব্দটা আসছে৷

নিচের দিকে তাকাতেই কী একটা চকচক করে উঠল৷ মেঝেতে পড়ে আছে অন্ধকারে৷ তুলে দেখি জরদার কৌটো৷ প্রায় ভর্তি৷ এ তো জনার্দনের জরদার কৌটো৷ চিৎকার করে উঠলুম, ‘জনার্দনদা?’

‘ওঁয়া ওঁয়া৷’

‘তুমি কোথায়?’

‘ওঁয়া ওঁয়া৷’

পা টিপে-টিপে পিছন দিকে দুজনে এগিয়ে গেলুম৷ বিশাল এক গোল গর্ত, মুখ হাঁ করে আছে৷ শানু বললে, ‘ওটা হল পুকুর৷’

আবার ডাকলুম, ‘জনার্দন দা৷’

‘ওঁয়া৷ কেঁ ভাঁই৷ বাঁচাও৷’

শানু আর আমি লাফাতে-লাফাতে বাড়ির দিকে ছুটছি, ‘পেয়েছি, পেয়েছি৷ জনার্দনদাকে খুঁজে পেয়েছি৷’

দাদু বললেন, ‘পুলিশ নয়, এবার তাহলে দমকলে খবর দাও৷’

ফোন বেজে উঠল, ‘হ্যালো৷’

মায়ের মুখ উজ্জ্বল হল, ‘বাবা, হাসপাতাল৷ বলছেন, মদন ভালো আছে৷ ভয় কেটে গেছে৷’

বাবা বললেন, ‘গুড লর্ড!’

দাদু বললেন, ‘মা ফায়ার ব্রিগেডে ডায়াল করো৷’

পনেরো মিনিটের মধ্যে পাড়া কেঁপে গেল৷ দমকলের ঘণ্টা বাজছে৷ পিছন-পিছন ছুটছে সারা পাড়া৷ জনার্দন-উদ্ধার পালা দেখতে৷ একপাশে আমি দাঁড়িয়ে৷ হাতে দু-খিলি পান, আর জরদার কৌটো৷ গর্ত থেকে তোলার সঙ্গে-সঙ্গেই হাতে ধরিয়ে দিতে হবে৷ আটচল্লিশ ঘণ্টা না খেয়ে আছে৷ জিভে এক দানাও জরদা পড়েনি৷

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%